সাফল্যের গল্প

মা মারা যায় যখন আমার বয়স ৪ বছর কিন্তু তার শেষ ইচ্ছেটা রয়ে যায় অপূর্ণ

আপনি কাউকে লাফ দিয়ে গাছে উঠে যেতে দেখেছেন ?
বা আপনি কাউকে দেখেছেন এমন যে আজ রাতে দুনিয়াতে আসলো আর কাল সকালে হাটা শুরু করে দিল ?

নাই ভাই আমি আমার লেখা পড়িয়ে না আপনার সময় নষ্ট করছি না নিজেকে আপনার সামনে বোকা প্রমান করার চেষ্টা করছি ।

আজ লিখবো এক বাস্তবতা । আমি খুব কাছ থেকে তাকে দেখেছি । আমি দেখেছি বাস্তবতাকে । আজ লিখবো সেই মানুষ এর কথা যে নিজে কে প্রমাণ করেছেন নিজের জায়গা থেকে ।

মা মরে গিয়েছে যখন আমার বয়স ৪ বছর । আমার থেকে বড় ছিল আমার এক ভাই আর তিন বোন । বড় সব বোনদের বিয়ে হয়ে যে যার স্বামীর ঘরে । আর বড় ভাই কাজের সন্ধানে চিটাগাং । বাবার যা সম্পত ছিল তা আমার দাদা মরে যাবার পর সব বেচে দিয়ে বসে বসে খেয়েছে । যার কারনে এখন আমাদের সম্পদ বলতে শুধু থাকার ঘর । এক রাতে খুব ঝড় হচ্ছিল । বাহিরে প্রচুর বৃষ্টি । এর মধ্যে আমার মায়ের পেট খারাপ , উনার পাতলা পায়খানা আর বমি । বাহিয়ে এত বৃষ্টি যে পায়খানা করতে হচ্ছে ঘরে । পায়খানা করতে করতে উনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন । কিন্তু তখন যোগাযোগ এর বেবস্থা এখনকার মত ভালো ছিল না , যার কারনে বাহিরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব । তখন বুঝতে পেরে ছিলাম মা কে বোধ হয় আর বাচানো যাবে না। আমার মরে যাওয়ার আগে বলে ছিল তার নাকি খুব ইলিশ মাছ খেতে ইচ্ছে করছে । কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের কোথাও সেদিন ইলিশ পাওয়া যায় নি । কিছুক্ষণ পর মা আমাদের এতিম করে দিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে । এর পর থেকে আমি বাবার সাথে মাছ ধরি । আমার খুব ইচ্ছে আমি লেখা পড়া করবো । কিন্তু বাবা করতে দিতেন না । বলতেন মাছ ধরতে । আমি লুকিয়ে ভর্তি হয়ে গেলাম স্কুলে । পড়াশুনায় খুব ভাল ছিলাম । বাবার সাথে রাতে মাছ ধরে দিনে বাবা কে খেলার কথা বলে লুকিয়ে গিয়ে ক্লাস করতাম ।

আমার একটা অভ্যাস আছে । তা হল আমি আমার অন্য ভাই বোন থেকে একটু বেশি খেয়ে থাকি। আর এই বিষয়টাই আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো । বাবা মা মরে যাওয়ার পর আবার বিয়ে করলেন । সেখানে কিছু দিন পর আরও ২ ভাই হল। তখন সৎ মা আমি বেশি খাই বলে আমাকে একটু খাবার দিয়ে বাকি পাতিলা উপরে তুলে রাখতেন যাতে আমি খেতে না পারি। আমার বোন রা স্বামীর সংসার থেকে আমাদের বাড়িতে বেরাতে আসলে আমার জন্য তাদের ভাগ থেকে অর্ধেক খাবার রেখে দিতেন । এই খাবার নিয়ে মা ও বাবার হাতে অনেক পিটানি খেয়েছি । কোন রকম করে আমি ক্লাস ৫ পাশ করে চলে আসলাম ঢাকাতে । তখন আমার বয়স ১২ কি ১৩ বছর হবে । প্রথমে আমি এসে এক জনের বাসায় কাজের লোক হিসেবে কাজ করি । আমার কাজ ছিল ঘর মুছা আর বাজার করা । সেই সাথে আমি রাতে লুকিয়ে বই পড়াতাম । একদিন বাজার করতে গিয়ে টাকা হারিয়ে ফেলি তখন মালিক মনে করে আমি টাকা চুরি করেছি । উনাকে অনেক বলার পর উনি বিশ্বাস করেন নি । আমাকে বেঁধে রেখে খুব মারেন।

আমি সেখান থেকে কাজ ছেড়ে দিয়ে একটি পোশাক এর দোকানে কাজ নেই । প্রতি মাসে যা ইনকাম করি তা বাবা কে পাঠিয়ে দেই । কারন আমার মা এর ঘরে আমার আরেক ছোট ভাই আছে । যাতে বাবা ওকে ভালো মত দেখে । এই ভাবে দিন কাটতে থাকে আমার । তখন দেখলাম না এই টাকায় আমার হচ্ছে না , তখন আমি কাজ ছেড়ে দিয়ে একটি হোটেলে যোগ দেই পানি ম্যান হিসেবে । মানে খাবার খাওয়ার সময় আমি টেবিলে পানি দেই । এই ভাবে করে আমার হাতে কিছু টাকা হতে থাকে আর প্রতি মাসে আমি টাকা বাড়িতে পাঠাতে থাকি । এক সময় পানি ম্যান থেকে হয়ে যাই মেছিয়ার মানে খাবার টেবিলে এনে দেই । তখন টাকার পরিমানটা বাড়তে থাকে । কারন খাবার শেষে দুই পাঁচ টাকা বকসিস পাই আর এর সাথে মাস শেষে বেতন । এই টাকা বাবা কে দিলে বাবা খুশি হন। এত দিনে বড় ভাই বিয়ে করে আলাদা হয়ে যান। তাই সংসারে কোন টাকা দেন না । সম্পুন টাকাটা আমার দিতে হয় ।

বয়স তখন ২০ এর কাছে । যেই এলকায় হোটেলে কাজ করি সেই এলাকায় একটা মেয়েকে দেখে ভালো লেগে যায় আর তখনি তাকে পালিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করি । পরবর্তীতে সবাই বিয়েকে মেনে নেয় ।

তখন আমি হোটেল এর চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করি । কিন্তু প্রতিবার যখন ব্যাথ হই তখনি পাশে নিজের স্ত্রী কে ভরসা হিসেবে পেয়েছি । আমাকে সব সময় সুপরামর্শ দিয়ে সাহায্য করলো । একটা গলির ভিতর চায়ের দোকান নিতে আমার বিবি আমাকে খুব হেল্প করেছিল । মূলত তার কথায় আমি দোকানটি নিয়ে থাকি । সেখানে আমি চা বিক্রি শুরু করি । যখন আমি শুরু করি তখন আমার পুজি ছিল মাত্র ৫০০ টাকা । সময় তখন ২০০০ সাল । ১ বছর দোকান করার পর টাকা হিসেব খুঁজে পাচ্ছিলাম না।মানে আয় ব্যয় ধরতে পারছিলাম না।তখন বিবির পরামর্শে কাজ করি । আল্লাহ রহমতে লাভের মুখ দেখতে থাকি । মাস শেষে বাবা ঢাকায় আসতেন আর টাকা নিয়ে যেতেন।আমি কিছু টাকা করে জমাতে থাকি । এক সময় কিছু টাকা হলে আমি গ্রামে জমি কিনা শুরু করি । কিছু টাকা ধানের উপর লাগিয়ে দেই । এই ভাবে আস্তে আস্তে আমার দিন ফিরতে থাকে । আমি যেমন আমার বাবাকে টাকা দিতে থাকি ঠিক তার পাশা পাশি টাকা জমিয়ে জায়গা সম্পদ নিতে থাকি । এক পর্যায় যখন দোকানে বিক্রি বেরে যায় তখন আমি ৩ বছর বাবাকে টাকা না দিয়ে, টাকা জমিয়ে গ্রামে বিল্ডিং করি । বাবা ইচ্ছে উনি মরার আগে বিল্ডিং ঘুমিয়ে মরবেন । আর এই দিকে আমার ঘরে আসে দুই সন্তান । তাদেরকে বাংলাদেশের তখন স্বনাম ধন্য স্কুলে পড়িয়ে বড় করতে থাকি । তার পাশা পাশি মোটর সাইকেল কিনে ফেলি । সব আসে আমার এই ছোট চায়ের দোকান থেকে । আস্তে আস্তে আমার জায়গার পরিমান যেমন বাড়তে থাকে ঠিক টাকার পরিমান ও বাড়তে থাকে ।

হয়তো আপনারা ভাববেন আমি কাল দোকান দিয়েছি আজই এত কিছু করে ফেলেছি । তা কিন্তু না , আমার কাজের পিছে ছিল আমার অধ্যাবশয় আমার সততা । আর যার কথা বলেই নয় সে হল আমার স্ত্রী । উনি না থাকলে হয়তো আমার কিছু হত না । অনেক ঝড় ঝাঁপটা এসেছে জীবনে । এলাকার ছেলে পেলে দোকানের উপর খুব জ্বালাতন করেছে । চা খেয়ে টাকা দেয়নি । অনেক মার খেয়েছি মানুষ এর হাতে । কিন্তু আমি দমে যায়নি । আমি এগিয়েছি আমার মত করে ।তাই আজ টাকা পয়সা বাড়ি গাড়ি সুখ সাফল্য সব ধরা দিয়েছে আমার হাতে ।

এত ক্ষন যার কথা পরছিলেন উনি আমার বাবা । হ্যা উনি আমার বাবা।আমি আজ নিজেকে গর্ব করে বলতে পারি আমার বাবা চা বিক্রি করেন । এবং তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন কোন কাজই ছোট না । সব কাজ দিয়ে মানুষ সাফল্য অর্জন করতে পারে যদি সে নিজ জায়গা থেকে সৎ থাকে আর ধৈর্য রাখে। এর জ্বলন্ত প্রমাণ হল আমার বাবা । আর আমি তার সন্তান হয়ে একটি নাম করা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি তে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি । বাবার ইচ্ছে লেখা পড়া করে অনেক বড় কিছু হব আর আমার ইচ্ছে আমি বাবার মত হব যেখানে থাকবে সততা আর কাজের প্রতি সম্মান ।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

ঠিক কি কারনে বাঙালি জাতি ৭মার্চের ভাষণে উত্থাল হয়েছিল?

MP Comrade

জীবনে সফল হওয়ার কিছু কথা

MD Rubel

সফলতা কি কোন রূপকথা ?

Ahmmed Abir

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy