দেশপ্রেম

দি জোয়ান অব্ আর্ক — প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

মানব সভ্যতার ইতিহাস ক্রম পরিবর্তনের ইতিহাস।সামাজিক, রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য আন্দোলন করতে হয়েছে বারবার। এ আন্দোলনে অর্জন যেমন হয়েছে তেমনি ব্যর্থতা ও কম নয় ।এসব সংগ্রামে পুরুষের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে নারীও অংশগ্রহণ করেছিল।

মুক্তি সংগ্রাম শব্দটি ব্যপক অর্থবহ।এক্ষেত্রে মুক্তি সংগ্রাম বলতে আমরা বুঝে নেব বিভিন্নভাবে বন্দীদশা থেকে নারীর মুক্তির সংগ্রাম।পারিবারিক,সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী বঞ্চিত হয়েছে।তাই নারীকেও তার ন্যায্য প্রাপ্তির জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছিল।অনেক মহীয়সী নারীর বীরত্ব ও মহত্ব গাঁথায় আমাদের ইতিহাস উজ্বল হয়ে আছে।সময় এসেছে আজ অতীতের গৌরবের দিকে ফিরে দেখার।আজকের নারী যেন অতীতের মহিমাময় পটভূমিতে নিজেদের আলোকিত ও জাগ্রত করে তুলতে পারেন।দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত দেখিয়ে গেছেন বীরাঙ্গনা অনেক মহীয়সী নারী,তাদের মধ্যে যে মহীয়সী নারী ঐকন্তিক দৃঢ়তায় সংকল্পবদ্ধ হয়ে দেশমাতৃকার জন্য আত্মাহুতি দিয়েছিলেন তিনি চট্টল গৌরব প্রীতিলতা। এই বীরচট্টলা কালের প্রেক্ষিতে সময়ের সাহসী সূর্য্ সন্তানদের বুকে ধারণ করেছে। পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে মুক্তির ইতিহাসে যাঁর নাম চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।তাঁর এ আত্মাহুতি আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণে প্রেরণা জুগিয়েছে এবং অনুপ্রাণিত করছে বর্তমান নারীদেরকেও।

প্রীতিলতার সাহসী কর্মকান্ডের জন্য তাঁকে উপমহাদেশীয় জোয়ান অব্ আর্ক নামে ভূষিত করেন।

জন্ম ও পরিচয়ঃ

প্রীতিলতার জন্ম ১৯১১ সালের ৫ মে।চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে।এখানে জন্ম হয়েছে অসংখ্য বিপ্লবীর।ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে এই গ্রাম ছিল বিপ্লবীদের প্রধান ঘাঁটি।প্রীতিলতার বাবার নাম জগদ্বন্ধু ওয়াদেদ্দার তিনি একজন তৎকারীন সিটি কর্পোরেশনের চাকুরীজীবি ছিলেন।মায়ের নাম ছিল প্রতিভাদেবী ,তিনি গৃহিণী ছিলেন।

শিক্ষাজীবনঃ

প্রীতিলতার শিক্ষাজীবনের সুত্রপাত হয় তৎকালীন সময়ের স্বনামধন্য নারী শিক্ষালয় ড: খাস্তগীর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে।লেখাপড়ায় তিনি মেধাবী ছিলেন তারই স্বীকৃতি স্বরুপ তিনি অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তিলাভ করেন।১৯২৮ সালে কৃতিত্বের সাথে ১ম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করে বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে।১৯২৯ সালে ঢাকা ইডেন কলেজ থেকে আই.এ তে মেয়েদের মধ্যে ১ম স্থান লাভ করে বিশ টাকা বৃত্তি পান।ভর্তি হলেন কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন বিষয়ে অর্নাস নিয়ে।প্রীতিলতা বি.এ পরীক্ষায় অংশ নেন এবং ডিস্টিংশন নিয়ে বি.এ পাশ করেন।

বিপ্লবী ও কর্মজীবনঃ

চট্টগ্রামে ফিরে এসে প্রীতিলতা নন্দনকানন স্কুলে(বর্তমান অপর্ণাচরণ স্কুল) এ প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন।

প্রীতিলতার স্বাধীনতাকামী মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার সুত্রপাত হই তার আত্মীয় সম্পর্কের এক ভাইয়ের মাধ্যমে,পরে এই বিষয়টা আরো ত্বরাণিত হয় দীপালী সংঘের সংস্পর্শে গিয়ে।তাঁর ব্যাক্তি জীবনে একজন আর্দশ ও অনুপ্রেরণা হিসেবে ছিলেন  “উষা দি “ যার সাথে কলেজে পড়ার সময়ে পরিচয় হয়।

তখন বিপ্লবীদের একমাত্র লক্ষ্য ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা।মাস্টার‘দা তখন বলেছিলেন — মেয়েদের ছাড়া কোন বিপ্লবের কথা ভাবা যায় না।শত্রুর সাথে লড়াই কঠিন-অনেক রক্তপাত,অস্ত্র সংঘর্ষ এ সবে মেয়েরা আপাততঃ যোগ দেবে না।তবে আগামিতে পারবে।সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া স্বদেশের স্বাধীনতা সুদুরপরাহত সেই আর্দশকে বুকে নিয়ে প্রীতিলতা কলেজে মাস্টারদার নির্দেশে এক বিপ্লবী চক্র গড়ে তুলেন।প্রীতিলতা ও অন্য মেয়েরা বোমার খোল এনে চট্টগ্রামে বিপ্লবীদের হাতে তুলে দিতেন।এটা ছিল তাদের সাংগঠনিক কাজের একটা অংশ।

একটা সময় প্রীতিলতা লক্ষ্য করলেন যে বিপ্লবীরা ধর্মভীরু,দলের প্রতি নিষ্ঠা,আনুগত্য,বিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুশাসনেই গঠিত।বাবা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া ধর্মশিক্ষা তাকে দেশের জন্য নিঃস্বার্থভাবে আত্মদানকে পবিত্র কর্তব্য বলে ভাবতে শিখিয়েছে।দর্শনের ছাত্রী – যুক্তি ও চিন্তার ব্যাপকতা তাঁর মধ্যে প্রোথিত।

১৯৩০ সাল।

প্রীতিলতা ছাত্রীনিবাসে বসে জানতে পারলেন যে চট্টগ্রামে বিপ্লবীরা অস্ত্রাগার লুন্ঠন,টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন অফিস ধ্বংস ও রির্জাভ পুলিশ লাইন অধিকার করে।এই ঘটনার পর তার মধ্যে আরো উন্মাদনা জাগে বিপ্লবীকাজে সক্রিয় হতে।পরে মাস্টারদার নেতৃত্বে কাজ করার সুযোগ আসল আর দলের প্রয়োজনে কল্পনা দত্তের সাথে তিনি তৈরি করলেন বোমা তৈরীর সরঞ্জাম আর গান কটন।এই কাজে আর্থিক সহায়তার জন্য তিনি নিজের গহনা দিয়ে এবং বাকিদের কাছ থেকে নিয়ে তহবিল যোগাড়ের  কাজ করেন।এই কাজে তিনি মাস্টারদার কাছ থেকে বেশ প্রশংসা পান।যা তাঁকে আরো অনুপ্রাণিত করে তুলেছিল বলা যায়।দীর্ঘদিন ধরে কল্পনা দত্ত আর প্রীতিলতা প্রত্যক্ষভাবে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার দাবি জানিয়ে আসছিল।অবশেষে বিপ্লবীদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি ধলঘাটের এক গোপন আস্তানায় এক সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয় ।বাড়িটি ছিল সাবিত্রিদেবীর।তবে সেদিন ব্রিটিশ পুলিশের আক্রমণে তারা কোনমতে পালিয়ে বাঁচে আর এই ঘটনায় বিপ্লবী নির্মল সেন আর অপূর্ব সেন নিহত হলেন।

অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ…………

এ সময় প্রীতিলতা আর কল্পনা দত্তের প্রবল আগ্রহের কথা জানতে পেরে মাস্টারদা তাঁদের দুজনকে বিপ্লবীকাজে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন আর আত্মগোপনে থাকার নির্দেশ দিলেন।

১৯২৩ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর রাতে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা নেন এবং দায়িত্ব দেন প্রীতিলতাকে।মুহুর্তের মধ্যেই স্থির করে ফেললেন এ আহবানে তিনি সাড়া দেবেনই।জীবনে হয়তঃ মৃত্যুর যবনিকা পড়বে কিন্তু তিনি ভীত নন।

ঝাঁসির রাণী লক্ষীবাঈ যদি যুদ্ধ করতে পারেন,শত্রুর প্রাণ সংহার করতে পারেন তিনি কেন পারবেন না ? নিশ্চিত মরণ উপেক্ষা করে দেশমাতৃকার পরাধীনতার শৃংঙ্খল মোচনে দৃঢ় সংকল্প প্রীতিলতা।মনে মনে শপথ নিলেন পাহাড়তলী অভিযানে তাঁকে সফল হতেই হবে।প্রীতিলতা উপস্থিত সেনাপতি হিসেবে আর নির্দিষ্ট সংকেত পাওয়ার পর চার্জ বলার সাথে সঙ্গীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল।মুহুর্তের মধ্যে বল নাচের পরিবর্তে ক্লাবটি রুপ নিল বিভীষিকাময় স্থানে।কান্না, চিৎকার আর দৌঁড়ঝাপ সবকিছূ মিলে সেদিনের যুদ্ধে প্রায় পঞ্চাশোর্ধ লোক হতাহত হয়।আক্রমণে নেতা সর্বাগ্রে আর প্রত্যবর্তনে নেতা পিছনে এমনই ছিল রণনীতি।সফল অভিযান শেষে সাথীরা মার্চ করে চলে যাচ্ছে।প্রীতিলতা পেছনে।হঠাৎ একটা গুলি এসে লাগল প্রীতিলতার বুকে,প্রবল রক্তক্ষরণ হচ্ছে,মাটিতে লুটিয়ে পড়ল নিথর দেহ।

ইংরেজ সৈন্যর একটা বেয়নেট এগিয়ে আসতে দেখে তিনি সঙ্গে রাখা পটাশিয়াম সায়ানাইড মুখে দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিলেন অবলীলায়।দেশের জন্য প্রাণ দিলেন চট্টল রাণী প্রীতিলতা।সৃষ্টি করলেন ইতিহাস।সেই যুগের প্রথম নারী বিপ্লবী শহীদ প্রীতিলতা রেখে গেলেন দেশপ্রেমের আর্দশ,চারিত্রিক দৃঢ়তা।

প্রীতিলতার নিজ হাতে লেখা একটা চিঠি তার মরদেহের সাথে পাওয়া যায় যাতে তিনি লিখেছেন নিজ অভিমত —-

প্রীতিলতার এই অন্তিম চিঠিখানি আমাদের আলোকবর্তিকা।প্রীতিলতার শৌর্য্,সাহস,অম্লান আর্দশনিষ্ঠা আমাদের কাছে এক অমূল্য দৃষ্টান্ত যা আমাদের অন্ধকারে বিদিশিার দিশা হয়ে থাকল।

আজ ভারতবর্ষ নেই,ব্রিটিশ শাসন নেই। স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ যেখানে শত শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জন করা স্বাধীনতার ফলটুকু আত্মসাৎ করছে কিছু মানুষ।ভোগবাদী ব্যবস্থার মূলোৎপাটন আর সামাজিক বিপ্লবের নিমিত্তে দরকার আরো একটা প্রচেষ্টার যেমনটা চেয়েছিল প্রীতিলতাসহ অন্য বিপ্লবীরা।

আজ নারীরা দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে ঘরে বাইরে।ইতিহাসের বীরসেনানী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার হয়তো আজও কোন সংগ্রামী নারীর চিত্তে সদাজাগ্রত আর বলীয়ান হয়ে নারীসত্তাকে করছে বিকশিত আর নারীশক্তির আলোকবর্তিকা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়ে চলছে নিরন্তর।

এই মহীয়সী নারীর জন্য নিরন্তর ভালবাসা আর আকুন্ঠ শ্রদ্ধা রইল ।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

একাডেমিক শিক্ষা এবং আমাদের জীবন

Mitun747

ভারতীয় এবং পাকিস্তানি ইউটিউবাররা কি নপুংসক? Are the Indian and Pakistani Youtubers Castrated?

Ferdous Sagar zFs

বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক ও তিস্তার পানি!!!

Ashraful Kabir

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: