Now Reading
ধ্রুবর কাহিনি (পর্ব ২)



ধ্রুবর কাহিনি (পর্ব ২)

(প্রথম পর্বের পর…)

তারাতারি করে চলে আসে শৈবাল।
তারপর ধ্রুব বলে আজকে পুরো শহর ঘুরে বেরাবে। এইবার শৈবালের রীতিমত তাজ্জব বনে যাওয়ার অবস্থা। যেই ধ্রুব কিনা সকালের জল-খাবার খাওয়ার জন্য ছাড়া ঘর থেকে বেরহয় না, সেই কিনা শহর ঘুরে বেড়াতে চাইছে ?

কিন্তু অনেকদিন পর ধ্রুব কোন কিছুর ইচ্ছা প্রকাশ করল, শৈবাল তা ফেলতে পারবে না।
৮ টায় দুজন একসাথে ঘর থেকে বের হয়, শৈবাল তার গাড়ি নিয়ে বের হতে চায়, কিন্তু ধ্রুব বারণ করে। তার ইচ্ছা একটা লোকাল বাসে চড়ে বেড়াবে।

শৈবাল আসলে কিছুই বুঝতে পারে না, যে ধ্রুবর মাথায় চলছে টা কি। কথা বেশি না বাড়িয়ে তারা ৬ নং বাসে গিয়ে উঠে। শুরু হয় তাদের যাত্রা। একটু পর পর থামাথামি, বাসের ভেতর সিট নিয়ে মারামারি, হেল্পারের কান ঝালাপালা করে দেওয়া ভাষণ, রিকশাওয়ালাদের চিৎকার-চেচামাচি কিছুই যেন বিরক্ত করছে না ধ্রুব কে। শৈবাল তার মত ধ্যাঁনের জগতের মানুষ নয়। সে বিরক্তবোধ করছে, প্রচন্ড বিরোক্তবোধ করছে। কিন্তু সাড়ে ৪ বছরেরও বেশি সময়ের পর ধ্রুবর মুখে হাসি দেখে পুরোটাই সহ্য করে যায়।
অর্ধেক শহর ঘুরে আসার পর ২ টায় তারা নেয় ভোজন বিরতি। কোন ৫ তারকা হোটেলে নয়, ধ্রুব চাইল মাটির চুলায় রান্না করে ধোয়া উঠানো সাদা ভাত এবং আলু ভর্তা।
এইবার শৈবাল একটু বেশিই ভয় পেতে শুরু করে। আজকে ধ্রুব এমন আজগুবি কর্মকান্ড করছে কেন ? জিজ্ঞাসা করে বসল শৈবাল। ধ্রুবর নিষ্পাপ উত্তর ” জীবন কে উপভোগ করতে চাই। আধমরা হয়ে আর কতদিন ? “। কিছুটা প্রশান্তি আসল শৈবালের মনে। বন্ধু মনে হয় তবে ভাল হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।

আরো আগেই হয়ে যেত, কিন্তু একদিন এক মনোবিদ ডেকে আনায় বাঁশের এক বারিতে ঐ মনোবিদের হবু বাচ্চাদের এতিম করে দিয়েছিল ধ্রুব। বহু কষ্টে ব্যাপারটি সামলাতে হয় শৈবালের।

তখন ধ্রুব প্রতি মুহুর্তে একা থাকতে চাইত। আলো কে ভয় পেত, অন্ধকার কে ভালবাসত। তবে এখন যেহেতু সে নিজে থেকেই তার মানসিক পরিস্থিতি ভাল করার পদক্ষেপ নিচ্ছে আশা করা যায় পদক্ষেপটি সফল হবে।

” কাল থেকে একদম সোজা হয়ে যাব দোস্ত, আজকে শেষ বারের মত গাজা খাব, এক পোটলা নিয়ে আয় না” । ধ্রুবর এই নিরীহ আবদার পছন্দ না হলেও পূরণ করতে হয় শৈবালের। রাতের সাড়ে ১১ টায় গাঁজা সেবন শেষ করে ধ্রুব। বড় বড় স্পীকার দুইটায় এখনো বাজছে এশেজ ব্যান্ডের ” তামাক পাতা ” গানটি। নেশা করার সময় এইটি তার প্রিয় গান। এই গান শুনলে ধ্রুবর পুরান দিনের কথা মনে পরে যায়, যখন ধ্রুব আর শৈবাল একসাথে গাঁজা খেত। পরে শৈবাল সিগারেট ছাড়া সব নেশা জাতীয় দ্রব্য পরিহার করে। শৈবাল এও জানে যে ধ্রুব যতই বলুক, মানসিক পরিস্থিতির উন্নতি হলেও গাঁজা ধ্রুব ছারবে না।
রাত ১২ টা পেরেয়ি যায়, ধ্রুব গান বন্ধ করে ঘুমোতে চেষ্টা করে, কাল থেকে তার একটি সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মত জীবন যাপন করতে হবে। গোছানো বিছানায় আস্তে করে গা এলিয়ে দেয় সে। চোখ বন্ধ করে, কিন্তু ঘুমোতে পারে না।

চোখের বদ্ধ পাতার নিচে, চক্ষুগোলক দুটি নাড়াচাড়া করছে, তাও ঘুম নেই । খুব কঠিন চেষ্টা করার পরেও ব্যর্থ হচ্ছে। তারপরেও চোখের পাতা খোলে নি সে। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

শেষমেশ আর পারল না। উঠে পরতে হল তাকে। অনেক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকা সত্তেও তার ঘুমটা আসল না। মনটাই খারাপ হয়ে গেল, নিজেকে ধিক্কার জানাল সে। সামান্য এই কাজটুকুও সে করতে পারে নি চিন্তা করতেই অগ্নিস্রোত বেরিয়ে আসছিল তার মাথা থেকে। তারপর মনে পরল আরও ছোট একটি কাজ সে সম্পন্ন করতে পারে নি আজও।
অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে ঐন্দ্রিলার ধর্ষনের প্রতিশোধ। এই ভেবে নিজেকে সান্তনা দিলে ধ্রুব।

এখন কি আর করার ? তন্দ্রাকে তো আর ঘুষ দিয়ে বলা যায় না যে আমাকে গ্রাস করে নাও। তাই প্রতিরাতের মতো নিশাচর ধ্রুব আজকেও বেরিয়ে পরল নিশিভ্রমনে। তার এই নিশিভ্রমনের কথা কিন্তু কেউ কোনোদিনও জানতে পারে নি। শৈবালও না। শৈবালের কাছে ধ্রুব কেবল এই কথাটাই গোপন করেছে। গোপন করার মত এমন কোন মহা গুরুত্বপূর্ণ কথা এটা নয়। তবুও মাথা আউলে যাওয়া ধ্রুবর কাছে এই বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও হতে পারে।

ধ্রুবর বয়স এখন ২৮। ১১ বছর আগে সর্বশেষ একসাথে নিশিভ্রমনে বেরিয়েছিল ধ্রুব, শৈবাল এবং আরও কিছু বন্ধু। সেদিন রাতে তাদেরকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছিল, রাত সাড়ে ৩ টায় পথঘাটে বাউন্ডুলেপনা করে বেরানোর দোষে। তারপর থেকে ধ্রুব প্রায় ২ বছর ঘর থেকে বের হয় নি, মিসেস মেজর আটকে রেখেছিলেন।
২ বছর পর যখন প্রথম স্বাধীনভাবে ঘর থেকে বেরিয়েছিল ধ্রুব, তার চেহারা ছিল দেখার মত। পাগলাগারদ, জেল বা রিহ্যাব থেকে ফিরে এলে মানুষের অবস্থা যেমনটা হয় আরকি। মায়াভরা চোখদুটোতে তাকিয়েছিল বন্ধুরা। কতটা বদলে গেলে এই ধ্রুব। দাড়ি উঠে না দেখে যার আফসোস এর শেষ ছিলনা, আজকে তারই মুখভর্তি দাড়ি। কিন্তু মুখে এই নিয়ে টু শব্দটি নেই। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ছারা আর কিছুই করতে পারছিল না শৈবালরা। সেখান থেকে স্বাভাবিক হতেও আরও মাসখানিক চলে যায়।

একটি ট্রাউজার এবং হাতাকাটা গেঞ্জির ওপর চাদর জড়িয়ে ঘর থেকে বের হল। মাথায় এখনও চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, ঘুম কেন আসল না ? এবং কালকে থেকে স্বাভাবিক থাকতে চায় সে।

জায়গাটা এখনও জমজমাট, এত রাত হয়েছে তারপরেও অনেক মানুষ। ধ্রুব সবাইকে পর্যবেক্ষন করা শুরু করল। প্রত্যেকেই
নেশাখোর ছারা আরেকটি মিল হল তাদের সবারই হাত পকেটে। ধ্রুব হঠাৎ আবিস্কার করল তার নিজের হাতদুটিও মুষ্টিবদ্ধ করে পকেটের ভেতরে রাখা। নিজের ওপর আবারও রেগে যায় ধ্রুব। সে চিরকালই চেয়েছিল অন্যান্য মানবজাতির চেয়ে ভিন্ন রূপ ধারণ করতে। কিন্তু এই সামান্য জায়গায়ও সবার ছোট একটি কাজের সাথে তার কাজটিও মিলে গেল। পকেট থেকে হাত বের করেনি। জিঘাংশু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সবার দিকে। সে জানতে চায় কি কারনে সবার হাত পকেটে।

চিন্তায় ডুবে গিয়ে কিছু কারন বের করতে পারল। ১) কেউ শীতের কারনে, ২) কেউ পকেটের ভেতরে টাকা গুনছে, ৩) কেউ ভাবে আছে, ব্যাক্তিত্ববোধ প্রদর্শন করছে এবং ৪) হাতে হাত রেখে ঘুরবার মত কেউ নেই তাই।

এইবার ধ্রুব বুঝতে পারল সেও মোটামুটি সেই ৪ নম্বর কারনেই হাত পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছে। সমস্যা নেই। এতগুলো কারনের
মাঝে কেউ বের করতে পারবে না, ধ্রুব কোন কারনে হাত লুকোচ্ছে । অবশ্য একসময় ধ্রুবরও প্রেমিকা নামক এক বস্তুর মালিকানা ছিল, ২ বছর পর ঘর থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে মৌ নামের ঐ মেয়ের সাথে ধ্রুবর দেখা হয়। মেয়ে ছিল অত্যন্ত ভাল, সুশীল এবং সুন্দরী। তার খারাপ দিক বলতে একটাই ছিল, যে তার বাপের বাড়ি নোয়াখালিতে। বাংলাদেশের সুশীল সমাজ নোয়াখালির লোকজনদের স্বভাবতই একটু বাঁকা চোখে দেখে। দোষটা মৌ’র ছিল না।

সমস্যাটা হত একদম বিয়ের সময়, মেজর সাহেবের পরিবার হয়ত মেনে নেবেন না। শুধুমাত্র তাই। কিন্তু ব্যাপারটা সে পর্যন্ত গড়ায় নি। তার আগেই ধ্রুবকে বিচ্ছেদের বিরহে ভাসিয়ে দিয়ে চলে যায় মৌ।
কারনটা আজও ধ্রুবর অজানা। ধ্রুবর এখনো মনে আছে বাড়িতে মিথ্যা কথা বলে তিশাকে নিয়ে যেদিন নীলগিরি তে যায়, সূর্যাস্তের সময় মৌ’র কোমর জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছিল সে। সেই শেষ স্মৃতি, তার ৫ কি ৬ মাস পরেই তাদের বিচ্ছেদ হয়।

সেদিন সবাইকে ধ্রুব টিক্কা পরোটা খাওয়ালেও, শৈবাল ঠিকই বুঝে নেয় ভেতরে ধ্রুব কাদছে। এখনো তিশার কথা মনে পরলে ধ্রুবর ঠোটের কোণায় হাসি দেখা যায়।

অনেকক্ষণ এক জায়গায় বসে দুই কুকুরের লীলাখেলা দেখছিল ধ্রুব, চোখে বিরক্তির ছাপ নেই। প্রাকৃতিক জিনিসে খারাপ কিছু নেই। মইতুল সবাইকেই সময়ে অসময়ে নারিয়ে দেয়। কুকুররাও তো মানুষই

কিন্তু ধ্রুব রাগান্বিত হয়ে উঠল যখন কুকুররূপি মানুষের পাশে হাজির হয় এক মানুষরূপি কুকুর। সাথে ছিল এক অসহায় নারী। যার ” বাচাও বাচাও” চিৎকার টা যেন শুধুমাত্র ধ্রুবর কানেই যাচ্ছিল। আর কেউ কোনরকম ভ্রূক্ষেপ করছিল না। মুহুর্তের মাঝে ধ্রুবর ভেতরে এক আতঙ্ক দেখা দিল।
ধ্রুবর যেন মনে হচ্ছিল এই নারী তারই বোন ঐন্দ্রিলা। বেঁচে থাকলে হয়তো এতদিনে এমনই দেখতে হতো ঐন্দ্রিলাকে। ধ্রুবর চোখের সামনে বারবার শুধু একটি দৃশ্য ভেসে আসছে। যখন ঐন্দ্রিলা তাকে কাদতে কাদতে বলেছিল, ” ভাইয়া ওরা আমাকে শেষ করে দিল ” । সেখানে বসে বসেই কাঁদছিল ধ্রুব। একটু পর কুকুরগুলোর পাশে গিয়ে দারায় ।

মানুষটার সেদিকে হুঁশ নেই যে কেউ তাদের পাশে এসে দারিয়েছে।  কুকুরগুলোর লীলাখেলার মাঝে একটু বাধা সৃষ্টি করতেই হল ধ্রুবকে। পাশে পরে থাকা কয়েকটা ইটের মধ্যে থেকে একটি ইট নিয়ে তৎক্ষণাৎ ঐ অপরাধী কুকুরটার ভবলীলা সাঙ্গ করে দেয় সে। মাথা ফেটে সব রক্ত গুলো ঝরে পড়ছে সেই নারীর সাদা কাপড়ের ওপর।
দেখে মনে হচ্ছিল হয়ত কোন নার্স হবে। মেয়েটা উঠেই পি.টি ঊষার মত দৌড় লাগাল, দেখে মনে হল আর কোনদিন এই রাস্তা মাড়াবে না এই প্রতিজ্ঞা করতে করতে যাচ্ছে।
ধ্রুবর খারাপ লাগল যে মেয়েটি একবারও ধন্যবাদ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না । কিন্তু সমস্যা নাই। আসল যেই কুকুরদুটিকে ধ্রুব বিরক্ত করেছিল তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিবে বলে পেছন ফেরে দেখে, ঐ বিরক্তিতে তাদের কিছু আসে যায় নি। তারা তাদের নিজের কাজে ব্যাস্ত। তখন আর অপরাধ বোধ হয় না তার। ধ্রুব জানে, কুকুররাও মানুষ, তাদেরও নিজ নিজ কাজে ব্যাস্ত থাকতে হয়। আর আজকে এত বড় একটা পুন্যের কাজ করার পর অপরাধ বোধ হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

অনেকদিন ভারী কাজ না করায়, সামান্য এক ইট উঠিয়েই ক্লান্ত হয়ে পরল ধ্রুব। ব্যায়ামের প্র্যাকটিসে থাকলে এমন হত না, প্র্যাকটিস মেইকস এ ম্যান পারফেক্ট বলে কথা।

(চলবে……)

About The Author
Prashanta Deb
Prashanta Deb
I am just a guy passionate about films and I am trying my best to develop my skills as an actor. Writing is one of my many hobbies.
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment