Now Reading
চারু! একটি মেয়ের নাম



চারু! একটি মেয়ের নাম

চারু! নামটা বড্ড সেকেলে তাই না। চারু মানে সুন্দর। আর এই চারু নামটা ঠিক আমার গায়ের রঙের বিপরীত। দাদু খুব শখ করে নাম রেখেছিলো। বড় হয়েছি কলকাতায়। কলকাতার বড়বাজার এ। ছোট থেকেই ছুটে বেড়িয়েছি এখানে ওখানে। কখনো বাবার কাজের জন্য ছুটেছি এই শহর থেকে ঐ শহর। কখনো ছুটেছি মায়ের হাত ধরে দাদুর বাড়ি। বাবা-মায়ের ঝগড়া সে নিত্য দিনের অভ্যাসে পরিনত হয়েছিলো। সকালে বা রাতে এইটা ওটা নিয়ে তারা ত্বর্কে লেগেই থাকতো। আমি সেই ত্বর্কের সময় লুকিয়ে কান্না করতাম, দরজার আড়ালে। তখন মা’ও আমার সাথে কান্না করতো। ছোট ছিলাম বলেই মনে হয় কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে যেতাম। কিন্তু মা ঘুমাতো না। কান্না করেই যেতো। আমি বড় হয়েছি বলতে গেলে দাদুর কাছেই। বাবা-মা অফিস করতো আর আমি একা একাই থাকতাম। আমার সহযোগী ছিলো এক আন্টি আর দাদু। আন্টি সপ্তাহে ৩ দিন আসতেন। বাকি সময় আমি আর দাদুই থাকতাম। দাদু বই পরতো আর আমি একা একাই থাকতাম প্রায় সময়। খেলার সাথী তেমন এলাও করতো না কেও। তাই বলতে গেলে একা একাই বেড়ে উঠা।

গবেষণা নাকি বলে, একা একা থাকা মানুষ গুলোর নাকি আয়ু কম থাকে। আর রোগের বেলায় সবার উপরে। জানিনা কতটা সত্য কিন্তু হতেও পারে সত্য। প্রথম ভালোবেসেছিলাম সেই ক্লাস ৮ এ। আমার ক্লাসেই পড়তো। সারা ক্লাস আমার দিকে তাকিয়ে থাকা, আমার সাথেই প্রাইভেট পড়া, আমার সাথেই বাড়ি আসতো। যদিও ওর বাড়ি অন্য এলাকায় ছিলো। আমাকে নোট’স দিয়ে হেল্প করতো সারাক্ষন। স্কুলে কেও আমার সাথে বাজে ব্যবহার ও করতে পারে নি। আসতে আসতে বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা হয়ে গেলো। কিভাবে কি হলো নিজেও জানি না। চলছিলো এভাবেই দিন। আমার নিজের ফোন ছিলো না। লুকিয়ে লুকিয়ে দাদু বা দোকান থেকে ফোন করতাম। ওর কাছেও ছিলো না ফোন। বাসার ফোন দিয়েই কথা বলতো। স্বল্পবয়ষি দুই কিশোর-কিশোরীর চলছিলো দিন এই ভাবেই। আমি সারাজীবন একা একাই বড় হয়েছিতো তাই ভয় পেতাম, কিছু পাওয়ার সময়।

শুভ্রর সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতাম সবটা সময়। আমি কখনো চাইতাম না কোন কারনে কষ্ট হোক বা শুভ্র’ও কখনো বাজে ব্যবহার করতো না। ভালোই চলছিলো দিন-গুলো। মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম দুই জনেই। ভর্তি হলাম এক ই কলেজে। কলেজে উঠেই যেন নিজেকে বদলে যেতে দেখলাম। খুব চুপচাপ স্বভাবের হলেও সব সময় চাইতাম সবার সাথে মিশতে। কিন্তু পারতাম না। কাওকেই আপন ভাবতে কষ্ট হতো। আমার মাঝে মাঝেই মাথা ব্যথা হতো। ছোট বেলা থেকেই। ভেবেছিলাম সাধারন ব্যথাই হবে। হয়তোবা ভুলছিলাম।

একদিন ডাক্তার দেখালাম। Neurologist অতুল কুমার সেন। আমার নানান টেষ্ট এর রিপোর্ট দেখে তিনি যে কথাটা আমাকে বলেছিলো, এখনো সেটা আমার কানে বাজে। প্রতিনিয়ত। “Miss Charu, you have brain cancer . There are approximately 1 month as the time in your hands. I would be happy to speak the words of someone in your family. But since there is no one, so it will be up to you to accept this fact. কথাগুলো যেনো আমার মনে গেথে গিয়েছিলো। আমি ডক্তরের চেম্বার থেকে যেনো হাটতে পারছিলাম না। চেম্বার থেকে বের হবার সময় শুভ্র ফোন করে বললো যে ওর বাবা আর নেই। আমার খুব কান্না পেলো কথাটা শুনে। আমি দেখতে গেলাম ওর বাবাকে। শুভ্র আমাকে ধরে খুব কান্না করলো। আমিও খুব কান্না করলাম। আমি ওকে কিছুতেই বলতে পারিনি যে আমার ক্যান্সার ধরা পয়েছে। এমনি ওর বাবা হারানোর কষ্ট, তার উপর আমার কথাগুলো বলে আরো কষ্ট দিতে চাই নি আমি। তাই আড়াল করে গেলাম সব কিছু। কেও কিছু জানলো না। সময় চলে যাচ্ছিলো। শুভ্র কে সাপোর্ট দিচ্ছিলাম মেন্টার্লি। কিন্তু আমি? নিজে নিজে যেন যুদ্ধ করছিলাম সারাটা সময়। কেনো আমার সাথে এমন হলো। ওদিকে বাবা-মা ও কিছু জানলো না। জমানো যা ছিলো সব দিয়েই শুভ্রর জন্য, বাবা-মা এর জন্য সবার জন্য এইটা সেইটা কিনে দিলাম। এক একটা দিন যেনো খুব তারাতারি ই চলে যাচ্ছিলো। আমি একা থাকতাম। মাথার এক্সট্রা চুল আনিয়ে নিয়েছিলাম। যাতে কেও সন্দেহ না করে। শুভ্রর সাথে দেখা করেছি ২ বার। সামনে গেলে যদি বলে দেই আমার কথা। তাহলে খুব কষ্ট পাবে ও। আমি তো কষ্ট দিতে চাই না। আচ্ছা, ভালোবাসা কি এমনি। নিজের মৃত্যু জেনেও অন্যকে খুসি রাখার চেষ্টা। আমি জানি আমার চলে যাওয়ার তারিখ। এক একটা সময় চলে যাচ্ছিলো আর মনে হচ্ছিলো কত কাজ করার ছিলো আমার। কত স্বপ্ন ছিলো। কিছুই পূরন হলো না আমার। সব কথা তো সবাইকে বলা যায় না। মায়ের জন্য, বাবার জন্য, শুভ্রর জন্য চিঠি লিখেছি আলাদা আলাদা করে। এক বন্ধুকে বলেছি ২ দিন পর যেনো সেই চিঠিগুলো আমাদের বাসায় দিয়ে দেয়। আমার হাতে আর ২ দিন আছে। জানিনা আমি আর লিখতে পারবো নাকি। আমার এই ডাইরিটা কেও পাবে বলেও মনে হয় না। এই জন্মে আমার কিছু পাওয়া হলো না। ঈশ্বর যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে পরের জন্মে যেন আমি শুভ্রকে আমার করে পাই।

About The Author
Pritom Pallav
Pritom pallav

You must log in to post a comment