Now Reading
সিনেমা রিভিউ :বাপজানের বায়স্কোপ



সিনেমা রিভিউ :বাপজানের বায়স্কোপ

চলচ্চিত্র বা সিনেমা দেখতে আমরা কেই না পসন্দ করি। কেউ অ্যাকশন ,কেউ কমেডি ,কেউ ড্রামা আবার কেউ রহস্য গল্প দেখতে খুব পসন্দ করে। তাইতো দুনিয়া জুড়ে হলিউড বলিউডের এত জয় জয়কার। তবে যখন কথাটা বাংলা চলচ্চিত্রের দিকে আসে তখনন কোনো জানি আমাদের নাকসিঁটকানোর একটা প্রকলন দেখা যায়। অনেকে এমনটাও ভাবে যে বাংলা চলচিত্রের কোনো মৌলিক গল্প নেই। নকল আর ওভার এক্টিং এ ভরপুর। এজন্যই হয়তো আমাদের চলচ্চিত্র হলে দর্শক টানতে ব্যার্থ।তবে বিগত বছর গুলোতে বেশ কিছু ভালো সিনেমা বের হতে দেখা গেসে। আজ আপনাদের এমনি একটি বাংলা সিনেমার কথা বলবো। যার গল্প মৌলিক ,কোনো ওভার এক্টিং নেই।যাতে আবেগ,প্রতিবাদ এবং ঐতিহ্যের একটি দারুন নিদর্শন সৃষ্টি করা হয়েছে।

সিনেমাটির নাম “বাপজানের বায়স্কোপ”।

ঘটনার সূত্রপাত হয় যমুনা পরের একটি চর থেকে। চরটির জমিদার তার ভাগিনার নাম অনুসারে চরের নামকরণ করেন চরভাগিনা। গল্পের মূল চরিত্র হাসেন মোল্লা এবং জীবন সরকার। হাসেন মোল্লা একজন প্রান্তিক চাষী। সে আর দশটি চাষীর মতো চাষাবাদ করে জীবন যাপন করতো। হাসেন মোল্লা একদিন তার জমিতে ক্যাশ করার সময় তার মৃত বাবা কে কল্পনায় দেখতে পায়। তার বাবা হাসেন মোল্লাকে তার ফেলে যাওয়া বায়োস্কোপটি পুনরায় চালু করতে বলে। বাবার কথা মতে হাসেন মোল্লা সিদ্ধান্ত নেয় সে আবার বায়াস্কোপ খেলা দেখাবে। সপ্তাহে ২ দিন বিএসকোপ খেলা দেখাবে আর ৪ দিন চাষাবাদ। হাসেন মোল্লা ভাবে সে বায়োস্কোপে নতুনত্ব আনবে। এর জন্য গ্রামের তরুণ ইসমাইল কে বলে তার জন্য কিছু ছবি এঁকে দিতে। যার বিনিময়ে তাকে পেটভরে মিষ্টি খাওয়াবে। এরপর সেই নতুন গল্প আর চিত্র নিয়ে তৈরী হয় বায়স্কোপ। ভালোই চলছিল সব কিছু ,এমন সময় একদিন জীবন সরকারের বউ বায়স্কোপ খেলা দেখতে চায়। বৌয়ের আবদার রাখতে জীবন সরকার ,হাসেন মোল্লাকে তার বাড়িতে নিয়ে যায়। এরপরই ঘটে মূল ঘটনা। জীবন সরকার বুঝতে পারে বায়স্কোপের ঘটনাটি একটি প্রতিবাদী গল্প যা তার মামার অন্যায় কে প্রতিনিধিত্ব করে। এর জন্য জীবন সরকার সিদ্ধান্ত নেন চরে এরপর আর কোনো বায়স্কোপ চলবে না। তবে হাসেন মোল্লা চায় বায়স্কোপ খেলা চালিয়ে যেতে। এরপর চরের সালিসে জীবন সরকার সিদ্ধান্ত নেন যদি হাসেন মোল্লা বায়স্কোপ খেলা বন্ধ না করে গ্রামে তিনি লবন বিক্রি হতে দিবেন না। এরপর চরে ভীষণ পরিমানে লবণের চাহিদা দেখা দেয়। সকলে হাসেন মোল্লাকে ব্যাস্কোপ খেলা বন্ধ করার অনুরোধ করে। তবে হাসেন মোল্লা তা না শুনে তার প্রতিবাদ চালিয়ে যায়। এদিকে চরবাসীর দুঃখ দেখে জীবন সরকারের বউ তার দেহরক্ষীর সাথে হাত মিলিয়ে চরবাসীর কাছে  লবন সরবারহ করে। চর বাসীর লবন সমস্যা না  থাকায় হাসেন মোল্লার প্রতিবাদ আরো বেগ পায়। এদিকে জীবন সরকার বায়স্কোপ বন্ধ করার বিভিন্ন পায়তারা করতে  থাকে। অবশেষে জীবন  সরকার তার দেহরক্ষী দিয়ে ইসমাইল কে খুন করে। ইসমাইলের মৃত্যুর  পর চরবাসী  আরো প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। চরবাসী সিদ্ধান্ত নেয় তারা জীবন  সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করবে।এরপর একদিন জীবন সরকার তার দোল নিয়ে বায়স্কোপ এবং হাসেন মোল্লাকে চিরতরে শেষ করার জন্য আক্রমণ করে। তবে গ্রামবাসীর প্রতিবাদে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ দিকে জীবন সরকারের দেহরক্ষী তার ভুল বুঝতে পারে এবং সেও জীবন সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।

সিনেমাটির গল্পে যে অন্যায় এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা এক কোথায় ছিল অসাধারণ। মৌলিক গল্প আর অভিনয়ের শক্তি সিনেমাটিকে নিয়ে গিয়েছে অনন্য এক উচ্চতায়।আমার কাছে বাংলাদেশের সের চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্যতম।হয়তো এর জন্যই ২০১৬ সালের সেরা চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত সিনেমা “বাপজানের বায়স্কোপ”।
সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিমান অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম( জীবন সরকার ) এবং শতাব্দী ওয়াদুদ(হাসেন মোল্লা)। এছাড়াও সানজিদা তন্ময় ,মাসুদ মহিউদ্দিন সহ প্রমুখ অভিনেতা এই সিনেমাটিতে কাজ করেছেন।   সিনেমাটি প্রযোজনা করেছেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান “কারুকাজ ফিল্মস “। একধারে পরিচালক ,প্রযোজক এবং লিখেছেন রিয়াজুল রিজু। শব্দ সংযোজন করেছেন সেতু চৌধুরী।এবং সিনেমার গান গুলো লিখেছেন অয়ন চৌধুরী এবং আমিরুল ইসলাম।
 
সিনেমাটিকে ঘিরে একটি তুচ্ছ গত না আছে। আর তা হলো বাপজানের বায়োস্কোপ চলচ্চিত্রে টিভি অভিনেতা মাহমুদুল ইসলাম মিঠুর অভিনয় করার কথা থাকলেও হঠাৎ তাকে বাদ দিয়ে শহীদুজ্জামান সেলিমকে নেয়া হয়। মিঠু জানান, ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ চলচ্চিত্রটি ছিলো আমার অভিনয় জীবনের স্বপ্নের একটি চরিত্র। তুচ্ছ এক ঘটনার জেরধরে রিজু আমাকে বাদ দিয়ে আমার চরিত্রে অন্যকে দিয়ে অভিনয় করান।’ পরবর্তীতে রিয়াজুল রিজু তাকে ফোনে প্রাণনাশের হুমকী দেন বলেও সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন মিঠু। তবে নিজের অভিনয় শক্তি দিয়ে  শহীদুজ্জামান সেলিম প্রমান করেছেন জীবন সরকার চরিত্রের জন্য তিনিই ছিলেন উত্তম।
 
বাংলা সিনেমা নিয়ে সমালোচনা করাটা আমাদের যেন একটা স্বভাব। আমি বলবো আগে বাংলা সিনেমা দেখুন তারপর তার সমালোচনা করুন। যেখানে বাহিরের দেশের সিনেমা এ দেশে ব্যবসা সফলতা পায় সেই দেশের সেরা চলচ্চিত্র হলে দর্শক আনতে বার্থ ভাবতেই লজ্জা লাগে। আমরা বাঙালি সুশীলতার আড়ালে ভুলে যাই দেশি পণ্যকে।ভুলে যাবেন না এক সময় ঢাকাই চলচ্চিত্রের জয়গান বিশ্ব জুড়ে ছিল। তাই অনুরোধ করবো বাংলা চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে হলে গিয়ে সিনেমা দেখুন। তবেই আয়নাবাজি ,জালালের গল্প ,বাপজানের বায়স্কোপের মতো সিনেমা বানাতে নির্মাতারা আগ্রহী হবেন। এদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে একটি বিপ্লব ঘটতে যাচ্ছে এবং হয়তো বর্তমান সময়টা একটি বিপ্লবকালীন সময়।
 
ধন্যবাদ।

About The Author
Abdul Mueez
0 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment