Now Reading
গোধূলি লগন । পর্ব – ০১



গোধূলি লগন । পর্ব – ০১

রাত তিনটা। রুমে মৃদু আলো।রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো সাদা জানালার কাঁচ ভেদ করে রুম আলোকিত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছে বার বার। রুমে এক ধরনের নরম আলোয় ঘেরা। এই মৃদু আলোতে আপাত দৃষ্টিতে কিছুই দেখা যায় না। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই সব কেমন যেনো স্পষ্ট।
এই যেমন আমি দেখতে পাচ্ছি – দেয়ালে একটা টিকটিকি এক মনে লেজ নেড়ে চলেছে।টিকটিকি টি লেজ নাড়তে নাড়তে কিছুক্ষণ পর পর টিক টিক করছে কি না বুঝতে পারছি না। দাদার আমলের ঘট-ঘট ফ্যানের আওয়াজের নিচে বাতরুমে পানি পড়ার আওয়াজ ঢাকা পড়ে যায়- আর এ তো সামান্য টিকটিকির আওয়াজ।
বাহিরে মনে হয় বৃষ্টি হচ্ছে। রুমে বসে কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। ফ্যানের ঘটঘট আওয়াজ ভেদ করে ছাদ থেকে পানি পড়ার আওয়াজ ভেসে আসছে। টিনের চাল থাকলে এই এক সুবিধে, খাটে শুয়ে শুয়ে এক ঘেয়ে কান্নার আওয়াজের মতো বৃষ্টির শব্দ শুনা যায়। ছাদ থাকার কারণে বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে না ঝড় কোনো কিছুই বুঝা যায় না। এর জন্য খবর দেখতে হয়। অথবা জানালা দিয়ে বাহিরে উঁকি দিতে হয়।
আমি এই সব কেনো লিখছি জানি না। ঘুম আসছিলো না। অনেক দিন পর হারানোর বেদনাটা কেমন যেনো বড় হয়ে বুকে বাঁধছে। আজকে আমার মন খুব বিষণ্ণ। একরাশ বিষণ্ণতা গা ঝাড়া দিয়ে উঠছে বার বার ।বিষন্নতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে একুয়াস হিউমার রূপে এক ঘেয়ে বৃষ্টি ঝরে চলেছে। আমি খাটের পাশে টেবিল ল্যাম্প টা জ্বালিয়ে ডায়েরি নিয়ে বসেছি । অনেক দিন ডায়েরি তে কিছু লিখি না।
লিখতে গিয়ে মনে হলো লেখার হাত বেশ কাঁচা হয়ে গেছে। কেমন যেনো অগোছালো সব। আমার মনের মতো। টিনের চালে পড়া এক ফোঁটা বৃষ্টির জলের মতো! বিক্ষিপ্ত!
আমার মনের বিষণ্ণতা এই ক্ষুদ্র লেখার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করছি। যেই আমার লেখা কেউ পড়বে তার মন খারাপ হয়ে যাবে। কিছু বিষণ্ণতা তাকে দিয়ে দিবো। এভাবে আমার সব বিষণ্ণতা একে একে বিলিয়ে দিবো।
আপনাদের একটা ছোট্ট গল্প শুনাই।
উপরের লাইনটি দেখে দয়া করে হাই তুলবেন না। আমি কোনো রাজ কন্যার গল্প শুরু করবো না। অথবা হিন্দি সিরিয়ালের হাই ক্লাইম্যাক্স। আমার জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা। আমার একান্ত কিছু অনুভূতির কথা আপনাদের কাছে বলবো। এই কথা গুলো গত চল্লিশ বছর ধরে মনের গভীরে চেপে ছিলো। আজ হঠাৎ বিশেষ একটি কারণে অনুভূতি গুলো আগের মতো প্রখর হয়ে উঠেছে একাকীত্বের ছোঁয়া নিয়ে।
আমার বয়স তখন একুশ বছর। তরুণ আমি। আমার চুল গুলো ছিলো নিকশ কালো ব্ল্যাক হোলের গভীরতার মতো। এখনকার মতো সাদা না। আধুনিকতার সাথে তাল মিলাতে গিয়ে দুই পাশ ছেচে ফেলে উপরের অংশের চুল গুলো বড় করে রাখতাম। দেখাতো মরুভূমির মাঝে এক থাবলা ঘাসের মতো। আমি তখন একটি ভার্সিটিতে সেকেন্ড ইয়ার এর ছাত্র। ( ভার্সিটির নাম উল্লেখ করার কোনো কারণ দেখছি না, এর সাথে গল্পের কোনো রকম সম্পর্ক নেই)।
আমি একটি মেয়ের প্রেমে পড়ি। তার চোখ গুলো ছিলো ক্লিওপেট্রার চোখের চেয়েও সুন্দর। ক্লিওপেট্রার চোখ আমি কখনো দেখিনি। ক্লিওপেট্রার চোখ কি তার চোখের চেয়েও সুন্দর ছিলো? মনে হয় না। তার হাসি। খিলখিলিয়ে সেই হাসি – বৈশাখী বাতাসে ধানের শীর্ষ গুলো ঢেউ খেলানোর মতোই অপরূপ সুন্দর ছিলো। হাসির শব্দ ছিলো -শুকনো পাতায় মোড়া দেওয়া আওয়াজের মতো সুন্দর। তার সবই সুন্দর ছিলো অথবা তার সব সৌন্দর্য গুলো ধরা পড়তো শুধু আমার চোখে। তার লম্বা চুল। চিকন করে দেওয়া বাঁকা কাজল রেখা। কপালে ওঠা সেই লাল ব্রণ টি ও কখনো খারাপ লাগতো না। ব্রণ টিও যেনো পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে এসেছিলো তার কপালে। যা বলছিলাম – আমি তার প্রেমে পড়ি। যখন থেকে তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় আমার গলার স্বর কেঁপে কেঁপে উঠতো তখন থেকেই বুঝতে পারি আমি তার প্রেমে পড়ি। আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। কারণ আমি আমার নিকট ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খুব ভালো মতো জানতাম। তারপরেও আমি প্রেমের মতো পবিত্রতায় ডুব দি। আমার মনে হয়েছিলো, এই রকম একটা মেয়েকে ভালোবেসে যদি সারাজীবন কষ্ট পাই তাও আমার বিন্দু মাত্র আফসোস হবে না।
আজ চল্লিশ বছর পর আমার কি আফসোস হচ্ছে? আমি নিজেকে নিজে প্রায়ই এই প্রশ্ন করি। প্রতি বারই তাকে হারানোর বেদনাটাই বড় হয়ে উঠে। আমি জানতাম,তার সাথে আমার কখনোই যায় না। ততদিনে আমি তার ভালোবাসার কাঙ্গাল হয়ে গিয়েছিলাম। আমি তার থেকে পাওয়া ছোট খাট জিনিসগুলো খুব যত্ন করে রেখে দিতাম। একদিন তার ক্লাস লেকচারের নোট কপি করতে গিয়ে একটি চুল পাই। কত যত্ন করেই না চুলটা আমি বইয়ের ভিতর রেখে দিয়েছিলাম। তার ছবি গুলো ছিলো আমার রাতের স্বপ্ন। আমি রাতে ঘুমাতাম না তার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ঘুমালেই আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে যাবে।
তার হাসি ছবির মধ্যে বন্দি করে রাখতে পারিনি বলে রাত কেটে যেতো আমার আপসোসে। আপসোসে কাটানো রাত গুলো ছিলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু রাত। আরো কত পাগলামো করতাম তখন। অনেক স্মৃতিই এখন ঝাপসা। স্মৃতির গন্ধ নাকে আসছে। তবে স্মৃতি গুলো কেমন যেনো অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। সাথে তাল মিলিয়েই যেনো অনুভূতি গুলো প্রখর হচ্ছে।
সে দিনের কথা আমার এখনো মনে আছে। স্মৃতি গুলো খুব স্পষ্ট। চোখ বন্ধ করে স্মৃতি গুলো কল্পনা করলে তার চুলের ঘ্রাণ এখনো আমি পাই। মনে হয় হাত বাড়ালেই চুল স্পর্শ করতে পারবো। আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে এলোচুল খেলা করে পালিয়ে যাবে। টিপ টিপ করে বৃষ্টি হচ্ছিলো। আকাশের কিছু অংশ কালো মেঘের দখলে। কালো মেঘের আড়াল থেকে সূর্য উঁকি দিয়ে লজ্জা পেয়ে আবার আড়ালে চলে যাচ্ছিলো। মেহমানদের দেখে ছোট বাচ্চারা দেয়ালের আড়াল থেকে যেভাবে উঁকি দেয়। সেভাবে।
আমরা বৃষ্টির মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। অর্পিতা কিছুক্ষণ পর পর হাত দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা গুলো ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছিলো। বৃষ্টির ফোঁটা গুলো যেনো ইচ্ছে করেই ওর হাতের উপর পড়ছিলো না। ওরা যেনো চাচ্ছে অর্পিতা রেগে যাক। তারাও কি জানে, রেগে গেলে তাকে কতটা সুন্দর দেখায়! ঝড়ো হাওয়া হঠাৎ হঠাৎ এসে সবার চোখে ধূলা দিয়ে যাচ্ছিলো। রাস্তার ধারের চা দোকান গুলোর কাস্টমাররা চায়ে চুমুক দিয়ে চিন্তিত মুখে আকশের দিকে তাকাচ্ছিলো।
আমাদের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিলো না। আমরা শুধু শহরের চওড়া রাজপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। বাতাস তার চুল গুলো কানের উপর থেকে সরিয়ে দিচ্ছিলো বার বার। ফুঁ দিয়ে চুল সরানোর ইচ্ছেটা ,বাতাস করে যাচ্ছিলো বলে খুব হিংসে হয়েছিলো সেদিন-বাতাসের উপর।
আমরা কোনো কথা বলছিলাম না, শুধু হেঁটে যাচ্ছিলাম পাশাপাশি। অনেক কষ্টে তার হাত ধরার ইচ্ছেটা দমন করে হাঁটতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিলো।
কিছুক্ষণ এভাবে চুপচাপ হাঁটার পর আমি বললাম, “আজকের আবহাওয়া টা কত সুন্দর আজকে সারাদিন হাঁটলে কেমন হয়?” উত্তরের আশায় আমি তার দিকে তাকালাম।ঝড়ো বাতাস তার চুল গুলো উড়িয়ে এনে আমার মুখের উপর ফেলছিলো । এবার আর হিংসে হয় নি বাতাসের উপর।
সে আমার কথার কোনো উওর দেয় নি। আকাশের দিকে তাকিয়ে- হাত কোশ করে বৃষ্টির ফোঁটা গুলো ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো তখন পর্যন্ত।
প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যে যেনো খুব বেশি অভিভূত হয়েছিলো সেদিন।
আর আমি অভিভূত হয়েছিলাম কাজল দেওয়া এক রূপসীর মুখ দেখে। এতোগুলো স্মৃতির মধ্য থেকে আজ হঠাৎ এই স্মৃতি টা মনে পড়লো কেনো জানিনা। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে এই জন্যই মনে হয়। বৃষ্টির শব্দ শুনে তারও কি এই ছোট্ট স্মৃতির কথা মনে পড়ে?

চলবে……….

About The Author
Saiful Antur
saiful antur
3 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment