Now Reading
চার্জ নিয়ে দুশ্চিন্তা দূর করবে ডায়মন্ড ব্যাটারি



চার্জ নিয়ে দুশ্চিন্তা দূর করবে ডায়মন্ড ব্যাটারি

মুঠোফোন বা মোবাইল ব্যবহার করেন না এমন মানুষ বোধহয় এযুগে আর পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আর প্রায় প্রতিদিনই লক্ষ লক্ষ মানুষ এই মোবাইল ফোন কিনছেন। এই মোবাইল কেনার সময় সব সচেতন ক্রেতাই একটা জিনিসের প্রতি বেশি মনোযোগ দেন আর সেটা হলো ব্যাটারীর চার্জ। যে ব্র্যান্ডের মোবাইলে যত বেশি চার্জ থাকে সেই ব্র্যান্ডের মোবাইলটি তত দ্রুত বাজারে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
আবার অনেকেই চার্জ নিয়ে অনেক বিড়ম্বনায় পরেন। বার বার ব্যাটারি পরিবর্তনের ঝামেলাও পোহাতে হয়। অদূর ভবিষ্যতে এই সমস্যাগুলো থেকে স্থায়ী মুক্তি দিতেই ‘ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিস্টল’ নিয়ে এসেছে ‘ডায়মন্ড ব্যাটারি’ এর ধারণা। আজ এই ব্যাটারি নিয়ে কিছু কথা বলা।

গত ২৫শে নভেম্বর ২০১৬ কেবট ইনস্টিটিউট এর ‘উইলস মেমোরিয়াল বিল্ডিং’ এ বার্ষিক বক্তৃতায় এই ব্যাটারির ব্যাপারে আলোচনা করেন উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষকগণ। এই ব্যাটারিটি নিউক্লিয়ার রিয়াক্টরে নিউট্রন মোডারেটর হিসেবে ব্যবহৃত গ্রাফাইট ব্লকের রেডিও আক্টিভিটি দিয়ে চলবে। আর তার ফলে এর চার্জের লাইফটাইম অনেক বেড়ে যাবে। ভাবছেন কতটাই বা বাড়বে? যদি বলি আপনার মোবাইলে কোনওদিন আর চার্জ দিতে হবে না তবে কি সন্তুষ্ট আপনি? হ্যাঁ, এমনটাই বলছেন গবেষকরা।

এই ব্যাটারিতে ‘সিনথেটিক ডায়মন্ড’ বা ‘আর্টিফিশিয়াল ডায়মন্ড’ ব্যবহৃত হবে। যেটি বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারে যদি তাকে কোনও রেডিও একটিভ ফিল্ডে স্থাপন করা হয়। এই ধরণের বৈশিষ্ট্যের জন্য একে রেডিও একটিভ সোর্স হিসেবে ব্যবহার করে আয়োনাইজ বা চার্জবাহী করে স্বল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা যাবে যা দিয়ে একটি মোবাইল অনায়াসে চলবে বছরের পর বছর। সংখ্যার বিচারে একবার ফুল চার্জ হওয়া মোবাইল ৫০% চার্জ শেষ করবে ৫,৭৩০ বছরে। তার মানে আপনার জীবদ্দশায় আপনি একটি মোবাইলের চার্জ শেষ করতে পারবেন না।

এখন আসা যাক এর মূল উপাদানের আলোচনায়। কমবেশি আমরা সকলেই জানি যে , ডায়মন্ড বা হীরা কার্বনের একটি রূপ। এর মধ্যে কার্বন-১৪ অনেক বেশি রেডিও এক্টিভ বলে গবেষকরা এটিকেই বেশি ব্যবহারের চেষ্টা করে যাচ্ছেন ‘সিনথেটিক ডায়মন্ড’ তৈরির জন্য। এছাড়াও এটির বেটা রশ্মি উচ্চ মানের শক্তি নির্গত করে। এই বেটা রশ্মির গড়পড়তা শক্তি ৫০ কিলো ইলেক্ট্রো ভোল্টের সমান। মূলত এই কার্বন-১৪ কে ব্যাটারির মূল উৎস হিসেবে  নেওয়ার কারণ হলো এর বেটা রশ্মি যা খুব সহজেই যে কোনো সলিড উপাদানের সাথে মিশে যায় বা শোষিত হয়। যার ফলে এটির রেডিয়েশন ডায়মন্ডের উপরের আস্তরণ ভেদ করে বেরিয়ে আসবে না। পুরোটাই এর ভিতরে থেকে যাবে। যা একে অনেক নিরাপদ করেছে মানুষের ব্যবহারের জন্য।

এই কার্বন-১৪ পাওয়া যাবে নিউক্লিয়ার রিয়াক্টরের গ্রাফাইট ব্লক থেকে। আমাদের বর্তমান বিশ্বে উন্নত দেশগুলোর মাথা ব্যথার কারণ তাদের নিউক্লিয়ার বর্জ্য। যা সহজে নষ্ট হয় না। এই ব্যাটারি তৈরিতে এখন এসব বর্জ্য ব্যবহার করা যাবে। গ্রাফাইট ব্লক থেকে মাত্র ৩৯১৫ কেলভিন তাপমাত্রা বা ৩৬৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োগের মাধ্যমে খুব সহজেই কার্বন-১৪ আলাদা করা যায়। এরপর এই কার্বন থেকেই তৈরি করা হয় ‘আর্টিফিশিয়াল ডায়মন্ড’। এই বিশেষ ডায়মন্ড ‘বেটাভোল্টিক ডিভাইস’ হিসেবে কাজ করে এবং চার্জ উৎপন্ন করে। এভাবে একটি ব্যাটারিতে যত বেশি সংখ্যক ডায়মন্ড ব্যবহার করা সম্ভব হবে তত বেশি চার্জ উৎপন্ন হবে। এই বেটাভোল্টিক ব্যাটারি কোনো ধরনের কয়েল অথবা মটর এর তৈরি নয় যার ফলে এটির স্থায়ীত্ব  অনেক বেশি অন্যান্য ব্যাটারীর তুলনায়। আর যেহেতু এটি ডায়মন্ডের তৈরি তাই অনেক বেশি শক্ত বা মজবুত। পড়ে গেলে বা চাপ লাগলে ভাঙার সম্ভবনাও নেই। আমাদের বর্তমান সময়ে ব্যবহৃত লিথিয়াম এর ব্যাটারির চেয়ে এর শক্তি অনেক বেশি। যেখানে একটি ২০ গ্রামের নন-রিচার্জবল ব্যাটারি ১৩০০০ জুল শক্তি উৎপন্ন করে মাত্র ২৪ ঘন্টা এর মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায় সেখানে মাত্র ১ গ্রাম কার্বন-১৪ দ্বারা নির্মিত ডায়মন্ড ব্যাটারি ১৫ জুল শক্তি উৎপন্ন করে কিন্তু কখনোই শেষ হয় না। একে বার বার চার্জ দেবার প্রয়োজন নেই। শুধু মোবাইল এর জন্যই নয় বরং বিভিন্ন মেডিকেল যন্ত্রেও এটি ব্যবহার করা যাবে, যেমন পেসমেকার। যার ফলে পেসমেকার বার বার পরিবর্তন করতে হবে না। বিভিন্ন স্পেসক্রাফট ও স্যাটেলাইটেও এটি ব্যবহার করা যাবে।

সর্বশেষ আশা যাক এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  ভুমিকাতে। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে উন্নত দেশগুলোর নিউক্লিয়ার বর্জ্য। যেগুলো হাজার বছরেও নষ্ট হয় না, মাটিতে মিশে যায় না। বরং পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করছে। এই সমস্যার সমাধান দিতে পারবে এই ব্যাটারি। কারণ, এর তৈরির জন্য যে গ্রাফাইট ব্লক ব্যবহৃত হয় তা মূলত নিউক্লিয়ার বর্জ্য। সেগুলোকে কাজে লাগানো মানে পরিবেশের জন্য সুখবর। সর্বোপরি আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এক অনন্য আবিষ্কার এই ‘ডায়মন্ড ব্যাটারি’। যা আমাদেরকে এক অফুরন্ত শক্তির আধার উপহার দিতে চলেছে। দূর করে দেবে চার্জ নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তা। আমাদের ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসগুলো পাবে এক নতুন মাত্রা।

About The Author
Shumit Roy
SRA
6 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment