সাহিত্য কথা

একটি আবেগশূন্য টাকার মেশিন

জীবিকার তাগিদে মানুষ কত কি না করে। কত রকম পেশা বেছে নেয়। কেও ইচ্ছা করে আবার কাওকে এই সমাজ বেছে নেয় তার কাজ করার জন্য। সবাই চায় তার জন্য ভালোটা। আমিও চেয়েছিলাম। এই সমাজের খাতায় আমি একজন ব্যর্থ মানুষ। আমাকে আর প্রয়োজন নেয় আমার স্ত্রী অথবা সন্তানের। দীর্ঘ ৫৯ বছর ধরে আমি এই পৃথিবীতে বেঁচে আছি আর নিরলসভাবে পরিবারের কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু কখনো তাদের থেকে পরিপূর্ণ কিছু পাই নি। আমি এখন বসে আছি কোন এক ব্রিজের উপর। উদ্দেশ্যঃ লাফ দেয়া।

আমার বয়ষ যখন ২০/২২ তখন আমি জীবিকার তাগিদে চলে যাই এক আরব কান্ট্রিতে। খুব সামান্য বেতনে চাকরি করতাম। বলতে গেলে আমার খরচের পর খুবি সামান্য পরিমানে কিছু থাকতো। তারপর ৭ বছর পর যখন কিছুটা সচ্ছল হলাম তখন দেশে আসলাম। সবাই জোর করে বিয়ে করিয়ে দিলো। বললো, নাহলে আর দেশে আসবো না। কিন্তু আমি তাদের বুঝাতে পারিনি যে আমার বেতনে নিজের ই চলে না। যাইহোক বিয়ে করলাম। বিয়ের ১৭ দিন পর আমার চলে যেতে চলো জীবিকার তাগিদে। যাওয়ার কিছুদিন পর জানলাম আমার স্ত্রী মা হতে চলেছে। ব্যাপার টা খুব সুখকর ছিলো আমার জন্য। ডেলিভারি এর সম্ভাব্য একটা মাস অনুমান করে আগেই ছুটির অবেদন করে রাখলাম। কিন্তু আমিযে প্রবাসী। প্রায় জোর করেই ছুটি নিতে হলো আমাকে।

চলে আসলাম দেশে। দেশে আসার ১ মাস পর আমার প্রথম মেয়ে হলো। খুব আনন্দেই যাচ্ছিল দিন গুলো। এদিকে আমার স্ত্রীর বায়না যেনো দিন দিন বেড়েই চলছিলো। এইটা ঐটা। বিদেশ গেলেই নাকি এত্ত এত্ত টাকা পাওয়া যায়। তো, তার কিছুদিন পর আমি গেলাম এম্বাসি। আমার ছুটি আর কিছুদিন বাড়ানোর জন্য। গিয়ে যা জানলাম তাতে আমার হাত মাথায় চলে এলো। আমি যে জোর করে ছুটি নিয়ে এসেছিলাম, তারা আমায় ছুটি তো দিয়েছে কিন্তু একেবারে। আমাকে কোম্পানী থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমি অনেক চেষ্ঠা করলাম, ওদিকে অনেক বন্ধুদের সাথে কথা বললাম। আমার স্যারদের অনেক মিনতি করলাম কিন্তু কেও কিছু করতে পারলো না।

ফলে, আমি চাকরিহীন এক সন্তাদের বাবাতে পরিনত হলাম। যার কাধে তার সন্তান, স্ত্রী, বৃদ্ধ বাবা-মা এর সমস্ত দায়িত্ব এসে পরলো। পড়ালেখার দৌড় বলতে ছিলো ৯ ক্লাস। ফলে কোথাও কোন ভালো চাকরি পেলাম না। অবশেষ অনেক খুঁজে, এক অফিসের বয় এর কাজ পেলাম। আমার কাজ তাদের চা এনে দেওয়া আর এইটা সেইটা কাজ করা। আমার মতন একজনের জন্য চাকরিটা তেমন সুবিধার না, কিন্তু আমাকে করতে হলো। ওদিকে আমার স্ত্রীর সারাদিন এইটা সেইটা বায়না। নানান কথা শুনতে হয় তার থেকে। কাছেও ঘেষতে দেয় না। আমার মেয়েটাকেও আমার কাছে আসতে দেয় না। বলে কি পোড়াকপালের সাথে বিয়ে হলো। এক মেয়ে জন্ম দিয়েই ঘড় শুদ্ধ মানুষ পথে বসতে বসেছে। এদিকে চলে গেলো অনেকগুলো বছর। মেয়ে বড় হচ্ছে। ওর জন্য কিছু জমানো দরকার। এদিকে সংসার ও চলে না তেমন। বাবা-মা মারা গেছে অনেকদিন হলো। জীবনে কারো জন্য কিছু করে যেতে পারবো না। দিন রাত এক করে দিচ্ছি আমি এই সংসারটাকে টিকিয়ে রাখতে।

মাঝে মাঝে দেখি স্ত্রী খুব গভীর রাতে বাসা থেকে চুপিসারে বেড়িয়ে যায় আর ফিরে সেই সকাল বেলা। সেদিন হাতে মোবাইল দেখে আমি চমকে উঠি। যেই বাসায় তিন বেলা খাবার জোটাতে কষ্ট হয়, সেই বাসায় মোবাইল। জিজ্ঞাস করাতেই ঝগড়া বেধে গেলো। শুনতে হলো হাজারটা কথা। এভাবেই চলে যাচ্ছিলো দিন। হটাৎ একদিন বাসায় এসে দেখি স্ত্রী বাসায় নেই। জিজ্ঞাস করে জানতে পারলাম দুপুরে বাসা থেকে বের হয়েছে। সব থেকে দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে ওর হাতের মোবাইলের নাম্বার আমার কাছে ছিলো না। পর পর ৩/৪ দিন চলে গেলো। নিকট আত্নিয় সকলের সাথে যোগাযোগ করেও কোন ফল হলো না। ধরে নিয়েছিলাম, হয়তো কোথাও আছে সেখানে এই যায়গা থেকে সুখে থাকতে পারবে।

বাবা মেয়ে মিলে কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। মেয়েটাও কেমন জানি স্বার্থপর এর মতন করে। কথার উত্তর দেয় না। কি করে কোথায় যায় কিছুই বলে না। জিজ্ঞাস করলে উলটা পালটা কথা বলে। ফলে আমিও আর এখন জিজ্ঞাস করি না। একদিন রাতে মেয়েটা বাড়ি ফিরলো বমি করতে করতে। বার বার বমি করছিলো। হাসপাতালে যে নিবো সেই শক্তিটাও যেন নেই আমার। পরে আশে পাশের সকলে মিলে বাসা থেকে এক সরকারী হাসপাতালে নিয়ে গেলাম মেয়েটাকে। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানালো মেয়াদবিহীন ড্রাগস নেয়ার কারনে এই অবস্থা। খুব শিগ্রই পেট ওয়াস করাতে হবে। নাহলে খুব খারাপ কিছু হবে। কিন্তু যেহেতু এইটা ড্রাগস নিয়ে তাই পুলিশ কেইস। আর পুলিশ কেইস এ তারা পুলিশের পার্মিশন ছাড়া রোগী ধরবে না। এদিকে আমার মেয়ের অবস্থা খারাপ হতে লাগলো। মেয়েকে হাসপাতালে রেখেই ছুটে গেলাম পুলিশের কাছে। কিন্তু তারা নানান টালবাহানা শুরু করলো। এত রাতে যাওয়া যাবে না। মেয়ে কি করেছে, কার সাথে ছিলো এইটা সেইটা। পরে তাদের বহন খরচ দাবী করলো। কিন্তু আমার কাছে ছিলো ৩০০০ টাকার মতন। সেখান থেকে ১৮০০ দিলাম পুলিশকে। তাদের নিয়ে আসতে আসতে ফজরের আযান দিয়ে দিলো। এসে দেখি আমার মেয়ে আর কথা বলে না। ডাক্তার ঘোষণা দিলো মাঝ রাতেই মারা গেছে। আর আমি চলে যাবার পর কেও ফিরেও তাকায় নি আমার মেয়েটার দিকে।

বাকি টাকা দিয়ে মেয়ের দাফন করলাম। কি অদ্ভুত তাই না? দিনের আলোয় ছিলো আমার মেয়ে, হাসপাতালে নিলাম আর হয়ে গেলো রোগী, মৃত্যুর পর হয়ে গেলো লাশ। মেয়েকে দাফন করে এই ব্রিজে চলে এসেছি। আমার আর কিছুই নেই এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার। একটা বাবার কাছে সব থেকে কষ্টের কাজ হলো তার সন্তানের লাশ বহন করা। আমি সেই কাজটাও করেছি। এই পৃথিবীতে আজ আমি ক্লান্ত। আমার কিছুই নেই। কিছু নেই….

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

ক্ষতি

Jobayer Ahmed

জ্বীন সমাচার – সত্য ঘটনা অবলম্বনে গল্প- পর্ব ২য়

Rohit Khan fzs

চিরবিদায়

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy