স্বাস্থ্য কথা

মশাবাহিত রোগ চিকুনগুনিয়া !

প্রায় প্রতিটা সময়েই কোনো না কোনো খুব জনপ্রিয় রোগশোক আমাদের সামনে ঘুরঘুর করতে দেখা যায় | এর মধ্যে ছিল ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ,জিকা কিংবা ফাইলেরিয়া | এই সবগুলোর জন্যই কোনো না কোনো মশা দায়ী থাকত | ঠিক সেরকম বর্তমান সময়েও আমাদের সামনে এরকম একটা জনপ্রিয় অসুখ রয়েছে যার নাম হলো “চিকুনগুনিয়া” | বলাই বাহুল্য ,এই রোগটার জন্যও মশা দায়ী !

চিকুনগুনিয়া কি ?

চিকুনগুনিয়া শব্দটা এসেছে পূর্ব আফ্রিকার দেশ তানজানিয়ার ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী কিমাকন্দ ভাষা থেকে | যার আক্ষরিক অর্থ হলো বাকা হয়ে যাওয়া | আর বাংলাদেশে একে বলে “ল্যাংড়া জ্বর” ! এতসব ভয়ংকর নাম হবার একটা যৌক্তিক কারণ ও রয়েছে | কারণ এই রোগ হলে আক্ষরিক অর্থেই সারা শরীরে এত বেশি ব্যথা করে যার ফলে মনে হতে পারে কেউ যেন হার বাকিয়ে দিয়েছে ! তবে, যাইহোক আমরা চিকুনগুনিয়া শব্দটি দ্বারা একটা রোগ হিসেবেই জানব | যা মূলত, মশার মাধ্যমে ভাইরাস হিসেবে আমাদের শরীরে আক্রমন করে | এর জন্য সাধারণত ২ টা মশা দায়ী | প্রথমটা হলো Aedes aegypti  আর দ্বিতীয়টার নাম  Aedes albopictus. এছাড়াও পাখি কিংবা রোডেন্ট এর মাধ্যমে এর ভাইরাস সার্কুলেট করতে পারে | তবে, মানুষের ক্ষেত্রে এই মশার কামড়ের মাধ্যমেই হয়ে থাকে |

চিকুনগুনিয়ার অঞ্চল

ভৌগলিক অঞ্চল বলতে আফ্রিকা ,এশিয়ার মধ্যে এর প্রকোপ বেশি | এছাড়াও , সেন্ট্রাল এবং সাউথ আমেরিকা, ইন্ডিয়ান ওশান, প্যাসিফিক ওশান এবং ক্যারিবিয়ান ও এর ঝুকিযুক্ত অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত |

তবে, আঞ্চলিক অঞ্চল বলতে চিকুন্গুনিয়ার মশা আমাদের বাড়ির আশেপাশেই ডোবা ,নালা-নর্দমা, জমে থাকা পানি ,ইত্যাদির মধ্যেই বিস্তার করে থাকে | এছাড়া বাইরে  ভোর কিংবা সন্ধার দিকে এই মশা সবচেয়ে বেশি কামরায় | এজন্য বাড়ির আশেপাশের অঞ্চল পরিষ্কার রাখাটা খুব জরুরি !

চিকুনগুনিয়ার লক্ষণ

প্রশ্ন আস্তে পারে চিকুনগুনিয়ার লক্ষণগুলো কি কি ? কি কি বৈশিষ্ট হলে আমরা বলতে পারি এইটা একটা চিকুনগুনিয়া ? এর সহজ উত্তর হলো -অসুখটার  ট্রেন্ড থাকা অবস্থায় কারো কোনো জ্বর হলেই মনে করতে হবে এইটা চিকুনগুনিয়া !!

সত্যিকার অর্থে চিকুনগুনিয়া আর ডেঙ্গু দুটোর ক্ষেত্রেই বৈশিষ্ঠ প্রায় একইরকম থাকে | যার ফলে দুটোর মধ্যে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার কাজটা কঠিন | তবে, পার্থক্য হলো ডেঙ্গু জ্বরে চোখ ,মাথা, মাংসপেশী ,হাড়ে প্রচন্ড ব্যথা হয় | চিকুন্গুনিয়ার এইসব বৈশিষ্ট কম বেশি থাকলেও এর উল্লেখযোগ্য লক্ষণ জ্বরের সাথে জয়েন্টে প্রচন্ড ব্যথা, বমি ,ডায়রিয়া আর ত্বকে লাল রঙের র‍্যাশ | ব্যথাটাও এতই মারাত্বক যে অনেকের ভাষ্যমতে এর বর্ণনা হলো “কেউ পিডায়লেও মনেও হয় এত ব্যথা করেনা !!” কাজেই, বোঝায় যাচ্ছে এই অসুখে খুব ব্যথা আর জ্বর হয় !

ডায়াগনস করার উপায়

ডেঙ্গু আর চিকুনগুনিয়া ডায়াগনস প্রায় একই পদ্ধতিতে করে থাকে | আরটি-পিসিআর , কালচার বা এন্টিবডি পরীক্ষা করে এই রোগ নির্ণয় করা হয় |

 

চিকুনগুনিয়া থেকে বাচার উপায়

চিকুনগুনিয়া থেকে বাচার অর্থ হলো মশাকে প্রিভেন্ট করা | সাধারণত নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে এই কাজটা করা হয়ে থাকে |

  •  পুরো শরীর কে যতখানি সম্ভব ঢেকে রাখা |
  •  মশার ঔষুধ ব্যবহার করা |
  •  সবসময় রিপেলেন্ট কেনার ক্ষেত্রে ইনগ্রেডিয়েন্ট চেক করে নিতে হবে | যাদের মধ্যে – DEET, Picaridin, PMD, IR3535 উক্ত আইটেমগুলো বিদ্যমান |
  •  যদি সানস্ক্রিন ব্যবহার করা হয় তাহলে, প্রথমে সানস্ক্রিন এবং এর উপর রিপেলেন্ট প্রয়োগ করতে হবে |
  •  পার্মিথরিন ট্রিটেড জামা পড়তে হবে | (পার্মিথরিন সরাসরি ত্বকে প্রয়োগ করা যাবেনা )
  •  এসি রুমে ঘুমালে ভালো হয় !
  •  এছাড়াও ঘরে নেট ব্যবহার করা যেতে পারে |

 

রোগ মুক্তির উপায় 

প্রথমেই বলি হতাশ হতে হবে কারণ, চিকুনগুনিয়া থেকে আক্ষরিক অর্থে মুক্তি লাভ করা যায়না ! কারণ, এখন পর্যন্ত এর কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি | এইটা এমনিতেই ৭-১০ দিনের মধ্যে সেরে যায় | যদি সত্যিই কিছু করতে হয় তাহলে প্রিভেনশনই সবচেয়ে ভালো | তবে, তাও বেশ কিছু পদ্ধতি যা অনুসরণ করে এই অসুখের সময় নিজেকে কিছুটা ভালো রাখা যায় | এর মধ্যে হলো –

  • জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ গ্রহণ|
  • প্রচুর পরিমানে পানি পান |
  • আর বেড রেস্টে থাকা |

 

কখন হাসপাতালে যাবেন ?

চিকুনগুনিয়া সাধারণত ষাটর্ধ ব্যক্তি ,অন্তসত্ব নারী ,ছোট শিশু এদের ক্ষেত্রে ঝুকি তুলনামূলক বেশি থাকে | এছাড়াও, যাদের কিডনি, যকৃত বা হৃদযন্ত্রে অসুখ রয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও এর ঝুকি বেশি থাকে | যদি রক্ত চাপ কমে যায় কিংবা প্রসবের পরিমান ৫০০ মিলিলিটারের কম হয় ,তিন দিনের অধিক সময় জ্বর থাকে তাহলে বুঝতে হবে এখন হাসপাতালে যাবার সময় হয়েছে |

 

চিকুনগুনিয়া বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত

এই বিষয়ে বাংলাদেশের ঢাকা মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় অধাপক মো: শহিদুল বাশার বলেন  -“প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবেনা | এছাড়াও প্রচুর পরিমান পানি পান করতে হবে | আর চিকুনগুনিয়ার মৃত্যুঝুকি প্রায় নেই বললেই চলে |” এছাড়াও তিনি দুর্বলতা কাটাতে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার প্রতিও জোরদান করেন |

প্রফেসর আবুল কালাম আজাদের বক্তব্য মতে -“এই রোগের উপসর্গ দেখা দিলে এক সপ্তাহের মধ্যেই সেরলোজি এবং আরসি-পিসিআর টেস্ট করে শনাক্ত করা যায় |”

মোট কথা, বিশেষজ্ঞদের আলাপ থেকে একটা বিষয় বোঝা যায় চিকুনগুনিয়া নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত হবার কোনো প্রয়োজন আসলে নেই |

 

আজকে এই পর্যন্তই | পরবর্তিতে হয়ত নতুন কোনো টপিক নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হব | সবাইকে ধন্যবাদ |

 


 

References :

  1. http://www.who.int/mediacentre/factsheets/fs327/en/
  2. https://wwwnc.cdc.gov/travel/diseases/chikungunya
  3. http://www.webmd.com/a-to-z-guides/tc/chikungunya-fever-topic-overview
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Chikungunya
  5. http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/1190166/%E0%A6%8F%E0%A6%A4-%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%A5%E0%A6%BE

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

টেস্টিং সল্ট : এক ভয়ঙ্কর বিষ!!

Kanij Sharmin

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার -একটি মানসিক ব্যাধি

Upama Tisha

যে মানসিক অসুখটি আপনাকে সফল হতে দিচ্ছে না!! (অধিকাংশ মানুষই জানে না তারা এতে আক্রান্ত)

Kanij Sharmin

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy