Now Reading
কুয়োর ব্যাঙঃ বাঙালিত্ববোধ ও মূল্যবোধের হন্তারক



কুয়োর ব্যাঙঃ বাঙালিত্ববোধ ও মূল্যবোধের হন্তারক

আমরা বাঙালিরা যারা দেশ থেকে বিদেশে পড়তে আসি, প্রত্যেকেই নানান দেশের মানুষের সাথে মেলামেশা করি। আমরা সকলেই আমাদের দেশের একেকজন প্রতিনিধি।
আমার মাঝেই আমার দেশ। আমাকে দিয়েই আমার দেশ, আমার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্ব চিনে নেবে, এটা আমাদের সকলের অন্তরে ধারণ করে চলতে হবে।
আমাদের সকলেরই উচিৎ, আচার আচরণ আর ব্যবহার দিয়ে নিজের দেশকে সকলের সামনে তুলে ধরা। অথচ, আমি অনেক সময়ই এর বিপরীত দেখতে পাই যা খুব হতাশাজনক।
সেদিন চাইনিজ আর্টস অ্যান্ড লিটারেচার ক্লাসে নানান দেশি ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে আমাদের জাতীয় সংগীত বাজানো হলো। সকলেই নিজ নিজ জায়গা থেকে সাথে সাথে দাঁড়ালাম। চাইনিজ টিচারও সম্মানের সহিত আমাদের সাথে দাঁড়িয়ে গেল। সত্যিই এক মধুর দৃশ্য ছিল সেদিন। অথচ, সেই মধুর দৃশ্যের মাঝে আমাদেরই কিছু বাঙালী সহপাঠী সামনের সাড়িতে বসে গালে হাত দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে অন্যদের দিকে তাকাচ্ছিল। শেষে বিরক্ত হয়ে নিজে থেকেই দাঁড়িয়ে যেতে বললাম। বেশ কয়েকবার বলার পড়েও তাদের দাঁড় করানো যায়নি। সত্যিকার অর্থে, দেশপ্রেম বলে কয়ে কারো মাঝে নিয়ে আসা যায় না। এটা একটা মানুষের ভিতর-গত ব্যাপার যা উপলব্ধি করতে হয় নিজে থেকে। দেশে থাকতে এরা নিশ্চয়ই জাতীয় সংগীতের সাথে দাঁড়ানো শিখেছে, পতাকার দিকে তাকিয়ে স্যালুট দেয়া শিখেছে। আর, এখানে এসে এসব ভুলে গেছে অথবা মনে রেখেও দেশের টান উপলব্ধি করতে পারছে না।

যাক সেকথা, এবার পাতি নেতাদের কথায় আসি।
বন্ধু মহলে এরা সবসময় নিজেদেরকে একেকজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে জাহির করতে ব্যস্ত। ভাবখানা এমন যে, সে যা বলবে অন্যরা সেভাবেই চলবে। দেশিও চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে সে অন্যদের মাঝে নিজেকে কুখ্যাত বানাতে একটুও দ্বিধা-বোধ করেনা। এদের মুখে সবসময় কিছু কমন কথা লেগে থাকে যা শুনতে শুনতে প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে। দেশে থেকে সে এই করছে, সেই করছে, একে মেরেছে, ওকে ধরেছে, দেশে তার বেশ কয়েকটা কেস চলমান, আরও কত কি। ব্যাপারগুলো এমনভাবে বলে, যেন সে মহান কাজ সাধন করে এসেছে যা না বললেই নয়। মূলত: এসব কথা বলে সবাইকে তার নিজ ক্ষমতার ব্যাপারে জানান দিচ্ছে, যাতে সবাই তাকে ভয় পায়। চিন্তা করে দেখেনা যে, তার এই কাজগুলো কতটা খারাপ আর এগুলো বলে বলে বেড়ানো কতখানি আহাম্মক হবার শামিল। একজনকে এও বলতে শুনেছি, সে নাকি তার ইউনিভার্সিটির শিক্ষককে মেরে সেখান থেকে ব্যান হয়ে বিদেশে পড়তে গেছে। একথা বলে বলে সে আসরও জমিয়ে ফেলেছে। কত বড় গর্দভ হলে এমন কাজ করে আর নিজেকে এভাবে উপস্থাপন করে। শিক্ষককে মেরে সেখান থেকে ব্যান হয়ে যাওয়াকে অথবা নানান অপকর্ম করাকে সে যদি বিশেষ অর্জন মনে করে, তবে তার উচিত সার্টিফিকেটের পিছনে এসব অভিজ্ঞতা লিখে রাখা। তার চিন্তা অনুযায়ী এসব তার ভবিষ্যতে কাজে লাগতেও পারে। সার্টিফিকেটের পিছনে লিখতে বলার পিছনে কারণ আছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রদত্ত সার্টিফিকেটে তার এসব মহান কাজ উল্লেখ থাকবে না। যেটুকু থাকবে, তা হলো একজন মানুষের বৈধ শিক্ষা। অবৈধ বা অসামাজিক শিক্ষার জায়গা মানুষ গড়ার কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দলিলে নেই।

আরেকদল মানুষ আছে, যারা নিজের দেশের মানুষকে পায়ে ঠেলে অন্য দেশের মানুষকে কোলে রাখে। আমি অনেককেই দেখেছি, যারা একে অপরের ভাল বন্ধু, কিন্তু ফরেইনদের সাথে কথা বলার সময় অন্যজনকে আর চিনেই না। বরং সেই বন্ধুকে নিয়ে হাসি তামাশা করে ফরেইনদের মাঝে জায়গা করে নেয়। অথচ সে জানেই না, তার এই চালাকি ওই ফরেইনর খুব সহজে ধরে ফেলে এবং সেই আহাম্মক নিজেকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এবার বিদেশীদের নিকট বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে কিছু কথা বলি।
প্রথম যখন আমার ইউনিভার্সিটিতে পা রাখি, দেশি বিদেশি অনেক বন্ধু নিয়ে একসাথে আমার দেশ নিয়ে গল্প করছিলাম। এক আফ্রিকান বন্ধু মাঝখান থেকে বলে উঠলো, “হেই ফ্রেন্ডস, আই নো সাম বাংলাদেশি ওয়ার্ডস”। আমি আগ্রহ ভরে তার কাছ থেকে সেই শব্দগুলো শুনতে চাইলাম। তার মুখ থেকে শোনা আমার প্রথম শব্দটি ছিলো, “বোকাচোদা”। এরপর আরও কিছু শব্দ শুনেছি, যা আমি এখানে উল্লেখ করতে পারছিনা। অন্যদেশি ফ্রেন্ডরা যখন এর মানে যানতে চাইলো, তখন সে ওসব শব্দ অনুবাদ করে তাদের শুনালো। কে তাকে এসব শিখিয়েছে জিজ্ঞেস করার পর জানতে পারলাম, আমাদের আগে যারা এসেছে, তারাই ওকে এসব শব্দ শিখিয়েছে। এমন ঘটনা আমি আশা করিনি। নিজ দেশের অপ্রীতিকর শব্দ অন্য দেশের মানুষের মুখ থেকে বের হবে, এটা কল্পনাতীত। দিন যত গড়িয়েছে, বাংলা ভাষার অপ্রীতিকর শব্দ বিদেশিদের মুখে তত বেশি শোনা গেছে। কিছুদিন পরে আমি আমার দেশি সকল বন্ধুদের এটা করতে বারণ করলাম। এও বললাম যে, যদি কিছু শিখাতেও হয়, ভাল কিছু শিখাও। আমাদের শেখানো এসব বাংলা ভাষা বিশ্বময় ছড়িয়ে যাক তাদের দ্বারা। বেশ কয়েকজন আমার পক্ষে কথা বললেও কিছু ফ্রেন্ড আমার কথার বিরোধিতা করলো। তাদের মুখ থেকে শোনা গেলো যে, তারা তাদের বাপের টাকায় পড়তে এসেছে, কারো কথা শোনার জন্য আসেনি। আমি তাদের আর কিছু বলতে পারিনি। তবে যারা আমার কথা পজিটিভ-লি গ্রহণ করেছে, তারা পরবর্তীতে বিদেশীদের অনেক গুলো বাংলা ভাষা শিখিয়েছে যা মধুর। বিদেশি বন্ধুদের সাথে দেখা হলেই তারা বলতো, “কেমন আছো ভালো”। আমি তাদের এই বাক্যটাকে সংশোধন করে দিয়েছি। এখন সামনাসামনি দেখা হলে জিজ্ঞেস করে। “কেমন আছো?” আমি যখন বলি, “ভাল আছি, তুমি?”। তখন সে সুন্দর করে বলে, “আমি ভাল আছি”। এরকম আরও কিছু সুন্দর বাংলা বাক্য তাদের মুখ থেকে বের হয়, যা শুনলে ভিতর থেকেই একটা প্রশান্তি চলে আসে। আমরা যারা পজিটিভ কথা শিখিয়েছি, আমাদের দেখে তারা পজিটিভ কথাই বলে। আর যারা গালি শিখিয়েছে, দূর থেকে তাদের কাউকে দেখলে, “হেই বোকাচোদা” বলে ডাক দেয়। মূর্খতার পরিচয় তারা সেখান থেকেই পেয়ে যায়।

সত্যিকার অর্থে এরা সবাই একেকটা কুয়োর ব্যাঙ। কুয়ো থেকে খোলা জায়গায় আসলে ব্যাঙ যেমন লাফায়, এরাও তেমন লাফাচ্ছে। এদের সকলেরই উচিত, নিজের চারপাশটা খোলা চোখে দেখে নিজেকে শুধরানো। আর মনে রাখা উচিত, পূর্বের অপকর্ম কখনোই নিজেকে কারো কাছে বড় করে না আর ভবিষ্যতকে আলোকিত করে না। ভবিষ্যতকে আলোকিত করতে চাই সঠিক শিক্ষা আর মানুষ হবার সঠিক পদক্ষেপ।

About The Author
Rafiqul Islam Heera
Rafiqul Islam Heera
A dreamer who wants to fly with midnight clouds under the vast sky and touches the thousands of twinkling stars || Study: Hangzhou Dianzi University (Telecommunication Engineering)

You must log in to post a comment