Now Reading
দোষ কি শুধুই তাহসানদের?



দোষ কি শুধুই তাহসানদের?

গতকাল ফুটপ্রিন্টে একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছিল “নাটকে ন্যাকামোপনা কবে শেষ হবে”– এই শিরোনামে যেখানে ফুটপ্রিন্টের একজন রেগুলার লেখক এবং সম্ভবত সবেচেয়ে জনপ্রিয় লেখক (এই সপ্তাহে) ফেরদৌস সাহেব বাংলাদেশের অভিনয় শিল্পীদের নিয়ে লিখেছেন। অত্যন্ত ভাল এবং বিশ্লেষন ধর্মী সেই পোস্টে তিনি তাহসান সহ আরো কজন অভিনেতার কিছু প্রফেশনাল দুর্বলতা সামনে তুলে এনেছেন। ফেরদৌস সাহেবের সেই পোস্টের প্রেক্ষিতে অর্থাৎ একটি ডিস্কাসন জবাব হিসবেই আমার এই লেখাটা দিচ্ছি।

অনেক সময় নিয়ে পুরো পোস্টটি পড়ার পর আমি সব পয়েন্টই ধরতে পেরেছি লেখক যা বোঝাতে চেয়েছেন। খুব ভাল একটা কম্প্যারিজনও দেখিয়েছেন পুরোনো দিনের নাটকের সাথে আজকের নাটকের। এবং আমি উক্ত লেখকের সাথে একমত, বাংলাদেশের টিভি-নাটকের এখন যাচ্ছেতাই অবস্থা। তবে, কিছু পয়েন্ট নিয়ে আমি কথা বলতে চাই আমি নিজে একজন ছোটখাটো ফিল্ম মেকার হিসেবে, অন্তত সেই লাইনেই আমার পড়ালেখা বা কার্যকলাপ।

উনার পোস্টটি মূলত বাংলাদেশের বিখ্যাত গায়ক এবং এখন অভিনেতা তাহসানকে নিয়ে। যেখানে তাহসানের “একঘেয়ে” অভিনয়ের কথা বলেছেন বার বার। গায়ক হতে, অভিনেতা হতে মেধার দরকার আছে এটা আমি মানি। কিন্তু, ফেরদৌস সাহেব, একটা ব্যাপার খেয়াল করলে দেখতে পারবেন, পৃথিবীর বিখ্যাত সব অভিনেতাদের কিন্তু অভিনয়ে হাতেখড়ি ক্যাজুয়াল অভিনয় থেকেই। অনেকেই আজ বিশ্ব সেরা অভিনয় শিল্পী কোন ধরনের অভিনয়-ডিগ্রী ছাড়াই। অনেকেই আবার উঠে এসেছেন একেবারে ক্ষুদ্র লেভেল থেকে আর আজ অস্কার মাতাচ্ছেন। শিল্প জিনিষটা আসলে কোন ডিগ্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশেষ করে অভিনয় শিল্প। ব্যাপারটা অভিজ্ঞতার উপরেই অনেক বেশী নির্ভরশীল। অভিনয় করতে হলে মঞ্চে গিয়ে শিখতে হবে আগে এরকম কোন কথা নেই।

ফেরদৌস সাহেব আরো একটি বিশাল পয়েন্ট মিস করে গেছেন। সেটি হলো, একজন অভিনয় শিল্পীর প্রকৃত অভিনয় ফুটিয়ে তোলার মূল কাজটা থাকে একজন ডিরেক্টর। এটা আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। ডিরেকশনের উপরে অনেক কিছু নির্ভর করে। তাহসানরা যে ধরনের অভিনয় করে থাকেন, বা যে ধরনের নাটক করে থাকেন, এই নাটকগুলো তো উনাদের লেখা না। উনারা তো ডিরেকশনে যান না। উনারা যেরকম অভিনয় করার সেরকমই করেন। যদি ডিরেক্টর বলে “TAKE OK” তাহলে OK। তাহলে এখানে শিল্পীদের কি দোষ? যদি কোন পরিচালক তাদের কাজকে বা সেই সিন-কে “ওকে” শট বলে দেন, তার মানে তাহসানদের কাজ ফুরিয়ে গেছে কারন ডিরেক্টর যেমন চেয়েছে তেমন পেয়েছে। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা এটা, কারন এ পর্যন্ত প্রচুক শর্টফিল্ম বানিয়েছি দেশে-বিদেশে। আমি যা চাই একজন পরিচালক হিসেবে সেটাই কিন্তু ফাইনাল। এখন আমার সেটের কোন একজন অভিনেতা যদি বলেন যে “ভাই, ভাল লাগলনা, টেক টা আবার নেন” তাহলে আমি হয়তো আবার নেব অথবা নিব না, এটা সম্পূর্ন আমার বা যেকোন ডিরেক্টরের ব্যাক্তিগত ব্যাপার। এখন তাহসানদের “ন্যাকামো” মূলক অভিনয়ে যদি তাদের পরিচালক সন্তুষ্ট থাকে তাহলে বেচারা অভিনেতাদের দোষ কি? ডিএসএলআর ক্যামেরাধারী শত শত নাট্য-নির্মাতা বাংলাদেশের অলিতেগলিতে ঘুরে বেড়ায় যারা বছর খানেক আগে ক্যামেরা কি বা লেন্স কি সেটাই জানতো না। এখন এরাই যদি নাটক বানায়, তাহলে অভিনেতাদের কাছ থেকে আপনি কি আশা করতে পারেন? একজন ডিরেক্টরের কাজ হলো অভিনেতা সহ তার পুরো শুটিন্ত ইউনিট থেকে সেরাটা বের করে আনা কিন্তু বাংলাদেশে সেটা হচ্ছে কোথায়?

এখন আপনি যুক্তি দিতে পারেন, তাহলে তাহসানরা এদের নাটক করে কেন? কেন করবে না? আর কোন অপশন না থাকলে তারা কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? খারাপের মধ্যে যেটা সবচেয়ে কম খারাপ সেখানে কাজ করবে। এর চাইতে তারা আর বেশী কিইবা করতে পারে? অনেক বছর আগে বাংলাদেশে ভাল নির্মাতারা ছিলেন যেমন হুমায়ুন আহমেদ, হানিফ সংকেত বা আরো অনেকেই। এখন তারা নেই বা থাকলেও নাটকে নেই। কেন নেই জানেন? কারন মার্কেটটা ছোট। এখানে নাটকের বাজেট ২ লাখ টাকা মানে অনেক কিছু। সেই ২ লাখ টাকা বাজেটের নাটকে আপনি কি আশা করবেন?

বাংলাদেশের অভিনেতারা অনেক কম অর্থ উপার্জন করেন। অনেক কম। যেকোন দেশের চাইতে অনেক গুন কম। নাটকের বাজেটই যদি হয় ২ লক্ষ টাকা, তাহলে কত টাকা আর্টিস্টকে দিবেন আর কত টাকা মেকিং এ দিবেন? এত কম টাকায় বাংলাদেশের একজন অভিনয় শিল্পীর সারা মাসে অনেকগুলো নাটকে অভিনয় করতে হয়। তা না হলে অনেকেরই পোষাবেনা।এখন একটা নাটক বানান, ভাল একটা বাজেট দেন – নূন্যতম ১০-১৫ লক্ষ টাকা, তাহসানের মত শিল্পীদের ভালভাবে পেমেন্ট করেন এবং সাথে এটাও বলে দেন যে আপনাকে সময় বেশী দিতে হবে কারন আপনি সেরাটাই চান – দেখেন কি হয়। তাহলে উনাদের মাসে ১৪টা নাটকে অভিনয় করে এক্সসটেড হতে হবে না। মাসে ২/১ বার অভিনয় করলেই হবে এবং পুরো ক্রিয়েটিভিটি আপনারা দেখতে পারবেন তখন। এর আগে যদি বাংলাদেশের অভিনয় শিল্পীদের যদি এভাবে মূল্যায়ন করা হয় তাহলে সেটা অন্যায় হবে।

এখন আপনি চাইলে উলটো আমাকে প্রশ্ন করে বসতে পারেন, যে নাহিদ, আপনি কেন তাহলে বানান না এত বড় বড় কথা যখন বলছেন। আমার উত্তর হলো, আমার মেইনস্ট্রিম নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। কোন কালে ছিল না। এখানে কিছু দূষন আছে যেগুল আমার পছন্দ না। তাই আমি একটু দূর দিয়ে যায়। এটা আমার প্রথম লজিক। আর ২য়, হ্যা, আমি তৈরী করব যদি আমি আমার নাটক বা সিনেমায় আমার অভিনেতাদের পুরোপুরি মুল্যায়ন করতে পারি। আপনি আমাকে ২-৩ লাখ টাকা বাজেট দিয়ে “টাইটানিক” বানাতে বললে হবে না। কারন আমি যদি বানাই, তাহলে আমি নিশ্চিত করব আমার শিল্পীদের কাছ থেকে যেন সেরাটা বের করে আনতে পারি এবং আমার সেই শুটিং পর্ব উত্তরার মামার বাড়িতে ২ দিনের টানা শুটে শেষ হবে না। আমার সময় লাগবে বানাতে ভাল কিছু। আর সেসময়টাতে আমি আমার শিল্পীদেরও টিমে চাইব। এখন ২ লাখ টাকা একটা নাটকের বাজেটে তাহসানদের মত অভিনেতাদের আমি কিভাবে বলি আমাকে ১ সপ্তাহ সময় দিতে? এটা তো ঘোরতর অব মূল্যায়ন। যদি কোন প্রডিওসার বা টিভি চ্যানেল এসে আমাকে বলে, নাহিদ, এই নেন, আপনার এই নাটকের জন্য আপনাকে ২০ লক্ষ টাকা বাজেট দেয়া হলো তখন দেখেন সেই নাটক কি হয় আর সেই অভিনেতার পারফরম্যান্স কি হয়? কিন্তু এরকম কেউ নেই। সবাই কমের উপর দিয়ে যাবে। ক্রিয়েটিভিটির মূল্য আসলে যাদের কাছে থাকার কথা, তাদের কাছে কম টাকায় বেশী প্রোডাকশনের মূল্য বেশী। তাই মেইনস্ট্রিম থেকে আমি হাজার মাইল দূরে। এর চাইতে ইউটিউব ভিডিও তৈরি করে আরও বেশীও উপার্জন করা যায়।

আমার এত কথার সরামর্ম হলো, এখানে শিল্পীদের এক তরফা দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই। যারা ডিরেকশনে আছে, যারা গল্প লিখছে তাদের আগে ফিল্টার করতে হবে বা ধরতে হবে। তাদের বানানোর যোগ্যতা পরিমাপ করতে হবে। ডিএসএলআর ক্যামেরা আর একটা প্রাইম লেন্স লাগিয়ে একটু ন্যারো ডেপথ অব ফিল্ডে (সোজা বাংলায় ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লার) টাইপের মেকার হয়ে লাভ নেই। মেকারদের সিনেমাটোগ্রাফি বুঝতে হবে, এম্বিয়েন্ট বুঝতে হবে, অভিনয়ের ভাষাটা বুঝতে হবে, গল্পের ওজন বুঝতে হবে। একজন অভিনয় শিল্পী তো আর নাটকটি লিখেন না বা তাহসান তো ডিরেক্টরকে গিয়ে স্ক্রিপ্ট দিয়ে আসেন না। উনি উনার অভিনয়টা করে যান যেরকম ডিরেক্টর বলবে। যদি ডিরেক্টর বলে “ওকে” তাহলে “ওকে”। সেই নাটক খারাপ লাগলে, একঘেয়েমি লাগলে ডিরেক্টরকে গিয়ে ধরেন। আর আজকাল ঘরে ঘরে ডিরেক্টর আছে। যার কাছে ক্যামেরা আছে, সেই এখন ডিরেক্টর, ফিল্ম মেকার। কতজনকে ধরবেন বলেন। তাহসানের ভাল নাটকও আছে কিন্ত। সেদিন এক ছোট ভাই ইনবক্সে লিঙ্ক করেছিল “দূরবীন” নামের একটি নাটক, ইউটিউবে আছে, বেশ ভাল ছিল। পরে বুঝলাম প্রডিওসার বিদেশী তাই। কাজ ভাল ছিল কারন কাজ করার স্কোপ ভাল ছিল।

যাই হোক, আমার এই লেখাটা একটা ডিসকাসন মাত্র। আমি কিছু পয়েন্ট নিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলাম এবং বলেছি। ফেরদৌস সাহেবের লেখাটা যথেষ্ট ইনফরমেটিভ ছিল এবং উনার পয়েন্টগুলো বেশ ভাল ছিল। কিন্তু, কিছু পয়েন্ট ফেরদৌস সাহেব মিস করে গেছেন যেগুলো আমি তুলে ধরলাম। আশা করি একটা বড় ছবি ফুটে উঠবে এর মাঝে। মিডিয়াকে ঠিক করতে হলে মিডিয়া যারা চালায় তাদের ঠিক করতে হবে অথবা অল্টারনেটিভ মিডিয়া খুজতে হবে। এটাই হলো মোদ্দা কথা।

 

About The Author
Nahid Helal
nahidrains
Independent Film Maker, CEO of NahidRains Pictures and President of Bangladeshism Project.
3 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment