সাহিত্য কথা

ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ৪)

(তৃতীয় পর্বের পর…)

শৈবাল ধ্রুবকে বলে বসে ” মা-বাবারা যা চায় স্বন্তানের ভালর জন্যেই তো চায় “।

তৎক্ষণাৎ উত্তর ধ্রুবর ” ভাল চায় ঠিক, কিন্তু ভাল করানোর জন্য যেই রাস্তা দিয়ে যায় সেই রাস্তা সবসময় ঠিক নাও হতে পারে। আর মানুষ বলে না? যে সন্তানের ওপর মা’র কখন নজর লাগে না। কথাটা ভুল। সন্তানের  ওপর মা’র নজরই সবার আগে লাগে ” ।

কথাগুলো বলে চুপ মেরে যায় ধ্রুব, শৈবালও চুপ, তার মাকে নিয়ে এইসব কথা ধ্রুব প্রায়ই বলে। রাগটা অনেক পুরোনো। সেই যে পুলিশ হেফাজতে গিয়েছিল ধ্রুবরা, সেদিনই তার মা তার কাছ থেকে তার প্রিয় মোবাইলফোনটি ছিন্তাই করে নিয়ে যায়। অনেক আকুতি-মিনতি করেছিল ধ্রুব তার মা’র কাছে, বস্তুটি ফেরত পাওয়ার জন্য। কিন্তু লাগাতার ১৪ দিন আবেদন করার পরেও যখন তার মা আবেদনটি নাকচ করে দিল, সেই থেকে মৃত্যু অবধি তার মা’র সঙ্গে তার কথা হয় নি। এবং টানা ১৪ দিন আবেদন করার পরেও মোবাইলফোনটি না পাওয়ায় সে এতই আপমানবোধ করে যে, সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয় সেই মোবাইলটি আর কখনো গ্রহন করবে না । এবং করেও নি। কিন্তু এই ২৮ বছর বয়সেও পুরোনো কথা ধরে মৃত ব্যাক্তির ওপর অভিমান করে বসে থাকা কোন সুস্থ ব্যাক্তিকে মানায় না।  যদিও ধ্রুব অসুস্থ, এবং দীর্ঘদিন অতিরিক্ত গাঁজা সেবন এর কারনে মাথাটা আউলেছে তার।

যাক, এইসব বলে আর বদলানো তো যাবে না বাস্তবতা। কিন্তু মায়ের প্রতি এতটা ভয়ানক ক্ষোভ কারো থাকে বলে মনে হয় না। এইসব কথা চিন্তা করতে করতেই ধ্রুবর পাড়ায় গাড়ি ঢুকে গিয়েছে। এবং পাড়ায় প্রথমেই চোখে পড়ল পুলিশের আনাগোনা। বুঝতে বাকি নেই, কাল যেই ব্যাক্তি ধর্ষনের নামে শহীদ হয়েছিল, তার খবর পেয়েই পুলিশের চেহারা দেখাতে হচ্ছে সবাইকে। ঐ মানুষরূপী কুকুররা প্রায়ই এমন পুণ্যের কাজ করে বেরায়, সবার শহীদ হতে হয় না। এরা তাদের যুদ্ধে প্রায় সময় শতভাগ সফল।

আর সুশীল সমাজের সাপোর্ট তাদেরকে এগিয়ে যেতে আরো সাহায্য করে। তাদের বক্তব্য ” এক হাতে তালি বাজে না ” বা ” মেয়েটিরই দোষ ছিল “। আরেকদিকে মাইকে সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে কাল শহীদের জানাজায় অংশগ্রহনের। তার মা-বাবা হয়তো বলে উঠবে ” আমার ছেলে মারা যায় নি, শহীদ হয়েছে “, এই বলে দুঃখ এবং আনন্দ মিশ্রিত অশ্রুকণা ঝরে পড়বে তাদের চোখ দিয়ে। ধ্রুবর ধরা পরবার ভয় নেই, পিছুটান থাকলে ভয় থাকত। যার পিছুটান বলতে কিছু নেই, তার আবার কিসের ভয় ? আর ধরা যদি পরেও যায়, তাতেও সমস্যা নেই। শৈবাল ঠিকই সামলে নেবে।

এবার গাড়ি থেকে নামল ধ্রুব, বাসা এসে গেছে। কাল সময়মতো অফিসে যাবে বলে শৈবালকে বিদায় জানাল।

শৈবাল এইবার কিছুটা ভীতিহীন, গাড়ি এখন সে নিজে চালাচ্ছে। বাড়ি ফিরে যেতে হবে তারাতারি, মা হয়তো দুপুরে কিছু খায় নি ছেলের কথা চিন্তা করে করে। প্রতিদিনের মত রাস্তাথেকে মায়ের জন্য এক হালি সাগর কলা কিনে নিল শৈবাল । বাড়ি গিয়ে মা’র হাসিমুখটা দেখবে এবং হাতে সেই এক হালি ভেষজ ধরিয়ে দিলেই যেন তার মা পেয়ে যায় রাজ্যের সুখ। শৈবালের এতটুকুতেই ভাল দিন যায়। দিশেহারা দিনগুলো পার হয়ে এখন এক লক্ষ টাকা বেতন পায়, নিজের গাড়ি কিনে নিয়েছে, আর মাত্র ৯ মাসের কিস্তিতে ফ্ল্যাটটাও নিজের নামে করে নেবে। কাজের চাপটা অনেক হলেও সে এটা মেনে নেয়, মাসে দুবার নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকা ঘুরে আসতে হয় কাজের জন্যেই। ধ্রুব তো আর এতসব সামলাতো না এতদিন। এখনও যে সামলাবে এটা বলা যায় না। পাগল যতই ভাল কথা বলুক, সেগুলো পাগলের প্রলাপই থাকে। ধ্রুবও হয়তো কিছুদিনের জন্য একটু ভাল হওয়ার চেষ্টা করে চলবে আরকি। শেষমেষ পরিণতি কি হবে সবার অজানা।

ধ্রুব অনেকদিন পর কিছু কাজ করার ফলে ক্লান্ত। এতটাই ক্লান্ত যে গাঁজা ধরিয়ে পাশের টেবিলে রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কাল সকালে আবার অফিসে রওয়ানা হবে। তাই তারাতারি উঠে যেতে পারবে। আর্লি টু বেড এন্ড আর্লি টু রাইজ, মেইকস এ মেন হ্যালদি, ওয়েলদি এন্ড ওয়াইজ।

পরেরদিন সকালে অফিসে বিরক্ত হয়ে ঢুকতে হল শৈবালকে। নতুন এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট এর ব্যাবসার জন্যে নিয়োগ দেয়া মহিলাটি ১ মাস ছুটি কাটিয়ে অফিসে ফিরছে আজ। এই মহিলাকে খুব একটা পছন্দ নয় শৈবালের। প্রাশাসনিক দক্ষতা এবং পূর্ব অভিজ্ঞতার কারনে প্রায় বাধ্য হয়েই রিক্রুট করতে হয়। কলিগ হিসেবে শুধু এই মহিলা না, কোন মহিলাকেই পছন্দ না শৈবালের। পুরুষ কলিগ হলে ভবিষ্যত পরিকল্পনা এবং ক্যারিয়ার নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা যায়। কিন্তু মহিলা কলিগ হলে জানা যায় শাশুরি মানুষ হিসেবে কেমন, বাচ্চারা কেন ভাত খায় না, আর মাঝে মাঝে নিজেদের জীবন নিয়ে বিলাপ। এইসব শুনলে যেকোন পুরুষের ক্রোধ তুঙ্গে ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

লাঞ্চের সময় শৈবালের দেখা হল সেই  মহিলার সাথে। দুই একটা কথা বলে পানি খেতে চলে গেল সেই মহিলা, পানি খেয়ে হয়তো দুনিয়ার সব গল্প শুরু করতে আসবে। সেই দিকেই ঘটল এক মজার ঘটনা, ফিল্টার থেকে পানি নিয়ে খাওয়ার সময় মহিলার এই খেয়াল নেই যে তার পেছনে দারিয়ে আছে খোদ শৈবাল। আশেপাশে কেউ নেই মনে করে সেই মহিলা সজোরে পন্দ্রবায়ু ছেড়ে দিয়েছিল।

শৈবাল হাসি আটকিয়েই ফিল্টারের পাশে থাকা এয়ার ফ্রেশ্নারটি নিয়ে সেদিকে দিল মেরে। আর ঐটুকুতেই কেল্লা ফতে। গালদুটো লাল করে মহিলা সেই যে সেখান থেকে সরে গেলেন, সেদিন আর শৈবালের আশেপাশে আসেন নি। শৈবাল অনেক খুশি, অন্তত একদিন সেই মহিলার কথাবার্তা থেকে রেহাই পাওয়া গেল।

(চলবে…)

 

 

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

আবার দেখা হবে। পর্ব-২

ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ৩)

Prashanta Deb

অদৃশ্য অভিমান। বাবা আমায় ভালোবাসে না!

Maksuda Akter

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy