Now Reading
উপহার যখন গলার কাঁটা হয়ে বিধে



উপহার যখন গলার কাঁটা হয়ে বিধে

সামাজিক প্রেক্ষাপটে আমরা পরিবারতন্ত্রের বেড়াজালে বেড়ে উঠছি। পরিবারের বাইরে গিয়ে মানুষের শিক্ষণীয় প্রতিটি কৃষ্টি কালচার আমরা সমাজ আর বাস্তবতা হতে শিখছি। উপনিবেশ কালে যখন সামাজিক প্রেক্ষাপট আজকের মত বন্ধুর ছিল না, তখন মানুষের কাছে সম্পদ আর প্রাচুর্যে ভরপুর ছিল।একে অপরকে খুশি বা আনন্দের ছলে উপহার দেয়ার রেওয়াজ মূলত তখন থেকেই চর্চা হয়ে আসছে। এই যে পারিবারিক চর্চা বা প্রথা তা একটা সময় সামাজিক রীতি হয়ে যায়। সমাজ বা রাষ্ট্রের অধীন নীতিনির্ধারকরা  নিয়মকে পরিমার্জিত করে সময়ের সাথে এইসব পদ্ধতিকে করেছে বহুমাত্রিক। উপহার বা উপটৌকনের যে সংস্কৃতি তার সাথে ধর্মীয় প্রেক্ষাপট আর মানবিক মুল্যবোধ গুলো জড়িয়ে বিষয়টা যেন আরো জটিল হয়ে পড়েছে। এই পরিচালিত সংস্কৃতি আর কার্যাবলির প্রেক্ষাপট হিসেবে দাঁড়ায় পৌরণিক বিশ্বাস আর ভাবধারাগুলো।

পরবর্তিত ভাবধারা আর সমাজ ব্যবস্থার আলোকে এখন এই উপহারের যে সংস্কৃতি তাই যেন সমাজের জন্য অলিখিত নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক অবকাঠামোর প্রেক্ষিতে সমাজে মোটামুটি তিনস্তরের মানুষের বসবাস আছে।

সামাজিক কার্যাবলির অংশ হিসেবে বিয়ে একটি সামাজিক চুক্তি বলা যায়।এখানে নরনারী একে অপরের সাথে সর্বসম্মতভাবে বৈধ উপায়ে বসবাসের অধিকার লাভ করে।সমাজে বসবাসরত মানুষ এই প্রথাকে একসময়ে একে অপরকে কাবু করার হাতিয়ার করে নিয়েছে। ইসলাম ধর্মের পাশাপাশি প্রচলিত অন্য ধর্মব্যবস্থায় সমাজ সংস্কারকরা সময়ের সাথে উপটৌকন দেয়ার প্রথাকে মিলিয়ে নিয়েছে। এই যৌতুকের প্রথাই যেন এখন বিয়ের একটা সম্পূরক অংশ বলে বিবেচিত হয়।

রাষ্ট্র এবং সমাজের প্রেক্ষাপটে আমরা এই যৌতুকের ভিন্ন দৃশ্যপট দেখতে পাই। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অঞ্চলভেদে তা আবার বহুমাত্রিক।এই বহুমাত্রিক ঘটনার প্রতিক্রিয়াও  বেশ জটিল বলা চলে।আমরা প্রতিদিনকার পত্রিকায় অন্তত একটা না একটা নৃশংসতার খবর ছাপতে দেখি যেখানে নেপথ্যে ছিল যৌতুকের মত অভিশপ্ত প্রথা।সমাজে প্রচলিত ধারার মধ্যে বহুল প্রচলিত বিয়ের রীতি বা প্রথা হল সর্বসম্মতভাবে বিয়ের আয়োজন বা এ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। এই সর্বসম্মত পদ্ধতিতে কোন অংশে কনে পক্ষকে ছাড় দেয়া হয় বলে মনে হয় না। এখনও মানুষ এই যৌতুককে নিজের প্রাপ্য অধিকার বলে মনে করে। ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে বিয়ের রীতিতে নারীর সুরক্ষা বা নিশ্চয়তা বিধানের জন্য কাবিন করার যে পন্থা তার সাথে আলাদাভাবে যৌতুককে মিলিয়ে বিষয়টাকে জটিল করে রেখেছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে একজন নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রতিনিধির তার সামাজিক অবস্থান হতে বিয়ের জন্য যে খরচ পড়ে তা আনুমানিক ২-৩ লাখ পড়বে। তবে এই খরচ নিতান্তপক্ষে বলা হয়েছে। একইভাবে মধ্যবিত্ত কোন পরিবার তার বিয়ের জন্য সর্বোচ্চ খরচ করার যে গন্ডি তা ৫ লাখের উর্ধ্বে যায়। সমাজে উচ্চবিত্তদের এই খরচের যে বাহার তা তার ইচ্ছানুযায়ী করে থাকে কেননা তা অবশ্য ১০ লাখের উর্ধ্বে চলে যায়।এখন দেশের যে অবকাঠামো সে অনুযায়ী এই ক্যাটাগরিতে অর্থ খরচ করার সামর্থ্য কয়জনের আছে তা দেখার বিষয়। আপনি এই যে খরচের কাঠামো দেখছেন তা বরাবরই অনুমেয় কিন্তু এই খরচ যদি চট্টগ্রামের প্রেক্ষিতে চিন্তা করেন তা অবশ্যই দ্বিগুণ করে ধরতে হবে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি একজন আত্মীয়ের মেয়ের বিয়ে বরপক্ষের ফরমায়েশ তিনি পূরণ করতে সমর্থ নন।অপরদিকে ছেলে নাকি ভাল তাই মেয়েকে তার হাতে দিতে চাই যেন একটু নির্ভার থাকা যায়। এখানে প্রশ্ন আসে যে ছেলে বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তের বাইরে এসে যৌতুক নিবে না এমন সাহসী একটা পদক্ষেপ নিতে পারে না সে কোন অর্থে ভাল তা যাচাইযোগ্য। এখনো আমরা মেয়েদের স্বাবলম্বী করার চেয়ে বরং অন্যের কাছে গছিয়ে দেয়ার মানসিকতা পোষণ করি। এটা চরম ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু নয় । আত্মীয়ের সেই বিয়েতে যথারীতি সাহায্য করতে হল এখানে হাত-পা বাঁধা।

একই দিকে এক বড়লোক বাবার আহ্লাদী কান্ড দেখলাম উনি ঘোষণা দিয়ে অযাচিত খরচ করেছেন কেননা উনার মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করেছেন। তারপরও তিনি কোন ছেলে যদি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার পেশার লোক পান তবে যথেচ্ছভাবে খরচ করবেন।যথারীতি করেছেন।পাশাপাশি অন্যদেরও দেখিয়েছেন যে কিভাবে স্বাভাবিক খরচকে অস্বাভাবিক করে এটাকে গলার কাঁটা বানানো যায়। এই ধরনের ঘটনা হারহামেশাই ঘটছে সমাজে । এই কাজগুলোর বেসামাল গতি থামানোর জন্য কোর সীমারেখা না থাকায় তা দিনেদিনে লাগামহীন হয়ে যাচ্ছে।আপনি ক্ষুদ্র পরিসরে সংস্কারী হওয়ার চিন্তা করলেন তবে সমাজ বা বাস্তবতা আপনাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিবে ওটা ছিল নাকি আপনার অপরাগতা।

সেদিন আমার একবন্ধু গলা ফাটিয়ে বলল সে নাকি বিয়ের সময় একটা অতিরিক্ত জিনিস নেয় নি যাকে যৌতুক বলা যাবে। এটাকে শাবাসী দেয়া যায়।

মূলত প্রচলিত মতবাদের অপব্যাখায় এখনকার সমাজে যৌতুককে একটা ভিন্ন মাত্রার প্রথা বানিয়েছে যা কিনা কোন ক্ষেত্রে বিলাসীতার পর্যায়ে পড়ে আবার কোথাও তা চরম মাত্রায় প্রহসনের পর্যায়ে পড়ে।

সম্প্রতি দেখলাম যৌতুকের বলি যে হচ্ছে তাদের কোন গন্ডি নেই নিম্নবিত্তের মেয়ে যেমন শিকার হচ্ছে তেমনি উচ্চবিত্তের মেয়েরা এই ধরনের আক্রোশ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। প্রাইভেট কার যৌতুক হিসেবে না পাওয়ায় মনীষা নামে এক মেয়ের জীবন নিতে কুন্ঠাবোধ করে নি পাষন্ড স্বামী। অথচ এই স্বামীর কাছে পরম বিশ্বাসে মেয়েকে দিয়েছিল বাবা-মা। উপহার বা যৌতুকের যে প্রথা তার প্রতি মানুষের প্রবণতা বেড়েই চলছে।লোভ বা কোন কিছু বাড়তি পাওয়ার যে আকাংখা তা স্বভাবজাত এই স্বাভাবিক চাহিদা যখন লিপ্সা হয়ে যায় তা সামাজিক অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হয়।

সময় এসেছে সোচ্চার হওয়ার কেননা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে আমাদের সামাজিক রীতিনীতিগুলো নিয়ে আরো বেশি ভাবা উচিত। এমন কোন প্রথা প্রচলিত থাকা উচিত না যেটা কিনা পরোক্ষভাবে মানব হন্তারক।গ্রাম বা শহরের প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে শুরু করে দালানকোঠায় এই যৌতুকের কালো থাবা বিস্তার করে আছে। এখন দেশের আনাচে কানাচে প্রতিনিয়ত হাজারো মেয়ে আড়ালে অগোচরে প্রতিনিয়ত এই যৌতুকের মত অভিশপ্ত কর্মকান্ডের প্রতিক্রিয়ার শিকার হচ্ছে। এইসব ঘটনার কয়টায় বড়জোর খবরের শিরোনাম হচ্ছে বা লোকচক্ষুর সামনে আসেছ।মূলত এই পন্থা বা রীতি সমাজকে অক্টোপাসের মতো করে ঘিরে রেখেছে আপনি চাইলেও সহসা বের হতে পারবেন না। আপনাকে এই বেড়াজাল ভাঙ্গার চেষ্টা তো করতে হবে।

এই অযাচিত একটা পদ্ধতি যার দ্বারা আমরা অকালে যেমন মায়ের কোল খালি হতে  দেখছি, তেমনি কারো আদরের বোনকে হারিয়ে বসছি,কোনক্ষেত্রে কোন শিশুর মাকে কেড়ে নিচ্ছে। এই প্রতিটা ঘটনার জন্য সামাজিক রীতির বেপোরোয়া আগ্রাসন দায়ী।

আসুন আমরা সবাই সোচ্চার হয় এই যৌতুকের বিরুদ্ধে। সামাজিক প্রথা হিসেবে চালু হওয়া এই উপহারের সংস্কৃতি যেন আমাদের গলার কাঁটা হয়ে না বিধে।

বিয়ে হোক কেবলই সামাজিক অধিকার যেখানে থাকবে না কোন দাসত্বের বেড়ি বা স্বার্থের শীতল যুদ্ধ। যা বাস্তবিক সামাজিক বা মানসিক অগ্রগতি দুটোর জন্য দায়ী বলা চলে।

About The Author
Rajib Rudra
1 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment