Now Reading
ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ৫)



ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ৫)

(চতূর্থ পর্বের পর…)

লাঞ্চের পালা শেষ। আবার কাজ শুরু করতে হবে, অনেক কাজ। অনেক অনেক অনেক কাজ। ব্যাবসা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে এবং তার সাথে তাল মিলিয়েই বেড়ে চলেছে শৈবালের খাটুনি। টেপাটেপি করতে করতে কোনদিন না জানি তার কিবোর্ডটাই শাহাদাৎ বরণ করে।

তো দীর্ঘক্ষন টেপাটেপির পর হঠাৎ তার মনে পড়ল, ধ্রুব এখনো অফিসে আসে নি। আসলে রুমে ঢু মেরে যেত। শৈবাল ভেবেই নিয়েছিল, ধ্রুব যা বলছে সব এমনিতেই বলছে। একদিনের বেশি তার ইচ্ছা থাকবে না ব্যাবসায়িক কাজকর্মে। কিন্তু তাও সে একটা ফোন দিল ধ্রুবর বাসায়। ফোন বেজেই চলছিল, কিন্তু কেউ ধরেনি তিন চার বারের পরও। এসব স্বাভাবিক, খুবই স্বাভাবিক, ধ্রুব এমনই করে যদি মন খারাপ থাকে। পঞ্চম বার ফোন দেওয়ায় আশ্চর্যজনক ভাবে ফোন উঠায় ঘরের কাজের সাহায্যকারী। শৈবাল চমকে উঠে। জিগ্যাসা করে ধ্রুব কোথায়?

সেই মহিলার উত্তর ” সাব তো সকালেই বাইর হইয়া গেসে, আমারে তো কিছু কইয়া যায় নাই “। দ্বিতীয়বার চমকানোর পালা শৈবালের। ঘর থেকে বের হয়েছে কিন্তু অফিসে আসল না, তাহলে গেছে কোথায় ? শৈবাল তারাতারি ধ্রুবর কক্ষে গিয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে যে সে এসেছে নাকি না। সিকিওরিটি থেকে শুরু করে সবাইকেই জিজ্ঞাসা করে দেখে তাকে দেখেছে নাকি না। সবার একই উত্তর ” না “।

এবার চিন্তাটা একটু বেরে গেল। কাজ-টাজ সব ফেলে রেখে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ধ্রুবকে খুজতে। অনেক রকম চিন্তা চলছিল শৈবালের মাথায়, জি.ডি করার চিন্তাভাবনাও করে ফেলেছিল, কিন্তু পরে একটু অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের খোজ চালু রাখল।

শহরটা প্রায় অর্ধেক ঘোরা হয়ে গেছে, কোথাও ঐরকম কাউকে দেখে নি কেউ।

হঠাৎ এক কবর স্থানের পাশ দিয়ে যেতে চোখে পড়ল ধ্রুবকে। এই কবর স্থানেই ঘুমিয়ে আছে তাদের এক কাছের বন্ধু নিলাদ্রী। ভেতরে ঢুকে দেখে ধ্রুব নিলাদ্রীর সমাধির পাশেই অবস্থান করছে। নিলাদ্রীর মৃত্যু হয়েছিল মাত্র ২ বছর আগে, তখন কিন্তু ধ্রুবর মানসিক ভারসাম্য নেই। যদিও তাকে জানানো হয়েছিল নিলাদ্রীর প্রয়ানের কথা, কিন্তু তখন সে এই বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয় নি, হয়ত বুঝতেই পারেনি কিছু। তবে এখন ধ্রুবকে দেখে মনে হচ্ছে সে আসলেই বন্ধু হারানোর বেদনায় কাতর। চোখে জল নেই, তবুও দেখে বোঝা যাচ্ছে যে সে খুব দুঃখিত।

নিলাদ্রীর মৃত্যুটা ছিল বড়ই করুণ, কিছুটা অবাক করাও বটে। নিলাদ্রীকে বন্ধু মহলে সবাই প্রেমিক পুরুষ হিসেবেই চিনত। স্মার্ট এবং ধন-সম্পত্তির মালিক হওয়ায় অনেক নারীই সংশপর্শে এসেছিল তার। কিন্তু নিলাদ্রী কখনই ভালবাসার স্বাদ পায় নি। সবাই টাকার লোভেই আসত তার কাছে। তাই ৭ম বার প্রেমে ব্যার্থ হওয়ার পর যখন আরেকটি মেয়ে বলল ভালবাসি, তখনই প্রবল হাসির কারনে তার হৃদপিণ্ড গোস্বা করে পদত্যাগ করে দিয়েছিল। সেখানেই শেষ হয়ে গেছিল নিলাদ্রীর অধ্যায়।

আজ হঠাৎ নিলাদ্রীর কথা মনে পরার কারন জিগ্যাসা করলে ধ্রুব বলে ” যখন মরল তখন অবুঝ ছিলাম, এখন দেখা না করাটা অন্যায় হবে। তাই একবার দেখতে আসলাম বন্ধুকে “।

শৈবালের একটু খারাপই লাগে ধ্রুবর চেহারার দিকে তাকিয়ে, এমন কষ্টাচ্ছন্ন চেহারা দেখা যায় না ধ্রুবর। বাবা-মা মারা যাওয়ার পরও দেখা যায় নি। আর কিছুক্ষণ থাকলে ধ্রুব হয়ত কেদেই দিবে। শৈবাল বুঝতে পারছে না তাকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে যাবে, নাকি বছরের পর বছর জমে থাকা বেদনাগুলো বের হয়ে আসতে দেবে আজ।

শেষমেশ তাই হল। অঝোরে  কাদা শুরু করল ধ্রুব, এই প্রথম ধ্রুবকে কাদতে দেখে মনে প্রশান্তি আসল শৈবালের। এ যে বছরের পর বছর জমে থাকা পাথর গলে অশ্রুকণা হয়ে বেরিয়ে আসছে ধ্রুবর চোখ বেয়ে। জমে থাকা কষ্ট বের করে দেওয়ায় মন হালকা হয়।

কিছুক্ষণ পর তারা বিদায় দিল নিলাদ্রীকে, উঠে চলল বাসার পথে। স্যুট বুট পরা ধ্রুব আজকে অফিসে যায় নি। কাপরগুলো শুধু শুধু পড়ল, এত কাপর না পরে সাধারণ কাপর পরলেই চলত তার। এই চিন্তা এখন খেলছে মাথায়। আজগুবি এইসব চিন্তা করার আসলে কোন দরকার নেই।

শৈবাল এক হাতে গাড়ি চালাতে চালাতে বাসায় ফোন দিয়ে বলে দিল আজকে সে ধ্রুবর সাথেই থেকে যাবে। সেই সময়ই ধ্রুব প্রশ্ন ছুড়ে দিল আবার শৈবালের মুখে। ” তুই বিয়ে করবি না ? “।

শৈবাল গতকাল ভেবেছিল শুধুমাত্র প্রশ্নটা এরানোর জন্যেই ধ্রুব এই প্রশ্ন করে, কিন্তু আজ সত্যিকার অর্থেই এই প্রশ্ন করছে সে। একটু সময় নিয়ে শৈবালের উত্তর ” এখনও আমি রেডি না, আরেকটু সময় লাগবে। সবকিছু আরেকটু গুছিয়ে নেই, ফ্ল্যাটটা নিজের নামে করে নেই তারপর। “।

এই কথা শুনে ধ্রুব কি বুঝল সে নিজেই জানে, মাথায় কোন একটা ফন্দি আঁটছিল। কোন ফন্দি আঁটার সময় ধ্রুবর চেহারাটা দেখেই বোঝা যায় কিছু একটা চলছে তার মাথায়।

এবার শৈবাল প্রশ্ন করল ধ্রুবর বিয়ের কথা। কিছু একটা বলতে গিয়েই তখন চুপ করে যায় ধ্রুব। মুহুর্তের নিরবতা, তারপর সে প্রশ্ন করে শৈবাল কে ” খুশবু কেমন আছে ?”।

শৈবাল প্রশ্নটি শুনেই কষে ব্রেক ধরল গাড়িতে। খুশবুর কথা এখনো মনে আছে তাহলে ধ্রুবর। আসলেই ধ্রুব এখন প্রতিদিন, প্রতি মুহুর্তে অবাক করে চলেছে শৈবালকে।

গাড়ি চালানো আবার শুরু করল শৈবাল, এতটা কষে ব্রেক ধরার পরেও ধ্রুব স্বাভাবিক ভাবেই বসে আছে। খুশবু মেয়েটা আসলে ধ্রুবর “প্রথম” ভাললাগা এবং ভালাবাসার মধ্যেখানের বস্তুটি। ইংরেজিতে যাকে বলে ইনফাচ্যুয়েশন। জেনুইন ইনফাচ্যুয়েশন। মেয়েটি যখন পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া তখন ধ্রুবরা নবম শ্রেণীতে।

খুশবু পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময়ই প্রথম ধ্রুবর চোখে পড়ে সে। নীলরঙা এক সোয়েটার পড়ে হাটছিল গোলাপি ঠোটওয়ালা মেয়েটি। সেই দেখাতেই ভাল লেগে যায়। বন্ধুদের জানালে সবাই ধ্রুবকে পেডোফাইল উপাধি দেয়, কিন্তু তাতে কিছুই আসে যায় না তার। সে শুধু এই বিশ্বাস করত যে খুশবুকে তার ভাল লাগে। কে কি বলে না বলে সেই সবে কান দিত না সে। সেই মাঘ মাসে প্রথম দেখা ধ্রুব এবং খুশবুর, আর কথায় যেমন বলে ” এক মাঘে শীত যায় না ” আসলেই যায় নি, সেই মাঘ মাসের ভাল লাগাটা আজ অবধি থেকে গেছে।

ভাললাগাটা যদিও স্কুল জীবনের, কিন্তু এতটাই দৃঢ় ছিল যে এখনো তেমনই রয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথা হত ধ্রুব এবং খুশবুর। খুশবু জেনে গিয়েছিল যে তাকে ধ্রুবর ভাললাগে। কিন্তু ধ্রুব কখনই তাকে পাওয়ার ইচ্ছা পোষন করে নি কারন সে জানত যে খুশবু তার সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে চায় না। তাতে কোন সমস্যা ছিল না ধ্রুবর, সে শুধুমাত্র তার সাথে কথা বলতে পেরেই খুশি ছিল।

স্কুল জীবনের শেষ বছরে এসে ধ্রুব ঠিক করেছিল খুশবুর সাথে একবার মুখোমুখি কথা বলবে সে। একদম খোলামেলা, তার সব অনুভুতির কথা পরিস্কারভাবে বলে দেবে খুশবুকে। তাকে পাওয়ার আশায় না। যেন ধ্রুবর মনে আফসোস না থাকে যে কখনো খুশবুকে তার কথাটা জানাতে পারে নি। কিন্তু মুখোমুখি কথা বলার সাহসটা আসলে ছিল না ধ্রুবর, তাই সে শৈবালের তৎকালীন প্রেমিকার সাথে এই ব্যাপারে একটু আলোচনা করে, যে ছিল ধ্রুবর ডাকা বোন এবং খুশবুর বান্ধবী।

সে ধ্রুবকে উপদেশ দেয় যে জানুয়ারির ৭ তারিখ খুশবুর জন্মদিন, তাই সে যেন ঐদিন খুশবুকে জন্মদিনের উপহারের সাথে একটি চিঠি দিয়ে সব কথা লিখে দেয়। তাতে সাপও মরবে এবং লাঠিও ভাংবে না।

 

(চলবে…) ধ্রুব.PNG

 

About The Author
Prashanta Deb
Prashanta Deb
I am just a guy passionate about films and I am trying my best to develop my skills as an actor. Writing is one of my many hobbies.

You must log in to post a comment