বিজ্ঞান

মোশন সিকনেস এবং তার বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ

আমরা যারা বাসে বা ট্রেনে করে কোথাও ঘুরতে যাই তখন লক্ষ্য করলেই দেখি কিছু মানুষ কেন জানি শুধু শুধু জানালা দিয়ে বমি করছে ! বমি করার কোনো দৃশ্য মোটেও ভালো লাগার কথা নয় কারণ, এর মধ্যে কোনো সৌন্দর্য্য নেই | তবে, এর মধ্যে যে কোনো বৈজ্ঞানিক সৌন্দর্য্য থাকবেনা তা নিশ্চয় হতে পারেনা |

কাজেই, আজকে আমরা এই বমি করার পিছনের কারণ কিংবা এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনা করব | তবে, তার আগেই জানিয়ে রাখি এই ঘটনার জন্য দায়ী যেই জিনিস তার নাম হলো– “মোশন সিকনেস”|

 

মোশন সিকনেস কি ?

নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে গতি সংক্রান্ত যেই অসুস্থতা তাই মূলত এই মোশন সিকনেস | আমরা যখন গতিশীল কোনো কিছু করে যাই তখন এইটা হতে পারে | এছাড়া, গতিশীল কোনো ঘটনাও যদি ভিডিও হিসেবে দেখি তাহলেও এই ঘটনা ঘটতে পারে | এর সিম্পটম হিসেবে যা দেখা যায় তাহলো- বমিবমি ভাব, মাথাব্যথা, মাথাঘোরা, ফ্যাকাশে ত্বক, অত্যাধিক লালা নিঃসৃত হওয়া, ক্লান্তি এবং সর্বশেষ বমি |

 

মোশন সিকনেস কিভাবে হয় ?

এখন প্রশ্ন আসতে পারে মোশন সিকনেস কিভাবে হয় ? বা মূলত কিভাবে কাজ করে থাকে ?

এইটা নিয়ে আসলে এখনো অনেক গবেষণা হচ্ছে | বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয় তবে, তাই ২টা জনপ্রিয় হাইপোথিসিস রয়েছে | এর মধ্যে একটি হলো “Senses out of Harmony” এবং অন্যটার নাম হলো “Sway theory” | এখানে উল্লেখ্য যদিও এইখানে থিওরি শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে তবে, বিজ্ঞানে থিওরি শব্দটা আরো ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয় | (*What’s Theory ?)

এইখানে, ২টা হাইপোথিসিস নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে | প্রথমেই আসি “Senses out of Harmony” নিয়ে |

 

Senses out of Harmony

আমাদের শরীরে ৩টা ভিন্ন অংশ রয়েছে যারা মোশন ডিটেক্ট করতে পারে এবং সেই তথ্য মস্তিষ্কে নিয়ে যায় | যা নিম্নরূপ:-

  • চোখ (যেইটা মূলত মোশন দেখতে পারে |)
  • অন্তঃকর্ণ (এইটা মূলত মোশন সেন্স, গ্র্যাভিটি এবং এক্সেলেরেশন সেন্স করতে পারে |)
  • ত্বকের সেনসরি রিসেপ্টর (যারা মাসল মুভমেন্ট ছাড়াও স্পর্শ সেন্স করে থাকে |)

 

এখন যখনই এই ৩ সেন্সরের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয় তখনই মূলত, এই মোশন সিকনেস দেখা দেয় |¹

এখন প্রশ্ন আসতে পারে অসামঞ্জস্যতা বলতে এখানে কি বোঝানো হচ্ছে ? এর মানে হলো আমাদের এক সেন্সর এই মুহুর্তে যা অনুভব করবে তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে যদি অন্যান্য সেন্সরগুলো তা অনুভব করতে না পারে তাহলেই হবে | উদাহরণ হিসেবে বলা যায় – আমরা যখন বাসে বসে যাই তখন আমাদের অন্তঃকর্ণ অনুভব করে আমরা গতিশীল কিন্তু, আমাদের চোখ বলে আমরা স্থিতিশীল |(ধরে নিচ্ছি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে নেই বাসের ভিতরেই তাকিয়ে রয়েছি !) কাজেই, তখনই অসামঞ্জস্যতা তৈরী হয় আর তার ফলেই শুরু হয় মোশন সিকনেস | আবার, আমরা যখন কোনো মুভিতে গতিশীল কিছু দেখতে দেখি তখন আমাদের চোখ বলে আমরা গতিশীল কিন্তু, অপরপক্ষে অন্তঃকর্ণ বলে স্থির কাজেই, আবারও অসামঞ্জস্যতা এবং আবারও সেই মোশন সিকনেস ! এভাবে আমরা নিজেরাই চাইলে মোশন সিকনেস সংক্রান্ত অনেক কিছু আবিষ্কার করতে পারি | তবে,বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত এই ৩ সেন্সরের অসামঞ্জস্যতার কারণেই মূলত মোশন সিকনেস হতে পারে কিন্তু, ঠিক কেন এইটা হয় সেই বিষয় তারা এখনো নিশ্চিত নয় |

কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে  জেনেটিক্যাল কারণে মোশন সিকনেস দ্বারা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে | আরেকটা, উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো চোখ দিয়ে কোনো কিছু দেখা বা না দেখাটা মোশন সিকনেস এর জন্য অবশ্যকীয় কোনো বৈশিষ্ট নয় কারণ, অন্ধ মানুষদেরও মোশন সিকনেস হতে পারে ! ²

এবার আসি ২য় হাইপোথিসিস নিয়ে যার নাম হলো “Sway theory”

 

Sway theory

এর প্রবক্তা হলো “Thomas Stoffregen” তার দাবি অনুসারে এর সাথে অনঃকর্ণের কোনো যোগসূত্র নেই | তার মতে, এর সাথে মূলত শরীরের ন্যাচারাল মুভমেন্ট এবং ভারসাম্য রক্ষার কাজ জড়িত | প্রতিটা ব্যক্তিই সবসময়ই সবক্ষেত্রে সামন্যতম হলেও গতিশীল থাকে | একেবারে গতিহীন অবস্থায় থাকা কোনো ব্যক্তির পক্ষে একেবারেই অসম্ভব একটা ব্যাপার | আমরা যদিও জানিনা কিন্তু এইটা মূলত আমরা শরীরের ভারসাম্য রক্ষার জন্যই অবচেতনভাবে করে থাকি | যেমন– যখন সামনে আগাই তখন পায়ের আঙ্গুল দ্বারা মেঝেতে চাপ দেই | মূলত, এভাবেই ভারসাম্য রক্ষার কাজটি হয়ে থাকে |

এখন, কল্পনা করি আমরা একটা গতিশীল কোনো যানবাহনের মধ্যে রয়েছি এবং ঠিক একইভাবে আমরা আমাদের ভারসাম্য রক্ষার কাজটি ক্রমাগত চেষ্টা করে যাচ্ছি | যেহেতু তখন, কাজটা করা খুব একটা সহজ নয় তার ফলে দেখা দেয় অসামঞ্জস্য আর সবশেষে আবারও সেই মোশন সিকনেস | মূলত এই দাবিই Thomas Stoffregen নামক ভদ্রলোকটি করেছেন |

 

মোশন সিকনেস কাদের বেশি হয় ?

প্রশ্ন আসতে পারে মোশন সিকনেস কি সবার ক্ষেত্রেই একইরকম হয় ? নাকি মানুষ ভেদে ভিন্ন হতে পারে ? একটু আগেই জেনেটিক ফ্যাক্টরের কথা উল্লেখ করেছিলাম তার মানে অবশ্যই মানুষ ভেদে ভিন্ন হতে পারে |

এখন আমরা দেখি কাদের ক্ষেত্রে বা কিসব ক্ষেত্রে মোশন সিকনেস বেশি হতে পারে |

  • বয়স : মোশন সিকনেস ছোট বাচ্চাদের হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে | বিশেষ করে যাদের বয়স ২ থেকে ১২ বছরের মধ্যে | যখন তারা বড় হতে থাকে অনেকেই এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারে কিন্তু, সবাই নয় |
  • জেন্ডার  : গবেষণায় দেখা গিয়েছে মহিলাদের আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা পুরুষদের থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি |
  • জাতি :  এশিয়ানদের মধ্যে অন্য জাতি অপেক্ষা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশি |
  • লোকেশন : যারা গাড়ির পিছনে বসে তাদের ক্ষেত্রে মোশন সিকনেস দ্বারা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি | এছাড়াও, যারা ড্রাইভিং করে কিংবা সামনের সিটে বসে তাদের ক্ষেত্রে মোশন সিকনেস এ আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কম কারণ, তারা গাড়ির গতি স্বচক্ষে দেখতে পাবার ফলে তাদের সেন্সরগুলোর মধ্যে একটা সিনক্রনায়জেশন হয়ে থাকে |

 

মোশন সিকনেস থেকে বাচার উপায়

এত কিছু হয়ত জানলাম কিন্তু, মোশন সিকনেস থেকেই যদি বাচতে না পারি তাহলে হবে কিভাবে ? কাজেই, এখন জানব কিভাবে মোশন সিকনেস থেকে বাচা যেতে পারে |

 

  • নিজে ড্রাইভার হিসেবে গাড়ি চালানো কারণ, এতে গাড়ির গতি সম্পর্কে আগে থেকেই জানা যায় ফলে সিনক্রনায়জেশন সম্ভব হয় |
  • Avomine ট্যাবলেট খাওয়া যেতে পারে | এইটা ট্রাভেল সিকনেস এর জন্য খাওয়া হয় |
  • বই-পড়া কিংবা মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কাজ না করা |
  • ট্রিপের আগে হালকা কিছু খাওয়া তবে, ভারী কিছু খাওয়া যাবেনা এতে উল্টো ব্যাকফায়ার হবে |
  • ঝাল জাতীয় খাবার ,ফ্যাটি ফুড কিংবা এলকোহল আছে এরকম কিছু খাওয়া যাবেনা |
  • আরেকটা চমত্কার উপায় হলো চুইংগাম চাবানো | এখানে চুইংগামটা সরাসরি মোশন সিকনেসের বিরুদ্ধে কাজ করছে না যেইটা করছে তাহলো, শুধু চাবানোটা !

এছাড়াও, কিছু রিলাক্সেশন থেরাপি রয়েছে যা দিয়ে এই মোশন সিকনেস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায় |

আজকে, এই পর্যন্তই | কেউ যদি কোনো ভুল-ক্রুটি পেয়ে থাকেন তাহলে, অনুগ্রহ করে জানাবেন | এছাড়া লেখাটা কেমন লাগলো তাও কষ্ট করে জানালো খুশি | সবাইকে ধন্যবাদ আজকে, এখানেই বিদায় নিচ্ছি |

 


 

References :

  1. http://www.webmd.com/cold-and-flu/ear-infection/tc/motion-sickness-topic-overview#1
  2. http://www.medicalnewstoday.com/articles/176198.php

 

Sources:

  1. http://health.howstuffworks.com/mental-health/neurological-conditions/motion-sickness.htm
  2. https://umm.edu/Health/Medical-Reference-Guide/Complementary-and-Alternative-Medicine-Guide/Condition/Motion-sickness

 

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ভুল ছবি !

Jannatul Firdous

3D গ্লাস দিয়ে আমরা কিভাবে থ্রিডি দেখি ?

Jannatul Firdous

মাইক্রোবায়োলজি কিংবা অণুজীববিজ্ঞানের ইতিহাস

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy