Now Reading
বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – চতুর্থ পর্ব (কুয়াশা)



বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – চতুর্থ পর্ব (কুয়াশা)

কুয়াশা। নামের মাঝেই আছে অস্পষ্টতা আর অধরা থাকার প্রয়াস। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন বিজ্ঞানী, বাংলার সন্তান এই কুয়াশা। আগাগোড়া রহস্যের চাদরে ঢাকা এই চরিত্রের এবং একই নামের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ নিয়ে আমাদের আজকের আলোচনা।

বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে সেবা প্রকাশনী খুবই পরিচিত নাম। স্কুল কলেজ পড়ুয়া বই প্রেমী যে কোন পাঠকের পছন্দের তালিকায় সেবার নাম আজ থেকে নয় বহু বছর ধরেই উজ্জ্বল হয়ে আছে। কাজী আনোয়ার হোসেন এর লেখা কুয়াশা সিরিজের মাধ্যমেই যাত্রা শুরু এই প্রকাশনীর। তখন যদিও প্রকাশনীর নাম ছিল ‘সেগুন বাগান প্রকাশনী’ আর কুয়াশা সিরিজের লেখক হিসেবে ছাপা হত ‘বিদ্যুৎ মিত্র’। যা কাজী আনোয়ার হোসেনের ছদ্মনাম।

কাজী আনোয়ার হোসেন একজন অসাধারণ লেখক, সফল প্রকাশন এবং বাংলাদেশী রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের প্রচলন তার হাত ধরেই বলা যায়। শুধু কুয়াশার আঁধার ঘেরা চরিত্র বা কল্প কাহিনীই নয়, স্পাইধর্মী আর এক বিখ্যাত সিরিজ ‘মাসুদ রানা’ এর সৃষ্টিও তাঁর হাত ধরে। এছাড়াও লিখেছেন মৌলিক উপন্যাস আর অসাধারণ সব অনুবাদ।

কাজী আনোয়ার হোসেন লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে ঝুঁকেছিলেন সঙ্গীতের দিকে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই জানান, লেখক-প্রকাশক হওয়ার আগে তিনি রেডিও, টেলিভিশন এমনকি চলচিত্রের জন্যেও কণ্ঠ দিয়েছেন। এর থেকে বোঝা যায় জাদু কেবল তাঁর কলমের খোঁচায় নয়, বরং গলায় সুর খেলানোতেও সমান ভাবে রয়েছে। একবার লেখালেখি শুরুর পর আর গানের দিকে যান নি তিনি। একের পর এক সফল বই, সিরিজ আর উদীয়মান লেখক উপহার দিয়ে সকল শ্রেণীর পাঠক বিশেষ করে কিশোর পাঠকদের মন্ত্র মুগ্ধ করে রেখেছেন পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। সব লেখকেরই লেখায় একটা নিজস্ব ছাপ থাকে। কিছু শব্দের ব্যাবহার অথবা বিশেষ উপমার প্রয়োগ, কখনো বিবরণের ভঙ্গী এর সবই লেখকদের আলাদা করে। কাজীদার সেই লেখনির ধরন আজ সেবা প্রকাশনীর পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।

কুয়াশাকে অল্প কথায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। মূলত সে একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানী। তার মানে এই না সিরিজের সব বইয়ে শুধু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী বা নিছক কোন আবিষ্কারের আষাঢ়ে গল্প আছে। গুপ্তধনের সন্ধান থেকে কাছের মানুষদের রক্ষা করা, কখনো তার লড়াই ক্ষমতাধর কোন পাগল বিজ্ঞানীর সাথে অথবা কোন মুখোশধারি ভালমানুষের সত্যি পরিচয় ফাঁস করায়। সিরিজের প্রথম বইয়ের একেবারে শেষের দিকে কুয়াশার আসল পরিচয় জানতে পারা যায়। তার পুরো নাম মনসুর আলী। মাধ্যমিক পাশের পর নিছক শখের বসে আলট্রা সনিকের উপর পড়তে যেয়ে আস্তে আস্তে বিজ্ঞানের দিকে ঝুকে পরে সে। মাত্র সতেরো বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে সে পাড়ি জমায় সুদূর জার্মানিতে। সেখানে এক বিজ্ঞানীর সহায়তায় পনেরো বছর বিজ্ঞানের নানান শাখায় জ্ঞান লাভ করে সে। আবিষ্কার করে বিস্ময়কর সব যন্ত্র। এরপর দেশে ফিরে এসে সরকারি অনুদানের মাধ্যমে গবেষণা চালিয়ে যেতে চাইলেও, বাঁধা পরে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই বলে। এর ফলে কুয়াশার মনের ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে আর বিজ্ঞানের প্রতি বাড়তে থাকে মোহ। নিত্য-নতুন সব পরীক্ষা করতে আর মানব জাতিকে আরও উন্নত করার কৌশল আবিষ্কার করতে প্রয়োজন প্রচুর অর্থের। এই অর্থের যোগান পেতে তাই কুয়াশাকে দেখা যায় আইন ভঙ্গ করতে। কখনো তাকে দেখা যায় অসাধু ব্যাবসায়িদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে আবার কখনো আবার ব্যাংক থেকে লুঠ করে। হোক তার এই প্রয়াস বিজ্ঞানের জন্যে বা মানব কল্যানে, তবু সে অপরাধী, সবার মনে আতঙ্কের নাম আর ঘৃণার পাত্র। যাদের উপকার করে প্রানে বাঁচায় তারাও সমাজের ভয়ে স্বীকার করতে পারেনা তার অবদান। এরপরও থেমে নেই কুয়াশা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কুয়াশার অভিযানের সমগ্র পৃথিবী জুড়ে এমনকি পৃথিবীর বাইরেও রয়েছে তার রোমাঞ্চ অভিযানের কাহিনী।

কালো আলখাল্লা গায়ে জড়ানো বিশালদেহী মানুষ কুয়াশা। অসম্ভব শক্তিশালী আর সূক্ষ্ম বুদ্ধির অধিকারী এক চরিত্র। প্রয়োজনীয় সব রসদ তার কালো আলখাল্লার ভেতরে সদা প্রস্তুত থাকে। গম্ভীর কণ্ঠ, শীতল দৃষ্টি আর নির্ভুল থাকে তার সব পরিকল্পনা। কুয়াশার অবসরে পছন্দের কাজ, সরোদ (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) বাজানো। অনেক বইয়ে উল্লেখ রয়েছে সরোদ বাজানোয় কুয়াশার মত ভালো হাত মনে হয় আর কারো নেই। যে হাতে বাজে সরোদের মিষ্টি সুর এই হাতেই রক্ত ঝড়ে অপরাধীদের। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেন সত্যই কালো অন্ধকার আর কুয়াশায় ঘেরা এক চরিত্র সে।

কুয়াশার নিজে ছাড়াও সিরিজের বই গুলোতে আরও বেশ কিছু চরিত্র আছে যাদের ছাড়া এই সিরিজ অপূর্ণ। কাহিনীর মূল নায়ক চরিত্র বা যদি বলি ন্যায়ের পথের চরিত্র শহিদ খান। ক্ষুরধার বুদ্ধি, কোমল মনের অধিকারী, শিল্পের সমঝদার আর অবশ্যই রহস্য সমাধানে ঝাপিয়ে পরতে সদা প্রস্তুত। রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজের মূল গোয়েন্দা চরিত্র যেমন থাকে, কুয়াশা সিরিজে শহিদ খানকে সেই ধরনের চরিত্রেই দেখা যায়। শুরুর দিকের বই গুলোতে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা তরুণ হিসেবে তাকে দেখা গেলেও সময়ের সাথে সে হয়ে উঠে একটি বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থার কর্ণধার।

শহিদের সহকারী আর কুশার সিরিজের আর এক অন্যতম চরিত্র কামাল। শহিদের একেবারে ছোটবেলার বন্ধু, দুইজনের বাবাও একে অপরের বন্ধু ছিল। সেই থেকেই শহিদ আর কামাল যেন এক সুতোয় বাঁধা দুইজন। নানান মজাদার কাণ্ডের মাধ্যমে বইয়ের গতি ধরে রাখতে সফল চরিত্র এই কামাল।

আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দেখা যায় কুয়াশা সিরিজে। শহিদের স্ত্রী ‘মহুয়া’ তার মধ্যে অন্যতম। কুয়াশার একমাত্র ছোট বোন মহুয়া। বেশ কিছু কাহিনীতে প্রত্যক্ষ ভাবে এবং বাকি গুলোয় পরোক্ষ ভাবে দেখা যায় তাকে। ইনস্পেকটর সিম্পসন চরিত্রও বেশ গুরুত্বপূর্ণ এই সিরিজে। নিবেদিত প্রান নির্ভীক এক পুলিশ অফিসার এই সিম্পসন। কখনো কুয়াশাকে বন্দী করতে আবার কখনো দেশের স্বার্থে মানুষের স্বার্থে কুয়াশার সাথে কাঁধে কাধ মিলিয়ে কাজ করতে দেখা যায় তাকে।

এছাড়াও শহিদের বাসার কাজের লোক গফুর কে কোন কোন বইয়ে পার্শ্ব চরিত্র হিসেবে দেখা যায়, রাসেল নামের আর এক সহযোদ্ধাকে দেখা যায় দুর্গম সব রহস্যে ঝাঁপিয়ে পরতে, কুয়াশার অনুচর আর সিরিজের বিদূষক স্যানন ডি’কস্তা এর কথা বলার ধরন কেউ একবার পড়লে ভুলতে পারবে না। বিপদে সবসময় বসের সঙ্গে থাকা ডি’কস্তাও তাই সিরিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।

এই সিরিজের মোট বই সংখ্যা ৭৮টি। যার শেষ দুইটি কাজী আনোয়ার হোসেনের লেখা নয়। মজার বিষয় হচ্ছে এই সিরিজের বইগুলোর আলাদা কোন নাম নেই। শুধু মাত্র সংখ্যা দিয়ে সিরিজ আগানো হয়েছে।   ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় কুয়াশা সিরিজের বই। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেবা প্রকাশনীর অফিস জ্বালিয়ে দেয় পাক হানাদার বাহিনী। এর পরেও যুদ্ধের পর-পরই আবার সচল হয় সেবা প্রকাশনী সেই সাথে কুয়াশা সিরিজ। মুক্তিযুদ্ধের উপর ভিত্তি করে দুইটি বই আছে কুয়াশা সিরিজে।

বাংলায় লেখা একেবারে প্রথম দিকের রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ কুয়াশা। এখন থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে বন্ধ হয়ে যায় সিরিজটি। বইয়ের মুদ্রণও গত প্রায় বিশ বছর ধরে বন্ধ। মাসুদ রানা সিরিজের বই ‘সেই কুয়াশা’ এবং ‘বাউন্টি হান্টার’ এ বহু বছর পর দেখা গেছে কুয়াশাকে। মূলত এই সিরিজের অনেক কাহিনীতে হয়ত যুক্তি বা বাস্তবিকতার অভাব আছে। ষাটের দশকের প্রেক্ষিতে মূলত কিশোর উপন্যাস এই সিরিজটি বাংলা সাহিত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে না বলা গেলেও, অন্ধকার জগতের এক নিবেদিত প্রান বিজ্ঞানীর উপর লেখা এই সিরিজ কুয়াশা হয়ে নয়, উজ্জ্বল ভাবেই পাঠকের মনে বেঁচে থাকবে আজীবন।

 

About The Author
Abdullah-Al-Mahmood Showrav
Abdullah-Al-Mahmood Showrav
সাধারণ মানুষ, সাধারণেই বসবাস। লিখতে ভালবাসি, লিখতে শেখা হয়নি এখনো। অপেক্ষায় আছি একদিন ঠিক শিখে যাব।

You must log in to post a comment