Now Reading
কিছু আসমানীদের গল্প আর তাদের ভালবাসা



কিছু আসমানীদের গল্প আর তাদের ভালবাসা

প্রতিদিন অনেক মানুষকে হাসিয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিচ্ছে অনেক মানুষ । সেই সাথে ঠিক অপর প্রান্তে অনেক কে কান্নার রোলে ভাসিয়ে চলে যাচ্ছে না ফেরার দেশে । এইটাই দুনিয়ার খেলা । এই খেলা থেকে আমি আপনি কখনই বের হতে পারবো না । এইটাই আমাদের নিয়তি । আমরা প্রকৃতির কাছে খুব বেশি অসহায় । আমার অনেক কিছু আবিষ্কার করেছি । অনেক নাম না জানা রোগের ওষুধ বের করেছি । জয় করেছি চাঁদ সহ অনেক গ্রহ উপগ্রহ । কিন্তু মৃত্যু নামের বস্তুর কাছে আমরা সবাই পরাজিত

অনেক মানুষ বিদায় নিচ্ছে পৃথিবী থেকে । কারো বা স্বাভাবিক মৃত্যু আবার কারো বা অস্বাভাবিক মৃত্যু । আচ্ছা যেই সব মৃত্যুকে আমরা স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালিয়ে দেয় সেগুলো আদো কি স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল ? না ভাই আমি আন্তাজে পাগলের মতো প্রশ্ন করছি না । তাহলে চলুন আজ আমি আপনাদের একটি গল্প শুনাই

মা বাবার প্রথম সন্তান তাও আবার মেয়ে । বাবার খুশি রাখার জায়গা নেই । খুব শখ ছিল তার প্রথম সন্তান মেয়ে হবে আর হলো ও তাই । গ্রামের সবাইকে মেয়ে হবার খুশিতে দাওয়াত করে খাওয়ালো । রহিম সাহেব জসিমউদ্দিন এর আসমানী কবিতা পড়ার সময় আসমানী নামটা খুব পছন্দ হয়েছিল । আর সেখানে থেকে মেয়ের নাম রেখেছে আসমানী । সারা ঘরে আসমানী আসমানী বলে মাতিয়ে রাখতেন রহিম সাহেব । মেয়েও কম যায়না , বাবাকে ছাড়া যেন কিছুই বোঝে না ।

ধীরে ধীরে আসমানী কথা বলতে শিখলো । প্রথম যখন আলতো করে বাবা বলে উঠলো সেদিন তো রহিম সাহেব কান্না করে দিলেন খুশিতে । আসলে খুশি মনে হয় একেই বলে । আস্তে আস্তে আসমানী ও বড় হতে লাগলো আর সেই সাথে বাবা মেয়ের সম্পর্ক আরো বন্ধুত্ব পূর্ণ হয়ে উঠলো । আসমানী প্রথম যেদিন স্কুলে গিয়েছিলো সেদিন তার বাবা ক্লাস এর বাহিরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেয়েকে দেখছিলো । অসাধারণ মুহূর্ত ছিল রহিম সাহেবের কাছে । বাবা মেয়ের দুষ্টুমিতে সারা দিন ঘরটা মেতে থাকতো । ধীরে ধীরে মেয়ে বড় হতে লাগলো । স্কুল পার করে এখন আসমানী কলেজে । আসমানী বড় হয়ে গিয়েছে অনেক । কিন্তু রহিম সাহেব মনে হয় বড় হতে পারেনি । এখনো ঘুমোতে যাওয়ার আগে আসমানীর কপালে চুমু না দিলে মনে হয় রহিম সাহবে বেঁচে নেই । নিজের থেকেও বেশি ভালবাসেন তার মেয়ে কে । এই মেয়ের জন্য আর কোনো সন্তান নেন নি ।

প্রতিদিন রাতে রহিম সাহেব বারান্দায় দাঁড়িয়ে কান্না করে । এই কান্না কেউ দেখে না । তিনি ভাবেন মেয়ে বড় হয়ে গিয়েছে কিছুদিন পর মেয়ে কে বিয়ে দিতে হবে । আমি কি নিয়ে থাকবো । কাকে নিয়ে বাঁচবো । এই ভাবে অনেক রাত কাটিয়ে দেন না ঘুমিয়ে । আসলে মেয়েদের বাবারা বুঝি এমনি হয় ।

কিছু দিনের মধ্যে কলেজ পাশ করে আসমানী ভর্তি হয় ইউনিভার্সিটি তে । ধীরে ধীরে আসমানীর নতুন জগৎ তৈরী হয় । সেই জগতে ঠাই হয় তার বান্ধবী নীলা , ফারিয়া , রিমা সহ আরো অনেকে । আর তাদের মধ্যে সবচেয়ে কাছের বান্ধবী নীলা । সারাক্ষন নীলের সাথে সময় কাটায় আসমানী । কিছুদিন যাবার পর অন্তর নামের একটি ছেলের সাথে পরিচয় হয় আসমানীর । তারা একই ভার্সিটিতে পড়ে । অন্তর লেখা পড়ায় খুবই ভাল স্টুডেন্ট । আসমানীর সাথে পরিচয় হয় বন্ধুত্বের রেশ ধরে । কখন যেন আসমানীর ভাল লেগে যায় অন্তর কে । কিন্তু প্রকাশ করেনি । ধীরে ধীরে তাদের কথা বলার পরিমান বেড়ে যায় । ঠিক এই পরিবর্তনটা ধরে ফেলে তার বাবা । প্রথমে বুঝতে পারলেও মেয়ে কে কিছু বলেনি । প্রায় রাতে মেয়ের ঘর থেকে কথার শব্দ পেতেন রহিম সাহেব । এভাবে চলতে থাকে কিছু দিন । একদিন সাহস করে বলেই ফেলে অন্তর প্রথম দেখতে তোমাকে আমার খুব ভাল লাগে । এই প্রথম কোনো ছেলেকে আমার ভাল লেগেছে । আমি জানি তুমি হয়তো এইসব কথা শুনলে আমার সাথে আর বন্ধুত্ব রাখবে না কিন্তু আমি আর নিজেকে বোঝাতে পারছিলাম না । তাই আজ বলেই ফেললাম । সব সময় তো ছেলেরা আগে বলে আজ আমি না হয় তোমাকে বলে দিলাম আমি তোমার মনের অন্তরের অন্তর হতে চাই । এইসব কথা শুনে অন্তর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না । অন্তরও বলে দিলো আসমানী আমিও তোমার মনের আকাশে একমাত্র চাঁদ হতে চাই । যে শুধু আলো দিবে তোমায় আর আলো কিতো করে রাখবে তোমাকে ।

এই ভাবে তাদের ভালবাসা এগোতে থাকে । আর সেই সাথে পরিবর্তন হতে থাকে আসমানীর । একদিন সকালে তার বাবা জিজ্ঞেস করলো – আসমানী মা তুমি কি কাউকে পছন্দ করো
আসমানী এদিক সেদিক না ভাবে বলে ফেললো হ্যাঁ বাবা আমি একজন কে খুব ভালবাসি । এক কথা শুনে পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলো রহিম সাহেবের । সে কখনো বুঝে উঠতে পারেনি কখন যে তার মেয়ে বড় হয়ে গিয়েছে । তার বাবা হাসি মুখে বললো ছেলে কে কাল বলো যেন আমার সাথে দেখা করে । মেয়েও খুশি , আর মেয়ের খুশিতে বাবাও খুশি ।

ছেলে আসলো । ছেলে কে দেখে মেনেও নিলো তার বাবা । শুধু বলার মধ্যে বলেছিলো বাবা আমি আমার মেয়েকে খুব ভালবাসি । আমি কখনো ওকে কষ্ট দেয়নি , তুমি কখনো আমার মেয়েকে কষ্ট দিও না ।

আসমানীর একদিন খুব বমি করছিলো । হঠাৎ করে মেয়ের বমি দেখে তার বাবা খুব ভয় পেয়ে গেলো । কি হলো আমার মায়ের ।এই বলতে বলতে হসপিটালে নিয়ে গেলো আসমানী কে । ডাক্তার কে শুধু এই টুকু বললো যত টাকা লাগে আমি দিবো দরকার হলে আমার শরীরের সব রক্ত বিক্রি করে দিবো তবুও শুধু আমার মেয়েকে দেখেন । কারণ তখনো বমি বন্ধ হচ্ছিলো না আর তার সাথে কিছু টা রক্ত যাচ্ছিলো । ডাক্তার কিছু টেস্ট করে দেখলো তার ক্যান্সার ধরা পড়েছে ।

গল্প টা এখানে শেষ হলেও হতে পারতো আর ১০ টা সাধারণ গল্পের মতো কিন্তু আপনাদের গল্পের সাথে এই গল্পের কোনো মিল নেই ।

ডাক্তার যখন বললো রহিম সাহেব আপনার মেয়ের এত বড় রোগ হয়েছে কখনও টের পাননি ? সারা শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ছে তার বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম । ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে তার । এক কথা শুনে রহিম সাহেব মনে হয়ে আর দুনিয়াতে ছিল না । চার পাশের সব কিছু কেমন যেন তার কাছে ঘোলাটে লাগছে । ডাক্তার বললো আপনার মেয়ে আর বেশি দিন বাঁচবে না ।

রহিম সাহেব বুঝতেই পারলো না কবে কখন তার আসমানে এতো বড় মেঘ জমা হয়েছে । এক সময় আসমানীও বুঝে ফেললো তার রোগের কথা । অন্তর জেনে গেলো আসমানী আর বেশি দিন বাঁচবে না । যখন থেকে অন্তর জানলো আসমানী বাঁচবে না তখন থেকে কেমন যেন আসনামী কে এড়িয়ে চলছে অন্তর । কারণ প্রতিটা কেমোর সাথে চলে যাচ্ছে অনেক চুল । আসমানী আর আগের আসমানী নেই । আর তার বাবা? দিন রাত কান্না করছে আল্লাহর দরবারে ।

আসমানীর ফোন ধরছে না অন্তর । কল দিলে কেটে দেয় । এসএমএস দিলে উত্তর দেয় না । ঠিক বুঝতে উঠতে পারছিলো না আসলে অন্তরের কি হয়েছে । একদিন একলা হসপিটালে বসে মোবাইলের মধ্যে দেখতে পেলো তার বান্ধবী নীলা কে । মানে ফেসবুকে নীলা অন্তরের সাথে খুব অন্তরঙ্গ ভাবে ছবি দিয়েছে । এই দেখে আসমানীর আর বুঝতে বাকি রইলো না কেন অন্তর তার কল ধরছে না ।

ডাক্তার এর মধ্যে বলে দিয়েছে আসমানীর শরীরে কোনো কেমো কাজ করছে না । আর সব রক্ত বমির সাথে বের হয়ে যাচ্ছে । মনে হয়না আসমানী আর ২ মাসের বেশি বাঁচবে । মানে দুই মাস হতে এখনো ৪০ দিন বাকি । ক্যান্সার এর কষ্ট থেকেও আসমানী অন্তরের কষ্ট মেনে নিতে পারছে না । ক্যান্সারের কষ্ট তো সবাই দেখে কিন্তু আসমানীর মনের ভিতরে যেই ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে এইটা কে দেখে । কে দিবে সেই ক্যান্সার এর কেমো ? না আসমানী আর পেরে উঠছে না । ঠিক তার দুই দিনের মাথায় সবার মায়া ত্যাগ করে আসমানী বিদায় নিলো । বিদায় নিলো অন্ততেরে অন্তর থেকে , বিদায় নিলো তারা বাবার সেই চুমু খাওয়া থেকে

শুধু তার দেহটা পরে আছে । সবাই দেখলো আসমানী মারা গিয়ে ক্যান্সার । তার বাবা সেই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে হার্ট এটাক করলো আর সেই সাথে প্যরালাইস হয়ে গেলো ।

আচ্ছা এখন আপনার কাছে আবার সেই আগের প্রশ্নটি করছি এইটা কি স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল ?

এই রকম হাজারো মৃত্যু হচ্ছে আমাদের দেশে । শুধু আমাদের দেশে নয় এই রকম আসমানী মারা যাচ্ছে এই পৃথিবীতে । যা আমাদের চোখে খুবই স্বাভাবিক । মারা যাচ্ছে অনেক বাবাদের স্বপ্ন । আমরা যদি তাকে ভালবাসতে নাইবা পারি কি দরকার ভাই তার সাথে অভিনয় করার ? কেন তাকে মরে যাওয়ার আগে মৃত্যুর স্বাদ বুঝিয়ে দিচ্ছেন ? আপনি কি একবার ও ভেবেছেন তার এই মৃত্যুর সাথে কত রহিম সাহেবের মৃত্যু হচ্ছে । জানি আপনি বুঝেনি । কোনদিন বুঝবেন না , যেদিন আপনি এই রকম আরেকটি আসমানীর বাবা হবেন ঠিক সেদিন বুঝবেন ।

ভাল থাকুক আসমানীরা আর ভাল থাকুক তাদের বাবারা ।

লেখাটি ফেরদৌস সাগর ভাইকে উৎসর্গ করছি । কারণ উনার লেখা দেখে খুব অনুপ্রাণিত হই আমি ।
মাফ করবেন অনুমতি ছাড়াই উৎসর্গ করলাম

About The Author
Rohit Khan fzs
Rohit Khan fzs
বি.এস.সি করছি ইলেকট্রনিক এন্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং। লিখতে ভালবাসি। নতুন নতুন মানুষদের সাথে পরিচিত হতে পছন্দ করি।
1 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment