Now Reading
“ পেশাদারীত্ব যখন জনরোষের জন্য হুমকির মুখে ”



“ পেশাদারীত্ব যখন জনরোষের জন্য হুমকির মুখে ”

সাঁঝ সকালে আপনার বাসায় যে লোকটা নিয়ম করে খবরের কাগজ দিয়ে যায়,পাশাপাশি যে লোক সকালে দুধ দিয়ে যায় বেল বাজিয়ে,হাতে তাজা খবরের কাগজ আর চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে যখন দিন শুরু করেন,তখন কি আপনি একবারও ভেবে দেখেছেন ঐ লোকগুলোর পেশাদারীত্ব নিয়ে। ওদের কাজটা কতটা নিষ্ঠার সাথে করছে।

আমাদের রোজকার দিনলিপিতে সকাল হতে সন্ধ্যা পযর্ন্ত  সকল কাজ কোন না কোন লোকের  দ্বারা পরিচালিত হয়। এখানে একে অপরকে সাহায্যে করে নিজের কাজ যেমন করে যাচ্ছে,তেমনি একে অন্যের কাজের মধ্যে দিয়ে মূলত একটা সার্কেল তৈরি করে রেখেছে। যেখানে প্রতিনিয়ত আর্বতিত হয়ে আসছি।

রাষ্ট্র,সমাজ,পরিবার এমনকি নিজ ব্যক্তিস্বত্তাও কোন না কোনভাবে অন্য কারো পেশাদারীত্বের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আসছে। মহান মে দিবসের যে গুরুত্ব বা তাৎপর্য এখনো আমরা উপলব্ধি করতে পারি নি। এই মে দিবসের যে সংগ্রাম বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তা বিশ্বব্যাপী খুবই গুরুত্ববহ। এবারের মে দিবসে আমার সৌভাগ্য হয়েছে এই দিবসের তাৎপর্য সম্পর্কে শোনার। রাস্তার পাশে এক রিকশাচালক কোনভাবে রহস্য উন্মোচন করতে পারছে না মে দিবসের দিন কেন অফিস-আদালত বন্ধ ?

পাশে আরেক জন লোক তাকে খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিল এই বলে– শ্রমিকের উপর আজকের দিনে মালিকরা হামলা করেছিল যার কারণে শ্রমিক মারা যায়। তাই ঐ সব শ্রমিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আজকের অর্থাৎ মে দিবসের বন্ধ রাখা হয়েছে। যার কারণে সারা বিশ্বের শ্রমিকদের আজকের দিনে ছুটি।

ঐ দুজনের কথোপকথনে একটা জিনিস পরিস্কার হল কাউকে যদি সঠিকভাবে সম্মানটা দেয়া হয় তা আসলে সর্বজনস্বীকৃত হয়। এই বিষয়ে তারা দুজনে খুব খুশি ছিল কেননা এখানে শ্রমজীবিদের একটা মর্যাদা যে নিহিত রয়েছে। নুন্যতম  এই বিবরণ শুনে রিকশাচালক বেশ সন্তুষ্ট হল।আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থায় আমাদেরকে চেষ্টা করতে হবে প্রত্যেক পেশার মানুষকে সম্মান করতে যাতে করে তার কাছ থেকে সেরাটুকু বেরিয়ে আসে।

সমসাময়িক কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে আমরা অবলোকন করতে পারি পেশাদারীত্বের খাতিরে চিকিৎসক সহ নানান পেশার লোককে আমরা অবলীলায় হেনস্তা করছি।

রোগবালাইয়ের একমাত্র উপশম হলো চিকিৎসালয় গুলো এখানে আপনি একবার দ্বারস্থ হওযার মানে এই নয় যে সমস্ত দায়বদ্ধতা চিকিৎসকের উপর ঘাড়ে পড়বে। আপনি আমি যেই ভিক্টিম হয় না কেন যারা আমাদের সেবা দেয়ার মহান ব্রত নিয়ে বসে আছে তাদের নিষ্ঠা বা ডেডিকেশনের জায়গায় আপনি নিজেকে নিয়ে চিন্তা করলে নিশ্চিত ঘাবড়ে যাবেন। কেবলমাত্র পড়াশোনা করে যে ডাক্তার হওয়া যায় না তা আপনি ইন্টার্নী চিকিৎসকদের পরিশ্রম আর নিষ্ঠার বিষয়ে খেয়াল করলে অবশ্য বুঝবেন। এখানে নিজেকে একজন চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তুলতে কতখানি ছাড় দিতে হয় একজন মেডিকেল পড়ুয়ার সাথে কথা বললে বুঝতে পারবেন। চিকিৎসক বা চিকিৎসা পেশা নিয়ে বলছি এই কারণে বর্তমানে এই বিষয়টা একটা আলোচ্য ইস্যু কেননা কিছুদিন পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যুর পর গুজবে কান দিয়ে যে হামলা চালানো হয় তাতে করে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসকদের মনে একটা বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কেননা পরবর্তীতে এই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোন শিক্ষার্থীকে চিকিৎসা দেয়ার ক্ষেত্রে তারা উদাসীন হতে পারে নতুবা এড়িয়ে যেতে পারে। অনাকাঙ্খিত কিছু এড়ানোর জন্য নিরাপদ দুরত্বে থাকাটা শ্রেয় মনে করতে পারে।এক্ষেত্রে আমরাই বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হব।তাই ক্রোধের বশে অজান্তে নিজের ক্ষতি করে ফেলছি না তো ? এটা এখন বিবেচ্য বিষয় বৈকি ?

গ্রামাঞ্চলে বা মফস্বল শহরগুলোতে চিকিৎসকের সাথে রোগী বা আত্মীয়ের একটা শ্রদ্ধাস্পদ সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়।যেহেতু চিকিৎসার সাথে বাঁচা মরার একটা সম্পর্ক আছে তাই এখানটায়  আমাদের আবেগ আর অনুভূতি বেশ সোচ্চার হই।

আমার একটা অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করি একবার মাঝবয়সী ভদ্র মহিলা সন্তানসম্ভাবা হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।ওনাকে যখন নির্দিষ্ট সময়ে লেবার রুমে নেয়া হল উনি ওখানকার পরিবেশ দেখে খুব সম্ভবত স্ট্রোক করে বসেন।এটা স্বাভাবিক যেহেতু এর আগে কখনো অস্ত্রোপচারের সম্মুখীন হয় নি। অপরিকল্পিত গর্ভধারণ,শারীরিক বা মানসিক দুর্বলতার মতো অনেক কারণ থাকতে পারে যা কিনা একজন মহিলা ঐ সময়ে স্ট্রোক করতে পারেন। এই কেসে ডাক্তারের সমস্যাটা কি বলুন তো ?

এমন অনেক নজির আছে যেখানে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মা মারা যাওয়ায় নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়াতে এগিয়ে এসেছেন চিকিৎসক বা নার্স। এই ঘটনায় তো আপনি বলতে পারবেন না তাঁরা তাদের পেশাদারীত্বের জায়গায় কোন কমতি রেখেছে ।তাই সবসময় উভয় দিক থেকে বিচার করা বাঞ্চনীয়।

কিচুদিন আগে এক হাসপাতালে ইন্টার্নী ডাক্তারের প্রতি রোগীর আত্মীয় কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করায় সহকর্মী প্রতিবাদ করে। এই ঘটনায় রোগী ও স্থানীয় ক্ষমতাসীন জনগণ ক্ষমতার জেরে বিষয়টা প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এই যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে আমাদের এই ধরনের কর্মকান্ড প্রমাণ করে আমাদের নৈতিকতা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। এই মানসিক বিকৃতির গন্ডি থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। পরবর্তীতে অনাকঙ্খিত হলেও পত্রিকার মারফতে আমরা জানতে পারি শাস্তির খড়গ ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ঘাড়ে পড়েছিল।

সব ডাক্তার কমিশন যেমন নেয় না,তেমনি সব শিক্ষকও আবার প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত না। অপরদিকে প্রশাসনের সকল কর্মচারী বা কর্মকর্তা যদি অসাধু হতো আপনার আমার অস্তিত্ব থাকত না।

তবে এই সকল ক্ষেত্রে আমরা অনেকটা অযাচিতভাবে তির্যক মন্তব্য করে বসি। এক কথায় বলি সবাই খারাপ আসলেই কি সবাই খারাপ ?

আপনি নিজেকে প্রতিদিন রাতে একাকী শহরে ঘোরাফেরা করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে পারবেন ? জানি হয়তো অনেকে পারবেন কিন্তু কষ্ট হবে। এই কাজটা অনেকটা অনায়াসে করে যায় আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা।

এইক্ষেত্রে পান থেকে চুর খসলে আমরা বলে বসি ওরা ভাল না।

প্রতিটি শ্রমজীবি বা পেশাজীবি তার পেশার প্রতি অবিচল বাইরে থেকে যে কেউ তার প্রতি কটু কথা বললে তার আস্থায় এতটুকুও ব্যাঘাত ঘটে না। তারা হয়তো সমায়িক কষ্ট পাই কিন্তু আবার ঘুরে দাঁড়ায়।

ধরুন…..

আপনি কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গেলেন রির্পোট আনতে, আপনার সাথে আরো ৯৯ জন আছে।আপনারা সবাই রির্পোট নিবেন কিন্তু দিবে একজন। এই সময় যদি ৬০ জন লোক চেঁচামেচি করে তবে যে লোকটা আপনাদের সেবার জন্য বসছে উনি অবশ্যই বিরক্ত হবেন। ফলে কোন কিছু উল্টাপাল্টা হলে ওনার যেমন কষ্ট আপনারও বাড়তি ভোগান্তি।

আমরা হাসপাতালে গেলে আবেগের বশবর্তী হয়ে যা মন চাই তাই করতে চাই। একবার ভাবুন আপনার মতো সবাই যদি মনের খায়েশ মতো যা ইচ্ছা তা করতে চাই তবে হাসপাতালের পরিবেশটা কেমন হবে?

এইক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা আসলে দিনের শেষে ঐ লোকটা আপনার জন্য খারাপ যে কিনা ওখানে শৃঙ্খলা রক্ষার দাযিত্বে আছে। আপনি আপনার ভালোর চিন্তা করছেন। লোকটাকে তার পেশাদারীত্বের শতভাগ দেয়ার চিন্তা করতে হচ্ছে হোক সেটা ওয়াচম্যানের কাজ।

এই যে আবেগের বশবর্তী হয়ে নানান অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে তাতে দোষত্রুটি বিচারের জন্য কোন নিয়ম তো নেই।এইক্ষেত্রে আইন বা প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সবসময় জনসমর্থন বা শক্তিমত্তার বিষয়টা নিয়ে ধাবিত হই।

তাছাড়া দিনশেষে পেশাদারীত্বের দোষ-ত্রুটি বা একটা ভিক্টিমের পরিণতি যা হওয়ার তা হলেও একটা অপরাধপ্রবণতার চর্চা নিয়ত চর্চাধীন রয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী হওয়ায় বিষয়টা নিয়ে মিডিয়ায় বেশ তোলপাড় হয়েছে। এইক্ষেত্রে প্রশাসনের তো কোন সুনির্দিষ্ট হস্তক্ষেপের সংস্কৃতি আমাদের দেশে হলো না। এ ঘটনাগুলো ভাসমান মেঘের মতো হারিয়ে যায়।

এখন সময় হয়েছে সুনির্দিষ্ট তত্ত্বাবধানের আলোকে এই বিষয় বা ঘটনার প্রেক্ষিতে একটা যুগোপযোগী আইন প্রণয়ণ ও তার বাস্তবায়ন করা । এতে করে প্রশাসনসহ সর্বস্তরের লোকের টনক নড়বে যাতে করে বারবার কোন অপ্রীতিকর ঘটনা পেশাদার লোকগুলোর মাঝে কোন উৎকন্ঠা যেমন তৈরি করবে না তেমনি জবাবদিহিতার একটা সংস্কৃতি তৈরি হবে। এতে উভয়পক্ষ সোচ্চার হবে।

আমরা দিনদিন আত্মস্বার্থবাদী হয়ে যাচ্ছি। সবসময়ই নিজের বিষয়টাকে প্রাধান্য দিয়ে ‍আসছি। এটা অনুধাবনের বিষয় আপনি যখন অনুধাবন করবেন পরে ধীরে ধীরে চর্চাও করবেন।

একটা বিষয় শেয়ার করি প্রতিদিন নিজের কাজে শহরে লেগুনায় করে যাতায়াত করি। এখনকার বেশির ভাগ লেগুনাতে হেলপার থাকে না,যাত্রীদের ভাড়া নেয়ার কাজটা ড্রাইভার করে।এই সময়টুকুতে যাত্রীরা চিৎকার চেঁচামেছি করে তাকে শাসায়। ভাড়া আদায়ের সময়টুকুন দিতে রাজি নয়। সারাদিনের পরিশ্রমের সকল উপযোগিতা যেমন ভাল-মন্দ ড্রাইভারকে ভোগ করতে হবে। এটা আমাদের আত্মস্বার্থবাদী হওয়ার সামান্য নমুনামাত্র।

আসুন আমরা সকাল পেশাজীবির প্রতি সম্মানটুকু দেয়ার চেষ্টা করি।যেখানটায় হয়তো ভাল কিছুর শুরু হবে।একটা সময় সেবাপ্রদানকারী আর গ্রহণকারীর মধ্যে দুরত্বটুকু কমে যাবে।এমনই আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারি।

About The Author
Rajib Rudra
3 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment