• Home
  • সাহিত্য কথা
  • বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – পঞ্চম পর্ব (মাসুদ রানা)
সাহিত্য কথা

বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – পঞ্চম পর্ব (মাসুদ রানা)

মাসুদ রানা। কেবল একটি নাম নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে কম বেশি এ দেশের বহু বইপ্রেমী পাঠকের কৈশোরের স্মৃতি। কোড নেম এমআর নাইন এর পেছনের মানুষটি অগণিত পাঠকের মনে জায়গা করে আছে পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে। সময়ের স্রোতে হাজারো ব্যাস্ততায় বহু পাঠক হারিয়ে গেলেও, সেই জায়গা দখল করে চলেছে নতুনেরা। রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ বইয়ের এই পর্বের আলোচনা মাসুদ রানা সিরিজ নিয়ে।

কাজী আনোয়ার হোসেন, সেবা প্রেমী সবাই তাকে কাজীদা বলেই চেনে। তাঁর লেখা স্পাইধর্মী সিরিজ এই মাসুদ রানা। একটি একটি করে রহস্য সমাধান করে আর প্রতিকূল অভিযান শেষ করে একান্নটি বছর পার করেছে মাসুদ রানা। কুয়াশা সিরিজের মাধ্যমে লেখালেখির শুরু করলেও কিছুদিন পরই আরও নতুন কিছু আরও ভালো কিছু করার তাগিদে কাজী আনোয়ার হোসেন লিখতে শুরু করেন মাসুদ রানা সিরিজের বই। লেখকের বিষয় নতুন করে বিবরণে যাব না, কারন আগের পর্বে তাঁকে নিয়ে কিছু বিবরণ লিখেছি। যদিও তাঁর মত গুণী লেখক কে নিয়ে যতই লিখি তা কমই হবে।

মূলত স্পাই থ্রিলারধর্মী এই সিরিজে রহস্যের মারপ্যাঁচ যেমন আছে তেমনি আছে চোখ ঝলসানো সব গাড়ি, অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের বিবরণ। দেশের বাইরের বিভিন্ন দৃশ্যের বিবরণ এতোটাই সূক্ষ্ম ভাবে দেয়া থাকে যে মনে হয় চোখের সামনেই দেখছি অজানা কত দৃশ্যকে। রানা সিরিজটি মূলত শুরু করা হয়েছিল প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্যে রহস্য সিরিজ হিসেবে। শুরুর দিকের বই গুলোতে তাই ভরপুর মারামারির সাথে ছিল চোখ ধাঁধানো নায়িকাদের বিবরণ আর ভালোবাসার পরশ। এ নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি করে তৎকালীন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকাশনীরা। অভিযোগ ওঠে অত্যাধিক যৌনতার বিবরণ নাকি দেয়া হচ্ছে এই সব বইয়ে। এ নিয়ে রেষারেষি এক সময় আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং রানা সিরিজের তৃতীয় বই ‘স্বর্ণমৃগ’ সরকার নিষিদ্ধ করে। কিন্তু মাসুদ রানার সৃষ্টিকারী লেখক নিজেও কি রানা থেকে কম যান? তিনিও নিজের উপর আস্থা রেখে লড়ে যান সেই কেস। এ যেন তাঁর গল্পের কোন দৃশ্য। কেসে জিতে বইয়ের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলিয়ে নেন এক সময়। সময়ের সাথে তাল রেখে বইয়ের লেখনিতে পরিবর্তন আসে। যে সময় মাসুদ রানার আবির্ভাব সে সময় টেলিভিশন আর টেলিফোন ছিল দুষ্প্রাপ্য বিষয়, কিন্তু পাঠকের চিন্তা ধারার সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়ে মাসুদ রানাও প্রবেশ করেছে স্মার্ট ফোন আর দ্রুত গতির ইন্টারনেটের যুগে। এখনকার বইগুলোতে হয়তো প্রথম বই গুলোর মত আবেগঘন রোমান্স দেখা যায়না, কিন্তু তাই বলে রূপবতী নায়িকাদের ঝলক কিনবা জীবন বাজী রেখে এগিয়ে যাওয়ার কাহিনীর কমতি নেই।

মাসুদ রানা সিরিজ লেখার পেছনে ‘মাহবুব আমিন’ নামের এক বন্ধুর অবদানের কথা লেখক উল্লেখ করেছেন তাঁর ২০১১ সালের সাক্ষাৎকারে। তিনি কাজী আনোয়ার হোসেন কে জেমস বন্ড সিরিজের ‘ডক্টর নো’ বইটি কিনে দিয়ে বলেছিলেন পড়ে দেখতে দেশের বাইরের লেখার ধরন কতটুকু এগিয়ে গেছে। ১৯৯৪ সালের এক সাক্ষাৎকারে কাজীদা উল্লেখ করেন, এই সিরিজ লেখা শুরু করতে তিনি জেমস বন্ড থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। মাসুদ রানা নামটি এসেছে তাঁর এক গীতিকার বন্ধু ‘মাসুদ করিমের’ নামের প্রথম অংশ এবং ভারতের প্রখ্যাত রাজপুত বংশের রাজা ‘রানা প্রতাপ সিং’ এর নাম থেকে। একে একে বাকি চরিতগুলোও সৃষ্টি করে ফেলেন কাজীদা, লিখে ফেলেন সিরিজের প্রথম বই ‘ধ্বংস পাহাড়’।

পুরো নাম মাসুদ রানা। ১৯৩৬ সালের ৯ এপ্রিল জন্ম। বাবার মৃত্যুর পরে চাচা আর ফুপুর কাছে লন্ডনে বড় হয় সে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানের উপর লেখাপড়া শেষ করে, ব্রিটেনেই আর্মি ট্রেনিং নেয় সে। এর পর বাংলাদেশ (১৯৬৬ সালে প্রকাশিত বইয়ে পাকিস্তান সেনা বাহিনী ছিল) সেনা বাহিনীতে যোগ দেয় ১৯৫৬ সালে। এক বছরের মাথায় আর্মি ইন্টেলিজেন্সে নিয়ে নেওয়া হয় তাকে। ১৯৬১ সালে মেজর পদে থাকা কালীন, বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের(বিসিআই)অনুরধে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে যোগ দেয় সে। বিশ্বের মোটামুটি সব দেশেই কাজ করে খ্যাতি অর্জন করেছে রানা। ওনেক দেশে বিসিআই এর ছদ্মনামের অফিস ‘রানা এজেন্সি’ এর কর্ণধার সে। কম্পনার রানা এক এক জনের দেখতে এক এক রকম। বইয়ের বিবরণ অনুযায়ী লম্বায় সে পাঁচ ফিট এগারো, কালো চুল আর চোখ। বয়স ত্রিশের কোঠা কোনদিন পাড় হয়নি তার। চেহারায় দৃঢ়টা, আত্মবিশ্বাস কোনটার কমতি নেই।  অভিজ্ঞ একজন সৈনিক, দক্ষ অধিনায়ক, অসাধারণ প্রেমিক আর কোমল মনের একজন মানুষ মাসুদ রানা।

১৯৬৬ সালে যাত্রা শুরু করা এই সিরিজে এখন পর্যন্ত বই বের হয়েছে ৪৫১ টি। ২০১৬ সালে ‘দুরন্ত কৈশোর’ বইয়ের মাধ্যমে ৫০ বছর পূর্ণ করে সিরিজটি। কখনো এক খণ্ডে কখনো আবার দুই বা তিন খন্ডেও শেষ হয় রানার শ্বাসরুদ্ধকর সব অভিযান। মাসুদ রানা একজন নিবেদিত প্রান দেশপ্রেমী। দেশের জন্যে মৃত্যুর মুখে কত শত বার পরেছে তা গুনে শেষ করা যাবে না। দেশের জন্যে কাজ করা ছাড়াও বিপদগ্রস্থ বন্ধুদের উদ্ধার করতে, শত্রু দেশের আক্রমন নস্যাৎ করে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রকে সাহায্য করতে অথবা বিনা কারনে তার উপর চাপিয়ে দেয়া অন্যায়ের বোঝা নামিয়ে শত্রুকে শেষ করতে দেখা যায় তাকে। আন্তর্জাতিক রহস্য আর জটিল সব সমস্যার সমাধানেও মাসুদ রানাকে দেখা যায় সমান পারদর্শী হিসেবে। কেবল যে পিছু ধাওয়া আর সম্মুখযুদ্ধ রানার বইগুলোর মূল কাহিনী তা কিন্তু নয়, হাজার বছরের পুরনো গুপ্তধন অথবা ছিনতাই হয়ে যাওয়া সম্পদ উদ্ধারেও রানার জুড়ি মেলা ভার।

রানা সিরিজের বই গুলোতে নিত্য নতুন অনেক চরিত্রের আনাগোনা থাকলেও কিছু চরিত্র সবসময় অমলিন। তাদের একজন মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) রাহাত খান। বিসিআই চিফ, রাশভারী ধরনের মানুষ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাকে দেখা যায় নিজের কেবিনে এক গাদা ফাইলের মাঝে মুখ গুজে মিষ্টি গন্ধের তামাক ভরা পাইপ খেতে। কাহিনীর ধারা বিবরণীতে সাধারণত শুরুর দিকে দেখা যায় তাঁকে। রানাকে স্নেহ করেন নিজের ছেলের মত করেই। কিন্তু কাজের বেলায় কাউকেই ছাড় দেন না। তাঁর নিজস্ব অভিযানের কাহিনী নিয়ে সেবার একটি সিরিজ ছিল যার নাম ‘মেজর রাহাত সিরিজ’। সময়ের সাথে সেই সিরিজ বন্ধ হয়ে গেলেও রানা সিরিজের অন্যতম চরিত্র হয়ে আছেন এবং থাকবেন দেশের জন্য নিবেদিত প্রান এই বিসিআই অধিনায়ক।

এর পর নাম চলে আসে রানার সবচেয়ে কাছের বন্ধু সোহেল আহমেদর। অক্সফোর্ডে লেখা পড়া একই সাথে তখন থেকেই অন্তরঙ্গ বন্ধু তারা। নিজেদের মাঝে খুনসুটি আর হাতাহাতি চললেও একে অপরের জন্য জীবন বাজি রাখতে কেউ পেছপা হয় না। এক হাত কাটা যাবার দরুন তাকে সব মিশনে সাথে দেখা যায় না। বিসিআই এর অফিশিয়াল কাজে অথবা পর্দার আড়ালে থেকে রানাকে সাহায্য করতে দেখা যায় তাকে।

প্রেম পিয়াসী রানার সাথে প্রেমে মাতোয়ারা হতে দেখা যায় অনেক নায়িকাকেই। কিন্তু রানার সাথে ঘর বাঁধতে পারেনি কেউ আজ পর্যন্ত। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ বইয়ে রেবেকা সউল কে বিয়ে করবে বলে ঠিক করে রানা, কিন্তু এর আগেই খুন হয়ে যায় সে। এ ছাড়া বিসিআই এ রানার সহকর্মী এবং কাছের মানুষ হিসেবে সোহানা কে দেখা যায়। এক সাথে বহু অভিযানে অংশ নেয়া দুইজনের মধ্যে একটা অলিখিত ভালবাসার ছাপ আছে তা রানা ভক্ত সব পাঠকেরই জানা।

রানার বইয়ের মিছিলে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আছে যাদের কথা উল্লেখ না করলেই নয়, তারা হচ্ছে, মমি মুরল্যান্ড, ভিন্সেন্ট গোগল, গিল্টি মিয়া, রাঙার মা, সলিল সেন, নিশাত সহ আরও অনেকে। বিখ্যাত খল চরিতেরও অভাব নেই রানা সিরিজে। রানাকে বহু ভাবে ভোগানোর পরেও শেষ পর্যন্ত জিততে না পারলেও বার বার আরও ভয়ানক চাল নিয়ে ফিরে আশা সেই চরিত্রেদের মাঝে কবির চৌধুরী, খায়রুল কবির (কবির চৌধুরীর ছেলে) উ সেন, গুস্তাফ, জ্যাক লেমন সহ অনেকে উল্লেখযোগ্য।

পেপারব্যাকের বাদামী পৃষ্ঠার বাইরেও রানার পা পড়েছে চলচিত্রে। সাম্প্রতিক কালে উদ্ভত সব চলচিত্রে রানার নামের ঘোষণা আসলেও এগুলোর বাস্তবতা নিয়ে যতেষ্ট সন্দেহ আছে। ১৯৭৪ সালে মাসুদ রানা প্রথমবারের মত চলচিত্রে আসে। সিরিজের এগারোতম বই ‘বিস্মরণ’ এর উপর এই চলচিত্র নির্মাণ করেন সেই সময়কার আলোচিত নায়ক সোহেল রানা। মাসুদ রানার ভূমিকায় অভিনয়ও করেন তিনি সেই চলচিত্রে। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের প্রথম প্যাকেজ নাটক ‘প্রাচীর পেরিয়ে’, রানা সিরিজের ‘পিশাচ দ্বীপ’ বইয়ের কাহিনী অবলবনে তৈরি করা হয়।

অনেকটা সময় পেরিয়ে আজও নিজের অবস্থান শক্ত করে ধরে রেখেছে মাসুদ রানা আর এই সিরিজের বই। পাঠকের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে চলতে থাকা এই সিরিজ নিজেই একটি বিস্ময়কর গল্প যেন। অনেক বই বিদেশী গল্পের অবলম্বনে লেখা হলেও একটি চরিত্রকে সব বইয়ে ফুটিয়ে তোলার যে ক্ষমত্‌ সেটি কাজী আনোয়ার হোসেন দেখিয়েছেন চমৎকার ভাবে। বেঁচে থাকুক মাসুদ রানা, বেঁচে থাকুক আমাদের প্রিয় কাজীদা।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – সপ্তম পর্ব (তিন গোয়েন্দা)

Abdullah-Al-Mahmood Showrav

মমতার গহীনে

Sajib Sikder

আজও কেন এমন হয় ৭–পর্ব [শেষ পর্ব ]

Salina Zannat

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: