Now Reading
বাংলাদেশ ক্রিকেট – এক আবেগের নাম



বাংলাদেশ ক্রিকেট – এক আবেগের নাম

ক্রিকেট খেলা টা বাংলাদেশের মানুষের জীবনের একটা অংশ। এই দেশের মানুষ গুলো যেমন ক্রিকেট প্রেমী পৃথিবীতে আর কোথাও এমন ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসা দেখা যায় না। বিশেষ করে বাংলাদেশের গ্রাম অঞ্চল গুলোতে বেশি দেখা যায়। খেলা থাকলেই খিচুড়ি আর গরুর মাংশ রান্না হবেই। গ্রামের বাজারে চায়ের দোকানে বাংলার বাঘের হুংকার শুনতে পাওয়া যায়। দেশের খেলা শুরু হয়েছে কিনা। ভ্যানওয়ালা, নাপিত, চা ওয়ালা, এলাকার মুরুব্বি সবাই আসর বেধে খেলা দেখতে বসে একটা দোকানে। কেও খারাপ খেললে দোকনে গালির ছড়াছড়ি লেগে যায়। যেন তারা বড় ধরণের কোন পাপ করে ফেলেছে। আবার ছক্কা হাঁকানোর পর তাকেই মাথায় করে রাখে তারা। অনেকের কাছে বার বার  ফোন আসে, খেলার স্কোর কত হয়েছে তা জানার জন্য। খেলা দেখতে পারছে না, কিন্তু টান ঠিকই আছে। ম্যাচ যদি হেরে যায় শেষে ওই খিচুড়ি আর গরুর মাংশ কিন্তু ঠিকই খাওয়া হয় শুধু না খাওয়ার মন নিয়ে। ম্যাচ জিতলে তো কথাই নাই। বাড়ি থেকে সবাই বের হয়ে আসে রাতেই, আনন্দের বন্যা বয়ে যায় তখন সেই এলাকায়। জীবনটা ঠিক এমনই চলে আমাদের। আমরা খেলা দেখার সময় বাছ বিচার করিনা যে পাশে কে বসে আছে। তর্কে ডুবে থাকি। নিজেরাই যেন কোচ হয়ে যাই টেলিভিশন এর সামনে বসে। খারাপ খেললে গালি দিই, আবার তাদেরই মাথায় করে রাখি। অন্যান্য দেশগুলো খেলা নিয়ে এতটাও আবেগী না। ভারত অনেকটা আবেগী আছে। তারা ক্রিকেট কে পূজা করে। কিন্তু জুয়া আর ব্যাবসা তাদের ভালবাসা কে ছাড়িয়ে গেছে। আপনি হয়তো বলবেন আমি অন্য দেশের খেলা নিয়ে কটু কথা বলছি। না আমার অন্যদের নিয়ে মাথা ব্যাথা নাই। কিন্তু আমি আপনি , আমরা সবাই জানি যে আমরা কতটা আবেগপ্রবণ জাতি। যেদিন এশিয়া কাপ ফাইনালে আমরা পাকিস্থান এর কাছে হেরে গেলাম মাত্র ২ রানের ব্যাবধানে, সেদিন আমি সহ আরো লাখ লাখ মানুষ চোখের পানি ফেলেছিল। ফেলতেই হবে, ক্রিকেট শুধু খেলা না, এতে মিশে আছে প্রতিটা বাঙালির প্রাণ। এই তো বেশিদিন হয়নি, যেদিন আমরা ক্রিকেট বিশ্বে একটা হাস্যকর দল হিসেবে পরিচিত ছিলাম। বড় বড় পরাশক্তির দলগুলো আমাদের আউট অফ লিষ্ট হিসেবে ধরতো। অনেক নামকরা ক্রিকেটার রা আমাদের টেষ্ট স্ট্যাটাস বাদ দিতেও বলেছিল। কিন্তু আমার গ্রামের সাত্তার চাচা বলেছিল, তোরা এত উত্তেজিত হইস না, একদিন আমরা এমন জায়গাতে উঠে আসবো বিশ্বের বড় দলগুলো আমাদের বিপক্ষে খেলতে ভয় পাবে। আমরা পেরেছি। আজ অনেক বড় দল আমাদের সাথে সিরিজ খেলতে না করে দেয়। আমরা এখন বড় দলগুলোকে হোয়াইট ওয়াশ করি।

দেশের সবথেকে উপরের স্থানে আমরা তাদের রেখেছি যারা আমাদের হয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের তুলে ধরে। যারা সাহসী যোদ্ধার মত ইতিহাস রচনা করতে জানে। যারা নির্ভীক সৈনিকের মত প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করে, আর দিন শেষে বিজয়ের পতাকা নিয়ে ঘরে ফিরে আসে। গত ২-৩ বছর আমরা অনেক স্মরণীয় সময় পার করেছি। আমরা পেয়েছি আমাদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এক নির্ভীক সৈনিক। নিজের কথা না ভেবে যে দেশের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়। এমন দলনেতা থাকলে বাকি ১০ জন যোদ্ধার অস্ত্রে এমনিতেই বারুদ জ্বলে উঠার কথা। আর সেই যোদ্ধাদের দেখার জন্য অফিস থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে রফিক সাহেব রাস্তার পাশে টিভির দোকানে দাঁড়িয়েই খেলা দেখতে শুরু করেন। আব্দুল চাচা সারাদিন রিক্সা চালিয়ে খেলা শুরুর আগে সেই টিভির দোকানের সামনে এসে হাজির হয়ে যান। গ্রামে চায়ের দোকান গুলোতে জায়গা দেওয়া যায় না। সাকিব, মাশরাফি ধ্বনিতে মুখরিত থাকে পরিবেশ। আমার মনে আছে এই তো সেদিন এশিয়া কাপে পাকিস্থান কে হারিয়ে ফাইনালে গেল বাংলাদেশ। সে রাতে খেলা শেষে আমরা সবাই রাস্তায় বের হয়ে গেছিলাম। বিজয় মিছিল বের করার জন্য। মজার বিষয় হচ্ছে, আমাদের সাথে একজন ছিল যে মাত্র ২ দিন হয়েছে বিয়ে করেছে, সেও সেদিন সারারাত বাইরে। ভালবাসা গুলো কথায় থেকে আসে ?

কোন কোন দেশে ক্রিকেট মানে জুয়া আর ব্যাবসা করার একটা মাধ্যম। আমাদের কাছে এটা আবেগ আর ভালবাসার প্রতীক। অনেক জাতি আছে যারা ক্রিকেট খেলে শুধু টাকার জন্য। তারা মাঠে আর মাঠের বাইরে জুয়া নামক ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করে আর দিন শেষে কোটি টাকা নিয়ে ঘরে ফেরে। কিন্তু আমরা ক্রিকেট জীবনের জন্য খেলি। তা না হলে একজন মানুষ পায়ে ৭ টা সার্জারীর পরও এভাবে নিজেকে দলের জন্য বিলিয়ে দিতে পারে না। আপনার একজনের সাথে ব্যাক্তিগত শত্রুতা বা রাজনৈতিক ভাবে শত্রুতা থাকতে পারে। কিন্তু আমি আপনাকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি। ম্যাচ চলাকালীন সময়ে আপনি পাশে ফিরে দেখেনও না যে আপনার পাশে আপনার শত্রু বসে আছে। আমরা জাতিটা একটু বেশি আবেগপ্রবণ, খেলা খারাপ হলে যাদের গালি দেই, কটু কথা বলি, আবার তাদেরই মাথায় করে রাখি। ভালবাসার চরম শিখড়ে আমরা রাখি এই খেলা কে। আমরা সারাবিশ্বে টাইগার হিসেবে পরিচিত। নিজেদের জোরে অনেক উপরে উঠে এসেছি, তবে আরো অনেক পথ যাওয়া বাকি আমাদের। আমরা যাবো, বিশ্ব দেখবে একদিন, শুনবে বাঘের গর্জন, আমরা আসছি।

About The Author
Ahmmed Abir
জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বাচতে শিখেছি। নিজেকে চ্যালেঞ্জ করে সামনে এগিয়ে যেতে শিখেছি। পছন্দ করি গান গাইতে গীটার বাজাতে আর গেইম খেলতে।
1 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment