Now Reading
এক ফরাসি কন্যার গল্প



এক ফরাসি কন্যার গল্প

একটি বিদেশি এনজিও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলাম বেশ কিছুদিন। সেটা সিডর পরবর্তী সময়। সেই এনজিওতে কাজ করার সুবাদেই পরিচয় হয় ফ্রান্সের মেয়ে এলিসার সাথে। আরেকটি বিদেশি সংস্থার মাধ্যমে আমাদের এনজিওতে এসেছিল খুলনা বিভাগের বিভিন্ন দুর্গত এলাকার মানুষের সেবা করতে। পেশায় ডাক্তার। ফিল্ড অফিসারগণ ইংরেজিতে তেমন পটু না হওয়ার দরুন দোভাষী হিসেবে আমিই দায়িত্ব নিলাম। তার সাথে কাজ করে কখনোই বিরক্ত হইনি আমি, বরং বেশ ভালোই লাগতো।

আমি আর সে পাশাপাশিই থাকতাম এনজিও ভবনে। বারান্দায় গেলে দেখা হতো প্রায়। কিন্তু সেটা হাই হ্যালো কিংবা চোখাচোখি পর্যন্তই। জানতাম যে বিদেশিরা নাকি অনেক ফ্রি মাইন্ডের হয়। কিন্তু এলিসার মধ্যে তার কোনো লক্ষণই দেখতাম না তাই বেশ অবাকই হতাম।

অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও সকালে ঘুম ভাঙার পর বারান্দাতে গেলাম। বেশ বৃষ্টি হচ্ছিলো তখন। দেখলাম এলিসা মন খারাপ করে বারান্দাতে চুপচাপ বসে বৃষ্টি দেখছে। তার কাছে গেলাম এবং মন খারাপের কথা জিজ্ঞেস করতেই সে আমাকে হঠাৎ জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাদঁতে লাগলো আর বললো তার বাবা মারা গেছে প্যারিসে কিন্তু এই মুহুর্তে সে কি করে যাবে অসহায় মানুষদেরকে ফেলে! আমি বললাম, তুমি তোমার বাবাকে দেখতে ফ্রান্সে যাবে, এদিকটা আমি সামলাবো।

উপরের মহলে সবকিছু জানিয়ে তখনই আমি এলিসাকে নিয়ে রওনা দিলাম যশোরের উদ্দেশ্যে। হেড অফিসে আগেই ফোন করে বলে রেখেছিলাম ঢাকার বিমানের দুটো টিকেট কেটে রাখতে। রাতের ফ্লাইটে আমরা যশোর থেকে ঢাকা গেলাম।

সেদিন ভোরে বিমান না পেলেও সৌভাগ্যবশত একদিন পরের ফ্লাইটে সে ফ্রান্সে চলে যায়। যাবার আগে সে তার ফ্রান্সের ফোন নম্বর, ফেসবুক আর স্কাইপ ইউজার নেম আমাকে জানিয়ে যায়।

এলিসা ফ্রান্সে পৌছেই আমাকে মেসেজ দিয়েছিলো। এরপর আমি তাকে ফেসবুকে এড করে নিই। ফেসবুকে নিয়মিত চ্যাট হতো। সে আমাকে দেখতে চাইতো তাই বারবার বলতো স্কাইপে আসার জন্য কিন্তু আমার না ছিলো কোনো স্কাইপ আইডি, না ছিলো কোনো ভালো ফোন যেটাতে ফ্রন্ট ক্যামেরা আছে। আমার সমস্যার কথা আমি ওকে জানালাম।

তিন-চার মাস পরের কথা। এলিসা আমার হৃদয়ের গভীরে একটা মজবুত স্থান তৈরী করে নিয়েছিল ততদিনে। এলিসার সাথে যোগাযোগ হতো ফেসবুকে। এলিসা ফ্রান্সেই রয়ে গেলো অসুস্থ মায়ের কাছে। আমিও তখন খুলনা শহরে হেড অফিসে কর্মরত। সেদিন ছিলো বুধবার; কি একটা কাজে বাইরে ছিলাম, হঠাৎ অফিস থেকে ফোন এলো যে আমার নামে বিদেশ থেকে পার্সেল এসেছে। অফিসে গিয়ে দেখি এলিসা ফ্রান্স থেকে কিছু একটা পাঠিয়েছে। বাসায় এসে প্যাকেট খুলে দেখি পাগলীটা আমার জন্য একটা দামী নোকিয়া সিম্বিয়ান সেট পাঠিয়েছে যেটা দিয়ে স্কাইপ ব্যবহার করা যাবে। সেদিনই একটা স্কাইপ একাউন্ট খুলে এলিসাকে রিকোয়েস্ট পাঠালাম। এরপর থেকে আমরা শত ব্যস্ততার মাঝেও স্কাইপে কথা বলতাম। এমন একটা নেশা হয়ে গিয়েছিলো যে দুজন দুজনকে না দেখে থাকতে পারতাম না। অনেক ঝামেলাও অবশ্য পোহাতে হতো আমার কারন তখনকার টুজি সিস্টেমে ভিডিও কল কেটে যেতো প্রায়ই।

এলিসার দেয়া এই একটা মোবাইল ফোন আমার জীবনটাকে বদলে দিয়েছিলো। মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে নিজের অনেক ফটো তুলে সেগুলা ফেসবুকে আপলোড করতাম। এলিসাও তাই করতো। এভাবেই আমাদের দিনগুলো ভালোই কেটে যাচ্ছিলো যদিও সেটা বন্ধুত্বের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিলো। আমি যে ওকে ভালোবাসি এই কথাটা বলার সাহস আমার ছিলোনা।

২০১০ সালের ভ্যালেন্টাইন ডের কথা।

সেদিন ওকে ফেসবুকে মেসেজ করলাম স্কাইপে আসার জন্য। কিন্তু বারবার বলছিলো লেট হবে। প্রায় দুই ঘন্টা পর যখন স্কাইপে এলো এলিসা, তখন আমার জন্য একটা বিশাল চমক অপেক্ষা করছিলো যেটা কিনা কল্পনাতীত ছিলো আমার কাছে। ভিডিও অন করার পর দেখলাম, সে কোনো এক বাঙালির কাছ থেকে একটা শাড়ি ম্যানেজ করে সেটা পরে বাঙালি ঢঙ্গে পোজ দিয়ে দাড়িঁয়ে আছে। এলিসাকে সেই মুহুর্তে কি বলবো ভাষা খুজেঁ পাচ্ছিলাম না। এরপর ও ফোনের কাছে এসে বললো- “আর ইউ সারপ্রাইজড? উইশিং টু হিয়ার সামথিং ফ্রম ইউ”।

আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম ওকে আমার ভালোবাসার কথা জানাবো তাই এক গুচ্ছ লাল গোলাপ কিনে রেখেছিলাম। এরপর ক্যামেরার সামনে গোলাপ হাতে নিয়ে এলিসাকে বললাম “আই লাভ ইউ। উইল ইউ ম্যারি মি?” এলিসার চোখে অশ্রু টলমল করছিলো তখন।

এলিসা বললো- “ইয়েস, ইয়েস আই উইল। আই ওয়াজ জাস্ট ওয়ান্টেড টু হিয়ার দিস ফ্রম ইউ দ্যাট ইউ লাভ মি। আই লাভ ইউ টু”। পচিঁশটা বসন্ত পার করে এসে সেদিন জীবনে প্রথম প্রেমের ছোঁয়া পেয়েছিলাম।

এরপরের ঘটনাগুলো বেশ দ্রুত ঘটে যেতে লাগলো।

বাবা-মা কে এলিসার কথা জানালাম। এলিসা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ও বিদেশিনী বলে বাবা-মা কোনভাবেই রাজি হলেন না। এলিসাকে জিজ্ঞেস করলাম সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে পারবে কিনা। এলিসা জানালো, সে আমার জন্য সবকিছু করতে পারবে। তবু বাবা-মা চাননি কোনো বিদেশিনী ঘরের বউ হয়ে আসুক। এলিসা সে সময় অনেক কষ্ট পেয়ে আমাকে ‘স্বার্থপর’ বলেছিলো। কিন্তু আমি যে এক কঠিন পরিস্থিতির স্বীকার সেটা তাকে বোঝাতে পারিনি।

এরপর সময়ের স্রোত তার আপন গতিতেই বয়ে যেতে লাগলো। এলিসা আর আমার যোগাযোগটাও ধীরে ধীরে একসময় কমে যেতে লাগলো। শুধু রয়ে গেলো এক রাশ ক্ষোভ, হতাশা, অভিমান আর গিফট হিসেবে পাঠানো দামি নোকিয়া ফোনটা।

শুনেছি, এলিসা এখনও আমার আশায় পথ চেয়ে আছে।  বাবা-মাকে বলেছি আমার জীবনটা আমার মতো করে সাজাতে দাও। তোমাদের ছেলে তো তোমাদেরই থাকবে।

ফ্রান্সের ভিসার জন্য আবেদন করেছিলাম। ভিসা হয়ে গেছে। খুব শীঘ্রই হয়তো দেশ ছেড়ে চলে যাবো।

এরপর এলিসাকে গিয়ে বলবো, এলিসা, আমি স্বার্থপর নই………..

 

গল্পে উল্লেখিত সময়কালঃ ২০০৮-২০১০

About The Author
Ferdous Sagar zFs
Ferdous Sagar zFs
Hi, I am Ferdous Sagar zFs. I am a Proud Bangladeshi living in abroad for study purpose. I love to write and it's my passion or hobby. Thanks.
0 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment