Now Reading
জীবন যেখানে বন্দি (প্রথম পর্ব)



জীবন যেখানে বন্দি (প্রথম পর্ব)

হিন্দু সমাজের প্রায় “প্রতিততম স্তরের অন্তর্গত ডোমবংশ”। এই বংশেই জন্ম তুষার এর। ডোম সম্প্রদায়ের মানুষেরা সাধারনত শ্মশানে শবদাহ কাজে সাহায্য করে। অনেকে আবার এই সম্প্রদায়ে থেকেও শবদাহ এর কাজ না করে বেতের কুলো ডালা ইত্যাদি নির্মাণ ও বিক্রি করে থাকে।

কিন্তু তুষারের বংশের লোকজন এ ধরনের কোন কাজে যুক্ত ছিলো না। বংশপরম্পরায় তারা লাঠিয়াল আর পরবর্তীতে দুর্ধষ ডাকাতে পরিনত হয়। তুষারের মামা বিখ্যাত ডাকাত। তার মাতামহ ডাকাতির কারনে দণ্ড ভোগ করতে গিয়ে কারাগারেই মারা গেছে। তুষারের পিতা সিঁধেল চোর আর দাদা ঠ্যাঙারে(কোন বাহিনীর হয়ে কাজ করা)। অর্থাৎ, তুষার “খুনীর দৌহিত, ডাকাতের ভাগিনা, ঠ্যাঙারের পৌত্র, সিধেঁল চোরের পুত্র”।

সময় অতিবাহিত হতে লাগলো। গ্রামের মানুষদের সাথে তাদের সম্পর্ক খারাপ হতে লাগলো। তুষারের মামা ডাকাতি করার সময় গ্রামবাসীর হাতে ধরা পরে এবং সেখানেই বেঘোরে প্রাণ যায়। তুষার তার দাদা আর বাবার কাছেই বলতে গেলে মানুষ হয়েছে। কারন তার মা, তার জন্মের সময় ই মৃত্যুবরণ করে। বাবা আর দাদার কাছে খুব একটা যত্ন পেতো না। কারন, তারা অধিকাংশ সময় বাড়ির বাইরে বাইরেই কাটাতো। আর অনেক সময় পালিয়ে থাকতো। তুষার বলতে গেলে আশে পাশের গ্রামের বাচ্চাদের সাথেই থাকতো। কখনো সেই বাচ্চাদের বাড়িতেও রাতে ঘুমাতো,যদি তার বাবা বাসায় যা আসতো।

দেখতে দেখতে তুষার এর বয়ষ ৫ এ এসে পরলো। তখন হঠাৎ একদিন তাদের বাসায় পুলিশ হানা দিলো। যেহেতু পরিবারের সকলেই কোন না কোন অবৈধ কাজে যুক্ত ছিলো তাই সকলকে ধরে নিয়ে গেলো। পুরো গ্রামবাসী পুলিশকে সাহায্য করেছিলো সেইদিন। তারপর থেকে তুষার প্রায় এতিম হয়ে গেলো।

কিন্তু “ভাগ্যের লিখন না যায় খণ্ডন”। তুষারকে লালন পালন এর দায়িত্ব নিলো এক নারী। শহড় থেকে গ্রামে এসেছিলো ভ্রমণে। তারপর সেখানে তার কষ্টের কথা শুনে, তুষারকে নিজেই লালন পালন করবে বলে মনঃস্থির করে। আর সাথে করে নিয়ে যেতে চায়। যেহেতু, তুষারের আর কেও নেই তাছাড়া এই বাচ্চাকে লালন পালন এর দায়িত্ব কে নিবে! তাই সকলেই রাজী হয়ে গেলো তার প্রস্তাবে।

তুষার ছোট বেলা থেকেই খুব শান্ত স্বভাবের ছিলো। শহরে এসে তার গ্রামের কথা মনে রইলো না। আপন মনেই সে লেখাপড়া করতো বাসায়। যে মহিলা তাকে নিয়ে এসেছিল সে ছিলো আঁধার মানবি। সন্ধ্যার পরেই সে বেরিয়ে যেতো জীবিকার সন্ধানে। ফিরতো কখনো মাঝরাতে আবার কখনো পরদিন সকালে। দিনের বেলা সে তুষারকে বাসায় লেখাপড়া শিখাতো। একসময় দেখা গেলো, তার বাসায় পড়ালেখা করার মতন আর তেমন কিছু নেই। তার এখন স্কুলের পাঠদান প্রয়োজন। তাই তুষারকে কাছেই একটি স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হলো। এমনি তুষার খুব মনোযোগী ছাত্র ছিলো। একটা পড়া অন্যান্য ছাত্রদের যেখানে শিখতে দিন চলে যেতো সেখানে তুষার কিছুটা সময় এক মধ্যেই তা শিখে যেতো।

তখন তুষার ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। বাসায় এসে দেখে তার মা ঘরে নেই। দিনের বেলা কখনো তার মা ঘরের বাইরে যায় না। সে ভাবলো হয়তো আজ বাইরে গেছে। পরপর চার দিন চলে গেলো, কিন্তু তার মায়ের কোন খবর পেলো না সে। এদিকে কিছুই খাওয়া হয় নি তার। বাড়ির মালিক মাঝে মাঝে এইটা সেইটা দিলেও রাজ্যের খুদায় সে কষ্ট পেতে লাগলো। এভাবে আধ পেট খেয়ে কোন রকম সপ্তাহখানিক পার করলো তুষার। বাচ্চা ছেলে খুঁজবে কি করে তার মা’কে! বাড়ির মালিক বুঝে গেলো আর মনে হয় আসবে না সেই মহিলা। এদিকে আবার বাচ্চা একটা ছেলে যেনো গলার কাঁটার মতন বিঁধে আছে। তাই সে তুষারকে বাড়ি থেকে বের করে দিলো। আর বাড়ির সব মালামাল নিজের করে নিলো।

রাস্তায় বেড়িয়ে তুষার বুঝতে পারলো জীবন কত কষ্টের। বেঁচে থাকার জন্য কতটা সংগ্রাম করতে হয় এদিকে। তারপর সে সকলের অবহেলা, গাল-মন্দ শুনে যেতে লাগলো। রাত হলে এদিক সেদিক ঘুমিয়ে কাটাতো। একদিন ঘুরতে ঘুরতে সে এক শ্মশান এ এসে হাজীর হলো। অন্যের কাছে মানুষ হলেও তার রক্তে কিন্তু ডোম বংশের রক্তই বইছে। তারপর সে ঐ শ্মশানেই থেকে গেলো, আর স্থানীয় ডোমদের একজন হয়ে কাজ করতে লাগলো।

কেও কি বিশ্বাস করবে, স্কুলের সেই মেধাবী ছাত্রটি আজ এই শ্মশানে মানুষের মাথা ফাটানোর সময় আনন্দ করে নেচে উঠে। যেনো অতি প্রিয় একটি কাজ করছে। দিন অতিবাহিত হতে লাগলো। এক সময় সে ঐ শ্মশানের ডোমদের প্রধান হয়ে উঠলো। মাঝে মাঝে অনেক পরিবারের লোকজন, কেও মারা গেলে তার স্বর্ন-গহনা সহ নিয়ে আসতো। এইটা নাকি শেষ ইচ্ছে ছিলো যে তাকে তার পরিহিত স্বর্নসহ তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে হবে। এতে লাভ হতো তুষারের। ঐ সকল গহনা তারা ভাগাভাগি করে নিয়ে নিতো। এভাবেই চলছিলো দিন।

তারপর একদিন একটা লাশ এলো শ্মশানে। বরাবরের মতন তারা সকলে ঘিরে ধরলো, কার লাশ, কোথায় বাড়ি, কোন কাঠে পোড়ানো হবে। চন্দন কাঠ কতটা দেয়া হলো সব নিয়ে তারা হিসেব করতে লাগলো। তুষার সর্দার হওয়ায় এখন আর এইসব সে করে না। অন্যরাই এইসব ভাগ করে। তার নিজের ভাগ ওরা এনে দিয়ে যায়। যথারীতি লাশ চিতায় তোলার পর মুখে অগ্নি দেয়া হলো। লাশের চেহাড়া এতক্ষণ তুষার দেখে নি। যখন দেখলো, সে যেনো নিজেকে বিশ্বাস করতে পারলো না। তার কাছে মনে হলো আকাশ আর মাটি মিলে যাচ্ছে। চারিদিক ঘুরছিলো। এই বুঝি সে পরে যাবে। তার মাথা ঘুরতে শুরু করলো। কারন, চিতায় যার লাশ আগুনে পুড়ছিল, সে ছিলো তুষারের “মা”।

তার মায়ের চেহাড়া চিতায় দেখে তুষার এইযে শ্মশান দেখে দৌড় শুরু করলো আর থামলো না। কোথায় যে চলে গিয়েছিলো তা আর কেও বলতে পারবে না। কেও জানেও না, সে তারপর কোথায় গিয়েছিলো বা তার কি হয়েছিলো। আদৌ বেঁচে ছিলো নাকি তাও কেও কখনো বলতে পারে নি।

About The Author
Pritom Pallav
Pritom pallav
2 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment