Now Reading
চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (প্রথম পর্ব)



চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (প্রথম পর্ব)

চেরনোবিল, ইউক্রেন। মনের ভেতর নাড়া দিতে এই নামটাই যতেষ্ট, অনেকের কাছেই এই নাম আর নামের পেছনের স্মৃতি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা বিস্ময়কর সব ভূতুড়ে ছবি। বিগত শতাব্দীর ভয়াবহতম পারমানবিক দুর্ঘটনার কারনে চেরনোবিল আজ ভূতুড়ে নগরী। কোন মানুষ বাস করেনা সেখানে। বিশাল সব স্থাপনাগুলো কালের সাক্ষী হয়ে ধ্বংসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। ধারাবাহিক এই লেখার প্রথম পর্বে চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়ের আগের এবং দুর্ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।

সোভিয়েত ইউনিয়ন অধ্যুষিত ইউক্রেনের একেবারে উত্তর সীমান্তে বিশাল এক পারমানবিক শক্তিকেন্দ্রের নাম ‘চেরনোবিল পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র’ (Chernobyl Nuclear Power Plant)। দুর্ঘটনার ঘটবার আগে ইউক্রেনের প্রায় ১০ ভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ করত এই কেন্দ্র। চারটি পারমাণবিক চুল্লি (Nuclear Reactor)মিলিয়ে এই চেরনোবিল প্ল্যান্ট। প্রাথমিক পরিকল্পনায় এই কেন্দ্র বানানোর কথা ছিল ইউক্রেনের রাজধানীর কাছে। পরবর্তীতে শুধুমাত্র যারা এখানে কাজ করে তাদের থাকার সুবিধার জন্যে আলাদা শহর নির্মাণ করা হয়। শহরের নাম রাখা হয় ‘প্রিপিয়াট’ (Pripyat)। এই শহরকে অন্য সব শহর থেকে একটু আলাদা ধাঁচে তৈরি করা হয়। প্রিপিয়াট শহরকে গড়ে তোলা হয়েছিল আদর্শ নগর হিসেবে। ১৯৭৯ সালে শহর হিসেবে ঘোষণা দেয়া হলেও, এর নয় বছর আগে থেকে কাজ শুরু হয় প্রিপিয়াটকে গড়ে তোলার। সময়ের তুলনায় এখানে আধুনিকায়নের চেষ্টা হয়েছে অনেকভাবেই। মসৃণ সুবিশাল রাস্তা, দেয়ালে আঁকা বিশাল সব রঙিন ছবি আর নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য আজও দেখা যায় এই মৃত্যুর শহরে। তখনকার সময়ে বাচ্চাদের জন্যে উন্নত স্কুল ,বিশাল শপিং মল, চোখ ধাঁধানো সব ঘরবাড়ি সবই তৈরি করা হয়েছিল সেখানে। মোট কথা আধুনিক আর আরামদায়ক জীবনযাপনের কোন সুবিধা বাকি রাখা হয়নি শহরটিতে। সেখানে যারা বাস করত তাদেরকে খুঁজে আনা হয়েছিল পুরো ইউক্রেন আর সোভিয়েত ইউনিয়নের নানা প্রান্ত থেকে। সবচেয়ে মেধাবি, কর্মঠ আর যোগ্য লোকদের নিয়ে শহর সাজানো হয়েছিল, পারমাণবিক শক্তিতে চলা এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে সঠিক ভাবে চালানোর জন্যে। কিন্তু পরিকল্পনা আর বাস্তবতার মাঝের দূরত্ব তাই আজ সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুঃসহ ইতিহাস হয়ে।

চেরনোবিল পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রের দুর্ঘটনা এতোটাই ভয়াবহ ছিল যে, সেখানকার সাধারণ মানুষের বাঁচার যুদ্ধ বিষয়ে কোন সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। চেরনোবিলের নিচে প্রিপিয়াটের নাম ঢাকা পরে গেলেও ভয়াবহ মৃত্যুর খেলা সবার আগে এ শহরবাসীই দেখা শুরু করে। প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের শহর হঠাৎ পরিণত হয় ইতিহাসের প্রথম পারমাণবিক উদ্বাস্তুতে।। ‘চেরনোবিল’ নামের অপর একটি শহরও এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রিপিয়াট এর চেয়ে অনেক কম লোকজন বাস করত সেই শহরে। মূল শক্তিকেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে সেই শহরের অবস্থান। পরোক্ষ ভাবে ছোঁয়াচে রোগের মত ছড়িয়ে পরা তেজস্ক্রিয়তায় বিপর্যয়ের শিকার হয় ইউক্রেনের রাজধানী ‘কিয়েভ’ও।

সবকিছু ঠিকঠাক মতই চলছিল। ১৯৮৩ সালের পর থেকে চারটি চুল্লি পুরদমে কাজ শুরু করার পর থেকে কোন বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি। সাধারণ মানুষের তেমন ধারনাও ছিলনা কি এই পারমাণবিক শক্তি অথবা তেজক্সিয়তার ক্ষমতাই বা কতটুকু। ১৯৮৬ সালের ২৬শে এপ্রিলের এক দুর্ঘটনা কেবল প্রিপিয়াটবাসী নয় পুরো পৃথিবীকে জানতে বাধ্য করে স্বাদ,গন্ধ আর আকৃতিহীন অদৃশ্য এই শত্রুর বিষয়ে। ২৫ এপ্রিল মধ্যরাতের পর অর্থাৎ ২৬ তারিখের শুরুটাই ছিল সেই অভিশাপের শুরু। বিস্ফরনের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় শহরের অনেকের। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দের পর তারা দেখতে পান চার নাম্বার চুল্লি থেকে ঘন ধোয়া আর আগুন বের হতে। তাদের মতে সেই আগুনের রঙ ছিল নীল। ঘটনার দিন এমনকি পরের দিন প্রায় দুপুর পর্যন্ত সেখানের মানুষ জানতোও না অদৃশ্য এই মৃত্যু কিভাবে তাদেরকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। দুর্ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে উদাসীন মানুষ কেবল এটুকু জানত, গত রাতে চার নাম্বার পারমানবিক চুল্লিতে আগুন লাগার কারনে সামান্য ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। শহরের মানুষদের সেখান থেকে যখন সরিয়ে নেয়া হয়, প্রিপিয়াটের বাতাসে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ তখন হয়ে দাঁড়ায় সাধারণ মানুষের সহ্য সীমার পঞ্চাশ গুনেরও বেশি। ২৭ তারিখ দুপুরের দিকে হাজারো সরকার নিয়ন্ত্রিত বাস আর গাড়ি প্রিপিয়াটে এসে পৌছায়। সাথে আসে সৈন্যের দল। মাইকে করে চারিদিকে ঘোষণা জারি করা হয়, সাময়িক ভাবে কিছু সময়ের জন্যে শহরবাসীকে এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া লাগবে। পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রে বিস্ফোরণের ফলে তেজস্ক্রিয়তা বেড়ে জাওয়ায় তাদের এই নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। নিজেদের ব্যবহার্য সামান্য কিছু জিনিষ, হালকা খাবার আর জরুরী কাগজপতের বাইরে কোন সামগ্রই সাথে না নেবার জন্যে বলা হয় সবাইকে। প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ সেইদিন ছোট্ট এই ঘোষণায় বাড়ি ছাড়ে, এই আশায় আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। মাত্র কয়েকটাই তো দিনের ব্যাপার। প্রিপিয়াট ও চেরনোবিল শহর এবং আসে পাশের কিছু ক্ষুদ্র গ্রাম থেকে সব মানুষকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানী কিয়েভে। তাদের নিজ ঘরে ফেরার সময় দিন থেকে মাস, মাস থেকে বছরে পরিণত হয়। কিন্তু কোনদিন আর তাদের ফেরা হয়না তাদের প্রিয় শহরে। বিজ্ঞানীদের ধারনা অনুযায়ী আগামী বিশ হাজার বছরের মধ্যে প্রিপিয়াট শহর বা এর কাছাকাছি মানুষের বসবাস করা উচিৎ হবে না। চেরনোবিল শহরের ভাগ্য প্রিপিয়াট থেকে কিছুটা ভাল। দুর্ঘটনার ত্রিশ বছর পর অনেকটা ভূতুড়ে হলেও কিছু পরিবার এখন বাস করে সেই শহরে।

অদৃশ্য অজানা এই তেজস্ক্রিয় মৃত্যুর মিছিলের শুরু তখন থেকেই। চেরনোবিলের অনেক রহস্যময় বিষয়ের মাঝে এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে, বিস্ফোরণের প্রায় ছত্রিশ ঘণ্টা পর যে সাধারণ মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল, তাদের উপর তেজস্ক্রিয়তার ছোবল কতটা ভয়াবহ ভাবে পড়েছিল? কতজন আক্রান্ত হয় পারমাণবিক চুল্লি থেকে বের হওয়া বিষাক্ত তেজস্ক্রিয়তায়? সময়ের আগে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে কত মানুষ? এর কোন সঠিক দলিল আজ পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি। চিকিৎসার কথা, মৃত্যুর কথা আর সেই ভয়াবহতার কথা যেন সময়ের সাথে মিশে গেছে চেরনোবিলের তেজস্ক্রিয়তার বিষাক্তটায়।

দেখতে দেখতে ছয় দিন পার হয়ে যায়। সমগ্র দেশ আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে ধাঁধায় ফেলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তখনও নিশ্চুপ বিস্ফোরণ আর দুর্ঘটনার বিষয়ে। নিজেদের দুর্বলতা বাইরের বিশ্বে প্রকাশ করতে নারাজ তারা। নিজেদের শক্ত হাতেই সব সামলে ফেলার অতি আত্মবিশ্বাসে তারা কাজ করে যাচ্ছিল কাউকে না জানিয়েই। ১লা মে, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে শ্রমিক দিবসের উৎসব হতো জমকালো আয়জনে। বিশেষকরে সকল জনসাধারনের জন্যে ছুটির দিনে সামরিক প্যারাড ছিল উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভেও আয়োজন করা হয় সেই অনুষ্ঠানের। চেরনোবিলের দুর্ঘটনা কবলিত শক্তিকেন্দ্র থেকে দূরে হলেও, ততদিনে বাতাসে তেজস্কিয়তা পরিমাণ যা ছিল তা সাধারন মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে অথবা ভয়াবহ রোগাক্রান্ত করার জন্যে যতেষ্ট ছিল। ইউক্রেনের মানুষ সে বছরের সেই প্যারেড কে ‘Parade of Death’ নামেই জানে। রহস্যময় ভাবে ১৯৮৬ সালে কিয়েভে যে উৎসবে হয়, এর কোন ছবি অথবা নথিপত্র কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। কিছু ছবি বা কাগজ হারিয়ে যেতে পারে তাই বলে কোন প্রমান না থাকা সত্যি রহস্যময়।

কিভাবে এই ভয়াবহ বিপর্যয় মোকাবেলা করে সোভিয়েত সরকার? ঠিক কি ঘটেছিল সেদিন পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রে? ভূতুড়ে শহর প্রিপিয়াটের এখনকার অবস্থা কেমন? এর সবই থাকবে আগামী পর্বগুলোতে।

About The Author
Abdullah-Al-Mahmood Showrav
সাধারণ মানুষ, সাধারণেই বসবাস। লিখতে ভালবাসি, লিখতে শেখা হয়নি এখনো। অপেক্ষায় আছি একদিন ঠিক শিখে যাব।
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment