সাহিত্য কথা

ক্ষতি

“বাবা!” খবরের কাগজ থেকে মুখ তুললেন শরীফ সাহেব। তাঁর একমাত্র ছেলে রায়হান দাঁড়িয়ে আছে সামনে, একটু ভীত মনে হচ্ছে তাকে। “কিছু বলবে?” গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করলেন তিনি। “না মানে, আমার কিছু টাকা দরকার ছিল,” ভয়ে ভয়ে বললো জবাব দিল রায়হান। “কত টাকা?” ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়লেন শরীফ সাহেব। “পাঁচ হাজারের মতো,” আমতা আমতা করে উত্তর দিল রায়হান, “বন্ধুদের সাথে পিকনিকে যেতাম”। “পিকনিকে যেতে পাঁচ হাজার টাকা লাগে? টাকা তো গাছের পাতা না যে চাইলেই পাওয়া যাবে। আমি দিনরাত খেটে টাকা তো তোমার পিকনিকের জন্য উপার্জন করি না। যাও এখন চোখের সামনে থেকে!” বলে খবরের কাগজে মুখ গুঁজলেন আবার তিনি। আড়চোখে দেখলেন রায়হানের গোমড়ামুখে চলে যাওয়া। কিছু করার নেই, ছেলেকে এভাবেই বাস্তবতা শেখাতে হবে। শরীফ সাহেবের টাকার অভাব নেই, কিন্তু তিনি বেশ কষ্ট করে এ পর্যন্ত এসেছেন। তিনি চান তাঁর ছেলেও সফলতার মর্ম বুঝতে শিখুক। বন্ধুদের সাথে পিকনিক করে বেড়ানো কোনো কাজের কথা না।

সকাল ৯.০০টার মতো বাজে। শরীফ সাহেব মগবাজার মোড়ে জ্যামে আটকে আছেন। প্রায় প্রতিদিনই তাঁর অফিসে যেতে দেরী হয়ে যায় এই অসহ্য জ্যামের কারণে। গাড়ির ভেতর এসির শীতল হাওয়ায় শরীরটা একটু এলিয়ে দেন তিনি। এমন সময়ে মায়াকাড়া চেহারার একটা মেয়ে এসে তাঁর জানালায় টোকা দেয়, মেয়েটা ফুল বিক্রি করছিলো। শরীফ সাহেব দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন, এসব উটকো ঝামেলার দিকে নজর দিতে ইচ্ছে করছে না। হঠাৎ তাঁর ড্রাইভার জানালা খুলে মেয়েটাকে একশো টাকার একটা নোট বের করে দিয়ে দিল। ভ্রু কুঁচকে উঠলো শরীফ সাহেবের, ব্যাপারটা তাঁর কাছে বেশ অপমানজনক মনে হলো। “হারামজাদা নিশ্চয়ই তেলের টাকা চুরি করছে,” মনে মনে ভাবলেন তিনি। পরের মাসেই ব্যাটাকে বিদেয় করে নেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন শরীফ সাহেব। তিনি একজন ব্যবসায়ী, কোনো ধরণের ক্ষতি তিনি সহ্য করতে পারেন না।

সিগন্যালে জ্যাম ছেড়েছে, ট্রাফিক পুলিশ ইশারা করতেই গাড়িগুলো চলতে শুরু করলো। কিন্তু কিছুদূর গিয়েই তাঁর গাড়ি থমকে দাঁড়ালো। ড্রাইভার বারবার চেষ্টা করেও আর স্টার্ট করতে পারলো না। সে নেমে গিয়ে ইঞ্জিন পরীক্ষা করতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর শুকনো মুখে এসে বললো যে ব্যাটারী ডাউন হয়ে গেছে, গ্যারেজে নিয়ে যেতে হবে। রাগে ফেটে পড়েন শরীফ সাহেব, “ব্যাটা মূর্খ! বাসা থেকে বেরোবার আগে দেখে নিতে পারো না? যতসব অকর্মা পুষে রেখেছি আমি। যাও, একটা রিকশা নিয়ে এসো এখন, আর গাড়িটা ঠিক করিয়ে অফিসে নিয়ে আসবে।” দিনটা খারাপভাবেই শুরু হল শরীফ সাহেবের, সকাল সকাল মেজাজ খারাপ করতে তাঁর ভালো লাগে না। হঠাৎ সিগারেটের তৃষ্ণা পেলো তাঁর, মেজাজ খারাপ থাকলে শরীর আরও বেশী নিকোটিন চায়। পকেট হাতড়ালেন তিনি প্যাকেটের জন্য, নেই ওটা। মনে করতে পারলেন না কোথায় রেখেছেন। “নিশ্চয়ই বাসায় ফেলে এসেছি!” মনে মনে বললেন শরীফ সাহেব। নিজের ওপর এখন রাগ হতে থাকলো তাঁর। গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার পাশের দোকানে গিয়ে এক প্যাকেট সিগারেট কিনলেন শরীফ সাহেব। মানিব্যাগ বের করে একটা পাঁচশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিলেন দোকানদারের দিকে। নোটটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখার পর দোকানদার টাকাটা ফেরত দিলো, “স্যার, এই নোট কোথায় পেলেন? এটা তো জাল নোট।” দোকানদারের কথা শুনে নিজে নোটটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখলেন তিনি, আসলেই জাল। “কোত্থেকে এলো এটা?” মনে করতে পারলেন না তিনি। সিগারেট না কিনেই ফিরে এলেন। এখন অন্য কিছু তাঁর মাথায় আর নেই, এই পাঁচশো টাকা যে তাঁর ক্ষতি হচ্ছে, এই চিন্তাতেই তিনি এখন বিভোর। তিনি একজন ব্যবসায়ী, কোন ক্ষতি তিনি সহ্য করতে পারেন না। ক্ষতি হলে তা তাঁকে পুষিয়ে নিতেই হবে। আশেপাশের কয়েকটা দোকানে গিয়ে তিনি নোটটা চালানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু কেউই নিলো না। এর মধ্যে তাঁর ড্রাইভার রিকশা নিয়ে এসেছে, মেজাজ খারাপ করে তিনি রিকশায় উঠলেন। জ্যাম কিছুটা কমেছে, হাওয়া খেতে খেতে রিকশায় যেতে ভালোই লাগছে তাঁর। বেশ ফুরফুরে মেজাজে রিকশাওয়ালার সাথে গল্প জুড়ে দিলেন তিনি।

“ছেলেমেয়ে কয়টা তোমার?”
-“পাঁচখান স্যার, তিনটা পোলা আর দুইটা মাইয়া।”
“দিনে কামাই হয় কেমন?”
-“ঠিক নাই স্যার, একেকদিন একেকরকম, তয় দিনে তিন-চাইরশো টেকার মতো হয়।”

হঠাৎ শরীফ সাহেবের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো। অফিসের প্রায় আধামাইল আগেই তিনি রিকশা থামালেন। নেমে সেই জাল পাঁচশো টাকার নোটটা দিলেন রিক্সাওয়ালার দিকে ভাড়া রাখার জন্য। রিক্সাওয়ালা দেখে আঁতকে উঠলো, “এতো বড় নোটের ভাংতি নাইতো স্যার!” “আমার কাছেও ভাংতি নাই, কতো আছে তোমার কাছে?” বিরক্তির একটা ভাব ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন শরীফ সাহেব। “২২০ টাকা আছে স্যার সব মিলাইয়া।” “আমার তাড়া আছে অনেক, ঠিক আছে, যা আছে তাই দাও আমাকে, আর পাঁচশো টাকাটা নিয়ে যাও।” খুশিতে প্রায় সবকয়টা দাঁত বেরিয়ে পড়লো রিকশাওয়ালার, “আল্লাহ আপনের ভালো করুক স্যার।” খুশিমনে জাল নোটটা নিয়ে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে গেলো সে। কিছুক্ষণ তার গমনপথের দিকে তাকিয়ে থেকে অফিসের দিকে হাঁটা ধরলেন শরীফ সাহেব, পাঁচ-ছয় মিনিটের বেশী লাগার কথা না এখান থেকে অফিসে যেতে। মনের ভেতর একটা চিন্তার মেঘ ঘনিয়ে আছে তাঁর, এজন্য নয় যে তিনি একটা গরীব রিকশাওয়ালাকে ঠকিয়েছেন, কিন্তু এইজন্য যে তাঁর আজ ২৮০ টাকার ক্ষতি হলো। এই ক্ষতি তো তিনি কোনদিন পূরণ করতে পারবেন না, এই ২৮০ টাকার কষ্ট তাঁকে অনেকদিন খোঁচাবে।

হাজার হোক, তিনি একজন ব্যবসায়ী, কোন ক্ষতি তিনি মেনে নিতে পারেন না।

 

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

অবসরের পর

Maksuda Akter

খুন!

Maksuda Akter

প্রতিশোধ- পর্ব ৬

Tondra Bilashi

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy