সাহিত্য কথা

জীবন যেখানে বন্দি (শেষ পর্ব)

যার মনে একবার ভবঘুরে হাওয়া লেগে যায়, তাকে খুব সহজে সংসারি করা যায় না। একবার যে ছন্নছাড়া জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তাকে আয়ত্বে আনা অনেকটাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

শ্মশানের চিতায় তার মায়ের মুখ দেখে, সেই যে তুষার দৌড় শুরু করলো তার শেষ কোথায় হয়েছিলো কেও জানে না। এতদিন কোথায় ছিলো তাও কেও সঠিক বলতে পারে না। তারপর একদিন, তাকে হটাৎ করে এক যায়গায় দেখতে পেলো তার সাথে শ্মশানে কাজ করা এক চণ্ডাল(যারা শ্মশানে মরা পোড়ায়। ডোম নামেও ডাকা হয় তাদের)। তার সাথে তুষার এর দেখা হওয়ার সাথে সাথেই ছেলেটি তুষারকে জড়িয়ে কান্না জুড়ে দিলো। অনেক কথা বলে, অনেক আকুতি-মিনুতি করে তুষারকে নিয়ে এলো  তার বাসায়।

বাসায় এসেই তুষার যেনো ছটফট করতে লাগলো। কারন, এরকম বদ্ধ জীবনের সাথে সে অভ্যস্ত নয় অনেকদিন। তাছাড়া অন্যের বাড়িতে একটা অযাচিতের মতন আছে বলেও বোধহয় তার ভালো লাগে নি। তিন দিন যেতে না যেতেই তুষার পালিয়ে গেলো।

যেখানে ছিলো সেখানে আর ফিরে গেলো না তুষার। অন্য আরেকটি শহরে চলে গেলো। তারপর সেখানে একটি গোটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসলো। হাতে কিছু জমানো অর্থ আছে, কিন্তু তা দিয়ে আর কতদিন চলবে। সুতরাং, সে গ্রহণ করলো নতুন পেশা।

সে নিজেই একটি পদবী জুড়ে দিলো নিজের নামের শেষে। বাড়ির সামনেই বাংলা এবং ইংরেজীতে লিখে বড় একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিলো, যে “অপূর্ব সুযোগ, অপূর্ব সুযোগ”। হিমালয়ের সন্ন্যাসীর নিকট থেকে প্রাপ্ত দৈব ঔষধ। ভূত-প্রেত-পেত্নি, ধনুষ্টঙ্কার, স্বপ্ন দোষ, চোয়াল আটক, পুলিশে ভয়, পত্নি-প্রহার ইত্যাদি দুরারোগ্য ব্যাধির প্রত্যক্ষ চিকিৎসা করে থাকি। ফিস মাত্র ৫০ টাকা। এক দিনের মধ্যে হাতে হাতে ফল না পাইলে মূল্য ফেরত। সাক্ষাৎকারের সময়ঃ সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা। প্রোঃ তুষার ওঝা।

দু একজন ওঝার চেম্বারে উঁকিঝুঁকি মেরেও বিশেষ রকম কৌতুক আর বিষ্ময় বোধ করে। ভূত কিংবা সাপের বিষ ঝড়ানো ওঝা কে না দেখেছে, তাদের চেহারা হয় কাপালিকদের মতন, রক্তাম্বর ভূষিত, মাথার চুল জট। কিন্তু এ যে একেবারে সাহেব ওঝা। হ্যাট-কোট-প্যাণ্ট পরা, সামনের টেবিলে পা তুলে চেয়ারে বসে ফুক ফুক করে সিগারেট টানে। পায়ে আবার বিদেশী  জুতো।

কাল্লু শেখ নামক এক মুসলমান ছেলেকে নিজের ঘরে আশ্রয় দিয়েছে তুষার। ছেলেটি তার কাছে ভিক্ষা চাইলে এসেছিল। ছেলেটিকে এক নজর দেখেই আকৃষ্ট হয়েছিলো তুষার। ছেলেটির মাথায় চুল নেই, এমনকি ভুরুও নেই। প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালে তার সম্পূর্ন শরীর কেশহীন, নির্মোল। বাপ-মা ছারা এই কাল্লুর স্থান ছিল শহরের আস্তাকুঁড়ে। পোকামাকড়ের মতন আবর্জনা খুঁড়ে খেত, তার এই বিচিত্র স্বভাবের জন্য এলাকার ছেলেরা তাকে দেখলেই ঢিল মারতো। তুষার তাকে নিজের ঘরে আশ্রয় দিয়ে ভালো মন্দ খাইয়ে দুই দিনেই চাঙ্গা করে তুললো। কাল্লুর সাথে ভালোই সময় কেটে যাচ্ছে তুষার এর। কাল্লু শেখের নাম পরিবর্তন করে রাখলো সুলতান। আর বললো, তোর নাম আজ থেকে সুলতান। এই শহরের কাওকে ভয় পাবি না।

তারপর তুষার সুলতান কে বিভিন্ন রকম কলা কৌশল শেখাতে শুরু করলো। ইংরেজী বিদ্যাও অনেকটা শিখে ফেললো সুলতান। তাছাড়া ছাঁদ থেকে লাফ দেয়া, মাটিতে গড়াগড়ি করা, শ্বাস আটকে রাখা, নদীতে ডুব দিয়ে থাকার মতন আরো অনেক কিছু শেখাতে শুরু করলো একটা বিশেষ কারনে।

তুষারের কাছে প্রথম কাষ্টমার আসলো এক জুতোর ব্যবসায়ী। সেই ব্যবসায়ী কাশীপুর অঞ্চলে একটি বাড়ি করেছে আর সেখানে অনেক ভূতের ভয়। তুষার সেই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিলো এবং সাত দিনের মধ্যেই ভূত তাড়িয়ে দিলো। উল্লেখ্য যে, ব্যবসায়ীর বাড়িটির উপর এলাকার ছেলেদের নজর ছিলো। তাই তারা বাড়িতি দখল করে ছিলো, আর ভূতের ভয় দেখাতো। সুলতানের সাহায্যে তুষার সেই যাত্রায় ঐ ছেলেদের ই ভয় দেখিয়ে বাড়ি থেকে বিদেয় করে দিলো।

এভাবে, তুষারের খ্যাতি বাড়ছিলো দিন দিন। অনেক যায়গা থেকে অনেক মানুষ তার কাছে আসতে শুরু করলো। রাত হলেই তুষার বেড়িয়ে পরে অজানা শহরটি দেখার জন্য। নানান যায়গায় হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেরায়। কখনো কোন মন্দিরে যায়, কখনো কারো বাড়ির আশেপাশে আবার কখনো কু-পল্লীর বাইরে দিয়েও যাতায়াত করে। কখনো কু-পল্লীর ভেতরে যাওয়া হয় না।

তুষারের এলাকা থেকে মাইল সাতেক উত্তরে এক সুনামধন্য ব্যবসায়ীর বাড়ি। যেমন আছে তার টাকা পয়সা, তেমন ক্ষমতা। তার বাড়িতে নাকি ভূত আছে, এমন প্রস্তাব দিয়ে এক সাধু আর তার কিছু চ্যালা কামুণ্ডারা আস্তানা পেতেছে ব্যবসায়ীর বাড়িতে। সাধু’র কথা হলো, বাড়িতে তারা আছেন। অনেক সমস্যায় আছে তারা। তাদের মনে অনেক ক্ষুদা, তাদের খেতে দিতে হবে। এইসব শুনেতো ব্যবসায়ী খুব ভয় পেয়ে গেলো এবং সাধুর কথা মতন বাড়ির মধ্যেই এলাহি কান্ড করে বসলো। আস্ত খাসি রান্না হলো ৭ টা, সাত মণ চালের পুলাও, ৭ টা মুরগীসহ মোট ৭ সংখ্যক খাবার আয়োজন করা হলো। ভূতেরা নাকি ৭ অনুযায়ী না হলে মুখেও আনবে না। আর সাত জন আছে ভূত এই বাড়িতে।

যে দিন ভূত তাড়ানো হবে সেই দিন সন্ধায় ব্যবসায়ীর বাড়ির সামনে যেনো মানুষের মেলা বসে গেলো। এত মানুষ যে যায়গা দেওয়াও কষ্ট হচ্ছে। তাদের সাথে তুষার আর সুলতান ও এসেছে ভূত তাড়ানো দেখতে। তারা সবাইকে ঠেলে ঠুলে সামনের সারিতে গিয়ে বসে পরলো। একটা বড় ঘরে সাজানো হয়েছিলো সব। একটা জলচকি’র উপর সাধু আর কিছু চ্যালা বসে ছিলো। তাদের সামনেই যজ্ঞের আয়োজন আর তার একটু দূরেই খাবার রাখা।

তারপর সেই সাধু চিৎকার করে দুর্বোধ্য মন্ত্র শুরু করলো। আর তার চ্যালারা ধুপ-ধূনোর ধোঁয়ায় কাঁদিয়ে অস্থির করলো সবাইকে। এমন সময় হটাৎ মন্ত্র থেকে যেতেই নেমে এলো অদ্ভুত নিরবতা। তারপর প্রথাসিদ্ধ ভূতের মতন সুর করে কে যেনো বললো, “দূর হয়ে যা, সবাই ঘর থেকে দূর হয়ে যা”।

শুধুমাত্র সাধু আর তার চ্যালাগুলো ছাড়া সকলেই বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। শুধু দরজা আর জানালা গুলো খোলা রইলো। দূর থেকেই দেখা গেলো ধোঁয়ায় ভর্তি অন্ধকার ঘরের মধ্যে অনেক ছাড়ামূর্তি এদিক ওদিকে ঘুরছে। চক-চকাস, কড়র-মড়র শব্দ হতেই বোঝা গেল পেতাত্মা খাবার খাওয়া শুরু করছে। দর্শক যারা ছিলো তাদের মধ্যে অনেকে ভরে কাঁপতে লাগলো, অনেকে আবার অজ্ঞানও হয়ে গেলো। কয়েক মূহুর্ত পর অবশ্য দেখা গেলো অন্য রকম কান্ড। হটাৎ ওয়াক-ওয়াক শব্দ শুরু হলো। ভূতে বমি করছে। সে কি সাঙ্গাতিক বমি। মনে হবে এই যেনো ভূতের প্রান বেরিয়ে গেলো।

সবাইকে হতবাক করে দিয়ে হো হো করে তুষার হেসে উঠলো। তারপর ঘরের মধ্যে যেয়ে লাইট জ্বালিয়ে দেখা গেলো, সাধুর চ্যালা চামুণ্ডারাই খাবার খেয়ে বমি করছে। ব্যাপার আর কিছুই না, অন্ধকারে ধোঁয়ার সুযোগে তুষার সুলতানকে দিয়ে ভূতের খাবারে অনেকটা টারমেরিক অ্যাসিড মিশিয়ে দিয়েছিলো। যার থেকে এই অবস্থা। ঐ অ্যাসিড পেটে গেলে খাবার পাঁচ মিনিটের বেশী উদরে রাখা সম্ভব না। তারপর হাসতে হাসতেই তুষার সুলতানের কাঁধে হাত দিয়ে বললো, এবার চল।

এভাবেই চলছিলো দিন। তারা অনেক জায়গায় যায় আবার অনেকে অনেক সমস্যা নিয়ে তাদের কাছে সমাধান এর জন্য আশে। কিন্তু কথায় আছে না, সবার ভাগ্যে বেশীদিন সুখ সহ্য হয় না। তুষারের বেলায় ও তাই হলো। রাতে রাস্তায় ঘুরাঘুরি করা পুরনো স্বভাব ছিলো তুষার এর। একদিন কু-পল্লীতে হাঁটার সময় এক বারবনিতাকে দেখলো কিছু লোকের সাথে ঝগড়া করছে। মেয়েটা আকুল স্বরে ডাকতে লাগলো তুষারকে। তুষার সামনে সাহায্যের জন্য ঐ ছেলেগুলার কাছে যেতেই শুরু হলো কথা কাটাকাটি আর তারপর মারামারি। সবগুলো নেশার ঘোরে ছিলো বলে মারার সময় হুশ জ্ঞান ছিলো না। তুষারকে অনেক মার খেতে হলো। কারন, একা এত লোকের সাথেতো আর পারা যায় না। কিন্তু ভাগ্যের ব্যাপার হলো, মেয়েটিকে নিয়ে অবশেষে পালিয়ে যেতে পেরেছিলো সে। রাতের অন্ধকারেই মেয়েটিকে নিয়ে এলো তার গৃহে। কিন্তু তার যেই হারে প্রহার করেছে তাতে তুষারের অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে গেলো। শরীর থেকে অনবরত রক্ত পড়ছে। কিছুতেই রক্ত বন্ধ করা যাচ্ছে না। রাতের আঁধারেই মেয়েটি আর সুলতান মিলে তুষারকে ভর্তি করলো পাশের একটি হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতাল এ নিয়েও তেমন কোন কাজ হলো না। শরীর থেকে অনেক রক্ত বেরিয়ে গেছে। কিন্তু হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে রক্ত ছিলো না পর্যাপ্ত। তার উপর তুষার কিছুক্ষন পর পর বমি করছিলো। বমির সাথে মাঝে মাঝে রক্ত বেড়িয়ে আসছিলো। সারারাত অনেক কষ্ট যন্ত্রনা সহ্য করে সকালের প্রথম প্রহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো তুষার।

মৃত্যুর পর একটা নিষ্পাপ শিশুর মতন লাগছিলো তাকে। নিষ্পাপ বলেই সে কাওকে ঘৃনা করে না। ঘৃনা নাই বলেই বেদনা আছে, যাতনা নাই। সেই বেদনার তীব্রতাই তার প্রানে একটি অপূর্ব রসের সঞ্চার করে-মৃত্যুকেও অমৃত করে তোলেছে।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – ষষ্ঠ পর্ব (ফেলুদা)

Abdullah-Al-Mahmood Showrav

রেললাইনের জীবন্ত লাশ

Rihanoor Islam Protik

স্বপ্নের কাছেও স্বপ্ন

Abid Pritom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy