Now Reading
পারমিতার দিনলিপি



পারমিতার দিনলিপি

 

 

ঘড়িতে রাত তিনটা বেজে দশ মিনিট।

একটু পরে ভোরের আলো ফুটবে আর চারদিকে পরিস্ফুটিত হবে নতুন আলোয়।আমার জীবনে এমন ঘোর আমানিশার অন্ধকার চলে আসবে তা কখনো ভাবতে পারি নি।বছর দুয়েক আগে পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে করেছিলাম আমি আর নীলা।বিয়ের পর তার স্বভাবসুলভ স্বাভাবিকতার জন্য তার সাথে মানিয়ে নিতে আমাকে বেগে পেতে হয় নি।আমাদের জীবনে প্রেম-ভালবাসার মত আপেক্ষিক বিষয়গুলো বেশ মধুর হয়ে ধরা দিতে লাগল।

একটা সময়ে একটা কালো থাবা যেটা কিনা ধীরে ধীরে ভর করতে লাগল দুজনের মাঝে।পরিবার,সমাজ আর পারিপার্শ্বিক বাস্তবতায় একটা সময়ে সবাই নীলাকে সন্তান নেয়ার জন্য চাপ দিতে লাগল।মূলত দুজনের উপর চলে আসল।বিয়ের এতদিন পর সন্তান না হওয়ার দরুণ নানা তিরস্কার বা কটু মন্তব্যগুলো যেন নীলাকে উদ্দেশ্য করে ছুঁড়তে লাগল।এই মেয়েটি স্বভাবে চাপা স্বভাবের হওয়াতে কখনো আমাকে বলে নি সে এতো কষ্ট সয়ে আসছিল।গত কয়েকদিন ধরে তার মন খারাপ দেখেছি কিন্তু নিজে কিছু না বলায় আর আমি আর জানতে চাইনি।তার কষ্টের বোঝাটা এতখানি ভারী হবে ভাবতে পারি নি।

আমি অফিসে চলে যাওয়ার পর শুনতে পেলাম সে নাকি আত্মহত্যার জন্য চেষ্টা করেছে। এই যাত্রায় ডাক্তার তাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছে কিন্তু আমি এখনো তার মুখোমুখি হতে সাহস পাচ্ছি না। নীলা এখন শংকামুক্ত হয়েছে আসলে কি এখনো শংকামুক্ত হতে পেরেছে।এই সমাজের মানুষগুলো তো তাকে স্বস্তির নিঃশ্বাসটুকু ফেলতে দিবে না।নীলা যে কখনো সন্তানের মা হতে পারবে না তা আমাকে বিয়ের প্রথম দিন বলে দিয়েছিল।আমি অনেকটা নিজের অবহেলায় বিষয়টা পরিবারের সাথে মোকাবেলা করে নিতে পারি নি।এটা আমার চরম ব্যর্থতা।

রাত সাড়ে তিনটা……..

হঠাৎ দেখি হাসপাতালের করিডোরের সামনে ছোট একটা জটলা।আমি একটু আগ্রহী হয়ে গেলাম।একটা রোগীকে নিয়ে বাগবিতন্ডা চলছে।পরিবারের লোকজন সিদ্ধান্ত দিতে পারছিল না রোগীকে কি অপারেশন করাবে নাকি নরমাল ডেলিভারী করাবে।মেয়েটি সন্তানসম্ভবা ছিল তাই ব্যাথায় কাতরাচ্ছিল।আমি নিজে তার দুরবস্থা দেখে কর্তব্যরত ডাক্তারকে রাজি করালাম তাকে যেন তাড়াতাড়ি অপারেশনে নিয়ে যায়।আমি এই সময় তাকে রাখা বেডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।

এই সময় নরম একটা হাত খুব শক্ত করে আমার হাতে চেপে ধরল। আমি খুবই অবাক হলাম আর সারা শরীর শিহরিত হয়ে উঠল।মেয়েটির হাতটা ঠকঠক করে কাঁপছিল।আমি পিছন ফিরে তাকাতে দেখি একজোড়া চোখ ছলছল করছে আর আমাকে কাঁপা গলায় কিছু একটা বলছে।এই সময় তার স্বর খুবই অস্পষ্ট ছিল।আমি তার চোখের পানে তাকিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। এসময় তার কাছে গিয়ে জানতে পারলাম …..

সে বারবার বলছে ভাইয়া আমার সন্তানটাকে বাঁচান…. এই কথাটা

আমি তাকে দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হওযার কারণ হলো এই মেয়ে তো আমার গ্রামের তাকে বছর দুয়েক আগে দেখেছিলাম কি স্বর্তস্ফূর্ত মানসিক অবস্থায়।আজকে এই অবস্থায় যেখানে সে প্রতিটি মুহুর্ত নিঃশ্বাসের সাথে পাঞ্জা লড়ছে।যেখানে দুটো পক্ষে রয়েছে জীবন আর মৃত্যু।

ইতিমধ্যে ডাক্তার তাকে নিয়ে অপারেশন রুমে চলে গেল।আমি বাইরে লম্বা টুলটাতে পা দুটো টেনে বসে আছি।আমি এবার স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম।এইতো সে মেয়েটা যে কিনা আমার কাছে এসেছিল কলেজ ভর্তি হতে গিয়ে কিছু কাগজপত্র সই করিয়ে নিতে।আমার কাছে আসার একটা কারণ ছিল তার বাড়ি আমার বাড়ি একই গ্রামে।বাড়ি থেকে আসার সময় নাকি বাবা বলে দিয়েছে কোন কাজে সমস্যা হলে যেন আমার কাছে আসে।

আমার রুমে ঢুকতে ভদ্রতার খাতিরে বলেছিল…..

স্যারঃআমি পারমিতা ।আসতে পারি ?

তার নামটার মধ্যে একটা মুগ্ধতা জড়িয়ে আছে।আমি সেদিন তার যাবতীয় কাগজপত্র গুছিয়ে দিলাম।সে আমার ভরসায় তার কয়েকজন পরিচিতদের কাগজও আমার কাছ থেকে সই করে নিয়েছে।এই বিষয়টা নিয়ে আমি বেশ হেসেছিলাম।তারপর থেকে কলেজে পড়ার সময় তার খোঁজ খবর নেয়া হতো।পারমিতা খুবই স্বপ্নবিলাসী ছিল..।সে খুবই দুরদর্শী ছিল ভবিষ্যতে নাকি একজন উদ্যেক্তা হয়ে অবহেলিত আর পীড়িত নারীদের কর্মসংস্থানে কাজ করবে এমনটায় বলেছিল আমাকে সেদিন।

একটা সময় আমার কাজের ব্যস্ততা আর অন্যান্য ব্যস্ততায় তার খোঁজখবর নেয়া হয়ে উঠে নি।কেউ একজন বলেছিল তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে।মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মা হয়তো বিয়ে দিয়েছে।এই মেয়ের সাথে সেদিনের পর এমন ক্রান্তিলগ্নে এসে আবার দেখা হবে ভাবতে পারি নি।আমি তার সম্ভাব্য পরিণতি আর ভবিষ্যতের চিন্তা করে একটু ভীষণ্ণ হয়ে পড়লাম।এমন সময় একজন চিকিৎসক রুম হতে বের হল।আমি পারমিতার অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বললেন খুবই বাজে অবস্থা ।এখন কিছু বলা যাবে না।আমার চিন্তা আরো বেড়ে গেল।

পারমিতাকে নিয়ে আসা লোকগুলোকে দেখছি না তাদের কথাবার্তা বেশ অসংলগ্ন ছিল।তাই আমি নিজে তাদের কিছু বলতে যায় নি।এই সময় নীলার কেবিনে গিয়ে একটু দেখে আসতে হবে।তাই সেদিকে গেলাম।এতক্ষণ নীলার কথা খেয়াল ছিল না।নীলা ঘুমাচ্ছে বেশ ক্লান্ত ছিল।তার শরীরের উপর বেশ ধকল গেছে।আগামীকাল ভোরে কথা বলব।এখন ঘুম ভাঙ্গিয়ে তার সাথে কথা বলাটা অনুচিত হবে। ফোন বেজে উঠায় আবার চলে গেলাম পারমিতার ওখানে…..

সেখানে গিয়ে দেখি সব নীরব নিস্তব্ধ।আমার জন্য এখানেও খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে না তো ? আমি নিজে নিজে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম।ওখানকার চিকিৎসক এসে আমাকে টেনে একপাশে নিয়ে গেল তখন আমি বেশ ভীত হয়ে পড়লাম।আমার আশংকা সত্যিই হল।এই অল্প বয়সে নিজের জীবন স্বামী সংসার সন্তান এইসব নিয়ে অনেক বড় একটা যুদ্ধ করেছে মেয়েটি।একটা সময় বাস্তবতার কাছে হেরে গিয়ে বিদায় নিল নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে।আমি আমার পরিচিতদের ফোন করে তার বাড়িতে ফোন দিয়ে তার অন্তিমযাত্রায় যেন কমতি না থাকে সেই অনুযায়ী চেষ্টাটুকু করলাম।

সকালের আলো ফুটল।আমার জীবনের এক বর্ণনাতীত রাত কাটালাম যেখানে হারানোর শংকা-উদ্বেগ যেমন ছিল কষ্টও ছিল।পারমিতার মৃত্যুটা আমাকে অনেকদিন তাড়িয়ে বেড়াবে।আমি চোখ বন্ধ করলেই তার ভেজা চোখজোড়া আমার সামনে ভেসে আসে।

নীলা সকালে ঘুম ভেঙ্গে উঠেছে…আমাকে দেখে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।আমি বিচলিত না হয়ে তাকে স্বান্তনা দিতে লাগলাম।আমি যদি তাকে বুঝতে দিই যে কষ্ট পেয়েছি তবে সে আরো কষ্ট পাবে।একজন নার্সের সাহায্য নিয়ে নীলাকে একটা হুইল চেয়ারে বসিয়ে আমি দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছি।

এই সময় নীলা আমার কাছে বারকয়েক জানতে চাইল কোথায় নিয়ে যাচ্ছি ?

আমি অনেকটা গুরগম্ভীর স্বরে বললাম তুমি আমার কাছ থেকে মুক্তি চেয়েছিলে ? তাই না?

আমি তোমাকে মুক্তি দিতে নিয়ে যাচ্ছি।আজকের পর তোমাকে কেউ আর কোন কষ্ট দিবে না।

এই কথা শোনার পর নীলা একটা কথাও বলল না।দেখলাম খুব জোরে হুইল চেয়ারের হাতল ধরে আছে।আমি হুইল চেয়ার নিয়ে করিডোর ছেড়ে বাইরে আসতে আমার দিকে একবার তাকানোর চেষ্টা করেছে।

আমার মস্তিস্কে এই সময় কি চলছে তা আমি নিজেই অনুভূতির ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।একটা উন্মাদনা আমার মাথায় ঝেঁকে বসেছে।এই কাজ শেষ না করে আমার নিস্তার নেই।এটা বুঝলাম।

চলবে………

About The Author
Rajib Rudra
Rajib Rudra

You must log in to post a comment