Now Reading
উইনচেস্টার রাইফেল এবং উইনচেস্টার পরিবারের অভিশপ্ত পরিণতি।



উইনচেস্টার রাইফেল এবং উইনচেস্টার পরিবারের অভিশপ্ত পরিণতি।

অস্ত্রের আবিষ্কার পৃথিবী থেকে কেড়ে নিয়েছে অজস্র প্রাণ। অস্ত্র নিয়ে ভাই ভাইয়ের উপর, বন্ধু বন্ধুর উপর, পুত্র পিতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে যারা এইসব আবিষ্কার করেছে তারা কামিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। মানুষের রক্তমাখা এই অপরিমিত অর্থ কি তাদের জীবনে সুখ এনে দিয়েছে? চলুন পাঠক আজকে জেনে নেই এমনই একটি পরিবার উইনচেস্টার পরিবারের গল্প।

১৮৬৬ সালে প্রথম উইনচেস্টার রাইফেল বাজারে নিয়ে আসে উইনচেস্টার রিপিটিং আর্মস কোম্পানি। উইনচেস্টার রিপিটিং আর্মস কোম্পানির হিসাবরক্ষক এবং সিংহভাগ শেয়ারের মালিক উইলিয়াম উইর্ট উইনচেস্টার-এর নামানুসারে এই রাইফেলের নামকরণ করা হয়। এটিই হচ্ছে বিশ্বের প্রথম নির্ভরযোগ্য রিপিটার রাইফেল। যা কিনা একবার লোড করে ১৫টি বুলেট ফায়ার করতে পারত। রাইফেল এর ট্রিগার এর পিছনে একটি লিভার থাকত যা পুনঃপুন গুলি ছুড়তে সাহায্য করত। তাই এটিকে লিভার অ্যাকশন রাইফেল ও বলা হয়। এর আবিষ্কার যুদ্ধক্ষেত্রে আমেরিকানদের হাতে এক অসম ক্ষমতা এনে দেয় কারণ তৎকালীন সময়ে আর কারো কাছে এই ধরণের রিপিটিং রাইফেল ছিল না।cq5dam.web.835.835.jpeg

সেইসময় অন্য বন্দুক বা রাইফেলগুলো প্রত্যেকবার গুলি করার পূর্বে ব্যারেলে গুলি লোড করা এবং গান পাউডার ভরতে হত। তাছাড়া অন্যান্য বন্দুকগুলো ছিল ভঙ্গুর এবং প্রায়ই মিসফায়ার বা ব্যাকফায়ার করত এতে করে অনেকসময় বন্দুকবাজ নিজেই নিজের বন্দুকে ধরাশায়ী হত। এই উইনচেস্টার রাইফেলকে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার বলে ধরা হয়। কারণ এই বন্দুক দিয়েই আমেরিকানরা বুনোপশ্চিম থেকে আমেরিকার আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদেরকে বিতাড়িত করে পশ্চিমে তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। উইনচেস্টার রাইফেল তৎকালীন সময়ে এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করে ছিল যে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের শাসনকর্তাদের মাঝে এর জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। প্রাথমিক অবস্থাতেই ফ্রান্স এবং অটোমান সাম্রাজ্যের(বর্তমান তুরুস্ক) সরকারের কাছ থেকে প্রায় ৩৮.২৫ মিলিয়ন ডলারের অর্ডার পায় উইনচেস্টার রিপিটিং আর্মস কোম্পানি। তাছাড়াও এই রাইফেল ১৮৭৭-৭৮ এর রুশ-তুর্কি যুদ্ধ, ১৮৮৫ সালের ক্যানাডার নর্থ-ওয়েস্ট বিদ্রোহ, স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধ, মেক্সিকান বিদ্রোহ সহ এমন আরও অনেক যুদ্ধক্ষেত্রে বহুল ব্যবহার হয়। যা কেড়ে নেয় শত শত সৈন্য এবং নিরীহ প্রাণ আর অপরদিকে উইনচেস্টারদের অস্ত্র ব্যবসায় ফুলে ফেঁপে উঠে। কিন্তু মানুষের অভিশাপে গড়া বিত্তবৈভব কি সুখ এনে দিতে পারে। যেই বছর (১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দ) উইনচেস্টার রাইফেল বাজারে ছাড়া হয় সেই বছরেই উইলিয়াম উইর্ট উইনচেস্টারের একমাত্র মেয়ে অ্যানি পাদ্রে উইনচেস্টার মাত্র ৫ বছর বয়সে মারা যায়। উইলিয়াম উইর্ট উইনচেস্টার এবং তার পত্নী সারাহ উইনচেস্টার তাদের একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে শোকে মুষড়ে পড়েন। এই শোক না কাটতেই ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে তার শ্বশুর উইনচেস্টার রিপিটিং আর্মস কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা অলিভার উইনচেস্টার মারা যান। মাত্র এক বছরের ব্যবধানেই এবার  উইলিয়াম উইর্ট উইনচেস্টার বাবার পথ ধরলেন। ১৮৮১ সালের ৭ই মার্চ আমেরিকার কানেক্টিকাটের ওয়েস্ট হেভেনের এক হাসপাতালে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন উইলিয়াম উইর্ট উইনচেস্টার। সবাইকে হারিয়ে স্ত্রী সারাহ উইনচেস্টার ভীষণভাবে ভেঙ্গে পড়লেন, তার মাথায় গণ্ডগোল দেখা দিল তার মনে হতে থাকল এইসব হয়ত কোনো অভিশাপের পরিণাম। যদিও স্বামীর মৃত্যুতে তিনি উইনচেস্টার কোম্পানির অর্ধেক মালিকানা, সঙ্গে উইলিয়ামের রেখে যাওয়া প্রায় দুই কোটি ডলারের সম্পদের একমাত্র মালিক হলেন তবুও অর্থ কি সব সুখ ফিরিয়ে দিতে পারে। এবার তিনি ভাবলেন এই অভিশাপ কাটাতে কিছু করা দরকার। তিনি একটি যক্ষ্মা নিরাময় হাসপাতাল তৈরির কাজ শুরু করলেন। এরপরই তার মাথায় অদ্ভুত এক ভূত চাপে,  তিনি এক তান্ত্রিকের দারস্ত হন। তান্ত্রিক তাকে জানায়, তার পরিবারের উপর কঠিন অভিশাপ লেগেছে, উইনচেস্টার রাইফেলের গুলিতে মৃত ব্যাক্তিদের অশরীরী আত্মার অভিশাপ। এই অভিশাপ কাটাতে হলে হাসপাতাল বানালে হবে না। এইসব অভিশপ্ত আত্মারা যারা পৃথিবীতে আটকে আছে তাদের থাকার জায়গা চাই। এর জন্য একটি বাড়ি বানাতে হবে। আত্মাদের থাকার জায়গা করে দিলে তবেই মিলবে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি। তান্ত্রিক তাকে পশ্চিমে কোথাও বাড়ি তৈরি করার পরামর্শ দেন। এবার সারাহ তান্ত্রিকের কথামত চলে এলেন ক্যালিফোর্নিয়ার সান হোসেতে। সেখানে সাড়ে চার হাজার একর জায়গা নিয়ে ভিক্টোরিয়ান স্টাইলে শুরু করলেন আত্মাদের জন্য বাড়ি তৈরির কাজ। প্রাসাদসম ঐ বাড়ির কাজ চলে দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে। সেই আমলেই এই বাড়ি তৈরির জন্য খরচ হয় প্রায় ৫৫ লক্ষ ডলার। বাইরে থেকে দেখতে এটিকে চোখধাঁদানো একটি প্রাসাদ বলে মনে হলেও এটি ভিতরে ছিল অদ্ভুত, অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং গোঁজামিলে ভরপুর। পাঠক এমন একটি ভূতুড়ে সিঁড়ির কথা ভাবুন যেটি নিচতালা থেকে সরাসরি উঠে গেছে উপরে, যা দিয়ে আপনি অন্য কোনও তলায় যেতে পারবেন না, যা একবারে সিলিং-এ গিয়ে শেষ হয়েছে কিংবা এমন কোনও সিঁড়ি যা শুরু হয়ে শেষ হয়েছে হঠাৎ মাঝ পথে। এভাবেই এমন অসংখ্য গোঁজামিল আর হেঁয়ালিপনায় ভরপুর এই উইনচেস্টার ম্যানর। আবার এমনও হলওয়ে আছে যেগুলো যেতে যেতে হঠাৎ একটি দেয়ালের সামনে থমকে গেছে কিংবা হয়তো ঘুরে-ফিরে একই জায়গায় এসে থেমেছে। কোনো কোনো দরজার ওপাশে আবার খাড়া গর্ত। অনেক স্কাইলাইট বসানো হয়েছে দুই ঘরের মাঝখানে। কোথাও হয়তো একটি চিমনি আছে, কিন্তু সেই চিমনির ধোঁয়া বের হওয়ার পথ নেই। কোথাও হয়ত নিরেট দেয়ালের মধ্যে জানালা দেয়া, জানালা খুলে এর সামনে দেখতে পাবেন নিরেট দেয়াল। কিন্তু এই অদ্ভুত বাড়িটিতেও শান-শওকতের কোনো কমতি ছিল না। সোনা-রুপার ঝাড়বাতি, জার্মানি থেকে আনা রুপা-তামার দরজা, নকশা কাটা কাঠের মেঝে, বাথরুমে গরম পানির ব্যবস্থা, সুইচ টেপা গ্যাসের বাতি, বৈদ্যুতিক-হাইড্রলিক দুই ধরনের লিফট— সেকালের আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা থেকে শুরু করে পারস্য আর ভারত থেকে আনা দামি দামি সিল্ক-লিনেন-শাটিন কাপড়ের দামি পর্দা কি নেই এই ভূতুড়ে বাড়িতে। লোকমুখে শোনা যায়, উইনচেস্টার রাইফেলের গুলিতে মৃত ব্যাক্তিদের অশরীরী আত্মারা যাতে তাদের পরকালে শান্তিতে থাকতে পারে এবং বের হয়ে আর যাতে কারো ক্ষতি করতে না পারে তাই এমন গোলোকধাঁদার মত বাড়ি তৈরি করেছিলেন সারাহ। ১৯২২ সালে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই বাড়ির কাজ চলতেই থাকে। শেষকালে এসে সারাহ একা জীবন-যাপন করতেন, বাড়ি তৈরির মিস্ত্রি আর কিছু ঘনিষ্ঠ চাকর ছাড়া আর কারো সাথে যোগাযোগ করতেন না। তাই আর কোনোদিন হয়ত জানা যাবে না এমন ভূতুড়ে বাড়ি তৈরির পিছনের রহস্য।

About The Author
Rysul Islam
Rysulislam

You must log in to post a comment