Now Reading
ধ্রুব’র কাহিনি (শেষ পর্ব)



ধ্রুব’র কাহিনি (শেষ পর্ব)

(পঞ্চম পর্বের পর…)

যেই কথা সেই কাজ। তাই হল। জন্মদিনের দিন, খুশবুর প্রিয় চকোলেটগুলোর সাথে একটি চিঠি দিয়ে সব বলে দিল ধ্রুব।

কিন্তু সেই চিঠি দেওয়ার পর যা হয় তাতে অত্যন্ত খুশি হয় ধ্রুব। প্রথমবারের মত খুশবুর ফোনকল আসে তার মুঠোফোনে, এবং ধ্রুবকে বলে যে আজ পর্যন্ত কোন ছেলেই তার জন্য এতটা অনুভুতি দেখায় নি। এবং উপহারটাকে খুশবুর ভাষায় ” কিউট ” উপাধি দেয়।
সেই সামান্য কিছু কথায়ই একদম লুতুপুতু হয়ে যায় ধ্রুব। আর আজ অবধি খুশবুর কথা মনে রেখে নিজেকে খুশি রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু স্কুল থেকে বের হওয়ার পর আর দেখা হয় নি তাদের।
গাড়ি চালাতে চালাতে এবার প্রশ্নটা করল শৈবাল, ” খুশবুকে বিয়ে করবি নাকি ? “। ধ্রুবর সরল উত্তর ” না, ব্যাস জানতে চাইলাম আরকি কেমন আছে “। তারপর শৈবাল জানতে চায় “তাহলে বিয়েটা করবি কাকে?”। এই প্রশ্ন করতে করতেই পৌছে যায় তারা ধ্রুবর বাড়িতে। গাড়ি থেকে নেমে ধ্রুব বলল ” মৌ’র কথা জানিস ?”।
এই কথাটি ধ্রুব উত্তর রুপে দিল নাকি আবারও এক সাধারণ প্রশ্ন করল তা শৈবালের বোধগম্য হল না। কিন্তু এটা প্রশ্ন বা উত্তর যেটাই হোক, কথাটা ভাল লাগে নি
তার। এবার শৈবাল খুব রাগান্বিত, রাগের সূরে ধ্রুবকে সে বলল ” নোয়াখাইল্লার লগে প্রেম করা এক্কেরেই ভালা কাম না “।
প্রচন্ড অবাক হয় ধ্রুব। শৈবালকে প্রায় কয়েক যুগ পর এমন রাগান্বিত হতে দেখেছে। শেষ দেখেছিল অনেকদিন আগে যখন বন্ধুরা তাকে বাথরুমে আটকে রেখে বাইরে থেকে দরজার খিল মেরে দিয়েছিল। কিন্তু আজকের রাগটা ভিন্ন। শৈবাল এই ভেবে ক্রোধিত যে মৌ ধ্রুবকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ধ্রুব একটু ভয়ই পেল বৈকি এই রাগ দেখে। তাই কিছুক্ষণের জন্য চুপ মেরে গেল। আর ভীষণ রাগ না হলে শৈবালের ভাষার এমন নাটকীয় পরিবর্তন হয় না। কোন জেলার ভাষা তা নিয়ে ধ্রুব একটু দ্বিধায় ছিল।

নোয়াখালির মেয়ে দেখে শৈবাল রেগে যায় নি এটা ধ্রুব নিশ্চিত। রেগেছে সে ধ্রুবকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল তাই। আর সে কারনেই নোয়াখালির সেই মেয়ের ব্যাপারটা ধ্রুব মুলতবী রাখল। কথাটা আর তোলে নি।

ঘরে প্রবেশ করল দুজনেই। সব জামা কাপর খুলেই মেঝেতে গা এলিয়ে দেয় ধ্রুব, শৈবাল এখনও মাথা গরম করে বসে আছে। মাথাটা তারাতারি ঠান্ডা করে নিতে একটা চুরুট ধরিয়ে নিল তারাতারি করে, ঘরের ভেতর ঘুর্নিঝড়ের মত ঘুরপাক খাচ্ছে ধোয়া গুলো। কার্বন ডাই অক্সাইডের সাথে মিশে ধোয়া বের হচ্ছে শৈবালের মুখ দিয়ে। এভাবেই যেন বেরিয়ে যাচ্ছে তার সব ক্লান্তি, তার সব রাগ। মৌ মেয়েটার কথা মনে পরতেই এভাবে তার মাথায় রক্ত চরে বসল। ধ্রুবকে খুব ভাল বন্ধু হিসেবে দেখে তো, বন্ধুর জীবনের সেই বাজে চাপ্টার টার প্রতি তাই রাগটা একটু বেশিই।
এতক্ষণে রাগটা একটু কমে গেছে শৈবালের। মেঝেতে বসল ধ্রুবর পাশে। ধ্রুব হাল্কা তন্দ্রাজনিত চোখে শৈবালের দিকে তাকিয়ে বলে চল বন্ধু ছাদে যাই না অনেকদিন। সন্ধ্যায় এই সুন্দর বাতাস পছন্দ হবে দুজনেরই, শৈবাল তাই আপত্তি জানায় না। নতুন কেনা বেনসনের প্যাকেট সহ দুজনেই উঠে গেল ছাদে। শৈবালের মাথায় এখনও চলছে ধ্রুবর মা’র মেজবানের কথা, কিন্তু ধ্রুবকে আবারও এই কথা বলে শুধুশুধু বিরক্ত করতে চাচ্ছে না সে। জিপ্পো দিয়ে জ্বালানো দুটো বেনসন দুইজন ধরিয়ে সুখটান দিতে দিতে গান ধরল। ১৬ মিনিটের এক গান। অনিকেত প্রান্তর। সুন্দর কিছু কথা একত্রিত করে কথায় সূর দিয়ে প্রাণ দেওয়া এক গান। কালো মেঘের নিচে বসে সাদা ধোয়া উড়িয়ে ঠান্ডা বাতাস খেতে ভালোই লাগছে ধ্রুবদের।

গান শেষ হওয়ার পর ধ্রুব শৈবালকে বলল ” বন্ধু তোর বিয়েতে কিন্তু আমি প্রাণ খুলে নাচব, নাচতে নাচতে হাত ঠেং সব ভেঙ্গে ফেলব “। শৈবাল হাসে তার কথা শুনে আজ তার মুখে বিয়ের কথাই বেশি। খুশবু, মৌ এবং শৈবালের বৌ, সব মিলিয়ে সব বিবাহ যোগ্য মেয়ে নিয়েই বোধহয় চিন্তা করছে আজকে। ব্যাপারটা বোধগম্য হচ্ছে না শৈবালের।

আজকে তারা এই ছাদেই রাতটা কাটিয়ে দিতে চায়। টিপ টিপ বৃষ্টিতে এখনই ভেজা শুরু করে দিয়েছে তারা। বারলেও আজকে নামবে না, থেকে যাবে ছাদেই। কিন্তু শৈবাল অসুস্থ হতে চায় না। এখন অসুস্থ হলে বড় বিপদ। ব্যাবসা অনেক ভালোভাবে এগোচ্ছে, এখন কোন ওলট পালট হলেই সবকিছুতে ধস নামবে। তাই শৈবাল নিচে নামল একটা ত্রিপাল এবং কিছু ড্রিঙ্কসের ব্যাবস্থা করতে। সারারাত ঘুমানো হবে না তাদের, গল্প করেই কেটে যাবে। তাই কিছু ড্রিঙ্কস সাথে রাখা দরকার।

কিন্তু নিচে নামতেই যে মুশলধারে বৃষ্টি শুরু হবে শৈবাল তা জানত না, সাথে শুরু হল বজ্রপাত। শৈবাল ধ্রুব কেউই বজ্রপাত ভয় পায় না। ছোটবেলা থেকেই এই অভ্যাস তাদের। কিন্তু খুবই জোড়ে শব্দ হচ্ছিল বজ্রপাতের। সেই দিকে মাথা না ঘামিয়ে শৈবাল স্টোর রুম থেকে ত্রিপাল এবং ফ্রিজ থেকে ড্রিঙ্কস গুলো বের করে নিয়ে যাচ্ছিল ছাদে। কিন্তু হঠাৎ মনে হল ধ্রুবর জন্য একটা তোয়ালে এবং একটা লুঙ্গি নিয়ে যাওয়া দরকার, অনেকক্ষণ হয়ে গেল বৃষ্টিতে ভিজছে বেচারা।

সবকিছু নিয়েই গেল উপরে, ধ্রুব তখনও শক্ত হয়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছে হাসিমুখে। ভিজে একদম একাকার, শৈবাল দূর থেকেই দেখছিল, এবং ছাদে থাকা এক বেতের বিছানাটার ওপর ত্রিপাল লাগাচ্ছিল, মানসিক পরিস্থিতি মাত্রই স্বাভাবিক হওয়া বন্ধু যেন বৃষ্টিতে সব দুঃখ ভিজিয়ে নিচ্ছে তাই ভেবে আর ডাকল না।

কিন্তু অনেক ভেজা হয়ে গেছে, শৈবালের ত্রিপাল লাগানোও শেষ তাই ধ্রুব কে এখন ডাকা উচিৎ নাহয় অসুস্থ হয়ে যেতে পারে সে। ধ্রুব এক কথায় সাড়া দেওয়ার মানুষ না, শৈবাল তা জানে। পাচ ছয় বার ডাকার পরেও সে আসে নি, এইবার বাধ্য হয়ে ধ্রুবর নিজেরই যেতে হল বৃষ্টির নিচে তাকে টেনে আনতে।
কিন্তু ঈশ্বর অন্য কিছু চাইতেন। ধ্রুবকে টেনে নিতে পারে নি শৈবাল, বরং এখন সেও বৃষ্টিতে বসে আছে। আর তার কোলে শক্ত হয়ে থাকা এক হাসিমুখের লাশ।

দুজনের একজনও বজ্রপাতকে ভয় পেত না কখনই। কিন্তু এখন থেকে শৈবাল অবশ্যই তার অভ্যাস পালটাবে।

About The Author
Prashanta Deb
Prashanta Deb
I am just a guy passionate about films and I am trying my best to develop my skills as an actor. Writing is one of my many hobbies.

You must log in to post a comment