Now Reading
“ নিরাপত্তাহীনতার বলয়ে শিশুরা ” সমাজের করণীয় কি ?



“ নিরাপত্তাহীনতার বলয়ে শিশুরা ” সমাজের করণীয় কি ?

কিশোর কবি সুকান্তের কন্ঠে উদাত্ত আহব্বান ছিল নবজাতকের জন্য করে যেতে হবে এই পৃথিবীকে জঞ্জালমুক্ত। এই জঞ্জালের ভেতর নবজাতকের বেঁচে থাকা কতখানি দুস্কর তা হয়তো কবির মনে একটা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। সময়ের স্রোতে কবি আজ আমাদের মাঝে নেই। কবির চিন্তা বা উদ্বেগ আজ যেন বার বার ফিরে আসছে প্রতীয়মান হয়ে। আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটে একটা পরিবারতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এখানে বাবা,মা,ভাই,বোন সকলে একটা সৌহার্দ্যের বন্ধনে থাকে।

জন্মের পর মানব শিশুর যে আত্মা তা অনেকটা অবচেতন কেননা তখন তার কোন অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে তাড়িত করতে পারে না। একটা সময় অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করতে করতে যোদ্ধায় পরিণত হয়। প্রতিটা শিশুর অন্তরে লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের কোন এক মূর্তমান চরিত্র। এই চরিত্রের গঠন ও লালন পালনের জন্য যাবতীয় কিছু করতে হয় শিশুর পাশাপাশি পরিবারের অন্য সকলকে। একটা শিশুর মানবাত্মা কাঁচা মাটির পিন্ডের মতো,শিল্পী কাঁচা মাটির পিন্ডকে লক্ষ্য করে তার মনের যে স্বীয় চিন্তা তার প্রতিফলন ঘটায়।

তেমনি সমাজে বসবাসরত মানুষের আচরণ আর ভালবাসা একজন শিশুর মনে একটা শক্ত বুঁনিয়াদ গড়ে তোলে।

মানব জীবনের প্রতিটা স্তরের গুরত্ব রয়েছে তবে শিশুকাল বা জীবনের প্রথম স্তরই যেন সবচেয়ে গুরুত্ববহ। এই সময়ে শিশু সবচেয়ে বেশি মানসিক বা চারিত্রিক দৃঢ়তা নিয়ে বেঁড়ে উঠে। তাই একজন সচেতন বাবা মায়ের স্থানে অধিষ্ঠিত হয়ে আমরা কি এই দায়িত্ব থেকে সরে আসছি ? এই বিষয় নিয়ে ভাবা উচিত।

সমাজ বিজ্ঞানের আলোচনায় বলা আছে পরিবারের মাঝে  এমনকি বাবা মায়ের গন্ডির মধ্যে শিশুর জন্য একটা নিরাপদ বলয় থাকা উচিত। যেখানটায় শিশুর সার্বিক বিকাশে কোন বাধা আসবে না। আমাদের দেশে একান্নবর্তী পরিবারের প্রথা ভেঙ্গে ক্ষুদ্র পরিবার প্রথা গড়ে উঠছে। যেখানে শিশুর জন্য অপেক্ষা করে বহুমাত্রিক সমস্যা। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে তার সাথে অনেকাংশে কোন সহায়ক কেউ থাকে না। সমাজ বা পরিবারের ক্ষেত্রে উদ্ভুত পরিস্থিতির আলোকে এইসব সমস্যার সুষ্ঠু বিহিত করা জরুরী।

আমরা আধুনিকতার মোড়কে একটা পিছিয়ে পড়া সমাজব্যবস্থায় আছি। এখানে সামাজিক সুরক্ষা আইনগুলো খুবই দুর্বল। যা প্রচলিত আছে তার কোন সুষ্ঠু প্রয়োগ নেই বললে চলে। সমাজে বেড়ে উঠতে গিয়ে একটা শিশু নানানভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। এই সব পরিস্থিতি আমরা যেমন সৃষ্টি করি তেমনি এসবের প্রতিকারও আমাদের হাতে। এখন সময়ের দাবী আমরা কতটা সোচ্চার এই বিষয়াদি নিয়ে। সামাজিক প্রেক্ষাপটে এখন নানাভাবে শিশুদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যেমন আছে তেমনি অবহেলিত কাজেও আছে। এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের তদারকি যেমন নাই তেমনি পাশাপাশি রয়েছে উদাসীনতা।

আমাদের দেশে এখনো অনেক শিশু রয়েছে যারা শিশুসুলভ চরিত্রের গন্ডি হতে বের না হতেই তাদের নিয়োগ করা হয়  গৃহপারিচারিকার কাজে। শহরের উঁচু সু-সজ্জিত দালানের ভেতর এই রুপটা খুবই নিকৃষ্ট বলা যায়। আমি নিজের একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারি।

আমি টিউশনির সূত্রে এক বড়লোকের বাড়িতে পড়াতে যেতাম। আমার স্টুডেন্টের বয়সী একটা কাজের মেয়ে তাদের বাসায় কাজ করে। একদিন দেখি কাজের মেয়েটিকে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছে। চোখের সামনে মেয়েটিকে বারকয়েক মারতে বা খারাপ ব্যবহার করতে দেখে নিজে বেশ অস্বস্তির মধ্যে ছিলাম।

কলকারখানাগুলোতে দীর্ঘসময়ে কাজের বিনিময়ে যৎসামান্য মজুরি বা নানানভাবে নির্যাতন যা কিনা একটা সভ্য সমাজে শিশুর জন্য বরাদ্দ হতে পারে না। শিশুর মৌলিক অধিকারের কতখানি আমাদের সমাজ দিতে পারছে তা দৃশ্যমান বটে।

সম্প্রতি আমাদের দেশে শিশুদের উপর বিদ্বেষটা যেন বেড়ে গেছে। বিগত কয়েকবছরে শিশুর প্রতি বিদ্বেষ যে হারে বেড়েছে তা সমাজবিশারদরা একটা সামাজিক উৎকন্ঠা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ঢাকাশহরসহ সারাদেশে পরকীয়ার জেরে,সম্পত্তির বিদ্বেষ বা স্বার্থের জন্য এখন শিশুকে হাতিয়ার করছে। কোন তুচছ ঘটনার জেরে যেমন শিশুকে আছাড় মেরে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটছে। তেমনি শিক্ষিত পরিবারের স্বামী স্ত্রীর ঝগড়ার জেরে অবুঝ শিশুকে বেগোড়ে প্রাণ দিতে হচ্ছে।

কখনো কখনো অবহেলা বা নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতার ছলে দিনে দুপুরে শিশুকে পিটিয়ে মেরে ফেলছে। যেখানে দিনের আলোয় একজন শিশুকে মেরে তার ধারণকৃত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ সাইটে আপলোড করেও এইসব ঘৃণ্য অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এটা আইনের নিছক দুর্বলতা বলে দায় এড়ানো কোনভাবে সম্ভব নয়। একটা পোশাক কারখানায় কর্মরত শিশুকে শাস্তির নাম করে পায়ুপথে বায়ু প্রবেশ করিয়ে খুনের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটছে। হিংস্র বা কুৎসিত মানসিকতার কিছু অধিকারী লোক যারা কিনা এইসব উগ্রতা অনেকটা খেলাছলে ঘটিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি যৌন নির্যাতনের মতো  কু-লিপ্সা মেটানোর জন্য হিংস্র জানোয়াররুপী মানুষগুলো শিশুদের ছাড় দিচ্ছে না। ষাটোর্ধ্ব বয়সী লোকের লিপ্সার শিকারে পরিণত হচ্ছে পাঁচ বছরের বয়সী কোন মেয়ে শিশু। নারী পাচারের মতো ঘটনা যেখানে অহরহ ঘটছে যার ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই নারী শিশু। এটা সামাজিক অন্যায্যতার প্রতিপাদন বটে। আমাদের দেশে নারী শিশুরা এই আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার আড়ালে আবডালে একটা অদৃশ্য কালো থাবার ছত্রছায়ায় পড়ে আছে। যেখানে প্রতিমুহুর্তে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে নানা উৎকন্ঠা আর উদ্বেগ। তাদের বেড়ে উঠার স্বাভাবিক সুস্থ পথটা আমরা প্রতিবন্ধকতায় ভরিয়ে রেখেছি।

প্রতিটা পরিবার আর সমাজের শৃঙ্খলে একটা বিব্রতকর পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সর্বাগ্রে দায়ী বাবা-মা এবং পরিবারের কর্তারা। এখন পারিপার্শ্বিকতায় আমরা নিজেদের স্বার্থকে জড়িয়ে কোমলমতি শিশুকে যেমন রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করে আসছি,তেমনি যেকোন হীন স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ন্যাক্কারজনক ঘটনাও কম ঘটছে না। ইদানীংকালে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনার প্রেক্ষাপটে রোষানলের শিকার ও বেঁচে যাওয়া সকল শিশুর প্রতি রাষ্ট্র বা নীতিনির্ধারকরা কোন সুবিচার করতে পারছে না। কোন ঘটনার উল্লেখযোগ্য শাস্তির বিধান করতে না পারায় রাষ্ট্রের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির নেপথ্যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি।

একটা সমাজ বা রাষ্ট্রের অন্তরালে কেবল পরিবারই যেখানে নিরাপদ একটা বলয় দিতে পারে সন্তানকে। সেখানে আমাদের উদাসীনতা আর অবহেলার কারণে পরিবারের মতো সুরক্ষিত স্থানটা আজ কোন না কোনভাবে শিশুদের জন্য বিপদসংকুল একটা স্থান হিসেবে চিহ্নিত।

আজকের শিশুর মধ্যে ভবিষ্যতের ধারকের অস্তিত্ব নিহিত। আগামীতে সুন্দর একটা সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্য এগিয়ে চলার জন্য আমাদের উচিত গঠনমূলক কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরী।

যেখানে সুন্দর আগামীর পথচলায় প্রতিটা মানবশিশু দাঁপিয়ে বেড়াবে। এমন সুন্দর পথচলা কেবলই নিশ্চিত করতে পারি আমরা। এই পথচলার দ্বার তৈরিতে আসুন আমরা একটা পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যায়।

About The Author
Rajib Rudra
Rajib Rudra
5 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment