Now Reading
চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (দ্বিতীয় পর্ব)



চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (দ্বিতীয় পর্ব)

২৬ এপ্রিল, ১৯৮৬ মধ্যরাত। চেরনোবিল পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের চার নম্বর চুল্লীর নিয়ন্ত্রন কক্ষ। ঘটনা-দুর্ঘটনা এর শ্বাসরুদ্ধকর নাটকের শুরু এখানেই। বিপর্যয়ের পরের হাহাকার আর বেদনার বিষয় নানান ছবি আর লেখায় উঠে আসলেও, কিভাবে কি কারনে পারমাণবিক এই বিপর্যয়ের শুরু, তার বিবরণ অস্পষ্ট অনেক জায়গাতেই। এবারের পর্বে এবং পরবর্তী পর্বে থাকবে এই বিষাদের রঙ্গমঞ্চে ঠিক কি ঘটেছিল সে বিষয় কিছু কথা।

শহরের বাতিগুলো আস্তে আস্তে নিভে আসছিল। সারা দিনের খাটুনির পর ব্যাস্ত নগরী প্রিপিয়াট তখন ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাতি জ্বলছে কেবল ক্লান্তিহীন পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের ভেতরে। অন্য সব সাধারণ রাতের মতই যার যার শিফট শেষ করে একদল কর্মী বিদায় নিয়েছে, নতুন শিফটের কর্মীদের কাজ চলছে ঢিমেতালে স্বাভাবিক ভাবেই। ১৬০ জন কর্মী সে রাতে কাজ করছিল চার নম্বর পারমানবিক শক্তি কেন্দ্রে। ব্যস্তটা কেবল চার নম্বর শক্তিকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রন কক্ষে। আজ রাতে তারা একটি বিশেষ পরীক্ষা চালাবে। নিরাপত্তামুলক এই পরীক্ষা চালানোর জন্যে আজকের দিনটি ধার্য করবার কারন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্যে মূল বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে সাময়িক ভাবে এই পারমানবিক চুল্লীটিকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। চেরনোবিলের চার নম্বর এই  চুল্লীর সাময়িক ছুটির আগে তাই বিশেষ এই পরীক্ষার আয়োজন। কেউ তখনও জানতো না, চুল্লীর সাময়িক ছুটি কেবল এরই আজীবনের ছুটিতে পরিণত হবে না সেই সাথে অসীম ছুটির দেশে নিয়ে যাবে অসংখ্য মানুষ আর শহরকেও।

নিরাপত্তা মূলক এই পরীক্ষাটি চেরনোবিলে অন্য শক্তিকেন্দ্রে গুলোতে আগেও করা হয়েছিল। ১৯৮২,৮৪ এবং ৮৫ সালে। কিন্তু প্রতিবার কোন না কোন ত্রুটির কারনে পরীক্ষাটি সফল হয় নি। তাই আবারো ১৯৮৬ সালে পরীক্ষাটি করবার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তিপক্ষ। বিগত বারের ভুল গুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সুবিশাল নির্দেশনাও পাঠানো হয় পরীক্ষাকারী দলের কাছে। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগেই বেশ কিছু ত্রুটি রয়ে যায় এই প্রক্রিয়ায়।

প্রথমত, ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বচ্চ গুপ্ত সংস্থা ‘কেজিবি’ পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের পরিচালকদের বার-বার সতর্ক করে দেয় যে, চেরনোবিলের এই শক্তিকেন্দ্রগুলোর গঠনে বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে। যে কোন সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু ক্ষমতা আর শক্তির মোহে অন্ধ কর্তিপক্ষ তখন ছিল অন্ধ, তারা নিজেদের অন্যতম সংস্থা কেজিবির কথাও শুনতে আগ্রহী হয়নি।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারন, পারমাণবিক দুর্ঘটনা সম্পর্কে সবার বাস্তব ধারনার অভাব। যেহেতু এর আগে কোন পারমাণবিক শক্তি চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি তাই এই মহাশক্তিকে তারা আর দশটা সাধারণ শক্তিকেন্দ্রের মতই ভাবতে শুরু করেছিল। তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের রাজনীতির রাঘববোয়ালরা দেশকে বিশ্ব বাজারে শ্রেষ্ঠ প্রমান করতে সব কাজে চমক আনার চেষ্টা করতেন। চেরনোবিলের চার নম্বর চুল্লি যখন নির্মাণ করা হয়, তারা ঘোষণা করেছিল নির্মাণ কাজ সময়ের আগে শেষ করতে পারলে বিশেষ পুরস্কারের ব্যাবস্থা থাকবে। নিয়ম অনুযায়ীয় চুল্লীর উপরের যে ছাদ বা চিমনী অংশ সেটি বানানোর কথা ছিল আগুন অপরিবাহী হিসেবে। কিন্তু দুর্ঘটনার পরে কেঁচো খুড়তে সাপ বের হয়ে আসে। অনুসন্ধানে জানা যায় সেই ছাদ বানানো হয়েছিল নিয়ম না মেনে অর্থাৎ দাহ্য পদার্থ ব্যাবহার করে।

ফিরে আসি চার নম্বর পারমাণবিক চুল্লীর নিয়ন্ত্রন কক্ষে। ২৫ তারিখের শেষে ২৬ তারিখের ঠিক শুরুতে নিরাপত্তা পরীক্ষার কাজ শুরু করা হয়। বৈজ্ঞানিক চুলচেরা ব্যাখায় না যেয়ে সহজ ভাষায় বললে, নিরাপত্তা পরীক্ষাটি ছিল এমন, ‘যদি কোন কারনে এই বিশাল পারমাণবিক চুল্লীকে ঠাণ্ডা করতে যে পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয় (২৮ হাজার লিটার প্রতি ঘণ্টায়), সেটি যদি কোন যান্ত্রিক গোলযোগে বন্ধ হয়ে যায় তখন কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা হবে।’ পারমাণবিক চুল্লীর কিভাবে কাজ করে সে বিষয়ে করার সামান্য একটু ব্যাখ্যা করলে ব্যাপারটা বুঝতে সহজ হবে।

তাপের সাহায্যে পানিকে বাস্প বানায় মূল চুল্লী। এই বাষ্প বানানোর জন্যে চুল্লীতে ব্যাবহার করা হয় ইউরনিয়াম দণ্ড। দণ্ড গুলো প্রচণ্ড গরম হয়ে এর সংস্পর্শে আসা পানিকে বাস্প করে, এই বাস্প বিশাল এক টারবাইনকে ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। চেরনোবিলের চার নম্বর চুল্লীতে ১৬৬১ টি ইউরেনিয়াম দণ্ড এই কাজে ব্যাবহার হত। দণ্ড গুলো উত্তপ্ত হয়ে যাতে কোন ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে যে জন্যে তাপমাতার গতি নিয়ন্ত্রনের জন্যে বোরোন দণ্ড ব্যাবহার করা হত। ২১১টি বোরোন দণ্ড সেই চুল্লী নিয়ন্ত্রনের জন্যে বসানো ছিল। ব্যাপারটা অনেকটা গাড়ির গতি কমাতে ব্রেক যে কাজ করে সেই রকম। বোরোন দণ্ড গুলো চুল্লীতে উঠিয়ে নামিয়ে এই নিয়ন্ত্রনের কাজ করা যেত।

উত্তপ্ত পারমাণবিক চুল্লীকে ঠাণ্ডা করতে এর চারপাশে পানি প্রবাহের ব্যাবস্থা ছিল। পানি চুল্লীর চারপাশে প্রবাহিত করা হলে ইউরনিয়াম দণ্ড গুলো আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হয়ে যেত। ভেজা রুমাল পেচিয়ে গরমের দিনে মাথা ঠাণ্ডা রাখার মত ব্যাপার। নিরাপত্তা পরীক্ষার জন্যে পানির এই প্রবাহ বন্ধ করে দেয়া হয়। কাগজ কলমের হিসাব অনুযায়ী জরুরী প্রয়োজনে রাখা তিনটি জেনারেটর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে নিজেরা স্বয়ংক্রিয় ভাবে চালু হয়ে যাবে। এবং তারা পুনরায় পানির প্রবাহ নিশ্চিত করে চুল্লীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রনে রাখবে। বিশেষজ্ঞদের ধারনা অনুযায়ী জেনারেটর চালু হতে সময় আরো বেশি লাগতে পারে। জেনারেটর চালুর আগের এই সময়টাতে পারমাণবিক চুল্লীর তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ব্যাবস্থার কথা তারা চিন্তা করেন। এই নির্দিষ্ট সময়টায় টারবাইনের গতির কারনে সৃষ্ট বিদ্যুৎ থেকে চুল্লী ঠাণ্ডা করার পানি সরবরাহ করা যায় কিনা সেটি জানার জন্যেই এই পরীক্ষা করা হবে।

যদিও শক্তিকেন্দ্রে কর্মরত প্রত্যেক কর্মী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এই ভয়ানক ইতিহাসে মিশে আছে তারপরও তিনটি চরিত্র এর মাঝে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। প্রথম হলেন আনাতোলি ডিয়াটলভ (Anatoly Dyatlov) সহকারী প্রধান প্রকৌশলী। যার নির্দেশে এই পরীক্ষা চালানো হয়। প্রধান প্রকৌশলী নিকোলাই মাক্সিমোভিচ(Nikolai Maksimovich)এর এই পরীক্ষা নিজে থেকে পরিচালনা করার কথা থাকলেও, তিনি নিজে পরীক্ষার সময় নিয়ন্ত্রন কক্ষে ছিলেন না। সহকারী প্রধান প্রকৌশলীকে কাজের দায়িত্ব দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত মনে প্রিপিয়াটের নিজের বাসস্থানে ঘুমিয়ে ছিলেন। দ্বিতীয়জন হলেন আলেকজেন্ডার আকিমভ (Aleksandr  Akimov) যিনি পরীক্ষা চলাকালীন সময় নিয়ন্ত্রন কক্ষের শিফট প্রধান ছিলেন। কাজ সম্পর্কে সাবধানী লোক তিনি এবং শেষ জন লিওনিড টপ্টোনভ (Leonid Toptunov) চুল্লীর যান্ত্রিক কার্যক্রমের পরিচালক, তিনি চুল্লীর সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের কাজে নিয়জিত ছিলেন, আকিমভের সহকারী অভিজ্ঞ এই প্রকৌশলী সে।

বিস্ফোরণের জন্যে এদের মাঝেই হয়তো কেউ দায়ী। সুনিশ্চিত ভাবে কিছু বলা না গেলেও বেঁচে ফেরা সহকর্মী আর তাদের অতীত ইথিহাস থেকে এর ধারনা করা যায়। কি ঘটেছিল ১টা বেজে ২৩ মিনিটে চেরনোবিল পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রে?  তা থাকছে আগামী পর্বে।

About The Author
Abdullah-Al-Mahmood Showrav
Abdullah-Al-Mahmood Showrav
সাধারণ মানুষ, সাধারণেই বসবাস। লিখতে ভালবাসি, লিখতে শেখা হয়নি এখনো। অপেক্ষায় আছি একদিন ঠিক শিখে যাব।
8 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment