3
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
 
 
ফ্রেশ!
REGISTER

আমি কালো, তা কি আমার অপরাধ?

Now Reading
আমি কালো, তা কি আমার অপরাধ?

আমার জন্ম হয়েছিলো এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা এক বেসরকারি অফিসে কেরানির কাজ করতেন। একে মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছিলাম, তার ওপর কালো বলে বাবা নাকি নাক শিটকেছিলেন। আমার জন্মের সময় দাদাভাই বেঁচে ছিলেন না, দাদিমা নাকি আমার জন্মটা মঙ্গলস্বরুপ নেয়নি তাই দাদিমা কখোনই মন থেকে আমাকে ভালোবাসতে পারেননি।

আমার বয়স যখন চার বছর তখন আমাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। সেইদিনের কথা আমি আজও ভুলতে পারিনি। কালো বলে আমার পাশে কেউ বসতে চাইছিলো না। অবশ্য প্রতিদিন ক্লাসে আমাকে একাই একটা বেঞ্চে বসতে হতো। আমি সব সময় আমার ক্লাসের বান্ধবিদের সঙ্গে কথা বলতে চাইতাম, কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কথা বলতো না, এমনকি খেলার মাঠেও কেউ আমার সঙ্গে খেলতো না।

আমি পড়াশুনায় অনেক ভালো ছিলাম। ক্লাসে সব সময় আমি প্রথম হতাম। পঞ্চম শ্রেণি ও অষ্টম শ্রেণিতে আমি বৃত্তি পাই। এতে আমার বাবা আমার ওপর অনেক খুশি ছিলেন, কিন্তু আমার দাদিমনি কখনোই আমাকে ভালো চোখে দেখতেন না। তার মতে “মেয়েদের পড়াশুনা করে লাভ নাই, বরং বিয়ে দিয়ে দিলেই ভালো, তার ওপর আবার আমি কালো, তাই যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে দিয়ে দেওয়াই ভালো”। দিদিমনির এই কথাগুলো শুনে আমি অনেক কান্না করেছিলাম। আমি কালো বলে আমার পরিবার, আত্নিয়-স্বজন ও স্কুলের বন্ধুরা কেওই আমাকে আপন করে নিতে পারেনি।

এদিকে হঠাৎ করে আমার বাবা মারা যান। বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের পরিবারে অভাব নেমে আসে। এছাড়া আমার ছোট আরেকটি ভাই ছিলো। আমার বাবার জমানো কোন টাকা ছিলো না। বাবার অফিস থেকে যে টাকা পাওয়া গিয়েছিলো তা দিয়ে মা আমাদের চার জনের সংসার ঠিকঠাক ভাবে চালাতে পারছিলেন না। তাই একদিন মা আমাকে ডেকে বললেন ‘‘তোমাকে পড়াতে গিয়ে আমি তোমার ছোট ভাইটাকে পড়াতে পাড়ছিনা, অনেক তো হলো, তোমার বাপকে খেয়েছো, এখন শান্ত হও, কাল থেকে তোমাকে আর স্কুলে যেতে হবে না”। আর সেখানেই আমার স্কুল জীবনের সমাপ্তি।

আমার মনে হয় কালো হয়ে জন্ম নেওয়াটা আমার জীবনে অভিশাপ ছিলো। একটা প্রশ্ন সব সময় আমার মনের মধ্যে খেলা করতো ‘‘আমাদের পৃথিবীর অর্ধেক সময় দিন, আর অর্ধেক রাত।তাই বলে কি কেও রাতকে ঘৃণা করে? কালো রং কি কারো পছন্দ নয়?” মাঝে মধ্যে মনের অজান্তেই ভাবতাম হয়তো কোন একদিন কোন এক রাজকুমার আমাকে ভালোবেসে তার সঙ্গে নিয়ে যাবে। আবার ভাবতাম কালো মেয়েদের জীবনে কি রাজকুমার আসে?

কিছুদিন যেতে না যেতেই দিদিমা আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেলো। আমাকে নাকি বুড়ি বুড়ি লাগে, আমাকে নাকি কেও বিয়ে করবেনা। তাই সময় থাকতে আমাকে বিয়ে দিতে হবে।

হঠাৎ করে একদিন ঘটক সাহেব আমাদে বাড়িতে হাজির বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। ছেলে বিদেশে থাকে, দেখতে অনেক ফর্সা, কিছুদিন বাদেই দেশে আসবে বিয়ে করার জন্য। আমার মা প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না, কিন্তু দাদিমা বললো এত ভালো ঘর আর পাওয়া যাবেনা, বউমা বিয়ে দিয়ে দাও। এতে মাও রাজি হয়ে গেলেন। তখন আমার ছোট্ট ভাইটি আমাকে এসে জিজ্ঞেস করলো ‘‘আপু বিয়ে হয়ে গেলে তুই কি অন্য বাড়িতে চলে যাবি, আমাগো সাথে আর থাকবি না? ছোট ভাইয়ের ওই কথাটি শুনে আমি কেঁদে দিয়েছিলাম। সত্যিই তো বিয়ের পর সবাইকে ছেড়ে আমাকে একা চলে যেতে হবে।

আমি সবে কিশোরী, বিয়ে কি জানলেও সংসার কি তা আমার জানা নেই। স্বপ্ন ছিলো মনের রাজকুমার একদিন এসে আমাকে ভালোবেসে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবে রুপ নেয়নি। তাই চিন্তা করলাম যাকে বিয়ে করবো তাকেই আমার মনের রাজকুমার বানাবো।

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হয়ে গেলো। ছেলে বিদেশ থেকে আসার পরই আমার বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়েতে যৌতুক হিসেবে অনেক টাকা চাওয়া হয়েছিলো। মা বলেছিলো যৌতুকের টাকা বিয়ের পর আস্তে আস্তে দিয়ে দেবে। বিয়ের পর বুঝতে পারলাম আমাকে বিয়ে দিয়ে সবাই প্রাণে বেঁচে গেছে।

বাসর রাত সব মেয়েদের জীবনে স্বপ্নের রাত। কিন্তু সেটা কিসের স্বপ্ন কোনো মেয়ে কি সেটা বলতে পারবে? আমি নিজেও সেটা বলতে পারবো না। মনে পড়ে বাসর রাতে যখন আমি একা বসে ছিলাম, মনের ভেতর কেমন যেনো একটা ভয় কাজ করছিলো। হঠাৎ ঘরে একটা মানুষের প্রবেশ। আমার পাশে এসে বসলেন। আমার মনে কতনা ভয় আর কথা। ভেবেছিলাম মানুষটি আমাকে আলিঙ্গন করবে যতটুকু প্রতিবেশীদের কাছে শুনেছিলাম। কিন্তু সেই ভাগ্য আমার কপালে জোটে নায়। আমার স্বামী আমাকে বললেন “তুমি কালো তার পরেও আমার মায়ের ইচ্ছেতে আমি তোমাকে বিয়ে করেছি, কিন্তু ভুলেও আমার কাছ থেকে স্বামীর অধিকার পাওয়ার আশা করো না।”

সেইদিন রাতেই বুঝেছিলাম আমাকে আজীবন এই কালোর নরক থেকে কেউ ভালোবেসে উদ্ধার করবে না। আমি সারারাত কেঁদে সেটা মেনে নিয়েছিলাম। আমি মেয়ে,তাই কাওকে কিছু বলতে পারবো না, সব কিছু  নিরবে সইতে হবে। আমার স্বামী কখনোই আমাকে মেনে নিতে পারেনি। আমি শুধু ছিলাম তার ভোগের বিলাশ। প্রথম রাতে যন্ত্রনায় কেঁদে ছিলাম, কারণ ২৮ বছরের এক হায়েনার কাছে আমি ষোড়সী এক হরিণ।

আচ্ছা, একটা ছেলে একটা মেয়েকে ভালো না বেসেও কি করে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে? প্রথম দিকে মনে হতো আমি তার টাকায় কেনা ভোগের বস্তু,পরে মেনে নিয়েছিলাম। আর,একদিন তার ভোগের ফল স্বরুপ এক সময় অনুভব করলাম আমার শরীরের মধ্যে অন্য এক মানুষের অস্তিত্ব। অবশ্য আমি গর্ভবতী সেটা যানার আগেই আমার স্বামী বিদেশ চলে গিয়েছিলো, পরে শুনেছে। আমার স্বামী বোধহয় কথাটি শুনার পর খুশি হতে পারেনি। আমি কালো বলে নিজেকে নিজেই গৃণা করতাম, কিন্তু সেই আমি আমার ভেতরের মানুষটার জন্য নিজেকে আস্তে আস্তে ভালোবাসতে শুরু করলাম।

একদিন আমরা প্রসব ব্যথা শুরু হলো। আমার কোলে একটা ফুটফুটে ছেলে জন্ম নিলো। আমি মা হলাম। আমার ছেলে দেখতে তার বাবার মতো ফর্সা হলো। আমি অনেক খুশি হয়েছিলাম যে আমার ছেলে দেখতে আমার মতো কালো হয়নি। আমি আমার স্বামীকে ফোন করে বললাম আমাকে না ভালোবাসো, তোমার ছেলের মুখটা দেখতে একবার হলেও দেশে আসো, তোমার ছেলে আমার মতো কালো হয়নি। সে দেশে এসেছিলো যখন ছেলের বয়স এক বছর। ছেলেকে দেখে সে অনেক খুশি হয়েছিলো। আমি তাতেই খুশি ছিলাম। তারপর সে আবার বিদেশ চলে যায়।

আমি কালো তাই হয়তো কালো রেখা আমাকে সব সময় বেশি ভালোবাসে। পাঁচ বছর পর আমার স্বামী যখন দেশে ফিরলো, তখন সে আরেকটা বিয়ে করলো। তার নাকি আমার এই মুখ দেখতে ইচ্ছে করেনা। তাই আমাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলো। অনেক অনুরোধ করলাম একটু আশ্রয়ের জন্য। কিন্তু সে তার সুন্দরী বউয়ের পাশে আমাকে রাখতে চায়না। শেষে বলেছিলাম আমার ছেলেকে আমায় দিয়ে দিতে। হাজার হোক নাড়ী কাটা ধন। কিন্তু আমার ছেলে থেকেও আমাকে বঞ্চিত করা হলো।

শেষে যখন বাপের বাড়িতে ছিলাম সবাই একটা কথাই বলতো, বাপটাকে খেয়ে শেষে স্বামীর সংসারটাকেও টিকিয়ে রাখতে পারলো না।

এই পৃথিবীটা পুরুষ শ্বাসিত। পুরুষ কৃষ্ণ হলেও সে পুরুষ, আর মেয়ে তার কি দোষ? সৃষ্টিকর্তা কালো নারীদেরকেও মন দিয়েছে, ভালোবাসা দিয়েছে। কালো হলেই কি সে বেঁচে থাকার অযোগ্য? ভলোবাসার অযোগ্য? বরং সমাজে সেই সকল মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নেই, যারা মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্য দেয় না। তারা রুপের মহিমা নিয়ে জন্ম নিলেও, মনের ভেতরটা থাকে কুৎসিত নিয়ে জন্মায়।

 

এক অন্য জগতের ঈদ।

Now Reading
এক অন্য জগতের ঈদ।

জান্নাতের মন আজ অনেক খুশি। আর মাত্র একটা দিন, তারপরেই তো বাড়ি, বাবা মায়ের সাথে দেখা, ছোট ভাইয়ের সাথে দুষ্টুমি, ছোট বেলার স্কুলের সামনে বসা,পুরানো বন্ধুদের সাথে আড্ডা। ভাবতে ভাবতে যেনো জান্নাত ভাবে “কখন বাড়ি যাবো”।

আজ জান্নাতের পরীক্ষা শেষ। দুইটা টিউশন করে সে, তারাও তাকে ছুটি দিছে। তার মাসের বেতনটাও তাকে দিয়ে দিয়েছে। তাই তার মনটা অনেক খুশি। এই বেতনের টাকা দিয়ে সে তার মায়ের জন্য, বাবার জন্য, ভাইয়ের জন্য কেনাকাটা করবে। সকাল থেকেই তাই সে কর্মব্যস্ত নিত্য দিনের কাজ করা শেষ করে শপিং এ যাওয়ার জন্য।

দুপুর হলেই জান্নাত তাই তার কাছের বন্ধু ও রুম মেট তামিমকে বলে তার সাথে যাওয়ার জন্য। তার গন্তব্য নিউ মার্কেট, আজিজ সুপার মার্কেট আর এলিফ্যান্ট রোড।

পড়ন্ত দুপুরে তারা বের হয় আর প্রথমে তারা নিউ মার্কেট যায়।

আর অল্প কিছুদিন পরেই ঈদ। ঢাকা শহর কর্ম ব্যস্ত হলেও এই শহরের মানুষ ধর্মহীন নয়, তারা নিয়মিত রোজা রাখে। তবু এই তীব্র রোদের তাপে তাদের মধ্যে ঈদ নিয়ে আনন্দের পরিমান বিন্দু মাত্র কমে না। আর তাই সকলেই ব্যস্ত তাদের কাছের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য কেনাকাটায়। আর তাই ঢাকা শহরের এই সময়টাতে যেমন ভীড় থাকে দোকানে, তেমন ভীড় থাকে রাস্তাতে। এজন্য দুই বন্ধুর রাস্তার জ্যাম ঠেলে পৌছাতে অনেক সময় লেগে যায়।

যখন তারা নিউ মার্কেটে প্রবেশ করে সেখানে কেবল জনস্রোতের ভীড়। ছোট বেলায় পড়েছিলো আজব শহর ঢাকা শহর জান্নাতের সে কথা মনে পড়ে। এখানে যেমন ফুটপাতে দেখা যায় জীবনের চিত্র, সেরকম দেখা যায় অট্টালিকার উপর আনন্দের স্রোত। তবে এই কর্মব্যস্ত শহরে মধ্যবিত্তদের একমাত্র কেনাকাটার স্থান হচ্ছে আজিমপুর নিউ মার্কেট।

জান্নাত আর তার বন্ধু সেই জনস্রোতের ভীড়ের মধ্য থেকে তার ছোট ভাইয়ের জন্য একটা শার্ট আর একটা প্যান্ট কেনে। নিজের জন্য একটা পাঞ্জাবী কেনে সে। এরপর সে যায় এ্যলিফ্যান্ট রোডে। বাবার জন্য একটা পাঞ্জাবী, নিজের জন্য একজোড়া স্যান্ডেল আর মায়ের জন্য একটি শাড়ী। বেশ কিছুদিন তার স্যান্ডেলটা ছিড়ে গেছে। তাকে দেয়ার মতন তেমন কেউ নেয়। তার টিউশনের টাকাটাই একমাত্র স্বম্বল। এজন্যে সে এই ঈদে কেনাকাটা করার জন্য দুই মাসের টিউশনের টাকা জমিয়েছে। সকল কেনাকাটার শেষে তারা রাতে বাসায় পৌছায়।

তার মনে আনন্দের একটা স্রোত বয়ে যায়। তার কষ্টের টাকা দিয়ে সে তার কাছের মানুষের জন্য কিছু কিনে নিয়ে যাচ্ছে। চোখ থেকে জান্নাতের জল আসে। ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করে সে ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়ে।

সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠে সে। তামিমকে সে ডাকতে থাকে। তামিমের বাড়ি বাগেরহাট আর জান্নাতের বাড়ি খুলনাতে। দুজনের পথ একই দিক। আর তাই দুই বন্ধু একসাথে বাড়িতে যাবে। তামিমের পরীক্ষা অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো কিন্তু বন্ধুর জন্যই তার অপেক্ষা। যায় হোক দ্রুত তারা সব কিছু গুছিয়ে নেয়। এরপর বেরিয়ে পড়ে।

প্রথমে তারা গুলশানে যায়। সেখান থেকে মাওয়া যাবে। যাবার সময় বাড়ির জন্য এক প্যাকেট মিষ্টি নেই জান্নাত। ঢাকার মিষ্টি, বাড়ির সবাই কত না খুশি হবে এটা পেয়ে।

আজ ঢাকা শহরে বাহির এলাকার লোকের ই বসবাস বেশি। আর এখন রোজার শেষ সময়, সকলে তাদের বাড়িতে প্রিয়জনে সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য যাচ্ছে। এজন্য একটি বাস ছাড়ছে তো আর একটি বাস এসে হাজির। সেটাও চোখের পলকেই ভরে যাচ্ছে। আর এই সুযোগ টা কাজে লাগাচ্ছে বাস মালিক সমিতি। নিত্য ভাড়ার টাকা দ্বিগুন বাড়িয়ে দিয়েছে তারা। মানুষ ঈদ আনন্দ ভাগাভাগির নেশায় যেনো অন্ধ হয়ে গেছে। কারো তাতে কিছু বলার নেই।

অনেক কষ্টে জান্নাত দুটি টিকিট পায় বিআরটিসি এর। তারপর দুই বন্ধু উঠে পড়ে বাসে। নির্দিষ্ট সময়ে বাস চলতে শুরু করে। বাস যখন কেরানীগঞ্জ ছেড়ে যায় জান্নাতের মনে হয় “এইতো আর কিছুক্ষনের মধ্যেই সে ঢাকা ছেড়ে দিচ্ছে। মাওয়াটা পার হলেই আর কিছুক্ষন, তারপর নিজের এলাকা, নিজের সিক্ত মনের ঠিকানা”।

মাওয়া ঘাট যেনো আজ ভীষণ ব্যস্ত হাজার হাজার মানুষকে এই বিপুল পদ্মা পাড়ি দেয়ার জন্য। অনেক কষ্টে ঠেলেঠুলে তার বন্ধু দুইটা স্পীড বোর্ডের টিকিট নিয়ে আসে। স্পীড বোর্ডেও দুর্নীতি, যেখানে ১০ জন নেয়ার কথা সেখানে আজ ঈদের সময় ১৪ জন। এর উপর আবার দ্বিগুন ভাড়া। যাই হোক দুই বন্ধু এ নিয়ে কিছু ভাবে না কারন তারা বাড়ি যাচ্ছে ঈদ করতে, মনের মধ্যে যেনো অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করছে।

মাওয়া পার হয়ে দুই বন্ধু তাদের পরিবারকে জানায় যে আর মাত্র কিছুক্ষন তারপরেই তারাই বাড়ি চলে আসছে। দুজন ভাবে বাসে গেলে অনেকে সময় লেগে যাবে, এজন্য তারা মাইক্রো বাসে যেতে রাজি হয়। বাসের ভাড়ার থেকে দ্বিগুন ভাড়া দিয়ে তারা মাইক্রোতে ওঠে। ৯ ছিটের মাইক্রোতে ১৩ জন বসে। যায় হোক অনেক কষ্টে চেপে চুপে তারা বসে।

প্রথম দিকে মাইক্রোটি অনেক আসতে আসতে চলতে থাকে। এভাবে তারা ভাঙা পার হয়, অনেকটা সময় চলে যায়, তারপর মাইক্রোটি হঠাৎ করে জোরে চলতে শুরু করে। যখন তাদের মাইক্রোটি গোপালগঞ্জ রোডে পৌছায় জান্নাতের মন যেনো লাফালাফি করতে থাকে, ভাবতে থাকে আর মাত্র কিছুক্ষন। কিন্তু মাইক্রো চালকটি যেনো একটু অনিয়ন্ত্রিত ভাবে চালাতে শুরু করে। কয়েকটা বাসকে ওভারটেক করে খুব দ্রুত। জান্নাত ভাবে মাইক্রো কেনো আরও দ্রুতো চলে না। দ্রুত চললে সে আরও দ্রুত পৌছাতে পারবে। যখন তারা ভাটিয়াপাড়া ক্রস করে তখন মাইক্রোটি যেনো আরও দ্রুত অনিয়ন্ত্রিত ভাবে চলতে শুরু করে। জান্নাত আর তামিম চারিদিকের দৃশ্য  দেখতে থাকে। হঠাৎ মাইক্রোটা একটি বাসকে টেক ওভার করতে যায়, কিন্তু বিপরীত দিক থেকে আসা অপর একটি বাসকে দেখে ড্রাইভার সাইড নিতে চাই। কিন্তু চালক গন্তব্যে পৌছাতে ব্যার্থ হয়। বেপরোয়াভাবে চালাতে গিয়ে চালক নিয়ন্ত্রন হারিয়ে রাস্তার পাশে একটি গাছে লাগিয়ে দেয়।

দুর্ঘটনায় মাইক্রোবাস চালক ঐ স্থানেই মারা যায়। চারিদিক থেকে মানুষ ছুটে আসে। তারা গাড়ীর ভিতর থেকে সকলকে বের করে। অনেকেই আহত হয়। আহতদের সকলকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

তামিমের মাথায় হাল্কা আঘাত লাগে। আর হাতে কিছুটা অংশ ছিলে যায়। তামিম জান্নাতকে খুজতে থাকে। নিহতদের লাশগুলো রাস্তার পাশে রেখে দেয়া হয়। তামিম সেখানে যায়। যখন সে জান্নাতের দেহটা দেখতে পায়, তখন চিৎকার করে ওঠে। সে বলে জান্নাতকে চোখ খুলতে, জানায় তারা বাড়ির কাছে চলে আসছে। কিন্তু তার বন্ধু যেনো হতাশ ভাঙ্গা মুখ নিয়ে পড়েই থাকে, সে আর চোখ খোলে না। আকাশটা যেনো তীব্র রোদের মধ্যে নিশ্চুপ হয়ে যায়, আশেপাশের সকল পাখি তাদের মধুর কন্ঠের ডাক থামিয়ে দেয়। সমান্তরাল রাস্তায় কেবলই যেনো মৃত্যুর জয়ধ্বনির চিৎকার চলতে থাকে।

জান্নাত অবশেষে বাড়ি পৌছায়। তবে সুস্থ শরীরে হাসিমুখে না, নিয়তির এক অনন্ত ধারায় অন্য পৃথিবীর যাত্রী হয়ে। সে আর তার বাবা মায়ের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারে না, পারেনা ছোট ভাইয়ের সাথে দুষ্টুমি করতে। তার ঈদটা তাকে এক অন্য জগৎ এনে দেয়। আর সেখানে তার আনন্দ ভাগাভাগি করতে হয় তার কবরের সাথে। ঈদের নতুন জামা পড়ে সে আর তার বাবা মাকে সালাম করতে পারে না, তাকে কাফনের নতুন কাপড় পড়েই যেতে হয় ঈদ করতে নতুন দেশে। কষ্টের টাকায় কেনা নতুন কাপড় আর তার বাবা মাকে দিতে পারে না জান্নাত।

কাছের মানুষদের কাছে পাওয়ার যে মোহ আমরা ভুলতে পারিনা, আজ সে মোহকে কাটিয়ে জান্নাতকে একাকী থাকতে হয়, এক অন্ধকারের জগতে। ছোট ছোট আনন্দ যেনো আর কখনও প্রকাশিত হতে পারে না।

 

শুধু জান্নাতের নয়, এরকম ঘটনা নিত্য ঘটছে। আমরা ছোট খাটো আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে ভুলের বসত সকলের আনন্দকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দেয়।

 

সকলের ঈদ শুভ হোক, ঈদ মোবারক।