3
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
 
 
ফ্রেশ!
REGISTER

ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই চাওয়ার নেই

Now Reading
ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই চাওয়ার নেই

image_4765.jpg

 

গতিশীল সমাজে গতিশীল আমরা। সমাজের চিরন্তন বাস্তবতা আমাদের মেনে নিয়ে বাবা-মার কাছ থেকে দূরে থাকতে হয়। লেখাপড়ার স্থানে, কর্মস্থলে কিংবা প্রবাসে। তাই বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে বাবা-মাকে মনে করিয়ে দিই, আমরা তোমাদের ভুলিনি।

বাবা সারাজীবন আমাদের বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন। বুঝতে দেননি চলার পথের প্রতিবন্ধকতা।

 

বাবা নির্ভরতার অন্য নাম। বাবা মানে নির্ভরতা, নিরাপত্তা, বিশালতা। বাবাহীন জীবন ধূসর মরুর ঊষর বুক, শ্বাপদ সংকুল বনে দুরু দুরু হৃদকম্পন; বাবাহীন জীবন ছোট্ট ডিঙ্গি নিয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি দেয়ার দুঃসাহসিক চেষ্টার নাম।

বাবার কাঁধে চড়ে প্রথম মেলায় যাওয়া। বাবার হাত ধরে প্রথম স্কুলের সিঁড়িতে পা রাখা। বাবার বুকে মাথা রেখে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখা। বাবার নিরাপদ আশ্রয় যার আছে, তার নেই কোনো ভয়। বনস্পতির ছায়ায় যেন নিশ্চিন্ত জীবন। বাবার মমতাভরা হাতখানি মাথায় ছোঁয়ালে অসম্ভবকে জয় করে আনাও খুব সম্ভব।

 

মানুষ বয়সে যত বড়ই হোক বাবার কাছে সে থাকে সেই ছোট্ট শিশুটিই । মাতৃগর্ভ থেকে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর প্রথমবারের মতো বাবা যখন সন্তানের মুখ দেখেন কিংবা কোলে তুলে নেন, সেদিনের সেই অনুভূতি অতুলনীয়, যা আজীবন বাবার হৃদয়ে অবশিষ্ট থাকে।

কোনো বাবা সন্তানের কাছে বন্ধুর মতো, কেউ-বা পথপ্রদর্শক। এ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে অনেকেই বাবাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাবেন। দেবেন নানা উপহার কার্ড, মগ কিংবা প্রিয় পোশাক। কেউ কেউ হয়ত বাবাকে নিয়ে বেড়াতে যাবেন, খাবেন ভালো কোনো রেস্টুরেন্টে। অন্যদিকে যাদের বাবা বেঁচে নেই, তারা হয়তো আকাশে তাকিয়ে অলক্ষ্যে বাবার স্মৃতি খোঁজে বেড়াবেন।

বাবা তার দায়িত্ব ও পিতৃত্বসূলভ আচরণ তার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বহাল রাখতে চান। সময়ের পরিবর্তনে বাবাও একদিন সন্তান নির্ভর হয়ে পড়ে, কিন্তু বাবা সব সময়ই বাবা। সন্তানের প্রতি বাবার দায়িত্ববোধ এবং ভালোবাসা বাবাকে দিয়েছে মহতের স্থান।

বাবার তুলনা চলে বটগাছের সাথে । যিনি শত-সহস্র ঝড়-ঝঞ্ঝা নীরবে সহ্য করতে রাজি, কিন্তু তার সন্তানদের প্রতি অতি ক্ষুদ্র আঘাত কিংবা কষ্টের ছিটেফোঁটা লাগাতেও নারাজ । দাম্পত্যের সুখ জলাঞ্জলি দিয়ে অনেক বাবা তার সন্তানদের ভালো রাখতে নিরলস পরিশ্রম করেন । নিজের শরীর আবৃত কিনা সেদিকে তার সামান্যতম খেয়াল নেই। কিন্তু সন্তানের শরীর উন্নত ও দামি পোশাকে মুড়িয়ে রাখতে সদা ব্যস্ত । নিজে না খেয়ে ভাগের সকল খাদ্য ছেলে-মেয়ের পাতে তুলে দিতে যিনি এতটুকু কার্পণ্য দেখাননি কোনদিন তিনিই-বাবা । জীবন-যৌবনের সকল সুখ-শান্তি ত্যাগ করে শুধু সন্তানদের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে যিনি সকাল থেকে রাত আবার রাত থেকে সকাল পর্যন্ত খেটে যান তিনিই শ্রদ্ধেয় বাবা । শরীরের রক্ত পানি করে বাবা তার সন্তানের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এঁকে দিয়ে যান । বাবা ত্যাগের দর্শন গ্রহণ করে সন্তানকে ভোগের নিশ্চয়তা দিতে সদা বদ্ধপরিকর ।

 

বাবা শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নির্ভরতা। রয়েছে এক বিশালতা। বাবা শব্দটি অনেক কঠিন কাজকে করে দেয় সহজ; পাহাড় সমান বিষণ্ণতাকে শুষে নেয় নিমিষেই। বাবা তো সেই জন, যার হাতে হাত রেখে হাঁটি হাঁটি পায়ে আমরা এগিয়ে যাই নতুন পৃথিবীর সন্ধানে। যার কাঁধে চড়ে আমরা প্রথম জানতে পারি পৃথিবী রূপ কি।

বাবা শুধু একজন মানুষ নন, একটি সম্পর্কের নাম নয়। বাবার মাঝে জড়িয়ে আছে বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবী প্রকাশ। বাবা নামটা উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে কোনো বয়সী সন্তানের হৃদয়ে শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার এক অনুভব জাগে মানুষটি কতভাবে অবদান রেখে যান সন্তানের জন্য, যার চুলচেরা হিসাব করে কেউ বের করতে পারবেন না।

আমার বাবা একজন শিক্ষিত অসুস্থ অবসরপ্রাপ্ত কৃষক। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তিনি ছুটতে চেয়েছিলেন স্রোতের বিপরীতে। কিন্তু অদৃষ্টের লিখন বলে কিছু আছে। তাই আর পেরে উঠা হয়নি।

আমার বাবা বরাবর ই একজন উচ্চমাত্রার পাঠক। সারাদিন পড়তে খুব ই ভালোবাসেন। সারা দুনিয়ার যে কোনো বই তাকে দিলেই হবে। তার আর কিছুই চাইনা। খাওয়া নাওয়া সব ভুলে যান। আর বই পড়া আমার দুচোখের শত্রু। মহা বিরক্তিকর একটা কাজ মনে হয়।

তার ভালো লাগে বাটা জুতা, লাইফবয় সাবান, পরতে ভালো লাগে লম্বা ঢিলা জামা, খাইতে ভালো লাগে নিরামিষ,,,,,,,,! যা কিনা সব গুলোই আমার বিপরীত। পেশী শক্তি অপব্যবহার করতে তাকে কখনওই দেখিনি। হাড় ভাঙা পরিশ্রমে অভ্যস্ত ছিলেন। সৎ উপার্জনের তাকিদ সব সময় ই ছিলো এখনো আছে। বরাবরের মতো আজো তিনি ভীষণ অতিথিপরায়ণ।

আব্বা চুপচাপ স্বল্পভাষী স্বভাবের। আমি প্রাণখোলা হই হুল্লুর টাইপের। ক্রিকেট নামক এক নেশার মধ্যে তাকে আমি ডুবিয়ে দিয়েছি। ক্রিকেট খুব একটা না বুঝলেও রান উইকেট এর হিসাব টা ভালোই বুঝেন। জয়সুরিয়া তার প্রিয় ক্রিকেটার।

আমার এখনো খুব ভালো করে মনে আছে ভরা পূর্ণিমাতিথিতে তার কাঁধে চেপে বেড়ানো আর জোনাকিপোকা ধরতে চাওয়া। সে যখন জমি চাষ করতো আমি তার জন্যে খাবার নিয়ে যেতাম। আমি আর আব্বা একসাথে মজা করে খেতাম। কতো যে স্বাদ ছিলো সে খাবারের, তা সারা দুনিয়ায় আর কোথাও আমি খুঁজে আজো পাইনি।

আমাকে পড়াতে গিয়ে তিনি আমায় বেধড়ক পিটিয়েছেন। শিক্ষাজীবনে কোনো শিক্ষক ই আমাকে এতো মারা মারেন নাই। তার কাছেই আমার পাঠশালার হাতেখড়ি। মনুষ্যত্বের বীজ তখন ই তিনি আমার মাঝে বপন করেছিলেন।

অভাবের সংসারে তিনি তিনি সবসময় ই আল্লাহর উপর ভরসা রেখেছেন। তিনি আজ অসুস্থ। শরীরের সাথে যুদ্ধ করে ক্লান্ত। তার বিশ্রাম চাই। আমি তার বিশ্রাম। তার কাঁধের জোয়াল টা এখন আমার কাঁধে। আমি যে বড় ছেলে।

বাবার কাঁধটা কি অন্য সবার চেয়ে বেশি চওড়া? তা না হলে কি করে সমাজ সংসারের এতো দায়ভার অবলীলায় বয়ে বেড়ান বাবা। বাবার পা কি অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত চলে? নইলে এতোটা পথ এতো অল্প সময়ে কি করে এতো শক্ত করে সব কিছু আগলে রাখেন বাবা …?

বাবা হলেন অদ্বিতীয় আলো, যার আলোয় আলোকিত হয়েই আমাদের সারা জীবনের পথচলা। আমরা এই সন্তানদের সব দায়- দায়িত্ব নিঃস্বার্থভাবে কাঁধে নিয়ে হাসিমুখে সৃষ্টির শুরু থেকে বিন্দু বিন্দু করে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে কামনা করেন আমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। বাবা ছাড়া আর কে দেবেন সন্তানের জন্য এমন বিসর্জন?

যাদের বাবা আজ প্রয়াত, তাদের উপলব্ধি এতটাই তীব্র ও বেদনা বিধুর, যেটা অনেকেই বুঝতে চাইবেন না। সন্তান বাবার ঋণ কখনো পরিমাপ ও শোধ করতেও পারে না। পরিবারের মহীরুহ হয়ে দায়িত্ব পালনে, সন্তান-সংসার পরিচালনায় ব্রতী যিনি, সেই বাবার প্রাপ্য সম্মান প্রদর্শনে একদিন কিছুই নয়।

তোমার কাছে ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই চাওয়ার নেই। অনেক দিয়েছো আমায়। আমার বটবৃক্ষটাকে অনেক ভালবাসি। ভালো থেকো বাবা। সুস্থ থেকো।

“রব্বীর হাম হুমা কামা রাব্বায়ানি সাগীরা”

-হে আমার প্রতিপালক! আমার পিতা-মাতার প্রতি দয়া করো, যেমন তারা দয়া, মায়া, মমতা সহকারে শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।

[সূরা বনী-ইসরাঈলঃ২৪]

একটি সুন্দর কাজ আরেকটি সুন্দর কাজের জননী!

Now Reading
একটি সুন্দর কাজ আরেকটি সুন্দর কাজের জননী!

87ed5cefeef62389958096e579126944-59a80e1dcc9bf.jpg

 

ভর দুপুরে একজন বৃদ্ধ দোকানে এসে বললেন, ‘একটা কেক দাও তো মিয়া ভাই!’ দুপুরটা রোদে খঁ-খাঁ করছে। এমন ভর দুপুরে একটা মানুষ কেক খাবে? ব্যাপারটা খটকা লাগলো! সহজ কঠিন সব ব্যাপারেই পুলিশের খটকা লাগে! এটা স্বাভাবিক!

‘চাচা মিয়া, দুপুরবেলা কেক খান ক্যান?’
‘বাবারে, হোটেলে খাওনের ট্যাহা নাই! কেকটা খায়া প্যাট ঠান্ডা করি!’
‘প্রতিদিন খান কই?’
‘বাড়িতে! কিন্তু দুপুরে যাওন যায় না। মালিকের হুকুম। আধাঘন্টার মইধ্যে দুপুরের খাওন শ্যাষ করন লাগবো! ইট ভাটার কাম খুব কড়া! বেশি কড়া ভাটার মালিক!’
‘তো বাড়িতে খেয়ে আসেন!’
‘নারে বাপ! যাইতে আইতে রিকশা ভাড়া লাগে। আবার আধাঘন্টায় কুলানো যায় না!’

আমি আশ্চর্য হলাম। এভাবে একটি বৃদ্ধ কাজ করবে অথচ দুপুরে কেক দিয়ে পেট ঠান্ডা করবে- বিষয়টি অদ্ভুত ! একটু আগেই আমি খেয়েছি। বৈষম্যের প্রাচীর ভেদ করে খাবারটুকু পেট থেকে বমি হয়ে বের হতে চাইছে!

বললাম, ‘চাচা চলেন আমার সাথে!’
তিনি ভয় পেয়ে গেলেন! ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘স্যার কই নিয়া যাবেন?’
আমি বললাম, ‘স্যার বলতে হবে না! আমি আপনার সন্তানের মতো। চলেন!’

রেস্টুরেন্টে লোকজন ভর্তি! পাশ থেকে একজন বলছে, ‘শালার পুলিশের ধর্ম নাই! বুড়া লোকটারে নিয়া যায় কই?’ আমি শুনলাম। না জেনে হুটহাট করে মন্তব্য করা একদল মানুষ আছে! এরা এই দলের। মাথা গরম করলাম না। ছোটখাট বিষয়ে মাথা গরম করা পুলিশের বৈশিষ্ট্য না। 
হোটেলের এক কোনায় বৃদ্ধ চাচাকে বসালাম। চাচা ভয়াবহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। এতোটা অবাক হয়তো জীবনে কখনো হন নি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, গরু খাবেন না মুরগী?

গরুর কালো ভুনা। সাথে শসার সালাদ। লেবুর টুকরাকে চিপে চিপে সব রস বের করে দুই প্লেট ভাত খেলেন বৃদ্ধ! আমি মুগ্ধ হয়ে তার খাওয়া দেখছি! পৃথিবীতে এত সুন্দর দৃশ্যও থাকতে পারে।

হোটেলের ম্যানাজার আসলেন। বললেন, স্যার কোল্ড ড্রিংস দিব? আরসি? সেভেন আপ? আমি জবাব দিলাম না। রেস্টুরেন্টের ম্যানাজাররা সাধারনত ক্যাশ টেবিল ছেড়ে একচুলও এদিক-ওদিক হন না। আর তিনি আমার কাছে এসে সেভেন আপ অফার দিচ্ছেন! ব্যাপারটা আমার কাছে খটকা লাগলো! ছোট খাট ব্যাপারও পুলিশের কাছে খটকা লাগে! এটা স্বভাবিক!

আমার নিরুত্তর তাকে চলে যেতে বাধ্য করলো। হয়তোবা আরও কিছুক্ষণ থাকতো। ক্যাশে টাকা দিতে গিয়ে বাধলো বিপত্তি! ম্যানাজার আমার টাকা নিবেন না! আশ্চর্য তো! জানতে চাইলাম টাকা নিবেন না কেন?
ম্যানাজার খুব গুছিয়ে কথা বললেন, ‘সেবাই মানুষের ধর্ম! তো আপনি একাই সেবা করে ধর্ম করবেন, আমি করবো না?’
বললাম, বুঝি নি! সোজা বাংলা ভাষায় কথা বলো! পেচিয়ে কথা বলার জন্য বাহান্নতে রক্ত দেয় নি জব্বার রফিকরা!
ম্যানাজার সহজ ভাষায় বললেন, বৃদ্ধ চাচাকে আপনি খাওয়াতে নিয়ে এসেছেন। সুন্দর কাজ। এবার আপনার সুন্দর কাজে আমিও যোগ দিলাম। দেড়শ টাকা বিল নিবো না। হোটেল মালিককে আমি টাকাটা দিয়ে দিব।

আমি বললাম, তা কি করে হয়? আমি এনেছি! 
ম্যানাজার বললেন, আমাকে কি তাহলে ভাল কাজ করার সুযোগ দিবেন না? 
এবার আমি হেরে গেলাম। কিছু হার মধুর! আনন্দের! হেরে গেলে জিতে যায় মানবতা! একটি সুন্দর কাজ আর একটি সুন্দর কাজের জন্ম দেয়!

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলাম একটি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। পৃথিবীটা আরও কিছু দিন বেঁচে থাকুক। হাজার কোটি বছর টিকে আছে এদের মত ভালো মানুষগুলির জন্যই! এই মানুষগুলির পায়ের স্পর্শ আছে বলেই, মনে হয় পৃথিবীটা অবিরাম ঘুরছে। তা না হলে, এত বড় সূর্যের চার পাশে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে যেত।

বৃদ্ধ চাচাকে তার কর্মক্ষেত্রে ফিরতে হবে। ভরপেটে খেয়ে এই ভরদুপুরে হেটে গেলে তিনি কাজ করতে পারবেন না। একটা রিকশা ডাকলাম। ভাবলাম, একটু দরকষাকষি করে দশ-বিশ টাকায় রিকশাটা ম্যানেজ করে দিই!

রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাড়া কত?
রিকশাওয়ালা যা জবাব দিল তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। সে জানালো, ভাড়া লগবো না স্যার! বুড়া মানুষ যাইবো! আমি ভাড়া নিমু না, স্যার! বহুত কামাই করছি!

মনে হল অদৃশ্য কেউ একজন আমার শার্টের কলার চেপে ধরে গালে একটা চটাস করে থাপ্পড় দিয়ে শাসাচ্ছে; ব্যাটা ভাড়া কমানোর জন্য দরকষাকষির চিন্তা করিস? মানুষ চিনলি না?’

চিলের মত ছোঁ মেরে রিকশাওয়ালা বৃদ্ধাকে নিয়ে গেল! রিকশা চলছে! চলন্ত চাকার দিকে হা করে তাকিয়ে আছি। এই মহান মানুষ গুলোর পায়ের স্পর্শে এই পৃথিবীটা রিকশার চাকার মত ঘুরছে। মনে হল মানুষ মরে যাচ্ছে; মানবতা বেচে আছে। হিসেবের খাতা খুলে হিসেব করলাম, একটি সুন্দর কাজ দুইটি সুন্দর কাজের জন্ম দেয়!

আমি ইট ভাটার মালিক কে ফোন দিলাম। থানার দারোগা পরিচয় দিয়ে বললাম, ‘আপনার ইট ভাটার শ্রমিকদের দুপুরে খাবার সময় কম দেন কেন? বেতনও নাকি কম দেন?’
‘স্যার! স্যার!’
‘আরে মিয়া স্যার স্যার করেন কেন?’
‘জ্বি স্যার! জ্বী স্যার!’
‘ভাটার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিব?’
‘না স্যার! না স্যার! দেইখেন কালকেই সব ঠিকঠাক করে দিব!’
আমি ফোন রেখে দিলাম। খুব অল্প সময়ে খুব অল্প চেষ্টায় কিছু কিছু অধিকার এনে দিতে পারি। চাইলেই হয়; কষ্ট করতে হয় না! নতুন করে হিসেব করলাম; একটি ভালো কাজ তিনটি ভালো কাজের জন্ম দেয়!

‘স্যার! স্যার!’
পিছনে তাকিয়ে দেখি রেস্টুরেন্টের ম্যানাজার! কাছে এসে একটি মুচকি হাসি দিল। বললো, স্যার আপনাকে খবরটা জানাতে আসলাম। আমি অভিভূত হলাম। রেস্টুরেন্টের মালিক তার ম্যানাজার কে আজকের বিতর্কিত বিলটি পাশ করাতে দেন নি। বৃদ্ধ চাচার দুপুরের খাবারের টাকা মালিক ম্যানাজারের কাছ থেকে নেন নি! বরং মালিক তার ম্যানাজারকে ধন্যবাদ দিয়েছে! বেতনও বৃদ্ধি হয়েছে! বেচারা ম্যানাজার আনন্দে আপ্লুত!

বিকেল হয়ে এল! ক্লান্ত সুর্য ঢলে পড়ছে দিগন্তে! যেন লুকাতে চাইছে! অবসর চাইছে! সারাদিনের ক্লান্তি কাটাতে সে সারারাত ঘুমাবে! আমার ডিউটি আপাতত শেষের দিকে। থানায় ফিরবো। ফোর্স গাড়িতে উঠলো। আমি হিসেবের খাতা ছুড়ে ফেলে দিলাম। ফলাফল মুখস্ত। দিন শেষে হিসেব হল, একটি সুন্দর কাজ আরেকটি সুন্দর কাজের জননী!

‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’- বলে চীৎকার করা একদল মানুষকে আজ খুব খুঁজতে ইচ্ছা করছে। বলতে ইচ্ছা করছে,”দ্যাখ ব্যাটা! মানবতা আজও মরে নি! মানুষ মরে; মানবতা মরে না; মানবতা বেঁচে থাকে! তোমরাই তাকে খুঁজে পাও না…!”