পথের শেষে [১ম পর্ব]

Now Reading
পথের শেষে [১ম পর্ব]

সন্ধ্যার একটু পর তারা মেসে ফিরে এলো।সবাই বেশ ক্লান্ত।রিকা হাতের ব্যাগটা টেবিলের উপর রেখে টয়লেটের দিকে গেল ফ্রেস হতে।

“রোজ রোজ এই একি ঝামেলা আর সহ্য হয় না…”, বিড়বিড় করতে করতে ফিরে এল সে।তার ভুরু জোড়া বিরক্তি আর বিষন্নতায় কুঁচকে আছে।সবাই একবার তার দিকে মুখ ফিরিয়ে চাইলো।তারপর আবার যে যার মত কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।এই সমস্যাটা তাদের নিত্যদিনের একটা অংশ হয়ে গেছে এখন।টয়লেটে পানি নেই।রোজ সন্ধ্যা হলেই পানি থাকে না।সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত পানির লাইন বন্ধ থাকবে।এটা একটা অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে।আজ সকালে সবাই ঘুরতে বেরিয়েছিল একসাথে বেঁধে।সারাদিন বাসায় কেউ ছিল না বলে বালতিতে পানি জমিয়ে রাখতে পারে নি।

ক্লান্ত, বিমর্ষ মুখে সবাই বসে আছে।সারাদিনে কত জায়গায় ঘুরেছে তারা।ধানমন্ডি লেক,চন্দ্রিমা উদ্যান তারপর একসাথে খাওয়া দাওয়া আরও কত কি! একঝাঁক তরুণী রাস্তা দিয়ে দল বেঁধে হাঁটছে,হাসাহাসি আর দুষ্টামি হৈ চৈ করছে,চারদিকের মানুষ শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল।

সারাদিন হেঁটে পায়ে ব্যথা শুরু হয়েছে খুব।নেতিয়ে পড়েছে পুরো শরীর।এমন ক্লান্ত মুহূর্তে কারও মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুচ্ছে না।অথচ সারাদিন সবাই বাচালের মত কি বকবক করেছে! এখন সবাই মুখ ঘোমরা করে বসে আছে বোবা মানুষের মত।কপালে চিন্তার ছাপ।অপেক্ষা শুধু একটা মুহূর্তের।কখন পানি আসবে,আর তারা একটু পরিচ্ছন্ন হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে শুবে।সমস্ত শরীরে ধুলাবালি গিজগিজ করছে।

দেখতে দেখতে আধঘণ্টার মত পার হল।এখনো পানি আসছে না।রিকা উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের উড়নাটা ঠিক করে নিল।চুল গুলো বেঁধে মাথায় ঘোমটা টেনে দিল একটা।পাশ থেকে রিমা প্রশ্ন করলো,”কোথায় যাচ্ছিস?”

বাড়িওয়ালার বাসায়।

কেন?

আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকব?পানির লাইনটা ছাড়ছে না কেন জিজ্ঞেস করে আসি।

আমি ফোন করেছিলাম তো।তিনি বলেছেন কিছুক্ষণের মধ্যেই লাইন ছেড়ে দিবেন।

আর কতক্ষণ গেলে সেই কিছুক্ষণ পূর্ণ হবে শুনি!

রিকা প্রচন্ড রেগে গেল।রাগে তার শরীর কাঁপছে।ফেমিলি ফ্ল্যাট গুলোতে পানির কোন সমস্যা হয় না, মেসে কেন হবে?বাড়ির মালিকদের কি বিশ্রী ধারণা_____ মেস গুলোতে পানির অপচয় বেশি হয়।

 

দাঁড়া আরেকবার ফোন করে দেখি।

কথা শেষ করে রিমা টেবিলের উপর থেকে মোবাইলটা হাতে নিল।রিকা বলল, ”থাক, দরকার নেই।আমি যাচ্ছি।এভাবে মোবাইলে কথা বললে উনারা আরও একঘণ্টায়ও পানি ছাড়বেন না।ঠিকি রাত আটটা পর্যন্ত আটকে রাখবেন।“

রিমা বলল, ”তুই এখন এই ক্লান্ত শরীরে ছয়তলা থেকে আবার দোতলায় নামবি?”

এ ছাড়া আর উপায় কি?তোরা কেউ যাবি আমার সাথে?

প্রশ্ন শেষ করে রিকা সবার দিকে চোখ ঘুরিয়ে তাকালো একবার।মেয়েরা একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে।কেউ কিছু বলছে না দেখে রিকা একাই দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লো।বাড়িওয়ালার বড় ছেলেটার চোখ ভালো না।মেয়েদের দিকে বিশ্রী চোখে তাকিয়ে থাকে।এলাকার মাস্তান টাইপের আজেবাজে ছেলেদের সাথে তার সারাদিন আড্ডা।কানে দুল পড়ে,দাঁড়ি চুলে কুরুচিপূর্ণ স্টাইলে চেহারাটা কেমন জঘন্য করে রেখেছে।দেখলেই ঘেন্না লাগে।

মেয়েরা কেউ ছেলেটার সামনে পড়তে চায় না।তবু কোথাও কিছু হয়েছে কি না, দেয়ালের রঙ, পানির লাইন, গ্যাসের পাইপ সবকিছু দেখার নাম করে কিছুদিন পর পর মেয়েদের মেসে চলে আসে ছেলেটা।খামোখা এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করে অনেকক্ষণ থাকে এখানে।বারান্দায়, আনলায় ঝুলিয়ে রাখা মেয়েদের কাপড়, অন্তর্বাস ও অন্যান্য মেয়েলি জিনিষ এসবের দিকে কানা চোখে তাকায়।এ বাসায় সব ফ্ল্যাটে ফ্যামিলি থাকে।শুধু সবার উপরে ছয়তলায় মেয়েদের একটা মাত্র মেস।মেয়েরা অন্যান্য ফ্ল্যাটে খোঁজ নিয়েছিল,বাড়িওয়ালার ছেলে কিছুদিন পর পর এমন তদারকি করতে আসে কি না।সবাই জানালো,কিছুদিন পর পর তো দূরের কথা, এখন পর্যন্ত একবারও আসে নি।

রিকা একদিন ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ”আপনি তো সব ফ্ল্যাটে গিয়ে এমন তদারকি করেন না।আমাদের এখানে কেন করেন?”

ছেলেটা দুইগাল চওড়া করে বিশ্রী একটা হাসি দিয়ে বলল, ”আপনাদের প্রতি আমার আলাদা মহব্বত আছে।পিতামাতা বাড়িঘর সবকিছু ছেড়ে এখানে এসে পড়ালেখা করছেন, দেখা শুনার কেউ নাই, অভিভাবক নাই, তাই আপনাদের সুবিধা অসুবিধা, হালচাল দেখা আমার দায়িত্ব মনে করি।“

রিমা বলল, ”আপনার দায়িত্বে আমরা সন্তুষ্ট।অনেক খুশি হয়েছি আপনার আন্তরিকতা দেখে।আপনাকে আর কষ্ট করে আসতে হবে না।আমাদের কোন সমস্যা হলে আমরাই আপনাকে জানাব।“

তারপরও ছেলেটার আসা যাওয়া কমে না।মেয়েরা ভদ্রভাবে অনেকবার বলেছে।লাভ হয় নি।বাড়িওয়ালার কাছেও বলেছিল।তাও কাজ হল না।দ্বিতীয়বার বাড়িওয়ালাকে বলার পর বাড়িওয়ালা বলল, ”সে তো আর তোমাদের কোন ক্ষতি করছে না।বাড়ির মালিক হিসেবে ঘরের সবকিছু ঠিক আছে কি না সেটা দেখার অধিকার ওর আছে।তোমরা যদি বল যে তোমাদের সাথে সে বাজে আচরণ করে, অসভ্যতামো করে তাহলে না হয় একটা কথা ছিল।“

মেয়েরা কিছু বলতে পারলো না।খারাপ কোন আচরণের প্রমাণ তাদের হাতে নেই।তারা ভেবেছিল একবার বলবে, “আপনার ছেলের নজর খারাপ।“

পরে কি ভেবে আর কথাটা বলে নি।এটা বলার মত কোন কথাও না।এ কথা বললে বাড়িওয়ালা বলবে, “আমার ছেলে এমন না।তোমাদের চিন্তা ভাবনায় সমস্যা আছে।মন খামোখা খুঁতখুঁত করছে।অশ্লীল চিন্তা।“

প্রমাণ ছাড়া সব নালিশ ভিত্তিহীন।মেয়েরা জানে, বাড়িওয়ালা ঠিকি তার ছেলেকে নিষেধ করেছিল, কিন্তু সে শুনে নি।তাই এখন বাড়িওয়ালা নিজের দায় বাঁচাতে কথা ঘুরাচ্ছে।

 

সিঁড়ি বেয়ে রিকা নেমে আসলো দোতলায়।স্থির হয়ে দাঁড়ালো বাড়িওয়ালার দরজার সামনে।কলিং বেলে চাপ দিল দুইবার___ ঢং ঢং করে ঘণ্টার মত বেজে উঠলো সেটা।……………( চলবে )…

পুরানো তিমির [১৫তম এবং শেষ পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [১৫তম এবং শেষ পর্ব]

অফিস থেকে সপ্তাহ খানেকের ছুটি নিয়ে বাড়ি এলাম।কাল মেয়ে দেখতে যাব।আশার নাম্বারটা আজ পনের দিন ধরে বন্ধ।তার সাথে কিছুতেই যোগাযোগ করতে পারছি না।

মা বেশ হাসিখুশি আছেন।বাবাও মনে মনে অনেক ফুরফুরা মেজাজে আছেন।শেফার সাজগোজ আর শপিং দেখে বুঝা যাচ্ছে সেও মহানন্দে আছে।ঘরের মধ্যে চিন্তিত ব্যক্তি শুধু আমি।যার মনে কোন আনন্দ এখন পর্যন্ত দোলা দিতে পারলো না।অথচ বিয়ে আমার,সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হওয়ার কথাও আমার।সবাই এতই ব্যস্ত যে আমি যে সারাদিন মনমরা হয়ে বসে থাকি সে দিকে কারও খেয়ালই নেই।শেফাকে জিজ্ঞেস করলাম,”প্রতিদিন এতকিছু কি কিনিস?শাড়ি আর কয়টা কিনবি?গয়নাগাটি কিনতে কিনতে তো আলমিরা জ্যাম করে ফেলেছিস!”

শেফা ছোট বাচ্চাদের মত মুখ বাঁকা করে বলল,”আমার কি চার পাঁচটা ভাই আছে যে বছর বছর কিনতে পারব?ভাই একটা,বিয়েও একটা,তাই যত আনন্দ করার করে নিই।এটাই শেষ সুযোগ।“

বাহ্‌! সবাই খুব আনন্দে আছে,আর আমি বসে আছি বিরস মুখে।

শুক্রবার সকালে আমরা মেয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠলাম।বাড়িঘর ভালো।দেখে বিত্তশালী,মান-মর্যাদা সম্পন্ন মনে হয়।আমাদেরকে বড় একটা ঘরে বসতে দেয়া হল।আমরা বসলাম।খাওয়া দাওয়া করলাম।ঘণ্টা খানেক পরে মেয়েকে আনা হল আনুষ্ঠানিক ভাবে।সবাই দেখে নিল যার যার মত করে।আমি দেখে থ মেরে গেলাম।এমন একটা দৃশ্য দেখার জন্যে আগে থেকে প্রস্তুত ছিলাম না।কল্পনাও করি নি ভুলে।আশা যখন আমাকে মেসেজ করে বলেছিল,আমার জন্যে অপ্রত্যাশিত কিছু একটা অপেক্ষা করছে তখন আমি সেই অপ্রত্যাশিত বিষয়টা কি হতে পারে এ নিয়ে অনেক ভেবেছি।কিন্তু এখন চোখের সামনে যা দেখছি তা একবারও ভেবে দেখি নি।হা করে তাকিয়ে আছি চোখ বড় বড় করে।চেয়ে আছি অবাক দৃষ্টিতে।অনেক চেষ্টা করছি স্বাভাবিক থাকতে, কিন্তু পারছি না।আমার অবস্থা দেখে মুরুব্বীরা কানাঘুষা করছেন।মুখ টিপে হাসছেন।সব চেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন মা।তিনি খুব সন্তুষ্ট।ছেলে বউ দেখতে এসে মেয়ের দিক থেকে চোখ সরাতে পারছে না, হয়ত এটাই সেই আনন্দের উৎস।তাদের ধারনা মেয়েকে আমার খুব পছন্দ হয়ে গেছে।কনে পক্ষের একজন গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলো, “আমাদের মনে হয় ছেলে আর মেয়েকে একান্তে একটু সময় দেয়া উচিত।ওরা নিজেদের মধ্যে একটু কথা বলে নিক।“

কথা শেষ করার দেরি সবাই উঠে চলে যেতে দেরি নাই।মুহূর্তে সবাই ঘর খালি করে বেরিয়ে গেল।এখন আমি আর মেয়েটা ঘরে একা।কেউ কিছু বলছি না।কি দিয়ে কথা শুরু করবো তাও বুঝতে পারছি না।শেষে আমিই কথা শুরু করলাম, “কেমন আছ মিনা?”

মিনা নিশ্চুপ।সোফায় কুঁজো হয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে।আমি আবার বললাম,”কিছু বলছ না যে মিনা!”

কিছুক্ষণ পর কান্নার শব্দ পেলাম হালকা।মিনা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।আমি বললাম,”কাঁদছ কেন মিনা?আমার কিছু করার ছিল না সেদিন।তখন মাত্র ইন্টারমেডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি।তুমি সেদিন হঠাৎ করে এসে বললে তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে।এতটুকু বয়সে একটা মেয়েকে নিয়ে পালাব এমন সাহস হয় নি।তাছাড়া তোমাকে নিয়ে যাব কোথায় তাও ভেবে পাই নি।“

“প্লিজ আমি এসব নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না।“ মিনা গর্জে উঠলো, “সেদিনের কথা আজ এত বছর পর আবার টেনে এনে পুনরায় কথা বাড়াতে চাই না।“

আমি চুপ করে গেলাম।জীবনটা যেন এখানে এসে হুট করে থেমে গেছে।স্তব্ধ হয়ে গেছে মহাকাল।পেছনে ফেলে আসা সময় গুলো যেন আজ আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে অজানা দুঃসাহসে।তখন সবে মাত্র কলেজে উঠলাম।কলেজের পেছনে ছোট একটা বালিকা বিদ্যালয়।মিনা তখন নবম শ্রেণীতে পড়ে।হাঁটার পথে ওকে একদিন দেখে খুব ভালো লাগলো।বন্ধুরা মিলে দুষ্টামি করে কয়দিন পেছন পেছন ঘুরলাম।প্রেম নিবেদন করলাম।মিনাও কি বুঝে রাজি হয়ে গেল।দেখতে দেখতে আবেগ জমে গেল পাথরের মত।এক সময় মনে হল ওকে ছাড়া পৃথিবীতে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।আবেগ কি সেটা হয়ত তখন ভালো করে বুঝতামও না।তবে অজানা আবেগের টানে যে ভালোবাসা মনে বাসা বেঁধেছিল তাতে একবিন্দু খাদ ছিল না।নির্ভেজাল সত্যের মত বিশুদ্ধ ভালোবাসা।

তারপর একদিন…… মিনা তখন দশম শ্রেণীর শেষের দিকে।কিছুদিন পরই এসএসসি পরীক্ষা দিবে।বেশকিছু দিন ধরে সে বলছিল,বাড়ি থেকে বিয়ে দেয়ার জন্য চেষ্টা চলছে খুব।ভালো ভালো প্রস্তাব আসছে দেখে তার বাবা মা লোভ সামলাতে পারছে না।একদিন সকাল বেলা এসে মিনা বলল,”চল আমরা পালিয়ে যাই।“

আমার সেদিন সাহস হয় নি।পিতামাতা,সমাজ পরিবার সবকিছুর মুখের উপর আঙুল তুলে মিনাকে নিয়ে নিজের পৃথিবী সাজানো সম্ভব হয় নি।তারপর থেকে মিনা উদাও।আর কোন খোঁজ খবর পাই নি।কিছুদিন পর তার বান্ধবীদের সাথে কথা বলে জানতে পারি,ওর বিয়ে হয়ে গেছে।তারপর থেকে মনে হারানো ভালোবাসার বিশ্রী ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছি।আজ…… এতদিন পর তাকে আবার এভাবে খুঁজে পাব এমনটা কখনো ভাবি নি।

মিনা আমি দুজনেই চুপচাপ বসে আছি।আমি নিরবতা ভাঙ্তে বললাম, “কিছু তো বল।এভাবে চুপ করে বসে আছ কেন?”

“কি বলব?”

“এতদিন পর দেখা হল,কিছুই বলার নেই?”

“দেখা না হলেই মনে হয় ভালো হত।“

“এমন কথা কেন মিনা?”

“কেমন কথা? এখন তো তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি তাই না? অথচ আজ সকালে ঘুম থেকে উঠার সময়ও তুমি এই বিয়েতে রাজি ছিলে না।“

“তখন তো আমি জানতাম না যে তুমিই আশা।“

“জানাতে আমিও চাই নি।যেদিন আমাকে ফোন করেছিলে সেদিন তোমার কণ্ঠ শুনেই চিনেছিলাম।ভয়ে আর কথা বলি নি,যদি চিনে যাও।“

“চিনে গেলে কি হত?”

“কিছু হত না।করুণা দেখিয়ে আমাকে বিয়ে করতে।এখন যেমন করুণা দেখিয়ে বিয়ে করবে ঠিক তেমন,”

“এভাবে কেন বলছ মিনা?করুণা হবে কেন?”

“নয়ত কি?অন্য কোন মেয়ে হলে বিয়ে করতে?হয়ত মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বিয়ে করতে,কিন্তু এখন যেমন নিজের সদিচ্ছায় আগ্রহ নিয়ে বিয়ে করবে তখন এমনটা করতে? বল! উত্তর দাও!”

আমি নির্বাক মুখে বসে আছি।বলতে বলতে মিনা কেঁদে দিল।কিছুক্ষণ পর কান্না থামিয়ে উঠে চলে গেল ভিতর ঘরে।আমরা সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে চলে আসলাম।ভালো করে খোঁজ খবর নিয়ে জানলাম,মিনার আগের স্বামীর মাথায় কিছুটা সমস্যা ছিল।রাত হলেই কিছুটা পাগলাটে আচরণ করতো।তাছাড়া ভদ্রলোক প্রজননে অক্ষম ছিলেন।বিয়ের এত বছর পরও তাদের কোন সন্তান হয় নি।এই নিয়েও ভদ্রলোক ভীষণ বিষন্নতায় ভুগতেন।

তার কিছুদিন পর মুরুব্বীরা বসে বিয়ের দিন ক্ষণ ঠিক করলেন।সব আয়োজন ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছে।মানুষের এই বিচিত্র জীবন বড় অদ্ভুত রহস্যের ভান্ডার।কখন কিভাবে বদলে যায় কেউ আগে থেকে বলতে পারে না।আমার জীবনও হঠাৎ করে বদলে গেছে।

পুরানো তিমির [১৩তম পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [১৩তম পর্ব]

খারাপ লাগছে।মেয়েটা এভাবে অহংকার দেখালো! তার মাঝে কি এমন আছে যে আমি তাকে দেখলে বিয়ের জন্যে ব্যাকুল হয়ে যাব? কথাটায় কেমন যেন একটা অপমান বোধ করছি।ওকে কিছু একটা বলতে পারলে হয়ত মনে একটু শান্তি পেতাম।মেয়েটা এ কাজটা ইচ্ছা করেই করেছে।না হলে এখন মোবাইল বন্ধ করে দিত না।সে জানে এই কথা শোনার পর আমি রেগে যাব,আর যতক্ষণ রাগ মেটাতে পারব না ততক্ষণ আমার কষ্ট হবে।আমাকে কষ্ট দেয়ার জন্যই হয়ত তার এই সূক্ষ্ম পরিকল্পনা।

 

দুপুরের দিকে শেফা ফোন করে বলল মা আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।অবস্থা খুব বেশি ভালো না।স্থানীয় কোন ক্লিনিকে রাখতে চাচ্ছে না।ঢাকায় পাঠাতে হবে।আমি ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করলাম ঘণ্টা খানেকের  মধ্যে।মা ঢাকা এসে পৌঁছলেন বিকেল পাঁচটার দিকে।বার্ডেম হাসপাতালে সুন্দর দেখে একটা কামরা নিলাম।মার সমস্যাটা খুব বেশি শারীরিক না।ডাক্তার বলেছেন,মানসিক ভাবে উনাকে সুস্থ রাখতে পারলে শারীরিক ভাবেও সুস্থ রাখা যাবে।মানসিক দিক থেকে চিন্তামুক্ত করতে পারলেই প্রেশার কন্ট্রোলে  চলে আসবে।

 

মার চিন্তার কারণটা আমি জানি।আশার সাথে আমার বিয়ে নিয়েই যত সব চিন্তার সৃষ্টি।

মানুষের জীবনে অপ্রত্যাশিত অনেককিছুই ঘটে।মানিয়ে নিতে হয়।আমিও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি।মানুষের প্রাণশক্তি খুব বেশি প্রখর।এই প্রাণীরা যে কোন কঠিন পরিস্থিতির সাথে অনায়াসে মানিয়ে নিতে পারে।প্রিয়জনদের জন্যে নিজের আশা আকাঙ্ক্ষা অনেককিছুই বিসর্জন দিতে হয়।পিতামাতার চেয়ে বেশি আপন পৃথিবীতে কোন সন্তানের জন্য আর কেউ হতে পারে না।

মার সাথে এত খারাপ সময় আমার আর কখনো যায় নি।মা অনেক কষ্ট পেয়েছেন।সন্ধ্যা বেলায় মার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হল।আমি তাঁর মাথার কাছে গিয়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম,”তুমি যা চাও তাই হবে মা।আমি বিয়েতে রাজি।আশাকেই বিয়ে করব।তুমি কথা বল।“

মা আমার দিকে আহত দৃষ্টিতে তাকালেন।চোখে কষ্ট আর ব্যর্থতার ছাপ সুস্পষ্ট।ক্লান্ত স্বরে তিনি বললেন,”আশা বিয়েতে রাজি না।সে তোকে বিয়ে করতে চাচ্ছে না।“

“এখন উপায়?”

“আমি অনেক বুঝিয়েছি।কিছুই বুঝতে চায় না।আমাকে বলল,সে নাকি বাসা বদলাবে।সামনের মাসে নাকি গ্রামের বাড়ি চলে যাবে।কাল এসেছিল শেষ দেখা করতে।“

“আর এই জন্যেই তুমি এমন অসুস্থ হয়ে পড়েছ তাই না!”

মা কিছু বললেন না।চুপ করে শুয়ে আছেন।তাঁকে এখন অবুঝ শিশুর মত মনে হচ্ছে।আমি মায়ের আরও কাছে গিয়ে বসলাম।বললাম,”মা…মেয়েটা যেহেতু বিয়ে করতে চাচ্ছে না,আমাদের তো জোর করা উচিত হবে না।সে ছাড়াও তো দুনিয়ায় আরও অনেক ভালো ভালো মেয়ে আছে।তুমি অন্য কাউকে দেখ।“

মা যেন কিছুটা বিচলিত হলেন।তবে মুখ দিয়ে কিছু বললেন না।আমি পাশ থেকে উঠে দাঁড়ালাম।দরজা দিয়ে বেরুতে যাব এমন সময় মা খুব শান্ত কোমল গলায় বললেন,”মেয়েটা খুব ভালো রে আহাদ…অনেক লক্ষ্মী।আমার এত ভালো লাগে ওকে…!”

কিছুক্ষণ মায়ের দিকে চেয়ে রইলাম।তাঁর উজ্জ্বল চোখ দুটি এখন কেমন ম্লান হয়ে আছে।দুঃখিত,শোকাহত।

 

আমি মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম নিঃশব্দে।হাসপাতালের করিডোরের শেষ মাথায় খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম।বাইরে বিশাল আকাশ,তারা গুলো এদিক সেদিক উদ্দেশ্যহীন ভাবে ছড়িয়ে আছে চারদিকে।আশা মেয়েটার প্রতি একধরনের সম্মান বোধ হচ্ছে।মেয়েটা তার কথা রেখেছে।নিজ থেকে সরে পড়েছে।অথচ আমি মেয়েটাকে নিয়ে কি সব আজেবাজে চিন্তা আর ধারনা মনের মাঝে পুষে রেখেছি।ওকে একটা ধন্যবাদ দেয়া দরকার।মোবাইলটা হাতে নিয়ে কল দিলাম।ধরলো না।কয়েকবার চেষ্টা করলাম।লাভ হল না।কিছুক্ষণ পর সে আমাকে একটা মেসেজ দিল।

“আমি আপনাদের পরিবার থেকে সরে এসেছি।আবার কেন যোগাযোগ করতে চাচ্ছেন?আমি আপনার সাথে কোন যোগাযোগ করতে চাচ্ছি না।“

আমি আর কল না দিয়ে একটা ফিরতি মেসেজ পাঠালাম,”আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে কল দিয়েছিলাম।“

পুনরায় মেসেজ,”ধন্যবাদ পেয়েছি আমি।আর কল দিবেন না।“

“আচ্ছা” বলে একটা মেসেজ পাঠাতে গিয়ে দেখি মোবাইল বন্ধ।মেয়েটা আমার আচরণে খুব কষ্ট পেয়েছে।যাই হোক,সে যেহেতু চাচ্ছে না,আমি আর যোগাযোগ করব না।

 

রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে গেলাম।শেফা এসে বলল,”তোকে মা ডাকছেন।“

আমি মায়ের কাছে গেলাম।মা আমাকে আজ অনেক আদরে খুব কাছে নিয়ে বসালেন।আমি বললাম,”কি হয়েছে মা?কিছু বলবে?”

মা কিছুক্ষণ আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন।আমার কাছে কেমন যেন লাগলো।মা এভাবে কোনদিন চেয়ে থাকেন নি।আমি বললাম,”এভাবে চেয়ে আছ যে মা!”

তিনি ক্ষীণ স্বরে বললেন,”তুই আশাকে বলেছিস বিয়েতে যেন রাজি না হয়,তাই না?তুই ওকে খুব শাসিয়েছিস।“

আমি কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম।মা এমনটা টের পেলেন কিভাবে!আশা কি তবে মাকে কিছু বলেছে!আমি বললাম,”এমন কথা কেন মা?আমি ওকে কোথায় পাব?ওর সাথে তো আমার কোনদিন দেখা হয় নি।“

“তুই ওর নাম্বারটা আসার সময় নিয়ে এসেছিলি আমি জানি।কাউকে কিছু বলতে হলে এখন আর দেখা করতে হয় না।“

শেফা মাকে বলে দিয়েছে আমি যে আশার নাম্বার নিয়ে এসেছি।শেফার দিকে তাকালাম।সে আমার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে অন্যদিকে ফিরে গেল।আমি মায়ের দিকে ফিরলাম,”হ্যাঁ মা,আমি ওকে একবার নিষেধ করেছিলাম।তবে এখন আর নিষেধ করব না।আমি প্রথমে মেয়েটাকে বুঝতে পারি নি।আমি এখন রাজি।ও যদি চায় তবে……”

মা কিছু বললেন না।চুপ করে আছেন।আমি আরও কিছুক্ষণ বসে থাকলাম।মা কিছু বলছেন না দেখে আমি বললাম,”রাত অনেক হয়েছে।ঘুমিয়ে যাও মা।“

কথা শেষ করে আমি চলে এলাম।আসার সময় করিডোরে দাঁড়িয়ে শেফাকে বললাম,”মাকে কথাটা না বললেও পারতি।“

“মেয়েটা অনেক ভালো।ওর সাথে বিয়ে হলে তুই সুখেই থাকবি।“

“তাহলে ওর আগের স্বামীটা সুখে থাকে নি কেন?কেন বেচারা কষ্টে পিষ্ট হয়ে স্ট্রোক করলো?”

“আগের স্বামীটা একটু পাগলাটে ছিল।একঘুয়ে।মাথায় কিছুটা সমস্যা ছিল তার।“

“আমি লোকটাকে জানি।খুব ভালো মানুষ ছিলেন তিনি।মেয়েটাকে অনেক ভালোবাসতেন।“

“ভালো মানুষ কখনো বউ পেটায়?”

“রাগ উঠলে মানুষ বদলে যায়।হয়ত উনার রাগ একটু বেশিই ছিল।মেয়েটা নিশ্চয় এমন আচরণ করতো যে লোকটা অনেক রেগে যেত।“

 

শেফা কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল।আমি হেঁটে চলে আসলাম।কথা বলতে ভালো লাগছে না।

পুরানো তিমির [১২তম পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [১২তম পর্ব]

দিনটা ছিল সুন্দর।দখিনের হালকা বাতাস গা দুলাচ্ছে।এমন সুন্দর একটা সন্ধ্যায় আমি বারান্দায় বসে আশাকে কল দিলাম।অনেকক্ষণ রিং হল।প্রথমবারে কেউ ফোন রিসিভ করলো না।দ্বিতীয়বার চেষ্টা করলাম।তাও কেউ ধরলো না।আরও একবার।এবারও ফলাফল শূন্য।এক এক করে কম না হলেও দশবারের মত চেষ্টা করলাম।কোন লাভ হল না।শেষে বিরক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিলাম।মেয়েটার স্বামী মারা গেছে বেশিদিন হয় নি।নিজেদের মধ্যে যতই ঝামেলা থাকুক স্বামীর প্রতি বাঙ্গালি মেয়েদের একটু অন্য রকম টান থাকে।এই সময়ে মেয়েটাকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না।মেয়েটাকে দোষ দিতে পারছি না।বিয়ের ব্যপারটা আমার পিতামাতা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।মেয়েটা নিশ্চয় নির্লজ্জ বেহায়ার মত মাকে গিয়ে বলে নি যে_____আমি আপনার ছেলেকে বিয়ে করতে চাই।

 

শেফাকে ফোন দিলাম,মেয়েটা বিয়ের বিষয়ে কিছু জানে কি না সে কথা জানার জন্যে।শেফা জানাল মেয়েটা এখনো কিছুই জানে না।অথচ বাবা মার সাথে এটা নিয়ে আমার কয়েকবার হাঙ্গামাও হয়ে গেল।এখন আমার দায়িত্ব হচ্ছে মেয়েটাকে ভালো ভাবে বিষয়টা বুঝিয়ে বলা।যেন সে নিজ থেকেই ধীরে ধীরে মার থেকে দূরে সরে যায়।

 

রাতের খাবার শেষ করে আশার নাম্বারে আবার চেষ্টা করলাম।লাভ হল না।আমি আর চেষ্টা না করে মোবাইলটা একপাশে ফেলে রাখলাম।স্বামী মৃত্যুর শোক কিছুটা কমুক,আরও কিছুদিন যাক,তারপর এসব নিয়ে কথা বলা যাবে।

সারাদিন অফিসে আজ বেশ খাটুনি গেছে।শরীর বেশ ক্লান্ত।ঘুম পাচ্ছে।বাতি নিভিয়ে আজ অনেক তাড়াতাড়িই শুয়ে গেলাম।চোখ দুটো সবে বুঝে আসলো,এমন সময় মোবাইলটা চিৎকার দিয়ে উঠলো।হাতে নিয়ে দেখলাম আশার নাম্বার থেকে কল এসেছে।বিছানায় উঠে বসলাম।মানসিক ভাবে নিজেকে একটু প্রস্তুত হওয়ার সময় দিলাম কয়েক সেকেন্ড।কিভাবে কি বলব তাও মনে মনে একবার ভেবে নিলাম।

তারপর……কলটা রিসিভ করে কানে ঠেকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললাম,”হ্যালো।“

ওপাশ থেকে কোন সাড়া শব্দ নেই।আমি দ্বিতীয়বারের মত বললাম,”হ্যালো…”

ওপাশে এখনও নিরবতা।আমি অনেকক্ষণ হ্যালো হ্যালো চালিয়ে গেলাম।তবু কেউ উত্তর দিল না।শেষে হ্যালো শব্দটার সাথে আরেকটু বাড়িয়ে নিজের পরিচয় দিলাম,”হ্যালো…আমার নাম আহাদ।আপনি রোজ বিকেলে যে মহিলার সাথে বাসায় গিয়ে আড্ডা দেন,আয়েশা হক,আমি তাঁর ছেলে।“

 

ভেবেছিলাম পরিচয় পেয়ে হয়ত ওপাশ থেকে কেউ মুখ খুলবে।কিন্তু কেউ খুলল না।শেষেমেশ বিরক্ত হয়ে ফোন রেখে দিলাম।নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম এই বলে যে,হয়ত কলটা ভুলে এসেছে।এমনটা হয়।আমাদের অজান্তেই অনেক সময় মোবাইলে হাত লেগে অনেক জায়গায় কল চলে যায়।মোবাইলটা বালিশের পাশে রেখে আবার ঘুমের প্রস্তুতি নিলাম।ঘুম আসবে আসবে এমন সময় মোবাইলে আবার শব্দ হল।এবার কল আসে নি,একটা টেক্সট মেসেজ।মোবাইলটা হাতে নিয়ে মেসেজটা পড়লাম।আশার নাম্বার থেকে এসেছে।মেসেজে যা লেখা ছিল তা এই রকম,

“আমি আপনার সাথে ফোনে কথা বলতে পারব না।আপনার যা বলার আপনি কল দিয়ে বলে যান,আমি মনোযোগ দিয়ে শুনবো।যদি কিছু উত্তর দিতে হয়,তাহলে এভাবে মেসেজ করে জানিয়ে দিব।“

 

আমি একটু অবাক হলাম।মেয়েটা আমার সাথে ভালোই ভেলকিবাজি শুরু করেছে।আমার সাথে ফোনে কথা বললে তার সমস্যা কি?আমি তো আর তাকে প্রেম নিবেদন করছি না কিংবা অন্যায় কোন আবদারও না।নিশ্চয় তার মনে অসৎ উদ্দেশ্য আছে।

আমি ফিরতি একটা মেসেজ পাঠালাম,”আমার সাথে কথা বললে আপনার সমস্যা কি?”

মেসেজের উওর আসলো,”সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।আমি আপনার সাথে মুখ দিয়ে কোন কথা বলতে চাচ্ছি না।আপনার কিছু বলার থাকলে বলতে পারেন।আমি তো আর আপনাকে বলতে নিষেধ করি নি।আমার কথা আমি মেসেজ করে জানিয়ে দিব।“

 

এভাবে মেসেজ মেসেজ খেলা আমার আর ভালো লাগছে না।পুনরায় কল দিলাম।এবার একবার রিং হতেই ফোনটা রিসিভ হল।আমি বলিষ্ঠ বক্তার মত নিজের বক্তৃতা শুরু করলাম,”দেখুন আপনি আমার সাথে কেন কথা বলতে চাচ্ছেন না আমি জানি না।তবে আপনাকে কিছু কথা জানানো জুরুরী।আমার মা চাচ্ছেন আমার সাথে আপনার বিয়ে হোক।কিন্তু আমি এমন কিছু ভাবতে চাচ্ছি না।এবং আমি জানি আপনিও চান না।মা আমার কথা শুনবেন না।এখন আপনি যদি নিজ থেকে শক্ত ভাবে নিষেধ করেন তাহলে বিষয়টা আর সামনে এগুবে না।আপনার কাছে হয়ত কথা গুলো খুব অবাক করার মত মনে হচ্ছে,তবে এটাই সত্যি।আমাদের বাসায় এই নিয়ে কথা হচ্ছে।আপনাকে হয়ত এখনো জানান হয় নি,তবে কিছুদিনের মধ্যেই জানান হবে।আপনার এমন শোকাতর সময়ে এমন একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছি বলে দুঃখিত।আমার হাতে এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই।“

 

কথা শেষ করে ফোন রেখে দিলাম।মেয়েটার মেসেজের জন্যে অপেক্ষা করছি।সে মেসেজ পাঠাচ্ছে না।তার মনে হয় কিছুই বলার নেই।অপেক্ষা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে গেলাম নিজেই জানি না।চোখ মেলে দেখি সকাল হয়ে গেল।মোবাইলটা হাতে নিয়ে মেয়েটার মেসেজ দেখলাম।

“আমাকে বিয়ে করতে আপনার আপত্তি কোথায় সেটা কি জানতে পারি?”

মেসেজটা পড়ে আমার কাছে বেশ বিরক্ত লাগলো।রাগে মাথাটা ঝিনঝিন করছে।বেহায়া নির্লজ্জ মেয়ে।তারমানে মেয়েটাও মন মনে রাজি।আমার গলায় সুযোগ পেলেই ঝুলে যাবে।ইচ্ছে করছে ফোন করে কিছুক্ষণ গালাগালি করি মেয়েটাকে।কিন্তু তা করলাম না।ভদ্রভাবে বললাম,”দেখুন আমি আপনাকে কোনদিন দেখি নি।তাছাড়া আপনার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই।দয়াকরে আর সামনে এগুবেন না।আমি অনুরোধ করছি।আমি চাচ্ছি না আপনার সাথে আমার বিয়েটা হোক।আপনি যতই রূপবতী বা গুণবতী হোন না কেন।“

আমি ফোন কেটে দেয়ার পর মেয়েটা মেসেজ দিল, “আপনি এখন হয়ত আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন না,কিন্তু আমি নিশ্চিত আমাকে দেখার পর আপনি নিজেই উঠে পড়ে লাগবেন যেন বিয়েটা হোক।তবে আপনি যখন বলছেন,তখন আমি বিয়েটা হতে দিব না।নিশ্চিত থাকুন।“

মেসেজটা পড়ে শেষ করে যখন কল দিলাম,তখন অপারেটর অফিস থেকে জানালো____নাম্বারটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।

আমার শহর জ্যামের ঘোরে

Now Reading
আমার শহর জ্যামের ঘোরে

বাইরের দেশে মানুষরা দিনে অনেক কাজ করে।তারা কঠোর পরিশ্রম করে।আমরা করি না।আমরা অলস।এটা আমাদের জন্যে বিশাল একটা হতাশা।না…সবটুকুই হতাশা নয়।সব দোষ শুধু নিজেদের উপর নিলে চলবে না।কিছু দায়ভার পারিপার্শ্বিক সুযোগ সুবিধার উপরও দেয়া যাক।

 

একটি মানুষ প্রতিদিন কতটুকু সময় পায়?এর সংক্ষিপ্ত এবং একমাত্র উত্তর চব্বিশ ঘণ্টা।একটা মানুষের হাতে প্রতিদিন চব্বিশটা ঘণ্টা সময় থাকে।একটা মানুষ এই সময়ের ভিতর কি কি করতে পারে?অনেককিছু।হিসাব করে বলা কঠিন।সময়ের সুন্দর পরিকল্পিত ব্যবহার আমাদের অনেক সাফল্য এনে দিতে পারে।

চব্বিশ ঘণ্টা সময় চারটি খানি কথা নয়।এখন কথা হচ্ছে আপনি আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ী সময়টা ব্যবহার করতে পারবেন কি না।

 

গতকাল ৮ নভেম্বর ২০১৭;রোজ বুধবার আমার হাতে ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা সময়ই ছিল।কিন্তু সারাদিনে আমি কাজে লাগাতে পেরেছি মাত্র দুই ঘণ্টা।কেন? আমার নিজের অবহেলার কারনে? মোটেই না।

সকাল ১১টায় বাসা থেকে বের হয়েছি পুরান ঢাকার দিকে যাব।থাকি মোহাম্মদপুরে।বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অনুষ্ঠানের মঞ্চনাটকের জন্যে কিছু সরঞ্জাম কিনতে হবে শাঁখারিবাজার থেকে।বেলা বারোটার দিকে বাসে উঠলাম শ্যামলী থেকে আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যখন নামি,ঘড়িতে তখন বিকেল তিনটা।হাতে গুণে হিসাব করলে তিনটা ঘণ্টা আমি এবং আমার মত জ্যামে বসে থাকা মানুষ গুলো নিছক গাড়িতে বসে কাটিয়ে দিলাম।শাঁখারিবাজারে আমার কাজ শেষ হল বিকেল পাঁচটার দিকে।বাসে উঠতে উঠতে বাজলো সাড়ে পাঁচটা।আমি যখন আমার বাসায় এসে পৌঁছাই তখন রাত সাড়ে আটটা।আবার গেল তিন ঘণ্টা।তাহলে সারাদিনে আমার তিন ঘণ্টার কাজের জন্যে বাড়তি ছয় ঘণ্টা মোট নয় ঘণ্টা খরচ করতে হয়েছে।

 

এটা হল মাত্র একটা দিনের হিসাব।এভাবে প্রত্যেকটা দিন আমার মত কোটি বাঙ্গালির কতটুকু সময় অযথা অকারণে জ্যামে আটকে থেকে অলসভাবে গাড়িতে বসে কেটে যাচ্ছে কেউ সেই হিসেব কখনো করে দেখেছে কি?স্বল্প উন্নত দেশের মানুষ আমরা।দূষিত পরিবেশ,তুলনামূলক অনুন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা,জনসংখ্যার আদিপত্যে পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব_____এ সব নিয়ামকের কারণে উন্নত দেশ গুলোর মানুষের চেয়ে আমরা এমনিতেই আয়ু কম পাই।জীবনে সময় খুব কম,কিন্তু তবুও আমরা উন্নত দেশ গুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে ঠিকই টিকে আছি।জীবনের সবটুকু সময় ব্যবহার না করতে পারলেও আমরা ঠিকই বছর বছর বিশ্ববিদ্যালয় গুলো থেকে আমেরিকা,যুক্তরাজ্য,কানাডা,জার্মানি,জাপান সহ পৃথিবীর বিভিন্ন সেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ভুরি ভুরি মেধাবী ছাত্র রপ্তানি করছি।তারা সেখানে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে নামযশ জমাচ্ছে।কেউ কেউ বড় মাপের বিজ্ঞানীও হচ্ছে; নাসার মত গবেষণা সংস্থায় কাজ করছে।জীবনের অধিকাংশ সময় জ্যামে কাটিয়ে দেয়ার পরও আমাদের দেশ থেকে বড় মাপের কবি,সাহিত্যিক,লেখক বের হচ্ছে,দার্শনিক ইতিহাসবিদ তৈরি হচ্ছে_____খেলাধুলা,শিক্ষা সংস্কৃতি কোনদিক থেকে আমরা খুব বেশি পিছিয়ে নেই।বরং দিন দিন আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

 

যে জাতি এত সব প্রতিবন্ধকতা থাকার সত্তেও অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখার সাহস করে,বিশ্বজয়ের পরিক্লপনা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ায়,একবার গভীর মনোযোগ দিয়ে ভাবুন,সে জাতিকে দিনের সবটুকু সময় ব্যবহার করতে দিলে তারা কি করতে পারে!

উন্নত দেশ গুলোতে যে ট্রাফিক জ্যাম একেবারেই নেই এমন ধারনা ভুল।সেই সব দেশেও জ্যাম আছে।অবশ্যই আছে।তবে সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করতে হয় না।স্বল্প সময়ের জ্যাম।তারা তাদের কাজ শেষ করে বিনোদনের জন্যে পর্যাপ্ত সময় পায়,বিশ্রামের সুযোগ পায়,মন ফ্রেস থাকে।পরবর্তীতে কাজ করার সময় পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে,ক্লান্তিহীন কাজ করতে পারে।বিষন্নতা এসে মনকে ভারাক্রান্ত করে না।

আর আমরা খুব সকালে ঘর থেকে বের হই জ্যাম ঠেলে গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে আর সেখান থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়।ব্যক্তিগত কাজ গুলো সেরে আমরা ঠিকমত ঘুম আর বিশ্রামের সুযোগ পাই না,চিত্ত-বিনোদন আর মনোরঞ্জনের কথা না হয় বাদই দিলাম।আমরা এক ঘেয়ে জীবনের ক্লান্তিকর অনুভূতি বয়ে বেড়াচ্ছি।মানুষের মস্তিষ্ক কখনো একটানা যন্ত্রের মত কাজ করতে পারে না।বিশ্রাম দরকার হয়,চিত্ত-বিনোদন দরকার হয়।একটানা একটা কাজ দীর্ঘ সময় ধরে করতে গেলে মস্তিষ্ক ঠিকঠাক কাজ করতে চায় না।তাই মাঝেমাঝে কাজের ফাঁকে একটু বিনোদন আবশ্যক।এই ধরুন গান শোনা,মুভি দেখা,কিছুক্ষণের জন্যে কোথাও থেকে ঘুরে আসা,বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া ইত্যাদি।

 

আমাদের এই প্রতিবন্ধকতা কিন্তু আময়াদেরই সৃষ্টি।অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থা,ট্রাফিক আইন পালনে অনিহা ও যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা না থাকা,ফিটনেস বিহীন গাড়ি,ভিআইপিদের বেশি সুবিধা দেয়া ইত্যাদি কারণেই কিন্তু জ্যাম গুলো বাঁধে।এই সমস্যা গুলো সমাধান করা খুব বেশি কঠিন নয়।শুধু কর্তৃপক্ষের একটু সদিচ্ছা আর সতর্ক দৃষ্টি দরকার।এই সমস্যা গুলোর সমাধান হলে হয়ত ঢাকা শহর থেকে জ্যাম একেবারে উদাও হয়ে যাবে না,তবে অনেকক্ষাণি কমবে,মানুষের ক্লান্তি আর দূরাবস্থার কিছুটা হলেও সমাধান মিলবে।কিন্তু হতাশার কথা হচ্ছে আমরা কেউই এ বিষইয়টা নিয়ে সোচ্চার হচ্ছি না।দিন তো কেটে যাচ্ছে,এই জ্যাম মাথায় নিয়েই জীবনে উন্নতি করতে হবে_____এই ধরনের মানসিকতা আমাদের মাথায় গেঁথে গেছে।আমরা এখন সমাধান করার চেষ্টা না করে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি।আমরা ধরেই নিয়েছি জ্যাম নামক সমস্যার কোন সমাধান নেই আর এই সমস্যার সাথে মানিয়ে চলতে আমরা বাধ্য।

সরকার,প্রশাসন,সাধারণ জনগণ সবাই একসাথে কাজ করলে এই সমস্যার সমাধান মিলতে খুব বেশি দেরি হবে না।

 

পরিশেষে কিছু আশার কথা বলি।সবাই বলে বাঙ্গালিরা অলস জাতি,আরাম প্রিয় জাতি।না,এই ধারনা সম্পূর্ণ ভুল।আমাদের যথেষ্ট মেধা যেমন আছে,তেমনি কঠোর পরিশ্রম করার সামর্থও আছে।আমরা বাঙ্গালিরা জীবনের খুব কম সময় কাজে লাগাতে পারলেও; এই কম সময়ে বড় ধরনের সাফল্য এনে বিশ্ববাসীকে বারবার অবাক করেছি।ড. জাহদ হাসান,আতিক উজ জামান,রুবাব খান,জামান নজরুল ইসলাম………এভাবে বলা শুরু করলে সারাদিনেও শেষ হবে না।আমরা এগিয়ে যাচ্ছি,এবং আরও দ্রুত বেগে ছুটে যেতে পারব যদি জ্যামে আটকা পড়ে আমাদের মূল্যবান সময় গুলো এভাবে নষ্ট না হয়।

 

 

// আমাদের শহরটা ছোট।বিশ্ববাসী বারবার গলা ফাটিয়ে বলে এই শহর বাসের অযোগ্য।
তবু আমরা বেঁচে থাকি।আমাদের প্রখর প্রাণশক্তি আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
এই জ্বালাময়ী বিশ্রী কোলাহলের মাঝেও আমাদের কবি গুলো কবিতা লিখে,গল্পে গল্পে সাহিত্য সাজায়।ম্যাথমেটিক্সের সাথে বিন্ধুত্ব পাতান ছেলেটা ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাসের রহস্যময় জটিল ধাঁধাঁর সমাধান করে ফেলে,এক কোণে বসে গভীর সন্তর্পনে কোন এক ইতিহাসবিদ পুরনো দিনের কথা সামনে তুলে আনে……কেউই তো থেমে নেই।দিন চলে যাচ্ছে তো!

এই অবহেলিত শহরে,ময়লার স্তুপে জমে দুর্গন্ধময় কিলবিল করা জীবাণু আর কীটপতঙ্গের সাথে,বখাটে যানবাহনের প্যা পু চিৎকার সাথে নিয়ে আমরা দিব্যি হেসে খেলে বেঁচে আছি।হোক না বাসের অযোগ্য,মানুষের প্রাণশক্তি খুব কঠিন।যে কোন পরিস্থির সাথে তারা  খাপ খাইয়ে চলতে জানে…//

পুরানো তিমির [১৪তম পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [১৪তম পর্ব]

কিছুদিনের মধ্যেই মা সুস্থ হলেন।তবে নতুন একটা সমস্যা নিয়েই তিনি সুস্থ হলেন।বাবার সাথে মা আলাপ করার সময় আমি শুনেছি,উনারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন,এবার বাড়ি গিয়ে আশার বাড়িতে পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিক বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবেন তাঁরা।সামাজিক নিয়মে অন্য আট-দশটা বিয়ে যেমন হয়,এটাও ঠিক সেই ভাবেই হবে।প্রথমে প্রস্তাব পাঠান হবে,তারপর দুই পক্ষ একে অপরের খোঁজ খবর নিবে,সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে দিনক্ষণ ঠিক করে আমরা একদিন মেয়ে দেখতে যাব।সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও উপস্থিত থাকবেন।মেয়ে পছন্দ হলে হয়ত সেদিনই বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে যাবে।

 

আমি এই নিয়ে বিশেষ একটা চিন্তিত নই।যা হবার হবে।আমি এক প্রকার মায়ের দিকে তাকিয়ে বিয়েতে রাজিই হয়ে গেছি।মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম,মা বাবা,শেফা সবার কাছেই যখন মেয়েটাকে খুব ভালো লেগেছে,মেয়েটা নিশ্চয় খুব বেশি খারাপ হবে না।যে মা পঁচিশটা বছর কষ্টে লালন করেছন,যে বাবা মাথার উপর ছায়ার মত সন্তান কে আগলে রেখেছেন,তাদের জন্য সন্তান হিসেবে এইটুক বিসর্জন দিতে পারব না___ এমনটা হতে পারে না।মনে হয়ত একটু আক্ষেপ থেকেই যাবে।কুমারী মেয়ে বিয়ে করতে সব পুরুষই চাই।এটা দোষের কিছু না।আমিও বা তার ব্যতিক্রম হব কেন?

থাক,ইচ্ছাটা না হয় পরিবারের সুখের দিকে তাকিয়ে পূরণ নাই বা হল।মন্দ কি! পৃথিবীতে সব ইচ্ছা পূরণ হতে হবে এমন তো কোন কথা নেই।কিছু ইচ্ছা অপূর্ণ থাকাই ভালো।সবকিছু পেয়ে গেলে মানুষ বাঁচার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।ভাবে,সব তো পেয়েই গেলাম,জীবন পরিপূর্ণ।আর যখন আমাদের তৃপ্তি মিটে যাবে,তখন পৃথিবীর প্রতি আমাদের টান কমে যাবে,মায়া কমে যাবে।

 

পরদিন সকালে মাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে আনলাম।বাসায় নিয়ে এসে মাকে বললাম,”কিছুদিন আমার কাছে থেকে যাও মা।“

তিনি বললেন,”না থাকতে পারব না।অনেক কাজ আছে।“

 

আমি আর জোর করি নি।জানি,জোর করে মাকে রাখা যাবে না।একবার যখন মুখ খুলে বলেছেন থাকবেন না তখন হাজার চেষ্টা করেও রাখা যাবে না।বৃদ্ধ হতে হতে মানুষ শিশুদের মত অবুঝ হয়ে যায়।মনের ভিতর কেমন একটা গোঁ ধরা ভাব থাকে।

বিকেলের ট্রেনে বাবা মা,শেফা সবাইকে উঠিয়ে দিলাম।

গভীর সন্তর্পনে সযত্নে লালন করা এই জীবন যেন ট্রেনের মত অবিরাম ছুটে চলছে।চলতে চলতে একদিন সমাপ্তিতে পৌঁছাবে।সমাপ্তির শেষ বিন্দুকে মানুষ আদর করে ডাকে মৃত্যু।

চলন্ত ট্রেনের দিকে তাকিয়ে থেকে এক মুহূর্তের জন্যে ভাবনায় ডুবে গেলাম।

 

তারপর কয়েক সপ্তাহ বেশ ভালোই কেটেছে।মা সুস্থ আছেন।আমিও নিয়মিত অফিস করছি।মাথাটা কেমন যেন ঝামেলা মুক্ত হালকা মনে হচ্ছে।তারপর একদিন,মেঘলা আকাশ,বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে।দুপুরের দিকে অসময়ের বৃষ্টির মত শেফাও অসময়ে ফোন করে জানালো অফিস থেকে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে বাড়ি যেতে।আমরা মেয়ে দেখতে যাব।মেয়ে দেখার দিন তারিখ ঠিক হবে আজ রাতে।

আমি বেশ চমকে উঠলাম।কখন প্রস্তাব পাঠান হল আর কখন সবকিছু এতদূর এগুলো কিছুই টের পাই নি।এর মধ্যে না কি মেয়ের ভাই আমাকে এসে তিনবার দেখে গেছে।একবার নাকি আমার সাথে অপরিচিত লোক বেশে কথাও বলেছে।কিছুই ধরতে পারলাম না।নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগছে।

 

ঐদিন রাতে আশা আমাকে আবার মেসেজ দিল।আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে মেসেজটা পড়লাম,

“আপনি বলেছেন আপনার পরিবার থেকে সরে আসতে,আমি সরে এসেছি।কিন্তু আপনারা এসব কি শুরু করেছেন?”

আমি ফিরতি একটা মেসেজ পাঠালাম,”আপনি তো জানেন মা আমার কথা শুনবেন না।এখানে আমার কিছু করার নেই।আমাকে যদি আপনার পছন্দ না হয় তাহলে আপনি আপনার পরিবারকে বলতে পারেন।তখন উনারাই বিয়ে থামানোর ব্যবস্থা করবেন।“

কিছুক্ষণ পর আবার মেসেজ আসলো,”দেখুন এটা আমার দ্বিতীয় বিয়ে।এখানে আমার মতামতকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে না।“

এভাবে আমাদের মধ্যে মেসেজ আদান প্রদান চলছে,

“আপনি আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন না কেন?”

“সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।দয়া করে আমাকে দেখতে আসবেন না প্লিজ।সহ্য করতে পারবেন না।তখন নিজেই বিয়ের জন্য জোর করবেন।“

“নিজেকে খুব রূপবতী মনে করেন আপনি।আপনার ধারনা আপনার চেয়ে সুন্দর মেয়ে পৃথিবীতে আর নেই।সব পুরুষ আপনার জন্যে পাগল হয়ে থাকে।হয়ত আপনি খুব সুন্দরী নারী।তবে এতটা অহংকারও ভালো নয়।“

“অহংকার করছি না।আপনি বিষয়টা বুঝতে পারছেন না।একটা অপ্রত্যাশিত কিছু অপেক্ষা করছে আপনার জন্যে।“

“বেশ তো,দেখি না সেই প্রত্যাশিত বিষয়টা কি।“

“আপনি তাহলে দেখতে আসবেন?কিছুদিন আগে আপনিই আমাকে নিষেধ করেছিলেন,বলেছিলেন আমার প্রতি আপনার কোন ইন্টারেস্ট নেই।“

“দেখুন আমি আপনাকে নিয়ে খুব একটা ভাবি নি।এখনও যে খুব বেশি ভাবছি এমনও না।আমার মায়ের জন্যে ভাবতে বাধ্য হচ্ছি।আপনি জানেন মা আপনাকে খুবই ভালোবাসেন।অনেক পছন্দ করেন।“

“বাহ…ধারুণ! শুধু মার মন রক্ষা করতে গিয়ে একটা মেয়েকে বিয়ে করে তার লাইফটা এভাবে নষ্ট করে দিবেন?”

“আরে আশ্চর্য! লাইফ নষ্ট হবে কেন?”

“হবে না? নিজ থেকে পছন্দ করে বিয়ে করলে একটা মেয়েকে আপনি যতটুকু ভালোবাসতে পারতেন,শুধুমাত্র মায়ের মন বাঁচাতে বিয়ে করলে অতটুকু ভালোবাসতে পারবেন? একটা মেয়ে কত স্বপ্ন নিয়ে স্বমীর ঘরে পা রাখে আপনি জানেন? মেয়ে হলে বুঝতেন।“

 

আমি কোণঠাসা হয়ে গেলাম।এরপর কি উত্তর দিব ভাবতে পারছি না।মেয়েটার কঠিন যুক্তির কাছে আমি পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য।শুধুমাত্র মায়ের মন বাঁচাতে একটা মেয়েকে বিয়ে করলাম,পরে দেখলাম দুজনের মনের মিল নেই।তখন কি আমরা সুখি হতে পারব?আমি না হয় নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিব যে____ মেয়েটাকে বিয়ে করাতে অন্তত আমার মা ভালো আছেন।এই ভেবে হয়ত আমি নিজ মনে তৃপ্ত থাকব।কিন্তু ঐ মেয়েটা? সে তখন নিজেকে কি বলে সান্ত্বনা দিবে?

 

আমি দোটানায় পড়ে গেলাম।উভয় সংকট,কি করব বুঝতে পারছি না।বিয়েটা কি করা উচিৎ হবে? সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।একদিকে মা,অন্যদিকে নিজ দাম্পত্য জীবনের ভবিষ্যৎ।

পুরানো তিমির [১১তম পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [১১তম পর্ব]

সকালে ঘুম থেকে উঠেই এমন একটা খবর শুনলাম যে আমার শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেল।গায়ের লোম গুলো কাঁটা দিয়ে উঠলো মুহূর্তে।আজিজুর রহমান মারা গেলেন।খবরটা পেলাম মায়ের মুখে।তিনি নাকি স্ট্রোক করেছেন।শুনে কেমন যেন মানতে পারছিলাম না কথাটা।মস্তিষ্ক যেন এমন একটা অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদ গ্রহন করতে চাইছে না। কাল রাতেই আমি তার সাথে কথা বলেছি।হ্যাঁ, খুব সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতই তিনি সুন্দর ভাবে কথা বলেছিলেন।দেখে একটুও অসুস্থ মনে হয় নি।আমার মনে আছে,তিনি বলেছিলেন____হয়ত আর দেখাই হবে না।কোনদিন আর দেখা হবে না।চাইলেও না।মানুষটা কি জানতেন আজ তিনি চলে যাবেন? অদ্ভুত!

লোকটার সাথে আমার পরিচিয় খুব অল্প দিনের।তেমন কোন ভাব জমে উঠে নি।সামান্য কথাবার্তায় আর ভদ্র লোকের অমায়িক ব্যবহারে কেমন যেন মায়া বসে গেছে।লোকটা খারাপ কি ভালো এতকিছু জানি না,শুধু বলতে পারি তাঁর মাঝে কোন মন্দ আচরণ দেখি নি।

 

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই এমন একটা খবর পেয়ে মনটা বেশ খারাপ হল।তবে স্বস্তির কথা হচ্ছে মা অনেক সুস্থ আছেন।খবরটা মা জেনেছেন আশার কাছ থেকে।মেয়েটা ভোর বেলায় মায়ের কাছে এসে কান্নাকাটি করে গেছে কিছুক্ষণ।বাবাও ছিলেন।তখন আমি আর শেফা দুজনই ঘুমিয়ে ছিলাম।

 

হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেস হলাম।নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়লাম আজিজুর রহমানের বাড়ির দিকে।লোকটাকে শেষবার একটু দেখে আসি।সেই সাথে আরো একটি কাজ হবে।আশা মেয়েটাকে আজ দেখতে পাব।

বাড়ির সামনে গিয়ে নিছক হতাশ হলাম।দরজায় তালা দেয়া।লোকমুখে জানলাম,খুব সকালে আজিজুর রহমানের লাশ পরিবার এসে দেশের বাড়ি নিয়ে গেছে।মনে মনে একটু দুঃখিত হলাম।একবার দেখতে পারলে ভালো হত।ভদ্রলোকের দেশের বাড়ি কোথায় আমি জানি না।জানলে যাওয়া যেত হয়ত।হতাশ মুখে ক্লিনিকে ফিরে এলাম।মা আজ এতটাই সুস্থ যে তাঁকে রিলিজ দেয়া হল।আশা মেয়েটার সাথে একবার দেখাই মাকে আমূলে বদলে দিল।অবাক হলাম।মানুষের মাঝে আত্মার বন্ধন কতটা সুদৃঢ় হতে পারে তা ভেবে আমাদের শুধু অবাক হতে হয়।

 

মাকে বিকেল বেলায় শেফার বাসায় পৌঁছে দিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।অনেকদিন পর মনটা একটু হালকা লাগছে।আজিজ সাহেবের জন্যে একটু খারাপ হয়ত লাগছে,তবে তা খুব বেশি জোরালো না।মৃত্যু আর নিয়তির উপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।

 

ঢাকায় পৌঁছে বেশ ভালোই ছিলাম।একদিন শেফা জানালো,আশা মেয়েটা এবার তার বাড়িতে আসা যাওয়া শুরু করেছে।মার সাথে আবার তার ভাব জমে উঠেছে।আমি আশ্চর্য হলাম।বললাম, “মেয়েটা তোর ঠিকানা জানলো কি করে?”

আশা জানালো,”মায়ের কাছে মেয়েটার মোবাইল নাম্বার আছে।“

খবরটা শুনে নিজেকে কেমন বোকা বোকা মনে হচ্ছে।এতদিন মেয়েটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি আর একবারের জন্যেও মার কাছে জানতে চাইলাম না মেয়েটা কে খুঁজে বের করার কোন উপায় আছে কি না।অবশ্য আমি নিজেই মাকে জানাতে চাই নি খবরটা।আমার পক্ষ থেকে সাপোর্ট পেয়ে গেলে পরে মেয়েটাকে আর আলাদা করতেই পারব না।

আমি শেফাকে বললাম,”থাক না,মেয়েটা যদি মায়ের সাথে একটু কথাবার্তা বললে মা একটু সুস্থ থাকেন তবে ক্ষতি কি! তোর যদি কোন অসুবিধে না হয় তাহলে আসুক।“

 

কিছুদিন পর আরেকটা খবর শুনে আমি আরও বেশি অবাক হলাম।শেফা ফোন করে আচমকা আশা মেয়েটার প্রশংসা শুরু করলো।মেয়েটা খুব ভালো,মায়াবী,মানুষকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারে……হেনতেন।

আমি নড়েচড়ে বসলাম, “তুইও মেয়েটার খপ্পরে পড়ে গেলি!”

“আরে দূর……খপ্পরে পড়তে যাব কেন?মেয়েটার মনে কোন খারাপি নেই।“

শেফার সাথে তর্কে গেলাম না।সেও মেয়েটার কাছে কাবু হয়ে গেছে।আমার ভয়টা পুনরায় বাড়তে লাগলো।এতদিন নিশ্চিন্তে ছিলাম এই ভেবে যে,মা বাবা দুজনেই এখন শেফার কাছে আছেন।আশা মেয়েটার মনে কোন দুষ্ট বুদ্ধি থাকলেও শেফা সামলে নিবে।সুবিধা করতে পারবে না।কিন্তু এখন দেখছি শেফা নিজেই বদলে গেছে।

 

এমন দুশ্চিন্তায় যখন আমার সময় কাটছে,তার কিছুদিন পর এমন ভয়াবহ একটা খবর পেলাম যা শুনে আমার টনক নড়ে উঠলো।আমার বিয়ে।আমাকে জানানো ছাড়াই আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।শেফা এক সন্ধ্যায় ফোন করে বলল,”আশার সাথে মা তোর বিয়ে ঠিক করেছেন।“ তার কথা বলার ভঙ্গি আর হাস্যজ্জল অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে পারলাম নাটের গুরু হিসেবে সেও বেশ খুশি।সবকিছু এতদিন পরিবার আর সবার সুখের জন্যে মেনে নিয়েছি।এমন একটা কাজ আর কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না।পিতামাতা তাঁর সন্তান কে নিজের পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করাতেই পারেন।হোক না মেয়েটার কোন রূপ-গুণ নেই।তাই বলে একটা বিধবাকে পছন্দ করবেন?সব পুরুষের মত আমারও কুমারী মেয়ে ঘরে আনার স্বপ্ন থাকাটা খুব বেশি অন্যায় নয়।

 

অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আবার বাড়ি গেলাম।স্পষ্ট করে বাবা মাকে বললাম আমি এই বিয়েতে রাজি না।অনেক তর্ক বিতর্ক হল।পিতামাতার সাথে এমন বিশ্রি ভাবে ঝগড়া আমার এর আগে আর হয় নি।দফায় দফায় সকাল বিকাল এ নিয়ে ঘরের ভিতর ঝামেলা লেগেই আছে।শেষে আর কিছু করতে না পেরে রাগ দেখিয়ে ঢাকায় চলে আসলাম।আসার সময় শেফার সাহায্যে মায়ের মোবাইল থেকে আশার মোবাইল নাম্বারটা চুরি করে আনলাম।মেয়েটার সাথে কথা বলে সবকিছু শেষ করতে হবে।

পুরানো তিমির [১০ম পাঠ]

Now Reading
পুরানো তিমির [১০ম পাঠ]

 

আজিজুর রহমানের বাড়ি থেকে সোজা ক্লিনিকে ফিরে এলাম।মায়ের ঘুম ভেঙ্গেছে।তিনি হেলান দিয়ে বসে আছেন বিছানায়।মাথার কাছে শেফা দাঁড়িয়ে আছে পায়সের বাটি নিয়ে।আমাকে দেখে মা একটু বিরক্ত হলেন।আমি এখনো এখান থেকে যাচ্ছি না কেন,এটাই সেই রাগের কারণ।মা’র সাথে কোন কথা না বলে চলে এলাম বারান্দায়।বাবা বসে আছেন শেফার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে।বাবার সাথে আশাকে নিয়ে কথা বলার সাহস কোনদিন হয় নি।তবু আজ কথা বলার সাহস নিয়ে সামনে গিয়ে বসলাম।বাবা আমার দিকে খেয়ালও করলেন না।এক মনে বারান্দার ফাঁকে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছেন।ডুবে আছেন একটা চিন্তার ঘোরে।আমি কাছে ঘেঁষে কোমল গলায় ডাক দিলাম।

“বাবা…”

“হু…”

বাবা আমার দিকে তাকালেন।শান্ত,নিমীলিত স্থির চোখ।দেখলে মায়া লাগে।

“নাস্তা করেছ বাবা?”

বাবা মুখ দিয়ে কিছু বললেন না।শুধু না সূচক মাথা নাড়লেন।আমি বললাম,“বেলা অনেক হয়েছে।কিছু খেয়ে নাও বাবা?”

বাবার ভাবের কোন পরিবর্তন হল না।তিনি আগের মতই বসে আছেন।আমি আশার কথাটা বলতে গিয়েও বললাম না।গলায় কেমন যেন আটকে গেল।এমন ভারসাম্যহীন মানসিক অবস্থায় কথাটা তুলতে বিবেকে বাঁধা দিচ্ছে।আমি উঠে দাঁড়ালাম।বারান্দার দরজায় দিয়ে যখন বের হব তখন বাবা খুব ক্ষীণ স্বরে ডাক দিলেন, “আহাদ……”

আমি ফিরে তাকালাম।বাবা আহত কণ্ঠে বললেন,”আশার কোন খোঁজ পেয়েছিস?”

আমি চমকে উঠলাম।আমি যে আশাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি এই কথা কাউকে বলি নি।এমন কি শেফাকেও না।বাবা টের পেলেন কিভাবে সেটা নিয়ে একটু ভাবলাম।পিতামাতাদের কাছে কি স্রষ্টা ঐশ্বরিক কোন ক্ষমতা দিয়ে রাখেন?উনারা কেমন করে জানি সন্তানের মনের অবস্থা বুঝে যান।আমি যখন বাবা হব,তখন আমিও কি সন্তানের মন এমন করে বুঝে যাব?

 

বাবার দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি।বাবা দ্বিতীয় বারের মত প্রশ্ন করলেন, “কোন খবর পাস নি?”

“না বাবা।তুমি কিছু জানো?”

“না…” বলতে গিয়ে বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।আমি সোজা বেরিয়ে গেলাম।আসার সময় শেফাকে বলে আসলাম, “বাবাকে কিছু খাইয়ে দিস।“

 

আকাশে মেঘ গুলো আরও বেশি জমাট বদ্ধ হয়েছে।কালো মেঘে ঢেকে গেছে পুরো আকাশ।হয়ত ঝুম বৃষ্টি নামবে।আমি ফুটপাত ধরে হাঁটা ধরলাম।উদ্দেশ্যহীন পথ চলা।যার কোন গন্তব্য নেই।মানুষের মন খারাপের সময় গুলো কেমন অদ্ভুত! মন যখন অশান্ত হয়ে পড়ে,মানুষ তখন উদ্দেশ্যহীন কাজে সান্ত্বনা খুঁজে পায়।

 

হাটতে হাটতে একটা খোলা মাঠ পেলাম।ছোট্ট।তেমন বেশি বড় না।এক কোণায় সারি করে লাগানো কয়েকটা গাছ।সেগুলো ছায়া ছড়াচ্ছে।সেই শীতল ছায়ার পরশে গাছ তলায় কয়েকটা বেঞ্চ দেয়া।আমি একটা তে গিয়ে বসলাম।ঘড়িতে তখন বেলা বারোটার মত বাজে।হাতে কোন কাজ নেই।কি করা যায় ভাবছি।মানুষের কাছে ব্যস্ততা যেমন অসহ্যকর,দম ফেলার সুযোগ থাকে না; তেমনি নিরানন্দ অবসরও অসহ্যকর।একটা বিচ্ছিরি অস্বস্তিতে দিন কাটছে আমার।একবার ভাবলাম ঢাকায় ফিরে যাই।এদিকে যা হবার হবে।আশা মেয়েটাকে যখন খুঁজে পাচ্ছি না,তখন এখানে বসে থেকে কি লাভ?

পরক্ষণেই আবার মন মানে না।মাকে এমন অবস্থায় রেখে যাই কি করে! কিছু একটা বিহিত করতেই হবে।

খুব বড় ভুল করে ফেলেছি।আশার স্বামী থেকে তার সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে আসা উচিত ছিল।আসল নামটা পর্যন্ত জানলাম না।মেয়েটার স্বভাব সম্পর্কে জানলে কিছু একটা অনুমান করতে পারতাম।

 

এসব ভাবতে ভাবতে আমার কি হয়েছে জানি না।চোখ মেলে দেখি সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।চারপাশে আবছা অন্ধকার নেমেছে।মনে করার চেষ্টা করলাম দুপুরে ভাবতে ভাবতে আমি এখানে ঘুমিয়ে পড়েছি।

 

ফুটপাত ধরে পুনরায় ক্লিনিকের দিকে হাঁটা দিলাম।সারাদিন আকাশে মেঘ গুলো গড়াগড়ি খেলে এতক্ষণে বৃষ্টি নামলো।ঝুম বৃষ্টি।আমি বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হাঁটছি।বৃষ্টির শীতল পরশে কেমন একটা স্বস্তির অনুভূতি আছে।

খেয়াল করলাম,আমার সাথে আরও একজন মানুষ হাঁটছে।পাশাপাশি না।একটু পিছনে।অন্ধকার নেমে এল,তার উপর আবার এমন বৃষ্টি,তাই ভালো করে লোকটার মুখ দেখতে পারছি না।

 

“আজকের এই বৃষ্টি করুণ রোদনের বৃষ্টি…” লোকটা জোর গলায় কথা বলে উঠলো,”এই বৃষ্টিতে মনের অবহেলিত স্মৃতি মনে পড়বে।কান্না পাবে খুব।“

পেছন ফিরে লোকটাকে ভালো করে দেখলাম।আজিজুর রহমান।ভিজে চুপসে আছেন।আমি হাসি মুখে বললাম,”আরে…ভাই কেমন আছেন?বৃষ্টিতে এমন ভিজছেন কেন?অসুখ করবে তো!”

“আপনার অসুখ করবে না?”

“হা হা হা……এদিকে কোথায় যাচ্ছেন?”

“কোথাও না।এমনি হাঁটছি।এমন বৃষ্টি সব সময় হয় না।তাই সুযোগ পেয়ে ভিজে নিচ্ছি।মজা লুটে নেয়ার এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে নেই।“

“ও…আচ্ছা।“

“এখনও ঢাকায় ফিরে যান নি?”

“না,কিছুদিন এখানে থাকব।ভালো লাগছে পরিবেশটা।“

“আপনার কি কাঁদতে ইচ্ছে করছে?ইচ্ছে করলে কেঁদে ফেলুন।“

আমি হকচকিয়ে গেলাম,“কাঁদছে ইচ্ছে করবে কেন?!”

“এমনি…আমার ইচ্ছে করছে,তাই আপনারও ইচ্ছে করছে কি না জানতে চাইলাম।সাধারণ অবস্থায় কাঁদলে মানুষ নানান প্রশ্ন করে।কেন কাঁদছি,কি হয়েছে…হেনতেন।বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কাঁদলে কারও চোখে পড়বে না।তাই বৃষ্টি হলেই আমার কান্না পায়।“

মনের অজান্তে বিড়বিড় করে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল,”অদ্ভুত…!!”

“এই পৃথিবীতে সবকিছুই অদ্ভুত ভাই।“

“আপনি অকারণে কাঁদবেন কেন?”

“সবকিছুর কারণ কি আর আমাদের জানা থাকে বলুন!”

 

আমি চুপ মেরে গেলাম।লোকটার সাথে কথায় পেরে উঠা মুশকিল।কথাটা একেবারে মিথ্যাও না।পৃথিবীর সব ঘটনার ব্যাখ্যা কি আমরা দিতে পারি?সবকিছুর কারণ আমাদের জানা থাকে কি? থাকে না।“

 

আমি আজিজুর রহমানের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলাম।তিনি লজ্জিত কণ্ঠে বললেন,”দুঃখিত ভাই,আমি ভুল বলেছি।চোখের জল কোনদিন লুকান যায় না।“

আমি দেখে অবাক হলাম।এই ঝুম বৃষ্টিতেও আজিজুর রহমানের চোখ বেয়ে পড়া অশ্রু আলাদা করে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে।কান্নার কি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য!কি বেহায়া!

 

হাঁটতে হাঁটতে ক্লিনিকের সামনে চলে আসলাম।আমি বললাম,”ভাই,গেলাম।আমার এক আত্মীয় অসুস্থ।এখানে ভর্তি করেছি।আমি এখানে আজ রাতটা থাকব।“

আজিজ সাহেব কোন কথা বাড়ালেন না।মুচকি হেসে সায় দিলেন।আমি বললাম,”বেঁচে থাকলে হয়ত আবারও দেখা হবে।ভালো থাকবেন।“

“হয়ত আর দেখাই হবে না।“

আমি মুচকি হেসে ক্লিনিকের দিকে হাঁটা দিলাম।গেইট দিয়ে ঢুকতে যাব এমন সময় আজিজুর রহমান পেছন থেকে ডাক দিলেন।আমি ফিরে তাকালাম।তিনি নির্ভীক কণ্ঠে বললেন,”আজ রাতে এই পৃথিবী বদলে যাবে…”

আমি কথাটার অর্থ বুঝার চেষ্টা করছি।আজিজ সাহেব সোজা সামনের দিকে হাঁটা দিলেন।সাহসী সৈনিকের মত উদ্দীপ্ত পদক্ষেপ।

পুরানো তিমির [৯ম পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [৯ম পর্ব]

খুব সকালে বিছানা ছেড়ে উঠলাম।বাইরে কাঁকডাকা ভোর।আবছা অন্ধকারের ধার বেঁয়ে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের ডাল।কালো কালো মেঘ গুলো এদিক সেদিক ভেসে বেড়াচ্ছে।আজ মনে হয় বৃষ্টি হবে।এমন মেঘলা সকালে আমি ঘুম থেকে উঠেই বাইরে বেরিয়ে পড়লাম।বৃষ্টির গুটি গুটি ফোঁটা শরীরে নরম পরশ বুলাচ্ছে।আশার বাড়িতে গিয়ে কোন লাভ হবে না জানি।কাল রাতেই খোঁজ করে দেখেছি কেউ নেই।তবু একবার গেলাম।মানুষের পরিকল্পনা গুলো যখন অগোছালো থাকে তখন মানুষ খুব বেশি উদ্দেশ্যহীন কাজ করে।আমারও তাই হচ্ছে।আশা মেয়েটাকে কোথায় খুঁজবো,কোত্থেকে খোঁজা শুরু করব কিছুই জানি না।জানলে না হয় কিছু একটা পরিকল্পনা সাজান যেত।শুধু জানি মেয়েটাকে খুঁজে পেতে হবে।যে ভাবেই হোক পেতে হবে।উদ্দেশ্যহীন ভাবে,যখন যেখানে মন চাচ্ছে খুঁজছি।ভাগ্যে থাকলে হয়ত পেয়েও যেতে পারি___মনের ভিতর এমন একটা সম্ভাবনা।নিজের মায়ের জন্যে একটা মেয়েকে খুঁজে বের করতে পারব না,এমন পরাজয় মেনে নেয়া কঠিন।

আশার বাড়ির সামনে গিয়ে ভিতরের দিকে উঁকি দিলাম।উঁকি দিয়ে মোটামুটি চমকে উঠলাম।আজ আশার ঘরের দরজাটা খোলা।কোন তালা ঝুলান নেই।আমি মনে মনে কেমন একটা প্রশান্তি অনুভব করছি।গভীর সন্তর্পনে,নতুন একটা আশায় নিশ্চুপে বাড়ির ভিতরে পা দিলাম।দরজায় কড়া নাড়তেই আজিজুর রহমান সাহেব দরজা খুলে বেরিয়ে আসলেন।মুখখানা বিমর্ষ,তবু আমাকে দেখে মুচকি হাসার চেষ্টা করলেন।সৌজন্য সূচক ভদ্র হাসি।আমিও মুচকি হাসলাম।এসব হাসির কোন অর্থ নেই।তবু হাসতে হয়,এটাই নিয়ম।

নাকের ডগায় ঝুলে থাকা চশমাটা ঠিক করতে করতে আজিজুর রহমান বললেন, “আরে…ভাইসাব কেমন আছেন? আপনার টাকা পেয়েছেন?”

উনার প্রশ্ন শুনে একটা ধাক্কা খেলাম।সামান্য একদিনের কিছুক্ষণের আলাপচারিতায় এই লোকটা আমাকে মনে রেখেছে!তার স্মরণশক্তি এত তীক্ষ্ণ!এত স্পষ্ট!

আমি আবার মুচকি হেসে ধাক্কাটা সামলে নিলাম।তারপর হাসি মুখে বললাম, “জ্বি পেয়েছি।আজ সকালে টাকা নিতে এখানে এসেছি।ভাবলাম আপনার সাথে একবার দেখা করে যাই।সাথে টাকা পাওয়ার খবরটাও দেয়া হল।“

তিনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন।তার প্রমান মুখের হাসি।মুখে একটু আগের বিমর্ষ ভাবটা আর নেই।প্রাণ চঞ্চল,যেন জেল্লা ফিরে এসেছে।আমাকে নিয়ে তিনি ভিতরে ঢুকলেন।সোফার দিকে ইশারা করে বসতে বললেন।

আমি বসলাম।

আজিজুর রহমান ভিতরে চলে গেলেন।ফিরলেন অনেকক্ষণ পর।হাতে এক গ্লাস বেলের শরবত।তাতে দুই টুকরো বরফ কুচি দেয়া।আমার দিকে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,”আপনি জার্নি করে এসেছেন,নিন ঠান্ডা শরবত খান।ভালো লাগবে।“

আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম।লজ্জিত কণ্ঠে বললাম,”আমার জন্যে এত কষ্ট করছেন কেন?”

তিনি চওড়া একটা হাসি দিয়ে বললেন,”এক গ্লাস শরবত বানাতে হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয় না ভাই।“

“এইটুকুই বা করবেন কেন?অপরিচিত লোক,কোথাকার কে……”

আজিজুর রহমান শান্ত কণ্ঠে বললেন, “মানুষকে ভালোবাসলে অতৃপ্ত প্রাণে তৃপ্তি আসে।“

 

দার্শনিকদের মত একটা বাণী দিয়ে ভদ্রলোক আবার ভিতরে চলে গেলেন।আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম।সুন্দর একটা উক্তি____মানুষকে ভালোবাসলে অতৃপ্ত প্রাণে তৃপ্তি আসে।কথাটা শুনে মুগ্ধ হলাম।তারমানে যে ভালোবাসতে জানে তার মনে কোনদিন অতৃপ্তি,অশান্তি আসবে না।যে ভালোবাসতে জানে তার মন চির প্রশান্ত।

 

ভদ্রলোককে যত কাছ থেকে দেখছি ততই অবাক হচ্ছি।তার অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হচ্ছি বারবার।অথচ এই লোকটাই রাত হলে বউ পিটায়।নিজ চোখে না দেখে কেউ কি একথা বিশ্বাস করবে?করবে না।মানুষের রাগ উঠলে মানুষ হিংস্র হায়না হয়ে যায়।রূপ বদলে যায় মুহূর্তে।এই পৃথিবী কত বিচিত্র……কত ভারসাম্যহীন!

 

ভদ্রলোক দ্বিতীয়বার ফিরে আসলেন দুই কাপ চা হাতে।একটা কাপ আমার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললেন, “নিজে বানাতে হয়েছে তো তাই আসতে একটু দেরি হল।আপনাকে একা বসিয়ে রাখলাম।কিছু মনে করবেন না।“

আমি মুচকি হেসে বললাম,” না না কিছু মনে করব কেন?………আপনি চা বানালেন……আপনার স্ত্রী বাসায় নেই?”

“না নেই”,লোকটা একটা ভারী নিশ্বাস ফেললেন।

আমি মনে মনে দুঃখিত হলাম।এবারও তাহলে আশাকে পাওয়া যাচ্ছে না।শুরুতে মনে একটা ক্ষীণ আশা জন্মেছিল,হয়ত এবার পেয়ে যাব।পেলাম না।

আমি মুখে কৃত্রিম হাসি টেনে বললাম, “বাবার বাড়ি বেড়াতে গেছে না কি?”

লোকটা গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন, “না…”

কিছুক্ষণ দু’জনেই নিরব ছিলাম।চা শেষ করে ভদ্রলোক শান্ত কণ্ঠে বললেন, “আমার বউ বাবার বাড়ি যায় নি।অন্যকোন আত্মীয় স্বজনের বাড়িও যায় নি।এমন পরিস্থিতিতে আপনি হলে কি বলতেন? আমার বউ উদাও হয়ে গেছে____এমন কিছু?”

ভদ্রলোকের প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে গেলাম।কি উত্তর দিব বুঝতে পারছি না।আশা মেয়েটা তাহলে কাউকে কিছু না জানিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছে?ভেবেছিলাম কথার ছলে আজিজুর রহমানের কাছ থেকে শশুর বাড়ির ঠিকানা জেনে নিব।এখন সেই ঠিকানাও বেশি কাজে আসবে না।ভদ্রলোক নিজেই তার বউ কে খুঁজে পাচ্ছেন না।

 

আমাকে চুপ থাকতে দেখে ভদ্রলোক রসিকতা করে বললেন, “কি?এই উত্তর আপনারও জানা নেই?হা হা হা…পৃথিবীতে সব উওর মানুষের জানতে হয় না।সবকিছু জেনে গেলে বাঁচার আগ্রহ হারিয়ে যায়।“

 

ভদ্রলোক অনবরত একটার পর একটা দার্শনিক টাইপ ভাব-গম্ভীর কথা বলে যাচ্ছেন,আর আমি মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে শুনছি।শেষমেশ একটু আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করে বসলাম,”আপনাদের মাঝে কোন ঝগড়া হয়েছে নাকি?……দুঃখিত,ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেললাম।রাগ করেন নি তো আবার!”

“না…রাগ করব কেন?কোন সংসারে ঝগড়া হয় না বলুন তো!কিন্তু ঝগড়া হলেই তো বউ নিরুদ্দেশ হয় না।নিরুদ্দেশ হওয়ার জন্যে বড় ধরনের ঝামেলা হতে হয়।“

 

আমি তাকিয়ে আছি আজিজুর রহমানের দিকে।তাদের মাঝে কি বড় ঝামেলা হয়েছে,সে প্রশ্ন করব কি না ভাবছি।নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপারে প্রশ্ন করা চরম অভদ্রতা।

তিনি শান্ত স্বরে বললেন,”ভাইসাব আমি মানুষ ভালো না।খুবই বদলোক।বউ পিটাই।বউ পেটান মানুষ কোনদিন ভালো হয় না।“

 

ভদ্রলোকের শেষ কথায় আমি পুরো হতভম্ভ হয়ে গেলাম।চুপচাপ বসে আছি।ভদ্রলোককে বুঝতে আমার কষ্ট হচ্ছে।আমি তার নিতান্ত একজন অপরিচিত মানুষ।আর তিনি আমার কাছে হর হর করে নিজের দোষ-ত্রুটি,সংসারের ঝামেলা সবকিছু বলে দিচ্ছেন!লোকটা সামান্য হলেও অগোছালো,নির্বোধ এই কথা ভাবা খুব বেশি ভুল হবে না।

 

আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম,”অনেকক্ষণ সময় কাটান হল।ভাই এবার যেতে হবে।আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগলো।আসি…”

বলতে বলতে আমি বাইরে বেরিয়ে পড়লাম।ভদ্রলোক আমার সাথে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন।আমি যখন বাড়ির গেইট দিয়ে বের হব তখন,তিনি পেছন থেকে ডাক দিলেন,”ভাইসাব…”

আমি ফিরে তাকালাম।ভদ্রলোক করুণ গলায় বললেন,”বউ কে পিটাই বলে যে ভালোবাসি না এমনটা নয়।পাষাণের মনেও ভালোবাসা লুকিয়ে।“

 

কথাটা শুনে এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে গেলাম।ভালোবাসা কি এই পৃথিবীর সব চেয়ে রহস্যময় শব্দ?আবেগ উতলে উঠা উত্তাল ঘূর্ণিঝড়!বাইরে মেঘলা আকাশ,আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি,আজিজুর রহমানের চোখ ছলছল করছে____করুণ রোদনের বৃষ্টির মত।

পুরানো তিমির [৮ম পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [৮ম পর্ব]

ঢাকায় ফিরে, বিশ দিনের মাথায় আমি ভালো মানের একটা বাসা ঠিক করলাম।সময় করে কিছু ভালো মানের আসবাব পত্র কিনে নিলাম।কিছু কেনাকাটা বাকি আছে।সেগুলো শেষ হলেই বাবা মাকে মোটামুটি সামনের মাসে ঢাকায় নিয়ে আসা যাবে।

 

সবকিছু ভালোই এগুচ্ছিল।একদিন বিকেলে শেফা ফোন করে বলল,মা’র অবস্থা ভালো না।তিনি আশার জন্যে খুব চিন্তিত।রাতে ঘুমের ঘোরে প্রলাপ বকেন।আমি বিশেষ চিন্তিত হলাম না।ধীরেধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে মনের ভিতর কেন যেন একটা জোর পাচ্ছি।জানি না ঠিক হবে কি না।তবে মনের ভিতর আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে দোষ কি?

শেফাকে বললাম মাকে যেন ভালো মানের  ডাক্তার দেখায়।পরদিন সকালে শেফাকে ফোন করে জানতে পারলাম মাকে ডাক্তার দেখানো হয়েছে।শরীরের অবস্থা যে খুব বেশি ভালো এমনটা নয়।শেফা বলল,তাকে একপাশে ডেকে নিয়ে ডাক্তার বলেছেন,”উনাকে যে ভাবেই হোক দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখতে হবে।প্রেশার ঠিক রাখা জুরুরী।রাতে যেন ভালো ঘুম হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন।“

 

দিন কয়েক পরে শেফা জানালো মায়ের অবস্থা খুব বেশি খারাপ।ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি।একটা ক্লিনিকে ভর্তি করান হয়েছে।আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মায়ের কাছে গেলাম।আমি যখন পৌঁছাই মা তখন ঘুমাচ্ছিলেন।আমি মায়ের মাথার কাছে গিয়ে বসলাম।কিছুক্ষণ পর মা প্রলাপ বকতে শুরু করলেন……”আহাদ…বাবা আহাদ,আশাকে মেরে ফেলবে,জলদি যা,ওকে বাঁচা…”

আমি চুপচাপ মায়ের কপালে হাত রেখে বসে আছি।

আরও কিছুক্ষণ পর…”আশা…আশা,আমি কাল পায়স রাঁধব,চলে আসিস।“

তারপর আবার নিরবতা।ঘড়ির কাটায় কিছু পার হল।আবার প্রলাপ, “দরজাটা কেউ খুলতো,আশা এসেছে।মেয়েটা কতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে! কেউ গিয়ে দরজাটা খুল…”

 

আমি আর মায়ের কাছে বসে থাকতে পারলাম না।উঠে চলে এলাম বারান্দায়।বারান্দায় এসে দেখি,শেফা এক কোণায় বসে মুখে হাত চাপা দিয়ে কাঁদছে।

“কি হয়েছে শেফা! কাঁদছিস কেন?”

আমি কাছে যেতে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো, “আহাদ রে…মা তো মনে হয়……’

“কি সব যা তা বকছিস! ডাক্তার ঔষধ দিচ্ছেন।সব ঠিক হয়ে যাবে।“

আশার কান্না বন্ধ হচ্ছে না।মুখে হাত চেপে আরও কিছুক্ষণ কাঁদলো সে।তার কান্না দেখে আমারও কেমন চোখ ভার ভার লাগছে।আমার পক্ষে আর এখানে থাকা সম্ভব নয়।।আমি ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে নেমে এলাম পথে।বাইরে ভীষণ কড়া রোদ।গা পুড়ে যাচ্ছে।এমন মধ্য দুপুরে আমি সোজা হাটা দিলাম।আমিও যেন ঘোরে ডুবে যাচ্ছি।এমন কড়া রোদ আমার অনুভূতিতেই লাগছে না।কি করছি বা কি করব কিছুই ভেবে উঠতে পারছি না।

 

বাইরে খনিক ঘুরাঘুরি করে ক্লিনিকে ফিরে এলাম।এসে দেখি মা জেগে উঠেছেন।খাবার খাচ্ছেন।মাকে এখন বেশ সুস্থ লাগছে দেখে আমি একটু স্বস্তি পেলাম।মার পাশে বাবাও বসে আছেন।শেফা এখন আর কান্না করছে না।বেশ চঞ্চল হয়েছে।আমরা সবাই যখন মা সুস্থ হয়ে গেছে ভেবে খুশি,মা আমাকে ডেকে তখন বললেন, “আহাদ তোর অফিস নেই?এখানে কেন এসেছিস?”

“তোমাকে দেখতে এসেছি।“

“আমাকে দেখার কি আছে?সেদিনই না বাসা থেকে গেলি।এত ঘন ঘন দেখতে আসার কি আছে!”

“তুমি অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলে মা।তাই তোমাকে দেখতে এলাম।“

“কে বলল আমি অসুস্থ?এসব এদের বাপ মেয়ের চালাকি সব।আমাকে খামোখা এখানে এনে শুইয়ে রেখেছে! তুই চলে যা।“

আমি একটু ধাক্কা খেলাম।মা আমাকে এভাবে তাড়িয়ে দিচ্ছেন কেন বুঝতে পারছি না।হয়ত আমার উপর খুব রেগে আছেন।আমি মুখে হাসি টেনে বললাম, ‘কেন মা,আমি আসাতে তুমি খুশি হও নি?”

“না হই নি।তুই থাকলে আশা আসতে পারে না।ও লজ্জা পায়।মেয়েটা ভীষণ লাজুক।অনেকদিন তো আমার কাছে ছিলি,এবার কাজে যা,অফিস কর।আমি মেয়েটাকে অনেক দিন দেখি না।“

 

মায়ের কথা শুনে শেফা যেন মূর্ছা খেল।আঁচলে মুখ চেপে পাশের ঘরে চলে গেল সে।বাবাও উঠে চলে গেলেন নিঃশব্দে।আমি নির্বাক মুখে বোকার মত চেয়ে আছি।মা কেমন অদ্ভূত আচরণ করছেন।তবে কি শেফা যা বলেছে তাই ঠিক? মার কি সত্যি সত্যি মাথা খারাপ হচ্ছে!

 

চারদিকে অসহায়ের মত কোন উপায় না পেয়ে,সন্ধ্যা বেলায় বেরিয়ে পড়লাম আশার খোঁজে।মাকে শান্ত করতে হলে মেয়েটাকে খুব দরকার।আশার বাসায় গিয়ে দেখলাম দরজায় তালা দেয়া।আশপাশের মানুষকে জিজ্ঞেস করে জানলাম তারা অনেকদিন বাসায় আসে নি।আমি মনে মনে ধারনা করলাম তারা তাদের গ্রামের বাড়িতে গেছে।গ্রামের বাড়ির ঠিকানা আমার জানা নেই।আশপাশের কেউই তাদের ঠিকানা জানে না।যে ভাবেই হোক ঠিকানাটা যোগার কতে হবে।মেয়েটা কে খুঁজে বের করতেই হবে।

 

অনেক রাত পর্যন্ত আমি বাইরে ছিলাম।ঠিকানাটা যোগার করার অনেক চেষ্টা করেছি।পারি নি।শেষমেশ ব্যর্থ সৈনিকের মত ক্লিনিকে ফিরে এলাম।মা তখনও জেগে ছিলেন।বাবা বারান্দায় বসে আছেন শেফার দুই বছরের বাচ্চা কে কোলে নিয়ে।আমি ঢুকতেই মা বললেন,”তুই এখনো যাস নি!”

“তুমি আমাকে এভাবে তাড়িয়ে দিচ্ছ মা?আমার চেয়েও ঐ মেয়েটা তোমার কাছে বেশি আপন হয়ে গেল?”

“তাড়িয়ে দিচ্ছি কোথায়?অনেক দিন তো আমার কাছে ছিলি।কিছুদিন অফিস করে আবার আসবি।এখন চলে যা।আশা প্রতিদিন দরজায় এসে,তুই আছিস জেনে ফিরে যায়।আসতে পারে না লজ্জায়।“

“মেয়েটা এখানে আবার কখন এলো?আমরা কেউ তো তাকে দেখি নি।“

“তোরা দেখবি কোত্থেকে?ও রোজই আসে।“

 

পরক্ষপণেই আমার মনে পড়লো,আমি  তো মেয়েটাকে চিনি না।কখনো দেখিও নি।সে এখানে আসলেও আমি বুঝতে পারব না।আমি শেফা কে বাবার কাছে পাঠালাম।বাবা মেয়েটা কে চিনে,মেয়েটা এখানে আসলে বাবা নিশ্চয় জানবেন।

শেফা বাবার কাছ থেকে ফিরে এসে জানালো,বাবাও মেয়েটাকে এখানে আসতে দেখেন নি।

ডাক্তার কে বিষয়টা জানালাম।তিনি বললেন মার হেলুসিনেশন হচ্ছে।

শেফা আরও ভয় পেয়ে গেল।আমার হাত চেপে ধরে বলল,”আহাদ…মার মাথা একেবারে খারাপ হয়ে যাবে না তো!”

“আরে দূর…এসব কি বলছিস?চিন্তায় থাকলে সবারই এমন কম বেশি হয়।“

 

শেফাকে সান্ত্বনা দিয়ে আমি ঘুমাতে গেলাম।কিন্তু আমি যেন নিজেই সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছি না।চোখের পাতায় এক ফোঁটা ঘুমও আসছে না।মার কি সত্যিই হেলুসিনেশন হচ্ছে? না কি মেয়েটি মায়ের সাথে গোপনে যোগাযোগ রাখছে! মেয়েটার উদ্দেশ্য কি!