শিশু নির্যাতনের একটি ঘটনা ও কিছু কথা…

Now Reading
শিশু নির্যাতনের একটি ঘটনা ও কিছু কথা…

যান্ত্রিক জীবনের এই যুগে আমরা যারা শহরে থাকি সারাদিনের কর্ম ব্যস্ততা শেষে রাতে ঘুমাই অনেক দেরি করে। জরুরি কোন কাজ না থাকলে আবার সকালে ঘুম থেকে উঠতেও অনেক দেরি হয়। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করতে যখন হোটেলে গেলাম তখন সময় সকাল ১১:০০ টা, সাথে ছিল একজন ছোট ভাই।
হোটেলের ওয়েটারকে ডেকে ডালভাজি আর পরোটার অর্ডার করলাম। নাস্তা করতে করতে হঠাৎ ক্ষীণ স্বরে একটা আর্তনাদের আওয়াজ শুনলাম। কোনদিক থেকে আওয়াজটা আসল তা দেখার জন্য যখন সামনের দিকে তাকালাম দেখলাম একটা ছোট শিশু নিজের পিঠ ঢলতেছিল আর কান্না করতেছিল। কান্নার দৃশ্যটা খুবই করুণ মনে হলো, নাস্তার প্লেট রেখে তাই উঠে দাঁড়ালাম কি হয়েছে তা দেখার জন্য।
শিশুটির কাছে গিয়ে দেখলাম শিশুটির এক হাতে নাস্তার খালি প্লেট, অন্য হাত দিয়ে নিজের পিঠ ঢলতেছে, পিঠের দিকে তাকিয়ে দেখি পিঠটা ভিজে আছে, তার পাশেই দেখলাম- চায়ের খালি কাপ হাতে নিয়ে ক্ষুব্দ দৃষ্টিতে শিশুটির দিকে তাকিয়ে আছে আর একটি যুবক বয়সের ছেলে, পরনে তার স্টাইলিস্ট টি-শার্ট ও দামি প্যান্ট, পায়ে শু পরা। অবস্থা দেখে যেটা বুঝতে পারলাম, যুবক ছেলেটিই সম্ভবত কোন কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে তার হাতে থাকা চায়ের কাপের গরম চা-টুকু শিশুটির গায়ে মেরে দিল, আর সেটির তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে শিশুটি কান্না করতে করতে তার পিঠ ঢলতে লাগলো। তবুও ঘটনাটি আসলে কি ঘটেছিল তা জানার জন্য যখন কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলাম তখন হোটেলেরই অন্য একজন ওয়েটার তাড়াহুড়ো করে এসে বলল, না ভাই কিছু হয়নি, আপনারা জায়গায় গিয়ে বসেন। একজন এই কথা বলেই শিশুটিকে হাত ধরে টেনে ভিতরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর একজনকে দেখলাম টিস্যু নিয়ে এসে যুবক ছেলেটার হাতে দিয়ে বলতে লাগলো- সরি ভাইয়া, কিছু মনে করবেন না, দুপুর বেলা তো, ভীড় একটু বেশি হওয়াতে ধাক্কা লাগল আপনার সাথে, ছোট ছেলে তো সামলাতে পারেনি। আপনি বসেন, বিষয়টা আমরা দেখতেছি। বুঝতে পারলাম তারা তাদের ব্যবসার স্বার্থে শিশুটির প্রতি এই অন্যায় আচরণের কোনরুপ প্রতিবাদ না করে বরং বিষয়টা ধামাচাপা দেওয়ারই চেষ্টা করল। যেখানে হোটেল কর্তৃপক্ষ নিজেরাই ঘটনাটার কোনরুপ প্রতিবাদ না করে ধামাচাপা দিতে চাইছেন সেখানে আমারই বা আর কি বলার থাকতে পারে। নিজের টেবিলে এসে পুনরায় নাস্তা করার দিকেই মনযোগ দিলাম।
নাস্তা শেষ করে নাস্তার টেবিল থেকে উঠতে গিয়ে দেখলাম ছোট ছেলে টা আবার আসছে, কান্না করতেছে আর টেবিল থেকে গ্লাস নিয়ে ধুয়ে পানি দিচ্ছে, কিন্তু কান্না থামছে না। এক পর্যায়ে দেখলাম তার দিকে চাঁ ছুঁড়ে মারা যুবক ছেলেটি শিশুটিকে কাছে ডাকল, ভয়ে শিশুটি কাছে আসতে চাইল না। তারপর অভয় দিয়ে ডাকল, অন্য ওয়েটাররাও তাকে অভয় দিল। শিশুটি কাছে গেলে তাকে বুকে টেনে জড়িয়ে ধরল যুবক ছেলেটি। তার হয়তো আত্ম উপলদ্ধি হলো শিশুটিকে সে এইভাবে গরম চা ছুঁড়ে মারাটা বোধহয় ঠিক হয়নি, শিশুটির হৃদয় নিগড়িত কান্না তার মধ্যে হয়তো একটু হলেও অনুশোচনার জন্ম দিল। সে বুঝতে পারছে যে সে কি ভুল করেছে, কিন্তু কি লাভটাই বা হল? পাশে বসিয়ে কিছু খাওয়াতে চেয়েছিল শিশুটিকে, কিন্তু তার কাজ পড়ে আছে বলে খাবে না বলে ওঠে গেল, হতে পারে হয়তো তার বুকে জমে থাকা ক্ষোভ আর অভিমান থেকেও কিছু খাওয়ার ইচ্ছে জাগলো না। নাস্তার বিল পরিশোধ করে আমরা বেরিয়ে যাচ্ছি, আমাদের সাথে বেরিয়ে যাচ্ছে সেই স্টাইলিস্ট ফ্যাশনের যুবক ছেলেটিও, তবে আমরা যেমন বেরিয়ে যাওয়ার পথেও বারবার তাকাচ্ছিলাম শিশুটির দিকে তেমনি তাকাচ্ছিল সেই ছেলেটিও। যতবারই তাকাচ্ছিলাম দেখতে লাগলাম শিশুটি থেমে থেমে টেবিল মুছতেছে আর তার দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পানি পড়ছে…

হোটেল থেকে বেরিয়ে আসার পরে আমার সাথে থাকা ছোট ভাইটি বলল- ভাইয়া, আমরা অনেক সময় একটু রাগের মাথায় অনেক কিছুই করে বসি, কারো সামান্য একটু দুর্বলতা পেলেই তাকে বড় ধরনের আঘাত করে বসি, কাউকে সুযোগ পেলেই কষ্ট দিয়ে থাকি, অপমান করে থাকি। আবার দেখবেন রাগ কমে গেলে হয়তো ঠিকই নিজেদের ভুলটাও বুঝতে পারি। কিন্তু রাগের মাথায় কাউকে যে কষ্টটা দিয়ে থাকি সেটা চায়ের গরম পানির মতই দাগ থেকে যাবে। হয়তো আপনি পরে ভুল বুঝে তাকে বুকে টেনে নিবেন, কিন্তু আপনার দেওয়া কষ্টটা কভু মন থেকে যাবে না। আর আপনি নিজেও নিজের কাছে অপরাধী হয়েই থাকবেন।

উল্লেখ্য, আমাদের দেশে হোটেল গুলোতে ছোট বাচ্চাদেরকে দিয়ে বিভিন্ন কাজ করানো হয় শিশুদের শ্রম মূল্য কম বলে। যে শিশুরা স্কুলের ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা তারা অভাবের তাড়নায় দুবেলা দু মুঠো খাবার পাওয়ার জন্যই কিন্তু হোটেলে কাজ করে থাকে। দেশের বিদ্যমান আর্থ সামাজি অবস্থা ও দারিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত শিশুদের অসহায়ত্বের সুযোগে তাদের দ্বারা যত্রতত্র যেকোন প্রকার ভারী ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আদায় করিয়ে নেওয়া হয়, বিনিময়ে পারিশ্রমিকও দেওয়া হয় নামমাত্র যৎসামান্য, অনেক জায়গায় তো কোন প্রকার পারিশ্রমিক ছাড়া পেটে-ভাতেই রাখা হয়। যে শিশুরা তাদের বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে অভাব ও দারিদ্রতার সাথে সংগ্রাম করে বড় হতে হচ্ছে তাদের এইসব ভারী ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করা ছাড়া বিকল্প কোন উপায়ও নেই। হয়তো এইভাবে জীবনের সাথে সংগ্রাম করেই তাদেরকে টিকে থাকতে হবে, তা নাহলে জীবন সংগ্রামে পরাজিত হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে, এটাই তাদের নিয়তি। নিয়তির খেলায় জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে এদের মধ্যেই হয়তো কেউ কেউ হয়ে ওঠে পরবর্তীতে নামকরা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, মাস্তান ও বখাটে। সমাজে জন্ম দেয় নতুন একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং কায়েম করে এক ত্রাসের রাজত্ব। আর সমাজের এলিট শ্রেণির ব্যক্তিরা ভোগে দুশ্চিন্তা ও নিরাপত্তাহীনতায়।

একটু ভেবে দেখুন তো, এই শিশুরাও তো কোন মা-বাবার সন্তান। ভালো পরিবেশে জন্ম হলে তো এরা বাবা মায়ের আঁচল তলে থেকে অতি আদর যত্নেই বেড়ে ওঠার কথা। অথচ গরিব বলে আজ আমাদের পূঁজিবাদী সমাজে এদের কোন আদর নেই, যত্ন নেই। অনাদর, অবহেলা আর ক্ষেত্রবিশেষ নানারকম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে জীবনের সাথে সংগ্রাম করতে করতে এরা বড় হয়। বুঝলাম গরীবের ঘরে জন্ম নেওয়াটা না হয় এদের নিয়তি, কিন্তু এই শিশুদেরকে একটু ভালো রাখার জন্য আমাদের কি কিছুই করার নেই? পরিবেশগত কারণে ও জন্মসূত্রেই তারা যেহেতু বঞ্চিত আমরা হয়তো পারব না তাদের অন্ন-বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসার মত মৌলিক সুযোগ সুবিধা সমূহ নিশ্চিত করতে। কিন্তু অন্ততপক্ষে তাদের প্রতি একটু সহানুভূতি আর আদর যত্নও কি দেখাতে পারি না, আমরা কি পারি না তাদের ছোটখাটো ভুল ত্রুটিগুলোকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে তাদের ভুল ত্রুটিগুলো সংশোধনের সুযোগ দিতে? জন্ম তাদের যেই পরিবেশেই হোক অন্ততপক্ষে তার চারপাশের পরিবেশ থেকে যদি বেড়ে ওঠার মতো সহানুভূতিশীল একটি পরিবেশ পেত তাহলে হয়তো সমাজের প্রতি ক্ষোভ নিয়ে তারা বড় হতো না, তাদের মধ্যে থেকে সৃষ্টি হতো না নতুন কোন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ বা লুটতরাজ। সৃষ্টি হতো না সামাজিক অশান্তি, কায়েম হতো না সমাজে ত্রাসের রাজত্ব।