সাইকো গল্প: কথোপকথন

Now Reading
সাইকো গল্প: কথোপকথন

চোখ খুলেই টকটকা লাল ফ্রেমের দেয়াল ঘড়িটায় নজর গেলো আমার।
রাত তিনটে পঁচিশ।।
অবশ্য ঘড়ির দিকে না তাকালেও সময়টা একদম হুবহু বলে দিতে পারতাম।
গত একটা বছর ধরে যে একই ব্যাপারে পূনরাবৃত্তি হয়ে আসছে!
পাশ ফিরে আস্তে করে ওকে ধাক্কা দিলাম।
 -এই শুনছো, এই! একটু উঠোনা, ঘুম ভেঙে গেছে আমার।
জানি, মাঝ রাতে এমন করে ডেকে তুললে রেগে কাঁই হয়ে যায় একদম ও। কিন্তু এত রাতে একা একা জেগে থেকে আমিই বা করবো কি? তারচে বরং ওর ঘুম ঘুম চোখের দিকে তাকিয়ে গল্প করতে যে বড্ড ভালো লাগে আমার!
-হ্যা গো!
তোমার সেই ছোট্টবেলার কথা মনে আছে? আমারতো বেশ মনে আছে। প্রথম যেদিন তুমি স্কুলে এলে লাল টকটকে একটা টি শার্ট আর আটশাট জিন্স পরে, জানো সেদিনই তোমার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম আমি। ছেলে মানুষ এত ফর্সা হয় তোমাকে না দেখলে জানতামই না!
আমরা তো ভেবেছিলাম তুমি বুঝি বিদেশ থেকে এসেছিলে!
উহ, তোমার সেকি দেমাগ ছিলো প্রথম কয়েকটা মাস!  পরে যখন দেখলে স্কুলের কেওই তেমন আগ বাড়িয়ে মিশছে না তোমার সাথে তখন তুমিও নরম হলে একটু একটু।
জানো, প্রথম যখন রিমোর সাথে হেসে হেসে কথা বলতে দেখেছিলাম কি যে রাগ লেগেছিলো আমার! তখনও বুঝিনি ওটাই প্রেম! অবশ্য ক্লাস টেন পড়ুয়া একটা মেয়ের এসব বুঝার বয়সই বা কি করে হবে তখন।”
কথা বলতে বলতে ওর দিকে তাকালাম। চোখ দুটো খুলে রেখেছে কিন্তু কেমন যেনো প্রাণহীন!
বেচারা চোখ খুলেই ঘুমিয়ে পড়েছে আবার! আস্তে করে ওর কপালে হাত রাখলাম,
– “এই ঘুমিয়ে পড়েছো আবার? একটু জেগে থাকোনা প্লিজ! এতটা রাত একলা জেগে জেগে কি করবো আমি!”
মানুষটা হা করে আবার বেঘোরে ঘুমুচ্ছে!
ওর মুখের দিকে তাকিয়ে
মনে পুরনো স্মৃতিগুলো ভেসে ভেসে আসছে আমার।
– “এই শুনো!
কলেজে একদিন প্রচন্ড বৃষ্টিতে কেমন পাগলামো করেছিলে তুমি, মনে আছে তোমার?
  বৃষ্টিতে ভিজে, কোথা থেকে যে সাদা পাঁচটা বেলির মালা নিয়ে এসেছিলে!
ইশ!
কেমন রোমান্টিক ছিলে গো তুমি!
ভাবলে এই এখনো বুড়ো বয়সেও লজ্জা পেয়ে যাই জানো!
সত্যি!
এমন নির্জলা ভালোবাসা সবাই পায়না কিন্তু। কলেজে তো সব মেয়েরা তোমাকে নিয়ে আমায় কত হিংসা করতো তুমি যদি বুঝতে!
আমারতো তখন প্রতিদিনই মনে হতো বুঝি ঈদ!
ও শুনো, সেদিন বাজারে গিয়ে নীলার সাথে দেখা হলো।
ওকে মনে আছে তোমার? ওইযে, ম্যাথ প্রাইভেটে প্রতিদিন খাতার ভেতর একটা করে চিঠি পেতে যে তুমি। এই নীলাই করতো এসব।
ন্যাকা একটা!
এতদিন পরও যেমন তেমনই রয়ে গেছে একদম।
     খুব করে চাইছিলো তোমার সাথে দেখা করতে, আমিই নিষেধ করেছি। বলেছি তুমি বাসায় নেই।
 বলা যায়না বাবা,
 তখন তো শুধু চিঠি লিখতো এখন আসলে হয়তো আর যেতেই চাইবেনা।
     লাস্যময়ী বুড়ি বদমাশ একটা!!
আর ওকেই বা দোষ দিয়ে কি হবে, তুমি নিজেও কি কম যাও? গত বছরের কথা ভুলে গেছি ভেবেছো?
ভার্সিটির স্টুডেন্ট, থিসিস করছে, হেল্প লাগবে, হ্যানো ত্যানো বলে বাসায় নিয়ে আসতে যে মেয়েটাকে ভেবোনা ভুলে গেছি সেসব।
দুতলার স্টাডিরুমে বসে যে কিসব নিয়ে গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর করতে আর হাহাহিহি করতে দেখলাম তো কয়টা মাস।
বজ্জাত মেয়েছেলে!
একেতো টিচার তায় আবার বাপের বয়সী লোক, তার সাথেও মাখামাখি করতে হবে তোদের?
   এই এখন নাক ডেকে ঘুমুনো হচ্ছে না? একদম ঘুমাবেনা বলে দিলাম, শুনতেই হবে এসব।
সারাটা জীবন হাড় কালি করে দিয়েছো আমার, এখন আমার সময়। সব শুনতে হবে মুখ বুজে।”
ঘড়ির দিকে তাকালাম, চারটে দশ। ওর দিকে তাকিয়েও চারটে দশের রেশটা লেগে থাকলো যেনো আমার মনে!
ওর একটা কথা মনে পড়ে গেলো,
    “তোমার সাইকোলজি বুঝা একেবারেই অসম্ভব মুক্তা। তোমার উচিত একবার ডঃ সিফাতের সাথে দেখা করা।”
হতচ্ছাড়া বদমাশ লোকটা।
সময়ে সময়ে সিফাতের কথা তুলে আমাকে খোঁচা না মারলেই নয় যেনো। অথচ এই সিফাতের সাথেই উপরে উপরে নিজের কেমন ভালো সম্পর্ক! পুরুষ মানুষগুলো বুঝি এমনই হয়!
আর ওই বদমাশটা!
জানতো ওর সাথে সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছিলোনা আমার, সেই সুযোগটাই নিলো। দুজন মিলে ঘুরতে যাওয়ার নাম করে পাবনা নিয়ে গেলো,তারপর হেমায়েতপুর! কিছুই ভুলিনি আমি।
তবে হ্যা, প্রাকৃতিক পরিবেশের দিক থেকে হলেও জায়গাটা অসাধারন!
এত সুন্দর জায়গা অথচ আমাকে কিনা আটকে রাখলো ওরা!
মনে পড়তেই আবারো পুরনো রাগটা বুকের ভেতরটায় খাঁমচে ধরলো আমার। জোরে ধাক্কা মারলাম ওকে,
 – “ওঠ্। নিজের কুকাজ গুলোর ফিরিস্তি শুনবিনা? কি কি করেছিস এই জীবনে?
ভালোবাসার মানুষটাকে সিজোফ্রেনিয়ার রোগী বলে আমারই পুরনো প্রেমিকের সাথে হাত মিলিয়ে রেখে এসেছিলি! একটুও লজ্জা করেনি তোর?
ছিহ! ভাবলেই কেমন ঘেন্না ধরে যায় গায়ে।
 এই তোর জন্যই কিনা বাবা-মা, ভাই-বোন সব ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলাম আমি!
 ভেবেছিলি তোদের মতলব বুঝিনি আমি? প্রতিশোধ নিচ্ছিলি আমার উপর? তোর সন্তান না হওয়ার প্রতিশোধ আর সিফাতের সাথে ঘর বাঁধার পরও ছেড়ে আসার প্রতিশোধ!
 আমায় শত্রু বানিয়ে তোরা দুজন হয়ে গেলি গলায় গলায় ভাবের ভাই!
কি আশ্চর্য পুরুষ মানুষ রে তোরা!
ভেবেছিলি কিছুই বুঝিনি?
তোদের এই ধারনাটাই ভুল ছিলো। আমি ঠিক জানতাম আমায় কি করতে হবে। পুরুষকে টেক্কা দেয়ার জন্যই নারীর সৃষ্টি জানিস না?
 ঠিক ঠিক পাঁচ মাসের মাথায় স্বসম্মানে ফিরে এলাম আমি। ওখানে যখন ২২৫ নম্বর রুমটায় অন্ধকার নেমে আসতো বসে বসে ছক কাটতাম আমি। তারা গুনে গুনে অযথাই সময় কাটানোর মতো বোকা মেয়েমানুষ আমি নই। ঠিক জানতাম আমাকে সবার সামনে কেমন ব্যবহার করতে হবে।
ভার্সিটিতে তোর থিয়েটারে আমিও কাজ করেছিলাম ভুলে গিয়েছিলি নাকি?
একটু আধটু অভিনয় করা, ভার্সিটির চব্বিশ ব্যাচের এই সেরা অভিনেত্রীর কাছে তো ডাল-ভাত!
আর হেমায়েতপুরের ওই পাগল ডাক্তারগুলোর তিন বেলার ওসব গরুর টেবলেটের আসল জায়গা যে জানলার পাশের ডোবা টা তা বুঝে নেয়া পাগলের পক্ষেও অসম্ভব নয়!
 আর আমি তো একেবারে সুস্থ্য মানুষ।
 তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোদের দুটোকে দেখে নেবো আমি।
  ফিরে এসে সিফাতকে হাত করা এমন কঠিন কিছুই ছিলোনা। এমনিই তো ফিদা ছিলো আমার প্রতি, হেসে দুটো মিষ্টি বোল ছাড়তেই গলে গেলো! তোদের পুরুষ মানুষের জাতটাই বুঝি এমন!
বয়স দেখিসনা, রঙ্গ দেখলেই মজে যেতে হবে।”
রাগটা কোনোভাবেই কমছেনা আমার। এত কিছু বললাম লোকটার কোনো সাড়া শব্দই নেই! চোখ দুটো খুলে রেখেই সমানে ঘুমিয়ে যাচ্ছে!
– “আজ তোমাকে কথা বলতেই হবে। গত একটা বছর ধরে একই আচরন করে যাচ্ছো আমার সাথে! কি পেয়েছোটা কি তুমি? আজ সব কিছুর জবাব চাই আমার!”
পাশ ফিরে ওর মুখের উপর ঝুকে বসলাম।
 হাত বাড়িয়ে ওর মাথার পাশ থেকে ছুরির বাট টা ধরলাম চোখের সামনে।
লালচে রঙের মরিচা জমাট বেঁধে আছে ওটার সারা গায়ে। উল্টো করে ধরে খোঁচা মারার মতো লাগালাম ছোরা টা ওর বাহুতে, ঠুন ঠুন শব্দ হলো।
হাঁড়ে হাঁড়ে বাড়ি লাগলো যেনো!
মাথাটা একদম ঝুকে ওর মুখের কাছে নিয়ে গেলাম। খুব খুউ–ব কাছে। চোখের কোটর দুটো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি এখন।ফিসফিসিয়ে বললাম,
     – “এত নিশ্চিন্তে কি করে ঘুমাও বলো আমাকে! আসলেই কি আর ভালোবাসোনা আমাকে তুমি?
বলো?”
      তবুও নিশ্চুপ পাষাণ রইলো মানুষটা!
রাগে চিৎকার করলাম আমি-
– “কি হলো! বলো…..?”
অকষ্মাৎ চিৎকারেই কিনা একটু নড়ে উঠলো ওর শরীরটা। জবাবের অপেক্ষায় মুখটা আরোও ঝুকে ওর চোখে চোখ রাখলাম আমি।
 খস খস করে একটা লাল পিঁপড়া বেরিয়ে এলো ওর চোখের কোটর থেকে!
ও আগের মতোই রইলো,
চুপচাপ,
অঘোরে ঘুমিয়ে!!
আমি আবারো অনুভব করলাম,
ভালোবাসা!
তুই বড্ড নিষ্ঠুর!!!

সাইকো গল্প: গুপ্তঘাতক!

Now Reading
সাইকো গল্প: গুপ্তঘাতক!

“এই ছাড়ো এখন, অফিসে যাবেনা নাকি আজ! নাস্তা বানাতে হবে তো।”
    সুহাস কে সরিয়ে দিয়ে বিছানায় উঠে বসলো প্রীতু। চুলগুলো পেছনে টেনে নিয়ে খোঁপা করে শাড়িটা ঠিক করে নিবে তখনই আবার প্রীতুকে নিজের দিকে টানলো সুহাস।
 
“থাকুকনা, আজ নাস্তাটা ক্যান্টিনেই করে নেবো। আর একটু থাক।”
 
“হু, বাইরে থেকে খেয়ে খেয়ে আবার গ্যাষ্ট্রিক বাঁধাতে হবেনা তোমার। যাও গোসলে যাও,আমি এক্ষুনি চট করে নাস্তাটা বানিয়ে নিই।” সুহাসকে গায়ের উপর থেকে সরিয়ে দিলো প্রীতু। জানলা দিয়ে সূর্যালোক ঢুকছে অল্পস্বল্প, তারই ফাঁকে পাশের বাসার ঝুমা আন্টির ফুলের টব টা দেখতে পেলো প্রীতু। তখনই একটা কথা মনে পড়লো ওর, “এই জানো, ঝুমা আন্টির সাথে কথা হচ্ছিলো কাল। আহারে! কি কষ্ট মহিলাটার। লোকটা নাকি প্রতিদিন ড্রিংকস করে আসে!
আমি নিজেও তো দেখলাম সেদিন লোকটার নজরও ভালোনা, কেমন নোংরা চোখে তাকাচ্ছিলো!”
 
প্রীতুর কথা শুনতেই একটু শক্ত হলো সুহাসের চোয়াল।
“ওই হোৎকা টা কিছু বলেছে নাকি তোকে? ওর চামড়া ছিলে নেবো একদম আমি!”
 
“না না আমাকে কি বলবে, আমিই তো ওনাকে বারান্দায় দেখলে ভেতরে চলে আসি। যা দু একবার দেখেছি তাতেই বুঝেছি নোংরা লোক। এমন কুৎসিতভাবে তাকিয়ে ছিলোনা!”
 
“হুম, এরপর থেকে আরো সাবধানে থাকিস।”
 
রেডি হয়ে প্রীতুকে জড়িয়ে ধরে আদর করলো সুহাস।
 
” বারান্দায় কম যাস একটু। আমি অফিসে যাচ্ছি এখন।”
 
 
সন্ধ্যায় ফেরার পথে রিক্সা থেকে নেমে কি ভেবে আবার পিছিয়ে হেটে গেলো আবার সুহাস। পাঁচটা লাল গোলাপ কিনলো। “অনেকদিন ফুল দেয়া হয়না প্রীতুকে।”
 
সুহাস আসার সময় হয়েছে। আসলে তো আর কাজে হাত ই দিতে দেবেনা, তাই রান্না শেষ করে চট করে কফির কাপটা বসিয়ে দিলো প্রীতু।  বেডরুমটা গোছাতে এসে শব্দটা শুনলো।
 
ঠুক ঠুক ঠুক!
জানলায় কেও টোকা দিচ্ছে!
“হেই প্রীতু, জানলাটা খোল।”
 
দৌড়ে গেলো ওদিকে অবাক প্রীতু। “তুমি এদিক দিয়ে কেনো?”
 
“বিয়ের আগে তো অনেকবার উঠেছি পাইপ বেঁয়ে,  আজ আবার ভাবলাম একটু ঝালাই করে নিই। নিত্যনতুন পদ্ধতিতে ভালোবাসা অটুট থাকুক প্রতিদিন। হা হা হা।”
 
মনে মনে খুশি হলেও একটা ধমক দিলো প্রীতু।
“হয়েছে এখন নিচে নেমে সিড়ি বেঁয়ে এসো। এই বয়সে আর সুপারম্যান সেজে কাজ নেই।”
     “ফুলগুলো নে, আমি আসছি।”
 
 
খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লো দুজন। সুহাস শুয়েই ঘুম! বেচারা সারাটাদিন অফিসে কত খাটাখুটি করতে হয়।
    প্রীতু সুহাসকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে। পাশের ফ্ল্যাটের ঝুমা আন্টির মৃদু সুরে কান্না শুনতে পাচ্ছে। “বেচারি! কত কষ্টেই না আছে।”
 
 
 
সকালে নাস্তা রেডি করে বারান্দা থেকে সুহাসের প্যান্ট টা আনতে গিয়ে পাশের বাসার খোলা বারান্দা দিয়ে চোখ গেলো প্রীতুর। ভেতরে মানুষ,পুলিশ সব গিজগিজ করছে!
 
     “ঝুমা আন্টির বর সুইসাইড করেছে! কাল রাতেও ড্রিংক করে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। মাঝ রাতে উঠে ঝুমা আন্টি দেখেন লোকটা রক্ত বমি করছে অনবরত। মেঝেতে বিষের বোতল গড়াচ্ছে!”
 
 
লোকটার মৃত্যুর খবর শুনে আড়মোরা ভেঙে উঠে বসলো সুহাস। “এত হাইপার হচ্ছিস কেনো! দেখ গিয়ে তোর ঝুমা আন্টিই হয়তো আর সহ্য করতে না পেরে বিষ দিয়ে মেরে ফেলেছে!”
 
প্রীতুও ভাবলো, হুম স্বামী এমন হলে জীবনটা আসলেই দূঃসহ হয়ে যায়। কত আর সহ্য করবে মহিলাটা!
 
“যাগ্গে, যেভাবেই মরুক মরতে তো হতোই একদিন। তাইনা?”
 
অফিস যাওয়ার আগে প্রীতুর গালে ঠোট ছোঁয়ালো সুহাস। “পাশাপাশি বারান্দায় একটা বদ লোকের কাছে বউকে রেখে যেতে টেনশান করতে ভালো লাগতো নাকি প্রতিদিন আমার? এরচে মরে গিয়ে নিজে উদ্ধার পেয়েছে, নিজের বউটাকেও শান্তি দিলো, সাথে আমিও।”
  হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলো সুহাস। ওর রসিকতায় প্রীতুরও হাসি পেলো।
 
 
বিকেলে সুহাসকে কল দিয়ে জানিয়ে দিলো অফিস থেকে ফেরার পথে প্রীতুকে যেনো শপিং থেকে নিয়ে যায় ও। এরমাঝে কেনাকাটা সেরে নিলো প্রীতু।
 
বাইকে করে ফিরছে। কলোনীর এই মোড়টায় সবসময় একটু জ্যাম। গাড়ি,রিক্সা এসবের। এরই মাঝে ছোট্ট গোল চত্ত্বরটায় ছেলেগুলো বসে থাকে। এই বাসাটায় আসার পর থেকেই এদের দেখে আসছে প্রীতুরা। বাইকটা ওদের কাছাকাছি আসতেই একজন চিৎকার করে ওঠলো, ভাবীজান, সবসময় জামাইর বাইকে বসলেই হইবো? দেবরদের দিকেও নজর দিয়েন একটু।” সবকটা হো হো করে হেসে ওঠলো!
 
 প্রীতু বাইকের পেছনে আরোও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সুহাসকে, বাইকটা ঘুরিয়ে দিতে গেলো ওদের দিকে ভয়ে ফিসফিস করে প্রীতু বললো, সুহাস প্লিজ! জলদি চলো এখান থেকে!”
 
 
বাসায় ফিরেও অনেক্ষন থম মেরে থাকলো সুহাস। অনেকটা সময় লাগলো প্রীতুর ওকে স্বাভাবিক করতে।
 
 
পরদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরছে সুহাস। মোড়ে এসে রিক্সা থামিয়ে হেটে চললো। আবছা আলোছায়ায় হাটছে।
মোড় পেরুনোর সময় দেখলো একজন পিছু পিছু আসছে ওর।
 
আগের দিনের ওই বখাটেটা, হাতে আধ খালি মদের বোতল টা হাটার তালে তালে আগুপিছু করছে।
 
  মাথাটা হালকা ঝুকে আছে ছেলেটার,
 সামনে ঝাকড়া চুলগুলো চোখ দুটোকে ঢেকে দিচ্ছে বার বার!
 
মাতাল নাকি ছোকরা!
হাটতে হাটতে পেছনে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো সুহাস। আগের রাতে এই ছেলেটাই টিজ করেছিলো প্রীতুকে। মনে হতেই রাগে শক্ত হয়ে গেলো সুহাসের হাতের মুঠো।
হাটতে হাটতেই আবার পেছনে তাকালো ও।
 
 
 
বাসায় ফিরতেই অবশ্য মনটা খুশিতে নেচে ওঠলো সুহাসের। সব ওর পছন্দের খাবার রান্না করেছে প্রীতু! মেয়েটাকে এজন্যই এত ভালোবাসে ও।
 
 
খেয়েদেয়ে শুয়ে আছে দুজন। প্রীতুকে কাছে টানলো সুহাস।
 
– আচ্ছা প্রীতু, মানুষের মৃত্যু সর্বোচ্চ কতটা দ্রুত হতে পারে বলে তোর মনে হয়?
 
– আমি কি করে বলবো! কিভাবে মরছে তার উপর হয়তো নির্ভর করবে।
 
– আচ্ছা, মনে কর একটা মাতাল পানিতে পড়ে গেলো পা পিছলে, বোতলটা আগে পানি দিয়ে ভরবে নাকি মাতালটার পেট?
 
     অনেক আগে আমাদের গ্রামে একবার এমন হয়েছিলো বুঝলি। সকালে সবার এটা নিয়ে সে কি জল্পনা কল্পনা! হাহ হাহ হাহ…
 
– আহ রাত দুপুরে মৃত্যু নিয়ে এমন রসিকতা করোনা তো!
       বিরক্ত হলো প্রীতু। যেনো ভয়েই আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সুহাসকে।
 
 
 
তীব্র কলিংবেলের শব্দে ধড়মড় করে ওঠে বসলো সুহাস। এত সকালে আবার কে এলো!
 
দরজা খুলে দেখে একজন সামনে দাড়িয়ে। গায়ে পুলিশের পোশাক।
 
-কি ব্যাপার?
 
– আপনি সুহাস ভৌমিক?
 
-জ্বি! কেনো?
      একটু অবাক হলো ও। ওর কাছে এদের কি কাজ!
 
– আপনার সাথে কিছু কথা ছিলো। গত সন্ধ্যায় কোথায় ছিলেন আপনি?
 
– ছয়টা নাগাদ অফিস থেকে বাসায় ফিরেছি! কেনো কি ব্যাপার?
 
– কেও পিছু নিয়েছিলো আপনার?
 
– জানিনা! আমার বাসায় ফেরার তাড়া ছিলো।
 
– গতরাতে একজন মারা গেছে।
পুকুরে ডুবিয়ে মারা হয়েছে তাকে। তার সাথের সঙ্গীরা সর্বশেষ আপনার পিছু পিছু যেতে দেখেছিলো ওকে, ওরা সবাই বয়ান দিয়েছে।
 
আপনাকে আমার সাথে একটু থানায় যেতে হবে এখুনি….
 
– “কি হয়েছে! ও কেনো থানায় যাবে?”
            কথাবার্তার শব্দে প্রীতু উঠে এসেছে ততক্ষনে। অফিসারের শেষ কথাগুলো কানে গিয়েছে ওর।
 
– আপনি? মিসেস সুহাস…?
 
-জ্বি, কি করেছে আমার হাসব্যান্ড!
 
– হয়তো তেমন কিছুই না। আপনি কোনো চিন্তা করবেননা, এটা একটা রুটিন ওয়ার্ক ভেবে নিন।
     “আর তাছাড়া…..”
            প্রীতুর মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলালো অফিসার,তেলতেলে হাসি দিলো একটা।
                “আমরা তো আছিই, চিন্তার কিছু নেই,জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আমিই আবার উনাকে পৌছে দেবো।” প্রীতু অজানা একটা ভয়ে থমকে গেলো একদম।
 
 
অফিসার তখন সুহাসের দিকে ফিরেলো,
 
– আমি গাড়িতে বসছি, আপনি একটু জলদি আসুন।
 
অফিসার সরে যেতেই প্রীতু জড়িয়ে ধরলো সুহাসকে। কেঁদে ফেললো ভয়ে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো সুহাস,
 
– লোকটা কেমন বাজে ইঙ্গিত করে গেলো তোকে!
 
তুই একটুও ভাবিসনা আমি যাবো আর আসবো। তোর দিকে যে বাজে নজর দিলো শেষ করে দিয়ে আসবো একদম।
 
– মানে!
       প্রীতুর পানিমাখা চোখে অবিশ্বাস।
 
-হুম, তোকে ভালোবাসি আমি। তুই শুধু আমার। অন্য যেই হোক সে, তোর দিকে খারাপ নজর দিলে মরতেই হবে। তুই কি ভেবেছিস এমনি এমনি পাইপ বেয়ে উঠতাম আমি? প্র্যাক্টিসটা ঝালাই করে নিচ্ছিলাম আসলে, দোতলা বেয়ে ওই হোৎকা টার মদে বিষ মিশিয়ে আসা মোটেও কঠিন ব্যাপার ছিলোনা।
 
 জানিস তো, তোর জন্য সব করতে পারি আমি প্রীতু!
 
   এখন থাক, এই শালাকেও শেষ করে আসি। চিন্তা করিসনা,
  কোনো প্রমাণ থাকবেনা এটায়ও। ফিরে এসে ওই ছোকড়াকে কিভাবে খুন করলাম সেই গল্পটা বলবো…।
 
 
 
 

ম্যানস্ পার্লার!

Now Reading
ম্যানস্ পার্লার!

(শুরুতেই বলে রাখি, এটি নিতান্তই একটি কাল্পনিক গল্প, কোনো বিশেষ ব্যাক্তি বা গোষ্ঠিকে লক্ষ্য করে এ লেখা নয়)
সুমনের তাড়ায় মা কুলসুম বেগম প্রায় দিশেহারা বোধ করছেন। বাবাহারা ছেলে, তার এহেন পরিস্থিতিতে তিনি কি করবেন কার কাছে যাবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেননা!
গেলো দুদিন কোনোরকমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রেখেছেন ছেলেটাও চুপচাপ ছিলো। আজ আবার কি হলো যে দশটার আগেই কোর্টে যেতে হবে বলে বারবার তাগাদা দিচ্ছে তাকে! রুটি সেঁকা শেষে টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে সুৃমনের পাশে বসলেন কুলসুম।
– বাবা, কি হয়েছে বলবি একটু?
-কোর্টে যেতে হবে মা, থানা থেকে কল দিয়ে বললো আজকে শুনানি হবে।
-শুনানি! কিসের?
-তোমাকে তো বলেছিলাম মা, আমি ওদের নামে মামলা করেছি!
 “ম্যানস্ পার্লারের” নামে যা তা করে বেড়াবে আর আমরা এসব সহ্য করে যাবো? নূন্যতম সেল্ফরেসপেক্ট নেই নাকি দেশটায় কারো!
ছেলের কথায় কুলসুম বেগম আৎকে উঠলেন একটু। এতক্ষনে যেনো মাথাটা পরিষ্কার হলো তার!
   “সুখনীড় ম্যানস্ পার্লার”।
নিচে ছোট ছোট করে পার্লারে কি কি সার্ভিস দেয়া হয় তার সারসংক্ষেপ দেয়া।
“চুল ছাঁটাই”
“শেভিং ও ফেসিয়াল”
“বডি ম্যাসেজ ও বডি ওয়াক্সিং”
“ফুল বডি ক্লিনিং”
       এরকম আরো অনেক কিছু।
 টানা এক মাস পরীক্ষা আর চাকুরী করে সুমন চুল ছাঁটার সময়ই পাচ্ছিলো না। শেষে সন্ধ্যারাতে মা কুলসুম বেগম একপ্রকার জোর করেই পাঠালো ওকে চুলগুলো কেটে আসার জন্য। এক ঘন্টাবাদে ফিরে এলো সুমন, চোখমুখ টকটকা লাল হয়ে আছে ছেলেটার! কুলসুম বেগম তো অবাক। এরইমাঝে কি এমন হলো বাইরে!
অনেক জিজ্ঞেস করেও কোনো জবাব নেই ছেলের মুখে। নিরাশ হয়ে নিজের ঘরে ফিরে যাবেন তখনই মাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো সুমন! জন্মাবধি এতটা বিস্মিত আর ভীত হননি কুলসুম বেগম।
সুখনীড় ম্যানস্ পার্লার টা পরিচালনা করে মূলত জনাকয়েক হিজরা। প্রায় দুবছর হলো পার্লারটা শুরু হয়েছে। সেক্টর সমিতির কাছে হিজরাদের একটা দল এসে নিজেরাই প্রস্তাব দেয় যে ওরা কিছু করতে চায়! অনুমতি পেলে সেক্টরের ভেতর একটা সেলুন কাম পার্লার দেবে।
নিজেরাই চালাবে ওটা। সবাই বরং খুশিই হয়েছিলো,ভেবেছিলো
   “যাক এদের সুমতি হয়েছে তবে! অযথা চাঁদা চেয়ে সেক্টরের মানুষদের আর হয়রানি করবেনা।”
কোর্ট প্রাঙ্গনে ঢুকেই তব্দা খেয়ে গেলো কুলসুম বেগম। পুরো মাঠ জুড়ে হিজরার দল গিজগিজ করছে! সুমনও এসব দেখে চুপ মেরে গেছে একেবারে।
মাকে নিয়ে সোজা কোর্টের হলরুমের দিকে হাটছে সুৃমন। চারপাশের সবাই সরে গিয়ে পথ করে দিচ্ছে ওদের। সবার চোখে কৌতুহলী দৃষ্টি। কাছাকাছি কোনো ঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বাজলো।
বড় হলঘরটায় কোর্টের শুনানি শুরু। পুরো হলরুমটায় মানুষ ভর্তি। কিছু টুকটাক কাজের পর মামলার বাদী সুমনের ডাক পড়লো কাঠগড়ায়। উকিল সাহেব জেরা করতে শুরু করলেন,
– আপনিই তো মামলার বাদী..?
-জি আমিই…..
-আচ্ছা, একটু বিস্তারিত বলুন জাজ কে।
সামনের সীটে বসা মার দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করলো সুমন,তারপর বললো,
-ওরা,, আমাকে মেন্টালি এবং ফিজিক্যালি হ্যারেজমেন্ট করার চেষ্টা করছিলো…
– ওখানে কি শুধু আপনিই ছিলেন?
– না আরো দুজন ছিলেন, একজন কে আমি ঢুকতেই ঝগরা করতে করতে বেরিয়ে যেতে দেখেছিলাম…
-আচ্ছা! তো আপনার সাথে ঠিক কি হয়েছিলো বলুন,
ইতস্তত করছে সুমন, লোকটা ঠিক কি জানতে চাইছে বুঝতে পারছেনা ও, মামলার বিবরনিতে তো দিয়েছেই সব!
-বললাম তো হ্যারেজমেন্ট…..
-এভাবে বললে তো হবেনা মি. সুমন! আরো একটু ডিটেইল…… আর একটু বিস্তারিত….একটু খুলে খুলে… বলুন..?
প্রশ্নটা শুনেই হলভর্তি মানুষ সব হো হো করে হেসে উঠলো। বেশ একটা রসিকতা হলো যেনো এইমাত্র!
উকিলের চোখে মিচকে হাসিটা স্পষ্ট দেখতে পেলো সুমন। এবং লোকটার মতলব বুঝতে পেরেই স্তব্ধ হয়ে ভাবলো, “এই অপমানের নরকের ভেতর মাকে এনে ভুল করলাম!”
আরো টুকটাক কথার পর সাতদিনের জন্য মুলতবি হলো শুনানি। মাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো সুমন।
পেছন থেকে হাহা হিহি হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছে ক্রমাগত, সেই সাথে টিটকিরির সুর…
– “কি করেছিলো ওরা…!
– “কি কি হয়েছিলো রে তোর সাথে…..?
– “কি কি করলো একটু খুলে বলনারে জাদু…আমরাও শুনি একটু…..”
লজ্জায় না কার উপর অযথা রাগে টলতে টলতে কোর্টের গেইট দিয়ে প্রায় পালিয়ে এলো মা ছেলে।
বাসার সামনে আসতেই দেখে দরজা জুড়ে পাঁচ ছয় জন হিজরা বসে আছে! এদেরকে চেনে ওরা, এলাকায় চাঁন্দা নেয় নিয়মিত। ওরা এখানে কেনো এখন!
কাজল নামে হিজরাটা এগিয়ে এলো।
– কি রে সুমনদা, একেবারেই কোর্টে গিয়ে উঠতে হলো? আমরা কি ছিলামনা নাকি?
ছেলে কিছু বলার আগেই কুলসিম বেগম এগিয়ে গেলেন।
– কাজল এসোনা ভেতরে এসে বসো। কি হতে কি হয়েছে ছাড়ো ওসব। আমরা মামলা তুলে নেবো কালই…
– মা!
ধমকে উঠলো সুমন। এত কিছুর পর কিসের মামলা তুলে নেবে বলছো তুমি?
বক কাটা চুলের হিজরাটা এগিয়ে এলো। হাতে একটা পাখির পালক, ওটা দিয়ে অনবরত কান খুঁচাচ্ছে!
এগিয়ে এসে সুমনের থুতনিতে হাত বুলিয়ে দিলো বব কাট। আস্তে আস্তে গলার দিকে নামলো হাতটা,
– “শুনো বেবি, অযথা বিপদ বাড়িওনা। নিজেও ভালো থাকো, আমাদেরও আমাদের কাজ করে ভালো থাকতে দাও।”
হাতটা এখনো সুমনের গায়ে হাতিয়ে বেড়াচ্ছে। গা ঘিনঘিন করে উঠলো সুমনের,ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিলো হাতটা।
হেসে উঠলো অন্যরা। বব কাটের অপমানে মজা পেয়েছে ওরা। বব কাট ঝট করে ফিরলো কুলসুম বেগমের দিকে, “দেখো মেয়ে, ছেলেকে সামলে রাখ্, বিপদ বাড়াইসনা।”
কথাটা বলেই গটমট করে চলে গেলো ওরা। কুলসুম বেগম কি করবেন কাকে থামাবেন বুঝে উঠতে পারছেননা যেনো।
সাতদিন পর।
কোর্টের শুনানি আবার আজ।  এর মাঝে যথেষ্ট খেটেছে সুমন। লুকিয়ে পার্লারের কাষ্টোমারদের রেজিষ্ট্রী খাতা জোগার করেছে। ওতে সবার নামধাম আর নম্বর ধরে ধরে কল দিয়েছে, আরো জোরালো প্রমান দরকার, স্বাক্ষীও লাগবে ওর জন্য।
অনেক কষ্টে দুজন লোককে রাজী করিয়েছে কোর্টে স্বাক্ষ্য দেয়ার জন্য। “হিজরাদের বিরূদ্ধে লাগতে যাওয়া ঠিক না” বলে অনেকেই বুঝাতে চেয়েছে সুমনকে। সবাই ভয় পায় ওদের!
মা কে রেডী হতে দেখে নিষেধ করলো সুমন। মাকে ওভাবে অপমানিত হতে দেখতে ভালো লাগবেনা আবারো।
– তুই পারবি একা যেতে?
আমি আসিনা সাথে….. মায়ের উদ্বিগ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো সুমন।
– পারবো মা, টেনশান করোনা। আমি পৌছে কল দেবো।
সুমন বেরিয়ে গেলে দরজাটা লাগিয়ে প্লেইটগুলো গুছিয়ে ফেলবে ভেবে ডাইনিংরুমে পা বাড়াতেই বাইরের রাস্তায় ভীষণ শব্দে চমকে উঠলো কুলসুম বেগম।
দৌড়ে গিয়ে দেখলেন,
      “ট্যাক্সিটাকে একদম পিষে ফেলেছে কার্গো গাড়িটা!!”
ঢং ঢং করে দশটা বাজার বেল পড়লো কোর্টের অফিসে।
আজ শুনানির দ্বিতীয় দিন।
উকিল,জাজ সবাই মামলার বাদীর জন্য অপেক্ষা করছেন।
এক পক্ষের শুনানির পরও যখন বাদী পৌছলোনা, জাজ দ্বিতীয় দিনের মতো মুলতবি ঘোষনা করে উঠে পড়ছেন তখনই রক্তাক্ত শাড়িতে টলতে টলতে এ্যম্বুলেন্স থেকে নেমে এসে ভেতরে ঢুকলেন কুলসুম বেগম।
উকিলের দিকে তাকিয়ে ছলছল চোখে বললেন,
               ” ফিজিক্যালি হ্যারেজমেন্টের প্রমান চাচ্ছিলেন, নিন নিয়ে এসেছি এ্যাম্বুলেন্সে করে, হাঁড়গোর গুড়িয়ে দিয়েছে একেবারে,
নিন আপনাদের জন্য জ্বলজ্যান্ত প্রমান নিয়ে এসেছি এইবার!”

জরিনা বিবির জরির শাড়ি

Now Reading
জরিনা বিবির জরির শাড়ি

“অ বউ! যাওতো অহন তুমি, যাও!
 এদ্দিন পর পোলাডা বাড়ি আইতেয়াছে, তরা কইরা একটা নতুন শাড়ি পইড়া লওগা যাও।” উঠানের একপাশ থেকে শ্বাশুরির কথাগুলো শুনে বিরক্তিতে মুখ বাঁকালো জরিনা।
      “হুও,নতুন শাড়ি পইড়া লও!
 আওনের পর থিক্যা পোয়াইত্তা বেডির মতন কোলের কাছে বওয়াইয়া রাহে আবার কয় বউ নতুন শাড়ি পড়গা! শাড়ি পড়ুম না তর মাথা খামু বুড়ি!”
     আপনমনে বিড়বিড় করলো জরিনা। এসব কথা জোরে বলতে নেই, বিয়ের আগেই শ্বাশুরির তর্জন গর্জনের খবর সব জানা, এসব বললেই এখন কুরুক্ষেত্র লেগে যাবে!
রান্নাবান্না সহ হাতের কাজ সব শেষ করে গোসল শেষে  মোটা পাড়ের নতুন শাড়িটা পড়লো জরিনা। মাথায় তেল দিয়ে পরিপাটি করে আঁচড়ে খোঁপা করলো একটা। তারপর দক্ষিনের ঘরটা ঝারমোছ করলো একটু।
এমনিতে শ্বাশুরির ঘরেই নিচে পাটি পেতে শোয় জরিনা, বুড়ির আবার বোবায় ধরে প্রায় রাতে তাই একলা থাকতে দিতে নিষেধ করে গেছে ছেলে। “মার জন্য দরদ একেবারে অফুরন্ত!
তাই বলে আজও নিশ্চয় জরিনাকে এঘরে শুতে বলবেনা!”
 প্রায় দুমাস পর শহর থেকে আসছে রহমত, নিজের ঘরদোর অগোছালো দেখলে কি মনে করবে মানুষটা!
কাজ শেষ করে বাইরে বের হতেই দূরের মেঠো পথে দেখা গেলো রহমতকে। মা’কে জড়িয়ে ধরে এদিকেই আসছে।
“এ্যহ বুড়ির রং দেখলে বাঁচিনা, পুলা যেন নাই আর কোনো বেটির!” বিড়বিড় করে গাল বকলো একটা জরিনা, তারপর হাসিমুখে মাথায় ঘোমটা টেনে স্বামীকে সালাম করলো এগিয়ে গিয়ে!
পানির ঘটিটা এগিয়ে এনে রাখলো উঠানের কোনের পেয়ারা তলায়। পাক ঘরের দরজায় একটা বিড়াল দেখে তেড়ে গেলো ওদিকে!
শহরে ইট ভাটায় চাকুরি করে রহমত। ছুটিছাটা কম দেয় ওরা। সারা বছরই তো কাজ লেগে থাকে। তারপরও মাস দু মাসে একবার এসে ঘুরে যায় গ্রাম থেকে।
 নতুন বউ, এভাবে কাছ ছাড়া রাখলে নজর অন্যদিকে চলে যাবে জানে রহমত। তাই যখনই সুযোগ হয় একবার দেখে যায়। গ্রামের মেয়েগুলো বড় কোমল হয়, এক রাতেই দুমাসের অভিমান ভুলে যায় ওরা!
খেতে বসে জরিনার শ্বাশুরি মুখ বাঁকালো।
– আল্লাহ! আ লো বউ, তর বাপের কি লবনের আড়ত আছিলোনি? এত কইলাম তবুও যদি একটু কম লবন দিতি। এহনই এমুন, আমি মইরা গেলে পুলাটারে ত আমার লবন খাওয়াইয়াই খুন করবি মুখপুড়ি!!
      বলতে বলতে নিমিষেই চোখ ছলছল করে ওঠলো শ্বাশুরি মোমেনা বিবির। “তুই কি বুঝবি পুলা পালন কত কষ্ট!”
– “মা রাহো না! কই অত তো লবন অয়নাই…
      রহমত আস্তে করে বউয়ের পক্ষ নিতে চাইলো।
– থাউক, তুমি চুপ করো। অত পিরিত দেহাইয়া কাম নাই আর!
      মোমেনা বিবি ছেলেকে ধমকে ওঠলেন।
    “লও বউ, খাইয়া সব গোছাইয়া ওডো, বিছনাডা গুছাইছো নাকি আমারই যাওন লাগবো?”
বাতের ব্যাথায় কাতর পা টা নিয়ে কাঁতরাতে কাঁতরাতে ওঠলো মোমেনা বিবি। ছেলেটা এতদিন বাদে আসছে, মা কে কম ভালোবাসে তা না, তারপরও কিসের টানে মাস না যেতেই ছুটে আসে তা না বুঝবার মতো অত বোকা নয় মোমেনা বিবি!
কুঁলকুচা করতে করতে উঠোনে নেমে গেলো মোমেনা। ওজু করে, দুরাকাত নামাজ পড়ে ঘুমাবে এখন নিজের ঘরে। “আইজ আর বোবায় ধরলে রক্ষা নাই” ভাবতেই কেমন লেগে ওঠলো। বয়সের সাথে সাথে মৃত্যুভয়টা বেশ জাকিয়ে বসছে মনের ভেতর!
মা চলে যেতেই জরিনার দিকে তাকালো রহমত। ঘোমটা টা খসে পড়ে গেছে এখন। মুখটা কালো করে রেখেছে জরিনা। শ্বাশুরির কথাশ রাগ করে বসে আছে বোকা মেয়েটা!
রহমত ওর হাত টা ধরতেই মুখ ঝামটা দিয়ে ছাড়িয়ে দিলো..
– “ছাড়েন, রঙ্গ কইরা কাম নাই। মার লগে তো কইতারলেন না একটা কতাও। কেমুন আমার বাপ-মা তুইল্লা খোঁচা মাইরা গেলোগা!”
– “বউ রাগ কইরোনা। মা কিন্তু তোমারে অনেক ভালোবাসে, এমনে বকাবকি করে আরকি। বুঝোনা ক্যান?”
– অত বুইজা কাম নাই আমার। যান বিছনা করা আছে ঘুমানগা।
– তোমারে ছাড়া ঘুমাইছি আমি কোনোদিন? চলো রাগ পরে কইরো, কি আনছি দেখবা আসো,,,,
      জরিনাকে একপ্রকার জাপটে ধরে ঘরে গিয়ে খিল দিলো রহমত। ব্যাগ খুলে একে একে বের করতে শুরু করলো আলতা, চুলের কাঁটা,পুতির মালা আরো টুকটাক জিনিস। এসব দেখেও জরিনার রাগ কমলোনা!
“কই পাইছেন এইসব, লাগবোনা আমার লইয়া যান, ফিরাইয়া দেনগা।” মুখ বাঁকিয়ে বললো জরিনা।
এত যত্নে আনা জিনিসগুলোর প্রতি অবহেলা দেখে একটু খারাপ লাগলো রহমতের।
“আইচ্ছা কি লাগবো তোমার? কও? পরেরবার ঠিক তাই আনুম!”
-আনবা? সত্যি?
-হু। কি লাগবো?
– “শাড়ি।
   লাল জরির একটা শাড়ি আইনা দেও আমারে। দিবা?”
    জরিনার চোখ দুটো চকচক করে ওঠলো। যেনো চোখের সামনেই শাড়ি দেখতে পাচ্ছে ও! চকচকে লাল পাড়ের জরিওয়ালা শাড়ি একটা!!
– ঠিক আছে দিমু!
দুদিন থেকেই কাজে ফিরে গেলো রহমত। জরিনার শ্বাশুরি ছেলেকে একদম বাসে তুলে দিয়ে এলো গিয়ে! জরিনার খুব শখ একদিন স্বামীকে এগিয়ে দেয়। “হুও বুড়ি না মরলে আর পারুম আগাই দিতে? পুলার লগে লগে তো তার না গেলে পেডের ভাত হজম অয়না!” শ্বাশুরির উপরে বেজায় রাগ জরিনার। মাঝে মাঝে তো স্বামীর উপরও রাগ লাগে। “মার কতার ওপর কোনো কতা নাই এ কেমুন জামাই পাইলাম খোদা!
  এমুন মা ন্যাওটা জামাই দিয়া মাইয়্যা মাইনষের কপাল পোড়াও ক্যান?”
একটা পাটিতে শুয়ে ঘুমের ঘোরে রাগে গজগজ করে জরিনা। কখনো বা আবেগে তেল চিটচিটে বালিশ ভাসায়! ভোরের আলোয় এই শ্বাশুরির সাথেই সব কাজে সমানতালে হাত চলে আবার!
রহমত গেছে আজ  চল্লিশ দিন। পাশের গ্রামের কালা ভাইজান এসে বলে গেছে কাল পরশু নাগান বাড়ি আসবে রহমত। একসাথেই কাজ করে ওরা শহরে। সংসারের টুকটাক কিছু জিনিস পাঠিয়েছে কালা ভাইয়ের হাতে শহর থেকে। যাওয়ার সময় চুপিচুপি জরিনার হাতে একটা পানের ডাবা গুজে দেয় কালা ভাই, ফিসফিস করে বললো, রহমত ভাইজান কইছে আফনের লাইজ্ঞা ছারপ্রেরাইজ আনবো!”
     বলেই মিটিমিটি হাসতে লাগলো কালা মিয়া। লজ্জায় মিইয়ে গেলো একেবারে জরিনা। কোনোমতে বিদায় দিয়েই পালাল লোকটার সামনে থেকে। “মানুষটার একেবারে লজ্জা শরম নাই, এইসব কতা কেও বাইরের লোকরে কয়?” ভাবতেই রাগ ওঠে গেলো ওর। “আসুক এইবার!”
সাত সকালে ওঠে ঘরদোর গুছিয়ে,  উঠান ঝাঁট দিয়ে সব ময়লা পেয়ারা তলায় জমাচ্ছে জরিনা। ওর কাজের গতিতে শ্বাশুরিও অবাক। আপন মনেই গজগজ করছে মোমেনা বিবি, “মাইয়্যা মাইনষের রঙ্গ দেইখ্যা আর বাঁচিনা! এদ্দিন ঘুম ভাঙতেই চায়না,  আর আইজ সোয়ামীর কাছে ভালা সাজনের লাইগ্গা এত কারবার! আমরা যেন বউ আছিলামনা কোনদিন! রঙ্গ লাগছে মনে!”
জরিনা কোনো কথা বলেনা। চুপচাপ কাজ করে আর আড়চোখে দূরের পথে তাকিয়ে দেখে। মানুষটার ছায়াও নেই ওখানে!
দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর সন্ধ্য। রহমত মনে হয় আজ আর আসবেনা। খেয়েদেয়ে পাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়ে জরিনা।
মাঝরাতে পিঠে কারো জোর ধাক্কায় ঘুম ভাঙে জরিনার। মোমেনা বিবি চিৎকার করছে সমানে, “আ লো মুখপুড়ি ওঠ! সব তো শেষ অইয়া গেলোগা!
দৌড়ে ঘরের বাইরে আসে জরিনা।
থমকে দাড়ায় এসে,
দরজার চৌকাঠ ডিঙিয়ে ওপারে শুয়ে আছে রহমত! পুরো শরীর,
 আগাগোড়া ছোঁপ ছোঁপ রক্ত লাগানো লাল কাপড়ে মোড়ানো!
লাল শাড়ি!!
সাথে হলুদ জরির পাড়!!

রহস্য গল্প: কেওক্রাডংয়ের দেশে। ভুতের আবার খুন!

Now Reading
রহস্য গল্প: কেওক্রাডংয়ের দেশে। ভুতের আবার খুন!

ছোটখাটো ছিমছাম হোটেল কাম কুঁড়ে ঘরটায় ঢুকেই অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করলো মনে। এয়ারকুলারের মৃদু শব্দটা ছাড়া চারপাশ চুপচুপে নিরব! ঠিক এমনটাই চেয়েছিলাম আমি।
সকালটা হবে নিরব আলোয় আলোকিত, সন্ধ্যেটা নামবে ঝিঁঝিঁর ডাকের সাথে তাল মিলিয়ে ঝুপ করে,টুপ করে ওঠে পড়বে মস্ত থালার মতো একটা চাঁদ!
একজন লেখকের জীবনে আর কি চাই?
ওহো! একটু ভুল হলো।
 সাগরিকা পাশে থাকলে মন্দ হতোনা অবশ্য। মৃদু বাতাসে ওর আঁচল উড়ে যেতো পতপত করে, আমি সেই শব্দে গল্পের লাইন খুজে বেড়াতাম নিরবে!
অফিসের চাপ সামলাতে সামলাতে মনটা আকুপাকু করছিলো গত কয়টা মাস। তিনদিনের ছুটি পেতেই তাই দৌড়ে পালালাম ঢাকা থেকে। পুরোটা রাত বাসে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে সাত সকালে এসে পৌছুলাম বান্দরবান শহরে।
 তারপর সারাটা দিন চাঁন্দের গাড়ির লক্কর ঢক্কর সেরে বগা লেকের এই কুঁড়েতে এসে ঠাই নিয়ে তবেই শান্তি!
     দুদিন দুরাতের জন্য গুনতে হয়েছে হাজার খানেক টাকা! তাতে কি?
এমন প্রাকৃতিক শান্তির জন্য লাখ খানেক ঢালতেও আমার হাতে আটকাতো না।
ভরপেট খেয়ে অনেক দিন পর এমন নরম ঘুম দিলাম। বয়স কম তারপরও এই বয়সেই গ্যাস্ট্রিক বাঁধিয়ে বসেছি আমি, প্রতি রাতেই ব্যাথা ওঠে।
  তাইতো আমার বালিশের তলায় একপাতা করে সারজেল, রেনিটেড থাকাটা বিচিত্র কিছু নয় আজকাল। অথচ আজ রাতে ঘুমই ভাঙলোনা একবারের জন্যও!
এজন্যই বোধহয় ডাক্তাররা পথ্যের সাথে সাথে মানসিক ব্যাপারটায়ও জোর দেন!
খুব ভোরে গাইড নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বগা লেকের পথে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা সাতটা। আজ একটু লেখালেখি করবো ভেবে জলদি শুয়ে পড়লাম।
মাঝ রাতে ঘুমটা ভেঙে গেলো!
বাইরে ক্রমাগত ঠুন ঠুন করে বিশ্রী একটা শব্দ হচ্ছে! এত রাতে এ কেমন বিরক্ত বাপু!!
ছিটকিনি খুলে বেরিয়ে এসেই থমকে গেলাম আমি।
আকাশে মস্ত একটা রূপালি থালা, চারদিকে যেনো স্বর্গীয় সোনালি আভা ছড়িয়ে আছে!
ঠুন ঠুন ঠুন..!
একটু থেমেছিলো,এখন বিরক্তিকর শব্দটা আবার শুরু হলো।
    “এমন সৌন্দর্য্য ফেলে কোন বেরসিক করছে এই কাজ?” চোখ কুঁচকে সামনে তাকালাম। সবই আলোকিত কিন্তু পরিষ্কার নয়। মোলায়েম চাঁদের আলোয় সবটুকু ঢাকা।
কুঁড়ে থেকে চাদরটা এনে গায়ে জড়িয়ে সামনে এগুলাম। শব্দটার কোন বিরামই নেই। হচ্ছেটা কি এত রাতে!
সামনে এগুলাম। আস্তে আস্তে তীব্রতর হচ্ছে শব্দটা।
   “ওইতো, একটা বড় জারুল গাছ দেখা যাচ্ছে।
ঠুন ঠুন ঠুন…..
শব্দের তালে তালে নড়ছে গাছটাও!”
“এত রাতে গাছ কাটছে! চোরাকারবারি নয়তো?”
      ভাবনাটা মাথায় আসতেই দমে গেলাম একটু। পাহাড়ি এলাকার এসব চোরাকারবারিরা খুব ডেঞ্জারাস হয় শুনেছি!
     “দেখে ফেললে আবার প্রমান লুকোবার জন্য খুনখারাবি করে ফেলবেনা তো!”
সাহস সঞ্চয় করে আর একটু এগুলাম। গাছের গোড়ায় মানুষের অবয়বটা এখন স্পষ্ট প্রায়। চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলাম,
– “এই কে ওখানে অত রাতে? কি হচ্ছেটা কি এখানে!”
শব্দটা থেমে গেলো। ছায়া টা হাতের কুঠার চালানো থামিয়ে আমার দিক পেছন ফিরে এক হাত কোমরে রেখে সোজা হয়ে দাড়িয়েছে!
 আবারো চিৎকার দেবো কিনা ভাবছি, পেছনে পায়ের শব্দ পেয়ে সাই করে ঘুরলাম। আমার কুঁড়ের ম্যানেজার ঘুসং চাকমা হেটে আসছে দ্রুত।
-“ছ্যার! কি করছিন কি আপনি? এত রাতে বাইরি আসিছেন কেনো?”
জবাব দিতে যাবো এমন সময় পেছনে উত্তপ্ত ধমক শুনতে পেলাম! জারুল তলায় এখন দুজনের মানুষের আবছা ছায়া! “পাশের লোকটা কোথা দিয়ে এলো দেখলামনা তো!”
“এ্য গনশা, তুলি লে যা এরে এহানথুন। সূয্যি আওয়ার আগি ফিনিশ করি দে। বড় বেশি বারিছে।”
      আমার পাশ থেকে ঘুসং জোর গলায় বলে ওঠলো ওদের লক্ষ্য করে। বিড়বিড় করে ওদের নিজস্ব ভাষায় কিছু বললো,গালি দিলো সম্ভবত।
আমার দিকে তাকালো ম্যানেজার। দুহাত কঁচলাচ্ছে, মুখে তেলতেলে শীতল হাসি একটা!
– “ছ্যার এই শীতে বেশিক্ষন থাকতি নেইকো, যান ঘুমানগে, আর অন্ধকারে কি দিখতে কি দিখিলেন কারোক বলিয়েননা।”
         লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে কি যেনো ঝিলিক মেরে ওঠতে দেখলাম আমি। অজানা একটা ভয় ঢুকি ঢুকি করছে ভেতরে। লোকটা কি কিছু ইঙ্গিত করতে চাইলো? খারাপ কিছু কি ঘটতে চলেছে…..!
পেছনে চিৎকার শুনতে পেলাম তখনই। একজন অন্যজনকে মাটিতে চেপে ধরে রেখেছে!
      চাঁদের আলোয় স্পষ্ট ঝিলিক মারতে দেখলাম ওপর দিকে তোলা দুহাত লম্বা চাপাতি টা! এক হাতে দুহাত চেপে ধরে রেখে,চাপাতি সহ হাতটা ঝপ করে নিচে নামিয়ে আনলো লোকটা!!
    মুখ ফসকে চিৎকারটা বেরিয়ে এলো আমার। ছুটতে শুরু করলাম…
চিৎকার করতে করতে কোনদিকে যাচ্ছিলাম জানিনা, একটা কুঁড়ের দরজায় সজোরে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়েই কুঁকড়ে গেলাম আমি। তারপর আর কিছুই মনে নেই।
সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি মস্তবড় একটা জাদরেল চেহারা ঝুকে আছে আমার উপর! গায়ে পুলিশের পোশাক!
বুকের একপাশে লিখা, ক্যাপ্টেন ইয়ান চাকমা!
আমাকে চোখ খুলতে দেখেই লোকটা কথা বলে ওঠলো,
– মশায় তো তাজ্জব করে দিলেন! তিন বছর আগের খুনিকে ধরিয়ে দিলেন,তাও সজ্ঞানে না অজ্ঞানে! কি করে করলেন বলুনতো?
সিআইডির কোন ডিপার্টমেন্টে আছেন?”
অবাক আমি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছি। কি বলছে কিছুই বুঝতে পারছিনা!
আশপাশের অনেকজনের কথা থেকে যা বুঝলাম,
   “প্রায় তিন বছর আগে ঘুরতে এসে এক পর্যটক আততায়ীর হাতে খুন হয়। অনেক খুজেও পুলিশ কোনো হদিস করতে পারেনি। গত রাতে চিৎকার করতে করতে আমি পাশের পুলিশ ক্যাম্পে ঢুকে পড়েছিলাম।
বার বার করে খুন, ঘুসং, গনশা আরো কি কি নাকি বলছিলাম!
তা থেকেই ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে নতুন করে পুলিশের সন্দেহ হয়।
খানিক জেরা করতেই ঘুসং হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে! গত তিন বছর ধরে অজানা এক ঠুন ঠুন শব্দে লোকটার নার্ভ নাকি এমনিতেই শেষ! সে এসব থেকে মুক্তি চায়!
কিন্তু রহস্যের ব্যাপার হলো, ওর হাট ভাড়া নেয়া বাদে আমাদের আর কথাই হয়নি,তাছাড়া ঘুসং হলফ করে বলেছে গত রাতে সে বাইরে বের ই নাকি হয়নি! আমি তবে এত কিছু কি করে বললাম?
পরদিনই তল্পতল্পা গুটিয়ে প্রায় ভুতে তাড়া খাওয়া মানুষের মতো ঢাকায় পালিয়ে এলাম।
রহস্যটা রহস্যই রয়ে গেলো আমার কাছে!
থাকুক, ওটা নিয়ে আর ভাবতেও চাইনা আমি।
প্রকৃতি রহস্যময়।
সে তার চারপাশে ঘটনা ঘটায়,
 আবার অদৃশ্য একটা চাদরে তা জড়িয়ে রাখে!
 আমরা তো নগন্য সন্তান তার। প্রকৃতি নিজে না চাইলে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন যে নগন্য মানুষের সাধ্যের বাইরে!

মৃন্ময়ীর ইচ্ছেগুলো মূল্যহীন!

Now Reading
মৃন্ময়ীর ইচ্ছেগুলো মূল্যহীন!

দরজায় তালা লাগিয়ে চটপট সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো মৃন্ময়ী। রাগে চোখমুখ বিশ্রী রকমের কুঁচকে রেখেছে ও। -“শুভ যে কবে একটু কেয়ারফুল হবে! এত করে বললাম সময় মতো গাড়িটা পাঠিয়ে দিও, পারবেনা তা আগে বললেই হতো। তা তো না ই, গাড়ি যে আসবেনা আধ ঘন্টা আগে মৃন্ময়ী কল না দিলে ওটাও হয়তো জানাতো না!”
আজকের রোদটাও কেমন কঠোর! তীব্র তাপ ছড়াচ্ছে মাথার উপর!

দুমিনিট দাড়াতেই ঘ্যাচ করে একটা ট্যাক্সিক্যাব এসে দাড়ালো সামনে। চট করে ওঠে পরলো মৃন্ময়ী।

-কোথায় যাবো ম্যাম?

-দাদা, সাইন্সল্যাব চলুন। আর, একটু জলদি প্লিজ।

মিটার ঠিক করেই ট্যাক্সি স্টার্ট দিলো ড্রাইভার। ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে ইলাকে কল দিলো মৃন্ময়ী, পার্টি শুরু করে দিক ওরা, পৌঁছতে একটু দেড়ি হবে জানিয়ে দেয়া উচিত।
ফোন কানে রেখে সামনের মিররে চোখ পড়তেই থমকে গেলো মৃন্ময়ী। ওখানে ড্রাইভারকে দেখা যাচ্ছে।
দেবাশীষ!
ট্যাক্সি ড্রাইভার! এটাও কি সম্ভব?
ভার্সিটির একসময়কার ড্যাশিং, স্মার্ট, ইন্টিলিজেন্ট আর প্রচন্ড আত্ম গর্বে গর্বিত দেবাশীষ এখন এখানে কেনো!

পলকেই সাত বছর পেছনের ঝলমলে রঙিন সময়গুলোয় চলে গেলো মৃন্ময়ী। সেকেন্ড ইয়ার শেষ করে থার্ড ইয়ারের মাঝামাঝি তখন ও। ক’মাস পরেই থার্ড ইয়ার ফাইনাল অথচ মেজর দুটো কোর্সের লেকচার গুলো করা হয়নি বলে একেবারোই ধারনা নেই মৃন্ময়ীর। এক্সাম দিলেও রিটেক দিতে না হয় আবার,তাই একই ডিপার্টমেন্টের তুখোর ছাত্র দেবাশীষ এর কাছে লেকচারগুলো বুঝিয়ে দেয়ার অনুরোধ করে মৃন্ময়ী। ভালো ছাত্র, ড্যাশিং চেহারা, তেমনই স্মার্ট ছেলে দেবাশীষের প্রেমে পড়ে যাই মৃন্ময়ী। আকারে ইঙ্গিতে অনেকবার বুঝানোর চেষ্টাও করেছে কিন্তু ধনীর দুলালী মৃন্ময়ীর ভালোবাসাকে সাময়িক আবেগ আখ্যা দিয়ে দেবাশীষ পাত্তা দেয়নি। শেষে একদিন এসব নিয়ে ক্যাম্পাসে বিরাট হাঙ্গামা করলো মৃন্ময়ী। দুজনেরই ডাক পড়লো ডিপার্টমেন্ট হেড এর অফিসে। সব কিছুর শেষ ওইদিনই। তারপর যে দু বছর ছিলো মৃন্ময়ী অনেকবার চেষ্টা করলেও দেবাশীষ ওর ছায়াও মাড়ায়নি আর!

সময়ের গতিতে সময় বয়ে গেছে। পাশ করে বের হতে না হতেই শুভর সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেলো মৃন্ময়ীর। সময়ের সাথে মানুষকেও তাল মিলাতে হয়। মৃন্ময়ীও তাই করেছে,দেবাশীষকে ভুলে যেতে বেশিদিন লাগেনি ওর!

আজ এত বছর পর এহেন রূপে দেবাশীষকে দেখে প্রচন্ড অবাক হয়েছে মৃন্ময়ী। ভাবছে, “আমার তো তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি, দেবাশীষ কি আমাকে চিনতে পারেনি! এত জলদিই ভুলে গেছে!”

পুরোটা রাস্তা আপন মনে ড্রাইভ করে গেলো ড্রাইভার। মৃন্ময়ীর আর কল দিয়ে কিছু বলা হলোনা। পুরোটা পথ সামনে তাকিয়ে আর মনে মনে স্মৃতির পাতা ঘেটেই কাটিয়ে দিলো সবটুকু পথ।

পার্টিতেও মন বসেনি মৃন্ময়ীর। চুপচাপ বসে ছিলো এক কোনে। শেষে নীলা এসে জিজ্ঞেস করায় প্রায় ফিসফিস করে যেনো বিরাট পাপ হয়ে গেছে এমনভাবে বললো, “দেবাশীষের সাথে দেখা হলো। ট্যাক্সি তে!”

নীলার মুখে কথা ফুটলোনা, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকলো ওর দিকে।

-“আচ্ছা এখন চলি রে, ভালো থাকিস।” আস্তে আস্তে বেরিয়ে চলে এলো মৃন্ময়ী।

 

খেয়েদেয়ে গুছিয়ে এসে বেড সাইড ল্যাম্পটা নিভিয়ে শুভর ওল্টো পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো মৃন্ময়ী। কিছুতেই ঘুম আসছেনা কেনো যেনো! ফোনটা হাতে নিতে আননোন একটা নম্বর থেকে আসা একটা ম্যাসেজ দেখে ওপেন করলো ও,

“ভেবোনা চিনতে পারিনি। পেরেছি ঠিকই কিন্তু এখন যে সবই মূল্যহীন।
আমার সাজা আমি পেয়েছি, শুধু চাই তুমি ভালো থেকো!”

-দেবাশীষ।

 

একবার শুভর দিকে তাকিয়ে, আরো একবার দেখে ম্যাসেজটা ডিলিট করে দিলো মৃন্ময়ী। “আসলেই তো, তার কোনো কিছুরই মূল্য নেই। এই যেমন এখন খুব চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে ওর, অথচ সম্ভব নয়। মনের গহীন থেকে ওঠে আসা তীব্র ইচ্ছে তারপরও পূরণ করা যাবেনা।
কারন?
এসব যে বড্ড মূল্যহীন!!”

নির্মম সাইকো: ভালোবেসে খুন!

Now Reading
নির্মম সাইকো: ভালোবেসে খুন!

ফোনটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে চিরুনিটা হাতে নিলো আবার রেনু। “যাক এখন একটু শান্তিতে সাজুগুজো করা যাবে!”
অনেক দিন পর নিলয় এর সাথে দেখা করতে যাচ্ছে রেনু। সকাল থেকেই কেমন একটা ফুরফুরে মেজাজে আছে। কখনো খুশি মনে রুম গোছগাছ করছে,কখনো গুনগুন করে গান গাইছে আর মিটিমিটি হাসছে আপন মনেই!
মায়ের পুরনো নীল শাড়িটার ভাজ খুলে ন্যফথালিনের টুকরো দুটো জানলা দিয়ে ছুড়ে ফেলতেই পাশের টিনের চালায় টুংটাং শব্দ তুললো ওগুলো।
 শুনেই ফিক করে দুষ্টুমির হাসি আসলো রেনুর মুখে। ইচ্ছে হলো এক বালতি ন্যাফথালিন এনে ঢেলে দিক, কেমন মধুর শব্দের ঝংকার তুলবে ওগুলো!
চুলগুলো খোঁপা করবে নাকি,ছেড়ে রাখবে বুঝতে পারছেনা। “”নিলয় যেনো কোনটা পছন্দ করে?” চোখ কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করলো রেনু।
একদিন হাটতে হাটতে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিলো, সেই সাথে প্রচন্ড ঝরো বাতাস!
 নিলয় হঠাৎ টান মেরে চুলের কাটা খুলে নিয়েছিলো রেনুর, বলেছিলো, “খোলা চুলেই দারুন লাগে তোমাকে।” ওটা মনে পড়তেই মনে মনে  স্বীদ্ধান্ত নিলো, “আজ চুলটা ছেড়েই যাবো। হালকা ভেজা লম্বা চুল, আঁচল ছেড়ে শাড়ি, ভালোই লাগবে ওর!”
“নীল শাড়ি সাদা পাড়,
সাথে নীল টিপ পড়বো নাকি লাল?” আবারো চিন্তায় পড়ে গেলো রেনু। “আচ্ছা সবই নীল পড়িনা কেনো আজ?
নীল শাড়ি,
নীল টিপ,
নীল চুড়ি,
নীল দুল,
নীল মালা! নিলয় তো চোখই ফেরাতে পারবেনা। ভাবতেই যেনো কেমন লাগছে!”
হঠাৎ দেয়াল ঘড়িটায় নজর গেলো রেনুর। “পাঁচটা পঁচিশ বেজে গেছেে! সাতটার মাঝেই তো নিলয় পৌছে যাবে!”
তাড়াহুরো করে বের হলো রেনু। “ভাগ্যিস কাঁধ ব্যাগটায় আগে থেকেই সব গুছিয়ে রেখেছিলো!  ঢাকা শহরে কোথাও যেতে হলে এক দু ঘন্টা আগে না বেরুলে হয়?”
ধানমন্ডি,ভুতের আড্ডা রেষ্টুরেন্ট।
 আগেও নিলয়ের সাথে অনেকবার এসেছিলো এখানে, ওয়েটার এগিয়ে এসে একটা খালি টেবিলের কাছে পৌছে দিলো রেনুকে
হাতের ব্যাগটা টেবিলের উপর আস্তে করে রেখে চেয়ারে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো ও। চারপাশ থেকে কয়েক জোড়া চোখ অনুসরন করছে বুঝতে পারছে রেনু।”নিলয়টা সব সময়ই লেইট আসবে,ঝর-ঝাপটা যাবে আমার উপর দিয়ে। আর পারিনা উফ!”
প্রায় দুই ঘন্টা পর নিলয় এলো।
-স্যরি, আসতে দেড়ী হয়ে গেলো। কেমন আছো তুমি?
বিরক্তিতে নাক মুখ কালো করে রেখেছে রেনু। নিলয়ের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। ওর কোলের বাচ্চাটা একদম সুমিতার মতো হয়েছে!
 বাচ্চাটার শান্ত ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে সুদূর অতীতে ফিরে গেলো রেনুর মনটা।
“নিলয় আর সুমিতা পাশাপাশি স্টেজে বসে আছে। ফটোসেশন চলছে অনবরত। সুমিতাকে অসম্ভব মিষ্টি লাগছে দেখতে, মুখে সারাক্ষন একটা মিষ্টি হাসি ছড়ানো।
রেনুকে কমিউনিটি সেন্টারের ওদের রুমটায় ঢুকতে দেখেই নিলয় চোখ ফিরিয়ে নিলো। সম্ভবত চারদিন আগের রেনুর সুমিতার প্রতি বিশ্রী ব্যবহারটা মনে পড়ে গিয়েছিলো!
নিলয় ভাবতেই পারেনি এতদিনের টিচার-স্টুডেন্টের সম্পর্কের বাইরেও রেনুর মনে আরো কিছু ছিলো!
তাও নাহয় থাকলো, তাই বলে সুমিতাকে নিলয় ভালোবাসে, বিয়ে করতে যাচ্ছে জানতেই রেনু অমন বিগড়ে  গিয়ে উগ্র মূর্তি ধারন করবে নিলয় ভাবতেই পারেনি।
 ওরই সামনে, দোতলার ঝুল বারান্দা থেকে সুমিতাকে লক্ষ্য করে রেনু যখন ফুলের টবটা ছুড়ে ফেলেছিলো নিলয়ের মুখে কোন কথাই ফুটছিলোনা সেদিন!
সেই ই শেষ। তারপর গত পাঁচ বছর রেনুর আর খোজ রাখেনি নিলয়। শুনেছিলো বার্ডেম হসপিটালে সাইকিয়াট্রিস্ট ডঃ অর্নব এর কাছে চিকিৎসা হচ্ছে রেনুর। নিলয়ের কাছে শেষ খবর এটুকুই।”
 রেনুর চ্যাপ্টারটা সে তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিলো।
 গত পরশু তাই ডঃ অর্নবের ফোন পেয়ে বেশ অবাকই হলো নিলয়।
বললেন, নিলয় সুমিতার সাহায্য দরকার ওনার। নিলয় প্রথমে রাজি হয়নি, পুরনো কাঁসুন্দি ঘেটে আবার কোনো বিপদ আনতে চায়নি নিলয়। কিন্তু সুমিতার চাপাচাপিতেই শেষে দেখা করতে রাজি হলো ও। রেনুকে কল দিয়ে বললো দেখা করতে চায় ওর সাথে।
রেস্টুরেন্টে চুপচাপ বসে এখন দুজনই ভাবছে কিভাবে কথা শুরু করা যায়। রেনুই কথা শুরু করল,
– আপনার পছন্দের নীল শাড়ি পড়েছি আজ। কেমন লাগছে বললেন না?
“নীল তো আমার পছন্দের রং নয় রেনু” বলতে গিয়েও কি ভেবে চুপ করে গেলো নিলয়। এতদিন পর দেখা করেই এত শক্ত কথা বলা ঠিক হবেনা।
– ভালো লাগছে রেনু।
  কিছু খাবে? অর্ডার দেবো?
– “হুম পাস্তা আনতে বলুন। আর আপনার জন্য চিকেন চাপ।” এটাও নিলয়ের সবচেয়ে অপছন্দের খাবার, তবুও নিলয় কিছু বললেনা। ওয়েটারকে ডেকে অর্ডার দিলো।
চুপচাপ খাওয়া শেষ করলো দুজন। নিলয় খেয়াল করেছে, রেনু এক দৃষ্টিতে সেই তখন থেকে তাকিয়ে আছে নিলয়ের  দিকে।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, একদমই ফাকা এখন রেস্টুরেন্টটা। এদিক ওদিক তাকিয়ে দূরের টেবিলে আবছা অন্ধকারে একজনকে দেখতে পেলো নিলয়, কি যেনো খাচ্ছে একমনে!
ওদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রেনুকে দেখলো নিলয়। একটু অপ্রস্তুতের হাসি দিয়ে বললো,
  -রেনু, রিমঝিমকে একটু রাখবে? একটু ওয়াশ রুম থেকে আসছি আমি।
-দিন আমি নিচ্ছি।
হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে কোলে নিলো রেনু। নিলয়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো, চোখ দুটো সুন্দর চকচককে আভায় জ্বলছে রেনুর। আবছা আধারে যেনো রহস্যময়ী লাগছে দেখতে!
 হেটে এসে মোড় ঘুরেই ওয়াশ রুমের দরজাটার পেছনে লুকালো নিলয়। দূর থেকে রেনুর ডান হাতটাকে কয়েক ইঞ্চি বড় লাগছে এখন!!
  আবছা আলোয় কেমন চকমক করে ওঠলো!
ওটা একটা চাকু রেনুর হাতে!!
হঠাৎ বারংবার চাকুটাকে উপর নিচে ঝিলিক মেরে ওঠতে দেখে গাঁ টা কেমন গুলিয়ে ওঠলো নিলয়ের।
       ওখানে, টেবিলে শুয়ে থাকা রিমঝিমের মতোই বানানো বাচ্চা ডামিটার জায়গায় নিজের সন্তানকে কল্পনা করে ভেতরটা কেমন করে ওঠলো ওর।
কি ভয়াবহ আক্রোশ ওই সাইকো টার ভেতর জমাট বেঁধে ছিলো এতদিন!!
দূরে জমাট বাঁধা অন্ধকারে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেললো ডঃ অর্নবও।
  “যাক, আক্রোশ মিটলো রেনুর। দীর্ঘ পাঁচ বছরের সিজোফ্রেনিয়া আর মেন্টালি ডিজঅর্ডার সমস্যায় জর্জরিত ওর এই সুন্দরী রোগীটা  হয়তো একটু একটু করে স্বাভাবিক হওয়া শুরু করবে এইবার!!”

আবেগ বিষাদের কথাকার লেখক কাজুওর নোবেল জয়

Now Reading
আবেগ বিষাদের কথাকার লেখক কাজুওর নোবেল জয়

সাহিত্যে “নোবেল ২০১৭” জিতে নিলেন ব্রিটিশ লেখক কাজুও ইশিগুরো!

সুইডিশ নোবেল কমিটির পক্ষ হতে ব্রিটিশ এই লেখকের ব্যাপক প্রশংসা করা হয়! বলা হয়েছে, “এই লেখক স্ব আদর্শ অটুট রেখে আবেগপ্রবণ শক্তি দিয়ে বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সংযোগ ঘটিয়েছেন!”

 

উল্লেখ্য, ব্রিটিশ লেখক কাজুও ইশিগুরো মোটমাট আটটি বই লিখেছেন যা প্রায় চল্লিশ টি ভিন্ন ভাষায় অনূদিতও হয়েছে!

তার লেখার ধরন, চিন্তাধারা এবং গল্পের বিষয়বস্তু সমসাময়িক লেখকদের তুলনায় একেবারেই ভিন্নধর্মী এবং উচ্চমানের।

 

তার দুটি উপন্যাসকে ছায়া করে চলচ্চিত্রও নির্মান করা হয়েছে এরই মাঝে।

একটি হলো:
“দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে”

অন্যটি:
“নেভার লেট মি গো”

‘নেভার লেট মি গো’তে একটি সমাজের ছবি তুলে ধরেছেন তিনি। বইটিতে আছে একটি স্কুলের বর্ণনা।

স্বাভাবিক ভাবে স্কুলটি আর পাঁচটি স্কুলের মতো। কিন্তু, সেখানে বড় হওয়া ছাত্রছাত্রীরা আসলে ‘ক্লোন’,
যাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হল, তাদের ‘অরিজিনাল’দের জন্য নিজেদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করা!

 

এর আগে, দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে, বইটির জন্য ১৯৮৯ সালে ম্যন বুকার পুরষ্কারে ভূষিত হোন তিনি।

 

মানব জীবনের গহীন স্মৃতি, অতীতের বেদনা-ভালোবাসা কিংবা আবেগঘন অনুভূতিগুলো খুব সহজ-সাবলিল ভাষায় প্রকাশ করার এক অপূর্ব ক্ষমতা রয়েছে তার!

 

টাইম ম্যাগাজিনের একটি জরিপে দেখা যায়, ১৯৪৫ সাল পরবর্তি ব্রিটিশ লেখকদের মাঝে ইশিগামির অবস্থান বত্রিশতম।

তার প্রথম উপন্যাসটির নাম হলো:
“আ পেইল ভিউ অব হিলস।”

 

তার লেখা সবচেয়ে আলোচিত পাঁচটি বই হলো:

১।  আ পেইল ভিউ অব দ্য হিলস
২। এন আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড
৩। দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে
৪। দ্য আনকনসোলড
৫। দ্য বেরিড জায়ান্ট

 

নোবেল জয়ী এই লেখকের জন্ম ১৯৫৪ সালে,জাপানের নাগাসাকি শহরে। পাঁচ বছর বয়সে ইশিগুরো ইংল্যান্ডে চলে আসেন। স্নাতক হন কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তারপর ইস্ট অ্যাংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সৃজনশীল লেখনীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

 

নাগাসাকিতে পরমানু হামলার মাত্র নয় বছর পরই জন্ম হয়েছিলো তার! পুরো নাগাসাকি শহরে বোমা হামলার ভয়াবহতার প্রভাব দেখেছেন জন্ম হওয়ার পর থেকেই।

হয়তো শৈশবের সেই স্মৃতি থেকেই লেখনিতে তুলে আনেন মনের গহীন বেদনার কষ্টদায়ক সব গল্প।

নতুন করে মানুষের জন্য মানুষকে ভাবাতে চান, কাঁদাতে চান অসাধারন এই লেখনীর মাধ্যমেই!!

 

লেখার ভাষায় জেগে থাকুক মানবতা চিরকাল।

অদৃশ্য অভিমান। বাবা আমায় ভালোবাসে না!

Now Reading
অদৃশ্য অভিমান। বাবা আমায় ভালোবাসে না!

সাত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠিয়ে স্কুলের জন্য তৈরি হওয়া খুবই কষ্টকর মনে হয় সুভংকর এর। তার উপর মা কল্পনা দেবীর তাড়াহুড়ো তো আরো বেদনাদায়ক!
– “আমার বাবুসোনা টা লক্ষী না? দেখবে আজকেও ঠিক সবার আগে বাস ধরতে পৌছে গেছি আমরা। একদম সামনের সিটটায় বসবো। কত্ত মজা হবে দেখো।”
-উফ মা! কতবার বলেছি আমাকে বাবুসোনা বলোনা কারো সামনে। ওরা রোজ হাসে যে দেখতে পাওনা!
– আচ্ছা বাবা বলবোনা। এখন ভালো বাবুটার মতো নাস্তাটা খেয়ে নাওতো।
-আবারো!
-ঠিক আছে, আর বলবোনা!
অপর পাশে চেয়ারে বসে চোখ কুঁচকে একবার মা ছেলের ন্যাকামো দেখে শুভদ্বীপ। দিনদিন এসব দেখতে দেখতে ত্যাক্ত হয়ে যাচ্ছে মনটা!
চেয়ার ঠেলে ওঠে পড়লো শুভদ্বীপ। আজ একটু জলদি যেতে হবে অফিসে,বিকেলে আবার লায়ন্স ক্লাবে একটা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হবে। লায়ন্স ক্লাবের কথা ভাবতেই সুদিপ্তার কথা মনে পড়ে গেলো। কি একটা জরুরি খবর আছে ওকে দেয়ার মতো। তবে এমনি এমনি দেবেনা বিনিময়ে একবেলা খেতে হবে ওর সাথে! রহস্যময়ী মেয়ে একটা! ও কি ভেবেছে শুভদ্বীপ কিছুই বুঝেনা!
  ভাবতে ভাবতে এক চিলতে হাসি ফুটলো শুভদ্বীপের মুখে। তখনই কল্পনার কথা শুনে মেজাজটা খিঁচিয়ে ওঠলো,
-তুমি একবার সুভংকরকে ড্রপ করে দেবে? একই দিকে যাচ্ছো যখন…..
-আমার অত সময় নেই। একই দিকে গেলেই হলো?
এই না বলছিলে স্কুলবাস ধরতে হবে? কি করে পারো এসব ন্যাকামো করতে….!
-“শুভ!” কল্পনা গলা নামিয়ে ধমকে ওঠলো।
  “ছেলেটা রোজ বসে থাকে বাবা এসে নিয়ে যাবে স্কুল থেকে, তখন না পারো, সকালে তো দিয়ে আসতে পারো একবার! নিজের কারনেই কিন্তু ছেলের সাথে দূরত্ব বাড়াচ্ছো তুমি।”
– হয়েছে, আবার শুরু করে দাও এখন। এসব ন্যাকামো করে করে তুমিই বরং ছেলেটার মাথা খাচ্ছো…
হঠাৎ ফোনের রিংটা বেজে ওঠতে,কথা শেষ না করেই ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো শুভদ্বীপ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কল্পনাও সুভংকরের স্কুল ব্যাগটা গোছাতে লাগলো।
এসব খটমট ওদের নিত্যদিনের অভ্যেস। সুভংকরও বুঝে বাবা ওকে স্কুলে দিয়ে আসতে বা নিয়ে আসতে চায়না। কিন্তু কেনো জানেনা! জানেনা বলেই কেবলি মনে হয় বাবা ওকে একটুও ভালোবাসেনা। আর এই ভাবনা থেকেই মনটা ছোট হয়ে থাকে সবসময়। বাবার সামনে তাই নিজেকে গুঁটিয়ে রাখে একদম বোবার মতো!
স্কুল বাসে ওঠতেই কল্পনা দেবী আজ একটু অবাক হলো। বাচ্চাগুলো সব সীটে বসে বসে ছবি আঁকছে!
-কি ব্যাপার বাবু, এত কিসের ছবি আঁকা হচ্ছে সবার!
-আন্টি জানেননা, কাল আমাদের স্কুলের আর্ট প্রতিযোগীতা হবে! যা ফার্স্ট হবে তাকে অননেক বড় পুরষ্কার দেয়া হবে!!
ছোট একটা ছেলে জবাব দিলো। কল্পনা অবাক, কই সুভংকর তো ওকে কিছুই বলেনি! তাকিয়ে দেখে ছেলেটা মাথা নিচু করে আছে। চোখে পানি!
-কি হলো বাবাই? আমাকে বলিসনি কেনো?
-বাবা যে এসব পছন্দ করেনা! আবার বকবে তোমাকে!    টলোমলো চোখে জবাব দিলো সুভংকর।
স্তম্ভিত কল্পনা কি বলবে বুঝতে পারছেনা। আস্তে করে বললো,
-বাবা কিন্তু অনেক ভালোবাসে তোমায়। এমনি রাগ দেখায় বলে বুঝোনা!
তুমি ছবি আঁকবে, দেখো বাবা জানতে পারলে খুব খুশি হবে!
রাতে বাড়ি ফিরলোনা শুভদ্বীপ। কল্পনার ফোনটাও রিসিভ করলোনা। সারা রাত জেগে বসে থাকলো কল্পনা, সাথে সুভংকরও ঘুমে ঢুলে ঢুলে পড়ছে। সকাল দশটায় বাসায় ফিরলো ও। এসেই সোজা চলে গেলো গোসলে, কল্পনা বা সুভর দিকে ফিরেও তাকালো না!
নাস্তা করছে ওরা। শুভদ্বীপ পত্রিকা পড়ছে আর চা খাচ্ছে। বাসায় আসা অবধি একটা কথাও বলেনি ও!
   চা শেষ করে ওঠে দাড়াতেই কল্পনা কথা বলে ওঠলো,
 – আজ বিকেলে ফ্রী আছো তুমি?
থমকে দাড়ালো শুভদ্বীপ,
-কেনো!
– লায়ন্স ক্লাবে আমাদের নিয়ে যেয়ো। সুভংকরের আর্ট প্রতিযোগীতা আছে একটা…
-উফ কল্পনা! তোমার ওই পিকাসো কে নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করতে যেয়োনা ওখানে। বাহির থেকে ফরেনাররা আসবে ওই প্রতিযোগীতায়, ওটা তোমার এই পিকাসোর জন্য নয়!
– তুমিও থাকছো ওখানে?
কল্পনা একটু অবাক হলো, তোমার পত্রিকা নিউজেও দেখলাম আজ। বেশ বড় প্রতিযোগীতা হচ্ছে তাহলে!
– তবে আর বলছি কি! আমার মুখ হাসিওনা ওখানে গিয়ে আর, প্লিজ!
কথা ক’টি বলেই বেরিয়ে গেলো শুভদ্বীপ।
অনেক দিন পর আজ লায়ন্স ক্লাবে এলো কল্পনা। সেই যে বিয়ের পর পর শুভদ্বীপের সঙ্গে আসতে মাঝে মাঝে। তারপর তো সুভংকরের জন্ম হলো,সেই ই শেষবার।  কল্পনাকে দেখে সুভংকরের আর্ট টিচাট এগিয়ে এলো,
  – দিদি আপনি এসেছেন ভালো হয়েছে খুব। দেখবেন পুরষ্কারটা আমাদের সুভই জিতবে,ওর মাঝে পিকাসোর ছায়া দেখেছি আমি!
ওইযে দূরে শুভদ্বীপকে দেখা যাচ্ছে। ঘাড় ফিরাতেই হাত নাড়লো কল্পনা, শুভদ্বীপ এক নজর তাকিয়ে নজর ফিরিয়ে নিলো! কি আশ্চর্য!
কল্পনা অবাক হয়ে ভাবলো, একই জায়গা,
একই মানুষ,
তবু সময়ের ব্যাবধানে মানুষ কতটা বদলে যায়!!
চারদিকে দেশী আর ফরেনারে গিজগিজ করছে। নাচ, গানে একটা আস্ত উৎসব যেনো!
তারই এক ফাঁকে চিত্রাংকন চলছে। এক মনে ছবি আঁকছে সুভংকর। কল্পনা শুধু দূরে দাড়িয়ে ছেলের মুখটা দেখেই যাচ্ছে। কি এক অদৃশ্য সংকল্প ওই ছোট্ট মুখে!
প্রতিযোগীতা শেষ। মার্কিং চলছে, কিছুক্ষন বাদেই প্রতিযোগীর নাম ঘোষনা করা হবে। শুভদ্বীপ দূরে দাড়ানো কল্পনাকে একবার দেখলো। পাশে সুভংকর দাড়িয়ে আছে। মুখ ফিরিয়ে নিলো ও।
“অযথাই লোক হাসাতে এসেছে দুজন। ভাগ্যিস কারো সাথে পরিচর করিয়ে দেইনি! কেমন লজ্জাটা পেতাম!”
একে একে মাইকে এনাউন্স হচ্ছে বিজয়ীদের নাম। তৃতীয় বিজয়ী, দ্বিতীয় বিজয়ী পুরষ্কার নিয়ে এলো।
সবশেষে প্রথম বিজয়ীর নাম ঘোষিত হলো, সুভংকর ব্যানার্জি…….!
প্রচন্ড করতালিতে মুখরিত হচ্ছে চারপাশ। আনন্দের আতিশয্যে হাসি থামছেইনা শুভদ্বীপের। “আমার ছেলে! আমার ছেলেটা প্রথম হয়েছে!”
“কালই আমার পত্রিকার প্রথম পাতায় খবরটা ছাপাবো আমি!”
  একেকজন কে পাশ কাটিয়ে এগুচ্ছে আর মনে মনে আকর্ষনীয় ক্যাপশন বাছাই করছে শুভদ্বীপ। সম্পাদকের নিজের ছেলে বলে কথা!
পুরষ্কার হাতে  নিয়ে এদিকেই আসছে সুভংকর। কল্পনাকে এসে জড়িয়ে ধরলো। ওদের ঘিরে ধরলো করতালিরত জনগন। ভীর ঠেলে এগুতে পারছেনা আর শুভদ্বীপ। গলা ছেড়ে ডাকলো ছেলেকে…
-সুভংকর!!
মায়ের কোল থেকে মাথা তুলে একবার তাকালো সুভংকর। চোখে অশ্রুধারা টলমল করছে ওর, এক পলক তাকিয়েই মায়ের কোলে মুখ গুজলো আবার!
থমকে দাড়ালো শুভদ্বীপ।
এই ভীর ঠেলে এগিয়ে কি লাভ হবে আর?
অনেক আগেই তো ছেলের সাথে অদৃশ্য এক দেয়াল তুলে ফেলেছে শুভদ্বীপ নিজেই!!

আমি আর বাবা

Now Reading
আমি আর বাবা

এই গল্পটা একান্তভাবেই আমার নিজের। কারো বিশ্বাস অবিশ্বাসে কিছুই করার নেই। গল্পের পুরোটাই আমার বাবাকে ঘিরে।
আমার বাবা জমাদার খায়রুল হক মুন্সী।
 সেই ৪৭’এর ভাঙনের সময় তার বাবা আহসান হক মুন্সীর হাত ধরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। প্রায় মাস তিনেক এ জেলা ও জেলা ঘুরাঘুরি করে শেষে পুরান ঢাকার লক্ষীবাজারের এই জায়গাটায় এসে তারা স্থির হোন। ভারতে তাদের বিশাল জমিজমা বিক্রি করে অর্থকরি এনে বসত ভিটে গড়ে তুলেন এই এখানেই।
বাবা বড় হলেন, বিয়ে থা করলেন। আমার জন্মের ঠিক তিন মাস আগে দাদা পরলোক গমন করেন।
এদেশে এসেও দাদা বিরাট কারবার পেতে বসেছিলেন। হুট করে সব পড়লো বাবার ঘাড়ে! বাবাও বেশ পাক্কা ব্যাবসায়ীর মতো দাদার কাজ বুঝে নিলেন অল্প দিনেই।
সারাদিন বাবার দেখা পেতামনা। খুব মন খারাপ লাগতো। মেয়েরা এমনিতেও বেশ বাবা ভক্ত হয়। আমিও তেমন। কেও কেও আবার রসিকতা করতো, বলতো,
 “বাব্বাহ!
এমন দহরম মহরম আর দেখিনি! বাবা ভক্ত মেয়ে নাকি মেয়ে ভক্ত বাবা!!”
আস্তে আস্তে বড় হচ্ছি। স্কুল পেরিয়ে কলেজ, কলেজ পেরিয়ে ভার্সিটি। বাবা মেয়ের মধুর সম্পর্ক ঠিক ছোট্ট বেলার মতোই আছে আমাদের।
ভার্সিটির তৃতীয় বছরে নতুন একজন কে জীবনে স্থান দিলাম। ছেলেটির নাম শিহাব! এত সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলে আর এত কেয়ারিং ঠিক যেনো বাবার মতোই!
কথায় বলেনা? মেয়েরা ছেলে পছন্দ পছন্দ করে বাবার সাথে মিল দেখে। আমিও তাই করেছিলাম।
একদিন বাবার সাথে ওকে কথা বলিয়ে দিলাম, মূহুর্ত বাদেই দুজনের বেশ জমে গেলো!
পরের বছরই বাবা আমাকে বিয়ে দিয়ে দিলেন। শিহাবের সাথে। নতুন সংসার, নতুন বাড়ি। তারপরও বাবার সাথে আমার দূরত্ব এতটুকুন কমলো না। পাশাপাশি মহল্লায় থাকি, বাবা রোজ সকাল-বিকাল দুবেলা করে আমার শ্বশুর বাড়ির সামনে দিয়ে হেটে যায়। কখনো ভেতরে আসে কখনো বা হাটতে হাটতে ফোনে কল দেয়!
বছর ঘুরতেই আমাদের একটা ফুটফুটে মেয়ে এলো। বাবা দেখতে এলো ওকে, গুলুমুলো বাবুটার নাম রাখলো বাবা নাফিসা। ডাকনাম দিলাম আমরা সুমো।
দিন যাচ্ছে আমাদের। এক রাতে ঘুম আসছেনা, শুয়ে এপাশ ওপাশ ছটফট করছি কেবল।
হটাৎ মনে হলো বাবা যেনো রাস্তা থেকে ডাক দিলো! রাত তখন দুটো বেজে দশ।
এত রাতে কেও নেই রাস্তায়।
-ঘুম আসছেনা তো, অস্থির মনে এসব হ্যালুসিনেশন হয় ই। ঘুমিয়ে পড়ো।”
     শিহাবের কথা ই মেনে নিলাম। অনেক চেষ্টার পর ঘুমালাম।
সাত সকালে মা’র ফোন এলো। বাবা হার্ট এ্যাটাক করেছেন। পাগলের মতো ছুটে গেলাম হসপিটালে। ততক্ষনে ময়নাতদন্ত শেষ, মেজর হার্ট এ্যাটাক।
মৃত্যুর সময় রাত দুটা থেকে আড়াইটার ভেতর!
বাবার হঠাৎ এমন চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছিলাম না কিছুতেই।
রাতে ঘুম আসেনা সহজে, খাওয়ায় রূচি নেই, এমনকি সুমোর যত্নও করছিলামনা ঠিকভাবে। এর মাঝেই একদিন ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। বিকেলে সিড়ির পাশের ছাদে সুমোকে  মাদুর বিছিয়ে বসে আছি, হঠাৎ দেখি ছাদের কার্নিসটার দিকে তাকিয়ে সুমো খিলখিল করে হাসছো!
অবাক হয়ে গেলাম। ওদিকটাতে কিচ্ছু নেই সুমো তবে হাসছে কেনো!
প্রায়দিনই সুমো এমন করছে। কখনো শুয়ে থেকে জানলার দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে আবার কখনোবা হামাগুড়ি দিয়ে অদৃশ্য কিসের পেছনে যেনো ছুটে বেড়ায় আর হাসে!
আমি কাওকেই দেখতে পাইনা, কিন্তু অনুভব করতে পারি বাবা আমাদের দেখছে! খুব কাছেই যেনো আছে, কানের পাশে গরম নিঃশ্বাস পাই যেনো আমি কখনো কখনো!
শিহাবকে বলবো বলবো ভেবেও বলিনা কিছু। এসব বিশ্বাস করানো কঠিন।
বাবা মারা যাওয়ার পর আস্তে আস্তে আবার সবাই যার যার কাজে মন দিয়েছি। সুমোও বড় হচ্ছে। প্রায় তিন মাসের মাথায় একদিন বাবাকে স্বপ্ন দেখলাম। হাত ইশারা করে দূরে কাকে যেনো দেখাচ্ছে! অস্পষ্ট চেহারা কাছে যেতে স্পষ্ট হলো, শিহাব! হঠাৎ দুম করে ও যেনো পড়ে গেলো নিচে! আমি চিৎকার করে জেগে ওঠলাম।
সে রাতে আর ঘুমোতে পারিনি। সারা রাত শিহাবকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইলাম আমি। কেনো যেনো ওকে নিয়ে ভয় ভয় লাগছিলো!
পরদিন ওঠে নাস্তা রেডী করছি। শিহাব গোসল করে কাপড় নেড়ে দিচ্ছে বারান্দায়।  আমার শ্বশুর বাড়িটা একটু পুরনো ধাঁচের। লম্বা বারান্দা দুপাশে, মাঝখানে থাকার ঘরগুলো সারি করে দেয়া।
আমি যে ঘরে নাস্তা দিচ্ছি তারই ঝুল বারান্দায় কাপড় দিচ্ছে শিহাব। হঠাৎ ওকে টলে ওঠতে দেখে কেমন করে ওঠলো আমার ভেতরটা! পুরনো ঝুল বারান্দার রেলিং শিহাবের ভর রাখতে পারছেনা, ভেঙে পড়ে যাচ্ছে ওটা!
চিৎকার করে দৌড়ে গেলাম আমি, শিহাবও কোনোমতে সামলে নিয়ে পিলার ধরে ওঠে এলো ভেতরে। জড়িয়ে ধরলাম ওকে। স্বপ্নটার কথা তখনি মনে পড়ে গেলো,
    “বাবা কি সাবধান করে দিতে এসেছিলো আমাকে? জানে তো শিহাব,সুমো দুজনের একজনকে ছাড়াও আমি থাকতে পারবোনা!”
রাতে শিহাবকে বলেছিলাম স্বপ্নের কথাটা। বিশ্বাস করেনি, অবশ্য মুখের উপর হাসেওনি, ভদ্র ছেলে তো। আমাকে ইনসাল্ট করতে চায়নি। আমিও আর জোর করে বিশ্বাস করাতে চাইলামনা।
দু মাস ভালোয় ভালোয় গেলো। এক বিকেলে হালকা চোখটা লেগে এসেছে, বাবাকে আবার দেখলাম!
ভয়ানক স্বপ্ন। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে তার মাঝখানে আমাদের ছোট্ট সুমো চিৎকার করছে দু হাত বাড়িয়ে! বাবা দূরে দাড়িয়ে চোখের জল ফেলছেন নিরবে।
ঝট করে ঘুম ভেঙে সটান ওঠে বসলাম। চটপট একটা ব্যাগে আমার আর সুমোর কাপড় গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। সিএনজি নিয়ে রওনা দেয়ার আগে ভাবলাম দোতলায় আমার শ্বাশুরিকে একবার বলে আসি,তারপর ভাবলাম না থাক। এভাবে হুট করে বেরুতে দেবেনা কেও, কিন্তি আমার তো আর এক মিনিটও এবাড়িতে থাকা চলবেনা। আমার মেয়ের যে বড্ড বিপদ! বললেও কেও বিশ্বাস করবেনা আমায়।
সিএনজি নিয়ে মা’র ওখানে যাচ্ছি। পথে শিহাবকে কল দিয়ে বললাম,
“মাকে দেখতে যাচ্ছি। তুমিও অফিস থেকে চলে এসো কিন্তু।”
ও অবাক হলো একটু, কিছু বললো না।
হঠাৎ এমন করে আসতে দেখে মাও অবাক। খুশিও হলো। খুশির চোটে তক্ষুনি বাজারে ছুটলো, নাতনী কে আজ চিংড়ি খাওয়াবে মা!
বাড়িতে আমি আর সুমো। দুতলায় বাবার ঘরটায় এলাম। কিছুই সরানো হয়নি, বাবা থাকতে যেমন ছিলো তেমনি সব সাজানো! মাও কি আমার মতো বাবাকে অনুভব করে?
সুমো বিছানায় বসে খেলছে। নিচের ঘরে এলাম ওর গোছলের জামা আনার জন্য,এমন সময়ই বাড়ি কাঁপিয়ে বিষ্ফোরনের শব্দ হলো! মা বার বার করে বলে গিয়েছিলো “চুলায় দুধ বসিয়ে যাচ্ছি দেখিস।”
 সিলিন্ডারটার জয়েন্টে একটু লিক হয়ে ছিলো দুধের বলক এসে পড়ে গিয়েছে।
ওখান থেকেই গরম বাড়তে বাড়তে বিষ্ফোরন।
সুমো!
আমার ছোট্ট মেয়েটা  দুই তলায় বসে আছে। আগুন কাঠের দরজা পুড়িয়ে সিড়ির দিকে ছুটছে দ্রুত! হাঁচড়ে পাঁচড়ে সিড়ি দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলাম। ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছে, অর্ধেক ওঠতেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেলাম।
মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটায় চোখ খুলে দেখি সামনে অনেক মানুষ!
মা, আমার শ্বাশুরী,শিহাব আর ওর কোলে আমার সুমো!
জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম এখনো হালকা ধোঁয়া ওঠছে। সব পুড়ে ছাঁই।
মা বললেন, কিছুই আর থাকলোনা রে। তোর বাবার ঘরটায় ঢুকেছিলাম একটা কিচ্ছু বাকি নেই সব পুড়া কাঠের গুলো হয়ে গেছে।”
কেনো জানিনা হাউমাউ করে কান্না বেরিয়ে এলো আমার। বাবা মারা যেতেও বোধহয় এত কান্না আসেনি যতটা না বাবার ঘরটা পুড়ে গেছে শুনে কাঁদলাম!
বাবা মারা যাওয়ার আগে ইনসিওরেন্স করিয়ে রেখেছিলেন। বাড়িটার সব ক্ষয়ক্ষতি ওরাই সারিয়ে দেবে।
আমি শ্বশুর বাড়িতে ফিরে এলাম। অদৃশ্য কারো অস্তিত্ব আর অনুভব করছিনা। সেদিনের আগুনে সব কিছুর সাথে বাবার প্রেতাত্মাটাও কি পুড়ে গিয়েছিলো??
জানিনা! শুধু জানি বাবা আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতো, আর আমিও!