আমাদের সিস্টেম-ই যখন সিস্টেমে নেই…..

Now Reading
আমাদের সিস্টেম-ই যখন সিস্টেমে নেই…..

প্রতি বছর আমরা দেখি পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে৷ কেউ সেই চেষ্টায় চলে যায় না ফেরার দেশে আবার কেউ বা সারাজীবনের জন্য ডিপ্রেশন নামক একটি পরম বন্ধুকে নিজের সঙ্গী করে নেয় সারাজীবনের জন্য৷

বইতে পড়েছিলাম- “শিক্ষার কাজ জ্ঞান পরিবেশন নয়, মূল্যবোধ সৃষ্টি করা”

কিন্তু, এই সমস্ত ছেলে-মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে কাগজের তৈরী একটি সনদ না পেয়েই নিজেদের মূল্যবোধকে বিসর্জন দেয় প্রতিবছর৷
জন্মের পর থেকে মা-বাবা কত কষ্ট করেই না এদের লালন পালন করেছে। যখন যা চেয়েছে তা-ই দিয়েছে। যা আর কেউই ওদের কখনোই দিবেনা।

এখন মনে হচ্ছে,
শিক্ষা জীবনে পা রাখার পর ১২ বছর ধরে মা-বাবার কষ্টার্জিত অর্থ, সেবা, মায়া-মমতা, পরিশ্রম সবকিছু এরা একটি মাত্র উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্যই গ্রহণ করেছে।

সেটি হচ্ছে – “ফলাফলকে কেন্দ্র করে বাবা-মায়ের যত্নে গড়ে দেওয়া শরীর/প্রাণটাকে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দেয়া, অথবা বিষের কবলে শেষ করে দেওয়া”

Michael H. Hart তার লেখা ‘The 100: A Ranking of the Most Influential Persons in History’ অর্থাৎ ‘পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ১০০ মনিষীর জীবনী’ বইতে নবী করীম (স.), উইলিয়াম সেক্সপিয়র, আব্রাহাম লিংকন, আলবার্ট আইনস্টাইন, আলেকজেন্ডার সহ ১০০ জন ব্যক্তির জীবনী তুলে ধরেছেন।

সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো – তার বইতে বর্ণিত ১০০ জনের বেশীরভাগ ব্যক্তিই জীবনে SSC/HSC তো দূরের কথা, কোনদিন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে/পেছনেও যায়নি। এদের নেই কোনো রুই-কাতলা টাইপের সার্টিফিকেট/ডিগ্রী!!!

তবুও এরা সর্বকালের সেরা৷ কারণ এরা কোনো কিছু শেখার জন্য শেখার চেষ্টা না করে বরং জীবনের জন্যে শিখেছে। অথছ আমরা শেখার জন্যেই জীবনের সবটুকু ব্যায় করে দেই।

আমরাও আর কি করবো?????

আগে থেকেই যে সিস্টেম কায়েম হয়ে এসেছে সেটিকেই সবাই ফলো করছি৷ ঐযে কথায় আছে- ‘আগের হাল যেই ভাবে যায়, পেছনের হালও ঠিক একই ভাবেই যায়’

আমরা কাগজের তৈরী একটি সনদ না পেয়ে জীবনকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি, পরীক্ষায় কম নাম্বার পেলে হতাশ হই, GPA-5 না পেলে মনেকরি সবই বৃথা৷ ডিপ্রেশনে পড়ে জীবনটাকে ঠেলে দেই বিষন্নতায়৷ আমরা ভুলে যাই, আমাদের এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আসল কাজ শুধুমাত্র একটি সনদ নয়, জ্ঞান-মূল্যবোধ তৈরী করা নিজেদের মাঝে৷ যে মূল্যবোধ নেই বলেই আমাদের সমাজ আজও অনেক পিছিয়ে৷

আমাদের এসব বুঝার সঠিক মানসিকতা থাকতে হবে যা আমাদের মাঝে নেই, মূল্যবোধ তৈরী করতে হবে যার অভাবে আমরা নিজেদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলি৷

যদিও মূল্যবোধ আর মানুষিকতার দোষ দিয়ে কোন লাভ আদৌতে নেই৷
দোষ তো সিস্টেমের…….যা আমাদের মত জাতির পক্ষে পরিবর্তনযোগ্য নহে….

আজব দেশ কা গাজাব ইউটিউবার….

Now Reading
আজব দেশ কা গাজাব ইউটিউবার….

আমার এক প্রিয়ভাজন ইউটিউবারকে দেখলাম তার ভিডিওতে লিজেন্ড মাশরাফি বিন মর্তুজার সাক্ষাৎকার নিলো। ১৮ মিনিটের ওই ভিডিওতে ম্যাশ ছিলো মাত্র ৫ মিনিট, বাকি পুরো সময় জুড়েই ছিলো সে নিজে।

অর্থাৎ, তার নতুন গাড়ি, তার অফিসের চেয়ার কি রং এর, তার সাথে কে ঘুরে, সে কি কি খাবার খায় ইত্যাদি। এক কথায় নিজের শো অফ। যে ৫ মিনিট সে ম্যাশের পাশে বসে ছিলো ওই সময়টাতে তাকে ম্যাশকে কোন মৌলিক প্রশ্ন অথবা কথা বলতেও দেখলাম না। আমি শিউর মাশরাফি ভাবেই নি যে তাকে এতটা হেয় ভাবে একটি ভিডিওতে উপস্থাপন করা হবে।

এই ইউটিউবারকেই আমি কিছুদিন আগে কোন এক প্রথম সারির পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলতে দেখেছি- “দুর্ভাগ্যের বিষয় আমাদের অনেক ইউটিউবারই নিজেদেরকে উপস্থাপন করছেন খুব বাজেভাবে”

তার বক্তব্য যে এভাবে তার নিজের কর্মকাণ্ডের সাথে হুবহু মিলে যাবে তা ভাবিনি। আমাদের ইউটিউবারেরা অন্য দেশের ক্রিকেট/ক্রিকেটার নিয়ে ট্রল ভিডিও বানায়, ডাবিং করে। এতে হয়তো কিছুটা বিনোদন পাওয়া যায়। যদিও এটি উচিত নয়। কিন্তু, নিজের দেশের ক্রিকেট লিজেন্ডদের নিয়ে ভিডিও বানাতে গিয়েও এমন দায়িত্ব জ্ঞানহীন কাজ সত্যিই আমাদের হতাশ করে।

একজন ইউটিউব ভিডিও মেকার চাইলেই ৫-১০ মিনিটের একটি ভিডিও দিয়ে সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরতে পারেন, শিক্ষনীয় মেসেজ দিতে পারেন আমাদের ইয়ুথদের। আবার চাইলেই অশ্লীলতার বীজ বপন করতে পারেন খুব সহজে, সমাজে ছড়িয়ে দিতে পারে নোংরামি।

কিছুদিন আগে এক ভদ্রলোকের রাস্তায় দাঁড়িয়ে গান গাওয়া একটি ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল হয়েছিলো। সেখানে আমাদের কিউট তরুন-তরুনীরা ওই লোকটিকে ‘গাঞ্জাখোর’, ‘পাগল’, ‘তারছেঁড়া’ ইত্যাদি উল্লেখ করে কমেন্ট/শেয়ার করেছিলো।

সেই লোকটিকেই একজন ইউটিউবার তার চ্যানেলে তুলে এনেছিলো, লোকটি তার গানের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলো সমাজের কিছু অসংগতি, বজ্র কন্ঠে গেয়েছিলো নজরুলের ‘বল বীর’। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, তখন আর কেউ লোকটিকে পাগল বললো না! সবাই বাহবা দিলো!

এরাও ইউটিউবার। যারা কর্দমা থেকে তুলে এনে প্রতিভার মূল্যায়ন করে। কিছু কিছু ইউটিউবারের ভিডিও আর হেডলাইনেরই কোন মিল থাকেনা। কেউ কেউ এক ধাপ এগিয়ে ‘১৮+’ লাগিয়ে দেয় হেডলাইনে। আবার কিছু অতি উৎসাহী মেয়ে আছে, এরা জামা-কাপড় খুলে মাঝরাতে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে LIVE-এ আসে। এদেরকেই আমাদের সমাজের এক শ্রেনীর তরুণ-তরুনীরা আইডল মানে, তাদের কাছ থেকে নাকি কিছু শেখা যায়!

সম্প্রতি কোন এক ইউটিউবারকে দেখলাম মেয়েদের ফেসবুক ওয়াল থেকে তাদের বানানো ফানি ভিডিও কপি করে এনে তা দিয়ে ভিডিও বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়ে দিয়েছে। মেয়ে গুলোর অনুমতি তো নেয়-ই নি উল্টো সেই ইউটিউব ভিডিওর কারণে এখন ওই মেয়ে গুলোর লাইফ হুমকির মুখে। কিন্তু কে ভাবে সেসব, আমাদের কিউট ইউটিউবারদের দরকার ভিউ। আর তাই অন্যর ব্যক্তিগত ফেসবুক একাউন্ট থেকে তার অনুমতি ছাড়া ভিডিও কালেক্ট করে সেসব ভিডিও দিয়ে তারা ভিউ আর সাবস্ক্রাইবার উপার্জন করতে মরিয়া।

তারও আগে দেখা গেছে ঢাকার ব্যাস্ততম রাস্তায় জনৈক ইউটিউবার প্লাস্টিকের সাপ দিয়ে মানুষকে ভয় দেখিয়ে সেই মুহুর্তের ভিডিও গোপনে ধারণ করে ইউটিউবে ছেড়ে দিয়েছিলো। এটি নাকি তাদের ভাষায় প্রাংক!

শুধু তা-ই নয়, রাস্তায় প্রকাশ্য মানুষের সামনে হঠাৎ লুঙ্গি খুলে উলঙ্গ হয়ে যাওয়া, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গী করা কিংবা পুলিশ সেজে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সেই মুহুর্তের ভিডিও ধারণ করে ইউটিউবে ছেড়ে দেওয়াকে প্রাংক বলে আমাদের ইউটিউবারেরা।

এদের বেশিরভাগেরই প্রাতিষ্ঠানিক তেমন কোনো শিক্ষা নেই, নেই কোনো ধরনের মিডিয়া রিলেটেড জ্ঞান। দুই একটা ক্যামেরা আছে আর একটি কম্পিউটার আছে, ব্যাস এই নিয়েই হয়ে গেল তাদের ইউটিউব উদ্ধার করার যোগ্যতা। এরাই আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যায় মোটিভেশনাল স্পিচ দিতে।

আমাদের কথিত এই সমস্ত ইউটিউবারদের জ্ঞানের পরিধি আর ব্যক্তিত্ব যে কতটা গভীর তা কিছুদিন আগের একটি ইউটিউব রিলেটেড অনুষ্ঠানে ঘটে যাওয়া কর্মকান্ড দেখলেই সহজে বুঝা যায়।

উন্নত দেশের ইউটিউবারদের স্টাইল নকল করে বেশিরভাগ ভিডিও বানায় আমাদের দেশের ইউটিউবারেরা। সব থেকে মজার ব্যাপার হলো তাদের স্টাইল নকল করলেও তাদের বেশিরভাগেরই আইডিয়া কেন যেন নকল করতে চায় না আমাদের দেশের ইউটিউবারেরা। কারণ তারা মনেকরে আইডিয়া নকল করলে তাদের ভিউ আর সাবস্ক্রাইবার কমে যাবে। তাই মানহীন আর অশ্লীল ভিডিও বানিয়ে মুখরোচক খাবারের মত টাইটেল দিয়ে তা ইউটিউবে ছেড়ে দেয়।

এই হলো আমাদের দেশের ইউটিউবারদের অবস্থা।

লিজেন্ডদের মূল্যায়ন বুঝেনা…..

শিক্ষনীয় কোন মেসেজ থাকেনা…..

বস্তাপঁচা ভিডিও বানিয়ে নিজেদের শো-অপ করায় ব্যাস্ত…….

এমন ইউটিউবার দ্বয়কে লইয়া এই জাতি কি করিবে!?

ডাক্তার? নাকি ডাকাত?

Now Reading
ডাক্তার? নাকি ডাকাত?

কিছুদিন আগে ছোট বোনের পেট ব্যথার কারণে এক ডাক্তারের চেম্বারে গেলাম৷ স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা বোন ব্যথায় চিৎকার করে কুঁকড়াচ্ছে৷ এমন অবস্থায় প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষার পরেও জানলাম ডাক্তার এখনো জরুরী কাজে ব্যস্ত৷ রাগে আমার গা জ্বলে উঠল৷ এরা কি মানুষ? রোগীর চেয়ে বড় ব্যস্ততা ডাক্তারের জীবনে আর কি থাকতে পারে!

এভাবে আরো কিছুক্ষন!
একপর্যায়ে আমরা কয়েকজন ক্ষিপ্ত হয়ে সিকিউরিটি গার্ডের বাঁধা ঠেলে চেম্বারে ঢুকে পড়লাম৷ ভেতরে ঢুকে দেখলাম ডাক্তার আমার বাবার বয়সী এক রোগীকে নিয়ে ব্যস্ত৷ তার হার্ট এটাক হয়েছে৷ ডাক্তার তার বুকে অনবরত CPR দিয়ে যাচ্ছেন৷ সব রাগ নিভে গেল৷ বৃদ্ধের নিথর শরীরের কষ্টের কাছে আমার বোনের পেট ব্যথার কষ্টটা অনেক তুচ্ছ মনে হলো৷

ঘটনাটা এই জন্যই শেয়ার করলাম- সব সময় আমরা খালি চোখে যা দেখি তা সত্যি নয়৷ সত্য জানার জন্য পর্দার আড়ালে ঘটে যাওয়া ঘটনার খোঁজ কেউ রাখি না৷ তাই বলে আমি ডাক্তারদের পক্ষ নিয়ে সাফাই গাইছি না৷ সব পেশার মতো ডাক্তারি পেশাতেও ডাকাতি কম নেই৷ সবচেয়ে আশ্চর্য্যের ব্যাপার হচ্ছে আমাদের মত ম্যাংগো জনতাই কিছু ডাক্তারদের ডাকাত বানাচ্ছি।

সরকারী মেডিকেল থেকে পাশ করে যেসব ডাক্তার নামী প্রফেসর হয়ে চেম্বারে বসেন, তারা কতক্ষন সময় সরকারী মেডিকেলে ব্যয় করেন?

গুটি কয়েক ডাক্তার কয়েক মিনিটের জন্য ফলোআপে আসলেও ম্যাক্সিমাম ডাক্তার মেডিকেলের বারান্দায় পাও রাখেন না। আমি বলব এইসব চেম্বার এক-একটা প্যাকেজ৷ কোন ডাক্তার সে প্যাকেজ বিক্রি করে ৫০০টাকায়, আবার কেউ বা ৭০০-১০০০ টাকায়৷

আপনাকে কেউ সেই চেম্বারে যেতে বাধ্য করছে না৷ তবুও আপনি ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে সেই প্যাকেজ ভোগ করছেন। তবে এখানে কিছু সুবিধাও আছে৷ প্যাকেজে আপনি যে সেবাটা পাবেন তা সরকারী মেডিকেলে পাবেন না৷ চেম্বারে ডাক্তার অনেক সময় নিয়ে আপনার রোগের কথা শুনবেন৷ আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী ইনভেস্টিগেশন করবেন৷ আবার সেখানে প্রতিটা ইন্সট্রুমেন্ট অটোক্লেভ করাও থাকে৷ যার কারণে শরীরে ইনফেকশনের রিস্ক থাকে না৷ যা আপনি সরকারী মেডিকেলে পাবেন না। কারন সরকারী মেডিকেলে একজন ডাক্তারের পেছনে কয়েক’শ রোগী থাকে৷ সবাইকে সেবা দিতে গিয়ে কেউ যদি ভুল ট্রিটমেন্টে মারাও যায় তার দায় সরকার কিংবা সরকারী মেডিকেলের কেউ নিবে না। কিন্তু বেসরকারি মেডিকেলে ভুল ট্রিটমেন্ট প্রমান হবার আগেই আমরা ডাক্তারের কলার টেনে ধরি৷ দুই দিন আগেও রাইফার মৃত্যুতে যা করেছিলাম৷

যদিও উন্নত দেশ গুলোতেও convulsion বা খিচুনির ট্রিটমেন্ট হিসেবে diazepam দেওয়া হয়৷ এতে ৮০% ভালো হয়ে গেলেও ২০% ঝুঁকিতে থাকে৷ রাইফাও সেই ঝুঁকির স্বীকার হয়েছিল৷ রাইফার ট্রিটমেন্ট টা ভুল প্রমান না হলেও অগোচরে ডাক্তারদের হাতে ট্রিটমেন্টের নামে নিরীহ মানুষ খুন হচ্ছে না তার গ্যারেন্টি কেউ দিতে পারবে না। কোন ডাক্তার নিজের ভুলে রোগী মেরে ফেলে যদি তা হার্ট এটাক বলে চালিয়ে দেয় তাহলে আমাদের মত আমজনতা তার হদিস কখনোই পাবে না।

ভুল ট্রিটমেন্টে রোগী মারা গেলে শাস্তি হিসেবে আমাদের দেশে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কোন আইন নেই৷ যে আইনটা আমেরিকায় ১৯৯৫ সালে নিউরোসার্জারিতে ভুল অপারেশনের দরুণ শ্রীদেবীর মায়ের মৃত্যুর কারণে তখনকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন ডাক্তারদের ভুল ট্রিটমেন্ট এবং অপারেশনের বিরুদ্ধে আইন পাশ করিয়েছিলেন।

উন্নত দেশ গুলোতে ট্রিটমেন্টের জন্য সরাসরি কোন বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া যায় না৷ সর্বপ্রথম জেনারেল ফিজিশিয়ানের কাছে যেতে হয়৷ তিনি যদি মনে করেন আপনার এর চেয়েও বেটার ট্রিটমেন্টের প্রয়োজন তবেই তিনি আপনার রোগের ধরন বুঝে বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করবেন।

কিন্তু আমাদের দেশে তার চিত্র পুরোই বিপরীত৷ যার টাকা আছে সে সামান্য জ্বর সর্দিতেও বিশেষজ্ঞের বারান্দায় লাইন লাগিয়ে বসে থাকে৷ আবার যার টাকার সমস্যা সে ক্যান্সারের ট্রিটমেন্টেও বিশেষজ্ঞের সেবা পাচ্ছে না৷ কখনো কখনো টাকার ব্যবস্থা হলেও ডাক্তারের দেখা পাবার জন্য সিরিয়াল আর মিলে না৷ আবার সেই বিশেষজ্ঞ যদি সামান্য জ্বর সর্দিতে একগাদা টেস্ট লিখে দেয় সেখানেও আমাদের আপত্তি৷ আরে ভাই আপনাকে বুঝতে হবে- নামী বিশেষজ্ঞরা আপনার মত সামান্য জ্বর সর্দি নিয়ে বসে থাকা প্রেশেন্টের পেছনে অতো টাইম কেন নষ্ট করবে যেখানে তিনি এরচেয়ে অনেক জটিল রোগ নিরাময়ে ব্যস্ত?

এরপরেও আপনাকে এত টেস্ট দেবার কারণ হচ্ছে সিরিয়াস পেশেন্টদের সিরিয়াল নষ্ট করে আপনাকে যেন বারবার তার চেম্বারে আসতে না হয়৷ তাই প্রতিবার টেস্ট চেইঞ্জ না করে রোগের উপর সম্ভাব্য সকল টেস্ট আপনাকে একবারেই লিখে দিয়েছেন৷ যাতে যে কোন একটা টেস্ট এর মধ্যে আপনার রোগটা ধরা পড়ে যায়। এখানে ভুলটা আপনার ৷ কারণ আপনি সিস্টেম ব্রেক করেছেন।

খুব কমন একটা অভিযোগ অনেকের মুখেই শোনা যায়- “একজন সার্জনের পক্ষে ডেইলি ২০ টা অপারেশন করা কিভাবে সম্ভব?”

ডাক্তারও মানুষ৷ ভুল হওয়া স্বাভাবিক৷ ডেইলি ২০টা অপারেশনের মধ্যে কোন একটা ভুল অপারেশনে রোগী মারা যাওয়াটা অস্বাভাবিক না৷ আমি বলব এই দোষটাও আপনার৷ ডাক্তার কিন্তু অপারেশন করাবে বলে নিজে আপনার কাছে যায় না বরং আপনিই ছুরি-কাঁচির নিচে ব্যবচ্ছেদ হতে লাখ টাকা খরচ করে তার পেছনে ঘুরছেন। আপনি জানেন, এই ডাক্তার ডেইলি ২০টা অপারেশন করায়৷ আপনি এইটাও ভালো ভাবেই জানেন ২০ জনের মধ্যে যে কোন একজন এক্সিডেন্টালি মারাও যেতে পারে৷ তবুও আপনি তার কাছেই গেলেন৷

এইটা আমাদের সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম। একই সরকারি কলেজ, একই ডিগ্রীধারী ডাক্তার, একই ভিজিট, তবুও আপনি ডেইলি ৫টা অপারেশন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে এমন ডাক্তারের কাছে যান না৷ ভীড় জমান ২০টা অপারেশন করা ডাক্তারের চেম্বারে।

খোজ নিয়ে দেখুন, এই পর্যন্ত যাদের বিরুদ্ধে রোগী মেরে ফেলার অভিযোগ উঠেছে তাদের অনেকেই ২০টা অপারেশন করা নামী ডাক্তার৷

ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা….

Now Reading
ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা….

প্রবাদে বলা আছে “কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে”

সময়ের সাথে সাথে এই প্রবাদের গ্রহণযোগ্যতাও কমে এসেছে।

আমাদের বাপ দাদাদের আমলে তারা একনিষ্ঠ পড়াশোনা করলে ভালো রেজাল্ট প্রতিদিনকার দিবা রাত্রির মতোই সত্য এবং পরিষ্কারভাবে নসিবে নাযিল হতো। এখন একজন ছাত্রের ভালো রেজাল্টের উপর কেবল তার পরিশ্রম নয়। আরো অনেক কিছুর প্রভাব থাকে।

বিগত কয়েক বছর ধরে পরীক্ষা পরবর্তী সময়ে বেশকিছু ভিডিও ও স্থিরচিত্র ভাইরাল হয়েছে। কোনোটাতে দেখা যায় চলন্ত লোকাল বাসে বসেই পরীক্ষক পাবলিক বোর্ড পরীক্ষার খাতা কাটছেন। কোনোটাতে দেখা যায় পরীক্ষকের ভূমিকায় অপেক্ষাকৃত ছোটক্লাসের কিশোর কিশোরীরা/ছাত্রেরা। আবার অনেক সময় এমনও দেখা গিয়েছে, পরীক্ষক খাতায় কোনো ধরনের ভুল সনাক্ত না করেই চোখ বন্ধ করে খাতার মান নির্ধারণ করেছেন নিজের ইচ্ছেমত।

পরবর্তী শিক্ষাজীবনের অনেকটাই যে বোর্ড পরীক্ষাগুলোর উপর নির্ভর করে সেই পরীক্ষার খাতাগুলোর সঠিক মূল্যায়ন কি আদৌ হয়?

যে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়া হয় তার উত্তর মূল্যায়ন করার ট্রেনিং/ নিয়ম কি সকল পরীক্ষক-নিরীক্ষকদের প্রদান করা হয়েছে?

উত্তরপত্র মূল্যায়নের আগে প্রশ্নপত্রের কথা বলতে হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস বানিজ্যের ব্যাপারে সকলেই এখন কমবেশি অবগত। গত ৫ বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁস যেন একটি মহা উত্সবে পরিনত হয়েছে। এমন কোনো পাবলিক পরীক্ষা নেই যেখানে অনিয়ম হয়নি কিংবা প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। এই অনৈতিক কাজ গুলো আমাদের শিক্ষার্থীদের কতটা ভাবায় তার জ্বলন্ত উদাহরণ ২০১৫ সালের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস পরিবর্তী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। শিক্ষাব্যবস্থা কতটা নড়বড়ে না হলে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামতে পারে তার বিচারের দায়িত্ব পাঠকের উপরেই ন্যস্ত করলাম। আমার তো মনেহয় পৃথিবীতে এমন দ্বিতীয় একটি দেশ কেউ দেখাতে পারবেন না যে দেশের শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামতে হয় নিজেদের পরীক্ষার প্রশ্ন জালিয়াতি রোধ করার দাবি নিয়ে। এটি আমাদের মত জাতির জন্য লজ্জা বৈ কি?

শুধু তা-ই নয়, যে প্রশ্ন বৈধ-অবৈধ উভয়ভাবেই পরীক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায় তার কোয়ালিটি/মান নিয়ে প্রতিবছরই পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ শোনা যায়। পরীক্ষার্থীদের বেকায়দায় ফেলতে আনকমন নয়, বরং কোয়ালিটিহীন প্রশ্নপত্রই যথেষ্ট, যে প্রশ্নের আগামাথা বুঝে উঠার আগেই সময় পক্ষী যেনো ফুরুৎ করে বেরিয়ে যায়।

সর্বশেষ অনুষ্ঠিত হওয়া উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সারাদেশে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হবার কথা থাকলেও তা না করে অনেক বোর্ডে ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিলো। আবার এমনও হয়েছে যে, বাংলা ১ম পত্র পরীক্ষার দিন শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়েছে বাংলা ২য় পত্রের প্রশ্ন। অনেক পরীক্ষায় নতুন প্রশ্নপত্র না দিয়ে দেওয়া হয়েছে ২-৩ বছর আগের পরীক্ষার প্রশ্ন। এমন অবস্থায় একজন শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা কোন পর্যায়ে যেতে পারে তা সহজে অনুমেয়।

যে প্রশ্ন এবং উত্তরপত্রের সাথেই এত এত প্রশ্ন জুড়ে আছে তার ফলাফল প্রশ্নাতীত থাকার কথাই অচিন্ত্যনীয়। এখন GPA-5 ই ভালো রেজাল্টের সিলমোহর এবং এটা আবার কিনতেও পাওয়া যায়! সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে শহরের বিভিন্ন নামীদামী কলেজের অধ্যক্ষ্যরা লাখ টাকার বিনিময়ে GPA-5 বিক্রির কথা অপকটে স্বীকার করেছেন। কয়েক মাস আগে একটি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কিভাবে লাখ টাকার বিনিময়ে GPA-5 পাইয়ে দিচ্ছে কিছু স্কুলের শিক্ষরেরা।

মোটকথা পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং মেধা এসব থাকলেও একজন ভালো শিক্ষার্থী এই দূর্নীতি ও অবহেলাপূর্ণ এডুকেশন সিস্টেমের গ্যাড়াকলে পড়ে তার সঠিক মূল্যায়ন পায়না। অপরদিকে কেউ একজন “ফেল করি মাখো তেল” সিস্টেমে চাইলেই একটি GPA-5 বগলদাবা করতে পারে।

এমন মেধার অবমূল্যায়ন অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীকেই পড়াশোনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করছে। শিক্ষাজীবনের প্রতি বিষিয়ে উঠছে মন এবং জমে উঠছে ক্ষোভ। সর্বশেষ SSC পরীক্ষার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ছেলের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিলো, যেখানে ছেলেটিকে শিক্ষা ব্যবস্থা এবং কর্তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে দেখা যায়। কারণ সে সবার থেকে ভালো পরীক্ষা দেওয়ার পরেও পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিলো, যা সে কোনো অবস্থাতেই মানতে পারছিলো না। তার ওই ভিডিওতে ফুটে উঠা ক্ষোভ-ই প্রমান করে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে কতটা ত্রুটিপূর্ণ। আর এই ক্রুটিপূর্ণ সিস্টেমের মাশুল হিসেবে কত মেধাবী শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে তার সঠিক সংখ্যা জানা নেই।

গত সপ্তাহে একটি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সিরাজগঞ্জের ৬০ বছর বয়স্ক জিল হোসেনের কাহিনী তুলে ধরা হয়। যে জিল হোসেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন সব পরীক্ষায় পাশ করলেও তাকে রেজাল্টে ফেইল দেখানো হয়। ফেইল মেনে নিয়ে অসহায় জিল হোসেন আবারও পরীক্ষায় বসে, কিন্তু প্রথম পরীক্ষার দিন-ই কোন কারণ ছাড়া জিল হোসেনকে পরীক্ষা থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়। আর পরীক্ষায় বসতে পারেনি জিল হোসেন। সারাজীবন অশিক্ষিত সার্টিফিকেট বিহীন একজন মানুষ হিসেবে সমাজের কাছে তিরস্কার আর অবহেলা পেয়ে আসতে হয়েছে জিল হোসেনকে।

আজ জিল হোসেন বৃদ্ধ, কিন্তু নামের পাশে ‘গ্রাজুয়েট’ লাগাতে আজও জিল হোসেন ছুটে যান হাইকোর্টের বারান্দায়। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের তথা শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে টানা ৩৬ বছর ধরে মামলা চালিয়ে আসছেন জিল হোসেন। রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মামলা করায় রাষ্ট্র লজ্জিত না হলেও জিল হোসেনেরা ঠিকই লজ্জিত। কারণ স্বাধীন রাষ্ট্রে এমন ক্যান্সারে আক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা জিল হোসেনেরা কখনোই দেখতে চায় না।

যে শিক্ষার উদ্দেশ্য জীবন আলোকিত করা, আমাদেরই ভুল এবং দূর্নীতির জন্যই ফুলের মতো শিক্ষার্থীদের জীবনে তা হয়ে উঠে নরকসম কালো অধ্যায়। একজন জিল হোসেন-ই তার প্রকৃত উদাহরণ।

শিক্ষা ব্যবস্থা-ই যখন মহাব্যাধি ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত, তখন কস্ট করলে “কেষ্ট” মেলার গ্যারান্টি এই প্রজন্মকে দিবে কে?