আই উইল ফাইন্ড ইউ এন্ড আই উইল কিল ইউ

Now Reading
আই উইল ফাইন্ড ইউ এন্ড আই উইল কিল ইউ

“আই উইল ফাইন্ড ইউ, এন্ড আই উইল কিল ইউ” এই বিখ্যাত উক্তিটি যদি আপনি না শুনে থাকেন তাহলে বলতে হবে হলিউড জগতে আপনি এখনও অজ্ঞ। বিখ্যাত ফিল্ম
সিরিজ টেকেন সিনেমার প্রথম পর্বে এই ডায়লগটা ছিল। ষাটোর্ধ অভিনেতা লিয়াম নিসনের এই ডায়লগ যেন এখনও মানুষের মুখে মুখে ঘুরে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও
সমানভাবে জনপ্রিয় এই উক্তি সবাইকে দিয়ে যাচ্ছে হাসির খোরাক জাগানো হরেক রকম মিম। এখনও যারা এই বিষয়ে জানেন না তাদের বলতে হয় হলিউডের অন্যতম এক
প্রোডাকশন আপনারা মিস করেছেন, এবং আপনাদের জন্য কেবল আফসোসই রয়ে যায়।

যাই হোক এবার একটু মুভির কথায় আসি। ২০০৮ সালে মুক্তি পায় এই টেকেন ফ্র্যাঞ্চাইজের প্রথম পর্ব। ২২ মিলিয়ন ডলারের স্বল্প বাজেট হলেও খুবই ভাল আয় করে নেয় পিয়েরে
মরেলের নির্দেশনার এই সিনেমা। শেষ পর্যন্ত বক্স অফিসে প্রথম পর্বটি ২২৬.৮ মিলিয়ন ডলার আয় করে নেয় এবং তারপর এই সাফল্যই যেন তাদের অনুপ্রাণিত করে এই ফ্র্যাঞ্চাইজের
আরও দুটি পর্ব বানানোর। মূল চরিত্রে লিয়াম নিসন থাকায় যেন আরও অনেক বেগ পেয়ে গিয়েছিল একশন-থ্রিলার ধাঁচের জন্য জনপ্রিয় মিঃ মরেলের এই আউটপুট। কিছু
চলচ্চিত্র সমালোচকের ভাষ্য মতে এমন কোন সিনেমা তারা দেখেন নি যেখানে লিয়াম নিসনকে কাউকে খুন করতে দেখা যায় না। আর হলিউড পাড়ার এক গুজব হল লিয়াম
যদি সিনেমায় কাউকে খুন না করেন তাহলে সেই সিনেমা সফল হবে না। আর এই সিনেমায় তো লিয়াম এক প্রাক্তন সি.আই.ই কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করেন। তবে বুঝতেই পারছেন
তিনি কাউকে খুন করেছেন নাকি না।

এবার একটু গল্পে আসা যাক। যেমনটি বলেছিলাম সিনেমার প্রোটাগনিস্ট ব্রায়ান মিলস এক প্রাক্তন সি.আই.ই কর্মকর্তা, যিনি এখন ফ্রিল্যান্স সিকিওরিটি সার্ভিসের জন্য মাঝে মাঝে
কাজ করেন যেই অর্গানাইজেশন তার কিছু বন্ধুর দ্বারা পরিচালিত। কিন্তু তার জীবনে খুব বড় এক দুঃখ হল তিনি সি.আই.ই’র হয়ে কাজ করার সময় দেশের সেবায় এতটাই
নিয়োজিত ছিলেন যে তার পরিবারকেই তিনি সময় দিতে পারেন নি। এবং তার ফলে তার স্ত্রী তার একমাত্র মেয়ে কে নিয়ে আলাদা হয়ে যান। কিন্তু তিনি প্রায় সময় তার মেয়ের
সাথে গিয়ে দেখা করতে পারতেন এইটাই তার জন্য খুব আনন্দময় একটি ব্যাপার।
তার মেয়ের ১৭ তম জন্মদিনের দিন তিনি গিয়েছিলেন তার সাথে দেখা করে তাকে একটি কেরিওকে মেশিন উপহার দিয়ে আসতে, কারণ লিয়ামের মেয়ে বড় হয়ে গায়িকা হতে চায়।
সেদিন জন্মদিনের অনুষ্ঠান থেকে লিয়াম খুব খুশি মনেই ফেরত এসেছিলেন কারণ এর পরেরদিনও লিয়ামের মেয়ের সাথে তার লাঞ্চ করার কথা। কিন্তু লাঞ্চ করতে গিয়ে মেয়ের মুখ
থেকে যা শুনে তা লিয়ামকে খুব ভয় পাইয়ে দেয়। তার মেয়ে প্যারিস ট্রিপে যেতে চায় তার বন্ধুদের সাথে। খুবই সাধারণ বিষয়, ভয় পাওয়ার মত তেমন কিছু নেই। কিন্তু সি.আই.ই তে কাজ করার
দরুন ব্রায়ান জানেন পৃথিবীটা কেমন নিষ্ঠুর,
মানুষেরাও কতটা নিষ্ঠুর। তাই তিনি যেতে দিতে চান না। কিন্তু তার মেয়ের ক্রন্দনরত চেহারা পছন্দ হয় নি তার, তাই শেষমেশ
তার মেয়েকে অনুমতি দেওয়া হয় প্রতি মুহূর্তের খবর ফোন করে ব্রায়ানকে জানানো হবে এই শর্তে। কিন্তু শেষমেশ ব্রায়ানের ভয়টিই সত্যি হয়। প্যারিসে গিয়ে নামতে না নামতেই
সে এবং তার বন্ধু শিকার হয় হিউম্যান ট্রাফিকিং-এর লোকদের। যখন সেই লোকেরা ব্রায়ানের মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন ফোনে তাদের বাপ বেটির কথোপকথন চলছিল আর তার থেকেই
সিনেমার নামটি হয়ে যায় “টেকেন”। তারপর মেয়েটাকে নিয়ে যাওয়ার সময় ফোনেই সেই লোকদের উদ্দেশ্যে ব্রায়ান বলে দেন “তোমরা যদি আমার কাছে মুক্তিপণ চাও তোমাদের
জেনে রাখা ভালো আমার কোন টাকা পয়সা নেই, কিন্তু এমন অনেক কৌশল আমার জানা যা তোমাদের কে অনেক বিপদে ফেলতে পারে, আই উইল ফাইন্ড ইউ এন্ড আই উইল কিল ইউ”
ব্যাস, তারপর সেখান থেকেই মুভির আসল প্লট শুরু। তারপর ব্রায়ান নিজে প্যারিসে যান, গিয়ে তার গোয়েন্দাগিরির সবরকম কৌশল কাজে লাগিয়ে তিনি একে একে অনেকগুলো
ধাপ পার করে তার মেয়েকে শেষমেশ উদ্ধার করে আনেন। এইটুকুতেই শেষ হয় প্রথম পর্ব। কিন্তু মানুষ বলে না চোর যতই চতুর হোক কোন সূত্র ছেরেই যায় ? সেটা একেবারে ঠিক ।
ব্রায়ানো এইখানে ঠিক কিছু সূত্র ছেড়ে গিয়েছিলেন যাকে মুলে রেখেই পরে বানানো হয় টেকেনের দ্বিতীয় পর্ব। সেখানে হয় আরও অনেক বড় কাহিনী। তার ফেলে আসা এক
সূত্র ধরে তার হাতে মারা যাওয়া এক অপরাধীর বড়ভাই টার্কিতে গিয়ে ব্রায়ানের পুরো পরিবারের উপর হামলা চালায়। খুবই সাড়া জাগানো এই পর্বেও ব্রায়ান অনেক কষ্টে এবং
বুদ্ধিমত্তায় তার পুরো পরিবারকে বাঁচিয়ে নেয়। এবং আক্ষরিক অর্থেই সব শত্রুদের মেরে দেয় প্রাণে। না মারলে তার সিনেমাটি হিট হবে না বৈকি।
কিন্তু এই ফ্র্যাঞ্চাইজের সবচেয়ে বড় টুইস্ট আসে তৃতীয় পর্বে, সেই পর্বের কথা না বলি সেটা নিজেরা দেখে বুঝে নিবেন। কিন্তু পুরো সিরিজটি নিয়ে একটা কথা বলতেই হয়
“অস্ত্র জমা দিয়েছি, ট্রেনিং জমা দেই নাই” কথাটা এই সিনেমা’র সাথে সম্পূর্ণভাবে খাটে।
এরকম এক্সাইটিং একটি সিনেমা না দেখলে জীবনে কোন একদিন নিশ্চিত পস্তাবেন, যারা দেখেননি তাদের জন্য এখনও আফসোস।4688f25a384d8f8f14da228abc67b0d91c1080e77c6344d48010987e8aca712f.jpg

“লিমিটলেস” মুভি রিভিউ

Now Reading
“লিমিটলেস” মুভি রিভিউ

দেয়ার ইজ এ ফেমাস মিথ, মানুষ নাকি তার মস্তিস্কের মাত্র ১০% ব্যাবহার করতে পারে। বাকি ৯০% ব্যাবহার করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। যদিও এর কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই, এবং অনেকে এও বলে থাকেন যে মানবসভ্যতায় শুধুমাত্র এলবার্ট আইনস্টাইন ছারা আর কেউ তার মস্তিস্কের ১০% এর উপর ব্যাবহার করতে পারেন নি।
এই কথাটাই যেন খুব সুন্দর ভাবে খেলে যায় হলিউডের ফিল্ম ডিরেক্টর নিল বার্গারের মাথায়। বিষয়টা খুব ভাবিয়ে তোলে তাকে এবং তিনি চিন্তা করতে থাকেন কেমন হত যদি মানুষ তার মস্তিস্কের সম্পূর্ন ব্যাবহার করতে পারত ?

এই চিন্তাকেই স্যেলুলয়েডে নিয়ে আসেন তিনি ২০১১ সালে তার “লিমিটলেস” সিনেমা দিয়ে। অসাধারণ চিন্তাধারা এবং চিত্রনাট্যকার লেসলি ডিক্সনের বুদ্ধিমত্তায় আমরা উপহার পাই ২০১১ সালের অন্যতম হিট এই সিনেমা। বক্সঅফিস কাপিয়ে দেওয়া এই সিনেমা মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই নিজের ব্যাগে পুরেছিল ১৮.৫ মিলিয়ন ডলার, এবং সব মিলিয়ে শেষমেশ ৩০০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি কামিয়ে নিয়েছিল ২৭.৫ মিলিয়ন ডলার বাজেটের এই লিমিটলেস।

এবার একটু সিনেমার গল্পে আসি। সিনেমার প্রটাগনিস্ট ‘এডি মোরা’ একজন লেখক হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেন, কিন্তু প্রকাশকদের কাছ থেকে এডভান্স বুঝে নেওয়ার পরেও প্রায় ১ বছর ধরে তিনি তার প্রথম বই লিখে শেষ করতে পারেন নি। তার একমাত্র কারন তিনি খুবই গোফ খেজুরে স্বভাবের এবং অলস প্রকৃতির। অনেকদিন ধরে তার ঘর ভাড়াও দেওয়া হয়নি, তার ফলে প্রায় প্রতিদিন বাড়িওয়ালার কটুকথা শুনতে হচ্ছে। কিন্তু এ সব বদলে যায় যখন তার শালা তাকে একটা ঔষধ সেবন করতে দেয়। তার শালার সাথে তার দেখাটাও হয়েছিল অনেকদিন পর, এই শালা তার প্রাক্তন বউ এর ভাই যে কিনা এক আন্ডারগ্রাউন্ড ফার্মাসিউটিকেল কম্পানির হয়ে চাকরি করছে। তাই প্রথমত এডি তার শালাকে বিশ্বাস করে নি। করবেও বা কেন ? তার শালা এই ঔষধ সেবনের কোন কারন তাকে জানায় নি। কিন্তু তাও এডি চেখে দেখেছিল ঔষধটা। আর তাতেই হয়ে যায় বাজিমাত। সেই এডি আর ঐ আগের এডি নয়, একদম নতুন এক অবতারে তার নিজের কাছে এসে ধরা দেয়। যেই বই এক বছরেও শেষ হল না সেই বই এডি শেষ করে ফেলল এক বসাতেই। সবকিছু কেমন উজ্বল দেখাচ্ছিল তার কাছে। এ যেন এক নতুন শুরু, কালো আধারের জীবনে স্ফিত হয়ে থাকা এক চিলতে রোদ্দুরের ফিরে  আসা। এই ভেবেই সেদিনের মত ঘুমোতে গিয়েছিল এডি। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে যেন সেই আগের এডি আবার ধরা দিল। এডি’র বোঝার বাকি নেই যে এই ড্রাগের কার্যক্ষমতা শুধু ২৪ ঘন্টার জন্য। কিন্তু এডির নতুন অবতারের সাথে যেন প্রেমে পড়ে গিয়েছিল এই এডি। তাই সে তৎক্ষণাৎ ছুট লাগালো তার সেই শালার বাড়ি আরো কিছু ড্রাগ পাওয়ার আশায়। কিন্তু সে গিয়ে যা দেখল তা অবাক করার মত, তার সেই শালা ঘরে মৃত পরে আছে এবং সে জানতে পারল যে কিছু পলিটিকেল কারনে কিছু শত্রু তার এই অবস্থা করেছে। তাতে এডি’র সমস্যা আরো বেরে গেল, সেই ড্রাগস গুলো এখন সে আর কোথাও পাবে না। কিন্তু সে হাল ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নয়, হন্তদন্ত হয়ে পুরো বাড়ি খুজে একসময় সে পেয়ে যায় লুকিয়ে রাখা অনেকগুলো ড্রাগসের ট্যাবলেট এবং সাথে মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মত কিছু টাকা।

তারপর শুরু হয় গল্পের আসল প্লট। এডি একদিনের মাথায় পিয়ানো বাজানো শিখে যায়, টিভিতে “ব্রুস লি” কে মার পিট করতে দেখেই মার্শাল আর্টস আয়ত্ত করে নেয়, একবার শোনাতেই শিখে নেয় যেকোন নতুন ভাষা। এর সাথে সে নিজেকে করে তোলে স্টক মার্কেটের এক ওস্তাদ। ৪ দিন ট্রেডিং করার মাথায় তার ব্যাংক একাউন্টে চলে আসে ২ মিলিয়ন ডলার এবং সে পেয়ে যায় এক নতুন গার্লফ্রেন্ড। স্বনামধন্য এক প্রতিষ্ঠানে ফিনান্সিয়াল এডভাইজার হিসেবে চাকরি পায় আর তার বুদ্ধিমত্তায় প্রতিদিনই অবাক হচ্ছিল সবাই। সব মিলিয়ে ভালোই চলছিল তার। কিন্তু সমস্যা শুরু হতে থাকে তখন। তার শত্রু বারতে থাকে, এই শত্রু সেই শত্রু যে তার সেই শালাকে খুন করেছিল। সাথে আরেক দুঃসংবাদ হল প্রতিদিন একটি করে ট্যাবলেট নেওয়ায় তার ড্রাগস এখন প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ার পথে, এবং সেই ড্রাগস গুলো ছাড়া এডি কিছুই নয়। এর সমাধান বের করে নিয়েছিল এডি এক সায়েন্টিফিক রিসার্চ সেন্টারে তার সেই ড্রাগ(এন.জি.টি) বানানোর অর্ডার দিয়ে। এবং সে শত্রুদের হাত থেকে বাচতে প্রতিদিনের জন্য দুইজন বডিগার্ড নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল আর খুব দামী এক হাইলি সিকিওর্ড বাসায় উঠে যায় এডি।

কিন্তু সেই শ্ত্রুরাও কম ধুরন্ধর তো নয়, তারাও তাদের কাজ চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল এবং প্রতি মুহুর্তে বাধা সৃষ্টি করছিল এডি’র জন্যে। এডিও খুব চাটুকারিতার সঙ্গে পেরিয়ে যাচ্ছিল সবগুলো বাধা। কিন্তু শেষমেশ কি হয় তা মুভি না দেখলে বোঝা যাবে না। অসাধারণ সব টুইস্টে থাকা এই সিনেমা দেখা সবারই দরকার।
কিন্তু লিমিটলেস নাম কেন এই সিনেমার? কারন এই ড্রাগটি (এন.জি.টি) মানুষকে তার মস্তিস্কের সর্বোচ্চ ব্যাবহারের সুযোগটা দেয় এবং তখনই মানুষের মস্তিস্কের শক্তিটা হয়ে যায় লিমিটলেস। অসাধারণ এই সিনেমার এডি চরিত্রে আছেন হ্যাঙ্গভার সিরিজ খ্যাত হলিউড হার্টথ্রব ব্র্যাডলি কুপার, যিনি পুরো সিনেমা জুড়ে তার অভিনয় দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন।

সিনেমাটি ব্যাবসাসফল হওয়ার পর একই নামে বের হয় একটি টিভি সিরিজ এবং সেটাও দর্শকদের প্রতি মুহুর্তে মুগ্ধ করে গেছেন। তবে আর দেরি না করে এখনই দেখে ফেলুন file_551046_limitlessreview.jpg২০১১ এর এই হিট।

ধ্রুব’র কাহিনি (শেষ পর্ব)

Now Reading
ধ্রুব’র কাহিনি (শেষ পর্ব)

(পঞ্চম পর্বের পর…)

যেই কথা সেই কাজ। তাই হল। জন্মদিনের দিন, খুশবুর প্রিয় চকোলেটগুলোর সাথে একটি চিঠি দিয়ে সব বলে দিল ধ্রুব।

কিন্তু সেই চিঠি দেওয়ার পর যা হয় তাতে অত্যন্ত খুশি হয় ধ্রুব। প্রথমবারের মত খুশবুর ফোনকল আসে তার মুঠোফোনে, এবং ধ্রুবকে বলে যে আজ পর্যন্ত কোন ছেলেই তার জন্য এতটা অনুভুতি দেখায় নি। এবং উপহারটাকে খুশবুর ভাষায় ” কিউট ” উপাধি দেয়।
সেই সামান্য কিছু কথায়ই একদম লুতুপুতু হয়ে যায় ধ্রুব। আর আজ অবধি খুশবুর কথা মনে রেখে নিজেকে খুশি রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু স্কুল থেকে বের হওয়ার পর আর দেখা হয় নি তাদের।
গাড়ি চালাতে চালাতে এবার প্রশ্নটা করল শৈবাল, ” খুশবুকে বিয়ে করবি নাকি ? “। ধ্রুবর সরল উত্তর ” না, ব্যাস জানতে চাইলাম আরকি কেমন আছে “। তারপর শৈবাল জানতে চায় “তাহলে বিয়েটা করবি কাকে?”। এই প্রশ্ন করতে করতেই পৌছে যায় তারা ধ্রুবর বাড়িতে। গাড়ি থেকে নেমে ধ্রুব বলল ” মৌ’র কথা জানিস ?”।
এই কথাটি ধ্রুব উত্তর রুপে দিল নাকি আবারও এক সাধারণ প্রশ্ন করল তা শৈবালের বোধগম্য হল না। কিন্তু এটা প্রশ্ন বা উত্তর যেটাই হোক, কথাটা ভাল লাগে নি
তার। এবার শৈবাল খুব রাগান্বিত, রাগের সূরে ধ্রুবকে সে বলল ” নোয়াখাইল্লার লগে প্রেম করা এক্কেরেই ভালা কাম না “।
প্রচন্ড অবাক হয় ধ্রুব। শৈবালকে প্রায় কয়েক যুগ পর এমন রাগান্বিত হতে দেখেছে। শেষ দেখেছিল অনেকদিন আগে যখন বন্ধুরা তাকে বাথরুমে আটকে রেখে বাইরে থেকে দরজার খিল মেরে দিয়েছিল। কিন্তু আজকের রাগটা ভিন্ন। শৈবাল এই ভেবে ক্রোধিত যে মৌ ধ্রুবকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ধ্রুব একটু ভয়ই পেল বৈকি এই রাগ দেখে। তাই কিছুক্ষণের জন্য চুপ মেরে গেল। আর ভীষণ রাগ না হলে শৈবালের ভাষার এমন নাটকীয় পরিবর্তন হয় না। কোন জেলার ভাষা তা নিয়ে ধ্রুব একটু দ্বিধায় ছিল।

নোয়াখালির মেয়ে দেখে শৈবাল রেগে যায় নি এটা ধ্রুব নিশ্চিত। রেগেছে সে ধ্রুবকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল তাই। আর সে কারনেই নোয়াখালির সেই মেয়ের ব্যাপারটা ধ্রুব মুলতবী রাখল। কথাটা আর তোলে নি।

ঘরে প্রবেশ করল দুজনেই। সব জামা কাপর খুলেই মেঝেতে গা এলিয়ে দেয় ধ্রুব, শৈবাল এখনও মাথা গরম করে বসে আছে। মাথাটা তারাতারি ঠান্ডা করে নিতে একটা চুরুট ধরিয়ে নিল তারাতারি করে, ঘরের ভেতর ঘুর্নিঝড়ের মত ঘুরপাক খাচ্ছে ধোয়া গুলো। কার্বন ডাই অক্সাইডের সাথে মিশে ধোয়া বের হচ্ছে শৈবালের মুখ দিয়ে। এভাবেই যেন বেরিয়ে যাচ্ছে তার সব ক্লান্তি, তার সব রাগ। মৌ মেয়েটার কথা মনে পরতেই এভাবে তার মাথায় রক্ত চরে বসল। ধ্রুবকে খুব ভাল বন্ধু হিসেবে দেখে তো, বন্ধুর জীবনের সেই বাজে চাপ্টার টার প্রতি তাই রাগটা একটু বেশিই।
এতক্ষণে রাগটা একটু কমে গেছে শৈবালের। মেঝেতে বসল ধ্রুবর পাশে। ধ্রুব হাল্কা তন্দ্রাজনিত চোখে শৈবালের দিকে তাকিয়ে বলে চল বন্ধু ছাদে যাই না অনেকদিন। সন্ধ্যায় এই সুন্দর বাতাস পছন্দ হবে দুজনেরই, শৈবাল তাই আপত্তি জানায় না। নতুন কেনা বেনসনের প্যাকেট সহ দুজনেই উঠে গেল ছাদে। শৈবালের মাথায় এখনও চলছে ধ্রুবর মা’র মেজবানের কথা, কিন্তু ধ্রুবকে আবারও এই কথা বলে শুধুশুধু বিরক্ত করতে চাচ্ছে না সে। জিপ্পো দিয়ে জ্বালানো দুটো বেনসন দুইজন ধরিয়ে সুখটান দিতে দিতে গান ধরল। ১৬ মিনিটের এক গান। অনিকেত প্রান্তর। সুন্দর কিছু কথা একত্রিত করে কথায় সূর দিয়ে প্রাণ দেওয়া এক গান। কালো মেঘের নিচে বসে সাদা ধোয়া উড়িয়ে ঠান্ডা বাতাস খেতে ভালোই লাগছে ধ্রুবদের।

গান শেষ হওয়ার পর ধ্রুব শৈবালকে বলল ” বন্ধু তোর বিয়েতে কিন্তু আমি প্রাণ খুলে নাচব, নাচতে নাচতে হাত ঠেং সব ভেঙ্গে ফেলব “। শৈবাল হাসে তার কথা শুনে আজ তার মুখে বিয়ের কথাই বেশি। খুশবু, মৌ এবং শৈবালের বৌ, সব মিলিয়ে সব বিবাহ যোগ্য মেয়ে নিয়েই বোধহয় চিন্তা করছে আজকে। ব্যাপারটা বোধগম্য হচ্ছে না শৈবালের।

আজকে তারা এই ছাদেই রাতটা কাটিয়ে দিতে চায়। টিপ টিপ বৃষ্টিতে এখনই ভেজা শুরু করে দিয়েছে তারা। বারলেও আজকে নামবে না, থেকে যাবে ছাদেই। কিন্তু শৈবাল অসুস্থ হতে চায় না। এখন অসুস্থ হলে বড় বিপদ। ব্যাবসা অনেক ভালোভাবে এগোচ্ছে, এখন কোন ওলট পালট হলেই সবকিছুতে ধস নামবে। তাই শৈবাল নিচে নামল একটা ত্রিপাল এবং কিছু ড্রিঙ্কসের ব্যাবস্থা করতে। সারারাত ঘুমানো হবে না তাদের, গল্প করেই কেটে যাবে। তাই কিছু ড্রিঙ্কস সাথে রাখা দরকার।

কিন্তু নিচে নামতেই যে মুশলধারে বৃষ্টি শুরু হবে শৈবাল তা জানত না, সাথে শুরু হল বজ্রপাত। শৈবাল ধ্রুব কেউই বজ্রপাত ভয় পায় না। ছোটবেলা থেকেই এই অভ্যাস তাদের। কিন্তু খুবই জোড়ে শব্দ হচ্ছিল বজ্রপাতের। সেই দিকে মাথা না ঘামিয়ে শৈবাল স্টোর রুম থেকে ত্রিপাল এবং ফ্রিজ থেকে ড্রিঙ্কস গুলো বের করে নিয়ে যাচ্ছিল ছাদে। কিন্তু হঠাৎ মনে হল ধ্রুবর জন্য একটা তোয়ালে এবং একটা লুঙ্গি নিয়ে যাওয়া দরকার, অনেকক্ষণ হয়ে গেল বৃষ্টিতে ভিজছে বেচারা।

সবকিছু নিয়েই গেল উপরে, ধ্রুব তখনও শক্ত হয়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছে হাসিমুখে। ভিজে একদম একাকার, শৈবাল দূর থেকেই দেখছিল, এবং ছাদে থাকা এক বেতের বিছানাটার ওপর ত্রিপাল লাগাচ্ছিল, মানসিক পরিস্থিতি মাত্রই স্বাভাবিক হওয়া বন্ধু যেন বৃষ্টিতে সব দুঃখ ভিজিয়ে নিচ্ছে তাই ভেবে আর ডাকল না।

কিন্তু অনেক ভেজা হয়ে গেছে, শৈবালের ত্রিপাল লাগানোও শেষ তাই ধ্রুব কে এখন ডাকা উচিৎ নাহয় অসুস্থ হয়ে যেতে পারে সে। ধ্রুব এক কথায় সাড়া দেওয়ার মানুষ না, শৈবাল তা জানে। পাচ ছয় বার ডাকার পরেও সে আসে নি, এইবার বাধ্য হয়ে ধ্রুবর নিজেরই যেতে হল বৃষ্টির নিচে তাকে টেনে আনতে।
কিন্তু ঈশ্বর অন্য কিছু চাইতেন। ধ্রুবকে টেনে নিতে পারে নি শৈবাল, বরং এখন সেও বৃষ্টিতে বসে আছে। আর তার কোলে শক্ত হয়ে থাকা এক হাসিমুখের লাশ।

দুজনের একজনও বজ্রপাতকে ভয় পেত না কখনই। কিন্তু এখন থেকে শৈবাল অবশ্যই তার অভ্যাস পালটাবে।

ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ৫)

Now Reading
ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ৫)

(চতূর্থ পর্বের পর…)

লাঞ্চের পালা শেষ। আবার কাজ শুরু করতে হবে, অনেক কাজ। অনেক অনেক অনেক কাজ। ব্যাবসা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে এবং তার সাথে তাল মিলিয়েই বেড়ে চলেছে শৈবালের খাটুনি। টেপাটেপি করতে করতে কোনদিন না জানি তার কিবোর্ডটাই শাহাদাৎ বরণ করে।

তো দীর্ঘক্ষন টেপাটেপির পর হঠাৎ তার মনে পড়ল, ধ্রুব এখনো অফিসে আসে নি। আসলে রুমে ঢু মেরে যেত। শৈবাল ভেবেই নিয়েছিল, ধ্রুব যা বলছে সব এমনিতেই বলছে। একদিনের বেশি তার ইচ্ছা থাকবে না ব্যাবসায়িক কাজকর্মে। কিন্তু তাও সে একটা ফোন দিল ধ্রুবর বাসায়। ফোন বেজেই চলছিল, কিন্তু কেউ ধরেনি তিন চার বারের পরও। এসব স্বাভাবিক, খুবই স্বাভাবিক, ধ্রুব এমনই করে যদি মন খারাপ থাকে। পঞ্চম বার ফোন দেওয়ায় আশ্চর্যজনক ভাবে ফোন উঠায় ঘরের কাজের সাহায্যকারী। শৈবাল চমকে উঠে। জিগ্যাসা করে ধ্রুব কোথায়?

সেই মহিলার উত্তর ” সাব তো সকালেই বাইর হইয়া গেসে, আমারে তো কিছু কইয়া যায় নাই “। দ্বিতীয়বার চমকানোর পালা শৈবালের। ঘর থেকে বের হয়েছে কিন্তু অফিসে আসল না, তাহলে গেছে কোথায় ? শৈবাল তারাতারি ধ্রুবর কক্ষে গিয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে যে সে এসেছে নাকি না। সিকিওরিটি থেকে শুরু করে সবাইকেই জিজ্ঞাসা করে দেখে তাকে দেখেছে নাকি না। সবার একই উত্তর ” না “।

এবার চিন্তাটা একটু বেরে গেল। কাজ-টাজ সব ফেলে রেখে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ধ্রুবকে খুজতে। অনেক রকম চিন্তা চলছিল শৈবালের মাথায়, জি.ডি করার চিন্তাভাবনাও করে ফেলেছিল, কিন্তু পরে একটু অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের খোজ চালু রাখল।

শহরটা প্রায় অর্ধেক ঘোরা হয়ে গেছে, কোথাও ঐরকম কাউকে দেখে নি কেউ।

হঠাৎ এক কবর স্থানের পাশ দিয়ে যেতে চোখে পড়ল ধ্রুবকে। এই কবর স্থানেই ঘুমিয়ে আছে তাদের এক কাছের বন্ধু নিলাদ্রী। ভেতরে ঢুকে দেখে ধ্রুব নিলাদ্রীর সমাধির পাশেই অবস্থান করছে। নিলাদ্রীর মৃত্যু হয়েছিল মাত্র ২ বছর আগে, তখন কিন্তু ধ্রুবর মানসিক ভারসাম্য নেই। যদিও তাকে জানানো হয়েছিল নিলাদ্রীর প্রয়ানের কথা, কিন্তু তখন সে এই বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয় নি, হয়ত বুঝতেই পারেনি কিছু। তবে এখন ধ্রুবকে দেখে মনে হচ্ছে সে আসলেই বন্ধু হারানোর বেদনায় কাতর। চোখে জল নেই, তবুও দেখে বোঝা যাচ্ছে যে সে খুব দুঃখিত।

নিলাদ্রীর মৃত্যুটা ছিল বড়ই করুণ, কিছুটা অবাক করাও বটে। নিলাদ্রীকে বন্ধু মহলে সবাই প্রেমিক পুরুষ হিসেবেই চিনত। স্মার্ট এবং ধন-সম্পত্তির মালিক হওয়ায় অনেক নারীই সংশপর্শে এসেছিল তার। কিন্তু নিলাদ্রী কখনই ভালবাসার স্বাদ পায় নি। সবাই টাকার লোভেই আসত তার কাছে। তাই ৭ম বার প্রেমে ব্যার্থ হওয়ার পর যখন আরেকটি মেয়ে বলল ভালবাসি, তখনই প্রবল হাসির কারনে তার হৃদপিণ্ড গোস্বা করে পদত্যাগ করে দিয়েছিল। সেখানেই শেষ হয়ে গেছিল নিলাদ্রীর অধ্যায়।

আজ হঠাৎ নিলাদ্রীর কথা মনে পরার কারন জিগ্যাসা করলে ধ্রুব বলে ” যখন মরল তখন অবুঝ ছিলাম, এখন দেখা না করাটা অন্যায় হবে। তাই একবার দেখতে আসলাম বন্ধুকে “।

শৈবালের একটু খারাপই লাগে ধ্রুবর চেহারার দিকে তাকিয়ে, এমন কষ্টাচ্ছন্ন চেহারা দেখা যায় না ধ্রুবর। বাবা-মা মারা যাওয়ার পরও দেখা যায় নি। আর কিছুক্ষণ থাকলে ধ্রুব হয়ত কেদেই দিবে। শৈবাল বুঝতে পারছে না তাকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে যাবে, নাকি বছরের পর বছর জমে থাকা বেদনাগুলো বের হয়ে আসতে দেবে আজ।

শেষমেশ তাই হল। অঝোরে  কাদা শুরু করল ধ্রুব, এই প্রথম ধ্রুবকে কাদতে দেখে মনে প্রশান্তি আসল শৈবালের। এ যে বছরের পর বছর জমে থাকা পাথর গলে অশ্রুকণা হয়ে বেরিয়ে আসছে ধ্রুবর চোখ বেয়ে। জমে থাকা কষ্ট বের করে দেওয়ায় মন হালকা হয়।

কিছুক্ষণ পর তারা বিদায় দিল নিলাদ্রীকে, উঠে চলল বাসার পথে। স্যুট বুট পরা ধ্রুব আজকে অফিসে যায় নি। কাপরগুলো শুধু শুধু পড়ল, এত কাপর না পরে সাধারণ কাপর পরলেই চলত তার। এই চিন্তা এখন খেলছে মাথায়। আজগুবি এইসব চিন্তা করার আসলে কোন দরকার নেই।

শৈবাল এক হাতে গাড়ি চালাতে চালাতে বাসায় ফোন দিয়ে বলে দিল আজকে সে ধ্রুবর সাথেই থেকে যাবে। সেই সময়ই ধ্রুব প্রশ্ন ছুড়ে দিল আবার শৈবালের মুখে। ” তুই বিয়ে করবি না ? “।

শৈবাল গতকাল ভেবেছিল শুধুমাত্র প্রশ্নটা এরানোর জন্যেই ধ্রুব এই প্রশ্ন করে, কিন্তু আজ সত্যিকার অর্থেই এই প্রশ্ন করছে সে। একটু সময় নিয়ে শৈবালের উত্তর ” এখনও আমি রেডি না, আরেকটু সময় লাগবে। সবকিছু আরেকটু গুছিয়ে নেই, ফ্ল্যাটটা নিজের নামে করে নেই তারপর। “।

এই কথা শুনে ধ্রুব কি বুঝল সে নিজেই জানে, মাথায় কোন একটা ফন্দি আঁটছিল। কোন ফন্দি আঁটার সময় ধ্রুবর চেহারাটা দেখেই বোঝা যায় কিছু একটা চলছে তার মাথায়।

এবার শৈবাল প্রশ্ন করল ধ্রুবর বিয়ের কথা। কিছু একটা বলতে গিয়েই তখন চুপ করে যায় ধ্রুব। মুহুর্তের নিরবতা, তারপর সে প্রশ্ন করে শৈবাল কে ” খুশবু কেমন আছে ?”।

শৈবাল প্রশ্নটি শুনেই কষে ব্রেক ধরল গাড়িতে। খুশবুর কথা এখনো মনে আছে তাহলে ধ্রুবর। আসলেই ধ্রুব এখন প্রতিদিন, প্রতি মুহুর্তে অবাক করে চলেছে শৈবালকে।

গাড়ি চালানো আবার শুরু করল শৈবাল, এতটা কষে ব্রেক ধরার পরেও ধ্রুব স্বাভাবিক ভাবেই বসে আছে। খুশবু মেয়েটা আসলে ধ্রুবর “প্রথম” ভাললাগা এবং ভালাবাসার মধ্যেখানের বস্তুটি। ইংরেজিতে যাকে বলে ইনফাচ্যুয়েশন। জেনুইন ইনফাচ্যুয়েশন। মেয়েটি যখন পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া তখন ধ্রুবরা নবম শ্রেণীতে।

খুশবু পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময়ই প্রথম ধ্রুবর চোখে পড়ে সে। নীলরঙা এক সোয়েটার পড়ে হাটছিল গোলাপি ঠোটওয়ালা মেয়েটি। সেই দেখাতেই ভাল লেগে যায়। বন্ধুদের জানালে সবাই ধ্রুবকে পেডোফাইল উপাধি দেয়, কিন্তু তাতে কিছুই আসে যায় না তার। সে শুধু এই বিশ্বাস করত যে খুশবুকে তার ভাল লাগে। কে কি বলে না বলে সেই সবে কান দিত না সে। সেই মাঘ মাসে প্রথম দেখা ধ্রুব এবং খুশবুর, আর কথায় যেমন বলে ” এক মাঘে শীত যায় না ” আসলেই যায় নি, সেই মাঘ মাসের ভাল লাগাটা আজ অবধি থেকে গেছে।

ভাললাগাটা যদিও স্কুল জীবনের, কিন্তু এতটাই দৃঢ় ছিল যে এখনো তেমনই রয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথা হত ধ্রুব এবং খুশবুর। খুশবু জেনে গিয়েছিল যে তাকে ধ্রুবর ভাললাগে। কিন্তু ধ্রুব কখনই তাকে পাওয়ার ইচ্ছা পোষন করে নি কারন সে জানত যে খুশবু তার সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে চায় না। তাতে কোন সমস্যা ছিল না ধ্রুবর, সে শুধুমাত্র তার সাথে কথা বলতে পেরেই খুশি ছিল।

স্কুল জীবনের শেষ বছরে এসে ধ্রুব ঠিক করেছিল খুশবুর সাথে একবার মুখোমুখি কথা বলবে সে। একদম খোলামেলা, তার সব অনুভুতির কথা পরিস্কারভাবে বলে দেবে খুশবুকে। তাকে পাওয়ার আশায় না। যেন ধ্রুবর মনে আফসোস না থাকে যে কখনো খুশবুকে তার কথাটা জানাতে পারে নি। কিন্তু মুখোমুখি কথা বলার সাহসটা আসলে ছিল না ধ্রুবর, তাই সে শৈবালের তৎকালীন প্রেমিকার সাথে এই ব্যাপারে একটু আলোচনা করে, যে ছিল ধ্রুবর ডাকা বোন এবং খুশবুর বান্ধবী।

সে ধ্রুবকে উপদেশ দেয় যে জানুয়ারির ৭ তারিখ খুশবুর জন্মদিন, তাই সে যেন ঐদিন খুশবুকে জন্মদিনের উপহারের সাথে একটি চিঠি দিয়ে সব কথা লিখে দেয়। তাতে সাপও মরবে এবং লাঠিও ভাংবে না।

 

(চলবে…) ধ্রুব.PNG

 

ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ৪)

Now Reading
ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ৪)

(তৃতীয় পর্বের পর…)

শৈবাল ধ্রুবকে বলে বসে ” মা-বাবারা যা চায় স্বন্তানের ভালর জন্যেই তো চায় “।

তৎক্ষণাৎ উত্তর ধ্রুবর ” ভাল চায় ঠিক, কিন্তু ভাল করানোর জন্য যেই রাস্তা দিয়ে যায় সেই রাস্তা সবসময় ঠিক নাও হতে পারে। আর মানুষ বলে না? যে সন্তানের ওপর মা’র কখন নজর লাগে না। কথাটা ভুল। সন্তানের  ওপর মা’র নজরই সবার আগে লাগে ” ।

কথাগুলো বলে চুপ মেরে যায় ধ্রুব, শৈবালও চুপ, তার মাকে নিয়ে এইসব কথা ধ্রুব প্রায়ই বলে। রাগটা অনেক পুরোনো। সেই যে পুলিশ হেফাজতে গিয়েছিল ধ্রুবরা, সেদিনই তার মা তার কাছ থেকে তার প্রিয় মোবাইলফোনটি ছিন্তাই করে নিয়ে যায়। অনেক আকুতি-মিনতি করেছিল ধ্রুব তার মা’র কাছে, বস্তুটি ফেরত পাওয়ার জন্য। কিন্তু লাগাতার ১৪ দিন আবেদন করার পরেও যখন তার মা আবেদনটি নাকচ করে দিল, সেই থেকে মৃত্যু অবধি তার মা’র সঙ্গে তার কথা হয় নি। এবং টানা ১৪ দিন আবেদন করার পরেও মোবাইলফোনটি না পাওয়ায় সে এতই আপমানবোধ করে যে, সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয় সেই মোবাইলটি আর কখনো গ্রহন করবে না । এবং করেও নি। কিন্তু এই ২৮ বছর বয়সেও পুরোনো কথা ধরে মৃত ব্যাক্তির ওপর অভিমান করে বসে থাকা কোন সুস্থ ব্যাক্তিকে মানায় না।  যদিও ধ্রুব অসুস্থ, এবং দীর্ঘদিন অতিরিক্ত গাঁজা সেবন এর কারনে মাথাটা আউলেছে তার।

যাক, এইসব বলে আর বদলানো তো যাবে না বাস্তবতা। কিন্তু মায়ের প্রতি এতটা ভয়ানক ক্ষোভ কারো থাকে বলে মনে হয় না। এইসব কথা চিন্তা করতে করতেই ধ্রুবর পাড়ায় গাড়ি ঢুকে গিয়েছে। এবং পাড়ায় প্রথমেই চোখে পড়ল পুলিশের আনাগোনা। বুঝতে বাকি নেই, কাল যেই ব্যাক্তি ধর্ষনের নামে শহীদ হয়েছিল, তার খবর পেয়েই পুলিশের চেহারা দেখাতে হচ্ছে সবাইকে। ঐ মানুষরূপী কুকুররা প্রায়ই এমন পুণ্যের কাজ করে বেরায়, সবার শহীদ হতে হয় না। এরা তাদের যুদ্ধে প্রায় সময় শতভাগ সফল।

আর সুশীল সমাজের সাপোর্ট তাদেরকে এগিয়ে যেতে আরো সাহায্য করে। তাদের বক্তব্য ” এক হাতে তালি বাজে না ” বা ” মেয়েটিরই দোষ ছিল “। আরেকদিকে মাইকে সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে কাল শহীদের জানাজায় অংশগ্রহনের। তার মা-বাবা হয়তো বলে উঠবে ” আমার ছেলে মারা যায় নি, শহীদ হয়েছে “, এই বলে দুঃখ এবং আনন্দ মিশ্রিত অশ্রুকণা ঝরে পড়বে তাদের চোখ দিয়ে। ধ্রুবর ধরা পরবার ভয় নেই, পিছুটান থাকলে ভয় থাকত। যার পিছুটান বলতে কিছু নেই, তার আবার কিসের ভয় ? আর ধরা যদি পরেও যায়, তাতেও সমস্যা নেই। শৈবাল ঠিকই সামলে নেবে।

এবার গাড়ি থেকে নামল ধ্রুব, বাসা এসে গেছে। কাল সময়মতো অফিসে যাবে বলে শৈবালকে বিদায় জানাল।

শৈবাল এইবার কিছুটা ভীতিহীন, গাড়ি এখন সে নিজে চালাচ্ছে। বাড়ি ফিরে যেতে হবে তারাতারি, মা হয়তো দুপুরে কিছু খায় নি ছেলের কথা চিন্তা করে করে। প্রতিদিনের মত রাস্তাথেকে মায়ের জন্য এক হালি সাগর কলা কিনে নিল শৈবাল । বাড়ি গিয়ে মা’র হাসিমুখটা দেখবে এবং হাতে সেই এক হালি ভেষজ ধরিয়ে দিলেই যেন তার মা পেয়ে যায় রাজ্যের সুখ। শৈবালের এতটুকুতেই ভাল দিন যায়। দিশেহারা দিনগুলো পার হয়ে এখন এক লক্ষ টাকা বেতন পায়, নিজের গাড়ি কিনে নিয়েছে, আর মাত্র ৯ মাসের কিস্তিতে ফ্ল্যাটটাও নিজের নামে করে নেবে। কাজের চাপটা অনেক হলেও সে এটা মেনে নেয়, মাসে দুবার নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকা ঘুরে আসতে হয় কাজের জন্যেই। ধ্রুব তো আর এতসব সামলাতো না এতদিন। এখনও যে সামলাবে এটা বলা যায় না। পাগল যতই ভাল কথা বলুক, সেগুলো পাগলের প্রলাপই থাকে। ধ্রুবও হয়তো কিছুদিনের জন্য একটু ভাল হওয়ার চেষ্টা করে চলবে আরকি। শেষমেষ পরিণতি কি হবে সবার অজানা।

ধ্রুব অনেকদিন পর কিছু কাজ করার ফলে ক্লান্ত। এতটাই ক্লান্ত যে গাঁজা ধরিয়ে পাশের টেবিলে রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কাল সকালে আবার অফিসে রওয়ানা হবে। তাই তারাতারি উঠে যেতে পারবে। আর্লি টু বেড এন্ড আর্লি টু রাইজ, মেইকস এ মেন হ্যালদি, ওয়েলদি এন্ড ওয়াইজ।

পরেরদিন সকালে অফিসে বিরক্ত হয়ে ঢুকতে হল শৈবালকে। নতুন এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট এর ব্যাবসার জন্যে নিয়োগ দেয়া মহিলাটি ১ মাস ছুটি কাটিয়ে অফিসে ফিরছে আজ। এই মহিলাকে খুব একটা পছন্দ নয় শৈবালের। প্রাশাসনিক দক্ষতা এবং পূর্ব অভিজ্ঞতার কারনে প্রায় বাধ্য হয়েই রিক্রুট করতে হয়। কলিগ হিসেবে শুধু এই মহিলা না, কোন মহিলাকেই পছন্দ না শৈবালের। পুরুষ কলিগ হলে ভবিষ্যত পরিকল্পনা এবং ক্যারিয়ার নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা যায়। কিন্তু মহিলা কলিগ হলে জানা যায় শাশুরি মানুষ হিসেবে কেমন, বাচ্চারা কেন ভাত খায় না, আর মাঝে মাঝে নিজেদের জীবন নিয়ে বিলাপ। এইসব শুনলে যেকোন পুরুষের ক্রোধ তুঙ্গে ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

লাঞ্চের সময় শৈবালের দেখা হল সেই  মহিলার সাথে। দুই একটা কথা বলে পানি খেতে চলে গেল সেই মহিলা, পানি খেয়ে হয়তো দুনিয়ার সব গল্প শুরু করতে আসবে। সেই দিকেই ঘটল এক মজার ঘটনা, ফিল্টার থেকে পানি নিয়ে খাওয়ার সময় মহিলার এই খেয়াল নেই যে তার পেছনে দারিয়ে আছে খোদ শৈবাল। আশেপাশে কেউ নেই মনে করে সেই মহিলা সজোরে পন্দ্রবায়ু ছেড়ে দিয়েছিল।

শৈবাল হাসি আটকিয়েই ফিল্টারের পাশে থাকা এয়ার ফ্রেশ্নারটি নিয়ে সেদিকে দিল মেরে। আর ঐটুকুতেই কেল্লা ফতে। গালদুটো লাল করে মহিলা সেই যে সেখান থেকে সরে গেলেন, সেদিন আর শৈবালের আশেপাশে আসেন নি। শৈবাল অনেক খুশি, অন্তত একদিন সেই মহিলার কথাবার্তা থেকে রেহাই পাওয়া গেল।

(চলবে…)

 

 

ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ৩)

Now Reading
ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ৩)

(দ্বিতীয় পর্বের পর…)

কিন্তু প্র্যাকটিসে না থাকার ভাল দিকটি হল, তার এখন ঘুম পাচ্ছে। সবকিছুর ভাল দিক খারাপ দিক থাকে, এটাই জগতের নিয়ম।

ঘরে ফিরল ধ্রুব। ফিরে পুরোদমে ফ্যানটি ছেরে দিয়ে দুটি কম্বল রাখল বিছানার ওপর। কি মনে করে যেন ” খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে, বিরাট শিশু ” গানটি অনেক জোড়ে ছেরে দিল। ছেড়ে শুনতে শুনতে, সেদিনের মত জ্ঞ্যান হারাল ।

ভোর ৬ টা বাজে । অ্যালার্মটা বেজে উঠল। গানটা এখনো বাজছে, অগত্যা ধ্রুবরই বন্ধ করতে হল। ঘরে যে আর কেউ নেই। ঘরের কাজে সাহায্যকারী এক মহিলা আসে

প্রতিদিন ৮ টার পর। শৈবালই ঠিক করে দিয়েছিল ঐ মহিলাকে। ধ্রুব গায়ে দুটো কাপর জড়িয়ে বের হল সবুজ হোটেলের উদ্দেশ্যে। ঢুকতেই বেয়ারা হাজির পরোটা এবং

খাসীর পায়া নিয়ে। টেবিলের ওপর সবকিছু রেখে চলে যেতে চায় বেয়ারা। ধ্রুব আটকায় তাকে।

ধ্রুবঃ খাসীর পায়া ছারা আর কিছু নাই ?

বেয়ারা প্রচন্ড রকম আশ্চর্য হয়।

বেয়ারাঃ স্যার, আফনের শইল ভালা তো ?

ধ্রুবঃ হ্যা, আজকে ভালই আছি।

বেয়ারাঃ না স্যার, আজকে মেলা দিন ফর আফনে আবার কথা কইলেন, আবার কইতাছেন খাসীর পায়া খাইবেন না, তাই একটু ডরায় গেছিলাম।

ধ্রুবঃ আরে আশ্চর্য ? আমি কখন বললাম খাসীর পায়া খাব না ? বললাম আর কি কি আছে সাথে করে নিয়ে আয়।

বেয়ারাঃ জ্বি স্যার, আফনে খারান, আমি এক মিনিটে আইতাছি।

টেবিলের সামনে এখন পরোটা ৪ টিই। কিন্তু সাথে আছে খাসীর পায়া সহ ডিম পোচ, ডাল, আলু ভাজি এবং ফিরনী। সবশেষে এল ধ্রুবর জন্য স্পেশাল বানানো মালাই চা।

দোকানি ধ্রুবকে দেখে মনে করল হয়ত আজই ধ্রুব প্রথম তৃপ্তি সহকারে খেয়েছে। বিল আসল ১৭০ টাকা, বেয়ারার বখশিস সহ ধ্রুব দিল ১৯০ । পয়সাওয়ালাদের

এই এক সমস্যা, বখশিস দেওয়ার সময় হাত খসে কখনো জল পরে না। তাও রেস্তোরার বেয়ারাদেরকে কিছুটা দিলেও, রিকশাওয়ালাদের কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ধ্রুব যদিও তাদের মত না, কিন্তু সেই ৮০ টাকার বিলেও যেমন বখশিস দিত ২০ টাকা, তেমনি ১৭০ টাকার বিলেও ঐ এক ২০ টাকাই দিল। বেয়ারা যদিও তাতেই খুশি। এবং দোকানিও। আজ প্রথম ধ্রুব ৫০০ টাকা নিয়ে বের হয়ে বলার মত কিছু টাকা খরচ করেছে।

তারাতারি করে প্রতিদিনের মত একটি চুরুট ধরিয়ে বাড়ি ফিরল । ঢুকেই তোয়ালে নিয়ে স্নানাগারে প্রবেশ করল । এত সকালে ধ্রুব কোনদিন স্নান সারে না, আর এই শীতের সকালে স্নান যেকোন মানুষের জন্যই দুঃস্বপ্ন অথবা বিরক্তির কারন হবে। কিন্তু ধ্রুব হাসিমুখেই ঢুকল এবং বেরিয়েও পরল। তারপর যতসব দামী কাপর-চোপর থেকে বেছে নিয়ে সাদা শার্ট কালো প্যান্ট পড়ে নিল সে। সাথে ল্যুই ভিতনের বেল্ট পরে ওপরে কালো কোট পরে বেরিয়ে পড়ল নতুন জীবনের উদ্দেশ্যে।

শৈবাল ততক্ষণে অফিসে পৌছে গেছে, আজকে গার্মেন্টসের কিছু ক্লায়েন্ট দেখা করতে আসবে। আর নতুন ইম্পোর্ট-এক্সপোর্ট এর ব্যাবসার  কিছু কাগজপত্রে ধ্রুবর সই দরকার। তাই ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং শেষ করে ধ্রুবর সাথে দেখা করতে যেতে হবে শৈবালের। এইসব চিন্তায় ব্যাস্ত ছিল শৈবাল। তখনই সিকিউরিটি নিচ থেকে ফোন দিল শৈবালকে।

সিকিউরিটিঃ স্যার, একজন ভদ্রলোক আপনার সাথে দেখা করতে চায়, পাঠাব ?

শইবালঃ হ্যা, পাঠাও।

ফোনটা রেখে দিয়ে কিছু কাগজ পত্র নাড়াচারা করছিল শৈবাল। তখনি ” আমার রুম কই ? ” বলে ঝড়ের বেগে কেউ তার  কার্যালয়ে প্রবেশ করে। শৈবাল আরেকটু হলে জ্ঞ্যান হারাত। ধ্রুব যে আজ আসলেই অফিসে এসে হাজির হবে সে কথা শৈবালের কল্পনায় ছিল না। তাই বলা যায় শৈবাল মোটামোটি আকাশ থেকেই পড়েছে। তার ওপর আরেক বিপদ, ধ্রুবর কক্ষটি পরিস্কার করার জন্য কখনোই কাউকে বলে নি শৈবাল, বলবেই বা কেন ? অফিস বানানোর পর তো ধ্রুব কখনোই অফিসে আসে নি, কিন্তু তাও ধ্রুবর এই ব্যাপারটা মাথায় রাখা উচিৎ ছিল। অগত্যা ধ্রুবকে নিজের চেয়ারেই বসিয়ে ধ্রুবর কক্ষ পরিস্কার করতে লোক পাঠাল শৈবাল। ইতোমধ্যে সবারই মালিকের সাথে পরিচয় পর্ব শেষ হল। এবং শৈবালকে বলল আজ থেকে ধ্রুব রোজ অফিস করবে। এমনকি আজকের মিটিং এও থাকবে সে।

কাজকর্ম শিখতে কিছু সময় হয়তো ব্যয় হবে, কিন্তু প্রাশাসনিক ভাবে ধ্রুব ছাত্রজীবন থেকেই দক্ষ। আর ধ্রুবর কাজকর্ম শেখা  খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেখাশুনা করার জন্য শৈবাল আছে, এবং শৈবালের উপর যথেষ্ট ভরসা আছে তার। কিন্তু এখন সে নিজেও দ্বায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিতে চায়, সব চাপ শৈবালের ওপর দেওয়া অন্যায় হবে।

দু কাপ চা নিয়ে শৈবাল আর ধ্রুব আড্ডা দিচ্ছিল, তখন তাদের মধ্যে ঠিক হয় প্রতি সপ্তাহের বন্ধের দুই দিন তারা দুইজন শহরের বাইরে থেকে ঘুরে আসবে। স্মৃতিচারণ করবে। শৈবালের আপত্তি নেই, এইসবে শৈবাল এক পায়ে খাড়া। তো ঠিক হল এই বৃহস্পতিবার রাতে তারা কক্সসবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে। রোমাঞ্ছকর এক যাত্রার পরিকল্পনা চলছে ধ্রুবর মাথায়, আর অন্যদিকে শৈবাল কাজে ব্যাস্ত। শৈবাল খুবই সাধারন থাকতে পছন্দ করে, খুব একটা আদিখ্যেতা তার পছন্দ নয়। সোজাসাপ্টা কথাবার্তা এবং চলেফারেই শৈবালের প্রতিবারের মত প্রিয়। কিন্তু এই শৈবালই যখন ধ্রুবর সাথে অবস্থান করে, তখন অসাধারণ কর্মকান্ড এবং পাগলামি দুটোই সবার দেখার অভিজ্ঞতা হয়।

আড্ডার পালা এখন মোটামোটি শেষ, মিটিং চলছে। ধ্রুব বুঝে গেছে, এগ্রিমেন্ট টা হয়ে যাবে। তাই সে আর মাথা ঘামাচ্ছে না। সে চিন্তা করছে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে। বয়স তার ৩০ হওয়ার আগেই সে কোটিপতি হতে চায়, দুবছরের মধ্যে কোটিপতি হওয়া কিছুটা কষ্টের হবে কিন্তু কষ্ট না হলে আর মজা কোথায় ? কিন্তু আরো মজার ব্যাপার হল ধ্রুব নিজেই জানে না যে সে একজন কোটিপতি। কিছুটা তার বাবার ন্যায়, আর বাকিটা শৈবালের পরিশ্রমে। এটা প্রমান করে যে গত ৩-৪ বছর ধ্রুব ব্যাঙ্কের চিঠিগুলো ছুয়েও দেখে নি। মিটিং শেষে শৈবাল এই আজগুবি ইচ্ছার কথা শুনে প্রায় আধাঘন্টা হাসল। হাসির রেস যেন তার আর কাটছে না। ধ্রুব নিজে জানার পরে সে নিজেও যেন মনে মনে কিছুটা হাসল। কিন্তু পরে দুঃখ টাও বেশি পেল বৈকি। কারন সে নিজের শ্রমে একটি কাজ করার লক্ষ্য স্থির করেছিল। সে কাজটি আপনা আপনি তার পায়ের কাছে এসে ধরা দিল। যাক দুঃখ পেলেও শান্তনা এই যে, টাকা নিয়ে তার আর চিন্তা করতে হবে না।

এখন মাথায় ভুত চাপল একটি ফিল্ম প্রোডাকশন হাউজ খোলার। এই ভুত নতুন কিছু নয়, সৃষ্টিশীল কিছু করার ইচ্ছা ধ্রুবর চিরকালই ছিল। এটা তেমন কোন ব্যাপার না।ধ্রুব নিজেই যদি ডিরেক্টর হয়, বাকিটা হেসে খেলে করে ফেলা যাবে। এক মাসের মধ্যে সব প্রস্তুত থাকবে এই প্রতিজ্ঞা করল শৈবাল।

অফিস থেকে বেরিয়ে এল দুজনেই, দুজনেই দুটো চ্রুট ধরাল। শৈবালের মনে পরে প্রায় একযুগ আগে দুজনে একসাথে হেসেখেলে চুরুট ধরিয়েছিল।

শৈবাল নিজের গাড়ি স্টার্ট দিল, কিন্তু ধ্রুবর আবদার আজকে সে চালাবে। শৈবালের আপত্তি নেই, কিন্তু ধ্রুব গাড়ি চালনায় খুবই ভয়ঙ্কর। সে যাক, যেভাবে চালানোর চালাক। রাস্তায় হঠাৎ মারা যেতে পারে এ নিয়ে শৈবালের চিন্তা ছিল না, শৈবালের চিন্তা ধ্রুবর মা’র মেজবান নিয়ে।

চট্টগ্রামের মেজবান বিশ্ববিখ্যাত। এখানকার আঙ্গুল চাটার মত করে গরুর মাংস আর কোথাও রান্না হয় না। খাওয়া-দাওয়া নিয়ে কোন চিন্তা নেই। চিন্তা আত্মীয়স্বজনদের নেমন্তন্ন করা নিয়ে। গাড়ি চালানো অবস্থায়ই ধ্রুবকে বলল শৈবাল। ” খালাম্মার চল্লিশা নিয়ে চিন্তা করেছিস কিছু ? ”

কথাটি এড়িয়ে যায় ধ্রুব। উলটো শৈবালকেই প্রশ্ন করে বসে ” তুই বিয়ে করবি না ? “।

ধ্রুবর মা’র ওপর ধ্রুবর অনেক আগে থেকেই রাগ শৈবাল তা জানে, কিন্তু মা তো মা। তার ওপর মা এখন আর এই পৃথিবীতে নেই। এখন রাগ করে আর কি লাভ ?

 

(চলবে…)

ধ্রুবর কাহিনি (পর্ব ২)

Now Reading
ধ্রুবর কাহিনি (পর্ব ২)

(প্রথম পর্বের পর…)

তারাতারি করে চলে আসে শৈবাল।
তারপর ধ্রুব বলে আজকে পুরো শহর ঘুরে বেরাবে। এইবার শৈবালের রীতিমত তাজ্জব বনে যাওয়ার অবস্থা। যেই ধ্রুব কিনা সকালের জল-খাবার খাওয়ার জন্য ছাড়া ঘর থেকে বেরহয় না, সেই কিনা শহর ঘুরে বেড়াতে চাইছে ?

কিন্তু অনেকদিন পর ধ্রুব কোন কিছুর ইচ্ছা প্রকাশ করল, শৈবাল তা ফেলতে পারবে না।
৮ টায় দুজন একসাথে ঘর থেকে বের হয়, শৈবাল তার গাড়ি নিয়ে বের হতে চায়, কিন্তু ধ্রুব বারণ করে। তার ইচ্ছা একটা লোকাল বাসে চড়ে বেড়াবে।

শৈবাল আসলে কিছুই বুঝতে পারে না, যে ধ্রুবর মাথায় চলছে টা কি। কথা বেশি না বাড়িয়ে তারা ৬ নং বাসে গিয়ে উঠে। শুরু হয় তাদের যাত্রা। একটু পর পর থামাথামি, বাসের ভেতর সিট নিয়ে মারামারি, হেল্পারের কান ঝালাপালা করে দেওয়া ভাষণ, রিকশাওয়ালাদের চিৎকার-চেচামাচি কিছুই যেন বিরক্ত করছে না ধ্রুব কে। শৈবাল তার মত ধ্যাঁনের জগতের মানুষ নয়। সে বিরক্তবোধ করছে, প্রচন্ড বিরোক্তবোধ করছে। কিন্তু সাড়ে ৪ বছরেরও বেশি সময়ের পর ধ্রুবর মুখে হাসি দেখে পুরোটাই সহ্য করে যায়।
অর্ধেক শহর ঘুরে আসার পর ২ টায় তারা নেয় ভোজন বিরতি। কোন ৫ তারকা হোটেলে নয়, ধ্রুব চাইল মাটির চুলায় রান্না করে ধোয়া উঠানো সাদা ভাত এবং আলু ভর্তা।
এইবার শৈবাল একটু বেশিই ভয় পেতে শুরু করে। আজকে ধ্রুব এমন আজগুবি কর্মকান্ড করছে কেন ? জিজ্ঞাসা করে বসল শৈবাল। ধ্রুবর নিষ্পাপ উত্তর ” জীবন কে উপভোগ করতে চাই। আধমরা হয়ে আর কতদিন ? “। কিছুটা প্রশান্তি আসল শৈবালের মনে। বন্ধু মনে হয় তবে ভাল হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।

আরো আগেই হয়ে যেত, কিন্তু একদিন এক মনোবিদ ডেকে আনায় বাঁশের এক বারিতে ঐ মনোবিদের হবু বাচ্চাদের এতিম করে দিয়েছিল ধ্রুব। বহু কষ্টে ব্যাপারটি সামলাতে হয় শৈবালের।

তখন ধ্রুব প্রতি মুহুর্তে একা থাকতে চাইত। আলো কে ভয় পেত, অন্ধকার কে ভালবাসত। তবে এখন যেহেতু সে নিজে থেকেই তার মানসিক পরিস্থিতি ভাল করার পদক্ষেপ নিচ্ছে আশা করা যায় পদক্ষেপটি সফল হবে।

” কাল থেকে একদম সোজা হয়ে যাব দোস্ত, আজকে শেষ বারের মত গাজা খাব, এক পোটলা নিয়ে আয় না” । ধ্রুবর এই নিরীহ আবদার পছন্দ না হলেও পূরণ করতে হয় শৈবালের। রাতের সাড়ে ১১ টায় গাঁজা সেবন শেষ করে ধ্রুব। বড় বড় স্পীকার দুইটায় এখনো বাজছে এশেজ ব্যান্ডের ” তামাক পাতা ” গানটি। নেশা করার সময় এইটি তার প্রিয় গান। এই গান শুনলে ধ্রুবর পুরান দিনের কথা মনে পরে যায়, যখন ধ্রুব আর শৈবাল একসাথে গাঁজা খেত। পরে শৈবাল সিগারেট ছাড়া সব নেশা জাতীয় দ্রব্য পরিহার করে। শৈবাল এও জানে যে ধ্রুব যতই বলুক, মানসিক পরিস্থিতির উন্নতি হলেও গাঁজা ধ্রুব ছারবে না।
রাত ১২ টা পেরেয়ি যায়, ধ্রুব গান বন্ধ করে ঘুমোতে চেষ্টা করে, কাল থেকে তার একটি সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মত জীবন যাপন করতে হবে। গোছানো বিছানায় আস্তে করে গা এলিয়ে দেয় সে। চোখ বন্ধ করে, কিন্তু ঘুমোতে পারে না।

চোখের বদ্ধ পাতার নিচে, চক্ষুগোলক দুটি নাড়াচাড়া করছে, তাও ঘুম নেই । খুব কঠিন চেষ্টা করার পরেও ব্যর্থ হচ্ছে। তারপরেও চোখের পাতা খোলে নি সে। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

শেষমেশ আর পারল না। উঠে পরতে হল তাকে। অনেক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকা সত্তেও তার ঘুমটা আসল না। মনটাই খারাপ হয়ে গেল, নিজেকে ধিক্কার জানাল সে। সামান্য এই কাজটুকুও সে করতে পারে নি চিন্তা করতেই অগ্নিস্রোত বেরিয়ে আসছিল তার মাথা থেকে। তারপর মনে পরল আরও ছোট একটি কাজ সে সম্পন্ন করতে পারে নি আজও।
অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে ঐন্দ্রিলার ধর্ষনের প্রতিশোধ। এই ভেবে নিজেকে সান্তনা দিলে ধ্রুব।

এখন কি আর করার ? তন্দ্রাকে তো আর ঘুষ দিয়ে বলা যায় না যে আমাকে গ্রাস করে নাও। তাই প্রতিরাতের মতো নিশাচর ধ্রুব আজকেও বেরিয়ে পরল নিশিভ্রমনে। তার এই নিশিভ্রমনের কথা কিন্তু কেউ কোনোদিনও জানতে পারে নি। শৈবালও না। শৈবালের কাছে ধ্রুব কেবল এই কথাটাই গোপন করেছে। গোপন করার মত এমন কোন মহা গুরুত্বপূর্ণ কথা এটা নয়। তবুও মাথা আউলে যাওয়া ধ্রুবর কাছে এই বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও হতে পারে।

ধ্রুবর বয়স এখন ২৮। ১১ বছর আগে সর্বশেষ একসাথে নিশিভ্রমনে বেরিয়েছিল ধ্রুব, শৈবাল এবং আরও কিছু বন্ধু। সেদিন রাতে তাদেরকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছিল, রাত সাড়ে ৩ টায় পথঘাটে বাউন্ডুলেপনা করে বেরানোর দোষে। তারপর থেকে ধ্রুব প্রায় ২ বছর ঘর থেকে বের হয় নি, মিসেস মেজর আটকে রেখেছিলেন।
২ বছর পর যখন প্রথম স্বাধীনভাবে ঘর থেকে বেরিয়েছিল ধ্রুব, তার চেহারা ছিল দেখার মত। পাগলাগারদ, জেল বা রিহ্যাব থেকে ফিরে এলে মানুষের অবস্থা যেমনটা হয় আরকি। মায়াভরা চোখদুটোতে তাকিয়েছিল বন্ধুরা। কতটা বদলে গেলে এই ধ্রুব। দাড়ি উঠে না দেখে যার আফসোস এর শেষ ছিলনা, আজকে তারই মুখভর্তি দাড়ি। কিন্তু মুখে এই নিয়ে টু শব্দটি নেই। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ছারা আর কিছুই করতে পারছিল না শৈবালরা। সেখান থেকে স্বাভাবিক হতেও আরও মাসখানিক চলে যায়।

একটি ট্রাউজার এবং হাতাকাটা গেঞ্জির ওপর চাদর জড়িয়ে ঘর থেকে বের হল। মাথায় এখনও চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, ঘুম কেন আসল না ? এবং কালকে থেকে স্বাভাবিক থাকতে চায় সে।

জায়গাটা এখনও জমজমাট, এত রাত হয়েছে তারপরেও অনেক মানুষ। ধ্রুব সবাইকে পর্যবেক্ষন করা শুরু করল। প্রত্যেকেই
নেশাখোর ছারা আরেকটি মিল হল তাদের সবারই হাত পকেটে। ধ্রুব হঠাৎ আবিস্কার করল তার নিজের হাতদুটিও মুষ্টিবদ্ধ করে পকেটের ভেতরে রাখা। নিজের ওপর আবারও রেগে যায় ধ্রুব। সে চিরকালই চেয়েছিল অন্যান্য মানবজাতির চেয়ে ভিন্ন রূপ ধারণ করতে। কিন্তু এই সামান্য জায়গায়ও সবার ছোট একটি কাজের সাথে তার কাজটিও মিলে গেল। পকেট থেকে হাত বের করেনি। জিঘাংশু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সবার দিকে। সে জানতে চায় কি কারনে সবার হাত পকেটে।

চিন্তায় ডুবে গিয়ে কিছু কারন বের করতে পারল। ১) কেউ শীতের কারনে, ২) কেউ পকেটের ভেতরে টাকা গুনছে, ৩) কেউ ভাবে আছে, ব্যাক্তিত্ববোধ প্রদর্শন করছে এবং ৪) হাতে হাত রেখে ঘুরবার মত কেউ নেই তাই।

এইবার ধ্রুব বুঝতে পারল সেও মোটামুটি সেই ৪ নম্বর কারনেই হাত পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছে। সমস্যা নেই। এতগুলো কারনের
মাঝে কেউ বের করতে পারবে না, ধ্রুব কোন কারনে হাত লুকোচ্ছে । অবশ্য একসময় ধ্রুবরও প্রেমিকা নামক এক বস্তুর মালিকানা ছিল, ২ বছর পর ঘর থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে মৌ নামের ঐ মেয়ের সাথে ধ্রুবর দেখা হয়। মেয়ে ছিল অত্যন্ত ভাল, সুশীল এবং সুন্দরী। তার খারাপ দিক বলতে একটাই ছিল, যে তার বাপের বাড়ি নোয়াখালিতে। বাংলাদেশের সুশীল সমাজ নোয়াখালির লোকজনদের স্বভাবতই একটু বাঁকা চোখে দেখে। দোষটা মৌ’র ছিল না।

সমস্যাটা হত একদম বিয়ের সময়, মেজর সাহেবের পরিবার হয়ত মেনে নেবেন না। শুধুমাত্র তাই। কিন্তু ব্যাপারটা সে পর্যন্ত গড়ায় নি। তার আগেই ধ্রুবকে বিচ্ছেদের বিরহে ভাসিয়ে দিয়ে চলে যায় মৌ।
কারনটা আজও ধ্রুবর অজানা। ধ্রুবর এখনো মনে আছে বাড়িতে মিথ্যা কথা বলে তিশাকে নিয়ে যেদিন নীলগিরি তে যায়, সূর্যাস্তের সময় মৌ’র কোমর জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছিল সে। সেই শেষ স্মৃতি, তার ৫ কি ৬ মাস পরেই তাদের বিচ্ছেদ হয়।

সেদিন সবাইকে ধ্রুব টিক্কা পরোটা খাওয়ালেও, শৈবাল ঠিকই বুঝে নেয় ভেতরে ধ্রুব কাদছে। এখনো তিশার কথা মনে পরলে ধ্রুবর ঠোটের কোণায় হাসি দেখা যায়।

অনেকক্ষণ এক জায়গায় বসে দুই কুকুরের লীলাখেলা দেখছিল ধ্রুব, চোখে বিরক্তির ছাপ নেই। প্রাকৃতিক জিনিসে খারাপ কিছু নেই। মইতুল সবাইকেই সময়ে অসময়ে নারিয়ে দেয়। কুকুররাও তো মানুষই

কিন্তু ধ্রুব রাগান্বিত হয়ে উঠল যখন কুকুররূপি মানুষের পাশে হাজির হয় এক মানুষরূপি কুকুর। সাথে ছিল এক অসহায় নারী। যার ” বাচাও বাচাও” চিৎকার টা যেন শুধুমাত্র ধ্রুবর কানেই যাচ্ছিল। আর কেউ কোনরকম ভ্রূক্ষেপ করছিল না। মুহুর্তের মাঝে ধ্রুবর ভেতরে এক আতঙ্ক দেখা দিল।
ধ্রুবর যেন মনে হচ্ছিল এই নারী তারই বোন ঐন্দ্রিলা। বেঁচে থাকলে হয়তো এতদিনে এমনই দেখতে হতো ঐন্দ্রিলাকে। ধ্রুবর চোখের সামনে বারবার শুধু একটি দৃশ্য ভেসে আসছে। যখন ঐন্দ্রিলা তাকে কাদতে কাদতে বলেছিল, ” ভাইয়া ওরা আমাকে শেষ করে দিল ” । সেখানে বসে বসেই কাঁদছিল ধ্রুব। একটু পর কুকুরগুলোর পাশে গিয়ে দারায় ।

মানুষটার সেদিকে হুঁশ নেই যে কেউ তাদের পাশে এসে দারিয়েছে।  কুকুরগুলোর লীলাখেলার মাঝে একটু বাধা সৃষ্টি করতেই হল ধ্রুবকে। পাশে পরে থাকা কয়েকটা ইটের মধ্যে থেকে একটি ইট নিয়ে তৎক্ষণাৎ ঐ অপরাধী কুকুরটার ভবলীলা সাঙ্গ করে দেয় সে। মাথা ফেটে সব রক্ত গুলো ঝরে পড়ছে সেই নারীর সাদা কাপড়ের ওপর।
দেখে মনে হচ্ছিল হয়ত কোন নার্স হবে। মেয়েটা উঠেই পি.টি ঊষার মত দৌড় লাগাল, দেখে মনে হল আর কোনদিন এই রাস্তা মাড়াবে না এই প্রতিজ্ঞা করতে করতে যাচ্ছে।
ধ্রুবর খারাপ লাগল যে মেয়েটি একবারও ধন্যবাদ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না । কিন্তু সমস্যা নাই। আসল যেই কুকুরদুটিকে ধ্রুব বিরক্ত করেছিল তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিবে বলে পেছন ফেরে দেখে, ঐ বিরক্তিতে তাদের কিছু আসে যায় নি। তারা তাদের নিজের কাজে ব্যাস্ত। তখন আর অপরাধ বোধ হয় না তার। ধ্রুব জানে, কুকুররাও মানুষ, তাদেরও নিজ নিজ কাজে ব্যাস্ত থাকতে হয়। আর আজকে এত বড় একটা পুন্যের কাজ করার পর অপরাধ বোধ হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

অনেকদিন ভারী কাজ না করায়, সামান্য এক ইট উঠিয়েই ক্লান্ত হয়ে পরল ধ্রুব। ব্যায়ামের প্র্যাকটিসে থাকলে এমন হত না, প্র্যাকটিস মেইকস এ ম্যান পারফেক্ট বলে কথা।

(চলবে……)

ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ১)

Now Reading
ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ১)

ভবঘুরে রা এমনই হয়। স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করা, মাথায় কোন দুশ্চিন্তা না রাখা, পাছে লকে কিছু বলবে এমন ভাবনায় সময় নষ্ট না করা তাদের প্রাথমিক কাজ।

ধ্রুব হঠাৎ তাদের দলে নাম লেখিয়েছে। ভোর ৬ টায় ঘুম থেকে উঠে পকেটে ৫০০ টাকা নিয়ে বের হয় প্রতিদিন। ৬ টা পনেরোর মধ্যে সবুজ হোটেলের সামনে গিয়ে দারায়। তারপর ভেতরে ঢুকে সকালের ভোজন শেষ করে। খাসীর পায়া এবং ৪ টি পরোটা ধ্রুবর প্রতিদিনের রুটিন । বেয়ারা সবাই ধ্রুবকে ভাল করেই চিনে।

প্রতিদিন ধ্রুব হোটেলে প্রবেশের সাথে সাথেই তাদের আপ্যায়ন শুরু হয়ে যায়। ধ্রুবর প্রতিদিনের অর্ডার তাদের সবার জানা, তাই জিজ্ঞাসা করে আর সময়  নষ্ট করে না।

মাত্র ৮০ টাকা বিল এবং বেয়ারা কে ২০ টাকা বখশিস দিলে সর্বমোট ১০০ টাকা আসে। তবুও ধ্রুব প্রতিদিন ৫০০ টাকা নিয়ে বেরহয় কেন জানি না। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত গাজা সেবনের কারনে মাথাটা আউলিয়েছে, হয়ত সে কারনেই।

গত পরশু ধ্রুবর মা মারা গেছেন। নিকট আত্মীয়রা বললেন ধ্রুবর চোখে তারা অশ্রুকণা দেখেননি। ৪ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার সময়ও এই বেশ ধরেছিল সে।

এতসব কথা শোনার পর মনে হবে ধ্রুব ছেলেটা এমনই। না হয় মা-বাবা মারা যাওয়ার পরও একটি মানবশিশু এতটা বেখেয়াল কিভাবে থাকে?

ব্যাপারটা আসলে তা নয়, ধ্রুবর চোখের সব জল শুকিয়ে গিয়েছিল বাবা মারা যাওয়ার ৮ মাস আগে। ২০১২ সালের এপ্রিলের ১৩ তারিখ। যখন তার আদরের একমাত্র ছোট বোনটাকে ধর্ষন করে হত্যা করা হয়। পাড়ার কিছু বখাটের কাজ এটা, ধ্রুব ভাল করেই বুঝতে পেরেছিল। ৩ জন কাছের বন্ধু এবং ২ টা চাইনিজ কুড়াল নিয়ে ধ্রুব বেরিয়েছিল তার বোনের আত্মার শান্তির কামনায়। কিন্তু তারা গা ঢাকা দেয়, পুলিশও তাদের কোন হদিস পায় নি। সেদিন থেকে চনমনে ধ্রুব বদলে গিয়ে নিজেকে হারিয়েছে। বোনের ঐ ঘটনাটার পর মা আধমরা এবং বাবা নেই বলা যেতে পারে। ধ্রুবর বাবা বাংলাদেশ আর্মির অবসরপ্রাপ্ত মেজর ছিলেন, ১২ বছর আর্মিতে থাকার পর নিজের কিছু ব্যাবসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছিলেন সর্বত্র।

ধ্রুবর বোন ছিল পড়ালেখার দিক দিয়ে অত্যন্ত মেধাবী, তাকে নিয়ে মিঃ এন্ড মিসেস মেজর এর কোন চিন্তা ছিলনা। তারা জানত, একদিন সে ঠিকই ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার কিছু হয়ে দেখাবে। যত চিন্তা ছিল সব ধ্রুব কে নিয়েই। ধ্রুবকে সবসময় তাড়া করে বেড়াত সৃষ্টিশীল কিছু করার ইচ্ছা । পড়ালেখা নিয়ে টেবিল এবং বইয়ের গন্ডির মাঝে বসে থাকার মত ধৈর্য্য তার ছিল না। কিন্তু ধ্রুবর বোন ঐন্দ্রিলা মারা যাওয়ার পর তার মা-বাবা ধ্রুবকে নিয়ে চিন্তাও ছেড়ে দিয়েছিল। খুব তাড়াহুড়োর মধ্যেই মেজর সাহেব সব বিষয়সম্পত্তি ধ্রুবর নামে করে দিয়ে মারা গেলেন। এবং ধ্রুবর মা, বাপ-মেয়ের কবরের পাশে কাদতে কাদতে।

আর্থিকভাবে যথেষ্ট স্বচ্ছল ছিল ধ্রুবর পরিবার। তখন ধ্রুব ছাড়া ব্যাবসার দেখাশুনা করার মত আর কেউ ছিল না। নারায়ণগঞ্জে বিশাল বড় এক খামার, ঢাকায় একটি ছোটখাট গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি এবং চট্টগ্রামে ২ টা রেস্তোরা ছারাও গ্রামে রয়েছে অনেক চাষের জমি। এসব দেখাশুনা করার জন্য মানসিক প্রশান্তি প্রয়োজন, মানসিক স্তুতি থাকা প্রয়োজন। যা ধ্রুবর ছিল না। তাই মাথা পুরোপুরি আউলে যাওয়ার কিছু আগেই ধ্রুব তার খুব কাছের এক বন্ধু শৈবাল কে নিয়োগ দেয় তার ব্যাবসা সামলাতে।

স্কুলজীবন থেকেই একসাথে ছিল শৈবাল আর ধ্রুব। দুইজন খুবই ভাল বন্ধু। মানিকজোড়ই বলা যায়। কিন্তু শৈবাল এর পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল খুব খারাপ এবং পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় তার উপর ছিল সংসারের হাল ধরার চাপ। ভাগ্য দোষে চট্টগ্রাম বিশ্যবিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হওয়ার ১ বছর পার হয়ে গেলেও কোন চাকরি জোটেনি শৈবাল এর কপালে। তখন ধ্রুব নরম গলায় শৈবালকে তার সব ব্যাবসা-বাণিজ্য দেখাশুনা করার প্রস্তাব দিল। বিনিময়ে মাসিক ৬০ হাজার টাকা বেতন দেবে।

অর্থনীতির এই মন্দাজড়িত অবস্থায় কেউ শুরুতেই এত বিশাল অংকের প্রস্তাব দেয় না। আর বন্ধুকে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া জামিন অযোগ্য অপরাধের আওতায় পরে। শৈবালের মাথায় তখন রক্ত চড়ে বসেছে, এক চরে সে ধ্রুবর ১৬ টি দাঁত ফেলে দিতে চায়। তার শক্ত হাতের উপর তার যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস আছে। কিন্তু একদিকে মানসিক ভারসাম্যহীন ধ্রুব, আরেকদিকে শৈবালের পরিবারের কথা চিন্তা করে শৈবাল রাজি হয়ে যায়। তাকে ৬০ হাজার টাকা দেওয়া ধ্রুবর কাছে কোন ব্যাপারই না, এখন অবশ্য সে ১ লক্ষ পায়। সব মিলিয়ে মাসিক ১৩ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা আয় হয় ধ্রুবর। কিন্তু সে পরিমাণে ধ্রুবর কোন খরচ নেই বললেই চলে।

ধ্রুবকে বাচিয়ে রাখার পেছনেও শৈবালের অনেক অবদান। মাথাটা পুরোপুরি আউলে যাওয়ার পর থেকে জ্ঞ্যান-বুদ্ধি সব হারিয়েছে সে। শৈবালের মত এক বন্ধু পাওয়া ধ্রুবর সৌভাগ্যই বটে । তার খাওয়া পড়া থেকে শুরু করে, প্রতি মাসে এতগুলো টাকা তার ব্যাংকে জমা দেওয়া সব ধ্রুবই করে। আর এই একমাত্র শৈবালের সাথেই ধ্রুব কথা বলে। অন্যথা প্রায় সময় চুপটি মেরে বসে থাকে।

যাই হোক আজকের মত সকালের খাওয়া শেষ করে একটি চুরুট ধরিয়ে বাড়ি ফিরল ধ্রুব। এলোমেলো বিছানার উপর বসে জানালা দিয়ে পাখির গান শুনছিল। ধ্রুব তখনি ফোন দিল। ধ্রুবর ফোনে রিংটোন বাজছে, ” আমার পরান যাহা চায়, তুমি তাই “। গানটা ধ্রুবর খুব প্রিয়, তাই বেশিরভাগ মানুষ তাকে ফোন দিয়ে যোগাযোগ করতে পারে না। ৩ থেকে ৪ বার বাজার পরে ধ্রুব ফোন ধরল। শৈবাল কোনরকম বিরক্তি প্রকাশ ছাড়াই তার সাথে কথা বলা শুরু করল।

শৈবালঃ খালাম্মার চল্লিশার ব্যাবস্থা করতে হবে তো। এতটা বেখেয়ালে থাকিস না। ধ্রুব শুনে চুপ করে বসে থাকে। চোখে মুখে অপরাধী অপরাধী ভাব, কিন্তু মুখে আর কিছু প্রকাশ করে নি।

ধ্রুবঃ বাসায় আয় কাজ আছে। শৈবালকে বলল ধ্রুব। এই অসময় শৈবালকে কখনো দেখা করতে বলে না ধ্রুব, তাই শৈবাল একটু অবাক হয় বৈকি ।
(চলবে……)