প্রতারিতের প্রতারণা

Now Reading
প্রতারিতের প্রতারণা

মোনার ভার্জিনিটি কিংবা অতীতের কোনো ব্যাপার নিয়ে আমার কখনো কোনো মাথা ব্যথা ছিল না। আমি কেবল চেয়েছিলাম ও আমার কাছে আসার পর অন্তত আমাকে নিয়েই থাকুক।

মোনার সাথে আমার প্রথম পরিচয়টা হয়েছিল আমার ক্লাসমেট তপনের গার্লফ্রেন্ড হিসাবে। ওদের মাঝে খুব গভীর সম্পর্কই ছিল একটা সময়। একাধিকবার সেটা একই বিছানা পর্যন্তও গড়িয়েছে। আমি সবই জানতাম। ওদের মাঝে কখনো ঝগড়া হলে সেটা আমাকেই মিটিয়ে দিতে হতো। তপন কখনো রাগ করলে মোনা আমাকে ফোন দিয়ে জ্বালাতো ওর রাগ ভাঙিয়ে দেওয়ার জন্য। এভাবে মোনার সাথে আমার একটা ভালো বুঝা পড়াও তৈরি হয়েছিল। অনেকটা ভালো বন্ধুর মত সম্পর্ক। তবে আমরা একে অপরকে শ্রদ্ধার চোখেই দেখতাম। আমি তপনকে বন্ধু বলে সম্বোবন করিনি কারণ ও পরবর্তীতে যা করেছে তারপর তাকে আর বন্ধু বলতে ইচ্ছা হয় না। ও একটা সময় মোনার সাথে প্রতারণা করে অন্য একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। মোনা অনেক অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছিল। প্রায়শই আমাকে ফোন দিয়ে কাঁদতো। আমি মোনাকে বলেছিলাম তপনের জন্য আর কষ্ট না পেয়ে তোমাকে সত্যিকারভাবেই ভালোবাসবে এমন কাউকে তোমার সঙ্গী বানিয়ে নাও। কিন্তু ও অন্য কোনোদিকে আর মনযোগ দিতে পারছিল না। এর এক মাসের মাথাতে তপন ওর নতুন প্রেমিকার কাছে প্রতারিত হয়ে আবার মোনার কাছে ফিরে আসতে চেয়েছিল কিন্তু মোনা এক্সেপ্ট করেনি আর ওর মত প্রতারককে। একটা সময় মোনা নতুন আরেকটা সম্পর্কে জড়িয়ে যায় কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেখান থেকেও প্রতারিত হয়। মোনার সেই সম্পর্কটাও বিছানা পর্যন্ত গড়িয়েছিল। এবার মোনা আমাকে বলছিল যে সে ছেলেদের উপর থেকে পুরোপুরি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। আমার নিজেরও আসলে বলার কিছু ছিল না। সত্যিকারভাবে ভালোবেসেও এভাবে যখন দুইজনের কাছে প্রতারিত হয় তখন আসলে আমি ছেলেদের পক্ষ নিয়ে আর কিছু বলতে পারি না। এসবের পর থেকে মোনা কেবল আমার সাথেই মাঝে মাঝে কথা বলতো। কিছুদিনের মাঝে ও আমাকে ওর জীবন সঙ্গী বানানোর প্রস্তাবও দেয়। আমি না করতে পারিনি। আমিতো জানতাম আমি কেমন। আমার মাঝে যে খারাপ কিংবা প্রতারণা করার কোনো মানসিকতা ছিল না তাতো আমিই ভালো জানতাম। এদিকে মোনা পরপর দুই দুইজন ছেলের কাছে মারাত্মকভাবে প্রতারিত। আমি আর চাইছিলাম না ছেলেদের নিয়ে ওর মাঝে কোনো বাজে ধারণা তৈরি হোক। তাছাড়া ও নিজেও মেয়ে হিসাবে অনেক ভালো ছিল। সব মিলিয়ে আমি ওকে না করতে পারিনি। তবে কেবল কয়েকটা কথা বলেছিলাম, “মোনা আমি তোমার সকল অতীত জানি। তুমি যে ভার্জিন না সেটাও জানি। কিন্তু আমি তোমাকে গ্রহণ করবো ভার্জিন ভেবেই। আমার কেবল অনুরোধ এই ভার্জিনিটা কখনো নষ্ট করো না। তোমার অতীত নিয়ে আমি কখনো তোমায় ছোট করবো না। কেবল আমার কাছে আসার পর এমন কিছু করো না যা আমাকে কষ্ট দিবে, প্রশ্নবিদ্ধ করবে তোমার সততাকে, তোমার সতীত্বকে।”

মোনা আমার কথা মেনে নিয়েছিল কোনো দ্বিধা ছাড়াই। না মানারও কোনো কারণ ছিল না। অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়েছিল। কেননা আমি ওকে যথেষ্ট সৎ হিসাবেই দেখেছি।
সম্পর্ক আমাদের ভালোই চলছিল। আমার বাসা ছিল উত্তরাতে, আর মোনার বারিধারায়। ফ্রি থাকলে প্রায়শই দুজনে ঘুরতে বেরুতাম। ভালোই চলছিল সব মিলিয়ে। একদিন আমি সারাদিন ফ্রি ছিলাম। মোনাকে আগেরদিন বলে রেখেছিলাম যে ও ফ্রি থাকলে যেন সারাদিন আমার সাথে থাকে। ওকে নিয়ে ঘুরবো কোথাও অনেক। ও বলেছিল ফ্রি থাকবে এবং ঘুরবে আমার সাথে। হুট করে সেদিন সকালে আমাকে জানালো ওর নাকি বারোটা থেকে একদম বিকাল পর্যন্ত ক্লাস। আগেরদিন নাকি রুটিন দেখতে ভুল হয়েছিল। কী আর করার, ঘোরাঘুরির জন্যেতো আর ক্লাস মিস দেওয়া যায় না। ও নিজে মিস দিতে চাইলেও আমি দিতে দিতাম না। কিন্তু তাতে কী? মনতো খারাপ হয়েছিল ঠিকই। সারাটাদিন বাসাতেই কাটিয়ে দিব বলে মনস্থির করে বসে ছিলাম। দুপুরের দিকে হঠাৎ আমার বেস্ট ফ্রেন্ড অর্ণব ফোন দিয়ে বলে, “দোস্ত, আজতো সারাদিন ফ্রিই আছি আমরা। চল ঢাকার ভেতরেই কোথাও ঘুরে আসি।”

আমি একা একা বোর ফিল করছিলাম বলে রাজী হয়ে যাই।” ওর বাইকে করে আমাকে বাসা থেকে পিক করে নিয়ে যায় ও। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম মিরপুরের দিকে কোথাও ঘুরবো। মিরপুরে পৌঁছে প্রথমে বললো যে চল কিছু খেয়ে নিই। খাওয়ার জন্য একটা ফাস্টফুডে ঢুকি। ঢুকার কিছক্ষণ পরেই মূলত আমি প্রথম শকটা খাই। দেখলাম যে মোনা একটা ছেলের হাত ধরে সেই ফাস্টফুডেই ঢুকলো। গিয়ে বসেছিল অন্য পাশের এক কোণায়। আমাদের খেয়াল করেনি। আমার ভেতরটা পাথরের মত হয়ে গিয়েছিল। আমি কিছু ভাবতে পারছিলাম না। এক পলকে কেবল সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম। আর অর্ণবও বিষয়টা দেখতে পেয়ে শকড হয়েছিল। আমরা যা খেতে শুরু করেছিলাম তা সেখানেই সমাপ্ত হয়ে যায়। আমার পক্ষে আর কিছু ভেতরে ঢুকানো সম্ভব ছিল না। কী কারণে যেন অর্ণবও আর কিছু মুখে নেয়নি। হতে পারে পরিস্থিতির বিবেচনায়। ও বারবার বলছিল আমাদের উঠে চলে যাওয়া উচিৎ। কিন্তু কেন যেন আমার মুখ থেকে কোনো কথা বেরুচ্ছিল না। আমি কেবলই এক পলক চেয়ে ছিলাম মোনার দিকে। আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। বারবার প্রার্থনা করছিলাম যেন আমার এ দেখা ভুল হয়। এভাবে আধঘন্টা কাটানোর পর হঠাৎ দেখলাম মোনা আর সেই ছেলেটি উঠলো এবং বেরুলো। আমিও একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে পিছে পিছেই বের হলাম। মোনা সেই ছেলেটির হাত এমনভাবে ধরে হাটছিল যে দেখতে পাচ্ছিলাম সেটি মোনার বিশেষ কোনো জায়গায় গিয়ে বারবার লাগছিল। এরপর তারা একটা রিকশায় উঠলো। মোনা ছেলেটির বামপাশে বসলো যেভাবে আমিও ওকে সবসময় আমার বামপাশে বসাতাম। রিকশার প্যাডেলে চাপ পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে মোনা রিকশাচালকে বললো হুড উঠিয়ে দিতে। এরপর রিকশা চলতে শুরু করলো। আমি দেখতে পেলাম ছেলেটির একটি হাত মোনাকে পেছন দিক দিয়ে পেচিয়ে ধরে সেটা এমন জায়গায় গিয়ে স্থির হলো যেখানে আসলে হওয়ার কথা নয়।

হঠাৎ পাশ থেকে শোনলাম অর্ণব কাউকে ফোন দিয়ে আমরা যেখানে ছিলাম সেখানে আসতে বলছে। এরপর আবার ফাস্টফুডটাতে ঢুকলাম। মিনিট বিশেক বসার পর অর্ণবের এক বন্ধু আসলো, আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল নাম আফসান। অর্ণব তিনটা সফট ড্রিংক অর্ডার করলো। আমি খেতে চাইলাম না। কিন্তু অর্ণব চোখ পাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করায় অল্প একটু খাওয়ার চেষ্টা করলাম। আমারটা অর্ধেকের বেশি খালি থাকতেই ওরা শেষ করে ফেললো। এরপর অর্ণব বললো চল উঠি। বাইরে বের হয়ে অর্ণব ওর ফ্রেন্ডকে বললো বাইকটা নিয়ে একদিনের জন্য তার কাছে রাখতে। আমি কিছুই বুঝছিলাম না আবার জিজ্ঞেসও করতে ইচ্ছা করছিল না। অর্ণব তাকে আরো কিছু বলার পর অর্ণবের বন্ধুটি বাইক নিয়ে চলে গেলো। এরপর অর্ণব একটি সিএনজি ডেকে একদম উত্তরা পর্যন্ত ঠিক করলো। সিএনজিতে উঠার পর আমাকে বললো, ” তর এই মানসিক অবস্থায় তোকে বাইকের পেছনে বসিয়ে নিয়ে যাওয়ার সাহস হচ্ছিল না। তাই সিএনজি নিলাম।”

আমি অর্ণবের এমন ভাবনায় অনেকটা অবাক হলেও কিছু বলিনি। কী বলবো? আমি যে একরকম অনুভূতি শূণ্য হয়ে পড়েছিলাম তখন। আসার পথে কোনো কথা হয়নি আমাদের। যে অর্ণব একটা মুহূর্ত চুপ থাকতো না সেই অর্ণব সিএনজিতে বসে সেদিন একটা কথাও আর বলেনি আমার সাথে। এর মাঝেই ও মোনাকে একবার ফোন দিয়েছিল। লাউডস্পিকারেই বলেছিল কথাগুলো। কথোপকথনটা ছিল অনেকটা এরকম-

“হ্যালো মোনা, আমি অর্ণব বলছি।”
“জ্বি বলেন ভাইয়া।”
“তুমি আর কখনো প্রলুকে ফোন দিও না। এমনকি তার সামনেও এসো না।”
“হঠাৎ এ কথা বলছেন কেন? কী হলো? আচ্ছা যাই হোক, আমার এখনি একটা ক্লাস শুরু হবে, আমি ক্লাস শেষে ফোন দিব আপনাকে।”
“এখন আবার কোন ক্লাস? একটু আগে না মিরপুরে একটা ফাস্টফুডে বসে ভুজনের একটা ক্লাস করলে, তারপর সেখান থেকে বের হয়ে রিকশায় হুড তুলে না আরেকটা ক্লাস করলে ভ্রমনানন্দের? এখন কোন ক্লাস আবার শুরু হচ্ছে এটা? শারীরিক শিক্ষা ক্লাস?”

অর্ণব এটুকু বলতেই মোনা কেটে দিয়েছিল। এবারও কেমন যেন এক অদ্ভুত কারণে আমার মাঝে কোনো অনুভূতি হচ্ছিল না। অর্ণবও আর কিছু বলছিল না আমাকে। সিএনজি উত্তরায় প্রবেশ করার পর অর্ণব হঠাৎ ড্রাইভারকে বললো দিয়া বাড়ি নিয়ে যেতে। আমি এবারও অবাক হলেও আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। দিয়া বাড়ি যাওয়ার পর অর্ণব আমাকে একটা নির্জন জায়গায় নিয়ে গিয়ে বসালো। কিছুক্ষণ পর ও আমাকে বলতে শুরু করলো, “একজন প্রতারকের জন্য নিজেকে কখনো কষ্ট দিস না। একজন বেইমান কৃতঘ্নের জন্য নিজেকে কখনো কষ্ট দিস না। যে মানুষটা তোকে কষ্ট দিতে কষ্ট পেলোনা তার জন্য নিজেকে কখনো কষ্ট দিস না। আমি জানি তোর ভেতরটা পুড়ে ছাড়খার হয়ে যাচ্ছে, অসহ্য রকমের কষ্ট হচ্ছে। তবে এ কষ্টটুকু ছাড়া তুই নিজে নিজেকে আলাদা কোনো কষ্ট দিস না, নিজের কোনো ক্ষতি করিস না। তপন মোনার সাথে প্রতারণা করার পর যে কথাগুলো তুই মোনাকে বুঝিয়েছিলি সেসব তুই নিজেকে বুঝা।”

অর্ণবের কথা চলার মাঝেই খেয়াল করলাম আকাশটা কালো অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে। এখনো সন্ধ্যা হতে আরো ঘন্টাখানেক বাকি, তারমানে বৃষ্টি হবে।
অর্ণব আবার আমাকে বলতে শুরু করলো, “এই যে দেখছিস পরিষ্কার আকাশটা হঠাৎ কালো হয়ে গেলো, এটাকে তুই তোর নিজের সাথে তুলনা কর। মনে কর আকাশটা গভীর কোনো কষ্টে হঠাৎ কালো হয়ে গেছে যেমনটা তর আনন্দঘন মনটা হঠাৎ করে মোনার প্রতারণায় দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে কালো হয়ে গেছে। আকাশটা কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি ঝরিয়ে তার সেই গভীর কষ্টটাকে ঝেড়ে ফেলে আবার পরিষ্কার হয়ে যাবে। ঠিক তেমনিভাবে তুইও বৃষ্টির সাথে কেঁদে কেঁদে তর দুঃখটাকে ঝেড়ে ফেলে নিজের ভেতরটা আবার পরিষ্কার করে ফেলবি। প্রয়োজনে মাঝে মাঝে চিৎকার করবি জোরে জোরে যেমনটা আকাশ মাঝে মাঝে করে বজ্রপাত ঘটিয়ে।”

অর্ণবের কথা শেষ হতে না হতেই বৃষ্টির ফোটা পড়তে শুরু করলো। এবার অর্ণব আমায় উচ্চস্বরে বলতে শুরু করলো, “প্রস্তুতি নে প্রলু, কাঁদার প্রস্তুতি নে! অনেক জোরে জোরে কাঁদার প্রস্তুতি নে। দেখিস, তর ভেতরটা হালকা হয়ে যাবে, অনেক হালকা হয়ে যাবে।”

বৃষ্টি আসতে শুরু করায় আশপাশের লোকজন চলে গিয়েছিল। পুরো এলাকাটা তখন খালিই বলা চলে। দূরে দেখতে পাচ্ছিলাম কয়েকটা ছেলে উল্লাসে বৃষ্টিতে ভিজতে শুরু করেছে। আমি চোখটা বন্ধ করলাম। কল্পনা করলাম আজকের দেখা দৃশ্যগুলো। কাঁদার চেষ্টা করলাম। চলে আসলো কান্না। বৃষ্টির তীব্রতার সাথে সাথে আমার কান্নার তীব্রতাও বেড়ে চললো। এক পর্যায়ে অনেক জোরে জোরে চিৎকার করেও কাঁদলাম। অনেক কাঁদলাম, অনেক!

এরপর সেদিন কাকভেজা হয়ে যখন বাসায় ফিরি তখন সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত হয়ে গিয়েছিল। অর্ণবও আমার সাথে এসেছিল সেদিন আমাদের বাসায়। যে অর্ণবকে অনেক জোরাজুরি করেও বাসায় রাতে রাখা যেত না সে অর্ণব সেদিন নিজে থেকেই থেকেছিল রাতে। আমার ভেতরটা সত্যিই অনেক হালকা লেগেছিল সেদিন। অনেক কান্নার পর মনে হয়ছিল অনেক বড় একটা বোঝা নেমে গেছে দেহ থেকে। রাতে তাড়াতাড়িই ঘুমিয়েছি। সকালে যখন উঠি তখন অনেক তরতাজা মনে হচ্ছিল। ক্লাস ছিল, অর্ণব তার সাথে করেই আমাকে ক্লাসে নিয়ে গিয়েছে। পুরো একটা দিনের মাঝেই আমাকে অর্ণব সেই আগের মত বানিয়ে ফেলেছিল।

অর্ণবের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এখনো মনে হলে ভয়ে চুপসে উঠি যে সেদিন যদি অর্ণব না থাকতো তবে কী হতো আমার? আসলে বন্ধুদের চেয়ে আপন কেউ হয় না। আবার সবার ভাগ্যে এমন বন্ধুও জোটে না।

ও হ্যাঁ, মোনার কী হয়েছিল এরপর জানতে ইচ্ছা করছে? আসলে আমি ওর আর কোনো খবরই রাখিনি। ও নিজেও আমাকে কখনো ফোন দেয়নি, হয়তো অর্ণব ওকে অনেক কিছু বলে দিয়েছে পরে আরো। ফোন দেওয়ার সাহস করে উঠতে পারেনি হয়তো। ওর ব্যাপারে কখনো আমার কিছু জানতেও ইচ্ছা হয়নি। একদিন অনেক দূর থেকে ওকে চোখে পড়েছিল, আমি সাথে সাথেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে ভালো মানুষের মত বলতে ইচ্ছা করে, “ও যেখানেই থাকুক, যেভাবেই থাকুক, ভালো থাকুক।” কিন্তু ইচ্ছা করলেই যে সব হয় না। আমি পারি না ওভাবে বলতে। আবার ওর জন্য কোনো খারাপ প্রার্থনাও করি না। তবে আমি জানি, ও ওর কৃতকর্মের প্রাপ্য শাস্তি কখনো পেয়েছে এটা শুনলে আমার অনেক আনন্দ হবে। অনেক!!! এবং আমি এও জানি, এই আনন্দটা একদিন আমি পাবোই। কারণ, Law of Nature বলে যে একটা ব্যাপার আছে!

ফেসবুকে লেখক: Rihanoor Protik

আমার উনি

Now Reading
আমার উনি

“এই যে ম্যাডাম, শুনছেন?”
“জ্বি বলুন।”
“কী বলবো?”
“আপনি কী বলবেন তা আমি কী জানি?”
“আমি কি আপনাকে বলেছি যে কিছু বলবো?”
“তো ডাকলেন যে?”
“ডাকলাম কোথায়? আমিতো কেবল জিজ্ঞেস করেছি আপনি শুনছেন কিনা।”
“আমি শুনছি কিনা তা জেনে আপনার কী হবে?”
“আসলে আপনার কান ঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করতেই জিজ্ঞেস করেছি শুনছেন কিনা।”
“অদ্ভুত! আমার কান ঠিক থাকলেই আপনি কী করবেন?”
“এটা একটা প্রশ্ন বটে। আসলেইতো কী করবো আমি?”
“আপনিই বলুন না কী করবেন।”
“যাক বাবা, ভুলে গেছি। মনে হলে অন্যদিন বলবো। আজ চলি।”
“হা হা হা! অদ্ভুত আপনি। ভীতুর ঢেঁকি। আচ্ছা, যান তাহলে আজ। আমিও চলি।”

কোনমতে চলে এসেছিলাম সেদিন। আসলে আমি গিয়েছিলাম ওকে প্রপোজ করতে। ‘ওকে’ করে কেন বলছি? আমি কি তার নাম জানি না? সারাদিনইতো তার নাম আওড়াতাম। এখন ‘ওকে’ করে কেন বলছি? উফ! তার নাম ভুলে গেছি আমি! এমন কেন হলো? তার নামইতো আমার বেশি মনে থাকার কথা অথচ তার নামই এখন ভুলে গেলাম? নাহ, ব্যাপারটা মানা যায় না। অবশ্য না মানা গেলেও করার কিছু নেই। যেই গুরু, সেই কাউ।

ওকে ডাক দেওয়ার সাথে সাথে যখনি ঘুরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে হা করে তাকিয়েছিল আমার মনে হয়েছে আমি আর আমি নেই। আমি কোনো এলিয়েন হয়ে গেছি। আমার হৃদপিন্ডটা কোনো এক বিশেষ পদার্থে তৈরি যার ভর এক মণেরও বেশি। ধড়াম ধড়াম শব্দে এটি স্পন্দিত হচ্ছে যার শব্দ আমার কান ছাপিয়ে তার কানেও মনে হয় চলে যাচ্ছে। আমার মস্তিষ্কের বিশেষ অংশে ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেছে। স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। তাকে প্রপোজ করার কথা ভুলে গেছি। আমার দেহের ভেতর কোথাও শর্ট-সার্কিট হয়েছে, যার দরুণ আমার দেহের বাইরে ঘাম নামক বিন্দু বিন্দু পানির কণা জমছিল। শুনেছি ঘাম নামক এই পানির কণার স্বাদ নাকি নোনতা। কখনো চেখে দেখা হয়নি। সেই সময় একটু চেখে দেখা যেত। অবশ্য সেই সময় আমার জিহবাটা কাজ করতো কিনা সন্দেহ ছিল। শর্ট সার্কিটের কারণে জিহবার ইলেক্ট্রিসিটির লাইনটাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কিনা কে জানে। শরীরটাও বেশ দুর্বল লাগছিল। মনে হচ্ছিল দেহের পাওয়ার প্লান্টে গোলমাল হয়েছে। যেকোন সময় বিস্ফোরিত হয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারি। অবশ্য মনে মনে তাই চাইছিলাম যেন বিস্ফোরিত হলেও অন্তত তার চোখের সেই দৃষ্টির বাইরে যেতে পারি। তবে ভাগ্য ভালো দেহের অক্সিলিয়ারি পাওয়ার সিস্টেম দ্রুত চালু হয়ে কোনোভাবে আমাকে সেই অবস্থা থেকে বাঁচিয়েছিল।

তবে একটা প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর এখনো আমি পাচ্ছি না। সে আমাকে ভীতু কেন বলেছিল? কয়েকদিন আগে কুকুরের দৌড়ানি খেয়ে তার সামনে দিয়েই পালিয়েছিলাম বলে? এতে ভীতু ভাবারতো কোনো কারণ নেই। তাকে কুকুর দৌড়ানি দিলে সে কি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতো? তাহলে কেন ভীতু বললো? আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে তাকে প্রপোজ করতে গিয়েছিলাম এটা সে বুঝতে পেরেছে? যদি বুঝতেই পেরে থাকে তাহলেতো এটাও বুঝে ফেলেছে যে আমি আর ভয়েই প্রপোজ করিনি পরে। ইশ! কী লজ্জা! এখন আমি ওর সামনে আবার যাবো কিভাবে? আমাকে আশেপাশে দেখলেই বা সে কী ভাববে? ছোটবেলায় একবার কুকুরের কামড় খাওয়ার পর থেকেই কুকুরকে আমি ভীষণভাবে এড়িয়ে চলি। দেখলেই ভয় করে। এখনতো মনে হচ্ছে তার কামড় না খেয়েও তাকে আমার এড়িয়ে চলতে হবে। হয়তো দেখলে ভয় পাবো না, কিন্তু যে লজ্জাটা পাবো তা কি যেকোনো প্রকার ভয়ের থেকে বেশি নয়? বুঝেছি আমার এ জীবনে তাকে আর প্রপোজও করা হবে না, পাওয়াও হবে না। আমার পিউর লাভের এভাবে সমাপ্তি খুবই বেদনাদায়ক। যাই, এবার একটু ঘুমুই। কাল থেকে তাকে এড়িয়ে চলার প্রস্তুতি নিয়ে চলতে হবে।

“এই যে মিস্টার, এতদিন কোথায় ছিলেন? আমার কান ঠিক থাকলে আপনি কী করবেন তা এখনো মনে হয়নি?”

যাক বাবা, ধরা খেয়ে গেলাম। এতো প্রস্তুতি নিয়ে এড়িয়ে চলেও কোনো লাভ হলো না। কিন্তু এখন আমি কি উত্তর দিব? আর আজ যদি কোনো উত্তর না দিই তাহলেতো ও আমাকে পেলেই এটা জিজ্ঞেস করবে আর আমি প্রতিনিয়ত লজ্জার চুকা কামড়ে লাল হবো। উফ! দেরি হয়ে যাচ্ছে। এখনি কিছু একটা উত্তর দিতে হবে। খোদা, আজ একটু সহায় হও। আজ যেন আর এলিয়েন না হই, পাওয়ার সাপ্লাইয়েও যেন আর গন্ডগোল না হয়।

“ইয়ে মানে……ইয়ে মানে আরকি ইয়ে…”
“কিসব ইয়ে ইয়ে করছেন? আমি ইয়ো ইয়ো সং শুনতে আসিনি। কান ঠিক থাকলে কী করবেন সেইটাই বলুন।”
“আসলে হয়েছে কি আপনার কানটা অনেক সুন্দর। ওটা ঠিক আছে কিনা তাই জানতে ইচ্ছা হয়েছিল।”
“কান সুন্দরের সাথে ঠিক আছের কী সম্পর্ক?”
“যেমন ধরুন অভিনেত্রী সারিকা, ওর চেহারাটা কত সুন্দর অথচ কন্ঠটা কেমন ঘেড়ঘেড়ে। তাই ভেবেছিলাম আপনার এতো সুন্দর কানেও কোনো ঘেড়ঘেড়ে সমস্যা আছে কিনা।”
“কানে আবার কীরকম ঘেড়ঘেড়ে সমস্যা থাকে?”
“ইয়ে মানে হতে পারে না যে আমি খুব সুন্দর কন্ঠে কথা বললাম অথচ আপনি সেটা ঘেড়ঘেড়ে কন্ঠে শুনলেন কিংবা একেবারেই শুনলেনও না, আই মিন বয়রা, হতে পারেন না?”
“কী!!! আপনি আমাকে বয়রা বললেন? আপনার বাড়িতে আজ বিচার দিব।”
“না না, আপনাকে আমি বয়রা বলিনি। আপনি বয়রা হলে কি আমাকে আজ এভাবে উন্মুক্ত জেলখানায় বন্দী হয়ে জেরায় পড়তে হতো?”
“ওতসব আমি বুঝি না। এক হয় এবার আসল সত্যটা বলুন, নাহয় আমি আপনার বাড়িতে গিয়ে বিচার দিব যে আপনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের সুন্দর কান খুঁজেন। খুঁজে পেলে সেটা ঠিক আছে কিনা জানার জন্য রাস্তার মাঝেই ডাকও দেন।”

ফাইস্যা গেছি, পুরা মাইনকা চিপায় ফাইস্যা গেছি। খোদা, আমার বুদ্ধিটা একটু খোলে দাও। সত্য না বলে এবার উপায় নাই। পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানোর চেয়ে সত্য বলে দেওয়াই ভালো হবে। আর এমন সুযোগ দ্বিতীয়বার আসবেও না। এইতো আমার বুদ্ধি খুলতে শুরু করেছে। এবার তাহলে আরেকটু ভাবি। সেদিন যেভাবে আমাকে ভীতু বলেছে তার মানে ও জানে আমি তাকে প্রপোজ করতে চাচ্ছি। আর জানার পরেও ও যেহেতু আজ নিজেই আমাকে ডেকেছে তার মানে ও চায় আমি তাকে প্রপোজ করি। আর ও যেহেতু চায় আমি তাকে প্রপোজ করি এর অর্থ বেশিরভাগ সম্ভব ও রাজী। মেয়েদের বুক ফাটেতো মুখ ফাটে না স্বভাবের কারণেই হয়তো ও সরাসরি কিছু বলতে পারছে না, আমাকে দিয়েই বলাতে চাচ্ছে। সুতরাং সমস্যা সব ডিশমিশ। এবার প্রপোজটা করেই ফেলি। তবে একটু ভিন্নভাবে করলে কেমন হয়? উইল ইউ মেরি মি কিংবা তোমাকে পছন্দ করি ভালোবাসি কমন হয়ে গেছে, কেমন ক্ষ্যাত ক্ষ্যাত লাগে! একটু ভিন্নভাবে এপ্রুচটা নিই। কান নিয়েই যেহেতু কথা হচ্ছে তাই কান দিয়েই প্রপোজ করি।

“এই যে মিস্টার…, এতো কী ভাবছেন? সত্য বলতে ভয় হচ্ছে? আজ কোনো ভয় টয় মানবো না। এক হয় সত্য বলবেন নাহয় বাড়িতে বিচার যাবে, হু, বলে রাখলাম।”
“আচ্ছা বলছি।”
“হু, বলেন।”
“আপনার ওই সুন্দর কান দুটোকে, মধ্যরাতে, ফিসফিসিয়ে কথা শোনাতে চাই, এবং তা বাকিটা জীবনের প্রতিটা দিনের জন্য। দিবে আপনার কানটা ওই অধিকারটুকু?”
“কানকেই জিজ্ঞাসা করুন।”
“কানতো বলতে পারে না, কেবল শুনতে পায়।”
“তবে কান কথা শুনে সে কথা যাকে পৌঁছে দেয় তাকে জিজ্ঞাসা করুন।”
“কানতো কথাটুকু শুনে নিজের কাছে রেখে দেয়নি। যাকে পৌঁছে দেওয়ার তাকে ঠিকই দিয়েছে। তবে সে কেন উত্তর দিচ্ছে না?”
“তাকে সরাসরি একবার জিজ্ঞেস করেই দেখুন না উত্তর দেয় কিনা।”
“আচ্ছা মেয়েতো বাবা!”
“হুম, আমি আচ্ছা মেয়েই। এখনো সময় আছে ভেবে দেখার। সময় থাকতে সাবধান।”
“যা ভাবার অনেক আগেই ভাবা হয়ে গেছে। এখন আর নতুন করে কোনো ভাবাভাবি হবে না। আচ্ছা, বলছি।”
“হুম, বলুন।”
“বাকীটা জীবনের প্রতিটা মধ্যরাতে আপনার কানে ফিসফিসিয়ে কথা বলার অধিকারটুকু দিবেন আমায়?”
“উফ! কী ক্ষ্যাত! আপনি করে বলে! আপনি করে বললে দিবো না।”
“ওরে বাবা! এ কার পাল্লায় পড়লাম! আচ্ছা তুমি করে বলছি।”
“কার পাল্লায় পড়েছেন পড়ে বুঝাবো। এবার বলুন।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করলাম, “বাকীটা জীবনের প্রতিটা রজনীর মধ্যাংশে তোমার কানে ফিসফিসিয়ে লজ্জা নম্রত কন্ঠে কথা বলার অধিকারটুকু দেবে আমায়?”

এরপর ওর উত্তর কী হয়েছিল তা বোধ করি না বললেও চলবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সেই যে ওর নাম ভুলেছি আর মনে পড়েনি। ওকে যে জিজ্ঞেস করবো সে উপায়ও নেই! জিজ্ঞেস করলেই নিশ্চিত বারোটা বাজাবে। সম্পর্ক হতে না হতেই তা হুমকীর মুখে পড়বে। আবার আমি চাইলেই অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে ওর নামটা জেনে নিতে পারি। ও হয়তো জানবে না ওর নাম ভুলে যাওয়ার ব্যাপারটা, কিন্তু আমি মনে করি আমার ভেতর ওর যে সত্তাটুকু আছে তাকে অপমান করা হবে। আমি ওর নাম ভুলে গিয়ে অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছি তা কেমন করে হয়? ওয়েট! ওয়েট!! আমার ফোনেইতো ওর নাম আছে। ওর নামে কয়েকটা কবিতা লিখেছি, সেগুলো ওপেন করলেইতো কবিতার মাঝে ওর নাম পাবো। কিন্তু না, আমি এটাও করবো না। আমি জানি ওর নামটা আমার মনের কোথাও না কোথাও আছে। হয়তো আমার সাথে লুকোচুরি খেলছে। তবে ধরা এক সময় ঠিকই পড়বে। কিন্তু ততদিন? ততদিন ওকে মনে মনে কী নামে ডাকবো? “ও” কেমন হয়? আই মিন “আমার ও”। না না, এটার চেয়েও আরেকটা আদুরে নাম দেওয়া যায়। “উনি”। রুনি, মুনি, ভুনি কত নামইতো হয়। আমি নাহয় আপাতত মনে মনে ওকে “উনি” বলেই ডাকলাম।

ফেসবুকে লেখক: Rihanoor Protik

ইংরেজি ভীতি আর নয়!

Now Reading
ইংরেজি ভীতি আর নয়!

কিছুদিন আগে আমাদের এক উদ্বোধনী ক্লাসে একজন অতিথি একটা ঘটনা বর্ণনা করছিলেন এমন যে তিনি একদিন কোনো এক ফাইভ স্টার হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কের পাশে বসে ছিলেন। এমন সময় একজন কোরিয়ান মহিলাকে হন্তদন্ত হয়ে ফ্রন্ট ডেস্কে ছুটে এসে বলতে দেখলেন- “Camera in, door closed, me out, camera go.”
অনেকে হয়তো ইতোমধ্যেই হাসতে শুরু করেছেন। হাসুন আর যাই করুন, একবার বলুনতো এখানে মহিলাটি যা বুঝাতে চেয়েছিল তা কি আমরা সবাই বুঝিনি? আশা করি সবাই বুঝেছি এবং সেদিন ফ্রন্ট ডেস্কে বসে থাকা ব্যক্তিটিও বুঝেছিল। তারপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিয়েছিল।

ভাষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভাবের আদান-প্রদান এবং যোগাযোগ। আমাদের আকুতি কিংবা আমাদের চাওয়াটা অন্যদেরকে বুঝাতে পারা। আমরা অনেকেই ইংরেজি বলতে ভয় পাই। এর কারণ আমরা ভালো ইংরেজি পারি না বা কম পারি। ভুল হলে মানুষে হাসাহাসি করবে এই ভয়েই মূলত আর বলতে যাই না। আসলে দেখুন ইংরেজিটা আমাদের মাতৃভাষা নয়, এখানে ভুল হবেই। ইংরেজি শুদ্ধভাবে বলতে পারার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যে বিষয়টা তা হচ্ছে ইংরেজি চর্চা এবং বলার অভ্যাস। কেউ যতই ইংরেজি জানুক না কেন, পুরো গ্রামার এবং ডিকশনারি মুখস্থ থাকলেও তার যদি ইংরেজি চর্চা বা বলার অভ্যাস না থাকে তাহলে কখনোই সে শুদ্ধভাবে ইংরেজি বলতে পারবে না। ইংরেজি বলার সময় কোথায় verb-এর past form/past participle form হবে, কোথায় s বা es, a বা an, he বা she হবে ইত্যাদি চিন্তা করার সময় থাকে না, তাই ইংরেজি বলার চর্চা বা অভ্যাস না থাকলে প্রচুর ভুল হয় এবং হওয়াটাই স্বাভাবিক। এজন্যে আমাদের ইংরেজিতে ভালো হতে হলে প্রয়োজন প্রচুর ইংরেজি চর্চা করা। অন্তত যখন যার সাথে সম্ভব তার সাথে চর্চাটা চালিয়ে যাওয়া উচিৎ। কাউকে ইংরেজি ভুল বলতে দেখলে হাসবেন না, সুন্দর ও ভদ্রভাবে ভুলটা ধরিয়ে দিয়ে শুদ্ধটা জানিয়ে দিন। একটা সময় ছিল যখন অন্যের ভুলভাল ইংরেজি দেখে আমার নিজেরও অনেক হাসি পেতো। মনে মনে বলতাম, পারে না আবার ভাব দেখাতে আসছে। কিন্তু এখন বুঝি তখন হাসাটা কিংবা মনে মনে ওমন ভাবাটা ঠিক হয়নি। তাকে বরং শ্রদ্ধা জানানো উচিৎ ছিল এজন্যে যে সে না পারুক না পারুক কিন্তু চেষ্টা করছে। তবে হ্যাঁ, ইংরেজি চর্চা করার জন্য কিন্তু কিছুটা ইংরেজি জানা অবশ্যই প্রয়োজন। কিছু না পারলে আপনি চেষ্টা করবেন কী দিয়ে? আর কেউ যদি একেবারেই ইংরেজি না পারেন তবে তারও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কেন হতাশ হওয়ার কিছু নেই সেটা বুঝানোর জন্য কেবল একটি ঘটনা বলবো।

আমার একজন টিচার আছেন যিনি নটরডেমের ছাত্র এবং পরবর্তীতে কানাডা থেকে গ্রাজুয়েশন করেছেন। উনি যখন নটরডেমে পড়তেন তখন সেখানে উনারা চার বন্ধু অনেক ভালো করায় পেয়েছিলেন “Award For Excellence”. তো স্যারের সেই চার বন্ধুর মধ্যে একজন ছিলেন ইংরেজিতে খুব কাঁচা। এমনিতে অন্য সব সাবজেক্টে ছিলেন একশতে একশো, কিন্তু ইংরেজি পারতোও না এবং বুঝতোও না তেমন। তো নটরডেমে পড়াশোনা শেষ করার পর স্যার এবং উনার বন্ধুরা কানাডায় পড়াশোনা করতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এদিকে কানাডায় যাওয়ার ভিসা পেতে হলেতো তাদের এমবাসি ফেস করতে হবে। সেখানে ভাইভা নিবে, অনেক কিছু জিজ্ঞেস করবে এবং সব হবে ইংরেজিতে। তো উনারা তাদের ইংরেজিতে কাঁচা বন্ধুটিকে নিয়ে অনেক দুঃচিন্তায় পড়ে যান। তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে বুঝবেও না এবং সে অনুযায়ী উত্তরও দিতে পারবে না। তো কী করা যায়? স্যারেরা অনেক ভেবে তাদের সেই বন্ধুটিকে বলে দেয় যে এমবাসি ফেস করার সময় ভিসা অফিসার যাই জিজ্ঞেস করুক না কেন উত্তরে শুধু ‘Yes’ বলতে হবে। যেই কথা সেই কাজ। স্যারের সেই বন্ধুটি সব প্রশ্নের উত্তরে শুধু ‘Yes’ বলে যাচ্ছিল। ভিসা অফিসার প্রথমে একটু ঘাবড়িয়ে গেলেও পরে ভাবে যে নটরডেমের ছাত্র যেহেতু সে কি আর ভুল বলবে! তো তাকে ভিসা দিয়ে দেয়। এই ঘটনার সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়টি হচ্ছে এরপর। কানাডায় পড়াশোনার একবছরের মাথায় ব্যাপারটি এমন দাঁড়ালো যে স্যারের যে বন্ধুটি ইংরেজিতে একদম কাঁচা ছিল সে হয়ে যায় সবার চেয়ে দক্ষ। সেখানে স্যারদের এক স্যার বলেন যে তিনি নাকি অন্য সবার চেয়ে স্যারের সেই ইংরেজিতে কাঁচা ফ্রেন্ডটির ইংলিশই ভালো বুঝেন! এমনকি তার একসেন্টও হয়ে যায় নাকি প্রায় হুবুহু কানাডিয়ানডের মত।
ঘটনাটি লক্ষ্য করুন, এখানে স্যারের সেই ফ্রেন্ডটি আগে ইংরেজি তেমন জানতো বলেই কানাডায় যাওয়ার পর প্রতিনিয়ত চর্চা এবং শোনার কারণে সেটাই সে রপ্ত করতে পেরেছে কানাডিয়ানদের মত করেই। যে কারণে তার ইংলিশই পরবর্তিতে সেখানের মানুষজন ভালো বুঝেছে। অথচ স্বাভাবিকভাবে স্যার এবং স্যারের যে বন্ধুরা ইংরেজি ভালো পারতো তাদেরই ইংরেজি ভালো আয়ত্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা না হয়ে যে সবচেয়ে কম পারতো তারই সবচেয়ে বেশি এবং ভালোভাবে আয়ত্ত হয়েছে। এই ঘটনাটি এজন্যে বললাম যে যারা ইংরেজি কম পারেন বা একেবারেই পারেন না, তারা একটু ধৈর্য ধরে শিখতে এবং চর্চা করতে শুরু করুন। বিশ্বাস করুন, আপনিই একদিন আগে যারা ভালো করতো তাদের চেয়ে ভালো করবেন।

আরেকটি ঘটনা বলা যায়। তবে সেটিকে ঘটনা না বলে উদাহরণ বলাই ভালো হবে। যারা ডিভি লটারি পেয়ে আমেরিকায় যায় তারা কিন্তু মনে হয় না কেউ তেমন ইংরেজি শিখে যায়। কিন্তু তারা সেখানে যাওয়ার কয়েক বছরের মাঝেই খুব ভালোভাবে ইংরেজিটাকে রপ্ত করে ফেলে। এটা কেন হয় জানেন? এর কারণ হলো তারা সেখানে যাওয়ার পর প্রতিনিয়ত ইংরেজি শুনতে শুনতে এবং বলার চেষ্টা করতে করতে রপ্ত করে ফেলে। এজন্যে আমরা কতটুকু পারি বা না পারি তারচেয়ে বেশি প্রয়োজন চর্চাটা। আমার মেরিনের এক বন্ধু আছে, যার সাথে একসাথে হলে কিংবা ফোনে কথা হলে আমরা শতকরা আশি ভাগ সময়ই ইংরেজিতে স্পিকিং করি। এতে দেখা গেছে আমাদের ইংরেজি স্পিকিংটা আগের চেয়ে অনেক ফ্লুয়েন্ট (অনর্গল) হয়ে গেছে। আগে যেখানে আ আ করতেই সময় চলে যেত এখন সেখানে আ আ আর করতে হচ্ছে না। এছাড়াও আমি যখন মনে মনে কিছু চিন্তা করি বা কল্পনার কারো সাথে কিছু কথোপকথন করি তখন তা ইংরেজিতে করার চেষ্টা করি। তো এভাবে আমরা যে যতটুকুই পারি তা দিয়ে যদি চর্চা করতে শুরু করি তাহলে আশা রাখি আমরাও অনেক ফ্লুয়েন্ট হয়ে যেতে পারবো। তো চলুন আর দেরী কিসের, শুরু করে দিই ইংরেজি চর্চা। আশেপাশে কে কী বললো তাতে কান দেওয়ার দরকার নেই কিংবা লজ্জা পাওয়ারও দরকার নেই। এখন তাদের কথায় লজ্জা পেয়ে যদি ইংরেজি আয়ত্ত করতে না পারেন তবে পরে কর্মক্ষেত্রে যখন ইংরেজির প্রয়োজন হবে তখন সেখানে না পারলে সে লজ্জা রাখবেন কোথায়?

 

পাপ ছাড়ে না বাপকেও কিংবা আকাশের কান্না

Now Reading
পাপ ছাড়ে না বাপকেও কিংবা আকাশের কান্না

হিলাটি বস্তির সামনে রাস্তায় শুয়ে শুয়ে অনেক কাঁদছিল আর জোরে জোরে বিলাপ করছিল। তার স্বামী তাকে অনেক মেরেছে, অনেক। কয়েক জায়গায় জখম হয়ে গিয়েছ। পথচারী কয়েকজন কান্না শুনে মহিলাটির কাছে গেলো। তাকে দেখে বললো, “এভাবে কেউ কাউকে মারে? ইশ! কী পাষন্ড! কোথায় আপনার স্বামী? তাকে পুলিশে দিবো।”

“হ, ওরে পুলিশে দেন। ঘরের মইদ্দেই আছে।”

এ কথা শুনে পথচারী লোকগুলো ঘরের দিকে হাঁটা দিল। তৎক্ষণাৎ মহিলাটি উঠে দৌড়ে গিয়ে একজনের পা জাপটে ধরে বলতে লাগলো, “না, উনারে পুলিশে দিবেন না। মাজে মইদ্দে মারলেও লোকটা অনেক ভালা। আমারে অনেক আদর করে। কাম করার পর মালিক ট্যাহা না দিলে ঘরে আইয়া হেই রাগ আমার উফরে ঝারে, মালিকরেতো কিছু কইবার পারে না! পুলিশে দিলে মালিকরে দেন।”

লোকগুলো তৎক্ষণাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। বিনা দোষে এতো মার খাওয়ার পরেও স্বামীর জন্য এতো ভালোবাসা!
একজন লোক ঘরে ঢুকে সেই স্বামীর হাতে পাঁচশো টাকা দিয়ে বলে মালিক পাঠায়ছে। পাষন্ড স্বামীটি টাকাটা হাতে নিয়েই দৌড়ে বউয়ের কাছে এসে তাকে দুহাত দিয়ে তুলতে তুলতে বলে, “ও বউ, তরে অনেক মারছি, না? থাইক, কান্দিস না। আয়, ডাক্তরের কাছে নিয়ে যাই। ওষুদ দিলেই ভালা হইয়া যাইবো।”

“না, ডাক্তরের কাছে নিয়া যাওন লাগবো না। আমরা বেদনা ভালা হইয়া গেছে। তুমি চাইল, আলু আর নুন কিইন্না আনো, যাও।”

দৃশ্যটা দেখে পথচারী লোকগুলোর চোখে পানি চলে আসে। এই বুঝি দুনিয়ার সবচেয়ে খাঁটি ভালোবাসা! মহিলাটি তাদের দিকে তাকিয়ে বলে, “কইছিলাম না, উনি অনেক ভালা মানুষ? একটু তারছিড়া, এইডাই খালি সমস্যা। মেজাজ খারাপ হইলে কী থেহে কী কইরা হালায় কইতেয়ারে না।”

হঠাৎ একজন পথচারীর কল্পনায় কিছু দৃশ্য ভেসে উঠে। মাসকয়েক আগে অফিস থেকে ফিরে বউকে ঘরের সকল কাজ বাদ দিয়ে টিভিতে সিরিয়াল নিয়ে পড়ে থাকতে দেখে একটু কথা শুনিয়েছিল। এজন্যে বউ চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে বাপের বাড়ি চলে যায়। আর গিয়ে সবাইকে বলেছিল কেবল টিভি দেখেছিল বলে নাকি গায়ে হাত তুলেছে। পরে অনেক কষ্টে-সৃষ্টে শত ধকল সহ্য করে বউকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছিল।
দিন পনের আগে একবার জ্বর হওয়ায় দুইদিন কোনো মতে সেবা করেই শরীর খারাপের কথা বলে বউ বাপের বাড়ি চলে যায়। এসেছিল একেবারে জ্বর ভালো হলে। প্রচন্ড দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লোকটির মনে মনে কেবল একটাই কথা উচ্চারিত হলো, “দুজনেই বউ কিন্তু আকাশ আর পাতাল!” আর এর সাথে সাথে তার আগের বউয়ের কথাও মনে পড়ে যায়। যে সবদিক থেকে ভালো হওয়া সত্ত্বেও কেবল সন্তান হয় না বলেই তালাকপ্রাপ্ত হয়েছিল । নতুন এই দজ্জাল বউ আনার পরেই আর কী লাভ হয়েছে! দুই বছর হতে চললো এখনো সন্তানের দেখা মিললো না।

কয়েকদিন বাদে সেই মহিলাটির পাষন্ড স্বামী তিনদিনের চুক্তিতে একটি কাজ পায়। ট্রাক থেকে বস্তা মাথায় করে নিয়ে গুদামে রাখতে হবে। প্রতি বস্তার জন্য পাঁচ টাকা। প্রতিদিন একশো বস্তা এভাবে ট্রাক থেকে গুদামে রাখতে হবে। তিন দিনের টাকা একবারে দিবে।
তিনদিনে তিনশো বস্তা গুদামে রাখার কাজ শেষ করে মালিকের কাছে গেলো টাকা নিতে। মালিক হাতে পাঁচশো টাকা ধরিয়ে দিলো। লোকটি আরো এক হাজার টাকার কথা জিজ্ঞেস করতেই মালিক কষে একটা থাপ্পর দিয়ে বললো, “প্রতি বস্তা কি তরে পনের টাকা করে দিমু?”

“ওস্তাদ, আমিতো পোনরো ট্যাহা করে চাই নাই। আগের দুই দিনের দুইশ বস্তার এক হাজার ট্যাহা চাইছি। সব ট্যাহাতো আইজ একসাতে দেওয়ার কতা আছিল।”

মালিক এবার আরো জোরে আরেকটা থাপ্পর দিয়ে বললো, “তুই কি কইবার চাস আগের দুইদিনের টেকা তরে দেই নাই? টেকা না নিয়াই তুই কাম করছস? যা, ভাগ এইখান থেকে। যতসব বাটপারের দল।”

লোকটি উদাস হয়ে গুদাম থেকে বেরিয়ে বস্তির দিকে হাঁটা দেয়। প্রচন্ড রোদ। দরদর করে ঘামছিল। সারাদিনের খাটুনি, দুইটা থাপ্পর, আর এক হাজার টাকা না দেওয়া- সব মিলিয়ে ওর মাথাটা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে হাটতে হাটতে বস্তির সামনে আসে। ওর বউ বাইরে বসে মাটির চুলা বানাচ্ছিল। প্রতি চুলা পঞ্চাশ টাকা করে বিক্রি করে। হঠাৎ স্বামীকে ফিরতে দেখে সে। তবে তার হাটার ধরণ কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছিল। বউটি তার কাছে দৌড়ে গিয়ে বলে, “ওগো, তোমার কী হয়ছে? এমুন করে হাটতাছ কে? মালিকে কি আজকেও ট্যাহা দেয় নাই?”

পাষন্ড স্বামীটি তার বউকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। পাশে পরে থাকা একটি মোটা খড়ি দিয়ে কাঁধ বরাবর জোরে একটা মারে। বউটি সেখানেই নিশ্চুপ হয়ে যায়। লোকটি আবার উদাসভাবে হাটতে হাটতে ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। পথচারী কয়েকজন এভাবে মারার দৃশ্য দেখে বউটির নিশ্চুপ দেহের কাছে দৌঁড়ে যায়। একজন হাতের নাড় পরীক্ষা করে বুঝতে পারে সে আর নেই। কেউ একজন পুলিশে ফোন দেয়।

পুলিশ পাষন্ড খুনি স্বামীটিকে যখন গাড়িতে তুলতে যাচ্ছিল, তখন সে চিৎকার করে করে বলতে থাকে, “ও মনু! মনু! তুই কই? আমারে নিয়া যাইতাছেগা, তুই কিছু কসনা কেরে? তরে ছাড়া আমি থাকমু কেমনে? মনুরে মনু, তুই কই মনু? আমারে আটকা, নিয়া যাইতে দেইস না।”

ঠিক সেই সময়ই পাশের রাস্তা দিয়ে একটি ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকে সাইরেন বাজিয়ে যেতে শোনা যায়। লোকে বলাবলি করছিল পাশেই কোথাও নাকি একটা গুদামে আগুন লেগেছে, ভয়াবহ আগুন!
রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশে হঠাৎই কোথা থেকে যেন ঘন কালো মেঘ এসে জমা হয়। কিছুক্ষণের মাঝেই শুরু হয়ে যায় প্রচন্ড বৃষ্টি। ফায়ার সার্ভিস যে আগুন নিভাতে ব্যর্থ হচ্ছিল তা বৃষ্টি এসে সফল করে দেয় আশাপাশের কোনো গুদামে আগুন ধরে যাওয়ার আগেই।
আচ্ছা, এ বৃষ্টি কি আসলেই বৃষ্টি নাকি অন্য কিছু? এ কি আকাশের কান্না হতে পারে না?

রেললাইনের জীবন্ত লাশ

Now Reading
রেললাইনের জীবন্ত লাশ

রেললাইন। একটি ছেলের জীবন্ত লাশ এসে এর উপর দেহটা এলিয়ে দিল। দেহের মাঝটা লাইনের মাঝের সাথে এমনভাবে রাখলো যেন দুপাশে দেহটা সমানভাবে ছড়িয়ে যায়। রেলের ধাতব চাকাটা যেন এমনভাবে দেহটাকে ত্রিখন্ডিত করে যাতে লাইনের দুপাশে পড়ে যাওয়া মাথার এবং পায়ের অংশের দৈর্ঘ্যটা সমান হয়। আচ্ছা, লাশ আবার জীবন্ত হয় কিভাবে? একটু পেছনে ফিরে যাওয়া যাক তবে।
তিন বছর পর বিদেশ থেকে ফিরেছে ছেলেটা। নাহ, এখান থেকে না। আরেকটু পেছনে যাওয়া যাক। আমার এই এক সমস্যা, গল্পের খেই রাখতে পারি না।

বাবা-মার একমাত্র সন্তান ছেলেটা। বাবা মারা গিয়েছে সেই ছোটবেলাতেই। মাও মারা গেলো মাস কয়েক আগে। ছেলেটা অনার্স শেষ করে বের হয়েছে ইউনিভার্সিটি থেকে গেল বছর। চিটাগাং ইউনিভার্সিটি, সোসিওলজি ডিপার্টমেন্ট। রেজাল্ট ভালোই ছিল, কিন্তু চাকরী জুটাতে পারছিল না। সব ঠিক থাকলেও শেষমেশ কিছু টাকার অভাবে চাকরী হয় না। একে ঠিক টাকা না বলে ঘুষ বলাই উচিৎ। অনেক কষ্টে পরে লাখ দুখানেক টাকার ঘুষ দিয়ে একটা চাকরী জুটায়।

নাহার, ওর সখী। ছয় বছরের সম্পর্ক সেই কলেজ থেকে। মেয়েটা কলেজ পর্যন্ত পড়েই ঝরে গেছে। কিন্তু তারা তাদের সম্পর্ককে ঝরে যেতে দেয়নি। আগের মত খুব একটা দেখা সাক্ষাৎ না হলেও যোগাযোগ ঠিকই রেখেছে। নাহার মাঝে মাঝে সুযোগ পেলে ওর বাবার ফোন নিয়ে কল দিয়েছে আর কদাচিৎ সবার অগোচরে লুকিয়ে দেখা করেছে। গতকাল ফোন দিয়েছিল। বলেছে, ওর বাবা নাকি ওর বিয়ে ঠিক করেছে এক বিদেশ ফেরত ছেলের সাথে। অনেক টাকা পয়সার মালিক। নাহার আরো বলেছে, কিছু একটা করতেই হবে। না হলে এ বিয়ে আটকানো যাবে না। এ শুনে ছেলেটা সিদ্ধান্ত নেয় যে নাহারের বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। করেছিলও তাই। কিন্তু নাহারের বাবা রাজী হতে চায়নি। ওমন টাকাওয়ালা বিদেশ ফেরত ছেলেকে রেখে কেউ সামান্য একটা চাকুরে করা ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিবে! ভালোবাসার নাকি খেতা পুড়েন উনি! ভালোবাসা দিয়ে কি আর পেট ভরে? তবে ছেলেটার অনেক জোরাজুরিতে কথা দিয়েছিলেন যে আগামী এক মাসের মধ্যে যদি ভালো কোনো দেশে যেতে পারে তবে তার ফিরে আসার আগ পর্যন্ত নাহারকে কোথাও বিয়ে দিবে না। সে ফিরলে তার সাথেই দিবে। ছেলেটা এই শুনে বিদেশ যাওয়ার তোড়জোড় করতে শুরু করে। চাকরী করে জমানো কিছু টাকা আর একটু জমি বিক্রি করে পাওয়া কিছু টাকা মিলিয়ে মিডল ইস্টের একটা মোটামুটি ভালো দেশে যাওয়ার বন্দোবস্ত করে। চলেও যায় ছাব্বিশ দিনের মাথায়। যাওয়ার আগে নাহারের বাবা বলেছিল অপেক্ষা করবে তার ফেরার জন্য। তবে শর্ত দিয়েছিল এ সময়ের মাঝে নাহারের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখতে পারবে না। ছেলেটা বাকী জীবনের সুখের কথা চিন্তা করে সাময়িক দুঃখের ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিল।

তিন বছর পর বিদেশ থেকে ফিরেছে ছেলেটা। বাড়িটা ওর এক চাচাকে দিয়ে গিয়েছিল থাকার জন্য। চাচী ওর আসার খবর শুনে অনেক বাহারী রান্না করেছে। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি বাসায় ফিরেছে ছেলেটা। ফিরতে ফিরতে রাত হয়েছে। ফ্রেশ হয়ে বাহারী খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল তাড়াতাড়িই। কাল ওর সখীর বাবার কাছে যাবে সখীকে বিয়ে করার প্রস্তাব নিয়ে। রাতটা ঘুমিয়ে চাঙ্গা হতে হবে। পরদিন সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে খেয়েদেয়ে ফিটফাট হয়ে বের হলো। উদ্দেশ্য সখীর বাড়ি। সখীদের বাড়িটা অন্যান্য বাড়ি থেকে কিছুটা নির্জনে। পাশ দিয়েই চলে গিয়েছে রেললাইন। বাড়িটা একটা আধাপাকা বাড়ি, তবে চারপাশে রয়েছে বাউন্ডারি ওয়াল। ছেলেটা বাউন্ডারির গেটে গিয়ে অনেকক্ষণ শব্দ করলো কিন্তু কোনো সাড়া পেলো না। দুঃচিন্তা নিয়ে পাশের সবচেয়ে কাছের বাড়িটাতে ও খোঁজ নিতে গেলো। যা জানতে পারলো তাতে ওর পৃথিবীটা উল্টে গেলো। তিন বছর আগেই নাকি নাহারের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে ঘর জামাই হিসেবেই থাকে এখানে। নাহারের বাবা মারা গেছে গত দুই বছর আগে। ওদের সাথে নাকি এখন এলাকার কারো তেমন সম্পর্ক নেই। পুরো বাড়িতে নাকি একাই থাকতে পছন্দ করে ওরা। বেরও হয় খুব কম। তবে দুপুরের পর থেকে নাকি শহরের বিভিন্ন মানুষকে আসতে যেতে দেখে এলাকার লোক ও বাড়িতে।

ছেলেটা সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াল ডিঙিয়ে গিয়ে হলেও সে এখনই ভেতরে ঢুকবে, দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না। ঢুকে নাহারকে খুঁজে বের করে শুধু একবার কথা বলবে, একবার!
ঢুকে সে ওয়াল ডিঙিয়ে। কিন্তু দরজা জানালা সব বন্ধ। বাড়িটাকে একটা পুরনো পরিত্যাক্ত বাড়ির মত লাগছিল। একদম শুনশান, নীরব। স্যাঁতস্যাঁতে দেয়াল ।সামনের নিম গাছটার নিচের ঝোপ দেখে লাগছিলো যেন অনেকদিন কেউ যত্ন নেয়নি। মাঝে মাঝে বাড়ির পেছনের ঝোপ থেকে কিছু পোকার মাকড়ের শব্দ আসছিল। সে হঠাৎ ভাবলো বাড়ির পেছনের দিকটায় দিয়ে দেখবে সেদিকে কোনো জানালা খোলা আছে কিনা। পেছনের দিকে গিয়ে দাঁড়ালো সে রুমটা বরাবর যেখানটায় আগে মূলত নাহার থাকতো। পেছন থেকেও জানালা বন্ধ। ও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসে কিনা শোনার চেষ্টা করলো। কিন্তু একদম নীরব, কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ চোখটা জানালা বরাবর নিচে মাটিতে পড়লো। অনেকগুলো প্যাকেট পড়ে আছে। সিলভার কালারের প্যাকেট। ছেলেটার মনে হয়েছিল হয়তো ওর স্বামীর কোনো ঘাতক ব্যাধি আছে। তবে খারাপ লেগেছিল অনেক প্যাকেটগুলো দেখে। বুকের ভেতর কোথায় যেন মোচড় দিয়ে উঠেছিল। হয়তো তার ভালোবাসাকে অন্য কেউ ভোগ করছে এটা ভেবে।

এরপর বাইরে বেরিয়ে আসে ছেলেটা। তবে বাড়ি যায়নি। সখীর সাথে একবার কথা না বলে যাবে না। আশেপাশেই বাড়ির দিকে চেয়ে ঘুরঘুর করছিল কেবল। দুপুরের দিকে হঠাৎ বাউন্ডারি গেটটা খুলে একজন তাকে ডাকলো। সে প্রথমে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও কাছে গেলো। লোকটা হতে পারে ওর সখীর স্বামী। এ সুযোগে যদি একটু দেখা করা যায় তবে মন্দ কিসে? কাছে যাও্য়ার পর লোকটা বলছিল, “চিনলেন কিভাবে?”

ছেলেটা হঠাৎ এমন প্রশ্নে ঘাবড়ে যায়। কী চেনার কথা বলছে? কিছুটা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, ” চিনলাম কিভাবে মানে?”

“আচ্ছা বাদ দেন মিয়া। ব্যবসাতে এতো কথা কয়ে সময় নষ্ট কইরা লাভ নাই। আমার কোনো চিনা কাস্টমারই মনে অয় আপনারে পাডায়ছে বাড়ির এড্রেস কইয়া। তয় হেই কি আপনারে রেটটাও বইলা দিছে?”

“কিসের রেট?”

“এতো ভালো সাজতাছেন কেন? বাড়ির পাশে এসে ঘুরঘুর করতাছেন কী এমনেই। যাই হইক, পার শট কিন্তু সাতশো। রাজি থাকলে আমার সাথে আহেন। একটু বসতে হইবো। রাতে একজন আইছিল এখনো বাইর হয় নাই। বাইর হইলে আপনে ঢুইকেন।”

তৎক্ষনাৎ ছেলেটার মাথায় একটা ভয়ঙ্কর চিন্তা খেলে যায়। সে বুঝতে পারে আসলে কী চলছে এ বাড়িতে এবং তা কাকে দিয়ে। তবুও নিশ্চিত হতে জিজ্ঞেস করে, “একজনই নাকি খালি? আর কেউ নাই?”

“কেন? আপনি জাইনা আহেন নাই?”

“না, এত জিজ্ঞেস করিনি। ঠিকানা নিয়েই চলে আসছি।”

“ও বুঝছি, আপনার বহুত গ্যারা। খবর পায়েই আর থাকতে পারেন নাই। হয়, জিনিস একটাই। তয় জিনিস কিন্তু হেব্বি স্পেশাল। আমার…, না থাইক। আইছেন, টাকা দিবেন, কাম করবেন, চলে যাবেন। এতো কতা কয়ে লাভ নাই।”

ছেলেটা যা বুঝার বুঝে ফেলে। সে মনে মনে মারাত্মক ভয়ঙ্কর একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে এবং রাজী হয়ে ভেতরে যায়। বারান্দার একটা জায়গায় তাকে বসতে দেয় লোকটা, এরপর টাকা চায়। কথা অনুযায়ী সাতশো টাকা সাথে একশো বকশিশ সহ লোকটার হাতে দিয়ে দেয় ছেলেটা। তখনই বিশেষ রুম থেকে একটা লোক বেরিয়ে আসে। কাস্টমার মনে হয় যে সারারাত আর অর্ধেক দিন থেকেছে। লোকটি রুম থেকে বের হয়ে সরাসরি গেট দিয়ে বেরিয়ে চলে যায়। পাশে তাকিয়েও দেখেনি। কিন্তু চেহারা দেখে ছেলেটি কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিল। জেলা শহরের অন্যতম রাজনৈতিক নেতা। অনেক নাম ডাক। এই কাস্টমারটি বের হওয়ার সাথে সাথেই ঘরে ঢুকেছে সেই লোকটা। যাকে সখীর স্বামী মনে করা হচ্ছে। রুমের ভেতর থেকে একটা ধমকাধমকির আওয়াজ আসে। আবছাভাবে সখীর কন্ঠস্বর আঘাত করে ছেলেটির কানের পর্দায়। স্বরটা আগের চেয়ে অনেক বিকৃত হলেও চিনতে অসুবিধা হয়নি। ছেলেটা তার ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অটল হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর লোকটা বেরিয়ে আসে। ছেলেটাকে বলে, “আপনারে ঘন্টাখানিক বইতে হইবো। শরীলে নাকি উনার মেলা ব্যথা করতাছে। ট্যাবলেট খাওয়াই আইছি। কইমা যাইবো ঘন্টাখানেকের মইদ্দে। আপনে ইচ্ছা করলে এইহানেও বইসা থাকতে পারেন আবার ভিত্রে আমার রুমেও বইতে পারেন। আপনার যা ইচ্ছা। আমি ভিত্রে গেলাম। খাইতে হইবো।”

ছেলেটা সুন্দরভাবে বললো, “আমি এখানেই আছি। সমস্যা নেই কোনো।”

লোকটি ভেতরে চলে যায়। ছেলেটা কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে উঠে। এরপর আস্তে আস্তে বাড়ির পেছনে যায় ঠিক যেখানটায় সিলভার কালারের প্যাকেটগুলো পড়ে ছিল। একটা একটা করে গুনতে থাকে। একশ সাইত্রিশটা টা হয়। আশেপাশে আরো আছে কিনা ভালোভাবে তাকায়। একটা ঝোপের উপর পড়ে থাকতে দেখে আরো তিনটা। হতে পারে জানালা দিয়ে ফেলে দেওয়ার সময় বাতাস থাকায় ঝোপের উপর গিয়ে পড়েছিল। সর্বমোট একশ চল্লিশটা হয়। সে এবার আস্তে আস্তে কোনো শব্দ না করে বাড়ির সামনে চলে আসে। কিছু একটা খুঁজতে থাকে। পেয়ে যায় সেটা বারান্দাতেই। একটা পরিত্যাক্ত মোটা লোহার রড। তিন হাতের মত লম্বা হবে। সেটা হাতে নেয়। চলে আসে লোকটার ঘরের দরজার যে পাশটায় সে বসেছিল তার বিপরীত পাশে। লোকটাকে ডাক দেয়, “ভাই, একটু এদিকে আসবেন?”

“খাড়ান, খাওয়া পেরায় শেষ। আর আপনেই ভিত্রে আহেন না। সমস্যা নাই।”

“না, আমি বাইরেই আছি।”

“আচ্ছা থাকেন তয়। আমি দুই মিনিটের মইদ্দে আইতাছি।”

“আহেন।” এই বলে ছেলেটা সুন্দর করে দরজার পাশে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। লোকটা বের হয়। বের হয়েই ছেলেটা যেদিকে বসেছিল সেদিকে তাকায়। দেখতে না পেয়ে থেমে উল্টো দিকে যেই মুখ ঘোরাতে যাবে তখনই পেছন থেকে কানে আসে ‘এক’ সংখ্যাটি আর সাথে সাথেই মাথায় একটি প্রচন্ড জোরে আঘাত আসে। লুটিয়ে যায় লোকটির দেহ মাটিতে। মাথার খুলি ভেঙে গিয়ে প্রচুর রক্তের পাশাপাশি মগজও কিছুটা বের হয়। স্পট ডেড। মরার আগে মুখ থেকে একটা শব্দও বেরুতে পারেনি। ছেলেটা দুই বলে আবার সেই মরা দেহটার মাথাতেই আঘাত করে। পুরো মাথার খুলিটাই এবার ভেঙে যায়। এভাবে সে গুনে গুনে একশ চল্লিশটা আঘাত করে পুরো দেহ জুড়ে। শেষ আঘাতটা করার পর দেহটাকে আর দেহ মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল কোনো প্রাণীর মাংস আর হার টুকরো টুকরো করে কেটে তারপর থেতলে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ছেলেটা সেই রডটাকে পাশের একটি জলায় ফেলে দেয়। এরপর কিছুটা দূরের একটা নির্জন জায়গায় গিয়ে চিৎকার করে করে কাঁদতে থাকে। কেউ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মুখে হাত দিয়ে কান্না চেপে ধরে রাখে। তার এ কান্না কাউকে দেখতে দেও্য়া যাবে না! এ কান্না কাউকে দেখানোর নয়। এ কান্না কেবলই কান্নার কান্না!

সন্ধ্যা পর্যন্ত কেঁদে থামে ছেলেটা। এরপর হাঁটা শুরু করে রেললাইনের উদ্দেশ্যে। নির্লিপ্ত আকাশটা কেবলই চেয়ে দেখেছিল সেদিন। হু হু করে বয়ে চলা বাতাস কিছু বলতে চেয়েও পারেনি সেদিন বলতে। দক্ষিণের আকাশে চমকানো একটি বিজলিকে মনে হয়েছিল আকাশ থেকে বেয়ে পড়া কোনো দড়ি, যা গিয়ে ঠেকেছিল দিগন্তে।

দুদিন পর জাতীয় পত্রিকার ভেতরের পাতায় একটি খবর প্রকাশিত হয়। যার সারমর্ম ছিল- একই এলাকা থেকে দুইদিনে দুইটি লাশ উদ্ধার। প্রথম লোকটিকে কিভাবে খুন করা হয়েছিল নিশ্চিত হওয়া যায়নি। লোকটির শশুরবাড়ি থেকে তার পিটিয়ে থেতলানো দেহ উদ্ধার করা হয়। খুনি সন্দেহে তার বউকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এবং পরেরদিন পাশেরই একটি রেললাইন থেকে ত্রিখন্ডিত একটি লাশ উদ্ধার করা হয়। এটিকে আত্মহত্যা হিসাবে সন্দেহ করা হচ্ছে। লোকটির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। মাত্র একদিন আগেই ফিরেছিল মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে তিন বছরের প্রবাস জীবন শেষে।

ফেসবুকে লেখক: Rihanoor Protik | রিহানুর ইসলাম প্রতীক

ধর্ষণ বনাম পারফেকশন

Now Reading
ধর্ষণ বনাম পারফেকশন

আমার এক আপু আছে, পড়ছে মেডিকেলে, স্বপরিবারে থাকে সৌদিতে। আমার চেয়ে বয়সে খুব বেশি বড় নয়, প্রায় এক বছরের মত হবে আরকি। অবশ্য দুজনে পাশাপাশি দাঁড়ালে মনে হবে আপু আমার চেয়ে পাঁচ-ছয় বছরের বড়। তবে দোষটা আপুর নয়, আমারই; আমাকে বয়সের তুলনায় অনেক ছোট ছোট লাগে। অনেকের আমার লেখা পড়ার পর যখন আমাকে দেখতে ইচ্ছা হয় তখন প্রোফাইলে গিয়ে আমার পিকচার দেখার পর তাদের এক্সপ্রেশনটা হয় অনেকটা এরকম- “এ্যাঁ! এতো একেবারে পিচ্চি! এই ছেলের থেকে এই লেখা কেমনে সম্ভব!”
বিষয়টা হাস্যকর হলেও এটাই সত্যি। এবং এই ধরনের এক্সপ্রেশনের মুখোমুখি আর না হতেই ফেসবুক প্রোফাইল থেকে আমার ছবি সরিয়ে নিয়েছিলাম। তবে পরে চিন্তা করে দেখলাম এভাবে আর কতদিন, যা সত্য তাই মানুষ দেখুক। আমি লিখি আমার ভালো লাগা থেকে, আমকে ভালো লাগাতে নয়। কোনো লেখা আমার সেটা বিশ্বাস করুক না করুক, লেখার মর্মার্থ বুঝতে পারলেই হলো। তাই আবার ফটো দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তবে হুট করে তুলে সেই ফটো আপলোড দিইনি। বিশেষভাবে বন্ধুদের নিয়ে ঐতিহ্যবাহী একটি জায়গায় গিয়ে ফটোসেশন করে সেখান থেকে নিজের সবচেয়ে ভালো লাগার ফটোটি আপলোড দিয়েছি!

যাহোক, অহেতুক বকবক অনেক করলাম। এবার লেখাটির মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। প্রসঙ্গটি ছিল আমার এক সৌদি প্রবাসী মেডিকেল পড়ুয়া আপুকে নিয়ে। আপু আমার রক্তের সম্পর্কের কেউ না হলেও একেবারে তারচেয়ে কমও নয়। অনেকটা বলা যায় ব্রাদার ফ্রম ডিফারেন্ট মাদার (ব্রাদারের জায়গায় সিস্টার হবে। ছন্দ মেলাতে ব্রাদার ব্যবহার করেছি!)। আপুর সাথে আমার প্রায়ই কথা হয়, নানা রকম বিষয় নিয়ে। আমার কোনো সমস্যা বা সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আমি প্রায় সময়ই আপুর পরামর্শ নেওয়ার চেষ্টা করি। এর পেছনেও কারণ আছে। কারণটা হলো আপুটা অনেক ম্যাচিউর। শুধু অনেক ম্যাচিউর বললেও ভুল হবে, মারাত্মক ম্যাচিউর। উনার চিন্তা-ভাবনা ও কথাবার্তা অনেক উঁচু স্তরের। উনার সাথে কথা বলার সময় আমি অনেক কিছু শিখতে পারি, এজন্যেই উনাকে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। উনার কিছু উক্তি নিয়ে মাস তিনেক আগে আমি “লাইফ ইজ আ লুডু” শিরোনামের একটি লেখাও লিখেছিলাম। তো কয়েকদিন আগে উনার সাথে কথোপকথনের একপর্যায়ে কোনো একটা বিষয় নিয়ে উনি বলছিলেন, “Whenever a guy proposes, I straightly tell them that no relationship before marriage. Also tell them that I was raped when I was 8 and they get disappeard!”

রেপড না হয়েও রেপড হয়েছে বলার কারণটা যদিও আমি বুঝেছিলাম তারপরেও জিজ্ঞেস করলাম, “Why do you lie?”

তারপর আপুর উত্তরটা ছিল এরকম, “No guy wants an imperfect girl. They propose, they reject as if I am a tissue paper. They draw it out, then they trash it down.”

আপুর উত্তরটা একটু খেয়াল করে দেখুন তার চিন্তা-ভাবনাটা কোন লেভেলের! আমরা প্রায় সবাই সবসময় পারফেক্ট সঙ্গী খুঁজি এবং অন্যদের কাছে নিজেকে সবসময় পারফেক্ট প্রমাণ করার চেষ্টা করি। এতে কিন্তু আসলে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হই। কেননা বলতে গেলে কেউই সবদিক থেকে পারফেক্ট না। কেউ ভেতর থেকে পারফেক্ট, কেউবা বাইরে থেকে পারফেক্ট। আমরা সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করি তা হচ্ছে কারোর বাইরের পারফেকশন দেখে তার কথা শুনে তার ভেতরটাও পারফেক্ট মনে করি। এবং এরপর যখন তাকে গ্রহণ করার পর তার থেকে আর সেই পারফেকশনটা পাই না তখন আফসোস করি এবং ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যায়। আমাদের সমাজের অধিকাংশের মানসিকতা এমন যে আমরা একজন ধর্ষিতা নারীকে দেখে ঘৃণায় থুথু ফেলি আর বয়ফ্রেন্ডের সাথে সেভেরাল টাইমস সেক্স করা মেয়েটার ব্যাপারে কোনো মাথা ব্যথাই থাকে না। ধর্ষিতা মেয়েকে বিয়ে করতে আমাদের জাত যায় আর অন্যের এক্স-গার্লফ্রেন্ডকে আমরা স্বচ্ছন্দে বিয়ে করতে পারি। মাসকয়েক আগে আমার প্রকাশিত অত্যন্ত সাড়া পাওয়া “সতীত্ব কিংবা ভার্জিনিটি” শিরোনামের একটি লেখায় আমি একটি উক্তি করেছিলাম এমন- “I wouldn’t say that raped girl non-virgin who never wished to have sex before marriage. Rather I would say that girl non-virgin who never had sex yet, but wished to have sex without marriage.”

একজন ধর্ষিতাকে বরং আমাদের সম্মান করা উচিৎ এজন্যে যে সে নিজেকে স্বেচ্ছায় বিলিয়ে দেয়নি। সুতরাং, বিচার করুন স্বেচ্ছায় বয়ফ্রেন্ডের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেওয়া মেয়েটি ভালো নাকি একজন ধর্ষিতা মেয়ে ভালো।

আমি এমন একটি মেয়েকে চিনি যাকে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই চারিত্রিক দিক দিয়ে অনেক ভালো হিসাবে জানে। এই জানার পেছনে একটি কারণও আছে। তার ফ্যামিলি অত্যন্ত ধার্মিক এবং সবার কাছে এসব দিক থেকে তাদের অনেক গ্রহণযোগ্যতাও আছে। আমি নিশ্চিত সেই মেয়েটির যদি কখনো কোনো বিয়ের প্রস্তাব আসে তবে তারা তাকে ফুলের মতই পবিত্র চরিত্রের অধিকারী ভেবে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে। অথচ তার ব্যাপারে গূঢ় সত্যটি কেবল আমি এবং আমার খুব ক্লোজ কয়েকজন ফ্রেন্ডই জানে। সে তার এক্স-বয়ফ্রেন্ডের সাথে বলতে গেলে এমন কিছু নেই যা করেনি। হ্যাঁ, এক্স-বয়ফ্রেন্ড বলছি এ কারণে যে সে পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় তার সাথে ব্রেকাপ করে এখন অন্যজনের সাথে সম্পর্কে আছে। না জানি সেখানেও কিছু বাদ রেখেছে কিনা। এমনকি সে সুযোগ পেলে অন্য ছেলেদের বাইকের পেছনে উঠেও ঘোরাঘুরি করে। প্রথমদিকে যখন তাকে দেখি তখন দেখতাম সবসময় বোরকা কিংবা অন্তত হিজাবটুকু পড়তো। এখন যদিও দূরে অন্যত্র থাকে, তবুও মাঝে মাঝে বিভিন্নভাবে শুনি এখন নাকি অনেক ফ্যাশন করে, এডভান্সড পোশাক-আশাক পড়ে এমনকি কনসার্টেও নাকি যায়। বুঝেন এবার তার লেভেলটা! অথচ এই ব্যাপারগুলো তার পরিবার কিংবা আত্মীয় স্বজন কেউই ঘুণাক্ষরেও জানে না কিংবা কোনোভাবেই জানার কথা না। এই মেয়েটি কি তবে একজন পতিতার চেয়েও খারাপ না? অথচ বাইরে থেকে তাকে বিচার করলে একটি ফুলের মতই পবিত্র মেয়ে হিসাবে উঠে আসবে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে একজন ধর্ষিতা এবং তার মাঝে তাকেই সবাই পারফেক্ট হিসাবে সম্মতি দিবে!

এই উদাহরণটি দিলাম এটা বুঝাতে যে কাউকে বাইরে থেকে দেখে তার পারফেকশনের বিচার করা ঠিক না। বরং যে মেয়ে তার ইমপারফেকশনগুলো নিজে থেকে বলে দেবে সেই হলো প্রকৃত পারফেক্ট। আমার যদি কোনো মেয়েকে ভালো লাগে এবং তাকে প্রপোজ করার পর সে যদি আপুর মত উত্তর দেয় যে সে কখনো কোনো একসময় ধর্ষিত হয়েছিল তবে আমি তাকে যেকোনো মূল্যেই চির জীবনের জন্য গ্রহণ করার চেষ্টা করবো। এরা পারফেক্ট না হতে পারে, কিন্তু কখনো বেঈমানী বা প্রতারণা করতে জানে না।
অপরদিকে অন্যের ব্যবহৃত এক্স-গার্লফ্রেন্ড যদি নিজেকে পুরোপুরি পারফেক্ট দাবী করে আমার জীবনে আসতে চায় এবং সাপোজ আমি যদি গ্রহণও করি তাকে তখন মনে মনে আমার একটা কথাই থাকবে- তোমাকে পার্ট টাইম হিসাবে ভালোই ব্যবহার করা যাবে। বিশ্বাস করুন, এদেরকে আপনার পার্ট টাইম হিসাবে নিতে হবে না, এরা আসেই পার্ট টাইমের জন্য। আপনার চেয়ে অন্য ভালো কাউকে পাক, তখন প্রতারণা এরা ঠিকই করবে।

শুরু করেছিলাম আপুকে নিয়ে, আর এতো এতো বকবক করতে করতে শেষে এসে ঠেকলাম কোথায়! তবে আপুকে নিয়ে বলার আরো অনেক কিছু আছে। কিন্তু আজ আর নয়, অন্য কোনো একদিন আপুর অন্য কোনো একটা প্রসঙ্গ নিয়ে আসবো। আজ আরো বকবক করতে গেলে পাঠক আমাকে বিশাল দৌড়ানি দিবে। সুতরাং, আজ আর নয়।
সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন; পারফেক্ট না খুঁজতে যেয়ে ইমপারফেকশনের মধ্য দিয়ে আসল পারফেক্টকে চিনতে শিখুন।

এ লেখায় উল্লেখিত আমার অন্য সেই লেখা দুটির ফেসবুক লিংক-
লাইফ ইজ আ লুডু
সতীত্ব কিংবা ভার্জিনিট

ফেসবুকে আমি: Rihanoor Protik

রোমান্টিক রম্য উইথ বউ

Now Reading
রোমান্টিক রম্য উইথ বউ

বউয়ের সাথে ব্রেকফাস্ট করলাম মাত্র। সকাল বাজে দশটা, অফ ডে থাকায় আজ দেরিতে উঠেছি ঘুম থেকে। ব্রেকফাস্ট শেষে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে পত্রিকাটা হাতে নিয়েছি মাত্র আর তখনই বউ বলছে, ‘এই শোনো। এই…, আমার দিকে তাকাও না।’

আমি কিছুটা রাগত ভাব নিয়ে বললাম, ‘আমি বয়রা না বাবা, কান আমার খোলাই আছে। কী বলতে চাও বলে ফেলো।’

‘এমন করো কেন? আচ্ছা, শোনো না, আমি ইদানীং চোখে একটু ঝাপসা দেখছি, বিশেষ করে সমস্যাটা হয় কিছু পড়ার সময়। অনেক কিছুই ভালোভাবে বুঝতে না পারায় পড়তে পারি না। একটা চোখের ডাক্তার দেখানো উচিৎ, চশমা নিতে হবে বোধহয়।’

‘এদিকে আসো, আমার সাথে এদিকে আসো।’ এটা বলতে বলতে আমি বউকে জানালার কাছে নিয়ে গেলাম।

‘এখানে নিয়ে আসলে কেন? কী হয়েছে?’

‘ঐ যে দেখতে পাচ্ছো ওটা কী বলতো?’

‘কেন, সূর্য।’

‘হারামজাদি হাজার মাইল দূরের সূর্যরে দেখে চিনতে পারস আর চোখের সামনে লেখা দেখে চিনতে পারস না?’

‘কী!!! তুমি আমারে হারামজাদি ডাকলা!!! তোমার সাথে কথা বলা বন্ধ!’

‘বাহ! এতো দেখছি মেঘ না চাইতেই জল। এমনিতেই কথা বলতে বলতে অসহ্য, তারমধ্যে নিজেই কথা বলা বাদ দিয়ে দিলে, ভালোই হলো। এবার আরামসে দিনাতিপাত করতে পারবো। খালি খাবো, দাবো আর ঘুমাবো।’

‘তোমার খাওয়াও বন্ধ।’

‘সমস্যা নাই, হোটেল থেকে খেয়ে নিব।’ এই বলে আমি বউকে পাত্তা না দিয়ে আবার পত্রিকা পড়ায় মনোনিবেশ করলাম। বউকে দেখলাম বেডরুমের দিকে চলে গেলো।

এভাবে ঝগড়া দিয়েই আমাদের বেশিরভাগ দিন অতিবাহিত হয়। সবসময় আমি ইচ্ছা করেই ঝগড়া বাধাই। এর পেছনে কারণও আছে। প্রতিটা ঝগড়ার সমাপ্তিই অনেক কিউট আর রোমান্টিকভাবে হয়। এটাই ভালো লাগে আমার। কেমন কিউট আর রোমান্টিক সমাপ্তি হয় তা ঝগড়ার পরের অংশ বললেই বুঝতে পারবেন।

যথারীতি আমি পত্রিকা পড়া শেষ করে টিভি দেখতে লাগলাম। বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে এলো। এবার উঠে গোসল সেরে বেডরুমে গিয়ে শোলাম। একটু পর দেখলাম বউ রান্নাঘর থেকে আসলো। এসে ফ্যানের নিচে একটু জিরিয়ে বাথরুমে গোসল করতে ঢুকার আগে দেখি আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে, ‘খাবার ভুলে বেশি রান্না করা হয়ে গেছে। কেউ না খেলে পড়ে থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে যাবে। খাবার নষ্ট করতে না চাইলে খেয়ে ফেলাই ভালো হবে। অবশ্য কেউ যদি অনেক দয়াবান হয় তাহলে বাইরে থেকে কোনো ফকির-মিসকিনকে ঢেকে এনে খাইয়ে দিতে পারবে। যাকগে, সেটা যার যার পারসোনাল ব্যাপার।’

এটা শুনে আমি মনে মনে হাসতে হাসতে বললাম, ‘দেখি কতক্ষণ কথা না বলে থাকতে পারো!’

কিছুক্ষণ পর বউ গোসল সেরে চুল-টুল আচড়িয়ে খাওয়া-দাওয়া না করেই বিছানার অন্য পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লো। আমি অবশ্য জানতাম আমাকে রেখে ও কখনো খাবে না, যেমনটা আমিও ওকে রেখে কখনো খাই না। তো কী আর করার, আমিও চুপচাপ শুয়ে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর দেখি ও বলছে, ‘আমি মার কাছে চলে যাবো আজ বিকালে। কারো আর কোনো কিছুতে অসহ্য হতে হবে না।’

আমি সাথে সাথে প্রতিউত্তর দিয়ে বললাম, ‘ভ্যান নিয়ে এসে দিবো নাকি শুধু রিকসা হলেই চলবে?’

বউ কিছুটা কান্না ও অভিমান জড়িত কণ্ঠে বললো, ‘নিজের ব্যবস্থা আমি নিজেই করে নিব, কাউকে আগ বাড়িয়ে আর সাহায্য করতে হবে না।’

আমি বউকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললাম, ‘যাক বাবা, বাঁচা গেলো। এ বিকেলটা তবে নিরবচ্ছিন্ন ঘুম দিয়ে কাটানো যাবে। আর উঠে দেখবো আপদ বিদেয়। খালি শান্তি আর শান্তি।’

পাশ থেকে বউয়ের গভীর তবে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ পেলাম। মনে হচ্ছে এবার মারাত্মক রেগে গিয়েছে। আল্লাহই জানে আজ কপালে কী আছে! আসলেই বাপের বাড়ি চলে যায় কিনা কে জানে! তবে আমি তখনো কিছু বললাম না। চুপ করে শুয়েই থাকলাম। ওভাবেই ঘন্টাখানেক পার হয়ে গেলো। হঠাৎ মনে হলো বউ আমার ক্ষিদে সহ্য করতে পারে না। সাথে সাথে আমি আর ঠিক থাকতে পারলাম না। এবার বউকে যে করেই হোক রাগ ভাঙিয়ে খাওয়াতে হবে। আমি পাশ ফিরে ওকে জড়িয়ে ধরতে গেলাম। ওমা! এ যে দেখি পুরাই হাই ভোল্টেজের বিদ্যুৎ! এমন শক দিয়েছে পুরো খাট সহ কেঁপে উঠেছে। বুঝলাম এ রাগ ভাঙাতে আমার বহুত পরিশ্রম করতে হবে। অবশ্য আমার শর্টকাট টেকনিক জানা আছে। কিন্তু সেটা সবসময় প্রয়োগ করি না। বউয়ের রাগ ভাঙাতে যত পরিশ্রম, তত মজা! কিন্তু এখন মজার দিকে তাকালে চলবে না। বউ আমার ক্ষুধায় কষ্ট করবে আর আমি মজা নিব তা হবে না। শর্টকাট টেকনিকই প্রয়োগ করতে হবে। আমি ওকে কয়েকবার টেনে তুলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু লাভ হলো না, পঞ্চান্ন কেজির দেহকে পঞ্চান্ন হাজার কেজি বলে মনে হলো! এরপর বললাম, ‘দেখো, আমার প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে। পেট একদম জ্বলে যাচ্ছে। আর এক মুহূর্তও থাকতে পারছি না। প্লিজ ওঠো লক্ষ্মী বউ আমার।’

‘থাকতে বলেছে কে? খাবার সব রেডি করে টেবিলে রাখাই আছে, যেয়ে খেয়ে নেন। আর ক্ষুদা লাগলে যে অসহ্য হারামজাদি বউও লক্ষ্মী বউ হয়ে যায় আজ প্রথম শুনলাম।’

‘ও বউ, তুমি রাগ করছো কেন? ওইটাতো তোমাকে ক্ষেপানোর জন্য বলছি। এবার একটু রাগটা ভাঙো না। আর তুমিতো জানই তোমাকে রেখে আমি এক লোকমাও খাবো না। প্লিজ বাবা, এবার ঊঠোনা। আর পারছি না থাকতে। বিশ্বাস করো খুব কষ্ট হচ্ছে।’

এটা বলে ভাবছি যে বউ আর শুয়ে থাকবে না, এবার উঠে আমার সাথে খাবে। কিন্তু এরপর দেখি ও বলতে শুরু করলো, ‘ক্ষুদার কারণে আপনার আবার কবে থেকে কষ্ট হতে শুরু করলো? অফিসে মাঝে মাঝেতো সারাদিন না খেয়ে থেকে অভ্যাস করছেনই। আজতো হঠাৎ কষ্ট হওয়ার কথা না। এটা কি ক্ষুদার কষ্ট নাকি অন্য কিছু?’

‘ক্ষুদার কষ্ট, তোমার ক্ষুদার কষ্ট।’

এই বলে আমি বউকে আবার তোলার জন্য টান দিলাম। বউ সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমিও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। এরপর কানে কানে বললাম, ‘দাও, সব ক্ষুদা বাড়িয়ে দাও। আজ তোমাকেও খাবো।’

এটা শুনে বউ আদর মিশ্রিত সুরেলা কণ্ঠে বললো, ‘খেও। এখন আগে চলো ভাত খেয়ে আসি।’

ফেসবুকে লেখক: Rihanoor Protik

 

দিবস | প্রয়োজনীয় নাকি অপ্রয়োজনীয়?

Now Reading
দিবস | প্রয়োজনীয় নাকি অপ্রয়োজনীয়?

ইদানীং সোস্যাল মিডিয়ার কারণে আমাদের দেশে বিভিন্ন দিবস অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তন্মধ্যে কয়েকটি হলো ভ্যালেন্টাইনস ডে, মাদার’স ডে, ফাদার’স ডে এবং আজ চলছে ফ্রেন্ডশিপ ডে। অবশ্য ফ্রেন্ডশিপ ডের তারিখ নিয়ে ভিন্নতা রয়েছে। উইকিপিডিয়াতে দুইটা ভিন্ন তারিখই দেওয়া আছে। একটা হচ্ছে ৩০ জুলাই, আরেকটা হচ্ছে আগস্টের প্রথম রবিবার যেটা কিনা আজ চলছে। থাক এই বিষয়ে আর যাব না, আজ এই লেখার প্রসঙ্গ এটা না।

প্রতিটা দিবস ঘিরেই দু ধরনের দলের উৎপত্তি হতে দেখা যায়। একটা দল প্রতিটা দিবসেই অন্যকে শুভেচ্ছা জানায়, সেই দিবস সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে স্মৃতিচারণ করে। আরেকটা দল সেটার সমালোচনা করে। যেমন মা দিবসে অনেকে তাদের মাকে শুভেচ্ছা জানায়, বিভিন্ন সারপ্রাইজ দেয়। মাকে নিয়ে তাদের বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। আর অন্য দলটা সেটার সমালোচনা করে বলে যে মাকে নিয়ে আবার দিবস কিসের! প্রতিটা দিবসই মা দিবস, প্রতিটা দিনই মাকে ভালোবাসার দিন। হ্যাঁ, তাদের কথা একেবারে ভুল নয়। তবে আমি মনে করি দিবসেরও প্রয়োজনীয়তা আছে। মাকে যেমন আমরা প্রতিদিনই ভালোবাসলেও সেটা আসলে সেভাবে কখনো প্রকাশ করা হয় না। মাকে নিয়ে দিবস থাকায় সেদিন একটু বিশেষভাবে সেটা প্রকাশ করতে পারি। তাদের নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে পারি, বিভিন্নজনের স্মৃতি কিংবা বিভিন্ন মধুর ঘটনা জানতে পারি। এতে করে মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধাটাও অনেকটা বেড়ে যায়। মাকে হুট করে গিয়ে ভালোবাসার কথাটা বলা যায় কিংবা কোনো একটা সারপ্রাইজ দিয়ে খুশি করা যায় যা এমনিতে প্রতিদিন সম্ভব নয়। সুতরাং মা দিবস উদযাপন করাতে আমি খারাপ কিছু দেখি না।
এছাড়াও আজকের ফ্রেন্ডশিপ ডে নিয়ে বলতে গেলেও এমন অনেক কিছু বলা যায়। আমাদের সকলেরই এমন অনেক ভালো ফ্রেন্ড আছে যাদের সাথে এক সময় দিনের বেশিরভাগ সময় কাটানো হলেও এখন কালের পরিক্রমায় তারা একেকজন একেক জায়গায় চলে গিয়েছে। যোগাযোগও হয় না তেমন একটা। কিন্তু এই ফ্রেন্ডশিপ ডে তে তাদের কথা সবারই একটু বিশেষভাবে মনে হবে। অনেকে তাদের শুভেচ্ছা জানাবে এতে করে পুরাতন বন্ধুত্বটা আরো সুহৃদ হবে, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ব বাড়বে। শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে হয়তো অনেকে কথোপকথনও জুড়ে দিবে। উঠে আসবে না বলা অনেক কথা। সব মিলিয়ে এই দিবস পালন করাকে আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় কিছু মনে হয় না। বরং এটা প্রয়োজনীয়, অনেক বেশিই প্রয়োজনীয়, অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়। যদি অপ্রয়োজনীয়ই হতো তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বে এতো এতো দিবসের উৎপত্তি হতো না। সুতরাং আসুন আলোচনা সমালোচনা বাদ দিয়ে প্রতিটা দিবস থেকেই ভালো কিছু বের করে আনার চেষ্টা করি। ভালোবাসা দিবসে গার্লফ্রেন্ডের সাথে ভালোবাসা দিবসেরই অযুহাতে সারাদিন ডেট করে বাসায় এসে সেই ভালোবাসা দিবসেরই সমালোচনা বন্ধ করি।

আসলে দুনিয়াটা এমনই যে এখানে যে কেউ যত ভালো কিছুই করুক না কেন তার বিপক্ষে কেউ না কেউ থাকবেই। আপনি কিছু করছেন, আপনার বিবেকই বলে দিবে সেটা ভালো নাকি খারাপ। সুতরাং ভালো কিছু করতে গিয়ে দুই-একজনের সমালোচনায় কখনো দমে যাবেন না। তাছাড়া তাদের সমালোচনা কানে নেওয়াই দরকার নেই যারা কখনো আপনার ভালো কাজেরও প্রশংসা করেনি।

আজকে যেহেতু বন্ধুত্ব দিবস তাই বন্ধুত্ব নিয়েই একটা নীতিগল্প শেয়ার করি।

একদিন দুই বন্ধু মরুভূমি দিয়ে হাটছিল। হঠাৎ তাদের মাঝে কোনো কারণে বাকবিতন্ডা হওয়ায় একবন্ধু আরেক বন্ধুকে থাপ্পর মারে। এরপর থাপ্পর খাওয়া বন্ধুটি বালির মধ্যে লিখে- আজ আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু আমাকে থাপ্পর মেরেছে। এরপর তারা আবার হাঁটতে থাকে একটা সমুদ্র না পাওয়া পর্যন্ত যেখানে তারা গোসল করতে পারে। সমুদ্র পাওয়ার পর গোসল করার সময় থাপ্পর খাওয়া বন্ধুটি হঠাৎ ঢেউ আসায় ডুবতে শুরে করে এবং তার থাপ্পর মারা বন্ধুটি তাকে বাঁচায়। এরপর সে পাথরে খোদাই করে লিখে রাখে- আজ আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু আমাকে বাঁচিয়েছে। তো এটা দেখে যে বন্ধুটি থাপ্পর মেরেছিল এবং বাঁচিয়েছিল সে জিজ্ঞেস করে, “তোকে মারার পর সেটা তুই বালিতে লিখে রাখলি আর এখন বাঁচানোর পর পাথরে কেন?” অন্যজন উত্তর দেয়, ” কেউ আমাদের আঘাত করলে সেটা বালিতে লিখে রাখা উচিৎ যাতে ক্ষমার বাতাস এসে তা মুছে দিতে পারে। কিন্তু, কেউ আমাদের ভালো কিছু করলে সেটা খোদাই করে লিখে রাখা উচিৎ যাতে কোনোকিছুই সেটাকে মুছতে না পারে।”

এই গল্পটার মোরালটা এমনই যে আমাদের কেবল কারো ভালো কিছুকেই মনে রাখা উচিৎ এবং খারাপটাকে ক্ষমা করে দিয়ে ভুলে যাওয়া উচিৎ। সেদিন সে বন্ধুটি থাপ্পর খাওয়ার পর যদি সেটা মনে রাখতে গিয়ে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দিত এবং একা একাই যদি সমুদ্রে গোসল করতে যেত তবে তার কিন্তু ঢেউয়ে ডুবে মরার একটা সমূহ সম্ভাবনা থাকতো। আসলে বিপদে কখন কাকে প্রয়োজন হয় তা আমরা কেউ জানি না। তাই কারো খারাপ কিছুকে মনে না রেখে সেটা ভুলে গিয়ে সবার সাথে সবসময় মিলে মিশেই থাকা উচিৎ।

যাহোক, সবাইকে ফ্রেন্ডশিপ ডের শুভেচ্ছা- হ্যাপি ফ্রেন্ডশিপ ডে। ফ্রেন্ডকে নিয়ে আপনাদের কারো কোনো মজার ঘটনা থাকলে কমেন্টে বা আমার ফেসবুকের ইনবক্সে শেয়ার করতে পারেন। আমার ফেসবুক আইডি লিংক এখানে খুঁজলেই পাবেন। না পেলে কমেন্ট করুন, আমি পরে রিপ্লাই দেবো। ভালো ও সুন্দর কিছু ঘটনা পেলে ঘটনা বর্ণনাকারীকে মেনশন করে সেসব ঘটনা কোনো একদিন কোনো একটা লেখার মাধ্যমে সবার সাথে শেয়ার করবো। ভালো থাকুন, সবাইকে ভালো রাখুন।

আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ৩য় এবং শেষ পর্ব

Now Reading
আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ৩য় এবং শেষ পর্ব

আমাদের বাড়ির পাশেই একটা পুকুর রয়েছে যেটা সে সময় পানিতে ভরা ছিল। চিৎকার শুনে আমি বাইরে বেরিয়ে প্রথমে কিছু দেখতে না পেলেও পুকুরের দিক থেকে আসা পানিতে ছটফটানির এক ধরনের শব্দ শুনি। সাথে সাথে সেদিকে দৌড়ে গিয়ে দেখে বুঝতে পারি তারা দুজনেই পানিতে পড়ে আছে। আমার ইরিনা সাঁতার জানতো না, তারপরেও দেখি সে ডুবে ডুবে তার দুহাত দিয়ে আমাদের তিয়াশাকে পানির উপরে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সে এক অনন্য হৃদয় বিদারক ভয়ঙ্কর এবং মধুর দৃশ্য। মা নিজে মরে যাচ্ছে অথচ তার সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, একই সাথে এর মত ভয়ঙ্কর ও মধুর দৃশ্য আর কী হতে পারে? এখনো এই ঘটনাটির কথা আমাদের অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। দৃশ্যটা দেখে আমি তৎক্ষণাৎ ঝাঁপ দিয়ে নেমে তিয়াশাকে ওর হাত থেকে নিয়ে এক হাত দিয়ে তিয়াশাকে ধরে রেখে অন্য হাত দিয়ে ওকে তুলে ধরার চেষ্টা করি। এরইমধ্যে আরেকজন ঝাঁপ দিয়ে নেমে আমার হাত থেকে তিয়াশাকে নিয়ে উঠে যায়। আমি এদিকে প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকি ইরিনাকে তোলার জন্য। কিন্তু ওর দিক থেকে কেমন যেন কোনো সাড়া পাচ্ছিলাম না। শরীরটা অনেক ভারী ভারী মনে হচ্ছিল। পুরো দেহটা পানির নিচে ছিল। ইতোমধ্যে আরো কয়েকজন ঝাঁপ দেয় এবং সবাই মিলে একপর্যায়ে ওকে পাড়ে তুলতে সক্ষম হই। পেটে চাপ দিয়ে পানিও বের করেছিলাম অনেক। পানি বের করার সময় একবার শুধু কাশি দিয়েছিল। কে জানতো সেটাই ছিল আমার চোখে দেখা আমার ইরিনার, আমার প্রিয় ইরিনার শেষ স্পন্দন!

এরপর দ্রুত ডাক্তারও আনা হয়েছিল, কিন্তু ওকে আর ফেরানো সম্ভব হয়নি। শুনেছিলাম সেদিন ডাক্তারের মুখে ওর চলে যাওয়ার কথা শুনে আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। পাক্কা ছ’ঘন্টা নাকি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। যখন জ্ঞান ফিরে তখন ওর ধোয়ানো শেষ, জানাজা পড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। জানাজা পড়ানোর আগে একবার আর পরে একবার এই দুবার আমায় তাকে দেখতে দেওয়া হয়েছিল। আমি নাকি সেদিন অনেক পাগলামো করছিলাম। তাই কবর দেওয়ার সময় আমাকে যেতে দেওয়া হয়নি। এরপর চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে আমি নাকি আবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। মোটামুটি দুদিন পর নাকি জ্ঞান ফিরেছিল, এর মাঝে নাকি স্যালাইনও দিয়ে রাখা হয়েছিল। এভাবেই আমার জীবনের সুখ নামক চশমার একটি হাতল ভেঙে যায় আর সুখটিও খসে পড়ে। এরপর আরো মাসখানেক আমি অপ্রকৃতস্থ ছিলাম। দুনিয়াবি কোন কিছুতে আমার তেমন মনযোগ ছিল না। আমার মেয়েকে দেখলেই আমি কান্না করে দিতাম। এতো বললাম কেবল আমার কথা। এছাড়াও আমাদের উভয়ের পুরো পরিবারটিও একেবারে ভেঙে পড়েছিল। আমার বাবা-মার অতি আদরের পুত্রবধু এবং তাদের দুই বছরের আদরের নাতনীর মার এভাবে চলে যাওয়াটা তারাও কোনভাবে মানতে পারেনি। আর ওদিকে ওর বাবা-মা তাদের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে স্বাভাবিকভাবেই একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। তারপর আস্তে আস্তে মাসখানেকের মাথায় আমরা যখন সবাই কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করি তখন ওর বাবা-মা আমাদের কাছে অনুরোধ করে আদরের নাতনী তিয়াশাকে তাদের কাছে রাখার জন্য। তারা তিয়াশাকে তাদের কাছে রেখে একমাত্র সন্তান হারানোর দুঃখকে কিছুটা প্রশমিত করতে চাচ্ছিল। আমি প্রথমে রাজি না হলেও পরে অনেক চিন্তা করে দেখলাম যে ঢাকায় আমাদের বাসা থেকে তাদের বাসা বেশি দূরে না হওয়ায় ঘন ঘন যাওয়ারও একটা সুযোগ থাকবে এবং তারাও তাদের একমাত্র মেয়ে হারানোর কষ্ট থেকে কিছুটা রেহাই পাবে তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নিই। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই তিয়াশাকে তাদের কাছে রাখা হয়। এরপর আস্তে আস্তে আমদের স্বাভাবিক জীবন শুরু হতে থাকে। মা-বাবাকে নিয়ে ঢাকায় গিয়ে আমি আবার অফিস করতে শুরু করি। ওদিকে ইরিনার বাবা-মাও আমাদের তিয়াশাকে নিয়ে জীবন যাপন করতে থাকে। প্রায় প্রতিদিনই আমি অফিস শেষে তিয়াশাকে দেখতে যাই, মা-বাবাও যায় প্রায়ই। উনারও তিয়াশাকে নিয়ে বেড়াতে আসেন মাঝে মাঝেই। এভাবে দেখতে দেখতেই দুটি বছর চলে যায়। এর মাঝে আমার নতুন করে বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে অনেক কিন্তু আমি না করে দিয়েছি। একদিন আমার ছোট ফুপু একটি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে, মেয়ের নাম আদ্রিয়ানা। বিয়ে করার ইচ্ছে না থাকায় আমি শুনেই না করে দিলেও মা কেমন যেন এবার আর ছাড়ছিলেন না। মার চাপাচাপিতেই আমি একসময় বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যাই। মা নাকি এই ব্যাপারটি নিয়ে আমার ইরিনার বাবা-মার সাথেও কথা বলেছিল। তাদেরও নাকি এই মেয়ের ব্যাপারে পূর্ণ সম্মতি ছিল এবং বলেছিল এই মেয়েকে বিয়ে করলে নাকি তারাও খুশি হবে। কী জানি বাবা কী আছে এই মেয়ের মাঝে, সবারই এতো তোড়জোড়! আমার আর রাজি না হয়ে উপায় ছিল না।

আজ একটু পর এই মেয়েকে বিয়ে করতেই বের হবো। গতরাতে ইরিনাকে স্বপ্নে দেখেছিলাম, স্বপ্নেও ও দেখি আমাকে বিয়েটা করতে বলছে। অবশেষে আদ্রিয়ানা নামক মেয়েটাকে বিয়ে করার জন্য পুরোপুরি মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। হয়েও যায় সেদিন আমাদের বিয়েটা। তিয়াশা নতুন মাকে বিয়ের রাতেই বাসায় আনার পর থেকেই যে কী খুশি ছিল বলার মত না। ওর নতুন মাও ওকে কাছে পেয়ে ছাড়ছিল না। ওদের দুজনের কান্ড দেখে শেষমেশ বাসর রাতে তিয়াশাকে আমাদের সাথেই রেখেছিলাম। নতুন মায়ের আদর পেয়ে বাবার কথাতো প্রায় ভুলেই যাবার যোগাড়। ভাগ্যিস নতুন মায়ের সামনেই বাবা বসে ছিল নাহলে নির্ঘাত ভুলে যেতো। তবে নতুন মায়ের নতুন আদরে বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারেনি। তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়েছিল। এরপর ওকে পাশে শুইয়ে রেখে সারারাত গল্প করেছিলাম আমি আর আদ্রিয়ানা। আমার আর ইরিনার সকল কাহিনী প্রায় একরাতেই বলে শেষ করেছিলাম ওকে!

আস্তে আস্তে বাড়ি থেকে বিয়ের আমেজ শেষ হয়ে যায়। আত্মীয়স্বজন যার যার মনে নিজেদের বাসায় চলে যায়। তিয়াশাকেও ওর নানা-নানী নিয়ে চলে যায়। আমি আর আদ্রিয়ানা অনেক রাখতে বলেছিলাম আর দুটো দিন, কিন্তু নানা অজুহাতে সেদিন আর রাখেনি। আমার নতুন সংসার জীবন শুরু হয়ে যায়। আদ্রিয়ানা মেয়েটা সত্যিই অনেক ভালো। ওর নিজের তুলনা ও কেবল নিজেই ছিল। তবুও আমি আদ্রিয়ানার মাঝে বারবার আমার ইরিনাকে খুঁজেছি। পেয়েছিও অনেক। আদ্রিয়ানাও আমার চাহিদা বুঝে সে অনুযায়ী নিজেকে ইরিনার মত করে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতো। শুনেছি মেয়েরা নাকি তাদের স্বামীর ভালোবাসার ভাগ অন্য কোনো মেয়েকে দিতে চায় না। কিন্তু আদ্রিয়ানার মধ্যে ওমনটা কখনো দেখিনি। ও নিজেই মাঝে মাঝে আমাকে ইরিনার ব্যাপারে গল্প করতে বলতো। করতামও আমি আর ও সেটা মনযোগ দিয়ে শুনতো। কিছুদিন পর পর তিয়াশাকে দেখতে যেতাম দুজনই। এভাবে চলতে চলতেই এসে যায় আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী। রাত বারোটায় ও আমাকে সাথে নিয়ে চুপিচুপি ছোট্ট একটা কেক কেটেছিল সে রাতে। এরপর ও আমাকে এমন একটা উপহার দেয় যা আমাকে রীতিমত সে রাতে সারপ্রাইজড করেছিল। সেটা ছিল বিশাল একটি ফ্রেমে বাঁধানো ইরিনার ছবি। তারপর ও নিজেই সেটা সে রাতে দেওয়ালে থাকা আমার একটি বড় ছবির পাশে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। সেদিন ওকে জড়িয়ে ধরিয়ে কেঁদেছিলাম আমি অনেক। কিন্তু কে জানতো সকালে এরচেয়েও বড় সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে! সে রাতে রাতভর আমরা অনেক দুষ্টুমি করেছি, আদর করেছি। সেজন্যে পরদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হয়ে যায়। ঘুমে থেকে জেগে দেখি ও পাশে নেই। বাথরুমের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ভাবলাম ও হয়তো গোসল করছে। একটু দুষ্টুমি করার জন্য বাথরুমের সামনে গিয়ে দরজা ধাক্কা দিতেই দেখি বাথরুম পুরো ফাঁকা। হতাশ হয়ে ভাবলাম হয়তো গোসলের কাজ আগেই সেরে ফেলে এখন রান্না করছে। কিচেনে গিয়ে দেখি সেখানেও নেই, কেবল মা একা রান্না করছে। মাকে জিজ্ঞেস করলাম ও কোথায়। মা বললো জানে না কিছু, হঠাৎ নাকি বেরিয়ে গেছে। আমিতো অবাক, এভাবে হঠাৎতো কখনো কাউকে কিছু না বলে ও বেরোয় না। ফোন দিলাম, বললো কিছুক্ষণের মাঝেই আসছে। কোথায় আছে জিজ্ঞেস করায় বললো সেটা সারপ্রাইজ, বলা যাবে না। কী আর করার! আমি ফোনটা রেখে ভাবতে লাগলাম কী এমন সারপ্রাইজ ও আমাকে আবার দিতে যাচ্ছে। রাতেইনা আমাকে ইয়া বড় একটা সারপ্রাইজ দিলো, ওটা দেওয়ার পর আর কী সারপ্রাইজ হতে পারে! শেষমেশ কোনো কূল-কিনারা করতে না পেরে আমি গোসল করে ফ্রেশ হয়ে ওর জন্য বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আধঘণ্টা পর কলিং বেল বাজলো। আমি উঠে দরজা খোলার জন্য রুম থেকে বেরুতেই দেখি মা ইতোমধ্যে দরজা খুলে দিয়েছে আর আদ্রিয়ানা একেবারে খালি হাতে প্রবেশ করছে। আমি সারপ্রাইজের আশায় আশায় বসে থেকে ওকে এভাবে খালি হাতে ফিরতে দেখে মনে মনে এক প্রকার সারপ্রাইজডই হলাম। ও হঠাৎ সামনে এসে আমার চোখ বন্ধ করতে বললো এবং না বলা পর্যন্ত খুলতে না করলো। আমিও তাই করলাম। ও আমার হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে গেলো। মনে হলো দরজার সামনে নিয়ে গেলো। এবার চোখটা খুলতে বললো। আমি চোখ খুলে যা দেখলাম তাতে আমি সত্যিই হঠাৎ মারাত্মকভাবে সারপ্রাইজড হয়ে গেলাম!

আমি দেখলাম আমার মেয়ে তিয়াশা আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে। আমাকে চোখ খুলতে দেখেই ও দৌড়ে এসে আমায় জড়িয়ে ধরলো। পাশ থেকে আদ্রিয়ানা বলছিলো ও ইরিনার বাবা-মাকে নাকি অনেকদিন ধরেই বোঝানো-সোঝানোর পর আজ থেকে একেবারের জন্যই তিয়াশাকে এনে পড়েছে আমাদের মাঝে। আর উনারা নাকি কথা দিয়েছেন খারাপ লাগলেই এখানে চলে আসবেন, আজকের এই বিশেষ দিনেতো আসবেনই। সব মিলিয়ে সে দিনটাই ছিল ইরিনা চলে যাবার পর আমার সবচেয়ে আনন্দের দিন। তবে সেদিন এটুকুতেই শেষ হয়নি। রাত বারোটা পেরোনোর আগেই আমিও সেদিন আদ্রিয়ানাকে একটা সারপ্রাইজ দিয়েছিলাম। ওরও একটি ছবি আমি ইরিনারটার মতই বড় করে বাঁধাই করে এনে আমার ছবিটার অন্যপাশে লাগিয়ে দিয়েছিলাম। ও সেসময় এতটাই খুশি হয়েছিল যে যতটা খুশি আমি ওকে আমাদের বিয়ের পরে কখনো হতে দেখিনি। সেদিনের সে রাতটি ছিল আমার দ্বিতীয় বিয়ের দ্বিতীয় বাসর। সে রাতে আদ্রিয়ানাকে কানে কানে আরো একটা সারপ্রাইজ দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আগামী এনিভার্সারির আগেই আমাদের জীবনে খোদা চাহেতো নতুন অতিথি চাই।

আগের পর্বগুলো:

আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ১ম পর্ব

আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ২য় পর্ব

আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ২য় পর্ব

Now Reading
আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ২য় পর্ব

সেদিন আন্টির কন্ঠে এমন কি ছিল আমি আর না করতে পারিনি। পরেরদিনই গিয়েছিলাম তাদের বাসায়। তবে এমন সময় গিয়েছিলাম যখন তার আর তার বাবার বাসায় থাকার কথা না। কিন্তু গিয়ে দেখি সে নেই ঠিকই কিন্তু তার বাবা ছিল। আমাকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসানো হলো এবং কিছুক্ষণ পর তার বাবা-মা দুজনই আসলো। আমি দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম। সালামের জবাব দিয়ে আন্টি আমাকে বসতে বললো। তারপর কুশল বিনিময় শেষে আমাকে বলতে শুরু করলো, ‘দেখো বাবা তোমাকে আজ মূলত যা বলতে যাচ্ছি তা তুমি কিভাবে নিবে জানি না কিন্তু আমাদের বলতেই হবে।’
‘আন্টি আপনি নিঃসংকোচে বলুন, আমি কিছু মনে করবো না। আপনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।’
‘সেদিন তোমার পড়ানো বাদ দেওয়ার ব্যাপারটা যেকোন অজুহাতেই আমাদের মেয়েকে বলার পর থেকেই ও কেমন যেন হয়ে যায়। বুঝতে পারছিলাম ও নিজেও তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে গিয়েছিল এবং বাদ দেওয়ায় প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে আমাদের কাউকে কিছু বলেনি আমরাও ভেবেছিলাম কিছুদিন বাদে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দিন দিন ওর শরীর-স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে। পড়াশোনায় অমনযোগী হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে একটা মারাত্মক খারাপ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছিল ব্যাপারটা। ডাক্তার দেখিয়েছি কয়েকবার লাভ হয়নি। পড়ে বুঝতে পারলাম তোমার সঙ্গ না পেলে ভালো হবে না। এদিকে তুমি ওকে পড়াবে না বলে আমার কাছে হাতজোড় করে অনুমতি নিয়েই গিয়েছ সুতরাং তোমাকে পুনরায় পড়াতে বলার মুখও আমাদের নেই। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দেখলাম একমাত্র বিয়ে ছাড়া তোমাদের একসাথে রাখার কোনো উপায় নেই। তাই আমরা ভাবছি তোমাদের দুজনের বিয়ে দেওয়ার। তুমি হয়তো এখন ভাবছো কেবল ওকে ভালো রাখার জন্যই তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাচ্ছি। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। তুমি যেদিন আমাকে তাকে আর না পড়ানোর ব্যাপারে বলেছিলে সেদিনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম খোদা চাহেতো তোমার সাথেই ওকে বিয়ে দিব। হয়তো সেটা অনেক দেরী হতো কিন্তু এখন ওর শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে এখনই করার কথা ভাবতে হচ্ছে। তোমাকে বিয়ে করতে রাজী কিনা জিজ্ঞেস করায় ও যদিও কিছু বলেনি কিন্তু ওর মুখের ঐ মুহূর্তের অবয়ব দেখে আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি ও এতে কতটা খুশি হবে। ওর মৌন সম্মতি পেয়ে তোমার আঙ্কেল তোমার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছে। এরমধ্যে তোমাদের গ্রামের বাড়িতেও গিয়েছিল তোমার আঙ্কেল বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। তোমার পরিবার প্রথমে এতো তাড়াতাড়িই তোমার বিয়ে দিতে অসম্মতি জানালেও সবকিছুর বিবেচনায় পরবর্তীতে রাজী হয়েছে। গত পরশু তোমার বাড়ি থেকে তোমার মা সহ আরো কয়েকজন এসে আমার ওকে দেখেও গেছে। সবাই পছন্দ করেছে এবং চূড়ান্ত ও পূর্ণ সম্মতিও দিয়েছে। আমাদের অনুরোধেই তারা এই বিশাল ব্যাপারটি গোপনেও রেখেছে তোমার কাছে। তোমাকে জানানো এবং বিয়ের ব্যাপারে সম্মতি নেওয়ার দায়িত্বও আমাদের উপরে দিয়েছে। এখন বলো বাবা তোমার এ ব্যাপারে মতামত কী।’

আমি এতসব কথা শুনে একেবারে ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিল আমি এমন কী পুণ্য করেছি যেজন্য খোদা আমাকে আমার স্বপ্নের মানুষকে এভাবে আমার হাতে তুলে দিতে চাচ্ছে। তবে আমি সেদিন আমার মতামত জানাইনি। আমার পরিবারের সবাই সত্যিই মন থেকে রাজী হয়েছে কিনা না জেনে আমি কোনভাবেই আমার সম্মতি জানাতে পারি না। একদিনের জন্য সময় নিয়ে সেদিন চলে এসেছিলাম। বাসায় এসে রাতে মাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম তারা সবাই সত্যিই মন থেকে রাজী কিনা। মার কথা শুনে বুঝেছিলাম তারা সবাই অনেক খুশি মনেই রাজি। তার পরেরদিন আন্টিকে ফোন করে আমার নিজের সম্মতির কথাও জানিয়েছিলাম। এর সপ্তাহখানেকের মাঝেই আমাদের বিয়েটা হয়ে গিয়েছিল। আমার ইচ্ছাতেই কোনো অনুষ্ঠান করা হয়নি। আমি চেয়েছি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ওর ভালোভাবে ভরণ-পোষণ করার মত অবস্থায় পৌঁছে নিজের টাকাতে বড় করে একটা জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করে ওকে তুলে নিব। তবে আমাদের বাসরঘরটা অনেক জাকজমক করে সাজানো হয়েছিল ওদের বাড়িতেই, ওটা নাকি ওর ইচ্ছা ছিল। বাসরঘরের রাতটা নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। আমি যখন রাত বারোটার দিকে বাসর ঘরে ঢুকি তখন দেখি ও ইয়া বড় ঘোমটা তুলে বসে আছে। আমাকে ঢুকতে দেখেই অতি মিষ্টি লজ্জামিশ্রিত কণ্ঠে সালাম দিয়েছিল। আমি সালামের জবাব দিয়ে ওর পাশে গিয়ে বসে ঘোমটা তুলতেই ও আমার বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। আমি ওর পিঠে হাত রেখে বলি, ‘আজকের এই মধুর আনন্দের দিনে কেন কাঁদছো জানি না। তবে এই তোমার শেষ কাঁদা, যত ইচ্ছা কেঁদে নাও, আর কখনো কাঁদতে দেবো না তোমায়।’
ও অনুযোগের সুরে বলতে থাকে, ‘ওভাবে হঠাৎ করে পড়ানো বাদ না দিলে হতো না? কী এমন তোমার পড়ার চাপ বেড়ে গিয়েছিল যে ওভাবে হঠাৎ করে বাদ দিতে হয়? একটুও খারাপ লাগেনি বুঝি?’
‘খারাপ লেগেছে কি লাগেনি তা যদি জানতে তবে এ কথা কখনো বলতে না। আমি আসলে তোমার প্রতি অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে কষ্ট হচ্ছিল। তাই বাধ্য হয়েছিলাম তোমার কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। তবে কথা দিচ্ছি আর কখনো তোমার থেকে দূরে থাকবো না। আজ থেকে আমি তোমার সবসময়ের জন্য প্রাইভেট টিউটর হয়ে গেলাম প্রিয় ইরিনা।’

এরপর থেকে আমি যে তাকে কত পড়িয়েছি! আর সে যে কত রকমের পড়া হিসাব নেই! বইয়ের পড়া, তার থেকেও বেশি ভালোবাসার পড়া; আদরের পড়া, টক-মিষ্টি-ঝালঝাল পড়া। মাঝে মাঝে মান-অভিমানের পড়াও পড়াতাম। সব মিলিয়ে মারাত্মক সুন্দর ভালোবাসাময় দিন অতিবাহিত করছিলাম আমরা। ওর বাবা-মা আমাকে ওদের বাসাতেই থাকতে বলেছিল কিন্তু আমি তাতে রাজি হয়নি। ঘর জামাই হয়ে আমার পক্ষে থাকা সম্ভব না। আমি আমার আগের মত মেসেই থেকেছি। তবে প্রতিদিন ওকে পড়াতে যেতাম। পড়ানোর সময় আদর, ভালোবাসা, খুনসুটি সবই হতো। আর ওর অনেক অনুরোধে সপ্তাহে একদিন থেকে যেতাম ওদের বাসায়। মাঝেমাঝে বের হতাম ওকে নিয়ে, হারিয়ে যেতাম দূর দিগন্তে। হানিমুনও করে ফেলেছিলাম এর মাঝে। গিয়েছিলাম সপ্তাহখানেকের জন্য কক্সবাজার। প্রতিদিন একসাথে সমুদ্রের জলে গোসল করেছি, একসাথে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখেছি। সেসব কেবলই আজ স্মৃতি। আজ এতদিন পর মনে হওয়াতেও চোখ ভিজে যাচ্ছে। কোনভাবেই মেনে নিতে পারছি না। কথায় আছে, সুখ বেশিদিন সয় না। কথাটা যে কতটা সত্যি তা হারে হারে টের পাচ্ছি।

যথারীতি আমার গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হয়ে যায়। কয়েকমাসের ব্যবধানে ভালো একটা চাকরীও জুটে যায়। চাকরীর পাশাপাশি পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশনটাও কমপ্লিট করি। এরপর অনেক ভালো একটা মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানি থেকে উচ্চ পদস্থ একটা চাকরীর সুযোগও আসে। দেরি না করে সেটাও লুফে নিই। ইতোমধ্যে নিজে একটা ভালো ফ্লাট বাসাতেও থাকা শুরু করেছি, ইরিনাকেও এনেছি। ও নিজেও এখন গ্র্যাজুয়েশন করছে, ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের উপর। ওর আর এক বছর আছে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করতে। চিন্তা করছি ওর গ্রাজুয়েশনটা কমপ্লিট হলেই একটা জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করে পূর্ণ মর্যাদায় ওকে আমাদের বাড়ির বউ করে নিয়ে যাবো। হলোও তাই। আত্মীয় স্বজন সবাই এসেছিল। প্রত্যেকেই অনেক খুশি। পুরোদমে আমাদের সাংসারিক জীবন শুরু হয়ে যায়। এরই এক বছরের মধ্যে আমাদের একটি মেয়েও হয়। নাম রাখি তিয়াশা। যদিও ওর ইচ্ছা ছিল ছেলে কিন্তু আমি মনে মনে মেয়েই চেয়েছিলাম। খোদা আমার ইচ্ছাই পূরণ করেছিলেন। দেখতে দেখতে আমাদের তিয়াশা মার দুই বছর হয়ে যায়। এরমধ্যে সবকিছু ভালোই চলেছে। সুখের কোনো ঘাটতি ছিল না। একবার রোজার ঈদের কিছুদিন আগে বাবা-মা সহ পুরো পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে যাই ঈদ করতে। বলে রাখা ভালো আমি ইতোমধ্যে আমার বাবা-মাকে ঢাকায় আমার নতুন কেনা ফ্লাটে পাকাপাকিভাবে নিয়ে এসেছিলাম। সবাই মিলে খুব আনন্দেই দিন কাটছিল আমাদের। মা-বাবাও তাদের নাতনীকে সারাক্ষণ কাছাকাছি পাওয়ার সুযোগ পেয়ে অনেক খুশিই ছিল। তো যথারীতি ঈদের কয়েকদিন আগে একদিন সকাল বেলায় ইরিনা তিয়াশাকে নিয়ে বাইরে হাটতে বের হয়। আমাকেও বলেছিল কিন্তু আমার চোখে অনেক ঘুম থাকায় আর বের হয়নি। ওর আগে থেকেই সকালে হাটাহাটির অভ্যাস ছিল তাই সেদিনও বেরিয়েছিল। ইতোমধ্যে আমাদের তিয়াশা মা ভালোই হাটতে ও দৌড়াতে শিখেছে। তো তারা হাটতে বের হওয়ার পর হঠাৎ ঠিক কিভাবে কী হয়েছিল আজও জানি না, কিন্তু বাইরে কিছুটা দূর থেকে প্রচন্ড একটা চিৎকার শুনি। দ্রুত উঠে দৌড়ে গিয়ে যা দেখি তা আজও আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং মধুর একটা দৃশ্য হয়ে রয়েছে।

আগের পর্ব: আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ১ম পর্ব

[আগামী পর্বটি হতে যাচ্ছে ৩য় এবং শেষ পর্ব। আজকের পর্বটি কেমন লেগেছে জানি না, তবে এটুকু আশা করতে পারি আগামী পর্বটি অনেক চমক, উত্তেজনা ও ভালোলাগায় ভরপুর থাকবে।]