রমজান মাস এবং আমরা।

Now Reading
রমজান মাস এবং আমরা।

রোজা চলে এলো। সংযম সিয়াম সাধনার মাস এই রমজান মাস। আর কদিন পরেই সব মুসলিম প্রধান দেশগুলোর মানুষদের এক মাসের জন্য জীবনধারা বদলে যাবে।এই গরমের ক্লান্ত দুপুরে যখন সব মা বোনেরা ভাতঘুমের আরামে বিভোর, আর কদিনপর এই সময়টায় তারা বিভোর থাকবে নিত্য নতুন ইফতারী আইটেম বানানোর প্রস্তুতি নিয়ে।
এখন পাল্লা দিয়ে চলবে ইফতারের আইটেম বাড়ানোর আয়োজন; কার ইফতারের টেবিল কতো ভরপুর থাকবে তা নিয়ে। কয় পদের জুস্ করা হলো না হলো তা নিয়েও চলবে বাকবিতন্ডা। আজওয়া খেজুর নাকি মরিয়ম খেজুর, ট্যাং নাকি রুহ্আফজা? ভাজা পোড়া আইটেম বেশি থাকবে নাকি স্বাস্থ্যকর কিছু; এই নিয়েও কিছু তর্ক বিতর্ক চলবে বেশ কয়দিন। বাজারে ছোলা,পেয়াজ,তেল,শসা, বেগুনের আকাশচুম্বী দাম হবে। এরমধ্যে কোনটার দাম ১০০ টাকা কেজি ছাড়িয়ে যাওয়ার ইস্যু নিয়ে দেশের খবরের কাগজ গুলো নানান ফিচার করবে। হোটেল মোটেল গুলোতে ঘনঘন ইফতার পার্টি হবে। টিভির খবর পাঠিকাদের পুরো মাস ঘোমটা পরিহিত অবস্থায় দেখা যাবে। শপিং মলগুলো তে ভীড় বাড়তে থাকবে। ঈদ ফ্যাশন বলে বলে নানারকম ভূত-অদ্ভুত ফ্যাশন চালু হবে। এক শ্রেণীর ক্রেতারা সেসব কিনতে না পারলে ডিভোর্স বা আত্মহত্যা করবে। রাস্তায় রাস্তায় চাঁদাবাজি বেড়ে যাবে। ছিনতাই,চুরি ডাকাতির খবর ঘনঘন শোনা যাবে। যথাযথ স্হানে পার্ক করা গাড়ি খোঁড়া যুক্তি প্রদর্শনের কারনে অযথা কেস খাবে। কার ঈদ ড্রেস কতো গর্জিয়াস হলো, ঈদের জুতো কতো ফ্যাশনেবল হলো সেই প্রতিযোগিতা চলবে। মসজিদে কিছু সিজনাল মুসুল্লীদের আনাগোনা দেখা যাবে।……. সবই হবে। হবেনা প্রকৃত অর্থে যাকে সংযম করা বলে,সেটাই।
ইসলাম আমাদের সংযমী হতে বলেছে, রোজার মাস আমাদের সেই শিক্ষাটাই দেয় মূলত। সংযম খাবার দাবারের উপর, টাকা-পয়সা খরচের উপর, নিজেদের ব্যবহারের উপর, রোজকার জীবনযাপনের উপর। অতিরন্জিত যে কোন কিছুকে ইসলমা সমর্থন করেনা। অথচ আমরা সেটাই দিব্যি ভুলে থাকছি। খাঁটি মনে এসব কিছু অনুসরণ করছে,এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। সেই কম সংখ্যক মানুষগুলো যখন ইসলামের এই সত্যি দিক গুলো তুলে ধরতে চায়,আমরা তাদের নিয়ে মজা করি। তাদের জীবনযাপন প্রণালী নিয়ে ঠাট্টা করি, হেয় করি। আমরা যাকাত দেই প্রচার করে ঢাকঢোল পিটিয়ে,সামাজিক স্টাটাস ঠিক রেখে। অমুক এতোটা শাড়ী দিচ্ছে, তমুক কে তারচেয়েও বেশি দেয়া চাই। মসজিদে মসজিদে নামাজের পর দোয়া করা হবে তাদের জন্যই যারা কিনা টাকার পরিমানটা হাযার ছাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ ইসলাম কিন্তু বলে, এমনভাবে দান করতে যাতে ডান হাত দান করলে বাম হাত টের না পায়। দেখা যাচ্ছে আমরা কেউ মূল সংযম পালন করতে পারছিনা। বরং সংযমের নামে চরম অসংযমী আচরণ করছি। কিন্তু মুখে ঠিকই “রমজান মাস সংযমের মাস,সিয়াম সাধনার মাস” বলে বলে নানা ধরনের টকশো আরও কতো কি! ইহকাল পরকাল ব্যাপারগুলো যেন শুধু বইয়ের ব্যাপার হয়ে গেছে। সবাই জানে,কিন্তু কেউ মানে না। যেন পরোয়াই করেনা। তারা বোধহয় মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে “নিশ্চই আল্লাহ্ পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল”। সৃস্টিকর্তা ওরা যাই করুক না কেন ক্ষমা করেই দিবেন।
অসংযমী রোজদারদের রোজা বা ইবাদত কতোটা কবুল হয় কিনা হয় সেই বিতর্কে গিয়ে আমার কোন সওয়াব যখন জুটবেইনা তখন সেই বিতর্কে নাই বা গেলাম। তারচেয়ে বরং নিজেরাই নিজেদের আয়না দেখানোর ফলে সামান্য হলেও যদি একটু আত্মশুদ্ধি হয় আমাদের কারো, তাহলেই এই লিখনীর সার্থকতা।আমাদের মধ্যে অনেকেই আছি এমন যে সবই জানি,বুঝি, তবু গড়িমসি করি, “কাল থেকে ঠিক মানুষ হবো” নীতিতে চলতে চলতে আমাদের সেই “কাল” আর আসে না। কেমন এক আলসেমি পেয়ে বসে সামান্য আধঘন্টার কোন নামাজ পড়তে গেলে। অথচ এর চেয়েও সময় সাপেক্ষ,কষ্ট সাপেক্ষ কোন কাজ কতো অবলীলায় করে ফেলছি। আমরা যেম এমনই! ফিক্সড প্রাইসের দোকানে গিয়ে বিনা বাক্য ব্যায়ে গুচ্ছের দাম দিয়ে কিছু কিনে ফেলতে দ্বিধা করিনা,কিন্তু চরম গরমে গন্তব্যে পৌছানোর জন্য রিকশা নিলে সেই গরীব রিকশাওয়ালার সাথে সামান্য পাঁচ টাকা নিয়ে ঝগড়া করতে আমাদের বাঁধে না। তখন আমাদের সংযমবোধ পুরোদমে জেগে ওঠে। “নাহ্। এইবেলা মিতব্যয়ী হবোই হবো!”
আমাদের বোধবুদ্ধির আসলেই তুলনা হয়না। আমরা দান করবো তাও প্রচার করে, জাঁকজমক করে। যেখানে সওয়াব প্রাপ্তির আশা থেকে বেশী আশা থাকে প্রচারের। লোকদেখানো এই দান আদতে কতোটা গ্রহনযোগ্য সেটার বিচার ভার আল্লাহ’র। তবে আমাদের সময় থাকতেই সাবধান হয়ে যাওয়া উচিৎ। আমরা ভুলেই যাই যে আমাদের মূল গন্তব্য সেই সাড়ে তিন হাত মাটির ভিতরেই। সেটা মাথায় রেখেই আমাদের জীবনযাপন করা উচিৎ। রোজার মাসের যে ফজিলত তা যদি আমরা নুন্যতম পরিমানটুকুও উপলব্ধি করতে পারতাম,তবে আমাদের ইফতারের টেবিলে নানা ইফতারী আইটেম যতোটুকু থাকা উচিৎ,ততোটুকুই থাকতো। শপিংমল গুলো খালি থাকতো। আমাদের দান খয়রাত গুলো বাস্তবিক দানখয়রাত ভাবেই গৃহীত হতো। আমাদের মনটা আসলেই উদার হতো।আমরা সত্যিকার ভাবে উপলব্ধি করতে পারতাম একজন অনাহারীর কষ্টটা। তাকে বা তাদের মতো কাউকে দু’চার টাকা বেশি দিয়ে সাহায্য করতে আমাদের বাঁধতো না।যাকাত শব্দটার মূল অর্থই আমাদের বোধগম্য হতো। আমরা প্রকৃত অর্থেই মুসলমান হতাম। এসব কথাই আমরা প্রত্যেকে সেই শৈশব থেকে জানি। কিন্তু অবহেলা করে,শুধু কথার কথা ভেবে পুরোপুরি অবহেলা করে আমরা যে যার মতো আয়েশি জীবনযাপন করছি। এভাবে একটা সময় আসবে আমরা হাড়ে হাড়ে পস্তাবো, কিন্তু সেদিন অনেক দেরী হয়ে যাবে। তখন আমাদের করনীয় কিছুই থাকবেনা। অতএব, সাধু সাবধান!

একটি টিভির আত্মকাহিনী

Now Reading
একটি টিভির আত্মকাহিনী

আমি একটি অত্যাধুনিক ৪২” এল ই ডি টিভি। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট এই পরিবারের ড্রয়িংরুমে আমার অবস্থান। ওরা আমাকে অনেক যত্ন করে রাখে। রোজ ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে ঝা চকচকে করে রাখে আমার শরীরটাকে। বড্ডো ভালেবাসে। আমিও ওদের যথাযথ সেবা দিতে সবসময়েই সচেষ্ট থাকি। আমিও ওদের ভালেবাসি। যেদিন ওদের বাসায় আমার প্রথম আগমন ঘটলো, আমাকে নিয়ে ওদের আহ্লাদিপনার কমতি ছিলোনা। পাশের বাসার ভাবীদের ভিন্ন অজুহাতে ডেকে এনে আমাকে দেখাচ্ছিলো,আমার শেপ, আমার আকৃতি, আমার ছবির কেয়ালিটি। সব্বার বাহ্ বাহ্ পেতে পেতে আমারও কেমন যেন গর্ব হচ্ছিলো নিজেকে নিয়ে। বাসার অন্য ফার্নিচারগুলো আমাকে কেমন হিংসুটে চোখে দেখছিলো! অনেক মজা লাগছিলো বটে! আমি সবচে, সব্বার চেয়ে সেরা,হিংসা তো তাদের হবেই, দোষের কিছুনা।যেমন দোষের না আমার এই অহংকার করাটা।
ডিশ্ কানেকশন লাগানোর পর শুরু হলো আমার পথ চলা।

আমাকে সামনে রেখে পরিবারের সবার কত আড্ডা, চা কফি,কোক! সবচে বয়োকনিষ্ঠ সদস্যটি সুযোগ পেলেই কার্টুন নেটওয়ার্ক ছেড়ে বসে থাকে। একা একা হাসে, হুহ্-হাহ্ করে। আমার মজা লাগে,মায়া লাগে। সবচে’ বিরক্ত লাগে যখন বাড়ীর বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলাটি কিসব প্যানপ্যানানি সিরিয়াল নামক জিনিষটাকে ছেড়ে দেয় আমার মধ্যে। ঐ কথায় কথায় কান্নাকাটি,মরে গিয়েও আবার বেঁচে ফিরে আসা,সামান্য সব ছুঁতো ধরে অসামান্য সব ঘটনা, ঝগড়াঝাটি আমার মধ্যে চলতে চলতে আমি নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ি, ওরা বোঝেনা। আমারই সিরিয়ালের ওদের মতো মরে নস্ট হয়ে যেতে মন চায়, আবার বেঁচে ফিরে আসতে আর একদম মন চায়না। রিমোট নিয়ে যখন বাড়ীর কর্তার সাথে ঐ কত্রীর ঝগড়া টাইপ কথোপকথন চলে, আমার খুব খুউব ইচ্ছা করে বেচারা কর্তার পক্ষ নিয়ে কিছু বলি। নিজের অক্ষমতায় তখন নিজেরই কষ্ট হয়। হায় প্রযুক্তিবিদগণ! এতো এতো কিছু আবিস্কার করেছেন, আর একটু কষ্ট করে আমাদের দু’চারটা মনের কথা বলতে পারার ব্যাপারটা যদি আবিষ্কার করতে পারতেন! কিছু চাইবার থাকতোনা! মাঝে কিছুদিন আমার ভিতরের খবরের এক চ্যানেলে শুনতে পাচ্ছিলাম স্টার জলসা নামক সেই ভয়ানক চ্যানেলটা নাকি বন্ধ হয়ে যাবে। নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিলোনা, সত্যিই এমন দিন আসবে? নাহ্! আসলেই তেমন দিন আসলোনা।

থাক! দুঃখের সাতকাহন গেয়ে আর কি হবে। কিছুই যখন করার নেই,কারোরই যখন আমাকে বোঝার নেই, কি লাভ আর এই দুঃখ করে! তারচে’ বরং সবচে মজার সময় কাটানোর কথা বলে মন হালকা করা যাক। বাড়ীর ছেলেটিকে আমার সেইরকম লাগে! কারন? ও আমাকে ছাড়লেই ইতংবিতং চ্যানেলগুলো ফেলে খেলার চ্যানেলগুলো দেখে। শান্তি শান্তি লাগে কেমন যেন।খেলার উত্তেজনা আমার মতো জড় পদার্থের একটা টিভির ভিতরেও ছড়িয়ে পড়ে কিভাবে যেন। কিন্তু সমস্যার কথা, এই ছেলেটির ভাগ্যে টিভি দেখা জুটেনা তার অফিসিয়াল নানান ব্যস্ততার কারনে। তার স্ত্রীর মতো আমিও ছেলেটির অপেক্ষায় থাকি। তার স্ত্রীর সংসারের কাজ করতে করতে আমার সামনে বসা খুব একটা হয়ে ওঠেনা। সেও হয়তো বসার সুযোগ পেলে সিরিয়াল ই দেখতো! তবে রাতে তারা টোনাটুনি মিলে যখন আমার সামনে বসে কোন মুভি দেখে অন্তরঙ্গ সময় কাটায়,চানাচুর বা মুড়ি খায়, ভালো লাগে আমার। তবে রোজ রোজ এই খেলা বা ওদের একসাথে বসে মুভি দেখার ব্যাপারটা হয়না আমার সাথে।তবে আমি রোজ চাই আজও খেলা হোক,আজও ওরা মুভি দেখতে বসুক। আমার ক্লান্ত লাগেনা তখন। তবে আমাকে দিয়ে বেশিরভাগ সময়েই সিরিয়াল দেখানো হয়। অবলা আমি একটু প্রতিবাদ ও করতে পারিনা।

সিরিয়াল ব্যাপারটা কি না দেখলেই নয়? এত্তো কত্তো চ্যানেল আমার ভিতর! কত্তো কত্তো মজার জিনিস হয়। ডিসকভারী বা এনিমেল প্লানেট দেখলেও তো দাদীমা!! তাও না বোঝ তো নিজের দেশেরই নাটকগুলো না হয় দেখো। তা না দেখে বস্তাপঁচা ওসব সিরিয়ালে কি মজা পাও, বুঝি না বাপু! সিরিয়াল দেখে দেখে মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি চাপাও আর সংসারে কোথাও পান থেকে চুন খসলেই ক্যাক করে ধরো। সাধারন “ভুল করে হয়ে গেছে” এভাবে ভেবে ব্যাপারটা ভুলে গেলেই হয়। তা কিভাবে হবে? সিরিয়ালের প্রভাবে তা হতে দিলে তবেই না! সেদিন আমার সামনেই তো বউটাকে সামান্য এক গ্লাস পানি আনতে দেরী হওয়ায় তার বাপ-মা তুলে কথা বললে। ডায়ালগ গুলো সবই কোথা থেকে আমদানি হলো তা বুঝতে তো আমার বাকি ছিলোনা। নেহাৎ কিছু বলতে পারার ক্ষমতা নেই বলে চুপ মেরে থাকা ছাড়া গতি ছিলোনা।কিন্তু ভিতরে ভিতরে মরমে মরে যাচ্ছিলাম যে বৌটার কথা গুলো শুনানোর একটা কারন বা মাধ্যম আমি নিজে! আজ আমি যদি না থাকতাম,হয়তো বৌটা এসব কথা শোনার হাত থেকে বাঁচতো। আসলেই কি বাঁচতো? না বাচলেও অন্তত আমি তো আর কোন মাধ্যম হিসেবে থাকতামনা। আমার জড় বিবেকটাও অনুশোচনায় বিদ্ধ হতোনা। আমার খুব প্রশ্ন করতে মন চায়, আমি একটা জড় পদার্থ,এক হাল ফ্যাশনের টিভি, আমার তাতেই বিবেক বোধটা কাজ করে, তুমি সৃস্টির সেরা জীব মানুষ হয়েও তোমার বিবেকে বাঁধে না?

সিরিয়াল তোমাকে কি শিখাচ্ছে একবার ভাবোতো দাদীমা! তোমার বাসার পরিবেশ নষ্ট করছে এই সিরিয়াল।তারচে’ বরং দাদার সাথে বসে খবর দেখতে দেখতে চা খাও, ঝগড়া হবেনা দেখো। ছেলের বৌকেও বিপক্ষের দল ভাববে না। তাকে ডেকে দু’চারটা ভালো কথা বলোই না। বা তাকে নিয়েই নিজের দেশের নিজের সংস্কৃতির একটা কোন নাটক দেখো। তুমি সবচে’ বড়। তোমাকে দেখেই তো বাকিরা শিখবে,তাই না দাদীমা। কাল যদি তোমার নাতি তোমার পাশে বসে এই সিরিয়াল গিলে,তো পরশু সে নিজেই ঘরের এসব ঝগড়াঝাটি গুলোকেই সাধারন ব্যাপার হিসাবে ধরে নেবে। তুমি তোমার প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মটাকেও প্রভাবিত করছো। একটা ভালো সিরিয়াল দেখাও আমাকে যেখান থেকে শিখার কিছু আছে! ৬৬৬
নিজের ভালো নাকি পাগলেও বোঝে। মানুষ হিসাবে তো এটা এই শ্রেনীর মানুষগুলোরও বোঝার কথা। আমি সামান্য এক ৪২” এল ই ডি টিভি। এক সময় আমার নিজেকে নিয়ে বেশ গর্ব হতো, এখন নিজেকেই কেমন ঘেন্না হয়।ঘরে ঘরে এতো ঝগড়া, অশান্তির মূলে যেন আমি নিজে!

অনলাইনে পরিচয়, অতঃপর….

Now Reading
অনলাইনে পরিচয়, অতঃপর….

“Looking through the window

This is not the main door.

It is easy to say, but hard to obey.

What do u think?

Please think before u ink.”

একটা সময় ছিলো যখন এভাবে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটানো হতো।এক সময় চিঠি চালাচালির জায়গা নিলো ইমেইল আর মোবাইল ফোন। দিনভর মোবাইল অপারেটরদের কে কত বেশি সেবা প্রদান করতে পারে সেই প্রতিযোগীতার পুরো সুবিধা ভোগ করতো শহর গ্রামের সব প্রেমিক প্রেমিকারা। কেউ এস এম এসের মাধ্যমে তো কেউ রাতভর ফোনালাপের মাধ্যমে। সকালে যার যার ক্লাসে উপস্থিতির হার কমছে, রেজাল্ট খারাপ করছে, তাতে কি। গুনগুন করে গাইছে গান…. “এখন তো সময়,ভালোবাসার!” যুগ আরো ডিজিটাল হচ্ছে।সাথে ডিজিটালাইজড হচ্ছে ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যমও। এখন আর কেউ শুধু ফোনে কন্ঠ শুনেই সন্তুষ্ট নয়। কি করবে বেচারা রা। আমাদের স্যাটেলাইট বিনোদন যে শিখিয়েছে “ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর!” তাইতো এবার লাইভ দেখা চাই।

আজকাল ফেসবুকের টাইমলাইনে অনলাইন সম্পর্ক নিয়ে অনেক ঘটনা দূর্ঘটনা চোখে পড়ছে।“প্রেম” / “ভালোবাসা” শব্দগুলো আজকাল কেমন হালকা আর সস্তা গোছের কিছু হয়ে গেছে। ফেসবুকের ভালোবাসার সুত্র ধরে ভালোবাসার মানুষটাকে ঠিকঠাক না চিনেই, না বুঝেই ম্যাসেন্জারে বা ভিডিও চ্যাটে  নিজেদের সম্পুর্ন ব্যাক্তিগত ভাবে উপস্থাপন। পরবর্তীতে কোন কারনে সেই সম্পর্ক না টিকলে অমনি সেই দুর্বল মূহুর্তে করা ব্যাক্তিগত ভিডিও ভাইরাল করে প্রতিশোধ নেয়া! তারই জের ধরে কোন এক পক্ষের আত্মহত্যা করার মতো ঘটনা এখন অহরহই ঘটছে।

হারিয়ে গেছে সেই সুন্দর ভালেবাসার সম্পর্কগুলো, যেখানে ডেটিং বলতে ছিলো হেলভেশিয়া বা  KFC কিংবা বইমেলার বটতলা বা টিএসসি’র ক্যান্টিন। এখন সব বদলে গেছে, জায়গা করে নিয়েছে অসংখ্য লিটনের ফ্লাট। মানুষের মনমানসিকতা ভয়ঙ্করভাবে বদলাচ্ছে, রুচির বদল হচ্ছে। কার কজন বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড সেটাতেও যেন অসুস্থ এক প্রতিযোগীতায় নেমেছে আজকের প্রজন্ম। ভালোবাসার প্রপোজ করার ব্যাপারটাও ভিডিও করে ফেসবুকে ছেড়ে দেয় সস্তাদরের জনপ্রিয়তা লাভের আশায়। সবচে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে এই আধুনিক  প্রেমিক প্রেমিকাদের দলটার বয়সের সীমা ১৮ ও পার হয়নি। স্কুল কলেজের এসব মাত্র দুনিয়া চিনতে শুরু করা কিশোর কিশোরীরা যে বিপথে যাবেনা  এতো বলাইবাহুল্য। ওদের বোঝাতে গেলে অনেক বাবা মা রাই সন্তানের চোখের শুল হচ্ছেন। ঐশীর বাবা মা’র করুণ পরিনতি চোখের সামনে ভেসে উঠে।

অনলাইন প্রেমের সফল পরিনতি যে একেবারেই নেই তা নয়। ব্যাক্তিগত ভাবে আমি এমন অনেক জুটিকে চিনি যারা অনলাইনের বিভিন্ন চ্যাট সাইট থেকে পরিচিত হয়ে অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বিয়ের মতো সামাজিক স্বীকৃতি পেয়েছে। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সুখে শান্তিতে দিন কাটাচ্ছে। তাই শুধুমাত্র অনলাইন সম্পর্ক গুলোর সবগুলোই যে খারাপ পরিণতির স্বীকার হয়,সেটা ভুল। সম্পর্ক যেই মাধ্যমেই হোকনা কেনো মানুষটাকে যাচাই বাছাই করে তারপর সম্পর্কের গভীরতা বাড়ানোটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যেই সম্পর্ক গুলো সামান্য পাসওয়ার্ড দেয়ানেয়াকে বিশ্বাসের মাধ্যম মনে করে,লাইভ  বা ব্যক্তিগত ভিডিও করাটাকে সম্পর্কের গভীরতার ভিত্তি মনে করে সেই সম্পর্কগুলো থেকে বেরিয়ে আসাই উচিত হবে।

মনের সাথে মনের সম্পর্ক থাকলে তবেই সেই সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া ভালো। নয়তো সারা জীবনভর পস্তানো লাগবে। আরেকটা ব্যাপার লক্ষনীয় যে ভালোবাসার মানুষটি যদি সমবয়সী হয়,তখন সেই ভালোবাসার মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধের অভাব দেখা যায়,যেখান থেকেও অনেক সম্পর্কে কোন নাম নেয়ার আগেই ফাটল ধরে।প্রতিশোধপরায়ন হয়ে কোন পক্ষ বেছে নেয় খুনাখুনি, এসিড মারা বা আরো কোন রোমহর্ষক কাজ। ভালোবাসাবাসি নিয়ে যেসব কবিতা,গল্প,উপন্যাস  তা আজকালকার ভালোবাসাবাসির স্টাইলের সাথে যায় না যেন। ভালোবাসা হয়ে গেছে যেন আর্থিক স্ট্যাটাস আর ফ্যাশন নির্ভর। কার কতো স্টাইলিশ গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড আছে সেটার শো অফ চলে যেন। সম্পর্কের স্থায়ীত্বের চেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে যেন সম্পর্কের জাহির করা ব্যাপারটা। জিনিষ পুরোনো হলে আমরা যেমন বদলে ফেলি, তেমনি যেন পুরোনো হয়ে যাওয়া সম্পর্ক কেও ঝেড়ে ফেলে দিতে দ্বিধা করেনা আজকালকার এসব হালফ্যাশনের সম্পর্কধারীরা। একটা গেলো তো কি হলো,আরেকটা আসবে- এমন নীতি তে চলছে যেন। তারপর কোন পক্ষ যদি সম্মত না হয় তখন ধর্ষণ, খুন,গুম তো আছেই। যেই সময়ের ভালোবাসাবাসির মিষ্টি সেই চিঠি চালাচালির কথা বলছিলাম শুরুতে, তখনো যে জোর জবরদস্তির ব্যাপারটা ছিলোনা, তা কিন্তু না। তবে তখনকার প্রতিশোধপরায়ণতার স্টাইল ছিলো এসিড মারা পর্যন্ত। ধর্ষণ তখন এতো ব্যাপকহারে বাড়েনি। এখন তো মনে হয় যেন, সেই ভালো ছিলো! এসিড মারার তো একটা চিকিৎসা আছে, ধর্ষণের শিকার হওয়া মানুষটার মনের তো চিকিৎসা নেই। সহজ সরল বিশ্বাাসের কি করুণ পরিণতি!

একটু সচেতন হলেই কিন্তু এসব পরিস্থিতি এড়ানো যায়। একটু মনকে শক্ত রাখতে পারলেই হলো। সম্পর্কের গভীরতার প্রমাণ কখনোই ভিডিও চ্যাটে শরীর দেখানো হতে পারেনা। সম্পর্কে বিশ্বাসের প্রমান হতে পারেনা পাসওয়ার্ড দেয়া না দেয়া। এসব অবান্তর ব্যাপারগুলো এড়িয়ে গেলেই অনেক সম্পর্ক একটা নাম নিতে পারে। স্হায়ীত্বও বাড়তে পারে। মানুষ চিনতে মানুষটার সাথে খুব কি অন্তরঙ্গ আসলেই হওয়া লাগে? সুন্দর একটা সম্পর্ক যখন কোন নাম নেয়, একটা পরিবার গড়ে ওঠে সেই সম্পর্ককে ঘিরে, তখন সেই গল্প শুনতেও যেমন আনন্দের,বলতেও তেমনি সুখের।সেই আনন্দ বা সুখ অধরা কিছুই না; শুধু যদি একটু সচেতনতা বাড়ানো যায়। ডাস্টবিনে পলিথিন মোড়ানো সদ্যজাত বাচ্চা গুলোকে মৃত অবস্থায় পেতে আর ভালো লাগেনা। আসুন সবাই মিলে সচেতন হই।

 

বাচ্চাদের জন্য আমরা নাকি আমাদের জন্য বাচ্চারা?

Now Reading
বাচ্চাদের জন্য আমরা নাকি আমাদের জন্য বাচ্চারা?

সদ্য চুলা থেকে নামানো ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরমা গরম চা যে শেষ কবে আয়েশ করে বসে খেয়েছিলাম, নিজেকে রিউয়াইন্ড করতে গিয়ে দেখি মা হবার পর এই ব্যাপারটা আমার কেমন যেন অধরা হয়ে গেছে। শুধু কি চা খাওয়া নিয়েই আক্ষেপ? গোসল, বাথরুম অন্যান্য নিজস্ব সব কাজই এখন যেন শুধু করার জন্য করা হয়। এক সময় আমি কুখ্যাত ছিলাম অনেক সময় নিয়ে গোসল করার জন্য। কতো যে বকা জুটতো এ কারন! সেই আমার আজ গোসলে সর্বোচ্চ সময় পনেরো মিনিট দিতে পারলেও নিজেকে ধন্য মনে করি। ব্যাপারগুলো শুধু এক আমার সাথেই যে হচ্ছে, তা কিন্তু না। বাচ্চা লালন পালন অনেক কঠিন এক কাজ। নিজের চেয়েও বেশি দায়িত্ববোধ থেকে এই কাজ করা হয়। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাগুলোর সমস্ত কিছুই বাবা মা’র হাতে। ওদের চাওয়া পাওয়া,ওদের হাসি কান্না, ওদের সুখ দুঃখ- সব কিছুর প্রয়োজন মিটানোর দায় বাবা-মা’র।
যেই মানুষটা বাবা কিংবা মা হবার আগে চরম বেহিসাবি জীবন যাপন করতো, সেই মানুষটা কে দেখা যায় বাবা /মা হবার পর নিজের কিছুর আগে বাচ্চার ভবিষ্যতের হিসাব কষতে। যেই মেয়েটা আগে লেটেস্ট ডিজাইনের ড্রেস বা হালফ্যাশনের জুয়েলারির খোঁজ রাখতে ভালবাসতো,তাকেই দেখা যায় মা হবার পর বাচ্চার কিউট কিউট ড্রেস কোথায় পাওয়া যাবে, কোন মজার খেলনাটা দোকানে নতুন এলো সেই খোঁজ রাখছে। যেই বাবাটা আগে খবর নিতো কোন আপডেটেড মোবাইল টার কি ফিচার, সেই বাবাই তার আগে খবর রাখছে কোন আইসক্রীমের নতুন ফ্লেভার এলো বাজারে,যা তার বাচ্চা এখনো চেঁখে দেখেনি। যেই দম্পতি আগে ছুটির দিন সময় কাটাতে সিনেপ্লেক্স এ যেতো, বাচ্চা হবার পর তাদের ছুটির দিন কাটে শিশুপার্ক বা এমন কোন এমিউজম্যান্ট পার্কে। আগে যেমন ফুড কোর্টে খেতে যাবার আগে নীরব নির্জন স্থানকে মাথায় রাখতো, বাচ্চা হবার পর সেখানে মাথায় রাখছে “কিডস্ জোন আছে তো?” শপিং করতে গেলেও ভীড়ভাট্টার গাউসিয়া নিউমার্কেট ফেলে বেছে নিচ্ছে বসুন্ধরার মতো এসি আর খোলামেলা পরিবেশের মতো শপিং মল। এত্তো এত্তো বদল না চাইতেই চলে আসে একেকটা বাবা-মা’র জীবনে, শুধু এই ছোট্ট নিষ্পাপ বাচ্চাগুলোর খাতিরে। সবাই চায় যার যার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে। ছোট্ট এই বাচ্চাগুলো আসলে সহজ সরল ভাবে কি করে যেন আমাদের জীবনযাপনের মানেই বদলে দেয়, আমরা টেরই পাইনা। সারাদিন ওদের নিয়ে কাটাতে কাটাতে একেক সময় আমরা ক্লান্ত হই, বিরক্ত হই, ওদের দুরন্তপনা কে শাসন করে দমিয়ে রাখতে বৃথা চেষ্টা করি, বকা ঝকা করি। আবার এই আমরাই ওদের ঘুমন্ত মুখটা দেখলে তীব্রভাবে অপেক্ষা করি কখন জাগবে বলে। আমরাই বকা দিচ্ছি “তুই আমার লাইফের একটা পেইন!” বলে। আবার মুহুর্তেই তাদের জড়িয়ে ধরে বলছি, “তুই না থাকলে আমি কি নিয়ে বাঁচতাম?” নিজেদের স্ববিরোধী আচরনে নিজেরাই দ্বিধান্বিত হই, বাচ্চাগুলোর কথা তো বাদই দিলাম।
বাচ্চা ছোট থাকলে এক রকম লাইফস্টাইল, সবচে ভালো ডাক্তার কোথায় পাওয়া যাবে; ভালো দুধ কোনটা এপ্টামিল নাকি নান? বাচ্চা ঘুমাচ্ছে, তাই সবাই ফিসফাস। একটু বড় হলো তো আরেকরকম জীবনযাপন।কোন স্কুল ভালো হবে,ইংলিশ মিডিয়াম না বাংলা মিডিয়াম? কি দেখাবো; ডোরেমন নাকি টম এন্ড জেরী? সাতার শিখবে না গান নাকি ছবি আঁকা? আর সেভাবে সেভাবে বাচ্চাদের প্রাধান্য দিতে গিয়ে নিজেদের জীবনযাপনের ধারাটা যে বদলে যায় সেদিকে আর খেয়াল থাকেনা। সেই বদলে যাওয়া জীবনটাতেই যে অপার্থিব সুখ! সেই সুখের কারনেই হাজার কষ্টের পরেও মনে হয় যেন বেশ আছি,ভালো আছি।ওদের খুশীতে নিজের খুশী মিশে যায়, ওরা কষ্ট পেলে আমরাও কষ্ট পাচ্ছি। ওদের অভিমান ভাঙ্গানোর একশ একটা কৌশল খুঁজে রাখছি। সবকিছুই বাবা-মা’রা করছে ওদের কথা মাথায় রেখেই।
এখানে বলে রাখা ভালো যে আমি ব্যাতিক্রমধর্মী বাবা-মা’র কথা না বলে গড়পড়তা বাবা-মা’র কথা বলছি, যাদের দিনের বেশিরভাগ সময় তাদের বাচ্চাদের কথা ভেবে এবং সেসব কাজের ব্যস্ততায় কাটে।
যেসব বাবা-মা চাকরীজীবি তারাও তাদের মাথায় বাচ্চার সুযোগ সুবিধাকেই আাগে প্রাধান্য দেন।তাদের জীবনযাপন ও বাচ্চাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে।
গরম চা খেতে না পারার দুঃখ করছিলাম শুরুতে। যেটা সেই কৃত্তিম অভিযোগ ছাড়া আর কিছু না। এই বাচ্চা কেন্দ্রিক জীবনে অভ্যস্তকারীরা গরম চা’র জন্য আক্ষেপ ও করবে, আবার নিজেকেই নিজে স্বান্তনা দিবে এই বলে যে, গরম চা তো জীবনে অনেক খেলাম,বাচ্চারা বড় হোক। তখন ইনশাল্লাহ্ আবার মন ভরে খাবো। এখন আপাতত দুধের স্বাদ ঘোলে, মানে গরম চা’র স্বাদ ঠান্ডা বিস্বাদ চা তেই মিটাই। কি আাসে যায়। চা আাবার গরম করতে গিয়ে না পাছে এমন কিছু মিস্ হয়ে যায়, যা জীবনে আর কোনদিম ফিরে আসবে না।বাচ্চ্চাদের জন্য আমরা না হয়ে আমাদের জন্য বাচ্চারা-এভাবে ভাবলে অনেক ছোটবড় কষ্টগুলো আর গায়েই লাগেনা। বাচ্চাদের সাথে বাচ্চা হয়ে ওদের বেড়ে ওঠাকে আরো আনম্দদায়ক করা গেলে আমাদের ভবিষ্যতপ্রজন্ম নিয়ে ওতো হতাশাব্যন্জক কিছু নাও হতে পারে। আমাদের জন্যই আমাদের বাচ্চাদের সুন্দর ভাবে গড়ে তোলা জরুরী।

আমি “তাদের” মতো হতে চাই।

Now Reading
আমি “তাদের” মতো হতে চাই।

ছোটবেলায় বাবাকে তার দিন শুরু করতে দেখতাম পেপার দিয়ে৷ আস্তেআস্তে কখন যেন নিজের মধ্যেও এই অভ্যাসটা ঢুকে গেল টের ও পেলামনা৷ তখন খবর মানে ছিলো টুকটাক সব খবর মজা করে পড়া, যেটাকে বলে স্বেচ্ছায় খবর জানত‌ে চাওয়ার জন্য খবরের কাগজ পড়া। এক কাপ গরম চা ন‌িয়‌ে পেপার পড়ার স‌েই মূহুর্তটা ছ‌িলো দ‌িন‌ের সবচ‌ে প্র‌িয় সময়। এখন‌ো খুব ম‌িস কর‌ি!

এখন ক‌েমন য‌েন সব বদল‌ে গেল‌ো হঠাৎ কর‌ে। সেই মানুষগুল‌ো বদল‌ে গ‌েলো; ঘর বদল‌ে গ‌েলো; খু্ব অবাক হয়‌ে দ‌েখলাম স‌েই পেপারের খবর গুল‌োও ক‌েমন বদল‌ে গেল‌ো। দ‌িন ক‌ে দ‌িন জঘন্য থ‌েকে এত‌ো জঘন্যতর হত‌ে লাগল‌ো য‌ে আর ন‌িত‌ে না প‌েরে পেপার পড়াই বন্ধ কর‌ে দ‌িলাম। তত‌োদ‌িন‌ে ফ‌েসবুক‌ের সদর্প আগমন। খবর না জানত‌ে চাইল‌েও না জ‌েনে উপায় ন‌েই! এই বাজ‌ে, জঘন্য, মন খারাপ করা খবরগুল‌োর ভীড়‌ে ভাল‌ো খবর গুল‌ো কই য‌েন হার‌িয়‌ে গ‌েলো। এখন দ‌িন শুরু হয় ওসব মন খারাপ করা ছব‌ি সহ খবর দ‌েখে; দ‌িন শ‌েষ হয় ওসব খবরের ব্যর্থ আপড‌েট দ‌েখে। ন‌িজ‌েকে হতাশ লাগ‌ে। ক‌ি কারন‌ে এমন হয়‌ে গ‌েলো ক‌ে জান‌ে! পার‌িবার‌িক বন্ধন গুল‌ো ক‌েমন ঠুনক‌ো হয়‌ে গ‌েলো। পরিবারের সবাই ম‌িল‌ে এক সাথ‌ে খ‌েতে বসার যে আনন্দ তা য‌েন ক‌োথায় হার‌িয়ে গ‌েছে। “শ্রদ্ধাব‌োধ” ব্যাপারটা য‌েন এখন শুধু বইয়ের মধ্য‌ে খুঁজ‌ে পাওয়া যায়। “বন্ধুত্ব” মান‌ে য‌েন উশৃঙ্খলতা প্রকাশ‌ের আর‌েক নাম।”য‌ৌনতা” হয়‌ে গ‌েছে হ‌িংস্রতার আর‌েক নাম। “বিনোদন” হয়ে গেছে স্যাটেলাইটের সিরিয়াল গুলো নির্ভর। পুরো পরিবার নিয়ে লুডু বোর্ডে বা ক্যারাম বোর্ডে সময় কাটানো যেন বা ব্যাকডেটেড কিছুর নামান্তর। কাকে কে কি দোষ দেবে?

পারিবারিক শিক্ষার দোষ দিয়ে একতরফা ভাবে চাপিয়ে দেয়াটাও ভুল হবে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব বলে পুরোপুরি পাশ কাটানোও যাবেনা,কেননা সেখানেও প্রশ্ন জাগে,ঐ প্রভাবে প্রভাবিত হতে বলেছিল কে? তাহলে? ব্যাপারটা ভাববার বিষয় তো অবশ্যই। বাঙ্গালি আমরা, স্বভাবতই নিজের দোষ দেখবোনা, কাউকে না কাউকে, কিছু না কিছুকে তো দায়ী করেই ছাড়বো। তাই তো ধর্ষনের মতো ব্যাপারেও সাফাই গাইবো ধর্ষিতার ড্রেস আপ নিয়ে।হোক সে হিজাব পরিহিতা, বা হোক সে পাঁচ বছরের শিশু। “বিচার চাই” বলে শাহবাগে আবার আরেক দফা আন্দোলন হবে কিছুদিন। তারপর…… সেই পুরনো উক্তি, “বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে” বলে যে যার জায়গায় পুনরায় ফিরে যাওয়া। এই তো হয়ে আসছে,তাই না?

নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে ভুগতে সবাই কেমন যেন ছা পোষা কেরাণী টাইপ হয়ে যাচ্ছি, যা হয় হোক, মেনে নিচ্ছি। কেন মেনে নিচ্ছি? কেন সজাগ হয়েও ঘুমিয়ে থাকার ভান করছি? শান্তি তে থাকা যদি এর কারন হয় তো সেই শান্তিতে থাকতে কি পারছি আদৌ? ভাবার বিষয়, ভাবছি। লেখার বিষয়,লিখছি। পড়ার বিষয়, পড়ছি। কিন্তু এই বিষাক্ত সমস্যাটা থেকে সমাধানের কোন পথ কেউ খুঁজে পাচ্ছিনা। দুর্নীতি আমাদের জীবনযাপনে এমন ভাবে ঢুকে গেছে যে আমাদের “নীতি” শব্দটার উপরে অবিশ্বাস চলে আসছে। অন্যায় হলে থানা পুলিশের কাছে স্বাভাবিক ভাবে যেতেও আমাদের অনীহা, “কি হবে গিয়ে?” তারচেয়ে ভালো, মেনে নাও, মেনে নাও। বিবেক কে জোর করে ঘুম পাড়িয়ে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া অন্যায়গুলোকে আমরা না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে যাই। পারলে,সুযোগ বুঝে অপরাধস্হলে ঘটনা ঘটাকালীন মূহুর্তকে স্মরনীয় করে রাখতে কিছু সেলফি তুলে তাজা তাজা ফেসবুকে আপলোড করে দেই কিছু লাইক পাবার আশায়। তবু ঝুঁকি নিয়ে সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করিনা, পাছে নিজেই না আবার বিপদে পড়ি।

এভাবেই সবাই হয়ে পড়ছি আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর এক সুশিক্ষিত জাতি,যারা কিনা আর কিছুকে দোষ না দিতে পারলে নিজেদের রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের দোষ দিতে খুব ভালোবাসি। “ঐ আমলে ভালো ছিলাম” বলে চিল্লাচিল্লি আর গলাবাজি করে আসর জমাতে আমাদের জুড়ি নেই। তবু প্রতিবাদটা নিজের থেকে শুরু করবোনা! হতাশায় ভুগছে পুরো জাতি।

এরমধ্যেও আশার কথা হাতেগোনা কিছু মানুষ তাদের সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করছেনা। কি পাবো,কি পাবোনা- সেই কুটিল হিসাব না কষে তাৎক্ষনিক ভাবে হাজির হয়ে যাচ্ছে নিজেদের তল্পিতল্পা সহ, “যা থাকে কপালে” ভাব নিয়ে। একটু হলেও যদি কারো কোনও উপকারে আসতে পারে এই ভেবে তারা নিজেদের পাশাপাশি একটা বাহিনীও তৈরী করে ফেলেছে,যারা এখন চাইলে এখনি কোন দুর্ঘটনায় ঝাঁপিয়ে পড়তে রাজি। আমি আর আমার মতো হতাশাবাদী খবর বিমুখ মানুষগুলো আবারো একটু আশাবাদী হই। আবার আমাদের স্বপ্ন দেখানেওয়ালারা নিজেদের স্বপ্নকে আমাদের সাথে এক করে প্রমান করতে চাইছে যেন ওরাও তো আধুনিক কালেরই মানুষ,ওরাও তো একই পথে হাঁটে, একই মেয়েদের সাথে চলে,কথা বলে, বন্ধু হয়। কিন্তু শুধু বন্ধুত্বের চোখেই দেখে। ওরা প্রমান করে দিতে চাইছে যেন, বিনোদন মানে নির্দোষ বিনোদন, নতুন কোন জায়গা ঘুরে আসা;ঘরে বসে বস্তাপচাঁ টিভি সিরিয়াল দেখা নয়। বন্ধুত্ব মানে বন্ধুর প্রয়োজনে জান বাজি রাখা;উশৃঙ্খলতা নয়। যৌনতা মানে একে অপরের ইচ্ছার প্রাধান্য দেয়া, হিংস্রতা নয়। ওদের জন্য আবার আমার খবরের কাগজ পড়ার ইচ্ছা জাগে। আবার আশাবাদী হই। আবার ভাবতে ভালো লাগে যে কোথাও বিপদে পড়লে তাদের আমি পাশে পাবোই। আমারও খুব ইচ্ছা করে তাদের মতো খুব সাহসী হতে। দেশটাকে একটু হলেও এগিয়ে দিতে সামান্য হলেও ভুমিকা রাখতে। ওরা কারা? যারাই হোক- সশ্রদ্ধ সালাম।

“মা দিবস”- হুজুগের না আবেগের?

Now Reading
“মা দিবস”- হুজুগের না আবেগের?

“মা” দিবস গেল এইতো কিছুদিন আগে৷ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে অনেকের মা কে নিয়ে ছবি,পোষ্ট, স্টাটাস – মন্দ লাগছিলো না! একদিনের জন্য হলেও মা তার সন্তানদের সঙ্গ পাচ্ছেন; অনেকের বেলায় হোক না তা লোক দেখানো- তাই বা কম কিসে!

নিজে মা হবার পর বুঝতে পারি সন্তানদের সাথে কাটানো সময় গুলো কতোটা মুল্যবান৷ তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করি কবে আবার বাচ্চাগুলোকে নিয়ে একসাথে সময় কাটাবো৷ এখনো বৃদ্ধাশ্রমে যাবার মতো বুড়িয়ে যাইনি, তাতেই বাচ্চাদের পাশে পেতে আকুল হয়ে থাকি; সেখানে বয়সের ভারে নিমজ্জিত, বাধ্য হয়ে অবসর প্রাপ্ত মা’দের সন্তানকে কাছে পাবার আকুলতা আমাকে ছুঁয়ে যায়৷ কিভাবে পারে একেকটা কুলাঙ্গার শ্রেনীর সন্তানরা তাদের মা’দের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে! কেউ কেউ তো আত্মীয় স্বজনদের কাছে পৌছে দেবার নাম করে অজানা অচেনা জায়গায় অসহায় মা কে ফেলে পালিয়ে যাবার মতো ন্যাক্কারজনক কাজ ও করে৷ কিভাবে পারে? কি ভেবে পারে? একবার ও কি শৈশবের কোন স্মৃতি ভেসে ওঠে না? ভালো করে তাকাই আমার ছোট্ট ছেলেটার মুখের দিকে৷ যখন ওর জীবনে আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে,সেও কি আমাকে কোন বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা হাতে ধরিয়ে দিবে? এখনই কি সাবধান হওয়া উচিৎ না আমার? যাদের কারনে নিজের ক্যারিয়ারকে প্যাকেট করে সযতনে ড্রয়ারের কোনে ফেলে রাখলাম, তাদের কাছ থেকেই তো সবচেয়ে বড় আঘাতটা পাবার কথা আমার৷ অন্তত আজকাল দুনিয়াদারির হালচাল তো সেইদিকটাই দেখাচ্ছে৷

আসলে সমস্যাটা কোথায়? একটা বিশেষ সময়ের পর কেন মা বাবার মূল্য ফুরিয়ে যাচ্ছে? কেন মনে হচ্ছে জীবনে আর ওদের কোনই দরকার নেই? সামাজিক মূল্যবোধের অভাব? বিবেকের দংশনের অভাব? সময়ের অভাব? মা তো মা৷ একটা মানুষের স্থান কি পারে আরেকটা মানুষ নিতে? বিশেষ করে মা’র মতো একজনের অভাব কি পৃথিবীর কোনও মানুষকে দিয়ে পূরন হবার মতো কিছু? অনেকে এজন্য জীবনের আরেক নারী চরিত্র “বৌ” কে দায়ী করে৷ আসলেই কি তাই? কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৌ’দের অবদান যে থাকেনা তা নয়৷ তবে এমন কি হওয়া উচিত? সেই বৌটি ও তো একসময় মা হবে; সেই সন্তানদের কেন্দ্র করেই তার জীবনের একটা বিশাল সময় সেও তো পার করবে৷ নানান কষ্ট ;নানান ত্যাগ স্বীকার করে সেও তো তার সন্তানদের বড় করবে৷ তারপর? তারপর তার সন্তানের বিয়ের পর সেও একই রকম বোঝা হয়ে দাঁড়াবে তার সন্তানের কাছে? তাকেও কি সেই একই বৃদ্ধাশ্রমে দিন কাটানো লাগবে? এ কি এক চক্র? যা ঘুরেফিরে ফিরেঘুরে সেই এক ব্যাপার- অবহেলা৷ এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি?

অনেকে বলবেন ব্যপারটা আধুনিকতার সাথে সম্পৃক্ত৷ আমি তাতে একমত নই৷ আমার শৈশবে এক চীনা গল্প পড়েছিলাম যাতে এক বাবার মাথায় ঝুড়িতে করে দাদীকে পাহাড়ে রেখে আসার কথা শুনে ছেলেটা বাবাকে বলেছিলো ফিরার পথে যেন মনে করে ঝুড়িটা নিয়ে আসে৷ কারন জানতে চাইলে বাচ্চাটা উত্তর দিয়েছিলো বড় হলে তো তারও বাবাকে পাহাড়ে রেখে আসতে গেলে ঝুড়িটার দরকার হবে৷ চৈনিক গল্পটার উৎপত্তি তারও আগের কোন যুগ থেকে৷ তার মানে ব্যাপারটা আধুনিক না; যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে৷ কারন টা তখনো হাতড়ে গেছে কিছু মানুষ, আজও হাতড়াচ্ছে৷ উত্তরটা আজও অজানা৷ সন্তান বড় হলে মন মানসিকতার ,ব্যাক্তিত্বের পরিবর্তন ঘটে বলে সন্তানের হয়তো মা’কে নিয়ে অনুভূতির পরিবর্তন আসে; মা’র কি আসে? মা তো আমৃত্যু নিজের আগে সন্তানের কথাই ভেবে যাবে৷ আহ্ মা জাত! একটু কেন স্বার্থপর হতে পারে না? একটু কেন শক্ত হতে পারেনা একথা ভেবে যে , “ঠিক আছে, আমাকে তোমার দরকার নেই যখন তোমাকেও আমার কোন দরকার নেই৷ তুমি তোমার রাস্তা মাপো, আমি আমার রাস্তা মাপছি৷” আমি মা৷ আমি জানি পৃথিবীর কোন মায়ের এতো শক্তি নাই যে এভাবে ভাববে, বলবে! অভিমান করে হয়তো এক কি দুইদিন দুরে থাকবে , কথা বলা বন্ধ রাখবে৷ তারপর যেই লাউ সেই কদু৷ মাঝখান থেকে আমরা আধুনিকতার দোহাই দিবো, আর্থিক অসচ্ছলতার কারন দর্শাবো, আরও যে কাকে কাকে দোষ দিবো তার ইয়াত্তা নাই৷ তবু একবার মনের ভুলেও আয়নার সামনে নিজেকে দাঁড় করাবোনা! একবারও নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করবোনা আমরা কোনও সুশীল সন্তানরাই৷ কেন করবো? দোষ দিবো বাড়ির বৌদের৷ একসাথে থাকতে পারলে কি আর বৃদ্ধাশ্রমের খোঁজ করতে হতো? – আক্ষেপ এক সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানের৷ কেন থাকা গেলো না? এই প্রশ্নের অবশ্য সদুত্তর মেলেনি৷

সন্তানরা যদি নিজেদের বেলায় স্বচ্ছ থেকে এক এক সম্পর্ক কে সুন্দরভাবে মানিয়ে চলে; আমার মনে হয় সমস্যাটা অনেকাংশে মিটে যাবে৷ কোন বৌ যেমন কারো মা’র জায়গাটা নিতে পারেনা; তেমনি কোন মা ও পারেনা কোন বৌ’র জায়গা নিতে৷ যার যার জায়গা, যার যার সম্পর্ক তার তার হওয়া উচিৎ৷ এক্ষেত্রে সেই সন্তানকে একপেশে আচরন না করে হতে হবে বাস্তবমুখী৷ একটা সম্পর্কের জন্য যেন কোনভাবে আরেকটা সম্পর্ক নষ্ট না হয়, সেটা ঠিক রাখা টা কি আসলেই খুব কঠিন কাজ? মা কে সময় দিলে যদি বৌ নামক মানুষ গুলোর মুখ কালো হয় তাহলে সেই মানুষ গুলোর মনুষ্যত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠে বৈকি৷ সেই কালো মুখ গুলো সাদা করার প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে যদি মা কেই বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে হয় তবে সেই সন্তানের ব্যাক্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক৷ মা জাত টা তবু তার সন্তানদের দোষ খুঁজবেন না৷ খুঁজবেন তার সন্তানের কোথাও সমস্যা হলো কিনা সেসব দিকটা! আহ্ মা জাত! আমি কি এখনই সাবধানী হয়ে যাবো? এখনই কি খুঁজে রাখবো কোন ভালো বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা? যেখানে ভবিষ্যতের কোন এক মা দিবসে অনেক আয়োজন করে আমার সন্তানরাও আসবে আমার সাথে শুভেচ্ছা জানাতে, সেলফি তুলতে৷ তারপর দিন শেষে আমি আবার অপেক্ষা করবো আগামী বছরের মা দিবসটার জন্য৷