বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বাংলাদেশ কোথায় ?

Now Reading
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বাংলাদেশ কোথায় ?

একটি চলচ্চিত্র একটা দেশকে তুলে ধরে। দেশের সামাজিক অবস্থা, সংস্কৃতি, প্রকৃতি, মানুষ এবং সর্বোপরি সেই দেশের মানুষদের মনোজাগতিক অবস্থা, আবেগ, অনুভূতির মতো বিষয়গুলো চলচ্চিত্রে উঠে আসে বলেই সেটি হয়ে উঠে প্রকৃত অর্থে চলমান চিত্র বা চলচ্চিত্র।

আমরা যখন বহির্বিশ্বের কোন একটা চলচ্চিত্র দেখি তখন সেই চলচ্চিত্রটি থেকে আমরা সেই দেশটি সম্পর্কে একটা ধারনা নিয়ে থাকি। সেই ধারনা কতটুকু সঠিক ধারনা তা কিন্তু আমরা ভাবি না। দর্শক-মনে চলচ্চিত্রের প্রভাব এতোটাই যে- চলচ্চিত্রে দর্শক যে চলমান চিত্র দেখে সেই চিত্রই তাদের মনোজগতে জীবন্ত হয়ে উঠে।

ফলে দীর্ঘ্যদিন একটি দেশের চলচ্চিত্র নিজের দেশকে, দেশের সংস্কৃতিকে, দেশের প্রকৃতিকে, মানুষকে ভূল ভাবে উপস্থাপন করলে ঐ দেশের চলচ্চিত্রের দর্শকদের মনে দেশটি সম্পর্কে সেই ভূল প্রতিচ্ছবিটাই গেঁথে যায়।

আমাদের চলচ্চিত্রের অবস্থাটাও সেরকম।

চলচ্চিত্রে দীর্ঘ্যদিন সস্তা হিরোইজম আর অতিরঞ্জিত ঘটনা দেখতে দেখতে আমাদের চলচ্চিত্রের নিয়মিত দর্শকরাও অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে সে সবে।

বাংলা চলচ্চিত্র শুরুর দিকে কিন্তু নিজের আত্মাকে ভালোভাবেই ধরতে পেরেছিলো। তখনো চলচ্চিত্রে সস্তা বানিজ্যিক ফর্মূলা ঢুকেনি। ৫০ এর দশক থেকে ৭০ দশকের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের নিজস্ব একটা পরিচয় ছিলো।

সে সময়ে বানিজ্যিক ধারার ছবিতেও উঠে আসতো বাংলার শহর-গ্রাম এবং বাঙ্গালীর সরল জীবনের চিত্র।

আজো আমাদের চলচ্চিত্র বলতে সেই সময়কার ‘’সূর্য দীঘল বাড়ী’’ (১৯৭৯), ‘’জীবন থেকে নেয়া’’ (১৯৭০), ‘’সীমানা পেরিয়ে’’ (১৯৭৭), ‘’তিতাস একটি নদীর নাম’’ (১৯৭৩) ছবি গুলোর নাম আমরা গর্ব ভরে উচ্চারন করি।

সে সময়ের বানিজ্যিক ধারার ছবি কিংবা ফোঁক ছবির মধ্যেও বাংলাদেশকে খুঁজে পাওয়া যেত। গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৮), ‘’সারেং বউ’’ (১৯৭৮), ‘’ভাত দে’’ (১৯৮৪) ছবিগুলো বানিজ্যিক ফর্মুলার নির্মিত হলেও তার মধ্যে বাংলার মানুষের দুঃখ দুর্দশার চিত্র ফুঁঠে উঠতো।

আর সে সব ছবিতে যে গান গুলো থাকতো তা কথা ও সূরে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ, অনুভূতিগুলোকে অসম্ভব সুন্দরভাবে ধারন করতো। ”ওরে নীল দরিয়া” এর মতো গান আজো বাঙ্গালী শ্রোতাদের হৃদয়কে তৃপ্ত করে।

মূলত ৮০ এর দশকের মাঝামাঝি থেকেই আমাদের সিনেমার বলিউডের সস্তা বানিজ্যিক ফর্মূলা ঢুকে পড়ে। শুরু হয় বলিউড ছবির সস্তা রিমেক। অনেক ক্ষেত্রে আবার স্বত্ব না কিনেই নকল করে তৈরী হয় বানিজ্যিক ছবি।

সে সময় থেকে বানিজ্যিক ছবির অবস্থা খারাপ হতে থাকে। তবে তখনো বিকল্পধারার নামে একটা সৃষ্টিশীল ধারা ছিলো। যার ফলে বানিজ্যিক ছবির পাশাপাশি অল্প কিছু ভালো ছবি নির্মিত হয়েছিলো। কিন্তু ৯০ এর শেষে যখন চলচ্চিত্র শিল্প একপ্রকার ভেঙ্গে পড়ে, অর্থাৎ বানিজ্যিক ছবিতে ভয়াবহ্‌ অশ্লীলতা শুরু হয়; তখন বাংলা ছবি সম্পূর্ন রুপেই তার নিজস্বতা হারায়।

গত দশকে হাতে গোনা কয়েকটি ছবিতে আমরা বাংলাদেশকে খুঁজে পেয়েছিলাম। তারেক মাসূদের ‘’ মাটির ময়না ‘’ (২০০২) তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এই ছবিতে আমরা বাংলাদেশকে পেয়েছি। পেয়েছি বাংলার মানুষের জীবনচিত্র।

এ ছাড়া হুমায়ূন আহমেদ তার ছবি গুলোতে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে নিজস্ব ফ্যান্টাসির মধ্যে দেখিয়েছেন। ‘’শ্রাবন মেঘের দিন’’ (১৯৯৯) ছবিটি হুমায়ুন আহমেদের নিজস্ব ফ্যান্টাসির বাংলাদেশকে ফুঁটিয়ে তুলেছে; যেখানে জীবন বড্ড সরল ও সুন্দর। একই সঙ্গে মানব-মনের কাব্যিক বেদনাও শ্রাবন মেঘের দিন ছবিটিসহ্‌ হুমায়ূন আহমেদের সবগুলো ছবিতে আমরা পাই।

এ সময়ে মোরশেদুল ইসলাম ‘’ দীপু নাম্বার ২ ‘’ (১৯৯৬), ‘’দুখাই’’ (১৯৯৭) সহ্‌ কয়েকটি ভিন্ন ধারার ছবি বানিয়ে প্রশংসিত হন।

এ ছাড়া তানভীর মোকাম্মেলও কিছু ভাল কাজ দর্শকদের উপহার দেন। যে সব ছবি বাংলার আত্মাকে ধারন করেছিলো।

অভিনেতা তৌকির আহমেদও চলচ্চিত্রকার হিসেবে দেশীয় সংস্কৃতিকে লালন করেছেন হৃদয়ে। তার ‘’জয়যাত্রা’’ (২০০৪) কিংবা হালের ‘’অজ্ঞাতনামা’’ (২০১৬) বাঙ্গালীর সংগ্রাম কিংবা সুখ দুঃখের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।

আধুনিক ধারার চলচ্চিত্রকার মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী বরং বাংলাদেশের শহুরে এবং আধুনিক সংস্কৃতিকে পর্দায় নিয়ে আসতে চেয়েছেন। তার চলচ্চিত্রে চিরায়ত বাংলাদেশকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও সমসাময়িক শহুরে উচ্চবিত্ত কিংবা উচ্চ-মধ্যবিত্তের জীবন নিজস্ব হিউমারের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন। যদিও তার চলচ্চিত্র-দর্শন নিয়ে অনেকের আপত্তি আছে।

এছাড়া গিয়াসউদ্দিন সেলিমের ‘’মনপুরা’’ (২০০৯) এর মতো হাতে গোনা অল্প কিছু বানিজ্যিক ছবিই বাংলাদেশকে ধারন করে নির্মিত হয়েছে।

 

এরপর চলমান দশকের দিকে তাকালে কেবলই হাহাকার করতে হয়। চলতি দশকে উল্লেখ করার মতো বাংলাদেশী ছবি নেই বললেই চলে।

গতবছর অমিতাভ রেজার ‘’ আয়নাবাজি ‘’ এবং তৌকির আহমেদ এর ‘’ অজ্ঞাতনামা ‘’ দেশী ছবি হিসেবে আলোচিত হলেও এ দশকে নির্মিত মোট ছবির  ১০% ছবিতেও বাংলাদেশকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

 

আগেই বলেছি যে, ৮০-এর দশকের পর থেকেই মূলত বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ভিনদেশী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটতে শুরু করে। দিন যত যাচ্ছে সে অবস্থা কেবল খারাপের দিকেই গেছে।

 

বর্তমানে বানিজ্যিক ছবির নামে যা হচ্ছে তা মূলত ভারতীয় বানিজ্যিক ছবিরই এক ধরনের সস্তা সংস্করণ। এসব ছবিকে বাংলাদেশের ছবি হিসেবে মেনে নেয়া এক প্রকার অসম্ভব। আর আমাদের চলচ্চিত্রের বিকল্প ধারাটিও কেন যেন খেই হারিয়ে ফেলছে।

সাম্প্রতিককালে ‘’জালালের গল্প’’ (২০১৪), ‘’বৃহন্নলা’’ (২০১৪) ‘’ভূবন মাঝি’’ (২০১৭) এর মতো কিছু দেশীয় সংস্কৃতির ছবি নির্মিত হলেও সংখ্যায় এ ধারার ছবি এতোটাই কম নির্মিত হচ্ছে যে বলতে গেলি দেশীয় ধারার চলচ্চিত্র এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে আছে।

অথচ বাংলা ছবিতে বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার প্রকৃতি, বাংলার মানুষকে তুলে ধরতে পারলেই কেবলমাত্র বাংলাদেশী চলচ্চিত্র একটা স্বতন্ত্র পরিচয় দাঁড় করাতে পারবে।

বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নয়নে নিজস্ব সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মানের বিকল্প নেই।

আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতি চলচ্চিত্র নির্মানের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আমাদের রয়েছে সরল প্রকৃতি এবং সরলতায় ভরা মানুষের জীবন।

আর বাংলার জীবন ও সংস্কৃতিতে মিশে আছে নানা ঘটনা বা গল্প।

বাংলাদেশের সাহিত্যও বানিজ্যিক চলচ্চিত্রে্র জন্য দারুন উপযোগী।

কেবল মাত্র শরৎ বা রবীন্দ্রনাথ দিয়েই হতে পারে অসংখ্য মানসম্মত চলচ্চিত্র।

 

পৃথিবীর বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখবো তাদের প্রত্যেকেরই নিজস্বতা আছে। আর এই নিজস্বতা আছে বলেই বিশ্বব্যাপী তারা সমাদৃত।

হলিউডের বিখ্যাত ছবি গুলো মূলত তাদের বিভিন্ন সাহিত্যকর্মেরই চলমান চিত্র। ইরানী চলচ্চিত্রকাররা তাদের মানুষের জীবনের সহজাত সরলতা ও সংগ্রামকে তুলে ধরেই বিশ্বব্যাপী নিজেদের গ্রহনযোগ্যতা করে নিয়েছে।

অথচ আমরা ভারতীয় ছবির অনুসরণ বা অনুকরণ করে টিকে থাকতে চাই।

প্রথমে বলিউডের ছবির হুবহু নকল করেছে আমাদের বানিজ্যিক ছবির নির্মাতারা। পরে দক্ষিন ভারতের ছবির অনুকরণ করে গেছে।

কি লাভ হয়েছে তাতে ?

দর্শক দিন দিন চলচ্চিত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সিনেমা হল গুলো একে একে বন্ধ হয়েছে। বাংলা সংস্কৃতি কলুষিত হয়েছে মাত্র।

বাঙ্গালী হার মানা জাতি নয়। এদেশের চলচ্চিত্রকাররাও হার মানবে না বলেই আমরা বিশ্বাস করি। যখন দেখি চলচ্চিত্রের এতো অবক্ষয়ের পরও এদেশের সাধারন মানুষ এখনো নিজ দেশের সিনেমা ভালবাসে, এখনো এদেশের সিনেমা দর্শকরা ভাল সিনেমার স্বপ্ন দেখে, এদেশের সাধারন মানুষ চায় আমাদের চলচ্চিত্রের একটা নিজস্ব পরিচয় হোক, আমাদের চলচ্চিত্র মাথা তুলে দাঁড়াক দেশে, বিদেশে; এখনো যখন দেখি এদেশের তরুনরা চলচ্চিত্রকার হতে চায়, স্বপ্ন দেখে নিজেদের চলচ্চিত্রকে সম্মানজনক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার; কিংবা শত সীমাবদ্ধতা স্বত্বেও এদেশের কোন কোন চলচ্চিত্রকার যখন গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে বরং নিজেদের মতো করে খাঁটি দেশীয় সিনেমা বানিয়ে যায়; তখন আশান্বিত না হয়ে পারি না আমরা।

স্বপ্ন দেখি একদিন আমাদের চলচ্চিত্রও নিজস্ব একটা পরিচয় দাঁড় করাতে পারবে। দেশে-বিদেশে আমাদের চলচ্চিত্র আমাদের সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানুষকে তুলে ধরবে।

আবারো বলি- চলচ্চিত্রের উন্নয়নে নিজস্বতার বিকল্প নেই।