পুরোনো দিনগুলোর প্রেম। (২য় পর্ব)

Now Reading
পুরোনো দিনগুলোর প্রেম। (২য় পর্ব)

১ম পর্ব।

১ম পর্বের পর।

প্রদীপ— সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিয়ে হয়তো আমি তোমার জন্য ১০১টি নীলপদ্ম আনিতে পারিবো না, রুপকথার রাজকুমারের মতো হয়তো তোমাকে আমার রাজকুমারী করে রাখতে পারিবো না। তবে হ্যা, এই পৃথিবীতে যতটুকু ভালবাসার অস্তিত্ত আছে তার সবটুকু দিয়ে তোমাকে ভালবাসিতে পারিবো। ও আমার হৃদয় হরণী প্রথম দর্শনেই আমার অজান্তে আমার হৃদয়, তোমাকে তার স্থানের অধিকারী করে দিয়েছে. এই অতি নগন্য ব্যক্তির স্থান কি তোমার হৃদয়পটে হবে?

নিলীমা— (অবিরাম হাসি)।
প্রদীপ— ঠাট্টা ভাবছেন?
নিলীমা— কেন? সব হাসি কি ঠাট্টার হয়?
প্রদীপ— হাসি অনেক রহস্যময় বস্তু। তা বোঝা বড় দায়।
নিলীমা— আচ্ছা ঠিক আছে আর হাসবো না।
প্রদীপ— আমার কথার তো কোন প্রতুত্তর পেলাম না।
নিলীমা— আজকে আমার সাজ দেখে আপনি নিশ্চয়ই ভেবেছেন এটা কাকতালীয়। না, ইহা ইচ্ছাকৃত। আপনি এমন কিছু বলবেন সেটা আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। সেদিন আমি যখন মন্দির থেকে বের হই তখন দেখি আপনি লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে দেখছেন। বুঝতে দেইনি যে আমি আপনাকে দেখেছি। আজ বুঝতে পারছি সেদিন এমন কেনো করেছিলেন। আপনি যদি সম্মতি দেন আর সময়ক্ষেপন নয় এখনই আমার হৃদয়ের সবস্থানটুকু আপনাকে প্রদান করিলাম। আপনার ইচ্ছা মতো অবস্থান করুন।

প্রদীপ— বালিকার এতো সহজে সম্মতি দেয়ার যথাযথ কারন আছে কি? অতি সহজে পাওয়া কিছু বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
নিলীমা— ভালবাসা বস্তুটি স্বয়ং ঈশ্বরের দান সে কখন যে কাহাকে দিতে বলে তাহা বুঝা নিতান্তই অসাধ্য। এটা মন ও মস্তিষ্ক থেকে আসে।
প্রদীপ—- তোমার নামের মতোই তোমার মনের বিশালতা অসীম।
নিলীমা— আপনিও প্রদীপের আলোর মতো ভালবাসার আলো দিয়ে আমাকে আলোকিত করে রাখবেন আশা করি।
প্রদীপ আর কিছু না বলে অতিদুঃসাহসে নিলীমার হাত ধরে হাঁটা শুরু করলো। তারপর তারা কি কথা বলতে ছিলো তা অজানাই থাক। (পাঠক মহাদয় ক্ষমা করবেন এই সময় তাদের মাঝে আমার না যাওয়াটাই শ্রেয়। তারা তাদের মত করে সময় কাটাক। তাদের এখনের অনুভূতিগুলো লেখায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে নিতান্তই অসম্ভব।)

তারপর দুজনে যার যার গন্তব্যে চলে এলো। পরের দিন ক্লাস ফাকি দিয়ে আবার দুজনে দেখা করলো। এই সময়টায় যেনো পৃথিবীর সবকিছুই তুচ্ছ মনে হয়, শুধু দুজন দুজনের পাশে থাকার প্রচেষ্টা।

প্রদীপ— বহুগুণী রমনী তোমার ঐ সুরেলা কন্ঠে একটি গান শোনার সৌভাগ্য কী আমার হবে?
নিলীমা— সবকিছুর অধিকার তো আপনাকে দিয়েছি তাহলে কেন এত সংশয়।
প্রদীপ— তারপরও সব কিছুতে তাড়াহুড়া করতে নেই।
নিলীমা কিছু না বলে গান গাইতে শুরু করলো—

তুমি সন্ধ্যারো মেঘমালা, তুমি আমারও সাধেরো সাধনা,
মম শূন্যগগনবিহারী।
আমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা–
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম অসীমগগনবিহারী ——

গান শেষ করে নিলীমা বললো এখন আপনার সময়। আমি জানি আপনি খুব ভালো আবৃত্তি করেন।
প্রদীপ— আজ না অন্য একদিন।
নিলীমা— কিছু কাজ সময় মতো না করলে পরে সেটার মূল্য কমে যায়।
প্রদীপ—ঠিক আছে করছি—
আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি
যুগল প্রেমের স্রোতে
অনাদিকালের হৃদয়-উৎস হতে।
আমরা দুজনে করিয়াছি খেলা
কোটি প্রেমিকের মাঝে
বিরহবিধুর নয়নসলিলে,
মিলনমধুর লাজে—
পুরাতন প্রেম নিত্যনূতন সাজে।

এভাবে তাদের দিনগুলো ভালোই যাচ্ছিলো! এটা এমন একটা সময় যে এই সময় সবাই ভালো থাকে। হঠাৎ একদিন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। আজকের মধ্যেই হলত্যাগ করতে হবে। এটা শুনে প্রদীপ ছুটে নিলীমার হলের দিকে গেলো। কিন্তু হলে প্রবেশ করতে পারলো না। পাগলের মতো চারপাশে ঘুরতে ছিলো। হটাৎ দেখলো নিলীমা তার বাবার সাথে হল থেকে বের হচ্ছে। কিন্তু কথা বলার কোন সুযোগ পেলো না। তারপর হলে ফিরে সবকিছু গুছিয়ে বাড়িতে চলে আসলো। বাড়িতে এসে প্রদীপ একটু অন্যরকম হয়ে গেছে। কারো সাথে তেমন কথা বলে না। একা একা থাকে। কিছুদিন এভাবেই কাটলো। হঠাৎ একদিন প্রদীপের বাবা প্রদীপকে বললো রাতে আমার ঘরে এসো তোমার সাথে কিছু কথা আছে। প্রদীপ বললো ঠিক আছে। রাতে প্রদীপ বাবার ঘরে গেলো।
প্রদীপ— আদাব বাবা! কিছু বলবেন?
বাবা— হুম, বসো। তোমার পড়াশুনা কেমন চলছে?
প্রদীপ— জ্বী, ভালো।
বাবা— ভার্সিটি খুলবে কবে?
প্রদীপ— জানি না বাবা, অনেক ঝামেলা চলছে।
বাবা— দেখো বাবা,আমার শরীরটা বেশি ভালো যাচ্ছে না। আমি চাচ্ছি তুমি এখন বিয়ে করো।
প্রদীপ— কি বলেন বাবা! আমার পড়াশুনা এখনো তো শেষ হয় নি। তাছাড়া আমি এখনো কিছু করছি না। সামনে মাস্টার্স ফাইনাল এক্সাম। তার পর বিসিএস এর প্রস্তুতি। এই সময় বিয়ে!
বাবা— সমস্যা কি? বিয়ের পড়ে পড়বে। তাছাড়া মেয়েও ঢাকায় পড়াশোনা করে বিয়ের পর দুজনে এক সাথে পড়বে। তুমি আমার এক মাত্র সন্তান। আমার যা কিছু আছে তা তোমার জন্য যথেষ্ট। চাকরি ততটা জরুরী না।
প্রদীপ— তারপরও বাবা।
বাবা— আমি কিছু শুনতে চাই না। তোমার কাকা তার বন্ধু কে কথা দিয়েছে। আমিও গিয়েছিলাম তার মেয়েকে দেখতে। তোমার সাথে ভালো মানাবে। এই নাও মেয়ের ছবি আশা করি তোমারও ভালো লাগবে। তুমি এখন আসতে পারো।
তারপর প্রদীপ চলে আসলো। বাবার কথার বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস প্রদীপের হলো না। শুধু প্রদীপ কেনো এই সমাজে সকল সন্তানই বাবার কাছে অসহায়। বাবাদের কথার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস খুব কম সন্তানেরই আছে। প্রদীপ ছবিটি না দেখে ফেলে দিলো। অন্যদিকে নিলীমা কেমন আছে তা নিয়ে প্রদীপ অনেক চিন্তায় আছে। প্রদীপের অনিচ্ছা সত্বেও বিবাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অবশেষে বিবাহের দিন এসে পড়লো। সবাই কনের বাড়ির দিকে যাত্রা করলো। দীর্ঘসময়পর সবাই গন্তব্যে পৌছালো। সেখানে সানাইয়ের প্রতিটা সুর প্রদীপের কাছে ভায়োলিনের করুন সুর মনে হচ্ছিলো। বিবাহের লগ্ন অতিনিকটে। সবাই উদগ্রীব শুধু প্রদীপ ব্যতীত। প্রদীপের মনের অবস্থা বুঝে আদিত্য বললো তোকে স্বান্তনা দেয়ার মতো ভাষা আমার কাছে নেই।
প্রদীপ– নিজের প্রতি খুব ঘৃণা হচ্ছে। স্বার্থপরের মতো আমি তাকে ত্যাগ করে দিতেছি।
এরই মধ্যে বিবাহ কনে এসে প্রদীপের সামনে উপস্থিত। পুরোহিত মশাই বিবাহ কার্যক্রম শুরু করলো। শুভ দৃষ্টিক্ষনে প্রদীপ যা দেখলো তা সে কল্পনাও করে নি। এই তার সেই প্রভাত কন্যা। শুভ দৃষ্টি শুরুর পূর্বেই নিলীমার আঁখি চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। প্রদীপ উঠে ধরার পূর্বেই নিলীমা মাটিতে লুটায়ে পড়ে। বিষ পানে তার শ্বেত মুখখানি নীল হয়ে গেছে। প্রদীপ চিৎকার করে বললো আমার জন্য তুমি এতো কিছু করলে! আমি অনেক স্বার্থপর। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও, আমার ভালবাসার আলো দিয়ে তোমার জীবনকে আলোকিত করতে পারলাম না।

শীতের সকালে ঘন কুয়াশার ভিতর হালকা রোদের আলোয় যার দেখা হয়েছিলো, বিমর্ষ রাতের অন্ধকারে সে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলো।

(পাঠক মহোদয়, পুরো গল্পটি লেখা হয়েছে অনেক আগের প্রেক্ষাপটে, তাই বর্তমানের সাথে এর অনেক কিছুই মিলবে না। আর এটা শুধুই একটা কল্পিত গল্প। ধন্যবাদ।)

গান ও কবিতা সূত্র: কবি গুরু।
ছবি সূত্র: prothom-alo

পুরোনো দিনগুলোর প্রেম। (১ম পর্ব)

Now Reading
পুরোনো দিনগুলোর প্রেম। (১ম পর্ব)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কারো কাছে এটি অহংকার আর গর্বের নাম, কারো কাছে তীব্র আক্ষেপের নাম, আবার কারো কাছে না জানা একটি নাম। সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজীতে মাস্টার্সে পড়ে একজন। তার নাম হলো, না থাক তার নাম বলার উপযুক্ত সময় এখনো হয়নি। (পাঠক মহোদয়, নাম না বলার জন্য ক্ষমা করবেন তবে উপযুক্ত সময়েই তার নামটা জানতে পারবেন)। তবে আপাতত তাকে “ছেলেটি” বলেই পরিচয় করানো হলো। ছেলেটি থাকে জগন্নাথ হলে। পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী। সাহিত্যে পড়ার কারণে তার মনে রসবোধ আছে অনেক। প্রতিদিনের মতো একদিন শীতের সকালে মন্দিরের পাশ দিয়ে হাটতে ছিলো। হটাৎ সকালের ঘন কুয়াশার ভিতর থেকে নূপুরের নিক্বণ শব্দ শুনতে পায়। শব্দটি তার মস্তিষ্ক থেকে হৃতপিণ্ডে যেতে বেশি একটা সময় নেয় নি। চারদিকে খুজতে থাকলো তবুও নূপুরানীর দেখা পেলোনা। অনেক খোজার পর মন্দিরের ভিতর তার দেখা পেল। সে দেখতে পেল কোনো এক রমনীর পৃষ্ঠদেশ। সুদীর্ঘ ঘনকৃষ্ণ কেশগুলো তার মধ্যমা পর্যন্ত অবস্থান করিতেছে। ছেলেটি তা একনয়নে দেখছে। তখন তার মনের ভিতর কী খেলা করতেছে তা জানা নিতান্তই অসম্ভব। আর ঐ দিকে মেয়েটি একঠায় দাড়িয়ে গভীর সাধনায় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে। কিছুক্ষন পরে মেয়টি প্রার্থনা শেষ করে মন্দির থেকে বের হলো। এতো সময় তাহার পৃষ্ঠদেশ দেখা গেছে। এখন তার অগ্রভাগ দেখার সৌভাগ্য হলো। তার কাজল মিশ্রিত দুটো হরিণির চোখ যা দেখলে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়, হালকা লম্বা মুখমন্ডলে বাকা ঠোট যেন তার সৌন্দর্যকে আরো বিকশিত করেছে। ঠোটের উপরে কালো ছোট্ট তিলটা আরো সৌন্দর্য যোগ করেছে, ছিপছিপে গড়নের দৈহিক আকৃতি, সব মিলিয়ে সে “অনন্য”।

ছেলেটি একটু লুকিয়ে থেকে তাকে যেতে দিলো। রমনী যখন হাটতেছিল তাহার নূপুরের ধ্বনিতে শুধু ছেলেটি কেনো, মন্দিরের ভিতরে থাকা দূর্গাও নিশ্চয়ই খুশি হয়ে আশীর্বাদ দিচ্ছে। সবশেষে বালিকা রিকসা করে তার গন্তব্যে চলে গেল। ছেলেটি পিছন পিছন গেলো কিন্তু হারিয়ে ফেলে। তারপর হলে ফিরে আসলো। রুমে এসে তার রুম মেইট এবং খুব কাছের বন্ধু আদিত্যের কাছে সব কিছু বলে। সেইদিন মেয়েটিকে নিয়েই ভাবতে ভাবতে তার দিন চলে গেলো। এভাবে মেয়েটিকে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই কয়েকদিন চলে গেলো। একদিন সকালে আদিত্য বললো চারুকলায় আজ বসন্ত উৎসব হবে চল যাই। ছেলেটি বললো ঠিক আছে চল। প্রস্তূতি শেষে দুজনে চারুকলায় গেলো। মঞ্চের অতি নিকটে তারা অবস্থান করছিলো। আকস্মিক কে যেন ছেলেটির পাশ দিয়ে দ্রূতগতিতে ছুটলো। ছেলেটি এদিক সেদিক তাকালো তারপর সে যাকে দেখলো তা হয়তো কল্পনাও করেনি। এই সেই প্রভাত বালিকা। মেয়েটি মঞ্চের দিকে যাচ্ছে। পরনে বসন্ত রঙের শাড়ি, অলক মধ্যে ফুলের গুচ্ছ। একটু পর ছেলেটি বুঝতে পারলো নৃত্য করবার জন্য বালিকার আগমন ঘটেছে। ছেলেটির ভাব দেখে আদিত্য বিষয়টা বুঝতে পারছে। সে জিজ্ঞেস করল এই সে মেয়ে? ছেলেটি বলল হুম এই সেই মেয়ে যে এক পলক দেখা দিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলো। আদিত্য বলল আজকে কথা বলতে হবে তার সাথে। ছেলেটি বলল এতো তাড়াতাড়ি আগানো কি ঠিক হবে?? আদিত্য বলল বন্ধু তাড়াতাড়ি না করলে তো আবার হারিয়ে ফেলবে। পরে ছেলেটিও রাজি হলো কথা বলতে। তারপর তারা দুজনেই মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলো। মেয়েটি তখন মাত্র নাচ শেষ করে মঞ্চ থেকে নামছে। আদিত্য ছেলেটিকে বলছে এখন কথা বলার সুযোগ আছে। ছেলেটির অনেক ভয় লাগছে। এই ভয়টা যেন সব পুরুষের মাঝেই বিদ্যমান। সে যেইহোক, যুদ্ধের ময়দানের সাহসী সৈনিক হোক কিংবা শত শত মানুষকে হত্যকারী ফাঁসির দন্ড পাওয়া আসামী হোক নারীর সামনে সবাইকেই আগে “ভয়” নামক শব্দটির সাথে পরিচিত হতে হয়। যাইহোক সেই ভয় কে দূরে ঠেলে দিয়ে ছেলেটি মেয়েটিকে বললো “এই যে শুনছেন আপনার সাথে কিছু সময় কথা বলার সুযোগ পেতে পারি কি?” এই বলে ছেলেটি মেয়েটির সামনে এসে দাড়ালো।
মেয়েটি– কিছু বলবেন কি?
ছেলেটি— আপনার নামটা জানতে পারি কি?
হূঁম! পারেন, আমি নিলীমা। আপনি?
(এতো সময় অপেক্ষা করার জন্য পাঠকদের কাছে কৃতজ্ঞ)
ছেলেটি— আমার নাম প্রদীপ! কোথায় পড়াশুনা করেন?
নিলীমা— চারুকলায় ১ম বর্ষে, আপনি?
প্রদীপ— ইংরেজীতে মাস্টার্স করছি।
নিলীমা— হুঁম! এখন যেতে হবে। ভালো থাকবেন।
এই বলেই নিলীমা হাঁটা ধরল।
প্রদীপ চিৎকার করে বললো— বালিকার দেখা আর কি কখনো পাওয়া যাবে?
নিলীমাও চিৎকার করে বললো— মনে বিশ্বাস রাখুন। হলেও হতে পারে (হাসি)।

অবশেষে প্রদীপ আর আদিত্য হলে ফিরে আসলো। পরেরদিন প্রদীপ একাই চারুকলার দিকে গেলো। অনেক সময় খোজাখুজির পরও নিলীমার দেখা পেলো না। এভাবে দুই, তিনদিন খোজার পর একদিন টিএসসি তে তার দেখা পেলো।
প্রদীপ— এই যে শুনছেন?
নিলীমা— হায় আপনি যে! আমাকে খুজছিলেন নিশ্চয়ই?
প্রদীপ— কিছুটা, একটু সময় হবে কি?
নিলীমা—হুম! হবে, তবে এখন না। বিকেলে আমি এখানেই থাকব। আপনি চলে আইসেন।
প্রদীপ— ঠিক আছে।

বিকেলে প্রদীপ কথামতো টিসএসসি তে গেলো। একটু পরে নিলীমাও আসলো।

প্রদীপ— কেমন আছেন?
নিলীমা— ভালো। আপনি?
প্রদীপ— ভালো। চলেন সামনে হেঁটে হেঁটে কথা বলি।
নিলীমা— চলেন।
প্রদীপ— আচ্ছা আপনার দেশের বাড়ি কোথায়?
নিলীমা— ফরিদপুর। আপনার?
প্রদীপ— গোপালগঞ্জ।
নিলীমা— ফরিদপুর আসছেন কখনো?
প্রদীপ— অনেক আগে একবার গিয়েছিলাম। আমার কাকাবাবু ওখানে চাকরি করে, তার বাসায়।
নিলীমা— আচ্ছা, আপনি আমার পিছু নিচ্ছেন কেনো?
প্রদীপ— কেন বেশি অপরাধ করে ফেললাম? সময় হোক জানতে পারেন।
নিলীমা— তা না, তবে অজানা লোকের সাথে কথা বলতে একটু অস্বস্তি লাগছে আর কি!
প্রদীপ— কেনো পরিচয়তো দিলাম!
নিলীমা— পরিচয় দিয়ে একজনকে চেনা যায় কিন্তু জানা যায় না।
প্রদীপ— বাহ! আপনি তো খুব ভালোভাবে কথা বলেন।
নিলীমা— (হাসি)। আজ যেতে হবে।
প্রদীপ— কাল কি দেখা হতে পারে?
নিলীমা— হুম! হতে পারে (হাসি)।
প্রদীপ— আচ্ছা, এখন আসি।
নিলীমা— ঠিক আছে।

তারপর দুজনে যার যার গন্তব্যে চলে এলো। এভাবে তাদের মধ্যে কয়েকদিন দেখা হলো, কথা হলো, দুজন দুজনকে জানাশোনা হলো। একদিন প্রদীপ ভাবলো নিলীমা কে সে ভালবাসার কথাটা বলেই দিবে। এতো দিন ধরে হৃদয়ের গহীন কোণে একটু একটু যেই অনুভূতিগুলো জমা হয়েছে সেগুলো প্রকাশ করার উপযুক্ত সময় হয়েছে। প্রতিদিনের মতো প্রদীপ নিলীমার সাথে দেখা করতে গেলো।
প্রদীপ— আপনার সাথে কিছু বিশেষ কথা ছিলো।
নিলীমা— হুম, বলেন (হাসি)।
প্রদীপ— আজ না, কাল বলবো।
নিলীমা— ঠিক আছে।
প্রদীপ— কাল বিকেল ৪ টায় কার্জন হল এলাকার পুকুর পাড়ের দিকে দেখা হবে।
নিলীমা— হুম! (হাসি)
প্রদীপ— আচ্ছা, আজ আসি। কাল সময় মতো দেখা হবে।
নিলীমা—- ঠিক আছে।
পরের দিন যথাসময়ে প্রদীপ সেই স্থানে পৌছালো। কিছু সময় অপেক্ষার পর নিলীমা আসলো। আজ নিলীমাকে দেখে প্রদীপ একটু অবাকই হয়েছে কারণ সেদিন সকালে তাকে যেমন দেখাচ্ছিলো আজ ঠিক তেমনই দেখাচ্ছে। সেই পোশাক, সেই সাজসজ্জা। সব থেকে বড় বিষয় হচ্ছে সেই নূপুর। আজ সে নূপুর পড়েছে।
প্রদীপ— অপরুপা আপনাকে স্বাগতম!
নিলীমা— (হাসি)!
প্রদীপ— চলেন হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা যাক।
নিলীমা— আপনার বিশেষ কথা কি এখন শুনতে পারি?
প্রদীপ— নিশ্চয়ই। জানি না আপনি কিভাবে নিবেন। তারপরও বলছি। কারণ কিছু অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে নেই।
নিলীমা— ঠিক বলছেন। লুকিয়ে রাখলে অনুভূতিগুলো মনের ভিতর খেলা করে। তাতে কষ্ট বাড়ে। বলেন কোন ভয় নেই।
প্রদীপ— সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিয়ে হয়তো আমি তোমারি জন্য ১০১টি নীলপদ্ম আনিতে পারিবো না, রুপকথার রাজকুমারের মতো হয়তো তোমাকে আমার রাজকুমারী করে রাখতে পারিবো না। তবে হ্যা, এই পৃথিবীতে যতটুকু ভালবাসার অস্তিত্ত আছে তার সবটুকু দিয়ে তোমাকে ভালবাসিতে পারিবো। ও আমার হৃদয় হরণী প্রথম দর্শনেই আমার অজান্তে আমার হৃদয়, তোমাকে তার স্থানের অধিকারী করে দিয়েছে. এই অতি নগন্য ব্যক্তির স্থান কি তোমার হৃদয়পটে হবে?
চলবে————-
( পাঠক মহাদয় অপ্রত্যাশিতভাবে এখানে শেষ করার জন্য ক্ষমা করবেন। অতিশীঘ্রই ২য় পর্ব দেয়া হবে।)

ছবিসূত্র: Prothom-alo

ফেসবুক এবং আমাদের বিকৃত মানসিকতা!!

Now Reading
ফেসবুক এবং আমাদের বিকৃত মানসিকতা!!

মানুষ পরিবর্তনশীল। সে তার মেধা, প্রচেষ্টা এবং শ্রম দিয়ে প্রতিনিয়ত তার জীবনযাপনকে পরিবর্তন করছে।জীবনকে সহজ থেকে আরো সহজতর করছে। সেই প্রাচীন যুগে মানুষ বস্ত্রহীন ছিলো, খাদ্য হিসেবে ফলমূল আহার করতো, একজন আর একজনের সাথে যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন আকার-ঈঙ্গিত ব্যবহার করতো। ধীরে ধীরে মানুষ সভ্য হতে থাকে বস্ত্র ধারণ করতে শিখে, আগুন দিয়ে খাবার রান্না করে খেতে শিখে, যোগাযোগের জন্য ভাষার ব্যবহার শুরু করে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগ পেরিয়ে আমরা এখন আধুনিক যুগে বাস করি। এই আধুনিক যুগের প্রধান হাতিয়ার হলো প্রযুক্তি। যোগাযোগের জন্য এখন শুধু ভাষার ব্যবহারই হয় না। প্রযুক্তির কল্যাণে খুব সহজেই আমরা এখন দূরবর্তী কারো সাথে মুহূর্তের মধ্যে যোগাযোগ করতে পারছি। সেই যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম রয়েছে যেমন- মোবাইল, টেলিফোন, ফেসবুক, টুইটার, ই-মেইল ইত্যাদি। এদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হলো ফেসবুক। ফেসবুকের তথ্যমতে সারা বিশ্বে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা দুইশো কোটিরও বেশি। বাংলাদেশেও ব্যবহারকারীর সংখ্যা একদম কম নয় প্রায় দুই কোটিরও বেশি।

প্রতিটা জিনিসের কিছু ব্যবহারবিধি থাকে। ফেসবুকেরও কিছু ব্যবহার বিধি আছে। সবকিছু সহজলভ্য হওয়ার কারণে অতিসহজেই আমরা সবাই এখন ফেসবুক ব্যবহার করতে পারছি। কিন্তু আমরা কি এর ব্যবহারবিধি মেনে ব্যবহার করতে পারছি? একবার ইউটিউবে টেন মিনিট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আয়মান সাদিকের একটা ক্লাস করছিলাম। সেখানে সে বলেছে-“আমরা শিক্ষিত হওয়ার আগে ডিজিটাল হয়ে গেছি”।  আমি মনে করি তার কথাটা শত ভাগ বাস্তব কথা। আমাদের সবারই হয়তো মনে আছে, আমরা যখন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ক্লাস করি তখন একটা ওরিয়েন্টেশন হয়।  শিক্ষকরা আমাদের শিখিয়ে দেয় কি করতে হবে, কি করা যাবে না, আচার-আচারণ কেমন হবে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে হয়তো সেগুলো হয় না। তবে আমরা নিজেরা তো জেনে নিতে পারি। আমি এমনো অনেক কে দেখেছি যে গ্রাজুয়েশন শেষ করার পরও ফেসবুকে  বাংলা, ইংলিশ লেখাটাও ভুল করে। কোন ধরনের স্ট্যাটাস দিতে হবে, কোন ধরনের ছবি পোস্ট করতে হবে তাও জানে না।  এই যদি হয় শিক্ষিতদের অবস্থা। তাহলে ভাবুন অশিক্ষতরা কী করবে? আমাদের অনেকের ফেসবুক প্রোফাইলের নাম দেখলে হাসি পায়। “আই লাভ ইউ জরিনা, তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না, বুকে অনেক কষ্ট,” এধরনের হয় অনেকের প্রোফাইল নাম। আমরা কোন পোস্টে কী কমেন্ট করতে হবে তাও জানি না। মার্ক জাকারবার্গের ফেসবুক লাইভে ও আইসিসির ফেসবুক লাইভেও আমরা কমেন্ট করি “চিকন পিনের চার্জার হবে, নোয়াখালি বিভাগ চাই” ইত্যাদি হাবিজাবি লিখে। যারা এগুলো করে তারা ভাবে এতে কি হবে। কিন্তু এতে অনেক কিছু হয়। সারা বিশ্বের মানুষ সেখানে থাকে। তারা দেখছে বাংলাদেশের মানুষ কেমন। তারা ভাবছে কোথায় কি বলতে হয় আমরা তা জানি না। মাঝে মধ্যেই নিউজ পোস্টের কমেন্ট দেখি, সেখানে দেখা যায় আমরা গালাগালিটা কত ভালো পারি। কারো সমালোচনা যদি করতেই হয় তাহলে ভদ্র ভাষায় তো করা যায়। গালাগালি তো অসভ্যতার লক্ষণ। 

অনেকেই এখন ফেসবুক সেলিব্রেটি হওয়ার জন্য নানা কিছু করছে। একদিন একটা নিউজে পড়ছিলাম যে শুধুমাত্র ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার জন্য একটা ছেলে  চলতি ট্রেনের নিচে শুয়ে ছিলো, আর অন্য একজনে পাশ থেকে সেটার ভিডিও ধারণ করছিলো। যেন সেটা ফেসবুকে আপলোড করে তাড়াতাড়ি ভাইরাল হওয়া যায়। এটা তো সিম্পল বিষয়। এখন ভাইরাল হওয়ার জন্য মেয়েরা শরীর দেখাতেও দ্বিধাবোধ করে না। এইতো কয়েকদিন আগেও বিপিএল এর ফাইনাল ম্যাচ চলাকালীন এক মেয়ে স্ট্যাটাস দিছে যে “ঢাকা ডায়নামাইটস হেরে গেলে সে ছোট পোশাক (এখানে অন্য কিছু বলছে ভদ্রভাবে বলার জন্য ছোট পোশাক শব্দটা ব্যবহার করেছি) পড়ে লাইভে আসবে। ভাবতে পারেন এরা কতটা বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ? সামাজিক মাধ্যমটাকে এরা অসামাজিক করে ফেলছে। ভাইরাল যদি হতেই হয়, এতোই যদি আপনাদের জনপ্রিয় হওয়ার ইচ্ছা তাহলে শরীর দিয়ে নয় বুদ্ধি দিয়ে হওয়ার চেষ্টা করুন। এমন কিছু করেন যা সমাজের জন্য কল্যাণকর। তাতে আরো বেশি জনপ্রিয় হওয়া যাবে।

অনেকে তো ফেসবুকের প্রতি আসক্ত হয়ে গেছে। এরা এমন পর্যায় চলে গেছে যে ফেসবুক ব্যবহার না করে থাকতে পারেনা। ব্যাপারটা এমন যে এরা ফেসবুককে ব্যবহার করেনা উল্টো ফেসবুক এদেরকে ব্যবহার করছে। সারাক্ষন ফেসবুকে থাকতে থাকতে এরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে এরা যন্ত্রের মতো হয়ে যাচ্ছে। বিবেক, বুদ্ধি ও মনুষ্যত্ব সব কিছু লোপ পাচ্ছে। এরাই পরে বিভিন্ন সাইবার অপরাধের জড়িয়ে পড়ে।

ফেসবুক শুধু লাইক, কমেন্ট, শেয়ার এবং ছবি আপলোড করার জন্য না। এর মাধ্যমে অনেক ভালো কিছু করা যায়। বলতে গেলে ফেসবুক এখন একটা ডিজিটাল সিভি। আপনি ফেসবুক প্রোফাইলটা ভালো ভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখুন। আপনি কোন কোন কাজে পারদর্শী, আপনার প্রিয় শখ কি, আপনার কোন ধরনের কাজ করতে ভালো লাগে সেগুলো সেট করুন। একটা কথা মনে রাখতে হবে ফেসবুক এখন নিজের একটা বহিঃপ্রকাশ। অনেকেই আপনার প্রোফাইল দেখতে পাবে। আপনি কোন ধরনের পোস্ট দিচ্ছেন, কোন ধরনের ছবি আপলোড করছেন, কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন, সব কিছু তারা দেখছে। তাই নিজের ব্রান্ডিংটা ভালো ভাবে করুন। এমন কোন কিছু করবেন না যেটা দেখে মানুষ হাসাহাসি করে। আপনার কাছ থেকে যেনো আর একজন কিছু শিখতে পারে এমন কিছু করেন।

সবশেষে একটা কথা বলতে চাই সবাই যে এরকম তা নয়। অনেকেই এখন ফেসবুকের মাধ্যমে অনেক ভালো ভালো কাজ করছে। কেউ ফেসবুকের মাধ্যমে রক্তদান কর্মসূচী করছে, কেউ বিজনেস করছে, কেউ ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করছে, এরকম বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ করছে। এর বড় একটা উদাহরণ টেন মিনিট স্কুল। যার মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ ঘরে বসে বিনামূল্যে ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে ক্লাস করতে পারছে। আমাদের সবারই উচিত যার যার অবস্থান থেকে এরকম উদ্যোগ গ্রহন করা, নতুন নতুন আইডিয়া তৈরি করা। যেটা নিজের এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর হবে। বর্তমানে উন্নতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো প্রযুক্তি। যত ভালো ভাবে এই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করা যাবে তত তাড়াতাড়ি উন্নতির শিখরে পৌছানো যাবে। তাই আমাদের প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করাটা শিখতে হবে। চলুন সবাই প্রতিজ্ঞা করি আজ থেকে যেন ফেসবুকের মাধ্যমে ভালো কিছু করার চেষ্টা করি।  

 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া

আমরা এবং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা!!

Now Reading
আমরা এবং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা!!

“শিক্ষা” একটি দেশ ও জাতির উন্নয়নের প্রধান সিঁড়ি। যেটি ছাড়া একটি দেশের উন্নতি অসম্ভব। সামাজিক,  অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত প্রতিটি ক্ষেত্রেই উন্নতির প্রধান হাতিয়ার হলো এই শিক্ষা।

প্রাচীন যুগে এই শিক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল আত্মার উন্নতি সাধন। যার জন্য প্রয়োজন হতো সাধনা, চিন্তা ও আত্মসংযম।  শিক্ষা প্রক্রিয়ায় কোন ব্যক্তির মাঝে অন্তর্নিহিত যে গুণাবলী রয়েছে সেগুলোকে পূর্ণ বিকাশের জন্য উৎসাহ দেয়া হয় এবং সমাজের একজন দক্ষ ও উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভের জন্য যে সকল দক্ষতা প্রয়োজন সেগুলো অর্জনে সহায়তা করা হয়। সাধারণ অর্থে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে। তবে শিক্ষা হল সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন। সক্রেটিসের ভাষায় “শিক্ষা হল মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ।” এরিস্টটল বলেন “সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হল শিক্ষা”। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় “শিক্ষা হল তাই যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।”

অবিভক্ত ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে প্রচলিত প্রাথমিক শিক্ষার আনুষ্ঠানিক প্রচলন কখন কোথায় প্রথম শুরু হয় তা বলা বেশ কঠিন। আনুমানিক ৩০০০ বছরেরও পূর্বে এ উপমহাদেশে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বীজ রোপিত হয় যা কালের আবর্তনে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে সেই শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে আমরা সেই শিক্ষা কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি সঠিক ও কার্যকরি শিক্ষাব্যবস্থা? সেটা হয়তো এখনো হয়নি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিভিন্ন সমস্যা।  গত কয়েক বছরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ভয়াবহ থাবা বসাচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁস। আজ শোনলাম শিক্ষকদের কল্যাণে দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রশ্নও নাকি ফাঁস হয়েছে। ভাবতে পারেন কতটা ভয়াবহ?  এটা সংক্রমণ রোগের মতো প্রতিনিয়ত পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে সংক্রমিত করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া অসামঞ্জস্যপূর্ণ সিলেবাস প্রনয়ণ,  অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা, অদক্ষ শিক্ষক,  শিক্ষকদের সদিচ্ছার অভাব বিভিন্ন সমস্যায় বিজড়িত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা।  তারপরও কিছুটা হলেও তো আমাদের শিক্ষা গ্রহনের সুযোগতো আছে।  সেই শিক্ষাটুকু আমরা যারা শিক্ষার্থী আছি ভালোভাবে অর্জন করতে পেরেছি? কয়েকজন পারলেও অধিকাংশই এখনো তা পারিনি। আমি এমনো অনেককে দেখেছি গ্রাজুয়েশন শেষ করার পরও সঠিকভাবে ইংরেজী পর্যন্ত পড়তে পারেনা। ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিলে বাংলা লেখাটাও ভুল করে। (এই ফেসবুক কান্ড নিয়ে আরেক দিন লিখবো)।  অনেকে বলবে আমাদের সেভাবে শিখানো হয়নি। আমি তাদের বলবো, মানলাম হয়নি,  তো নিজে কী করছেন?  এখন অনেক উপায় আছে শেখার, নিজে শিখুন। সবাই যে অত্যন্ত মেধাবী হবে আমি এটা বলছিনা। এটা সম্ভবও না। তবে আপনি যতটুকু পড়াশুনা করছেন তা তো ভালোভাবে শিখবেন। আপনি গ্রাজুয়েশন করার পরও যদি সঠিকভাবে ইংরেজী, বাংলা পড়া ও লেখা ভুল করেন। আমি বলবো এটা একান্তই  আপনার ব্যর্থতা, অন্যকিছুকে দোষারোপ করার সুযোগ নেই। এসব লোকেই বলে চাকরি পাইনা, দেশে চাকরি নেই, ঘুষ ছাড়া চাকরি হয় না। হ্যা, এটা ঠিক আমাদের দেশে লোকসংখ্যার তুলনায় চাকরি কম,  দুর্নীতিও আছে। তাই বলে যে ঘুষ ছাড়া একদমই চাকরি হয়না এটা মানতে পারলাম না।  একবার ভাবুনতো, লোকসংখ্যা বেশি আর চাকরি কম,  তাহলে ভালো যোগ্য প্রার্থী না নিয়ে আপনার মতো  অযোগ্যকে তারা  নিবে কেনো? বাজারে পণ্যের সরবরাহ বেশি হলে আপনিও তখন কম দামে ভালো পণ্যটাই কিনতে চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। তেমনি তারাও এতো লোকের মাঝে যে সবচেয়ে যোগ্য তাকেই নিবে এটাও স্বাভাবিক। আর  যারা অযোগ্য  তাদের  ঐ অযোগ্য জায়গাটা পুরণ করতেই তখন ঘুষ দিতে হয়। কম চাকরি আর বেশি চাকরি প্রার্থীর মাঝে আপনাকে একটু বেশিই যোগ্য হতে হবে এটাই স্বাভাবিক, তানাহলে আপনি প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়বেন। এখন অনেকে  মনে করবেন বেশি জনসংখ্যা একটা বোঝা।  একবার ভাবুন তো আমরা সবাই যদি শিক্ষিত ও দক্ষ হতে পারি তাহলে এই বোঝাটাই একদিন সম্পদে পরিণত হবে। তখন নতুন নতুন চাকরির বাজার তৈরি হবে। তখন দেখবেন আপনি চাকরিকে না  বরং চাকরি আপনাকে খুঁজবে। 

 

এবার আসি আমাদের অভিবাবকদের কথায়। আমরা এখনো বলতে গেলে প্রায় ৮০ ভাগ  ( আনুমানিক)  অশিক্ষিত অভিবাবকদের সন্তান। এটাও আমাদের অনেক বড় একটা বাঁধা। তারপরও আর ২০ ভাগ যারা আছে তারা কি সঠিকভাবে সন্তানদের গড়ে তুলতে পারছে? এদের বেশির ভাগই শহর এলাকার।  একজন সন্তান শিক্ষকদের আগে পিতা-মাতার সংস্পর্শে থাকে। তাই তাদের দায়িত্বটাও বেশি। কিন্তু দূঃখজনক হলেও সত্য তারা সেভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেনা। ছোট ছোট শিশুদের বিভিন্নভাবে তারা প্রতিনিয়ত চাপ দিচ্ছে যেমন- অতিরিক্ত প্রাইভেট, কোচিং, গানের ক্লাস, নাচের ক্লাস, পাশের বাসার ভাবির ছেলে প্রথম হয়েছে তোমাকেও প্রথম হতে হবে, বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়তে হবে, ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। এমনভাবে তারা নিজেদের ইচ্ছা সন্তানদের উপরে চাপিয়ে দিচ্ছে। সন্তানের ভালো লাগা, খারাপ লাগা তাদের কাছে কিছুই না।

 

সবশেষে একটা কথা বলতে চাই সফল হতে গেলে বিভিন্ন সমস্যা থাকবেই। হ্যা এটা ঠিক অভিবাবক ও শিক্ষকদের অবহেলার কারণে প্রথমে আমরা তেমন ভালো গাইডলাইন পাইনা। তবে একটা সময়তো আসবে যখন আমাদের জানার ও বোঝার ক্ষমতা হবে তখন আমাদের ঐ সময়টুকু সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। এটা মনে রাখতে হবে সফল আপনি হবেন তাই কষ্টটাও আপনারি বেশি করতে হবে।  নিজের চেষ্টা, শ্রম দিয়ে সমস্যা মোকাবেলা করে সফল হতে হবে।  এমনভাবে শিক্ষা অর্জন করা উচিত যাতে শিক্ষাকেও যেন শিক্ষা দেওয়া যায়। শিক্ষাকে শিক্ষা দেয়া বলতে বোঝানো হয়েছে এমনভাবে শিক্ষা অর্জন করতে হবে যেন নতুন নতুন চিন্তা ভাবনা দিয়ে শিক্ষাটাকে যেন আরো উন্নত ও আধুনিক করা যায়। দার্শনিক কনফুসিয়াসের একটা কথা আছে- “চিন্তা ব্যতীত শিক্ষা হচ্ছে বৃথা আর শিক্ষা ব্যতীত চিন্তা হচ্ছে বিপদজনক।” তাই শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি আমাদের চিন্তাভাবনা ও গবেষনার মাধ্যমে শিক্ষার সুফল ছড়িয়ে দিতে হবে। তাহলেই শিক্ষা অর্জন করাটা সার্থক হবে।

 

(এটা লেখকের একান্তই ব্যক্তিগত মতামত। কারো মতাদর্শের সাথে নাও মিলতে পারে)

 

তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া।

ছবিসূত্র: banglarjob.com