বাংলাদেশের ডিজিটাল ম্যাপে মুক্তিযুদ্ধ

Now Reading
বাংলাদেশের ডিজিটাল ম্যাপে মুক্তিযুদ্ধ

ডিসেম্বরজুড়ে দেশের ৬৪ জেলায় সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে ও প্রিয় ডটকমের সরাসরি তত্ত্বাবধানে মুক্তিযুদ্ধের ছোটবড় ঘটনাগুলোকে শনাক্ত করে অজানা ও য়িষ্ণু প্রায় ইতিহাসকে দীপ্তিময় করে তোলা হবে। এসব ঘটনা ও ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা হবে বাংলাদেশের ডিজিটাল মানচিত্রের ওপর। এ ডিজিটাল আর্কাইভ ইতিহাসকে পৌঁছে দেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে, যাতে প্রজন্মান্তরে আমাদের অমূল্য মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রামের ঘটনা হারিয়ে না যায়।
এ ব্যাপারে প্রিয় লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাকারিয়া স্বপন বলেন, সর্বস্তরের বাংলাদেশী নাগরিককে এই উদ্যোগে সংযুক্ত করতে ডিসেম্বর থেকে প্রিয় মুক্তি পিন সফটওয়্যারটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে রাখা হবে। উন্মুক্ত করা হবে মোবাইল অ্যাপ। বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে আগ্রহী যে কেউ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুক্তি পিন ম্যাপের মাধ্যমে প্রকাশ করে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এই ডিজিটাল আর্কাইভের অংশ হতে পারবেন। নিজস্ব বিচারক প্যানেল পিনদাতাদের দেয়া প্রতিটি পিনের সত্যতা নিশ্চিত করবে। সাধারণ মানুষের দেয়া পিনগুলোর সত্যতা ও যথার্থতা যাচাই করার জন্য প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান, প্রফেসর ড. কায়কোবাদ, প্রফেসর ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, ড. গওহর রিজভীর মতো আরো বিশেষ কিছু ব্যক্তিত্বদের নিয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছে প্রিয় লিমিটেড। যারা সঠিক পিন দেবেন তাদের পিনগুলোকে ম্যাপেই ভ্যারিফাই করে দেয়া হবে। গত ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ প্রকল্পটি চলবে আগামী ২৮ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত। মার্চে সর্বোচ্চ সংখ্যক সঠিক মুক্তি পিনদাতাদের মধ্য থেকে প্রথম ১০০ জনের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে পুরস্কার ও অন্যান্য সৌজন্য সামগ্রী উপহার দেয়া হবে। পিন করার প্রক্রিয়া  বলা হয়েছে, আপনার স্মার্টফোনটিতে প্রিয় অ্যাপটি ডাউনলোড করুন অথবা ব্রাউজার থেকে priyo.com/muktipin ওয়েব পেজটি ভিজিট করুন। ওয়েব পেজ বা অ্যাপটি লোড হওয়ার পর আপনার সামনে উন্মুক্ত হওয়া স্ক্রিনটিতে পিন করুন নামক বাটনটি কিক করুন। একটি উইন্ডো প্রদর্শিত হবে, সেখানে আপনার প্রাথমিক সব তথ্য (নাম, ফোন নম্বর এবং ইমেইল) দেয়ার পর আপনার পিন সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য দিন। মুক্তি পিনের টাইটেল, ওই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট ছবি, ঘটনার বিবরণ, সময়কাল লিখে সঠিক স্থানটি ম্যাপে সংযুক্ত করে পোস্ট বাটনে কিক করুন। ঘটনা সংশ্লিষ্ট সঠিক জায়গাটি ম্যাপে পিন করার সুবিধার্থে ম্যাপের সাথে সংযুক্ত সার্চ অপশনে জায়গাটির নাম লিখে এন্টার ক্লিক করুন। এরপর সঠিক জায়গাটি ম্যাপের মধ্য থেকে খুঁজে বের করে পিন করুন। পোস্ট করার পর আপনার পিনটি প্রাথমিকভাবে ম্যাপে সংরক্ষিত হবে। কিছু সময় পর যাচাই-বাছাই (ভেরিফিকেশন) প্রক্রিয়া শেষে আপনার পিনটি আমাদের মুক্তি পিন ম্যাপে স্থায়ীভাবে প্রকাশ করা হবে। পিন প্রদানের জন্য আপনার দেয়া তথ্যগুলো অবশ্যই বাংলায় হতে হবে।  ইউনিকোড কিংবা অভ্র,  ইত্যাদি ফন্ট ব্যবহার করা যাবে। ঐতিহাসিক জায়গাটির যুদ্ধের সময়কার তৎকালীন ছবি দেয়া বাধ্যতামূলক নয়। বর্তমানে ওই স্থানটি যেমন অবস্থায় আছে, সেই ছবিটিও প্রদান করা যাবে। মুক্তিযুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এমন কোনো অবান্তর ঘটনা পিন করা হলে কিংবা পিনকৃত ঘটনাটির সত্যতা না পাওয়া গেলে সেটি তাৎণিকভাবে ম্যাপ থেকে মুছে ফেলা হবে।

নি বে দি ত

Now Reading
নি বে দি ত

কাল হাবিবার জন্মদিন। তাই ভাবনার অন্ত নেই। কারণ আমার এত বড় পকেটটা শূন্য মাঠের মতো খালি হয়ে আছে। কী করব বুঝতে পারছি না। ডিপ্লোমা কোর্স শেষ করে দিব্যি বসে আছি। কোনো চাকরির দেখা আমার কপালে আজ পর্যন্ত জোটেনি। হাবিবাও আমাকে মাঝে মাঝে, না মাঝে মাঝে বললে বিরাট রকমের ভুল হবে। বলতে হবে সারাক্ষণই অকর্মা বলে আচ্ছা মতো জব্দ করে। শুধু কান পেতে শুনে যাই। কিছুই করার নেই। একজন মানুষ যা, লোকে তো তাই বলবে। সে অন্য কিছু তো আর বলে না। মাঝে মাঝে আবার অন্য কিছুও বলে। যা বলার নয়। কয়েক জায়গায় চাকরির অ্যাপ্লাই করেছিলাম। কিন্তু সেই চাকরি আর আলোর মুখ দেখেনি। অনেক পরিশ্রম করেও যখন শেষে আর হয় না তখন মনের অবস্থাও খুব খারাপ হয়ে যায়। তাই দিন দিন চাকরির আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি। অন্য কিছু করব ভাবছি। কী করব সেটাও ভেবেও পাচ্ছি না।
বাড়ি থেকে টাকা নিতে গেলেও লজ্জা লাগে। সাত-পাঁচ না ভেবে তবু টাকা সংগ্রহ করে ফেলি। চলতে হবে তো নাকি। টাকা ছাড়া যে এক পা ফেলা যায় না, তা আর আমার চেয়ে কে ভালো জানে!
হাবিবার জন্মদিনে একটা কিছু তো দিতেই হবে। ভাবলাম সুন্দর একটা সোপীস কিনে দেবো। টাকার কাছে এসেই থেমে গেলাম। তবে বুদ্ধি একখানা পেয়ে গেলাম। বাড়িতে এসে আদরের মাকে বললাম, মা একটা চাকরির অ্যাপ্লাই করব, কিছু টাকা দাও তো। মা তার অকর্মা ছেলের দিকে তাকিয়ে আর না করতে পারল না। নিমেষেই মা শ’পাঁচেক টাকা বের করে দিলো। মা জানে তার তার পাগল ছেলের একটা চাকরির জোগাড় হয়ে গেলে অন্তত বাবার ঘ্যানঘ্যানানি থেকে রেহাই পাবে। টাকা পেয়ে আমার খুশি যেন আসমান ছুঁয়ে গেল।
২.
একটা নিরিবিলি জায়গায় ছোট করে হাবিবার জন্মদিনের আয়োজন করলাম মনের মতো করেই। ফোন করে হাবিবাকে আসতে বললাম। কিছুক্ষণ পর সে এসে গেল। গোলাপি নীল একটা সুন্দর ড্রেস পড়ে। মাথায় সাদা স্কার্ফ। কী অমায়িক লাগছে তাকে। দেখতে দেখতে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলাম। হাবিবা আমাকে চমকে দিয়ে বলল।
এই এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? আর এসব কী?
গাঢ় বিস্ময়টা ভেঙে গেল।
কই, কিছু না তো, এমনি।
এমনি তোমায় এসব করতে কে বলেছে?
আরে বাবা, আজ একটা বিশেষ দিন তাই।
কী বিশেষ দিন?
আজ তোমার জন্মদিন।
হাবিবা খুব সহজেই চমকে গেল। দিনটি সম্ভবত মনে ছিল না।
এই ছোট আয়োজনটুকুও কি আমি করতে পারি না আমার মায়াবতীর জন্য?
না, পারো না !
কেন?
আগে চাকরির গোছ করো তার পর।
আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে।
আগে বলো, তুমি টাকা পেলে কোথায়?
পরে সব বলছি তোমাকে। এখন এসো কেকটা কেটে নাও।
উজ্জ্বল মন নিয়ে মুখে হাসি রেখে কেটে ফেলল কেকটা। আমি বারণ করা সত্ত্বেও আমার মুখেই আগে তুলে দিলো। তা না হলে হাবিবা ভীষণ মন খারাপ করবে। আয়োজন পর্ব শেষে মাথায় রাখা প্রশ্নটা করে বসল।
তুমি টাকা পেলে কোথায়?
মায়ের কাছ থেকে নিয়ে ছিলাম।
কী বলে নিয়েছ, সত্য বলবা। মিথ্যা আমার পছন্দ না তুমি সেটা ভালো করেই জানো।
চাকরির অ্যাপ্লাইয়ের কথা বলে নিয়েছিলাম।
আমার কথা শোনার পর হাবিবা আমাকে মিথ্যুক আর চোর খেতাবি দিলো। আমি জানতাম হাবিবা এসব পছন্দ করে না।
৩.
নিজের অযোগ্যতা ঝেড়ে ফেলে বেশ কিছু দিনের মধ্যেই একটা ভালো চাকরির গোছ করে ফেললাম। স্যালরিটাও খুব ভালো।
আগের মতো আর দিন কাটাতে চাই না। নতুন দিনের মতোই নিজেকে নতুন করে তুলতে শুরু করলাম। সকালে বের হই। সন্ধ্যা হলে বাসায় ফিরি। এভাবেই দিন যায়। যাচ্ছে।
দিনে দিনে বাড়তে থাকে নাম না জানা অভাব। ভালো না থাকার অভাব। আলো ছড়ানো সময়ের অভাব। একটু আনন্দের অভাব।
হাবিবার দুষ্ট-মিষ্টি ছায়াগুলো কেমন এলোমেলো করে দিচ্ছে আমাকে। শুকনো পাতার বাঁশি বাজাচ্ছে মনের কোটরে। কী করব? কী করা উচিত? কোনোটাই মাথায় ধরা দিচ্ছে না আমার। কেন জানি, হাবিবার সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে। ফোন হাতে তুলে সেই পরিচিত নম্বরে ডায়েল করলাম। কত দিন ফোন দেয়া হয় না প্রিয় নম্বরে। বার কয়েক ফোন দিলাম। রিসিভ হলো না। ভাবলাম, এই একটা দেবো। তার পর আর না। ভাগ্যক্রমে ফোন রিসিভ হলো। কোনো কথা নেই। কোনো শব্দ নেই। শেষমেশ খুব রেগে যেতেই ইচ্ছে হলো। এত দিন পরে ফোন দিলাম অথচ কোনো কথা না বলে কেমন চুপ করে আছে। খুব অস্বস্তি জমল মনে।
কী হলো কথা বলছ না কেন?
কী বলব? আমার কিছুই বলার নেই। আগে কখনো বলিনি আর এখনো বলব না।

নীল শার্ট গল্প

Now Reading
নীল শার্ট গল্প

হাতখরচের জন্য বাবা আমাকে পাঁচ হাজার টাকা দিতেই আমি আনন্দে ভেসে গেলাম। যাক বাবা, জাহান প্লাজার সেই অভিজাত বস্ত্রবিতানে গতকাল দেখে আসা নীল শার্টটা কেনা যাবে।
গতকাল জাহান প্লাজার এক বস্ত্রবিতানে ঝুলানো নীল শার্টটা দেখে আমার চোখ সেখানে আটকে গেল। ভেবেছিলাম এবারে কাপড়-চোপড় কিছু কিনব না। কিন্তু নীল শার্টটি আমার সে সিদ্ধান্ত বদলে দিলো। কাপড়-চোপড় কিছু না কিনলেও অন্তত এই নীল শার্টটি আমার কেনা চাই। রাতে স্বপ্নেও দেখিÑ আমি পরম আনন্দে সেই নীল শার্ট গায়ে দিয়ে সারাবাড়ি ঘুরছি। পরিজনরা সকলে মুগ্ধ হয়ে আমাকে দেখে বলাবলি করছে আমাকে নাকি দেখতে রাজকুমারের মতন লাগছে। শুনে ভারি লজ্জা হলো আমার।
অবশেষে বাবার দেয়া মাস খরচের পাঁচ হাজার টাকা পেয়ে প্রিয় নীল শার্ট কিনব বলে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাসও দিলাম। বিকেলে মানিব্যাগে ভর্তি নতুন কচকচে টাকা নিয়ে জাহান প্লাজার দিতে ছুটলাম স্বপ্নের শার্ট কিনব বলে।
জাহান প্লাজার পাশেই ফুটপাথে লম্বা সারিবদ্ধ পোশাকের স্টলগুলোতে কেনাকাটার ধুম লেগেছে। সমাজের নিম্নবিত্তরা এসব কেনাকাটায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে। ফুটপাথের ছোট্ট একটা স্টলে সাদা কালারের একটি কম দামি শার্ট আমার নজর কাড়ল। ভাবলাম এটা রতনের জন্য কিনে নিয়ে যাব। রতন আমাদের বাসায় কাজ করে। বয়স ষোল কি সতের। বেশ খুশি হবে সে এটা দেখলে।
অনেকটা আগ্রহ নিয়ে ফুটপাথের সেই স্টলে গেলাম রতনের জন্য শার্টটি কিনতে।
এই যে ভাই, এই সাদা শার্টটির দাম কত?
ভাইজান, এটা একদাম দুই’শ টাকা।
বল কি? এটা তো ফুটপাথের জামা, এত দাম? পঞ্চাশ টাকা দেবে?
না ভাইয়া, এক’শ আশি টাকা কেনা। বিশ টাকা আমার লাভ।
চুপ করো ফকিন্নির পুত। ফুটপাথের এই শার্টটি পঞ্চাশ টাকার বেশি এক টাকাও দেবো না। দেবে?
নিরব চাহনিতে বিত্রেুতা আমার মুখের অপ্রত্যাশিত গালি শুনে ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে অনেকটা ঝাড়ি মেরে সোজা জাহান প্লাজার দিকে পা বাড়ালাম।

২.
অভিজাত বস্ত্রবিতানে মাঝবয়সী বিক্রেতা লোকটা প্রিয় নীল শার্ট আমার সাথে দামাদামি করছেন।
না ভাইয়া, এই শার্টের দাম সাড়ে তিন হাজার টাকা। বেশ ভালো কাপড়। পরলে মজা পাবেন।
কিছু মূল্য ছাড় দেয়া যায় না?
না আসলে আমাদের এখানে সব এক দাম। এক পয়সাও কম রাখি না আমরা। কিনলে কেনেন, না কিনলে আসতে পারেন।
না ইয়ে মানে..। বুঝতে পারলাম এখানে কোনো দামাদামি চলে না। সব এক দামে বিক্রি হয়। একবার ভাবলাম শার্টটি কিনব না। আবার না কিনেও থাকতে পারছি না। কি যে মুশকিল।
শেষ পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজার টাকায় শার্টটি কিনে জাহান প্লাজা থেকে বের হয়ে এলাম।
সেই ফুটপাথের পাশ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছি। ফকিন্নির পুত বলে যাকে গালি দিলাম, তার চোখে চোখ পড়ে গেল। সে কেমন উৎসুক চোখে আমার হাতে সাড়ে তিন হাজার টাকা দামের শার্টের ব্যাগের দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবলাম এই ফুটপাথের বিক্রেতা ২০০ টাকার শার্ট ৫০ টাকায় দেয়নি বলে তাকে আমরা ফকিন্নির পুত বলে গালি দিতে পারি, অথচ জাহান প্লাজা নামে বড় বড় শপিংমলে সাড়ে তিন হাজার টাকা দাম চাইলেও আমরা সে সমস্ত বিক্রেতাকে কিছুই বলি না, যারা গলাকাটা দামে আমাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বরং হাসি মুখে আমার পণ্য কিনে ঘরে ফিরি। শখ বলে কথা।

অপোর প্রহর

Now Reading
অপোর প্রহর

ইনবক্স চেক করতেই নুসরাতের মেসেজটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে সালমানের। ক’দিন ধরেই ইনবক্সে কথা হচ্ছে তাদের। বেশ আগ্রহ নিয়েই রিপ্লে দিতে কিক করে সালমান।
কেমন আছো? আজ টিউটোরিয়াল এক্সাম শেষ হলো,তাই তোমায় মেসেজ করলাম।
হু ভালো, আর তুমি?
এই তো আছি। তা কী করছিলে?
নাহ, তেমন কিছু না। পড়া শেষ করেই কেবল উঠলাম। আর নতুন কয়েকটা নাটক ডাউনলোড দিলাম, তাই ভাবছি এখন সেগুলো দেখব।
তার পর?
পরীার পড়া তৈরি করতে হবে।
জি আচ্ছা।
ওকে, বাই।
প্রতিদিন এভাবেই কোনো-না-কোনো একটা বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে চলে দুষ্টুমি, রাগ, অভিমান, হাসি-কান্না, শাসন সবই। সেই ছোটবেলার বন্ধু তারা দু’জন। একসাথে কাস এইট পর্যন্ত গ্রামের স্কুলেই পড়েছে। তার পর নুসরাতের পরিবার চলে আসে ঢাকায়। বড় ভাইয়ের সরকারি চাকরির সুবাদে সেখানে তারা সরকারি কোয়ার্টারেই থাকে। সেখানকার একটা স্কুলে ভর্তি হয়েছে নুসরাত, আর সালমান গ্রামের স্কুলেই। সামনে তাদের এইচএসসি পরীা। পড়ালেখায় দু’জনই বেশ ভালো। গ্রামের স্কুলে থাকতে তাদের রোল থাকত এক অথবা দুই। তবে সালমান বেশির ভাগই এক হতো। সেখান থেকেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্বটা গড়ে ওঠে। তবে ঢাকায় যাওয়ার পর থেকে বেশ কিছু দিন তাদের মধ্যকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। ফেসবুকের কল্যাণে প্রায় তিন বছর পর তাদের কথা বলা। সামনে দু’জনেরই ফাইনাল পরীা তাই তেমন একটা কথা বলা সম্ভব হয় না।
টেস্ট পরীার চার-পাঁচ দিন বাকি থাকতেই ফেসবুক আইডি ডিএক্টিভ করে দেয় সালমান। তবে সেটা নুসরাত জানে না। বারবার সালমানের নাম সার্চ করেও আসছে না। ভিন্ন চিন্তা মাথায় এসে ভর করতে থাকে নুসরাতের। তখনই সালমানের মেসেজÑ আইডি ডিঅ্যাক্টিভ করে নিচ্ছি, জাস্ট মেসেঞ্জার ইউজ করব মাঝে মধ্যে।
কেন, কী হয়েছে সালমান?
না রে তেমন কিছু না।
তবে?
জাস্ট স্টাডি!
একটা কথা বলতে চাই, বলব?
আরে বলো, অনুমতির কী আছে!
এই কয় দিন তোর সাথে কথা বলার পর থেকে কেন জানি বারবার মনে হচ্ছে…। যাকগে, একবার দেখা করতে পারবি?
কী সব বলছিস তুই! সামনে টেস্ট তার পর ফাইনাল পরীা, সব মিলিয়ে অনেক চাপ। কিভাবে সম্ভব!
তাহলে…! দেখা হবে না আমাদের আর?
হবে ত, এত তাড়াহুড়ো করছিস কেন?
তাহলে আর কবে?
প্লিজ নুসরাত, আগে পরীাটা ভালোভাবে শেষ হোক, তারপর না হয়।
সত্যি বলছিস তো!
হু, একদম সত্যি!
নুসরাতের বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই। মা সেই ছোটবেলায় মারা যান। আর বাবাও বছরখানেক আগে মারা যান। এখন শুধু বড় ভাইয়া আছেন। আর ভাইয়ার বউ-ছেলে-সন্তান। তাদের সাথেই থাকে নুসরাত। একসময় পরিবারে সবার আদুরে মেয়ে ছিল সে, কিন্তু এখন আর কেউ তেমন আদর করে না। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে ভাইয়া আদর করলেও তিনি তো আর সব সময় বাসায় থাকেন না, ভাইয়ার নানামুখী ব্যস্ততা। অপূর্ণতা অনুভব করে নুসরাত। এই পরিবারে তার কোনো মূল্য নেই! কী আর করা। ভাগ্যে যে এটাই ছিল তার। তা না হলে বাবা-মা দু’জনই এভাবে একে একে তাকে একা রেখে চলে যাবে! পড়ালেখায় ভালো থাকা নুসরাত এখন আর আগের মতো নেই বললেই চলে। বারবার মনে পড়ছে সেই পুরনো দিনের স্মৃতি সব। কতই না সুখের ছিল সেই দিনগুলো। নিজের
অজান্তেই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে নুসরাতের। মনে মনে ভাবছে যদি সালমানের হাত ধরে এই পরিবার থেকে দূরে যাওয়া যেত, তাহলে মনে হয়…! ফাইনাল পরীা একদম নিকটে তবুও পড়ায় মন বসছে না তার। ভাবছে কত দিনে শেষ হবে পরীা। তার ভাবনায় এখন শুধুই সালমান! সেই ভাবনা নিয়েই অপোর প্রহর গুনছে নুসরাত।

ঝরা ফুল

Now Reading
ঝরা ফুল

শাহবাগে বসে চা খাচ্ছি। রঞ্জুর সাথে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে কথা বলছি। হঠাৎ একটি ছোট্ট মেয়ে কতগুলো তাজা গোলাপ হাতে এসে বললÑ স্যার, একটা ফুল কিনবেন।
আমি অন্য দিকে তাকিয়ে বললামÑ না, ফুল লাগবে না।।
স্যার আমার মায়ের খুব অসুক হইছে। হেরে হাসপাতালে নিতে হইব। একটা ফুল লন না, স্যার।
বললাম তো লাগবে না।
মেয়েটি মাথা নিচু করে নিঃশব্দে চলে যেতে লাগল। রঞ্জু ডেকে বললÑ এই মেয়ে শোনো। কী নাম তোমার?
শেফালি।
একটা ফুল দাও। কত টাকা?
স্যার দশ টাকা।
ফুল নিয়ে মেয়েটিকে টাকা দিতেই সে চলে যেতে লাগল।
শোনো। এ ফুলটি তোমার জন্য।
শেফালির ঠোঁটের কোণে চন্দ্রোজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল। মনে হয় সে যেন কোনো রাজদরবার থেকে বিশেষ উপঢৌকন পেয়েছে।
রঞ্জু অনেকটা এ রকমই মানবতাবাদী। তার অন্তর সব সময়ই মানুষের জন্য কাঁদে। সে সব সময় সমাজে ইকুইটির কথা বলত। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলত। সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করার কথা বলত। রঞ্জু করুণা বস্তুটিকে ঘৃণা করত।
প্রিয়াকে ভালোবাসত রঞ্জু। আমাদের ডিপার্টমেন্টেই পড়ত। প্রিয়ার চিন্তাচেতনা অনেকটা রঞ্জুর সহজাত। প্রিয়া অনেক ভালো ছবি আঁকত। চারুকলায় তার নাকি চান্স হয়েছিল, কিন্তু ইচ্ছা করেই পড়েনি। দেখতে একেবারে অসুন্দর নয়। রঙ শ্যামবর্ণ, চোখ কাজলা দীঘি, চোখের নজর কথা বলে আর পলক সবাইকে থামিয়ে তার কথা শুনতে বাধ্য করে। ঠোঁটের কোণে হাসির ঝরনা বইছে অনন্তকাল ধরে। চুল ঘাড় পর্যন্ত লম্বা, একগুচ্ছ বুকের ওপর ফেলে রাখে। উচ্চতা ৫ বাই ৫। জিন্স আর টি-শার্টই বেশি পরে। গানের গলাও খুব ভালো। রবীন্দ্রসঙ্গীতের গলা।
তমার জন্মদিনের দাওয়াতে গিয়ে অবাক। সেই টি-শার্ট পরা প্রিয়া, শাড়িতে। যেন সুশ্রী এক পরীকে দু’টি ডানা কেটে দেয়া হয়েছে। তমাও রঞ্জুকে পছন্দ করত। রঞ্জু এ কথা জানত। কিন্তু তার মনের নজর তমাকে এড়িয়ে গেছে। প্রিয়া তমার জন্য নিজ হাতে আঁকা একটি স্ক্যাচ উপহার দিয়েছিল।
রঞ্জুর চাওয়া ছিল একটু বেশি। বলত দেশে সেবা খাতে বিনিয়োগ বন্ধ করতে হবে এবং শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রফেশনাল ডিগ্রিধারীদের ভালো স্যালারি দিয়ে দেশে ধরে রাখতে হবে। ব্রেনড্রেন ঠেকাতে হবে। কোয়ালিটি এডুকেশনের দিকে জোর দিতে হবে। মানুষকে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
ওর স্বপ্ন একটু বড়ই ছিল। সে বলত, থিংকিং বিগ। বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। আমার চিন্তা ছিল রঞ্জুর পরিপন্থী। পাঁচতলার ওপর থেকে পড়লে জীবনে ইতি ঘটবে। একতলা থেকে পড়লে হাত-পা ভাঙবে, কিন্তু মৃত্যুর আশঙ্কা কম। সে রকম বড় স্বপ্ন পূরণ না হলে কষ্টটাও একটু বেশি পেতে হবে।
রঞ্জু প্রায়ই শেফালির কাছ থেকে ফুল কিনত। ফুল কেনার বাহানায় শেফালিকে সাহায্য করত। পয়লা ফাল্গুনে সে অনেক ফুল কিনেছিল প্রিয়াকে দেয়ার জন্য। কিন্তু শেষমেশ সে ফুলগুলো দিতে পারেনি। প্রিয়া সেদিন আসবে বলে আসেনি। কেন আসেনি সে কারণটা রঞ্জুর হয়তো আজো জানা নেই। পরের দিন অবশ্য ওদের দেখা হয়েছিল। কিন্তু সেদিন রঞ্জু ফুলগুলো দেয়নি। রঞ্জু হয়তো জানত বাসি ফুলে পূজা হয় না।
দেখতে দেখতে পড়াশোনা শেষ হয়ে গেল। যে যার মতো চাকরি নিয়ে এদিক-ওদিক চলে গেলাম। আমি বিসিএসে টিকে গেলাম। পোস্টিং হলো কুমিল্লায়। তারপর কেটে গেল সাত বছর। কী এক অফিসিয়াল কাজে ঢাকার সচিবালয়ে কাজ শেষে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি সেই ফুল বিক্রেতা শেফালিকে। অনেক দিন পর দেখে চিনতে প্রথমে খানিকটা সময় নিলাম।
কিরে শেফালি, তুই এখানে?
স্যার কত দিনপর আপনারে দেখলাম।
ভালো আছিস?
হ। খুব ভালো আছি।
তুই রঞ্জুর কোনো খবর জানিস? মনে আছে রঞ্জুর কথা?
কী যে কন স্যার, মনে থাকব না ক্যান। হেয় তো প্রিয়া আফারে বিয়া করছে।
কী বলিস। ওরা কোথায় থাকে জানিস।
হ জানি। আফনে যাইবেন?
হ্যাঁ। চল।
রঞ্জু, তোর কোন খোঁজখবরই নেই। আমি সবার সাথে যোগাযোগ করেছি। কেউ তোর কোনো খোঁজ দিতে পারেনি। কেমন আছিস?
ভালো।
আমি জানতাম, তুই একদিন আসবি।
আমি একটা বিষয় কিছুতেই বুঝতে পারছি না। তোর মতো ব্যাচ টপার, যে কোনো দিন সেকেন্ড হয়নি, সে আজ এখানে কেন?
খারাপ কী? শিশুদের পড়াতে ভালো লাগে। আমি এই কচিকাঁচাগুলোকে পরিপক্ব করে তুলব; যাতে ঝড় এলে ভেঙে না পড়ে।
প্রিয়া কোথায়?
অফিসে। ও একটা এনজিওতে কাজ করে। দু’জনে মিলে এই পথশিশুদের নিয়ে ভালোই আছি।
আজ বাসস্ট্যান্ডে একটি তেরো-চৌদ্দ বছরের ফুলবিক্রেতা মেয়ে গাড়িচাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। তখন সেই পুরনো দিনের ভেলায় ভেসে বেড়ালাম স্মৃতির সাগরে। রঞ্জুর শেষ কথা আমার মনে খুব করে গেঁথে গেছে। ও ঠিকই বলেছিলÑ শাহবাগের ফুলের দোকানের সব ফুলই তো আর পূজার উদ্দেশ্যে মন্দিরে যায় না, কিছু ফুল শ্মশানঘাটেও যায়।

ব্রেকআপ

Now Reading
ব্রেকআপ

ফোনটা পিক করতেই ওপাশ থেকে একটি শব্দ ভেসে এলো ব্রেক আপ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লাইনটা কেটে গেল।
উফ সিট বলে চোখে মুখে রাজ্যের বিরক্তি প্রকাশ করে সোহাগ একটা সিগারেট বের করে যেই ধরাতে যাবে, তখনই ঘটল আরেক বিপত্তি, দিয়াশলাইটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রাগে একরকম গজরাতে গজরাতে হোস্টেলের ডান দিকের বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। চাঁদনী রাত আকাশে তারার মেলা। তারাগুলো মিটিমিটি করে জ্বলছে নাকি হাসছে ঠিক সেই হিসাবটা সোহাগ আজো মেলাতে পারেনি। তাই তো তারাদের সাথে মিল রেখে মুন্নীকে মুন বলে ডাকে। আজো সোহাগ মুন্নীর ভেতরের মুন্নীটাকে আবিষ্কার করতে পারেনি। মুন্নীর সব কিছুই সোহাগের ভালো লাগে; কিন্তু মুন্নীর হঠাৎ কোনো কারণবশত রেগে যাওয়াটাই বড্ড বিরক্তি লাগে। মুন্নীর কথামতো আজকের বিকেলটা তার সাথেই কাটিয়েছে বেশ হাসি খুশিই একটা মুড ছিল; কিন্তু হঠাৎ কী এমন হলো যে, মধ্যরাত্রে ব্রেক আপ বলে তিন বছরের সাজানো প্রেমটাকে শেষ করে দিবে। সোহাগ অনবরত ঘামছে কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না, যেই টিস্যু বের করতে যাবে, ঠিক সে সেসময় আবারো মুন্নীর ফোন। চটজলদি সোহাগ পিক করেই বলে উঠল, জান! তোমার কী হয়েছে? কোনো রকম উত্তর না দিয়ে মুন্নী বলে উঠল, কাল তুমি সকাল ৯টায় টিএসসিতে চলে আসো, শেষ বোঝাপড়া আছে। নেশাটা বড্ড বেড়েই চলছে, কাল কলেজের ফরম ফিলাপের শেষ দিন, টাকাটা এখনো ব্যবস্থা হয়নি, ফরম ফিলাপ না হলে এক ইয়ার লস হয়ে যাবে। টিউশনির বেতনটা যথাসময়ে না পাওয়ায় একটি বিশ্রী অবস্থায় পড়েছে সোহাগ। কারো কাছে হাত পাতার অভ্যাসটা সোহাগের ছোট থেকেই নেই। দুই বেলা না খেয়ে থাকলেও কারো কাছে ধার করবে না। সোহাগের এই ব্যাপারটা মুন্নীর ভীষণ পছন্দ। না, কোনোভাবেই ঘুম আসছে না, সব টেনশন সোহাগকে ঘিরে ধরছে। তবু ঘুমানোর জোর চেষ্টা চালাল সোহাগ।
ক্রিংক্রিং শব্দে সোহাগের ঘুম ভাঙলে ফোনটা পিক করতেই ওপাশ থেকে মুন্নীর তাড়া, এখন কয়টা বাজে? আমি টিএসসিতে দাঁড়িয়ে আছি বলেই লাইনটা কেটে দিলো। দ্রুতগতিতে সোহাগ রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ল।
বেশ রাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুন্নী, সোহাগকে দেখতেই রাগের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে বলতে লাগল দায়িত্বজ্ঞানহীন কোনো ছেলের সাথে আমার রিলেশন থাকতে পারে না। এই শেষ দেখা তুমি আর কোনো দিন আমার সাথে যোগাযোগ করবে না। তোমার সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই,আজ থেকে ব্রেক আপ। যেতে যেতে শুধু একবার সোহাগের দিকে ফিরে তাকাল। ভ্যানিটিব্যাগটি ফেলে যেতে দেখে সোহাগ চিল্লাতে লাগল তোমার ভ্যানিটিব্যাগটা তো নিয়ে যাও। মুন্নী শুনেও না শোনার ভান করে চলে গেল। সোহাগ ভ্যানিটিব্যাগটি হাতে নিয়ে খুলতে গিয়ে দেখল ভেতরে চার হাজার টাকা। টাকাটা দেখে হঠাৎ সোহাগের ফরম ফিলাপের কথা মনে পড়ে গেল। সেই টাকা দিয়ে ফরম ফিলাপ করে, মলিন মুখে বাসায় ফিরল। ভ্যানিটিব্যাগে মুন্নীর ফোন, ভ্যানিটিব্যাগটি দিয়ে আসা দরকার বলে যেই সোহাগ উঠতে যাবে, ঠিক সেই সময় মুন্নীর ফোন। বেশ নরম গলায় বলল, তুমি কোথায়? আমি বাসায়। আর হ্যাঁ, শোন তোমার ভ্যানিটিব্যাগের টাকাটা খরচ করে ফেলেছি। কয়েক দিন পড়েই দিয়ে দিব প্রমিজ, রাগ করো না লক্ষ্মীটি। ওপাশ থেকে একটি কথাই ভেসে এলো তোমার সাথে কি আমি রাগ করতে পারি। এপাশ থেকে সোহাগকে বেশ খুশি খুশি লাগছে, মুখে বেশ একটা চওড়া হাসির রেখা দেখা গেল।

সাইবার হামলার ঝুঁকিতে স্মার্টফোন

Now Reading
সাইবার হামলার ঝুঁকিতে স্মার্টফোন

ত্রুটিপূর্ণ অ্যাপের কারণে বিশ্বের ১৮ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছেন। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যাপথোরিটি জানিয়েছে, ৬৮৫টি অ্যাপের কোডিংয়ে সাধারণ একটি ত্রুটি পাওয়া গেছে। এসব অ্যাপে ডেভেলপাররা ভুলভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কোড লিপিবদ্ধ করেছেন। যেগুলো পর্যালোচনা করে হ্যাকাররা সহজে এসব অ্যাপ ব্যবহারকারীর তথ্যে প্রবেশাধিকার পেতে পারে।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যাপথোরিটির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিভিন্ন অ্যাপের কোডিংয়ে সাধারণ ত্রুটি পাওয়ায় এসব ত্রুটিপূর্ণ অ্যাপের মাধ্যমে স্মার্টফোন ব্যবহারকারী সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। অ্যাপথোরিটির নিরাপত্তা গবেষণা বিভাগের পরিচালক সেদ হার্ডি এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, সানফ্রান্সিসকোভিত্তিক ক্লাউড কমিউনিকেশন্স প্লাটফর্ম টুইলিও ইনকরপোরেশনের সরবরাহকৃত টেক্স মেসেজিং, কলিং এবং অন্যান্য সেবার বেশ কিছু অ্যাপে ডেভেলপাররা ভুলভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কোড লিপিবদ্ধ করেছেন। যেগুলো পর্যালোচনা করে হ্যাকাররা সহজে এসব অ্যাপ ব্যবহারকারীর তথ্যে প্রবেশাধিকার পেতে পারে। এমনকি এ অ্যাপগুলোর মাধ্যমে যোগাযোগ বা অন্যকে পাঠানো বিভিন্ন তথ্যও হাতিয়ে নেয়া সম্ভব। তৃতীয় পক্ষের সেবার ক্ষেত্রে একটি সমস্যা হলো, বহু অ্যাপ ডেভেলপার প্রায়ই একই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন। এটি অ্যাপগুলোর জন্য একটি নিরাপত্তা দুর্বলতা। অ্যাপথোরিটি ১১০০টি অ্যাপের ওপর জরিপ চালিয়ে ৬৮৫টিতে ত্রুটি খুঁজে পেয়েছে। এর মধ্যে ৮৫টির সাথে টুইলিও অ্যাকাউন্টের সম্পৃক্ততা আছে। কোডিংয়ে ত্রুটি আছে এমন অ্যাপের তালিকায় রয়েছে এটিঅ্যান্ডটি নেভিগেটর। এই অ্যাপটি অ্যান্ড্রয়েড ফোনে আগে থেকেই ইনস্টল করা থাকে। এ ছাড়া টেলেনাভ ইনকরপোরেশনের এক ডজনের বেশি জিপিএস নেভিগেশন অ্যাপ রয়েছে। এ অ্যাপগুলো অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ১৮ কোটি বার এবং অ্যাপলের আইওএসভিত্তিক ডিভাইসে অসংখ্যবার ইনস্টল করা হয়েছে। হার্ডি জানিয়েছেন, হ্যাকাররা টুইলিওর তথ্য পেতে চায়। কারণ প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করে টেক্সট মেসেজ প্রেরণ, ফোন কল করা এবং অন্যান্য সেবা দিয়ে থাকে।
অ্যাপথোরিটি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা অ্যাপগুলোর নির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করেনি। টুইলিওর গ্রাহকের তালিকায় রয়েছে অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবাদাতা উবার টেকনোলজিস এবং অনলাইন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক নেটফ্লিক্স ইনকরপোরেশন। এ ধরনের বড় কোম্পানিগুলো নিরাপত্তা পর্যালোচনা করে থাকে, যা সাধারণ কোডিং ত্রুটি শনাক্ত করতে পারে। অ্যাপথোরিটি যে কোডিং ত্রুটির কথা বলেছে, তা এসব কোম্পানির পক্ষে শনাক্ত করা সম্ভব। যদিও উবার কিংবা নেটফ্লিক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অ্যাপথোরিটির খুঁজে পাওয়া ত্রুটি টুইলিওর মতো তৃতীয় পক্ষের সেবা ব্যবহারের হুমকি সামনে এনেছে। টুইলিও বিশ্বব্যাপী ৪০ হাজারের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে তারা যোগাযোগ সেবা দিচ্ছে।

হার্ডি আরো জানিয়েছেন, এটি শুধু টুইলিওর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তৃতীয় পক্ষের সেবাগুলোতে এটি একটি সাধারণ সমস্যা। তৃতীয় পক্ষের সেবাদাতারা কোনো একটি সেবার ক্ষেত্রে ভুল করলে, তা তাদের অন্য সেবাগুলোতেও দেখা যায়। অ্যাপথোরিটি এরই মধ্যে ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজন ডটকমকে সতর্ক করেছে। হার্ডি বলেন, অ্যাপের ত্রুটি কাজে লাগিয়ে অ্যামাজনের স্টোরে থাকা তথ্য হাতিয়ে নেয়া হতে পারে। এটিঅ্যান্ডটি নেভিগেটর ম্যাপিং ও জিপিএস অ্যাপের অজ্ঞাত সংস্করণে টুইলিওর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। অ্যাপথোরিটির তথ্যমতে, এটিঅ্যান্ডটি নেভিগেটর অ্যাপের নতুন সংস্করণগুলোকে নিরাপদ মনে হয়েছে। তবে ডেভেলপাররা যদি একই টুইলিও অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তথ্য পাঠায় তাহলে তা ঝুঁকিপূর্ণ।

টুইলিওর ওয়েবসাইটে ডেভেলপারদের এ নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। অ্যাপগুলোর গ্রাহকদের তথ্যে প্রবেশাধিকার পেতে হ্যাকাররা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কোড ব্যবহার করেছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কষ্ট

Now Reading
কষ্ট

শ্রাবণ মাসের এক রাত। পরিবারের সবাইকে আমি চিৎকার করে ডাকছি। কেউ আমার কোনো কথাই শুনতে পায় না। আমার কথা বুঝতে পারে না। শুধু আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আমি শত চেষ্টা করেও যখন ওদেরকে মনের কথাগুলো বোঝাতে পারি না, তখন যেন আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। তখন আমার একমাত্র ভাষা হয়ে যায় চোখের জল। আমি অঝোরে কাঁদতে থাকি। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকি।
প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই যেন পরিবারে ঈদের আনন্দ নেমে আসে। কাল শুক্রবার, হুররে কি মজা হবে। সবার ছুটি কী মজা বলে সাত বছরের ছোট্ট শিশুটি আনন্দে নাচানাচি করছে। বাবা, কাল সবাই মিলে বেড়াতে যাব। অনেক মজা হবে। সারাদিন পার্কে বেড়াব, তারপর সন্ধ্যায় সবাই মিলে চাইনিজ খাব। কি মজা। বাবা তুমি প্রমিজ করো! আচ্ছা ঠিক আছে যাব, হলো! তারপর আবার নাচানাচি।
তখন রাত ৩টা কি সাড়ে ৩টা। বাথরুমে যাওয়ার জন্য বেড থেকে নামতেই মাথায় আচমকা একটা চক্কর মেরে ওঠে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি ধপাস করে পড়ে যাই মেঝেতে। বস্তা পরার মতো একটা শব্দ হয়। আমার স্ত্রী হুড়মুড় করে উঠে বসে। রাফির বাবা বলে, আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমি রাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। চুলগুলো এলোমেলো। চোখে মুখে রাজ্যের আতঙ্ক। ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল রাবুকে। আমি শরীরের সব শক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি; কিন্তু পারি না। বাম পাশটায় কেন যেন কোনো শক্তি পাচ্ছি না। আমি ডান হাত দিয়ে রাবুর হাতটা শক্ত করে ধরে আছি। রাবু কাঁদতে কাঁদতে বলে, রাফির বাবা, কি হলো তোমার? ওঠো! আমি পারি না। রাবুর মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। যেন আজ প্রথম দেখছি রাবুকে। রাবুর কান্নার শব্দে শিশু দু’টি উঠে পড়ে। ওরা এসে ওদের মায়ের কান্না দেখে ওরাও কান্না শুরু করে দেয়। আমি ওদের বলি কেঁদো না। ওরা কেউই আমার ভাষা বুঝতে পারে না। আমি হাত দিয়ে ওদের ইশারা করে থামতে বলি। ওরা শব্দ থামিয়ে ফোঁপাতে থাকে।
পরদিন সকালেই আমাদের বাসায় অনেক মেহমান আসে। আমাকে দেখতে আসে। অনেক ফলমূল নিয়ে এসেছে। রোগী দেখতে গেলে ফলমূল নিতে হয়। সবাই আমার মুখের দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আহারে কত জোয়ান মানুষ! মুহূর্তে কি হয়ে গেল! আমি ওদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি, পারি না। কথা বোঝাতে না পারলেই কান্না।
এখন বিছানাই আমার জগৎ। এভাবে দিন যায়, মাস যায়। আস্তে আস্তে সব কিছু স্বাভাবিক হতে থাকে। পৃথিবী কারো জন্য থেমে থাকে না। শিশুরা স্কুলে যায়। রাবু কলেজে ক্লাস নিতে যায়। রাবু যাওয়ার আগে আমার অনেক সেবাযতœ করে। আমি একা একা বিছানায় পড়ে থাকি। একটু পানি পিপাসা লাগলে আমি উঠে খেতে পারি না। রাবু যাওয়ার সময় এক লিটারের একটা বোতল ভরে আমার ডান পাশে রেখে যায়। সবাই যখন বাসা থেকে চলে যায়, আমি তখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখি। চার তলার খোলা জানালা দিয়ে আকাশ দেখতে ভালো লাগে। দূরের আকাশে একদল পাখি উড়ে বেড়ায়। উড়তে উড়তে পাখিরা দূর আকাশে মিলিয়ে যায়। পাখিদের আকাশে উড়তে দেখে আমারও খুব পাখি হতে ইচ্ছে করে। দূর আকাশে উড়তে ইচ্ছে করে। রাতের বেলায় দূর আকাশে তারা দেখি। কত রকমের তারা!
চিত হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে আমার বাম পাশটায় ঘা হয়ে যাচ্ছে। রাবু একটা মিল্লাত পাউডার কিনেছে। কলেজে যাওয়ার সময় ঘা তে লাগিয়া দিয়ে যায়। গন্ধ দূর হয়। আরামও পাওয়া যায়। এখন আর আগের মতো আত্মীয়স্বজন আমাকে দেখতে আসে না। ক’দিনই বা আসবে। সবাই তো ব্যস্ত। গত কয়েক দিন যাবৎ ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। তার ওপর আবার মশার উপদ্রব। ভ্যাপসা গরমে মশারি খাটানোর জো নেই। রাবু বিছানার পাশে কয়েল ধরিয়ে দেয়। মাঝরাতে কখন যে কয়েল এসে বিছানার সাথে লাগে বুঝতেই পারি না। আমি জেগেই ছিলাম। ধোঁয়া দেখেই আমি চিৎকার করে ডাকতে থাকি। কয়েলের আগুন তোষক থেকে আমার শরীরে লাগতে থাকে। আমার চিৎকার ওরা কেউ শুনতে পায় না। রাবু বেচারা রাত জেগে খাতা দেখে ঘুমিয়েছে। কিছুই টের পায় না সে। আগুন আস্তে আস্তে আমাকে পোড়াতে থাকে। আমি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ডাকতে থাকি। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে আমি পুড়তে থাকি। সে যে কি কষ্ট! আস্ত মানুষ পোড়ার ভয়াবহ দুর্গন্ধে রাবু পাশের ঘর থেকে দৌড়ে আসে। আমার সন্তান দু’টি উঠে আসে রাবুর সাথে। রাবু পাগলের মতো দৌড়ে বাথরুম থেকে পানি এনে আমার শরীরে ঢালতে থাকে। আমি কথা বলার চেষ্টা করি; কিন্তু পারি না। আমি নীরব। রাবু আমার ডান হাত ধরে টান দেয়, রাফির বাবা কথা বলো। আমার হাতটা ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায়। আমার স্ত্রী আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার দেয়। মায়ের সাথে শিশু দু’টিও কেঁদে ওঠে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ঠিক আমার মতোই একজন মানুষ নিথর হয়ে পড়ে আছে বিছানায়।
গভীর রাতে রাবু আর সন্তানদের কান্নার শব্দে প্রতিবেশীরা ভিড় জমায় বাসায়। আহারে! কত কষ্ট পেয়ে যে মানুষটা মরে গেছে! খুব ভালো মানুষ ছিল লোকটা। সবসময় মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটত।
ভোর হতে না হতেই আত্মীয়স্বজনেরা বাসায় চলে আসে। সবাই বলাবলি করছে, লাশ বেশিক্ষণ ঘরে রাখতে নেই। যত তাড়াতাড়ি দাফন করা যায়, ততই ভালো। তা না হলে মুর্দার রূহ কষ্ট পায়। রাবুর ভাই-ভাবীরা সংবাদ পেয়ে আগেই মাইক্রোবাস ঠিক করে নিয়ে এসেছে। আত্মীয়স্বজনদের কাছে পেয়ে রাবু আর সন্তান দু’টি আরো তুমুল বেগে কাঁদতে থাকে। আমি কত করে বলি রাবু, কাঁদছ কেন, কী হয়েছে আমার? রাবু আমার কথা বুঝতে পারে না। ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দারা শেষ দেখা দেখতে আসে। আহারে, লোকটা কত ভালো ছিল। দেখা হলে কী সুন্দর করে সালাম দিত। হাসি ছাড়া কথা বলত না। সন্তান দু’টি কেমন অল্প বয়সে এতিম হয়ে গেল।
সবাই মিলে ধরাধরি করে মানুষটাকে গাড়িতে তোলে। তার কোনো সাড়াশব্দ নেই। বিছানার চাঁদর দিয়ে মানুষটাকে ঢেকে দেয়া হয়েছে। রাবুর দুই ভাই মুখ ভার করে গাড়িতে বসে আছে। আমি সবকিছু খেয়াল করছি। রাবু আমার কোনো কথাই শুনছে না। গাড়ি চলছে গ্রামের উদ্দেশে। আমার স্ত্রী আর সন্তানেরা এখন থেমে থেমে কাঁদছে। গ্রামের আত্মীয়স্বজনদের আগেই খবর দেয়া হয়েছে। তারা নাকি কবর খুঁড়ে রেখেছে। বাড়ির উঠোনে নামানোর পর ভাইবোন সবাই গড়াগড়ি করে কাঁদছে। কিন্তু আশ্চর্য, মাকে দেখলাম একটুও কাঁদছে না। বলছে, তোরা সবাই থাম, আমার রাজপুত্রকে একটু সাজিয়ে দেই। আমার মতোই দেখতে মানুষটাকে মা চোখে সুরমা লাগিয়ে দেয়, সাদা কাপড়ে জড়িয়ে দেয়। আমি বললাম মা, আমার কী হয়েছে? আবার আশ্চর্য হলাম, শুধু মা আমার কথা বুঝতে পারল। বলল, বাজান আজ তুমি তোমার আসল বাড়িতে যাচ্ছো। তুমি ভেবো না বাজান, আমি তাড়াতাড়িই তোমার সাথে দেখা করব।

ঘৃণা

Now Reading
ঘৃণা

ঘণ্টাখানেক দেরিতে হলেও বনানীর জ্যাম উতরে শোভার জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে পৌঁছতে পেরে মনে মনে খুবই উৎফুল্ল কবিতা। শোভা কবিতার কলেজ বান্ধবী, কাসমেট।
জন্মদিনের জমকালো অনুষ্ঠান। পুরো ছয়তলা বাড়িজুড়ে রঙিন বাতি জ্বলছে। সাদা আর নীল আলোর মিশেল কবিতার কাছে বেশ ভালো লাগাতে সে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। শোভার মা এসে কবিতাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন। শোভার সাথে দেখা হলো। গল্পে মেতে উঠল দু’জন। ফাঁকে আগত অতিথিদের ‘হাই’ ‘হ্যালো’ বলতেও হচ্ছে মাঝে মধ্যে।
অনুষ্ঠানের শেষের দিকে এলো শোভার মায়ের বান্ধবী মিশু। বেশ সুন্দরী মহিলা। এ বয়সে ফিগারটাও ধরে রেখেছে বেশ। কবিতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে বান্ধবীকে নিয়ে এলেন শোভার মা।
মিশু, এ হচ্ছে শোভার বান্ধবী কবিতা। আমাদের সবার প্রিয় আজাদ সাহেবের মেয়ে। আর কবিতা, ইনি হচ্ছেন আমার বান্ধবী মিশু, এক্সপার্ট বিউটিশিয়ান।
আজাদ সাহেবের নাম শুনতেই চমকে উঠল মিশু, এই কবিতাই তাহলে আজাদের মেয়ে! বাবার মতোই চেহারা তার। চিকন নাক, লম্বাটে অবয়ব, চোখে মায়ার চাহনি।
কবিতারও চিনতে দেরি হয়নি মিশু নামের হৃদয়হীন এই মহিলাকে। মুহূর্তে ঘৃণায় মুখ কালো হয়ে যায় তার। কোনোভাবেই অনুষ্ঠানটি শেষ হলেই হয়, এক মিনিটের জন্যও দেরি করবে না কবিতা। এই ঘৃণিত মহিলার চেহারাও দেখতে রাজি নয় সে। এদিকে অনুষ্ঠান শেষ হতেই কবিতাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করল মিশু। কবিতা চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল শোভার কামরায়। এমনিতে মন মেজাজ ভালো নেই, তার ভেতর এই মহিলার আগমন তার কাছে একেবারেই অপছন্দের।
মুখে মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে কবিতার পাশে বসল মিশু।
কবিতা, তুমি মাশাআল্লাহ অনেক সুন্দরী হয়েছো। তোমার বাবা কেমন আছেন?
মিশুর কথাগুলো কবিতার কাছে অস্বস্তিকর মনে হলো। এমনিতে মহিলাটিকে অসহ্য লাগছে, তার মধ্যে বাবার কথা বলাতে একেবারেই গোস্যায় নাকের অগ্রভাগ লাল হয়ে গেল কবিতার।
চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত কবিতা খানিকটা রাগের ভাষায়ই কথা বলল, আমি যে বেশ সুন্দরী সে কথা আমি জানি। এটা আপনার কাছ থেকে শুনতে আমার মোটেও ভালো লাগেনি। আমার রূপের প্রশংসা করেছেন বলে আমি আপনার রূপের প্রশংসা করব যদি ভেবে থাকেন তাহলে ভুল করছেন। দেখুন আপনার নাকটা কেমন বোঁচা, গলায় কত্তবড় একটা কালো তিল আর ঠোঁটগুলো মাশাআল্লাহ আফ্রিকানদের মতো মোটা মোটা। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো আপনার ভেতরটা আরো কুৎসিত, কদাকার।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গোস্যায় কেঁপে উঠল কবিতা।
মিশু খানিকটা বিব্রতবোধ করলেও যথাসম্ভব স্বাভাবিক হয়ে হাসার চেষ্টা করল।
কবিতা শোনো…। কথা শেষ করতে পারল না মিশু, তার আগেই আবার বলতে শুরু করল কবিতা।
আপনি শোনেন, আমার ঘৃণার সবটুকু আজ আপনাকে দিয়ে যেতে চাই। যা এত বছর ধরে জমিয়ে রেখেছিলাম আপনার জন্য। আপনি কোনো সাহসে আমার বাবার কথা জিজ্ঞেস করলেন? আপনি যে আজাদ আহমেদের পায়ের যোগ্যও নন, এটা তো আপনার না জানার কথা নয়। যে আজাদ আহমেদ আপনাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিল, যার ভালোবাসায় কোনো ত্রুটি ছিল না। আপনাকে নিয়ে যার হাজারো স্বপ্ন ছিল সে মানুষটিকে আপনি এভাবে একা রেখে চলে যেতে পারলেন? আপনি যে একজন দুশ্চরিত্র মহিলা সেটা আপনি নিজেই প্রমাণ করলেন, প্রতারণাই যদি করবেন তবে কেন বিয়ের কথাবার্তা আর দিন-তারিখ ঠিক হওয়ার পর আপনি চলে গেলেন অন্যের হাত ধরে? আজাদ আহমেদের টাকার গরম ছিল না বলে? ছি:, আপনার চেহারার দিকে তাকাতেও আমার ঘৃণা হচ্ছে। নিজের চেহারা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলো কবিতা।
আপনার প্রতি এতটা ঘৃণা আমার হতো না, যদি বাবা আপনাকে ভুলে যেত। কিন্তু আমার বাবা তো আপনাকে আজো ভোলেনি, কারণ মানুষ একবারই ভালোবাসে। প্রথমবার ভালোবাসে, তারপরের বারগুলো সত্যিকার অর্থে ভালোবাসা নয়, সমঝোতা অথবা ভালোবাসার অভিনয়ও বলা যেতে পারে। আমার বাবার মতো ভালো মানুষ আমি আর দেখিনি। কারো প্রতি কোনো দিন অন্যায় করেননি। অথচ আপনাকে ভালো বেসেছিল বলে বাবা বাধ্য হয়ে আমার মায়ের সাথে অভিনয় করেই যাচ্ছে। আপনার জন্য আমার আফসোস হয়, আমার বাবার বুকভরা ভালোবাসার পাহাড় জমা আছে আপনার জন্য অথচ সে ভালোবাসা থেকে আপনি বঞ্চিত। কতদিন একাকী গভীর রাতে অশ্রুভেজা বাবাকে বেলকনিতে বসে থাকতে দেখেছি। মাঝে মধ্যে বাবা হারিয়ে যায় তার ফেলে আসা স্মৃতিতে। হয়তো কল্পনার সেই মানুষটি তখন আপনিই। আপনিই ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাবার হাত ধরে অথচ আমার মা তা দেখতে পাচ্ছেন না। কিন্তু বাবা আমার কাছে কিছুই লুকোয় না, আমি বাবার সব কথাই জানি। আর জানি বলেই আমি আপনাকে ঘৃণা করি, প্রচণ্ড ঘৃণা, হৃদয় উড়াজ করা ঘৃণা।
শোভার কামরা থেকে বের হয়ে যায় কবিতা। তার চলে যাওয়ার পর মিশু লক্ষ করল তার চোখের পাতা ভিজে গেছে। আজাদের প্রতি সত্যিই বড় অবিচার করেছিল সে। আজাদের চেয়ে বেশি টাকার মালিক বলে সাজ্জাদকে বিয়ে করেছিল মিশু। কিন্তু সাজ্জাদের ভেতরে একজন আজাদকে খুঁজে পায়নি মিশু, ভুল হয়ে গেছে তার। ততক্ষণে বড্ড দেরিও হয়ে গিয়েছিল। আজাদকে তার মা-বাবা বিয়ে দিয়ে দেন সহসাই।
ভাবতে ভাবতে উদাস হয়ে যায় মিশু। তার গাল বেয়ে ঝরে পড়া অশ্রুফোঁটার সাথে কষ্টগুলো ঝরতে থাকে।

যে মেয়েটা রোজ রাতে বদলায় হাতে হাতে

Now Reading
যে মেয়েটা রোজ রাতে বদলায় হাতে হাতে

দিনের আলো নিভে গেল; রাত নেমেছে। আস্তে আস্তে অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে চার পাশ। ছুটে চলা গাড়ির হর্ন আর রেলের ঝিকঝিক ছন্দে গন্তব্যে যাচ্ছে ক্লান্ত মানুষেরা। শুধু ক্লান্তি নেই এই জনপদের বাসিন্দাদের। এখানে রাত নামে না, নামে হাজারো স্বপ্নের কফিন। হাজারো দীর্ঘশ্বাসের দেহপসরার বিকিকিনি। ব্যস্ত তারা পসরা আকর্ষণীয় সস্তা মেকাপের প্রলেপে। প্রেমহীন এই জনপদের সবাই ভিন্ন জগতের বাসিন্দা।

এই জগতের বাসিন্দাদের কোনো ভেদাভেদ নেই। তারা টাকার বিনিময়ে নতুন করে বাসর সাজায়। সোহাগ বিক্রি করে। সমাজ যাকে ডাকে পতিতা বলে। রোজ রাতে হাতে হাতে বদল হওয়া এমনি একজন স্বপ্না (ছদ্মনাম)। বয়স আর কত হবে? ২০-২২। অভাবের তাড়নায় ১৫ বছর বয়সে এক গার্মেন্টে কাজ শুরু করেন। সেই বেতনের টাকাতে অনেক কষ্টে চলত তার আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জীবন। একমাত্র ভাই ভিটেবাড়ি বিক্রি করে ভাগ্য উন্নয়নের জন্য বিদেশ পাড়ি জমায়। কিন্তু তার আর কোনো খোঁজ পায়নি তার পরিবার। বাধ্য হয়েই সংসারের হাল ধরতে হলো মেয়েটিকে। এলাকার এক আপা গার্মেন্টে চাকরি করত। তার সাথেই গার্মেন্টে চাকরিতে যোগ দেয় স্বপ্না। বছরখানেক পরে ভালো বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে এক দালাল তাকে ধরে এনে বিক্রি করে দেয় দৌলতদিয়ার এই পতিতালয়ে। এর পর থেকেই সে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা। এভাবেই কেটে যাচ্ছে তার জীবন নামের রেলগাড়িটা।

নারী পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে টাঙ্গাইলের এক পতিতালয়ে বিক্রি হওয়া একজন কিশোরী রানী (ছদ্মনাম)। জন্মের পর বাবা-মা আদর করে একটি নাম রাখলেও সেটি হারিয়ে গিয়েছিল নারী পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে। পতিতালয়ে ওকে দেয়া হয়েছিল এই রানী নামটিই। প্রায় ছয় মাস এই পতিতালয়ের চার দেয়ালের মাঝে প্রতিদিন ভোগের পণ্য হয়ে বন্দী জীবন কাটাচ্ছিলেন তিনি। অবশেষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার অদম্য বাসনায় মুক্তি মিলেছে তার। সম্প্রতি স্থানীয় সাংবাদিকের হস্তক্ষেপে অভিভাবকদের হাত ধরে তিনি ফিরে গেছেন তার আপন ঠিকানায়। তার পিতা নিশ্চিত করেছেন তাদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা। তবে তার জীবনে আবার স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে কি না এটিই সময়ের প্রশ্ন হয়ে থাকবে।
রানীদের মতো আরো শত শত মেয়ে এখনো প্রতিদিন বোবাকান্না করে যাচ্ছেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে। পতিতালয়ের চার দেয়ালে বন্দী ওদের কান্না শোনার মতো যেন কেউ নেই। মুক্তির পর রানীর জবানবন্দীতে জানা গেছে এসব তথ্য।
রানীর ভাষ্য মতে, মোবাইল ফোনে পরিচয়, প্রেম; অতঃপর বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে সাভারের আশুলিয়া এলাকায় সংসার পাতেন রানী। ছেলেটির বাড়ি টাঙ্গাইল সদরে, শুধু এটুকুই জানতেন রানী। বিয়ের সপ্তাহখানেক পরে তার স্বামী বলে তাদের বিয়ে তার পরিবার মেনে নিয়েছে। তাই আজ রাতেই তারা টাঙ্গাইল যাবে। খবরটি শুনে আনন্দে রানীর চোখে জল এসে যায়। কারণ প্রতিটি নারীই চান তার স্বামী, শ্বশুরবাড়ি আর সংসার নিয়ে সুখে থাকতে। তার স্বামী আর তার এক বন্ধু মিলে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে তারা রওনা হয়, রাত গভীর হয়ে আসে, গাড়ির ঝাঁকুনিতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে আসে রানী। টাঙ্গাইল ঠিকই গেলেন রানী কিন্তু শ্বশুরবাড়ি নয়; পতিতালয়ে। পতিতালয়ের সর্দারনীর কাছে বিক্রি করা হয় এক লাখ টাকায়। এরপর চলে ভয়ভীতি দেখিয়ে পোষ মানানোর প্রক্রিয়া।

রানীর মতো এমন অনেক কিশোরীর বুকভরা ভালোবাসার সলিল সমাধি হয় প্রতি রাতে। নারীপাচারকারী, দালাল ও পতিতা সর্দারনীদের ভয়ভীতির মুখে তারা কাউকে সহজে জানাতেও সাহস পান না তাদের বন্দিদশার কথা। রোজ রাতে হাতে হাতে বদলায়।

এখানে নারীরা দুর্বল, আবার কেউ কেউ ক্ষমতাধর। সবচেয়ে খারাপ সময় কাটে যখন প্রথম তারা এখানে প্রবেশ করেন। অনেকেই আসে নারী পাচারচক্রের মাধ্যমে, যাদের বিক্রি করে দেয়া হয় পতিতালয়ের কোনো এক সর্দারনির কাছে। নতুন আসা বেশির ভাগেরই বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছর। পাচারচক্র সর্দারনির কাছ থেকে নেয়া টাকাটা সর্দারনিকে শোধ করে দেয়ার আগে তাদের কাজের কোনো স্বাধীনতা থাকে না। আর বাইরে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই তাদের। সুযোগ নেই খদ্দের বাছাইয়ের।

আরেক কিশোরী শেফালী (ছদ্মনাম)। তার মতো অনেক মেয়ের স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর বয়স হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতির শিকার হয়ে, ফাঁদে পা ফেলে তারা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে অন্ধকার গলির পথ। পরিণত বয়স না হলেও তাদেরকে ‘মাসিরা’ রাতারাতি বড় করে তুলছে গরু মোটাতাজাকরণে ব্যবহৃত ওষুধ খাইয়ে। এর ফলে খুব দ্রুত শেফালীদের শরীরের বৃদ্ধি ঘটে। দিন-রাতে তাদেরকে প্রায় ১০ জন খদ্দেরকে সামাল দিতে হয়। কখনো তারও বেশি। প্রতিজন খদ্দের থেকে তারা আয় করে প্রায় ১০০ থেকে ৫০০ টাকা। এ পেশা থেকে তাদের বেরিয়ে আসায় মানা নেই। কিন্তু সমাজ ও পরিবার তাদেরকে মেনে নিতে চায় না। ফলে অন্ধকারেই জীবন কেটে যায় তাদের।

কোনো মেয়েই খারাপ হয়ে জন্মায় না। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক সমস্যা, পক্ষপাতদুষ্ট সামাজিক নিয়ম, পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাব ইত্যাদি পরিস্থিতির স্বীকার হয়েই একটা মেয়ে বেছে নিতে বাধ্য হয় এই ঘৃণিত জীবন। এটা কোনো মেয়েরই কাম্য জীবন নয়।

একটা মেয়ের পতিতা হয়ে উঠার পেছনের কাহিনী যাই হোক এটা ঠিক যে, কোনো মেয়েই স্বেচ্ছায় পতিতার জীবন বেছে নেয় না। কিন্তু প্রায় সব সময়ই যে বা যারা এই মেয়েটিকে অন্ধকার জীবনে ঠেলে দিচ্ছে তারা রহস্যময়ভাবে থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যে পুরুষটি তাকে ব্যবহারের মাধ্যমে পতিতার সিলমোহর লাগিয়ে দিচ্ছে সে-ও সমাজের বুকে কোনো নারীর সন্তান, ভাই, স্বামী বা বাবা হিসেবে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।