রহস্য চারিদিকে পর্ব—৩

Now Reading
রহস্য চারিদিকে পর্ব—৩

রহস্য চারিদিকে     পর্ব—-৩  [ পিরামিডের রহস্য কথা ] ——– সমগ্র পৃথিবীর অসংখ্য রহস্যের সঠিক উম্মোচন আজও কারও কাছে নেই । না বিজ্ঞান সঠিক ভাবে জানে,  না অনুসন্ধানকারী ব্যক্তি । রহস্যের বিচারে  মিশরের পিরামিডের নাম পড়ে  সর্বোচ্চ তালিকায় । প্রাচিন সপ্ত আশ্চর্যের একটি এই পিরামিড ।

great-pyramids-of-giza-seen-from-above.jpg

খ্রিস্টপুর্ব প্রায় ৫০০০ [পাঁচ হাজার]  বছর আগে নির্মাণ হয়েছিলো এই রহস্যময় মিশরিয় পিরামিডের । প্রায় ৭৫ টি পিরামিড আছে মিশরে । এবং আরও অসংখ্য আছে পৃথিবী জুড়ে ।

শুধু মিশরেই নয় পুরো পৃথিবীতে নির্মিত হয়েছে পিরামিড । মিশরের চেয়ে বেশি পিরামিড সুদানে আছে । মেক্সিকোর পিরামিডের বিষয়ে সবারই মোটামুটি জানা আছে ।

135627861.jpg

উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকা ছাড়াও চীন, টিটিকাকা হ্রদের নিচে, জাপান সমুদ্র তলে এমনি আরও স্থান যা ভাবনার বাইরে এমন সব জায়গায় পিরামিডের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে ।

937f721864460c445daf9775e82d1e79--black-power-ancient-architecture (1).jpg

এখানে বিস্ময়কর ব্যাপার যেটা তা হোল পৃথিবীর নানা প্রান্তে একই আকৃতির স্থাপত্য নির্মাণ কি করে হোল । বিজ্ঞানীরা এর ব্যখ্যায় বলছেন, কালেক্টিভ কন্সাসনেস অর্থাৎ সামগ্রিক চেতনায় মানুষ এক রকম চিন্তা করে, তাই কাজও  একই রকম করে । সেটাই যদি সত্যি হবে আজকের যুগের মানুষরা  তাদের নির্মিত জিনিসগুলোর গঠন আলাদা আলাদা করছে  কেন ?

ফারাও রাজা খুফুর পিরামিডটি সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় । এটি গিজায় অবস্থিত ।

download (24).jpg

এটির উচ্চতা প্রায় ৪৮১ ফুট এর পরিধি প্রায় ৭৫৫ বর্গফুট ।

2005.jpg

গিজার চারটি পিরামিডই  সর্বাধিক সৌন্দর্যময় । এগুলো হোল —–  দ্য গ্রেট পিরামিড – দ্য খাফ্রা – পিরামিড অব মেনকাউরে – স্ফিংস ।   গিজার পিরামিডের আর একটি রহস্য, এটার অবস্থান পৃথিবীর ঠিক মাঝখানে । হাজার হাজার বছর আগের মানুষ এটা কিভাবে জানল যে ভূখণ্ডের মধ্য অংশ কোনটি ?

গিজার তিন পিরামিড আর মেক্সিকোর তিন পিরামিডের সাথে ওরিয়ন নক্ষত্রের কোন সম্পর্ক আছে বলে ধারনা করা হয় ।  এই তিন টি পিরামিড ওরিয়নের  তিন টি নক্ষত্রের সাথে জুড়ে আছে ।

download (17).jpg download (16).jpg

এই দুই সভ্যতাই মানতো যে তাদের দেবতারা  ওই তিন তারা থেকেই এসেছে । যদিও এমন কোন প্রমান আজও মেলেনি যে এই দুটি সভ্যতা পরস্পরের সাথে যুক্ত ছিল বা পরিচিত ছিল ।  তখনকার মিশরীয়রা নিজেদের সূর্যের বংশধর ও দেবতা মনে করতো । তাই তারা বংশের বাইরে কাউকে বিয়ে না করে ভাই বোনকে বিয়ে করতো । সে সময় উন্নত সভ্যতাগুলো মিরামিড  নির্মাণকে যেন অবশ্যম্ভাবী কাজ মনে করতো । পিরামিড নির্মিত সভ্যতাগুলো অনেক উন্নত এবং বহু জ্ঞানের অধিকারী ছিল ।

images (42).jpg

পিরামিডকে এলিয়েন ও স্পেস শিপ এর সাথেও জুড়ে দেওয়া হয়েছে । এই নিয়ে বহু মিথ ও আছে ।

পিরামিড নির্মাণের পেছনে মিশরের ফারাও বা উঁচু শ্রেণীর কোন ব্যক্তির কবর বা মমি রাখার কথা বলা হয় । কিন্তু আজ অবধি কোন একটি পিরামিডেও কোন মানুষের শবদেহ বা মমি মেলেনি ।  আজ পর্যন্ত যত মমি  পাওয়া গেছে সব  ভ্যালি অফ কিং থেকে মিলেছে । অনেকে বলেন যে চোরেরা চুরি  করেছে । সেটা মানা যায় না, চোর দামি বস্তু চুরি  করতে পারে কিন্তু শব বা মমি নিবে না ।  তারপরও বলা হয় যে এই পিরামিডগুলো মমি রাখার জন্যই তৈরি ।

মুলত পিরামিড কেন তৈরি হয়েছে তা নিয়ে বহু কাহিনী  আছে । আর নানা মতামত  ছড়িয়ে আছে বিশেষজ্ঞদের ।  ২২ বছর ধরে ১ লাখ শ্রমিকের পরিশ্রমে খুফুর গ্রেট পিরামিডটি নির্মিত হয়েছে বলে ভাবা হয় । ৬০ টন ওজন আর ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যের বিশাল সব পাথর খণ্ড জোড়া দিয়ে এটি তৈরি হয়েছিলো ।

images (47).jpg  images (49).jpgimages (48).jpg

নিখুত ভাবে কাটা এই পাথর গুলো দিয়ে বানানো পিরামিডের দুটি পাথরের মাঝে চুল পরিমাণও ফাঁকা ছিল না । দর দুরান্ত থেকে বয়ে আনা এমন বিশাল পাথর কোন আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই নিখুত ভাবে কেটে ক্রমান্বয়ে উপরে তূলে কেমন করে এই স্থাপত্য তৈরি হোল তা আজও বিস্ময় । অনুমান ছাড়া কেউই জানেনা তার সঠিক ব্যখ্যা ।

প্রাচিনকালের মিশরীয়রা পরকালে বিশ্বাসী ছিল ।  এবং ভাবত মৃত্যুর পর যখন পুনরায় জীবিত হবে তখন যেন তাদের সকল আরাম আয়েশের ব্যাবস্থা তাদের কবরেই  মজুদ থাকে ।

images (44).jpg images (43).jpg

তাই তারা মৃতদেহকে মমি বানিয়ে রাখত । আর মমির সাথে দিয়ে রাখত জীবনের সকল প্রয়োজনীয় বস্ত । খাবার,  ধন সম্পদ,  মুল্যবান সামগ্রি, দাসদাসী । উঁচু শ্রেণীর ব্যক্তিরা তাদের সেবকদের মমির সাথে জীবন্ত দাফন করতো যেন পরবর্তী জীবনে কোন ক্লেশ পোহাতে না হয় ।

images (45).jpg

মমি তৈরিতে তখনকার মানুষেরা গোপন কোন রাসায়নিক বিশেষ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করতো বিভিন্ন ধাপে। বহুদিন ধরে এই কাজ চলতো ।  মমিকে সুগন্ধিতে ডুবিয়ে রাখত, ব্যান্ডেজে জড়িয়ে রাখত । আজও অজানা তার পদ্ধতি । এই আধুনিক যুগেও মানুষ জানে না সেই  রাসায়নিক ও প্রক্রিয়া গুলো ।

রহস্যময় পিরামিডের আর একটি রহস্য হোল এর অভিশাপ । ১৯২২ সালে ব্রিটিশ প্রত্নত্তবিদ  Howard Carter খুঁজে পান ফারাও তুতেন খামেন এর সমাধি ।

download (18).jpg

৩০০০ বছর পূর্বে মাত্র ১৯ বছর বয়সে  মারা যান এই বিখ্যাত  ফারাও রাজা তুতেন খামেন । তাকে নিয়ে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে । এই সমাধি নিয়ে আজ পর্যন্ত অনেক গবেষণা হয়েছে কিন্তু সব রহস্যের সমাধান মেলেনি ।

images (51).jpg        images (53).jpg

এই সমাধি আবিস্কারের পেছনে যারা যারা ছিলেন তাদের সবাই দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন । প্রথমে মশার কামড়ে ইনফেকশনে ১৯২৩  সালের ৫ এপ্রিল  মারা যান  Lord Carnaval । দ্বিতীয় জন Goerge A Bolt  ফ্রেন্স নদীতে ডুবে মারা যান, ১৯২৩ সালের ১৬ তারিখের মে মাসে । ১০ই জুলাই ১৯২৩ নিজ স্ত্রীর হাতে মারা যান Prince Ali Kamal Fahimi । ভুল চিকিৎসায় অন্ধ হয়ে ব্লাড ইনফেকশনে Lord Carnaval এর সৎ ভাইও  মারা যান ১৯২৩ সালের ২৬ তারিখে । পরের জন ছিলেন Wolf Jewel,  তিনি দক্ষিন আমেরিকার বিত্তশালী ব্যক্তি । তিনি  গুলিতে মারা যান, ১৩ই  নভেম্বার ১৯২৩ সালে । প্রখ্যাত রেডিয়োলজিস্ট  Sir Archibard Dougles fre এক রহস্যময় রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯২৪ সালের ১৫ই জানুয়ারিতে মারা যান  । সুদানের গভর্নর জেনারেল ছিলেন Sir Lee Star, তিনি মারা যান ১৯২৪  সালের ১৯ নভেম্বার এক আততায়ীর হাতে কায়রোতে । এছাড়াও আরও অনেকেই অস্বাভাবিক মৃত্যু বরন  করেন বিভিন্ন সময় ।

সাধারণত পুরুষেরাই মিসর শাসন করেছিলেন । এদের মধ্যে অল্প সংখ্যক নারী ফারাও ছিলেন । দুর্দান্ত সাহসী এই নারীরা মিশরের ফারাও হিসাবে ছিলেন অদ্বিতীয় ।

হাতসেফসুত = তিনি ছিলেন ১৮ শতকের  পঞ্চম ফারাও রানী ।

images (39).jpg images (36).jpg

সিংহের গুহায় জন্ম নেয়া এবং ২২ বছর মিশর শাসন করা একজন চমৎকার ফারাও রানী ছিলেন তিনি । তিনি সিংহ পাশে নিয়ে বসতেন । শোনা যায় পুরুষের বেশ নিয়ে নকল দাড়িও লাগাতেন তিনি । নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামে গেলেই তার সম্পর্কে সব তথ্য জানা যাবে ।

নেফারতিতি =  আখমেননের সম্মানিত রানী ছিলেন তিনি । তার নামের অর্থ – ‘সুন্দর নারী আসছে’ ।

images (41).jpg

তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না । ধারনা করা হয় তিনি ফারাও এর কন্যা । আখেনাতেনের দূর কোন আত্মীয় অথবা বহিরাগত নারী । তার ৬টি কন্যা সন্তান হয় । কিন্তু তাদের বেঁচে থাকার বা পরবর্তী জীবনের কোন প্রমান নেই । নেফারতিতি ও তার স্বামী নতুন কালচার ও বিশ্বাস নিয়ে এসেছিলেন । তারা একেশ্বরবাদী ছিলেন । ধর্মীয় অনেক পরিবর্তন করেছিলেন । তার রাজত্বের ১২ বছর পর হটাতই  তিনি অদৃশ্য হয়ে যান । কোথায় গেলেন কেন গেলেন কেউ জানে না ।  তার অন্তর্ধানের অনেক সম্ভাবনা নিয়ে ভাবা হয়েছে । কিন্তু সঠিক তথ্য পাওয়া যায় নি ।

 

ক্লিওপেট্রা =  অত্যন্ত ইতিহাস বিখ্যাত বিতর্কিত মিশরিয় রানী ক্লিওপেট্রা । তার অসাধারন সৌন্দর্য, রাজনীতি, চাতুর্য, নির্দয়তা, রাজ্যলোভ ও প্রেম এর কারনে তিনি পৃথিবী বিখ্যাত হয়ে আছেন ।

images (34).jpg images (35).jpg

৬৯ খ্রিষ্টপূর্বে তার জন্ম হয়  মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় । রাজত্ব পাওয়ার জন্য তিনি তার ভাই টলেমীকে মেরে ফেলেন জুলিয়াস সিজারের সহায়তায় ।

hqdefault (1).jpg

রোমের রাজা জুলিয়াস সিজারকে আপন সৌন্দর্য জালে আবদ্ধ করেন । হয়ে যান মিশরের রানী ।  পরবরতিতে তার ছোট ভাই এবং বালক রাজা ও ছোট বোনকে হত্যা করেন রাজত্বের জন্য । মিশরের পর এবার রোমের রাজত্ব পাবার জন্য যুদ্ধবাজ রানী  ক্লিওপেট্রা  সিজারের সেনাপতি আন্টনিও কে বিয়ে করে এবং তাকে দিয়ে জুলিয়াস সিজারকে হত্যা করে রোম সাম্রাজ্যের রানী হওয়ার জন্য । এদিকে সিজার এর পুত্র ওকটাভিয়াস সিজার এর সাথে ক্লিওপেট্রার যুদ্ধ হয় ।

download (21).jpg

যুদ্ধে ক্লিওপেট্রা হেরে গিয়ে অজ্ঞাতবাসে চলে যায় । সেখানেই তার মৃত্যু হয় । তার মৃত্যু নিয়ে জনশ্রুতি আছে । সেগুলো হোল — ওকটাভিয়াসই ক্লিওপেট্রাকে মেরে ফেলে, ক্লিওপেট্রা হতাশায়  অধিক মদ্যপানের কারনে মৃত্যু হয়  অথাবা সাপের কামড়ে মৃত্যু । মৃত ক্লিওপেট্রাকে যখন পাওয়া যায় তখন তার শরীরে সাপ জড়ানো  ছিল । কিন্তু আসলেই কিভাবে এই অপার সৌন্দর্যের অধিকারী রানী ক্লিওপেট্রা মারা যায় তা আজও অজানা এক রহস্য ।

the-death-of-cleopatra-1899-louis-marie-baader-1828-1920-france-french-fegwm1.jpg

 

এছাড়াও কিছু রানী যারা ইতিহাস বিখ্যাত তারা হলেন- রানী আনোকসুনামুন । যিনি  ছিলেন রাজা তুতের স্ত্রী, রানী নেফারতারি তিনি  ছিলেন ফারাও রামেসিস ২  [ দ্বিতীয় ] এর স্ত্রী ।,

 

 

 

 

 

 

 

সেলিনা জান্নাত

ঢাকা-রচনাকাল

©২২/০৭/২০১৭ইং

রহস্য চারিদিকে পর্ব—-২

Now Reading
রহস্য চারিদিকে পর্ব—-২

 

প্রথম পর্বের পর

পৃথিবী বলুন,  আকাশ বলুন, সাগরে বলুন, পাতালে বলুন—অথবা মহাকাশে কিম্বা বিগ ব্যাং এর পর ন্যানো সেকেন্ড থেকেই শুরু হয়েছে রহস্যের জাল বুনুন । আপনি বলবেন বিজ্ঞান তো এক সময় সবই প্রমান করে দিবে । আমিও বলি হয়তো ঠিক কথা । কিন্তু যতক্ষণ না প্রমান হচ্ছে ততক্ষন সেটা একটা গভীর রহস্য । সর্বত্র সবখানে সব সময় চারিদিকে রহস্য ঘিরে আছে । আছে গল্প,  গাঁথা, কাহিনী ।  আছে সত্য মিথ্যার অসংখ্য মিথ । আছে অবিশ্বাস্য ব্যখ্যাহীন অমীমাংসিত ঘটনা । আমি তুমি সে , সকলেই কিছু শুনেছ, দেখেছে, কিম্বা অনুভব করেছে । কেউ বিশ্বাস করেছে , কেউ করেনি । কেউ হেসে উড়িয়ে দিয়েছে, কেউ ভয় পেয়েছে । কেউ গবেষণা করছে, কেউ এড়িয়ে যাচ্ছে । এসবে কম বেশি সন্দেহ সবাই করে তো বটেই , যার সাথে ঘটেছে সেও বিশ্বাস অবিশ্বাসের ব্যাখ্যাহীন জালে আবদ্ধ হয়ে যায় এক সময় । আর নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করতে থাকে, যেমন–  ‘’ আরে ? আমার সাথেই এটা ঘটেছিল ? আসলেই কি এমন কিছু হয়েছে ? এমনও কি হয় ? এটা কেমন করে হতে পারে ? এর কি ব্যাখ্যা ?’’ ইত্যাদি ।

-আমি এই সব কাহিনীর কিছু কিছু আপনাদের  সামনে তূলে ধরবো । এর কিছু নির্ভেজাল ভাবেই সত্য । যার সাথে ঘটেছে , সে ছাড়া অন্য সবাই সত্য মিথ্যার পাল্লার এপাশ ওপাশ দুলতে থাকে । থাকুক । কিন্তু রহস্য সব সময়ই কৌতুহলজনক । আবিস্কারে তাইতো এতো আনন্দ ।

এই পৃথিবীতে বাস্তবিক ও কাল্পনিক , দুই ধরনের মানুষ আছে । কিছু প্রজাতি এমনও আছে যাদেরকে না বাস্তবিক না কাল্পনিক বলা যাবে । এটা এ জন্য যে না এদের উপস্থিতির কোন সঠিক উপযুক্ত প্রমান আছে আর না এদের অস্তিত্বকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যাবে । এরা এতটাই রহস্যময় হয় যে এদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান কারও কাছে নেই ।

 

-এমনই একটি প্রজাতির নাম ভ্যাম্পায়ার । ড্রাকুলা নামেও  এরা খুব পরিচিত । এরা না পুরোপুরি মানুষ না জানোয়ার । না জীবিত না মৃত । ইতিহাস ও নানান দলিল দস্তাবেজ দ্বারা এটাই বলা যায় , এরা সময় সুযোগ মত রাতের আঁধারে কবর থেকে উঠে এসে মানুষ বা জানোয়ারের রক্ত পান করে ভোর হবার আগেই আবার কবরে গিয়ে শুয়ে পড়ে । আবার রাত হলেই শিকার খুঁজতে বের হয় । এভাবেই চলতে থাকে ।

dracula.jpg

hqdefault.jpg

-বিজ্ঞানও এটা মানছে যে ভ্যাম্পায়ার আছে, তবে তা কোন সুপারন্যাচারাল কিছু নয়, বরং এটা একটি রোগ । মানুষ বা জানোয়ারের রক্ত পান করার রোগ । রোগী ব্যক্তির রক্ত পান করা একটি নেশা ।  কোন জীবিত প্রাণীর রক্ত পান করলে তাদের ভালো লাগে, শক্তি অনুভব করে । রক্ত পান করতে না পারলে অস্থির উদ্ভ্রান্ত হয়ে বেহুশও হতে পারে । এখনও এর কোন চিকিৎসা আজও পাওয়া যায় নি ।

-বিজ্ঞানকে পাশে রেখে যদি কাহিনী, ইতিহাস ও বর্তমান নানান ঘটনাকে দেখি —

 

-১৭শ শতকের দিকে এমন ঘটনা বেশি শোনা যায় । ১৭শ থেকে ১৭শ ৩০ শতাব্দীকে ড্রাকুলার সময় বলা হয় । ওই  সব দিনে  ইংল্যান্ড ও ইউরোপে লোক ভাম্পায়ারের নাম নিতেও ভয় পেতো ।  ইউরোপে তখন এমন বহু ঘটনার বর্ণনা বিভিন্ন কাহিনী ও পুস্তকে দেখা যায় ।

– রোমানিয়ার ট্রান্সীল্ভ্যানিয়ার রাজা vlad tepes   এর কারপেথিয়ান পর্বতমালার উপর, প্রাসাদ দুর্গ ।ইংরেজ আইনজীবী  জোনাথন পার্কার এর সাথে কাউন্ট ড্রাকুলাকে নিয়ে ঘটে যাওয়া ভ্যাম্পায়ার কাহিনীটি  এই প্রাসাদ থেকেই শুরু ।

images (9).jpg

লেখক  ব্রাম স্টোকার  ১৮৯৭ সালে তার  উপন্যাসে রক্তপায়ী ড্রাকুলার বর্ণনা  করার পর থেকেই আজ অবধি ভ্যাম্পায়ার চরিত্রটি তুমুল জনপ্রিয় । এবং এর জনপ্রিয়তার কৃতিত্ব একমাত্র এই উপন্যাসেরই ।

tintinrocks_1303922216_6-Dracula-Year-Zero.JPG_595.jpg images (21).jpg

এই গল্পে কাউন্ট ড্রাকুলা তার সঙ্গী তিন নারী সহযোগে রক্তপান করে একে অন্যের এবং ধরে আনা শিকারের । এই কাহিনীর পটভূমিতে অসংখ্য গল্প, নাটক, ও মুভি তৈরি হয়েছে । ও হচ্ছে ।

ইতিহাসের চরিত্র – হাঙ্গেরিতে  ১৫৬০ সালে জন্ম নেয়া এলিজাবেথ বাথরি নামের এই নারীকে  ব্লাড কাউন্টেস নামেও ডাকা হয় ।  এলিজাবেথকে ইতিহাসের ক্রুরতম মহিলা হিসাবে জানা হয় ।

6_244680.jpg

গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড এ এলিজাবেথ বাথোরি সবচেয়ে বেশি খুন করা নারী রানী । তাকে জীবন্ত ভ্যাম্পায়ার বলা হয় । এই রানী  বার থেকে চৌদ্দ বছরের মেয়েদের ধরে এনে ভীষণ কষ্ট দিয়ে নতুন নতুন কৌশল বের করে মারত । আর ওদের শরীরের রক্ত দিয়ে গোসল করতো । চিরকাল সৌন্দর্য ধরে রাখার জন্য । তার বিশ্বাস ছিল এটা যে যদি যুবতি নারীর তাজা রক্তে গোসল করা হয় তবে সে অনন্তকাল সুন্দর থাকবে । আর তাই ১৫৮৫ থেকে ১৬১০ সালের মধ্যে সে প্রায় ৬৫০ টি মেয়েকে খুন করে,  নৃশংস বর্বর ধূর্ত এই রানী । শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে  আদালত বিচারে এই ঘৃণ্য নারীকে কারাদণ্ড দেয় এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয় ।

-হটাত করে মৃত শরীরে বিশ্বয়কর ভাবে জান এসে যাওয়া এই ভ্যাম্পায়ার হয়ে যায় প্রচণ্ড শক্তি, দ্রুতগামিতা, এবং প্রখর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী । সবচেয়ে বড় কথা  এরা অমর হয়ে যায়, অর্থাৎ কখনও মরে না । আর এদের ছায়া দেখা যায় না । বলা হয় এরা রক্ত পান করার কারনেই এদের এমন সুপার ন্যাচারাল লাভ ।

-সাভানা নামক একটি জায়গায় একটি ভ্যাম্পায়ারকে স্পট করা গেছে । সি সি টি ভি ক্যামেরায় ধরা পড়া এই ক্লিপটি প্রায় সত্য হিসাবেই ধরে নেয়া হয় । এখানে আয়নার সামনে দিয়ে যাওয়া মানুষটির  কোন ছায়া বা প্রতিবিম্ব বা রিফ্লেক্সন  আয়নায় পড়ে নি । ওই মুহূর্তে ওই আয়নার সামনে হেটে  যাওয়া আর সবারই ছায়া আয়নায় পড়েছে ।

images (15).jpg download (6).jpg

 

ভ্যাম্পায়ার, পিশাচ, আত্মা এদের কোন ছায়া নেই । এটা বা এই জিনিসটা আসলে কি ? তবে এই ছবিটা নিয়ে বহু প্রশ্ন,  তর্ক ও অনুসন্ধানের বিষয় আছে ।

-অরলিন্স নামে একটি জায়গায় পাঁচ হাজারেরও বেশি ভ্যাম্পায়ারের অস্তিত্ব বিদ্যমান । অনেক নিউজ রিপোর্ট, বি বি সি নিউজ রিপোর্ট এবং যারা ডকুমেন্টরী বানায় তাদের দাবী যে আমেরিকার অরলিন্স নামক জায়গাটিতে ভ্যাম্পায়ার সোসাইটি আছে । এরা একটি স্বতন্ত্র গ্রুপে বসবাস করে ও রাতে রক্ত পান করে । এরা স্বাভাবিক মানুষের মতই । এই কম্যুনিটিটি নিয়ে  ভ্যাম্পায়ার সম্পর্কিত অনেক প্রশ্ন উঠলেও অতিমানবীয় কোন কিছু আজও ওদের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় নি । শুরুতে এরা দুশো ছিল । এবং ক্রমে  বাড়ছে সংখ্যাটা ।

কোথাও কোথাও রক্ত পানের পাশাপাশি ভ্যাম্পায়াররা মাংসও খায় । এমন কথা ভারতে শোনা যায় । তারা রক্ত চোষা বা রাক্ষস নামে সমধিক পরিচিত ।

ভারতের মধ্যপ্রদেশের দীপা আহিরওয়ার এর কাহিনীটি তখন ভারতে তোলপাড় তূলে । এটা ২০১১ সালের কাহিনী। তিনি পুলিশে অভিযোগ করেন যে তার স্বামী মহেশ আহিরয়ার নিয়মিত তার রক্ত পান করছেন । মহেশ  মানে তার স্বামী এটা না করলে অর্থাৎ দীপার রক্ত পান না করলে খুব  অসুস্থ হয়ে যান । মহেশ যদিও  তার সুস্থতার জন্যই  এটা করছেন, এবং সিরিঞ্জ দিয়েই দীপার থেকে রক্ত নিয়ে পান করছেন, তারপরও দীপা তার প্রথম সন্তান জন্মের পর অসহ্য হয়েই পুলিশে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন ।

-ভ্যাম্পায়ার নিয়ে অতীতে ও বর্তমানে হাজারো কাহিনী ছড়িয়ে আছে পৃথিবীতে । অনেকেই সেসব ঘটনার ভুক্তভোগী ও সাক্ষী এবং তা বিশ্বাস করে । কোনটা আসলেই সত্যি আর কোনটা মিথ্যা সেটা আমরা কেউ জানি না ।  বিজ্ঞান ও জানে না । বিজ্ঞান এখনও এই রহস্যময় ঘটনার কোন ব্যখ্যা দিতে অপারগ । কোন একদিন নিশ্চয়ই পারবে । কিন্ত  বর্তমান পর্যন্ত এই রহস্য বোঝার ক্ষমতা  বা জ্ঞান বিজ্ঞান পায় নি ।

চলবে————

 

 

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা –রচনাকাল

৩০/০৬/২০১৭ইং

 

প্রথম পর্বের লিংক— http://footprint.press/রহস্য-চারিদিকে-পর্ব-১/

বালা লাগছে প্রেম করছি কইফত দিমু ক্যালা পর্ব—১

Now Reading
বালা লাগছে প্রেম করছি কইফত দিমু ক্যালা পর্ব—১

বাদশা প্যারিসের উচ্ছ্বল হাসিমুখের দিকে অপলকে তাকিয়ে আছে । বাদশার মুগ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে প্যারিস বলল, ‘এই, এমন করে তাকাও কেন ? এতো কি দেখো ?’ তবুও বাদশাকে চুপ দেখে ও আবারও বলল,  ‘এই, বলনা কি দেখছ এমন করে ।‘

-‘কেমুন কইরা ?’ পলক না ফেলে, চোখ না সরিয়ে ওভাবেই বলল বাদশা ।

-‘এই যে এমন গভীর হয়ে ? নিবিষ্ট হয়ে ।‘

-তুমার হাছি দেখতে আছি । পিরিছ । ইমুন হাছি,  দেইখা দেইখা আমি পাগল  ওইয়া যাইতে লাগছি ।‘

-প্যারিস কৃত্তিম গাম্ভীর্য নিয়ে বলল, ‘ও কে । আর হাসবো না । কাউকে পাগল করার অপরাধে অপরাধী হওয়া কি ঠিক ? নিশ্চয়ই নয় ।‘

-নদীর দুরন্ত বাতাসে উড়ে উড়ে যাওয়া প্যারিসের অবাধ্য চুলগুলো আঙ্গুল দিয়ে সরিয়ে বাদশা বলল, ‘এমুন কথা তুমি কেমতে কইলা ? তুমি কেমতে না হাছবা । তুমি না হাছলে আমি তো ডাবল পাগল ওইয়া জামু । এতো ছুন্দর কইরা হাছ । কি ছুন্দর যে লাগে তুমার হাছি । এক একটা হাছি হাছ, আর আমার এক একটা বচ্ছর আয়ু বাইরা যায় ।‘

– ‘ইসস ।‘

‘হাছা কইতাছি , এক্কেরে কছম—–।‘

-‘আমি বলেছি কিছু, বল ? আমি তো জানি ।‘

ওদের কথার মাঝখানে ফুসকাআলা এসে বলল, ‘এই নেন আপনেগো পেলেট ।‘ বাদশা একটি প্লেট প্যারিসের হাতে তূলে দেয় । অন্যটি নিজে নিয়ে ওর পাশে দাঁড়ায় ।

-ওরা দুজন, প্যারিস আর বাদশা । দাঁড়িয়েছিলো বুড়িগঙ্গা নদীর উপর ব্রিজটিতে । নদীর পানির দিকে তাকিয়ে ফুসকা খেতে খেতে প্যারিস বলল, ‘এই শোন, রেলিং এ প্লেট রেখে খেতে খেতে তো প্লেটই পড়ে যাবে । নদীতে ।‘

-‘এই কথা ? এর লিগগ্যা কি খাইবা না ? পড়লে পড়বো । ফুসকাআলারে একটা পেলেটের লিগগ্যা পাঁচটা পেলেটের দাম দিমুনে ।‘

-‘সত্যি ফেলে দিলাম ।‘  বলে প্যারিস সত্যিই ফুসকার প্লেটটা নদীতে ফেলে দিলো ।

-ফুসকাআলা দৌড়ে এলো , ‘করেন কি আফা, পেলেট ফালাইয়া দিলেন ।‘

-‘এই মিয়া ছুনো ।‘ বাদশা সামনে এসে দাঁড়ালো । ‘ পেলেট পড়ছে কি পড়ে নাই এইডা দেখন তোমার কাম না ।  তোমার কাম তুমি ফুসকা বানাইবা আর মেডামেরে আইনা দিবা । দিতেই থাকবা বুঝছ ? থামাথামি নাই ।‘

-ফুসকাআলা দ্বিতীয় প্লেটটা এনে বাদশার হাতে দিলো । বাদশা প্লেটটা নিয়ে প্যারিসের হাতে দিয়ে বলল, ‘এই লও পিরিছ, পেলেট  ফালাইতে ফুরতি লাগতাছে, লও ফালাও ।‘

-প্যারিস আবারও প্লেটটি  নিয়ে খুব সহজ ভাবে নদীতে ফেলে দিল । ফুফকাআলা দৌড়ে এলো, ‘কামডা কি অইল মেডাম , নদীর মইদ্দ্যে পেলেট ফিক্কা মারতাছেন । কিল্লিগগ্যা ?’

-বাদশা আবারও সামনে এসে দাঁড়ালো,  ফুসকাআলার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘ছুনো মিয়া, চিন্তা করো ক্যালা ? একটা পেলেটের বদলি তুমারে দছটা পেলেটের টেকা দিমুনে । চিন্তার কাম নাইক্কা । তুমি খালি ফুসকা বানাইবা আর মেডামেরে দিবা । বুঝছ আমার কথা ? কেচাকেচির দরকার নাই ।‘

-ফুসকাআলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকাতে থাকে ।

-‘কি মিয়া কথা কানে লও না ক্যালা ? যাও ফুসকা বানানি ছুরু করো ।‘

-ফুসকাআলা অনিচ্ছা সত্বেও মাথা নেড়ে চলে যায় । আর বিস্ময়য়ের চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে ফুসকা বানাতে থাকে । ফুসকাআলার চোখের সামনে দিয়ে যখন পঞ্চম প্লেটটিও নদীতে পড়লো আর প্যারিস একটি ফুসকা মুখে দিয়েই নিষ্ঠার সাথে নদীর পানিতে প্লেট ফেলার কাজটা করে যাচ্ছিলো তখন ফুসকাআলার সাথে সাথে আরও কিছু উৎসাহী দর্শকও হা করে তাকিয়েছিল ।

– পাশে দাঁড়িয়ে বাদশা তাকিয়েছিল হাসিমুখে । যেন একটি শিশু অন্য একটি শিশুর সাথে মজার কোন খেলায় মেতেছে ।

-ঠিক এই সময় সারমান ওদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো মোটর বাইকে করে । সারমান প্যারিসের একমাত্র ভাই । যদিও আরও একটি বোন আছে প্যারিসের । ওরা দুজনই বড় । আজ সারমানের কি একটা কাজে পুরনো ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জ যেতে হয়েছিলো । ফিরতি পথেই ও দেখতে পেল প্যারিসকে । একটি ছেলের সাথে নদীর পাড়ে দাড়িয়ে খুব হাসছে ।

-বাইকটাকে একটু দূরের টিক্কা কাবাবআলার গাড়ির আড়ালে রেখে ও দাঁড়িয়ে ছিল হতবাক হয়ে । এখানে এতো দূরে বুড়িগঙ্গার উপরে অচেনা একটি ছেলের সাথে ? ওরা যথেষ্ট আধুনিক ফ্যামিলি । বন্ধু থাকাটাকে স্বাভাবিক চোখেই দেখে । কিন্তু এতো দূরে হটাত প্যারিসকে দেখে ও কৌতূহলে এগিয়ে এলো প্যারিসকে আড়াল করে ।

-ও চাইছিল যে প্যারিস যে ছেলেটার সাথে এতো দূর এসে ঘুরছে, সে ব্যাক্তিটা কেমন । আজ অবধি প্যারিসকে কোন ছেলের সাথে এতটা আগ্রহ নিয়ে কথা বলতে দেখেনি ও । বরং ছেলেদের সাথে ও কে খুব গুনে হিসাব করে কথা বলতে দেখেছে । পলিন, মানে বড় বোন,  যেমন খুব বন্ধু নিয়ে মেতে থাকতো, প্যারিস মোটেই তেমনটা  নয় । প্যারিস যখন নদীর দিকে তাকিয়ে নৌকা গুনছিল আপন মনে,   তখন সারমান চট করে ফুসকার গাড়ির আড়ালে এসে দাঁড়ালো। বাদশা তখন  কথা বলছিল ফুসকাআলার সাথে । সারমান ওকে ডাক দিলো, এই, এই যে ভাই শুনুন।

-কি, আমারে কইতাছেন?

-জি আপনাকে।

– এগিয়ে এলো বাদশা, ‘কি হইছে?’

-সারমান প্রথমে কি বলবে ভেবে পেল না। ‘না মানে বলতে চাইছিলাম কেরানীগঞ্জ নদীর কোন পাড়ে।‘

-ও আইচ্ছা এই কথা। আপনের বাম হাতের দিকে ওইল পুরান ঢাকা আর ডাইন হাতে ওইলো কেরানীগঞ্জ। এই যে বিরিজ দেখতাছেন, এর এই পাড়ে ওইল ঢাকা ওই পাড়ে কেরানীগঞ্জ । বুঝবার পারছেন ?’

– আচ্ছা। ধন্যবাদ। ছেলেটার সাথে কথা বলতে বলতে ওর ভাষা শুনে মনে মনে বিরক্ত হচ্ছিলো সারমান। আর  যখন দেখল ছেলেটি চিৎকার করে প্যারিসকে বলছিল,   ‘পিরিছ তুমারে আরও মছলা  দিবার কমু।‘  কথাটা শুনে ও ভেতরে ভেতরে মহা খ্যাপা হয়ে গেলো। প্যারিস,  এতো সুন্দর একটা নামকে বলছে পিরিচ। এ কেমন ভাষা । আমার আদরের বোনটাকে কাপ পিরিচ প্লেট বানিয়ে ফেললো। ডিসগাসটিং । এমন একটা ছেলের সাথে প্যারিস কথা বলছে কি করে?

images (4).jpg

কোমরে দুহাত দিয়ে রাগত চোখে ও ভাবছিল। আমার বোন প্যারিস,  যে কিনা ব্রিটেনে জন্ম নিয়ে ওখানেই বড় হয়েছে, সব দিকেই অসাধারন একটি মেয়ে । আর সে এমন একটি রাবিশ টাইপের ছেলের সাথে ভাব করছে। যে ছেলে তার নামটা পর্যন্ত ঠিক ভাবে উচ্চারন করতে পারছে না। পিরিচ। হোয়াট ইজ পিরিচ? আমার বোন কোন ক্রোকারিজ? রান্না ঘরের বাসন কোসন?

-গাইয়াটা আবার এই দিকেই আসছে। নিজের রাগকে সামলে ভাবে ও । ‘এখন নয় সারমান, নট নাউ । নো সিন ক্রিয়েট। সারমান নিজের মুখটাকে যথা সাধ্য কোমল করে বলল, ‘কি ভাই ফ্রেন্ড বুঝি? ফ্রেন্ড নিয়ে ঘোরার জন্য চমৎকার জায়গা।‘

-‘ আরে কি কন। বহুত সুন্দর জাগা। এক্কেরে। নদীর বাতাছ খাইবেন মন ভইরা। আপনের মনে অয় পুরান ঢাকা ছোম্পরকে কুন আইডিয়া নাইক্কা। এই হানে বহুত ছুন্দর ছুন্দর জাগা আছে।‘

-ও আচ্ছা । তাই ?’

-‘  ঘুইরা ঘাইরা না দেখলে বুজবার পারবেন না । পুরান ঢাকা আইছেন, আহেন ।  আমগো লগে বইসা  অহন ফুসকা খান ভাইছাব । খুব ছাদের ফুসকা ।‘  বলে বাদশা ফুসকার অর্ডার দেয় । ‘এই মিয়া,  এই ফুসকা,  ভাইয়েরে ফুসকা দেও । যেই কই প্লেইট খাইবার চায় দিবা । বিল আমি দিমু নে ।‘

-‘ না আমি খাবো না ।‘ সারমান জোরালো  অসম্মতি জানায় ।

-‘খাইবেন না ?  ক্যান ? পুরান ঢাকা আইছেন, দেখা ওইছে, একটু মেহমানদারী করবার দেন ।‘

-‘আমি ফুসকা খাই না ।‘

-‘কি কন বাই, তাজ্জুব কথা ? ফুসকা খায় না এমুন মানুছ আছে নি ? খাইয়া দেখেন, বহুত ছাদের ।‘

-‘এরা হাইজিন না । আর জিনিসটাও  হাইজিনিক না ।‘

-‘হাই জিন আর লো জিন, এতো ভাবতাছেন ক্যালা ? জিনেরে ডরান নি কুনু ? কথাটা বলে বাদশা হাসতে থাকে । হা হা হা । গুলু মিয়ার কাম কাজ পরিছকার আছে । বিছছাস কইরা খাইয়া দেহেন ।‘

-বাদশার সাথে কথা বলতে বলতে ওর এমন ঢাকাইয়া উচ্চারণে সারমানের মেজাজ ক্রমশই খিঁচে যাচ্ছিলো । নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে ও বলল,  ‘ভাই একটা কথা –।‘

-‘কি কথা ।‘

চলবে———।

 

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা- রচনাকাল

০২/০৭/২০১৭ইং

রহস্য চারিদিকে পর্ব—১

Now Reading
রহস্য চারিদিকে পর্ব—১

[ টাইম ট্র্যাভেলার ]

পৃথিবী বলুন,  আকাশ বলুন, সাগরে বলুন, পাতালে বলুন—অথবা মহাকাশে কিম্বা বিগ ব্যাং এর পর ন্যানো সেকেন্ড থেকেই শুরু হয়েছে রহস্যের জাল বুনুন । আপনি বলবেন বিজ্ঞান তো এক সময় সবই প্রমান করে দিবে । আমিও বলি হয়তো ঠিক কথা । কিন্তু যতক্ষণ না প্রমান হচ্ছে ততক্ষন সেটা একটা গভীর রহস্য । সর্বত্র সবখানে সব সময় চারিদিকে রহস্য ঘিরে আছে । আছে গল্প,  গাঁথা, কাহিনী ।  আছে সত্য মিথ্যার অসংখ্য মিথ । আছে অবিশ্বাস্য ব্যখ্যাহীন অমীমাংসিত ঘটনা । আমি তুমি সে , সকলেই কিছু শুনেছ, দেখেছে, কিম্বা অনুভব করেছে । কেউ বিশ্বাস করেছে , কেউ করেনি । কেউ হেসে উড়িয়ে দিয়েছে, কেউ ভয় পেয়েছে । কেউ গবেষণা করছে, কেউ এড়িয়ে যাচ্ছে । এসবে কম বেশি সন্দেহ সবাই করে তো বটেই , যার সাথে ঘটেছে সেও বিশ্বাস অবিশ্বাসের ব্যাখ্যাহীন জালে আবদ্ধ হয়ে যায় এক সময়  যেমন–  ‘’আমার সাথেই এটা ঘটেছিল ? আসলেই কি এমন কিছু হয়েছে ? এমনও কি হয় ? এটা কেমন করে হতে পারে ? এর কি ব্যাখ্যা ?’’ ইত্যাদি ।

-আমি এই সব কাহিনীর কিছু কিছু আপনাদের  সামনে তূলে ধরবো । এর কিছু নির্ভেজাল ভাবেই সত্য । যার সাথে ঘটেছে , সে ছাড়া অন্য সবাই সত্য মিথ্যার পাল্লার এপাশ ওপাশ দুলতে থাকে । থাকুক । কিন্তু রহস্য সব সময়ই কৌতুহলজনক । আবিস্কারে তাইতো এতো আনন্দ ।

-পাঠক- এই পর্বে আমি টাইম ট্র্যাভেল বা সময়ের পরিভ্রমণ নিয়ে কিছু বলবো । টাইম ট্র্যাভেল এমন একটি বিষয়, যেটা নিয়ে আমরা কখনও না কখনও ভেবেছি । ভেবেছি, এমন যদি হতো- অতীতে গিয়ে নিজের কোন একটি ভুল অন্তত শুধরানো যেতো । পেছনে গিয়ে সেই কাজটি আমি কখনও করতাম না । যেটা করে ভুল করেছি । অথবা ওই কাজটি অবশ্যই আমি করে নিতাম । যেটা করা আমার একান্তই উচিত ছিল ।

images (50).jpg

-বিজ্ঞান বলে, আইনস্টাইনের  ‘থিয়োরি অব জেনারেল রিলেটিভিটি’ এর হিসাবে কেউ যদি লাইট স্পিডের [আলোর গতি] চেয়ে বেশি স্পিডে ট্র্যাভেল করে, তাহলে সে বর্তমান সময়ের পেছনে বা সামনে যেতে পারবে । সে হয়ে যাবে টাইম ট্র্যাভেলার ।  যদিও সেটা সম্ভব হয় নি আজও । আলোর গতিকে অতিক্রম করা তো দূর, মানবজাতি এখনও সেটা ছুঁতেই পারেনি । অতি ন্যানো সেকেন্ডের দুরত্বে আছে ।

why-time-travel-is-impossible_66207_990x742.jpg

-কিন্তু তারপরও কিছু এমন লোক আছেন  যারা দাবী করছেন যে, তারা টাইম ট্র্যাভেল বা সময় ভ্রমন বা সময় যাত্রা করেছেন । আজ আমি এমনি কিছু যাত্রীর ঘটনা বলতে যাচ্ছি, যারা এটা দাবী করেছেন যে তারা টাইম ট্র্যাভেল করেছেন । অথবা এমন ঘটনা যেটা দেখে তাদের সময় যাত্রী বলে ধরা নেয়া যাবে ।

-প্রথম ঘটনাটি ১৯৫৪ সনে Taured  নামক এক ব্যাক্তির । টোকিও এয়ারপোর্টে তার পাসপোর্ট স্ট্যাম্প লাগানোর জন্য নেয়া হলে, দেখা গেলো যে লোকটি টরেড নাম এর একটি দেশের অধিবাসী । কর্মকর্তারা এটা শুনার পর,  লোকটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য কাস্টডিতে নিয়ে  যাওয়া হোল, ও কোন দেশের ও সে দেশটি কোথায় তা জানার জন্য । তখন লোকটি বলল, এটা ফ্রান্স ও স্পেন এর মাঝের একটি দেশ । নাম টরেড । কর্মকর্তারা তার সামনে একটি ম্যাপ দিয়ে বললেন,   ‘’কোথায় তোমার দেশ দেখাও ?’’ ও তখন ম্যাপে টরেড নামের কোন দেশ খুঁজে না পেয়ে পেরেশান হয়ে গেলো । লোকটি এনডোরা দেশটি দেখিয়ে বলল, ‘’এখানেই আমার দেশ টরেড ।‘’ এবং সে এনডোরা নাম কখনওই  শুনেনি । সে বলল তার দেশটি হাজার বছর ধরে এখানেই আছে ।  এখানে এনডোরা নয় টরেড দেশ হবে ।   আর ও প্রায় পাঁচ বছর ধরে জাপানে ব্যাবসার কাজে আসা যাওয়া করছে ।

-লোকটির পাসপোর্টে সব এন্ট্রি চেক করে দেখা গেলো সেগুলো একেবারে সঠিক । ওর কাছে ওই Taured  দেশের দেয়া ড্রাইভিং লাইসেন্সও ছিল যা কিনা ওর দাবীকে আরও মজবুত করে দেয় । এবং ওর কাছে অনেক ইউরোপিয়ান কারেন্সি ও এমন একটি ব্যাংকের চেক বই ছিল যেটার নাম আগে কখনও শোনা যায় নি । ওকে একটি হোটেলে দুজন গার্ডের নজরবন্দীতে রাখা হোল । যেন সে কোথাও যেতে না পারে । পরদিন পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ওই কামরাটিতে গেলে তাকে পাওয়া গেলো না । বিস্ময়য়ের বিষয় সে কামরাটিতে আর কোন দরজা ছিল না । একটি মাত্র জানালা । পনর তলার উপর জানালা থেকে লাফ দেয়াও  সম্ভব নয় । তাহলে সে কিভাবে গেলো । আজ পর্যন্ত জানা গেলো না ব্যাক্তিটি কোথা থেকে এলো, কোথায়ই বা গেলো ।

mqdefault.jpg

-দ্বিতীয় ঘটনাটি । এই কাহিনী Andrew Carlssin  এর ২৮ জানুয়ারি ২০০৩ সাল । নিউইয়র্ক পুলিশ ওকে গ্রেফতার করলো । ওর উপর অভিযোগ ছিল, ও বেআইনি ভাবে শেয়ার মার্কেট থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন করেছে । Andru Carlssin আট শত ডলার নিয়ে শেয়ার ব্যাবসা শুরু করেছিলো ।  এবং ঝুঁকি পূর্ণ দাঁও খেলে দুসপ্তাহে ৩৫ লাখ ডলার কামাই করে নেয় । আর এ কারনে ও কর্মকর্তাদের নজরে এসে যায় । খুব ভাল ঝানু ব্যাবসায়ী ও এতো কম সময়ে এতো বেশি মুনাফা করতে পারবে না । আর কর্মকর্তারা এটা কিছুতেই মানতে রাজি নয় যে ঘটনাটা কাকতালীয় । এজন্য পুলিশে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বিস্ময়কর কথা জানা যায় ।  Andru Carlssin দাবী করে সে ভবিষ্যৎ থেকে এসেছে । ও ২২৫৬ শতাব্দী থেকে এসেছে । ও বলল ও ইতিহাসে পড়েছে এই সময় শেয়ার বাজারে  খুব ওলট পালট হয়েছিলো । তাই সে এ সুযোগটা নিতে এসেছে । এবং বই ও নেট থেকে ও জানতে পারে এ বছর কোন শেয়ারটি ভালো করবে, ও সে সব শেয়ার গুলোই কিনেছিল । ও পুলিশকে বলল,  তাকে ছেড়ে দেয়ার বদলে ওসামা বিন লাদেন কোথায় আছে ও এইডস এর রোগমুক্তির চিকিৎসা ও বলে দেবে ।  পুলিশ ওকে পাগল ভাবল । পরে ওকে জামিন দেয়া হলে ও যেন গায়েব হয়ে গেলো চিরিদিনের মত । ওকে  আর কেউ দেখিনি আজও । কোথায় হারিয়ে গেলো ?

images (45).jpg

– তৃতীয় যে কাহিনী, এটা Hakan Nordkvist  এর । ৩০ আগস্ট ২০০৬ এ ৩৬ বছরে পা দেওয়া Hakan Nordkvist,   তিনি কাজে কিচেনে আসেন । এসে দেখেন সিঙ্কের পাইপ খারাপ হবার কারনে মেঝেতে পানি জমেছে । তিনি এটা ঠিক করার জন্য পাইপের নিচু ক্যাবিনেটের ভেতর ঢুকে যান হাঁটুতে ভর দিয়ে । পথটা খুব লম্বা মনে হচ্ছিলো তার । পুরোটা পথ দেখতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত চলে যান । ওখান থেকে বের হয়ে তিনি এক অন্য জগত দেখতে পান । একেবারেই আলাদা । ভবিষ্যতের পৃথিবী । উনার ভাষ্য মতে উনি ২০৪২ শতাব্দীতে   পৌঁছে গেয়েছিলেন । শুধু তাই নয় তিনি ভবিষ্যতের Hakan Nordkvist এর   সাথেও মিলিত হয়েছেন । ভবিষ্যতের তিনি নিজেই । উনি এটাও দাবী করেন যে, যে কথা শুধু Hakan Nordkvist জানত সেটা সে ও জানে । তিনি তার কথাকে সত্য প্রমান করতে তারই মত দেখতে এক ব্যক্তির সাথে একটি ভিডিও বানিয়েছেন । ভিডিওতে দুজনের হাতের ট্যাটোও একই হাতে একইরকম । সত্যিই তিনি সময় পরিভ্রমণ করেছেন ।

 

অসংখ্য কাহিনীর মধ্যে, আরও কিছু টুকরো ঘটনা – সেটা ছিল ১৯৯৫ সন । MIKE TAISON  VS   MCNEELY এর বক্সিং ম্যাচ হচ্ছিলো । তখন একটি ভিডিওতে দেখা গেলো, দর্শক সারিতে বসে কেউ একজন দর্শক স্মার্ট  ফোন  দিয়ে খেলাটি রেকর্ড করছিল । হয়রানির বিষয় এটা যে, সেই সময় স্মার্ট ফোনের আবিস্কারই হয়নি । এমন কি ক্যামেরা ফোনের আবিষ্কারও ২০০০ সনে হয়েছিলো । লোকটি কে ছিল ? কোথা থেকে এলো ?

images (49).jpg

-Carlie Chaplin er ফিল্ম এর একটি সিনে এমন জিনিস দেখা গেলো যা সবাইকে হয়রান পেরেশান করে দিলো । ওই সিনে একটি মহিলা মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে যাচ্ছেন,   যাচ্ছে দেখা যায় । এটা কিভাবে সম্ভব ? মোবাইল ফোন ?  তখন তো ফোনই আবিস্কার হয়নি । ফোন আবিস্কার হয়েছে-১৯৭০ সনে । তখনকার  ফোন এক ফিট লম্বা হতো । ও কোথায় পেল মুঠো সমান মুঠো ফোন । ও কি টাইম ট্র্যাভেলার ছিল ?

 

-১৯৭৬ সনে The Capescott  Story নামে একটি বই লিখেছেন, Lester R Peterson নামে এক ব্যক্তি । এ বইটিতে সে সময়ের ইতিহাস ছবির মাধ্যমে তূলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে । কিন্তু একটি ছবি সবাইকে অবাক আর পেরেশান করে দিলো । ১৯১৭ সনের সেই ছবিতে সবাই সেই সময়ের হিসাবে সঠিক কাপড় পরেছিল । শুধু একটি লোক সবার থেকে আলাদা কাপড় পরেছে ।  ওর পোশাক, চুলের স্টাইল,  স্মার্টনেস সবই আধুনিক এই যুগের মত । ও পেল কোথায় এসব ? ওর পাশে বসা লোকগুলোও ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, যেন ওর এখানে থাকার কথা ছিল না । ও কি অদুর ভবিষ্যতের কেউ ?

0_77d3de_71a896fc_orig.jpg

– সন 2008 Chinese Archaeologists একটি বিশাল কফিন খুলেন । Shangsi দেশে একটি চারশত বছরের পুরনো  SI Qing নামে বিশাল কবরে কফিনটি  পাওয়া গেছে । কফিনের ভেতর তারা অবাক হয়ে দেখেন যে সেখানে একটি খুব ছোট ঘড়ি পাওয়া গেছে । আংটির সমান । সে ঘড়িতে সময়  ১০:০৬ এ স্থির হয়ে আছে । এবং ঘড়িটির পেছনে SWISS  শব্দটি ছাপ দেয়া ছিল । এটা একটি সুইস ঘড়ি । অবাক কাণ্ড এটা যে , তখন সুইজারল্যান্ড নামে কোন দেশই ছিল না । বর্তমানের দেশ সুইজারল্যান্ডের তৈরি এই ঘড়িটি সুদূর অতীতে কি করে গেলো ? দূর  অতীতে ওই ঘড়িটা কে নিয়ে গেলো ?

700_d87214296eee017607d10fcdbd156f10.jpg

চলবে………………

প্রিয় গাছ

Now Reading
প্রিয় গাছ

-শুনেছি সকালে ঘুম থেকে উঠে  প্রতিদিন কেউ যদি সবুজ গাছের দিকে তাকিয়ে থাকে, তাহলে তার চোখের জ্যোতি বেড়ে যায়, চোখে প্রশান্তি আসে । কিন্তু যতটুকু দেখেছি এই সবুজ শুধু চোখেই সতেজতা নয় মনেও আসে স্থিরতা , ফোকাস করার ক্ষমতা বেড়ে যায় । উৎফুল্লতা আসে । আসে উদ্দীপনা । ঘুম ভেঙ্গে সবুজ গাছের দিকে একমনে তাকিয়ে দেখুন সত্যিই আপনার মনে বহু পজিটিভ সেন্স সৃষ্টি হবে । যত বেশি সবুজ তত বেশি বিশুদ্ধতা । তত বেশি সুস্থতা ।

-কিন্তু আমাদের শহুরে জীবনে সবুজ পাওয়া ততটা সহজ নয় । চারিদিকে ইট কাঠের ভবন । বহুতল সব ভবনগুলো । উঠেছে, উঠছে, উঠবে । অধিকাংশই পরিকল্পনাবিহীন বহু পুরনো এবং ক্রমশও বেড়ে গিয়ে  বিশাল মেগা সিটিতে রুপ নেওয়া এই শহরটির কয়টি বাড়িতেই বা মন ভালো করে দেওয়া সবুজ পাওয়া যাবে । আরও দুটো পয়সার ইচ্ছায় এক ইঞ্চি জায়গাও কেউ ছেড়ে দিতে রাজি নয় প্রকৃতির জন্য । ভাগ্যবান ও রুচিশীল কিছু মানুষ ছাড়া আর প্রায় সকলকেই এপার্টমেন্ট ভবনের বারান্দা বা বেল্কনিতে সবুজকে আনার চেষ্টা করেন । কেউ কেউ ঘরেও মানানসই গাছ সাজিয়ে রাখেন । বনসাই, অর্কি্‌ড, পাতাবাহার,  মানিপ্ল্যান্ট ইত্যাদি গাছগুলো ঘরে ভালোই লাগে ।

Rooftop-Gardens-book-flowering-600x557.jpg

 

– ফ্ল্যাট বাড়িতে সবার কিন্তু আবার বারান্দা থাকেনা । তাই ইচ্ছে হলেও গাছ লাগানো সম্ভব হয় না । একফোঁটা সবুজের তৃষ্ণায় অনেককেই দেখিছি জানালায়ও দু একটা ছোট টব রাখেন । মানিপ্ল্যান্ট বা অর্কিড জাতীয় গাছকে প্রাধান্য দেন । মানিপ্ল্যান্ট গাছ নিয়ে একটি মজাদার মিথ শুনেছি যে, কেউ যদি মানিপ্ল্যান্ট গাছের একটি ডাল গাছের মালিকের অজান্তে ছিঁড়ে এনে ঘরে বা বাগানে লাগায়, তাহলে সেই লাগানো গাছটি  যত বাড়বে সেই ব্যাক্তির  টাকা বা সম্পদ তত বাড়বে । হা হা হা – কথাটা যদি সত্য হতো তাহলে বাংলাদেশের দারিদ্রতা সহজেই দূর করে দেওয়া যেতো । প্রধানমন্ত্রীকে আর এতো কষ্ট করে এতো প্ল্যান প্রোগ্রাম করে দেশকে উন্নয়নশীল থেকে ধনী দেশে রুপান্তরিত করার জন্য লড়তে হতোনা সকল প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে । তখন বিল পাশ হতো –প্রিয় দেশবাসী আপনারা দয়া করে একটু কষ্ট করে কোথাও থেকে মানিপ্ল্যান্ট ডাল জোগাড় করে লাগিয়ে নিন । এই কাজে ধনী হবার জন্য এক বছর সময় দেয়া হোল । এক বছর পর যদি কোন গরীব খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে এটাই ভেবে নেওয়া হবে যে আপনি সরকারের নিয়ম পালনে গাফিলতি করেছেন । অতএব আপনি এখন কাঠ গড়ায় । অর্ডার অর্ডার, আপনাকে এই মর্মে—- এই দণ্ডবিধি মতাবেক—-এই শাস্তি —-।  জাস্ট ফান । এ কথা শুনে গাছ কষ্ট পেতে  পারে । এবং সেই মানুষগুলো যাদের ক্ষেত্রে সত্যিই এমনটা হয়েছে বলে তারা মনে করেন ।

– আমার সকল কথার পেছনে গাছের উপকারিতার কথাই মুখ্য । পরোক্ষ আর প্রত্যক্ষ সকল ক্ষেত্রেই গাছের সর্বোচ্চ অবদান । আজকাল ছাদের বাগান মানুষকে খুব উৎসাহী হয়ে করতে দেখা যায় । এই সৌভাগ্যটুকু শুধুমাত্র ভবনের মালিকের থাকে । আমাদের মেয়র সাহেবরা রাজধানীকে  সবুজ করতে বেশ কিছু চমৎকার  পদক্ষেপ নিয়েছেন ।  উনারা ঢাকা সবুজ নগর  করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন । একদিকে যেমন ঢাকার তাপমাত্রা বাড়ছে , ওপর দিকে সবুজ কমছে । আশপাশের এলাকার চেয়ে ঢাকার তাপমাত্রা ৫ থেকে ৬ ডিগ্রি বেশি হওয়ায় গ্রীষ্মকালে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে ।   ঢাকার দুষিত বাতাসের কারনে শ্বাসকষ্ট সহ নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ । বিশেষ করে শিশুরা বেশি ভুগছে ।  মেয়ররা প্রতি বাড়ির ছাদে ও বারান্দায় গাছ লাগানোর পরামর্শ ও সাহায্য করে যাচ্ছেন । পুরনো ঢাকার পোস্তগোলা থেকে বাবুবাজার পর্যন্ত এলাকাকে হাতির ঝিলের মতই শুধু না লন্ডনের টেমস নদীর তীরের মত করে সুন্দর পার্ক তৈরি করে সবুজে ভরে দেবেন । দক্ষিনের মেয়রের পদক্ষেপটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য । যখনই এটা ভাবছি মনে মনে বলছি – ‘আরে, বাহ !!’

– এছাড়াও রাস্তার আশেপাশে, পার্কের খালি জায়গা, ফ্লাইওভারের নিচে ও বাড়ির ছাদে যদি মেয়ররা গাছ লাগানো হয়েছে । এভাবেই এই মেগা সিটিকে আরও সুন্দর করতে সবুজ করতে অনেক কাজই করেছেন উনারা ।

-এ বিষয়ে শিক্ষার্থী,  শিশু কিশোর সহ সকল  মানুষকে ভালোবেসে দায়িত্ব নিয়ে এ শহরকে সুন্দর করার প্রচেষ্টায়  হাত লাগায়   তাহলে রাজধানির সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি বড় উপকার হচ্ছে পরিবহন শিল্পকারখানা থেকে নিঃসৃত  কার্বন সহনীয় পর্যায়ে এসে যাবে । কার্বনডাইঅক্সাইডের কারনে সৃষ্ট ক্ষতিকর দিকগুলোও হ্রাস পাবে ।

-পরিবেশ রক্ষায় এই অতিপ্রয়োজনীয় অবশ্যকর্তব্য কাজটি করতে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগুতে হবে । আমার দেশের আমার রাজধানীর  এবং আমার পরিবার ও পরিবেশকে রক্ষার দায়িত্ব তো আমারই ।

 

প্রিয় গাছ

জলন্ত সূর্য মাথার উপর-

উত্তাপে জ্বলছে, হাঁটছে আর হাঁটছে সে তো শ্রান্ত পথিক,

ঘামছে  পুড়ছে  ভাবছে — দুখে মন ভেঙ্গে গেল যেই-

ওই তো একটি গাছ ডালপালা ছড়িয়ে দূরে আছে দাড়িয়ে,

ক্লান্তির শেষ ধাপে গাছের ছায়ায় এসে বসলো।

ভালোলাগা আবেশে হেলান দিয়ে চোখ বুজলো।

উত্তাপে জ্বলে যাওয়া এ শরীর নেতিয়ে পড়েছে দেহখানি,

গ্রীষ্মের খর তাপ এভাবেই পোড়াবে সকল দিনমানই।

কি করে কি করে সে বিধির আশিস যেন

ঝুপ করে পদপাশে এ যে পাকা আম ,

সুমিষ্ট সেই আম পরান জুড়িয়ে দিল শান্তি অনেক হোল প্রানে,

উপরে তাকিয়ে দেখে ফল ভরা আমগাছ চারিদিক ভরা ফল ঘ্রানে।

একদিন কোন এক সুধিজন, সজতনে লাগিয়েছে এক আম চারা,

আজ সেই চারা গাছ বৃক্ষ হয়ে, ছড়িয়েছে ডালপালা দিগন্ত জোড়া।

কেউ যদি কোনদিন লাগাতোনা এই গাছ পেতো কি সে গাছের ছায়া,

এটা নয় শুধু সকল সবুজ গাছ যেন এক উপকারী কায়া।

আমাকে বাঁচাবে গাছ, আমিও বাঁচাবো গাছ—

গাছ আমি সখ্য মিতালী,

মানবের বন্ধু অশেষ দিয়েছে

ভোরেছে দানে অঞ্জলী।

তুমি দাও ঔষধ তুমি দাও প্রসাধন

তুমি দাও আমাকে আহার,

ফুলের সুবাস দাও হাজারো রঙের

রঙিন পাতায় ভরা পাতার বাহার।

নিঃশ্বাস ফেলি সেতো তুমি আছ তাই,

তারপরও তোমাকে পোড়াই

তোমাকেই কেটে চিরে কত কিছু বানিয়ে,

আমাদের জীবন সাজাই।

তুমি ছাড়া একেবারে মিথ্যে জীবন

তুমি হোলে সত্য সাথী,

তুমি ছাড়া সব রঙ হারিয়ে যাবে,

তুমি যেন জীবন বাতি।

কেউ যদি কেটে ফেলে কোথাও একটি গাছ

হৃদয়ে দরদ মায়া জাগিয়ে,

পূর্ণ কোরে দিয়ো সে অভাবখানী,

অনুরোধ- চার চার গাছ লাগিয়ে।

পৃথিবী শোন—

গাছ এত কেটো না লাগাও চারা সবুজে সবুজে ভরে দাও,

শত দান প্রতিদান পাবে প্রতিক্ষণ ধরণীকে বাঁচাও বাঁচাও ।

images (1).jpg

 

পরিবেশ রক্ষায় এই অতিপ্রয়োজনীয় অবশ্যকর্তব্য কাজটি করতে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়  এগিয়ে যেতে হবে । আমার দেশের, আমার রাজধানী,‌  আমার এলাকার, আমার পরিবার ও পরিবেশকে রক্ষার দায়িত্ব তো আমারই । মানবতার জয়গান, সভ্যতার বিনির্মাণ, সুস্থ্যতার আহ্বান, সৌন্দর্যের প্রতিস্থাপন ও  জলবায়ু পরিবর্তনে এ কাজে আর এ কাজের সাহায্যে এগিয়ে আসতে  হবে পুরো পৃথিবীকেই ।

 

আজও কেন এমন হয় ৭–পর্ব [শেষ পর্ব ]

Now Reading
আজও কেন এমন হয় ৭–পর্ব [শেষ পর্ব ]

প্রথম পর্ব থেকে  ষষ্ঠ পর্বের পর  – [শেষ পর্ব ]

– এতক্ষন আমি ওদের দিকে নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে ছিলাম । যেন ওরা কি বলছে বা করছে সে ব্যাপারে আমার কিছুই করার নেই । ওরা ওদের ইচ্ছেমত ছটফটানির সাথে সাথে ওদের মনের বিচিত্র সব ভাব প্রকাশ করছে ।  কিন্তু হটাত এমন  ত্রাহি চিৎকার করছে-  এবার আর  চুপ করে স্ট্যাচু হয়ে  থাকা যায় না । খুব কাছাকাছি কেউ না থাকলেও পথিক বা আর কেউ এদিকে এলে শুনতে পেতে পারে । উঠে টেপ দিয়ে ওদের মুখ বেঁধে দিলাম । আরও আতংকিত হয়ে  বাঁধনগুলো  খোলার জন্য চরম ছটফট করছিল । কিন্তু সেটা তো  সম্ভব নয় । সময় নিয়ে বেশ করে বেঁধেছি ।

– যখন দেখল কিছুতেই কিছু হচ্ছে না তখন  আতংকিত বিস্ফারিত চোখে,  নিজের ইম্পরট্যান্ট পার্টটির দিকে তাকাচ্ছে দুজনেই । আর চোখের ভাষায় আমাকে কাকুতি মিনতি ভয় ধমক দয়াভিক্ষা  যা পারছে প্রকাশ করছে । আমি উঠে ওদের খুব কাছাকাছি এসে ধীর কোমল কণ্ঠে বললাম , ‘উহ , এত অস্থিরতার কি আছে ডিয়ার, যে অংশটিকে বেশি ভালবাসতে, বেশি গুরুত্ব দিতে, যাকে ছাড়া চলেই না, যার জন্য এতো কিছু– তাকে তো আমিও  খুব গুরুত্ব দিয়ে মায়া মমতায় জড়িয়ে নিয়েছি । মিথ্যেই অভিযোগ করছ ।‘

– আমি কাজলের পেন্সিলটা নিয়ে এগিয়ে গেলাম । একে একে দুজনের কপালে গালে বুকে পেটে লিখে দিলাম  আমি ধর্ষক, আমি খুনি, আমি অত্যাচারী,  আমি জুলুমকারী,  আমি ইভটিজার,  আমি মাতাল,  আমি জুয়াড়ি,  আমি সন্ত্রাসী  ইত্যাদি যা যা  ওদের কর্মকাণ্ড বলে শুনেছি  । যে সব ওরা নিষ্ঠার সাথে করে বলে শুনেছি ।  লিখছিলাম জোরে জোরে উচ্চারন করে , যেন ওরা শুনতে পায় । শুধু শুনতে পেলে তো হবে না দেখাও চাই । তাই  আয়নার দরকার । খুঁজাখুঁজি করে একটি আয়না পেয়ে গেলাম ।

-লিখা শেষ করে  আয়নাটি  এনে ওদের সামনে একটি চেয়ারের সাথে হেলান দিয়ে জুত মতো বসিয়ে দিলাম । ওরা এটায় নিজের নিজের প্রতিচ্ছবি দেখুক ।

-দুজনেই অসম্ভব অবিশ্বাস্য চোখে আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে । দেখছে  বহু মিশ্রিত অনুভবের ঘোলাটে চোখে । একটি পূর্ণ নারী,  বালিকা নারী, ও নারী শিশুর  দেহ মন হৃদয় আর আত্মাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে ব্যাবচ্ছেদ করে এবং কখনও কখনও মেরে ফেলে যারা,  তাদেরই আত্বজ, তাদেরই সাথী, তাদেরই অনুগামী এই বিভীষিকাময় নারকীয় কিট – দেখুক নিজেকে । কি তার প্রাপ্য ।  সেই ভিকটিম নারীটির কষ্টের গভীরতম অনুভবের কিঞ্চিৎ অনুভব করুক ।

-আমার কাজ শেষ । এই ঘরে আমার চিহ্ন গুলো মুছে দিলাম । আমাকে বেরুতে হবে । আলো ফোটার আগেই প্রথম বাসটি ধরতে হবে ।  আবার ওদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে চোখের ওপর চোখ রেখে বললাম , ‘জানিনা তোমাদের ভাগ্যে কি আছে  ? কি হবে এর পরে  ?  আশাকরি শুধরে যাবে । আরও কঠিন কোন শাস্তি হতে পারে এই ভাবনা মাথায় রেখে । আর শুধরাবে তাদেরও,  বিষাক্ত মনের সেই সব পাপীকে । যারা তোমাদের দলভুক্ত । তোমাদেরই মত পিশাচ । হা,  সবচেয়ে বড় কথা,  আদৌ যদি  পৃথিবী তোমাদেরকে  আরও কিছুদিন চায় ।‘

-আমার ব্যাগ নিয়ে বের হবার সময় ওদের গোঙানির শব্দ কানে আসছিলো । যেন কোন আহত  হিংস্র পশু । অবশেষে পশুদের আওয়াজ পশুদের মতই হচ্ছে ।  পেছনে না তাকিয়ে  বেরিয়ে এলাম । বাইরে ঝোপে লুকিয়ে রাখা আমার ব্যাগ উঠিয়ে নিলাম ।

-তখন শেষ রাত একটু পরেই আজান দিবে । বিলের পাড় ধরে আসার সময় ব্যাগটা পায়ের কাছে রেখে চারিদেকে তাকিয়ে আমার প্রিয় জায়গাটিকে দেখলাম ।  যেখানে এলে আমার মন ভালো হয়ে যেতো । দুহাত দুদিকে মেলে দিয়ে চোখ বন্ধ করে নির্মল বাতাসটুকু টেনে নিলাম নিজের  ভেতর । ঝির ঝির করে বাতাস বয়ে যাচ্ছে । অপুর্ব  আনন্দময় অনুভতি হচ্ছে আমার । প্রকৃতিও যেন  জেনে গেছে  আমি কি করেছি । প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজ তো প্রকৃতিও পছন্দ করেনা । যারা বিধাতার নিয়মের বাইরে, অকল্যাণ – যা কিনা তাঁর সৃষ্টিকে, অনৈতিকতায় আহত করে, ধ্বংস করে,  স্বেচ্ছাচারিতা করে, তাঁদের শাস্তি তো অনিবার্য ।  তাই তো প্রকৃতি  আমাকে আদরে আদরে কোমল পরশে সোহাগ করছে । চাঁদ আর তারাটিও যেন খুব কাছে চলে এসে হাসছে, রাতের ফোটা ফুলগুলোও সুগন্ধে জড়িয়ে নিচ্ছে ।

-জানিনা কবে আবার এই গ্রামটিকে দেখতে পাবো । আদৌ দেখতে পাবো কি ? এই বিশাল প্রশ্ন নিয়ে আমি গাড়িতে উঠলাম ।

-বাস ছুটছে ঢাকার পথে । নিজেকে নির্ভার মনে হচ্ছে ।  সবাই জানে গতকালই আমার বাড়ি  চলে গেছি আমি । গতকাল ভোরে সুমিদের বাড়ি গিয়েছিলাম । যাবার আগে ওকে একটু দেখবো আর কিছু কথা বলবো ।  আমাকে দেখেই ওর মা তেড়ে এলো । আমাকে টেনে এক কোনায় নিয়ে রাগত স্বরে জানতে চাইলেন আমি কেন আবার এর মাঝে আসছি । আমাকে কিছু বলতেই দিচ্ছিলেন না । আমার কোন কথা শুনতে তিনি রাজি নন । উনার ভালো উনিই বোঝেন । এবং উনার মেয়ের বিষয়ে আমি যেন কক্ষনও মাথা না ঘামাই  । অবশেষে, আমি আজ চলে যাচ্ছি এটা বুঝিয়ে বলার পর  সুমির সাথে কথা বলার অনুমতি পেলাম । সফুরা আমাকে ইশারায় দেখিয়ে দিলো ঘরে যেখানে ওর মেয়ে আছে ।

-ঘরে ঢুকে দেখি বেশ বড় একটি মাত্র কামরা । ঘর বলতে এই একটি মাত্র কামরাই । সুমিকে দেখতে পাচ্ছিলাম না । ওর মা ইশারায় কোনার দিকে দেখালেন । দেখলাম এক ভীষণ কষ্টময় দৃশ্য ।  ওর মা ওকে ঘরের এক কোনায় চৌকিতে শুইয়ে রেখেছে ।   কাপড় ঝুলিয়ে দিয়ে চৌকিটা আড়াল করে রাখা হয়েছে– যেন কেউ ঢুকেই ওকে দেখতে না পায়  । এখানেই থাকতে হবে ।  স্কুল বা অন্য কোথাও যাওয়া  তো দূর,  উঠোনে যাওয়াও মানা । সুমি কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়েছিল । আমাকে দেখেই উঠে বসলো । চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে । শুকিয়ে গেছ । শরীরের এখানে ওখানে ব্যান্ডেজ । হাঁপাচ্ছে বসে বসে ।

-এখানে এভাবে পর্দার আড়ালে শুইয়ে রাখার অর্থ  কি ?  অবাক হয়ে এর কারন জানতে চাইলে যা শুনলাম , তা হল যতদিন না ওর উপর হওয়া  লজ্জাজনক নির্যাতনের  সব  চিহ্ন গুলো মিলিয়ে যায় ততদিন সুমিকে এভাবেই বন্দি হয়ে থাকতে হবে । যেন দুনিয়া জানতে না পারে এ নির্মম বেদনাদায়ক  লজ্জার কাহিনী । মেয়ে বলে কথা । ভবিষ্যৎ আছে না ওর ? সুমির আর সুমির মায়ের এই বুকভাঙ্গা  নিঃশব্দ  কান্না,  আহাজারি,  এই ক্ষরন  আমাকে পায়ের আঙ্গুল থেকে মাথার তালু পর্যন্ত শরীরে মনে ভাবনায় চেতনায় একেবারেই এক আলাদা একজন মানুষে পরিনত করলো । যে শুধু কোমলই নয় কঠিনও হতে পারে ।

– ওর মা সরে গেলে ওর পাশে এসে বসলাম । ওকে একা পেয়ে কিছু কথা  বলেছিলাম,  ‘তোর জন্য তেমন কিছু তো করতে পারলাম না সুমি । তোকে সুবিচার দেয়ার খুব ইচ্ছে ছিল । ইচ্ছে ছিল তোর জন্য এমন কিছু করি যেন তুই শক্ত ভাবে নিজের পায়ে দাড়িয়ে  কিছু করতে পারিস । জানিনা কখনও সে ইচ্ছা পূর্ণ হবে কিনা ।‘ সুমি করুন ছলছল চোখে তাকিয়ে কি বুঝল কে জানে । মানসিক ভাবে অথর্ব মেয়েটির চিবুক ধরে বলেছিলাম , ‘শোন সুমি , আজ কাল পরশু বা যেদিনই হোক- ওই দুই বদমাশ কুকুরদের নিয়ে  একটা জিনিস দেখবি । শুনবি । ভেবে নিস এটা তোর জন্য আমার কিছু একটা করার চেষ্টা । সাবধান কাউকে কিছু বলতে যাবিনা । শুধু চুপচাপ দেখবি আর শুনবি ।

-সুমি আমার আরও কাছ ঘেসে বসলো । ওর নিষ্প্রভ চোখে একটু যেন আলো ফুটেছে । আমি খুব মমতায় ওর হাতখানি ধরে বলতে লাগলাম,   ‘শোন সব চেয়ে জরুরি যেটা,  লিখা পড়ার ব্যাপারে এতদিন কি কি বলেছিলাম মনে রাখিস । পড়বি খুব পড়বি । বড় হবি । যতটা হলে মনে প্রশান্তি আসে, উদারতা আসে, শুদ্ধতা আসে ।  এবং সেইসাথে ময়লা আবর্জনা আর সব পোকামাকড় ঝেড়ে মুছে সাফ করতে পারিস চাইলেই । ঠিক ততটুকু বড় হতে হবে তোকে । এই কষ্টকে কষ্টে নয়,  হতাশায় নয় । নিজেকে বিশাল করতে এই কষ্টকে শক্তিতে রূপান্তরিত করবি । জানিনা কতটুকু বুঝতে পারছিস । কিন্তু মনে রাখিস কথাগুলো,  কোন একদিন বুঝে যাবি ।‘

-আমার কথায় ওর দুচোখে একটুকরো আশার আলোর সাথে কষ্টের বন্যার অবিরল ধারা নেমে এলো ।  এবার হটাত ও আমার হাঁটুর উপর মাথা রেখে  হু হু করে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলো । সাথে আমারও চোখের পানি টুপটুপ করে পড়ছিল ওর মাথায় ।

 

©সেলিনাজান্নাত

ঢাকা-রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আজও কেন এমন হয় পর্ব—৬

Now Reading
আজও কেন এমন হয় পর্ব—৬

– ঘরের দরজা খোলা । শয়তান গুলো আমার জন্যেই খুলে রেখেছে  হয়তো । আমি ঢুকতেই বাদল দরজাটায়  ছিটকিনি লাগিয়ে দিলো । আমি দেখলাম ঘরে একটি খাট । খাটের দুইপাশে আলমারি আর টেবিল ।  খাটের সামনে মেঝেতে মাদুর পাতা । ওরা মেঝেতে বসে বসে মদ গিলছিল । আমাকে দেখে দিগুন উৎসাহে দুজনে খাটে হেলান দিয়ে আয়েশ করে ধূমপান ও শূরা পান চলছিলো । ধোঁয়ায় ঘর ভরে আছে । দুর্গন্ধ আর ধোঁয়ায় আমার কাশির সাথে বমিও আসছিলো ।

– মুখে বিজয়ের হাসি হেসে অভি বলল,   ‘এলে তাহলে ।’

-‘উপায় কি ছিল  আর ?’

-‘হুম , বুদ্ধি যত জলদি হবে তত ভালো হবে , মনে রেখো ।’

-‘যেটা করা উচিত সেটাই তো করে ফেলা চাই । ‘ বলে কাশতে লাগলাম । ইসস কি ধোঁয়া যে খেতে পারে ।

-‘কাশি  হচ্ছে  তাই না ? সুন্দরী এমন ধোঁয়া সহ্য তো করতেই হবে ।  ‘এসো বস ।‘ ওর পাশে বসতে  ইঙ্গিত করলো অভি ।

-‘লম্বু বলল, টানতেও হবে । এই নাও একটু খেয়েই দেখো দারুণ জিনিস ।‘ বলে ও ওর হাতের সিগারেটটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে ।

-আমি স্পর্শের দুরত্বে বসে কাশতে কাশতে  বললাম   ‘সময় দাও, তোমাদের চেয়ে বড় স্মোকার হয়ে দেখিয়ে দেব । আজ থাক ।’  মনে মনে ভাবছি ওদেরকে কিভাবে সামলাবো । ওরা ক্রমশই মাতাল হচ্ছে । আর আমার ভেতর ভয় বাড়ছে । আমি যথেষ্ট সাহসী মেয়ে । তাই এখানে আসতে  পেরেছি । জীবন মান হাতে নিয়ে ।  তারপরও–।

–  ‘কি সুন্দরী , এতো দূরে বসে কেন ? কাছে এসো,  একটু ঢেলে টেলে দাও, তোমার জন্য এতদিন অপেক্ষা করেছি , একটু তো রহম করো । হা হা হা । হা হা হা । দুজন কি কি  যে বলছে আর হাসছে ।

– আমি সহাস্যে বললাম,  ‘নিশ্চয়ই , আগে খাবারটা খেয়ে নাও ।‘

– ‘পরে  খাবো ।‘  অভি বলল ।

-‘এতো ভালো করে রেঁধেছি ,শুধু তোমাদের জন্য । সেই কোন সকালে গঞ্জে গিয়েছি । কত কি এনে রেঁধেছি । গরম জিনিসটা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে যে । এতো কষ্ট করে কি হোল  বল ?’   মিষ্টি হেসে বললাম ,’ তিনজন একসাথে ড্রিংক করবো তারপরে ,প্লিজ ।‘

-অভি বলল, ‘না না , পরে  খাবো । আগে তোমার সাথে বসে কথা বলি । খাবার তো জরুরি নয় ,আসল জিনিস তো তুমি ।‘

-আমি কৃত্তিম দুখের ভাব করে বললাম, ‘জানি তোমরা পয়সাওয়ালা আমার হাতের খাবার কি আর ভালো লাগবে ?’

– ‘ আরে তা নয় , কি বলছ । আয় তো অভি খেয়ে নি । সেটাই ভালো ।‘ বাদল বলল । ‘খিদেও পেয়েছে । কই সাজিয়ে দাও ।‘

-আমি মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে   ভেতর থেকে প্লেট বাটি এনে খুব যত্ন করে ওদেরকে আপ্যায়ন করতে লাগলাম । ওরা যখনই না বলছে অমনি  আমি আরও এক চামচ খাবার পাতে তূলে দিতে লাগলাম । অভি খেতে খেতে অন্য টিফিন বাটির দিকে ইঙ্গিত করে বলল,  , ‘ওটায় কি ? ওটা তো খুললে না । ওখানে আবার কি খাবার ?’

-‘আমার হৃৎপিণ্ডে কেউ যেন খামছে ধরল । কষ্টে নিজেকে সামলে  আমি মধুময় হেসে বললাম, ‘ ওটা ? ও আচ্ছা ।  আমার প্রিয় গেস্ট, তোমরা কি জানো না, প্রিয়জনকে খাবারের পর কি দিতে হয় ?’

-ওরা বোকার মত তাকিয়ে থাকলো চোখে প্রশ্ন নিয়ে । আরে অবুজ ভালো মানুষেরা  তোমাদের জন্য পায়েস আর মিষ্টি এনেছি ।  খাবারের পর সেটা দিচ্ছি ।‘

-‘ভালো মানুষ ?’ কথাটা অভি হজম করতে পারল না । নিজেই নিজের প্রতি সন্দেহে কনফিউজ চোখে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো । কিন্তু মাতাল মন মাতাল শরীর বেশি চিন্তা করতে পারল না ।

-‘ বাহ বাহ ‘ । বাদল খুব খুশির গলায় বলল ,  ‘শিক্ষিত মানুষের কাজই আলাদা । কেমন করে  কি করা উচিত ওরা ভালো জানে ।‘

-‘হুম ঠিক । এবার অভি বলল, চমৎকার খাবারের সাথে যদি চমৎকার সুন্দরী নারী থাকে তো তার তুলনা হয় না । এর চেয়ে সুখ আর কি হতে পারে ?‘ আচমকা হাত বাড়িয়ে আমার হাত টেনে ধরে বলল ,  ‘তুমিও খেতে বসে যাও সুন্দরী । সত্যি চমৎকার রেঁধেছ ।‘

–   ওদের সাথে খাবো না বলেই আমি বাসায় আগেই খেয়ে নিয়েছিলাম । আমি কষ্টে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম , ‘আজ রান্নার খাটুনিতে খুব খিদে পেয়েছিলো তো খেয়ে এসেছি । তোমরা মুল খাবারটা শেষ করো । মিষ্টি একসাথে  খাবো ।‘ আর কিছু না বলে দুজন সানন্দে গোগ্রাসে  গিলছে । মদ আর খাবার ।

– আমি মাদুরের এক কোনায় বসে বসে ওদের দেখছি । আর মনে মনে মিনিট  গুনছি । পাঁচ মিনিট , দশ মিনিট , পনর মিনিট । দুজনেরি হাত আস্তে আস্তে  স্লো হয়ে আসছে । মুখে খাবার দিতে গিয়েও পারছে  না । ঢলছে । কাঁপছে ।

– নিজেদের এই অবস্থা দেখে ওরা আমার দিকে বোকার মত তাকাল ।  ‘কি হল , হাত কাঁপছে কেন ? ম্যাডাম কি খাইয়েছ ? কি ছিল খাবারে ? শক্তি পাচ্ছি না কেন ?’ একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে , প্রশ্ন করছে কি হচ্ছে ?

– আমি নিরাপদ দুরত্বে বসে আছি । হাত বাড়িয়ে আমাকে ছুঁতে চাইলো । ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসার কারনে হাত তুলতে পারছিল না । ভয়ংকর খুনে চোখে তাকিয়ে আছে ওরা ।

– হাসছিলাম । ঘৃণার হাসি । প্রতিশোধের হাসি । বিজয়ের হাসি । হাত বাড়িয়ে ওরা আমাকে ধরতে চাইলো বার বার । আমি নাগালের বাইরে  ঠায় বসে তাকিয়ে থাকলাম ঠাণ্ডা চোখে । ওরা এক সময় ঢলে পড়লো জ্ঞান হারিয়ে ।

-ওদের চেতনা নেই । এবার আমাকে দ্রুত কাজ সারতে হবে । অপর টিফিন বাটিটা খুললাম । ভেতর থেকে বের করলাম  দড়ি,  স্কচ টেপ  কাজল পেন্সিল । এবার ওদের শরীর থেকে কাপড় গুলো খুলে নিলাম । লজ্জায় ঘৃণায় গা রি রি করছে আমার । এবার দড়ি দিয়ে দুজনের হাত পা বেঁধে ফেললাম ।  খাটের দুই পায়ের সাথে দুজনের কোমর বাধলাম । এবার একটি দড়ির টুকরো নিয়ে দড়ির একমাথা  দিয়ে অভির এবং  অন্য মাথা দিয়ে বাদলের  বিশেষ অঙ্গকে বাধলাম ।

– এরপর কাজল পেন্সিলটা হাতে নিয়ে  বসলাম । ওদের সামনে । পানি ছিটিয়ে অপেক্ষা করছিলাম ওদের সচেতন হবার ।

–  ওরা আস্তে আস্তে চেতনা ফিরে পেতে শুরু করলো । এবং যখন বুঝল যে , ওদের সাথে কি করা হয়েছে,  আমাকে ওদের ডিকশনারিতে যত গালাগালি আছে সব উজাড় করে দিলো । তার পর ভয় । ওদের কতোটা ক্ষমতা আছে আর ওরা কি কি করতে পারে তার ফিরিস্তি দিতে লাগলো ।

– আমি নির্বাক বসে আছি । এতো কিছু বলেও  কাজ হচ্ছে না দেখে কাকুতি মিনতি শুরু করলো । অবশেষে চিৎকার জুড়ে দিলো ।

 

চলবে………………।

 

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা- রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং

 

 

আজও কেন এমন হয় পর্ব—৫

Now Reading
আজও কেন এমন হয় পর্ব—৫

– গ্রামের জন্য রাত এগারোটা অনেক রাত। একঘুম হয়ে যায় এখানে। আমি আর সুমিই যা একটু রাত  জাগি । পড়াশুনা  করি । গল্প করি । আমি গান শুনি ও ছবি আঁকে । আমি আরেকটু অপেক্ষা করবো ভাবলাম। সফুরাও এসে কিছু বলে গেলো না। মনে হয় খুব ব্যস্ত ছিল । ঘুমিয়ে পড়েছে । গত দুবার তো বলে গিয়েছিল যে সুমি আজ আসবে না । আজকে কি ভুলে গেছে ?

– চোখ ভারি হয়ে আসছিল। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম রাত পৌনে বারোটা বাজে। ইচ্ছে হচ্ছিল না একা খেতে, তবুও প্লেটে খাবার নিয়ে কয়েক লোকমা খেলাম। আর না, রেখে দিলাম। ওকে রেখে খেতে মন চাইছে না । এখন কেন যেন  মনটা হটাতই কেমন কেমন যেন করছে। খাবারেও  রুচি নেই । ওকে এতটা মিস করছি কেন ? আমিও পাগল , সকালে বকে দিলেই হবে । হুট করে আসবে না, এটা কি ?

– ঘুমিয়ে পড়াটাই বেটার মনে হল । কাল সকালে সফুরাকে ডেকে বলে দেব সুমি না এলে যেন জানিয়ে দেয় । আর সুমি আসতে  না পারলে যেন  অন্য কাউকে রেখে যায় । আজকাল একা থাকাটা মোটেই ভালো লাগে না । গা ছম ছম করে ।  পাজী ছেলেগুলোর কথা মনে এসে যায় । তখুন খুব অসস্থি হয় । আজ আর কিছুই করার নেই । অতএব আলো নিভিয়ে শুয়ে  পড়লাম । পুরোপুরি অন্ধকারে আমি থাকতে পারি না । তাই দুই রুমে ও বারান্দায় সব সময় ডিম লাইট জ্বালিয়ে রাখি ।

– ঘুমিয়ে পড়লাম। হটাত যেন একটা আওয়াজ শুনলাম মনে  হল । চমকে জাগলাম । আধো আলোতে চারিদিকে তাকালাম, আর কোন শব্দ নেই । একটু পর আবারও হোল । এবার বারবার টোকার শব্দ । দরজায় কেউ ? উঠে বসলাম, সুমি হয়তো । কোন কারনে আসতে দেরি হয়ে গেছে ?  না তো, জানালায় টোকা পড়ছে । ও তাহলে সফুরা হবে। বলতে এসেছে সুমি আজ আসবে না । আমি উঠে আলো জ্বালালাম,  জানালা খুললাম । তাকালাম অন্ধকারে । নেই কেউ ।

– কিন্তু কেউ তো টোকা দিয়েছে । আমি মৃদু গলায় বললাম, ‘কে সফুরা ? সুমি ? সুমি তুই ?’ কাউকে তো দেখছি  না । সফুরা টোকা দিয়ে কোথায় গেলো । এতো রাতে এমন ফাজলামি করার মানে কি ?

-এবার  আমাকে প্রচণ্ড অবাক করে যে লোকটি সামনে এসে দাঁড়াল – সে অভি । আমি বিস্মিত ভয়ার্ত কণ্ঠে বললাম, ‘তুমি ? তুমি এখানে কি করছ ?’  উত্তরের অপেক্ষা না করে আমি দ্রুত জানালা বন্ধ করতে চাইলাম । তখুনি অভি দ্রুত একটা হাত গ্রিলে ঢুকিয়ে জানালার পাল্লা আঁটকে দিলো । আমি তড়িতাহতের মত পেছনে সরে এলাম । কি চায় ও ?  কি চায় ওরা ?

-অভি  তেরছা  চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল , ‘ কি সুন্দুরি , কেমন আছো ? মনে নেই — তোমাকে বলেছিলাম আমাদেরকে দাওয়াত দাও , শুনলে না তো ?’

– আমি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললাম, ‘ প্রশ্নই উঠে না । তমাদেরকে দাওয়াত করে খাওয়াবো এটা কেমন কথা ? বাজে কথা বল না  ছি , ছি , এমনটা  ভাবো কি করে তোমরা ? এমন কথা বলছ কোন সাহসে ,চলে যাও ।‘

– ও আর  একটু কাছে সরে এসে বলল,  ‘শুনবে না  ?’

– আমি আঙ্গুল তূলে  কঠিন ভাষায় বললাম, ‘ দূর হ কুকুরের দল, আমার সামনে থেকে সর । শয়তান বদমাশ গুন্ডা । তোদেরকে পুলিসে যদি না দেই তো দেখিস । বজ্জাত ছেলে ।

-‘পুলিশ ? ভালোই বলেছ । যাও না একবার মন যদি চায় । প্রয়োজনে বাইকে করে পৌঁছে দেব । বড্ড দূর কিনা ।‘ বলে হাসতে লাগলো ।

-‘সব পুলিশ তোদের চাটুকার নয় । তোদের মত শয়তানদের কিভাবে শায়েস্তা করতে হয় সেসব পুলিশরা ভালোই জানে ।‘

-‘ ওকে ।‘   হাল ছেড়ে দেয়ের ভঙ্গিতে  বলল অভি, ‘জানতাম সুন্দরী  এটাই তুমি করবে । কিছুতেই হাতে আসবে না। এরকম দুয়েকটা ঘাড় তেড়া  মেয়ে পাওয়া যায় । নানান কথা তাঁদের । নানান ভাবনা । আর  তাই তোমার ঔষধের ব্যবস্থা করে এসেছি ।‘

-‘ বাজে কথা না বলে যাও ।  দুর হও । সবাইকে ডাকবো এখনি ।‘

– হা হা হা । এ কথায় অভি খুব হাসল ।  ‘ডাকবে ? ডাকো ? শুধু রাতে নয় , দিনেও যদি মাঝ রাস্তায় দাড়িয়ে আমাদের বিরুদ্ধে কিছু বল তো দেখবে আমাদের নাম শুনলেই মুহূর্তেই সব ফাঁকা । কোথাও কেউ নেই । দেখবে নাকি একবার পরিক্ষা করে ?  বাজে কোথায় সময় নষ্ট করতে চাই না । যা দেখাতে এসেছি তা দেখে নাও ।‘  ও পেছনে তাকিয়ে শিস বাজাল । অমনি অন্ধকার চিরে আলোয় বেরিয়ে এলো বাদল ।

– আমি তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছি কি দেখাবে ওরা ? ভালো করে তাকালাম । দেখলাম । দেখে আমি একেবারে বজ্রাহত। বাদল সুমির হাত ধরে আছে । সুমির হাত বাঁধা । মুখে রুমাল বাঁধা । সুমি হাত ছাড়াতে ছটফট করছে । ও আতঙ্কে কাঁপছে । সেই সাথে আমিও চরম আতঙ্কিত হয় তাকিয়ে আছি ।  আমি ওদের দুজনের দিকে তাকালাম । কুৎসিত হাসি হাসছে ওরা ।

– অভি খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল ,  ‘তোমার শাস্তি হিসাবে আজ আমরা লাল ফিতা নিল ফিতাকে  নিয়ে যাচ্ছি ম্যাডাম, আজকে ও  আমাদের আদর যত্ন দেখভাল করবো । আজকের মেহমান ।‘

–  ওর পেছন থেকে বাদল বলল ,  ‘মেহমানদারী , সুন্দরী মেডাম । মেহমানদারী । তোমার মত  কৃপণ নই যে মেহমানদারীকে ভয় পাবো । ‘ কথাটা বলেই খিক খিক করে হাসতে লাগলো ।

‘-ছাড়ো , ছাড়ো  ওকে।‘ আমি ফ্যাস ফ্যাসে  গলায় বললাম । অভি মুখ বাকা করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো । এবার আমি মিনতি শুরু করলাম। কান্নায় আমার গলা বুজে আসছিলো।  ‘প্লিজ,  ওকে ছেড়ে দেও,  প্লিজ।‘

– ওরা আমার কোন কথাকেই  পাত্তাই দিলো না । আমার ধমক আমার কান্না মিনতি অনুরোধ আমার ভয় দেখানো। সবই ওদের কাছে ছেলেমানুষি যেন ।

– হটাত করে অভি গম্ভীর হয়ে বলল ,  ‘চুপ করো , কথা শোন । আজ আমরা যাচ্ছি লাল ফিতা নিল ফিতাকে নিয়ে ।আর  তোমাকে সাত দিন সময় দিচ্ছি । এর মধ্যে যদি মত না পালটাও তাহলে তুমি ভাবতেই পারবেনা  আর কি কি করবো । আর একটা কথা, যদি তুমি এ বিষয়ে কাউকে কিছু বল তাহলে—ও হাত দিয়ে কুচি কুচি করে কাটার  ভঙ্গি করলো। ‘এই ভাবে । হা এই ভাবে, লাল ফিতা নিল ফিতাকে টুকরো করবো । আর ফিতা গুলো তোমাকে উপহার হিসাবে পাঠিয়ে দেব । তারপর তুমিও আমাদের জন্য লাল নিল ফিতা তোমার ওই লম্বা চুলে বেঁধে নেবে ।‘ কথা গুলো বলেই  অভি নিজেই  জানালার পাল্লা টেনে বন্ধ  দিলো ।

– আমি নিরুপায় রাগে ক্ষোভে  ভয়ে  লজ্জায় আধ্মরা হয়ে আছি । এখন কি করবো ? কি করা উচিত ? কাকে বলবো ? থানায় যাবো ? আব্দুল চাচার বাড়ি যাবো ? সুমিদের বাড়ি যাবো ? বেরিয়ে কারও সাহায্য চাইবো ? আর বাইরে যাবোই বা কোন সাহসে । বাইরে আজ কে কোথায় ওঁত পেটে আছে কে জানে ? আর  কিছু করতে গেলে সুমিকে না মেরে ফেলে । হয়তো আমাকেও ।

– কত কি ভাবছিলাম । কত উপায়, কত পথ । যেটাই ভাবছিলাম সাথে সাথে চাচির কথা গুলো মাথায় আসছিলো । চাচির কথায় যদি সত্যতা একটুও থাকে এরা খুব ভয়ঙ্কর একটি দল । এ গাঁয়ের অলিখিত স্বেচ্ছাচারী রাজত্ব ওদের । কাছের শহর আর কাছের থানাটিও বহু দূরে । আর কাছে থাকলেই বা  কি এমন ফায়দা হতো  তাতে ।  পুলিশ বাবারা ওদের কাছে ঘন ঘন আপ্যায়িত হত আর পকেট ভর্তি করতো । আমার মত সামান্য এক স্কুল শিক্ষয়িত্রী  কি করতে পারে ?  আর কতটুকু করার ক্ষমতাই বা  রাখে ।

– সারাটি রাত জুবু থুবু হয়ে বসে বসে ভাবলাম । আমি অনেক পথেই যেতে পারি । কিন্তু তাতে সফলতার সম্ভাবনা জিরো । যাদের হাতে আইন এবং অগুনিত টাকা তারাই তো এলাকার একচ্ছত্র হুকুমের মালিক হতে পারে মন চাইলেই । যাদেরকে প্রচলিত নিয়মে কিছু করা না যায় তাদেরকে কে কিভাবে কি করার ক্ষমতা রাখে । তাদেরকে কিছু করতে হবে একেবারে কঠিন কোন পদ্ধতিতে । এই দূর প্রত্যন্ত গ্রামে ওদেরকে এসে রুখে দেবার ক্ষমতা কি কারও আছে ?

– ঘুম তো দূর ,  দমবন্ধ অস্থিরতায় সময় যেন স্থির হয়ে আছে ।

– খুব ভোরে । তখনও আলো ফোটেনি । দরোজার বাইরে কারও কান্নার আওয়াজে চমকে লাফিয়ে উঠলাম। কণ্ঠ শুনে  মনে হল সুমি ।  দরজা খুলতে সাহস হল না । খুব কাঁদছে । এ সুমিই । হা এটা ওরই কণ্ঠ । সাবধানে জানালা দিয়ে দেখলাম ।  হা সুমিই তো । বসে আছে  মাটিতে ।  কাঁদছে । চারিদিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম আসে পাশে কেউ নেই ।  আমি খুব সাবধানে ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে সুমিকে টেনে ঘরে ঢুকিয়ে দ্রুত দরজা লাগিয়ে দিলাম । ওকে খাটে বসিয়ে আহত বিস্ময়ে দেখলাম,  ওর সে সকল চিহ্ন গুলো । যা বয়ান করে তার উপর যৌন নির্যাতনের দুর্বিষহ কাহিনী । যা একটি মেয়েকে সারা জীবনের জন্যেই  হয়তো শারীরিক মানুষিক আত্মিক ভাবে শেষ করে দেয় । অথর্ব করে দেয় । হৃদয় মনকে এমনই ছিঁড়ে ছিঁড়ে রাখে যে  সেই দুঃস্বপ্ন গুলো দেখতে দেয় না নতুন কোন মধুময় স্বপ্ন ।

-ওর সাথে সাথে আমিও কাঁদছিলাম। ভাবলাম সফুরা আসুক , তিনজন একসাথে থানায় যাবো । এবং যেভাবেই হোক আমি লড়বো । সুমির হয়ে লড়বো । অবশ্যই লড়বো । ওকে সুবিচার দিবই । ওকে নিয়ে শহরে যাবো । যতটুকু করার তা  করবো । তার চেয়ে বেশি করতে চেষ্টা করবো ।

-সকালে সফুরা যখন কাজে এলো আমি কিছু বলতে যেতেই ও একপলকে সব বুঝে গেলো । দ্রুত ও  দরজাটা বন্ধ  করে সুমিকে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগলো । আমি ওকে বললাম চল থানায় যাই ।  কথাটা শুনে সুফুরা কান্না থাময়ে মিনতি ভরা গলায় যা বলল , তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে , সফুরা কিছুতেই এম পির লোকদের সাথে ঝামেলায় যেতে রাজি নয় । কারন ও এ বিষয়ে নিশ্চিত যে ও এম পির লোকদের বিরুদ্ধে  কিছু করতে গেলে তারা ওর পুরো পরিবারকে শেষ করে দেবে । ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেবে । গ্রাম ছাড়া করবে । কিম্বা কোন মিথ্যা মামলায় ফাসিয়ে দেবে । তার উপর মেয়ের সম্মান । তার তো  বিয়ে দিতে হবে । মেয়ের বদনাম বা নিজের ক্ষতি , কোনটাই ও চায় না ।

– তারপরও আমি জোরাজুরি করছি । এতো বড় অন্যায়ের পরও চুপ থাকা বা ওদেরকে হাতে নাতে ধরিয়ে দেবার সুযোগটা হাতছাড়া করাটা মারাত্বক ভুল । বেশি জোরাজুরি  করতেই সফুরা আমার পা জড়িয়ে ধরল । অনুনয় করতে লাগলো  আমি যেন কিছুতেই  এ ব্যাপারে কিছু না করি  । এবং কখনওই  মুখ না খুলি । আমি সফুরার হাত ধরে কিছু বলতে চাইলে ও ঝটকা মেরে আমার হাত ছাড়িয়ে কঠিন কণ্ঠে বলল, ‘টিচার আফা আপনের আর আমার মাইয়ার জন্যি কিছু ভাবতে হইব না । আমার মাইয়ার ভালো আমি বুঝি  । আপনে কে ?’ খুব রেগে কথাগুলো বলে ও আহত সুমিকে টেনে নিয়ে চলে গেলো ।

– আমি কিছু করতে গেলে ওর মেয়ে নয় শুধু ওর পুরো পরিবারই ভুগবে । আর আমি যেন ওর মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট না করি । এই যদি ওর বক্তব্য হয় তাহলে ওর দোষ কি দেয়া যায় ?

– এম পি সাহেব পারিবারিক ভাবেই  বহু আগেই  এরা অর্থ আর  ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত । নৈরাজ্য সৃষ্টি করা ছেলেগুলো উনার জ্ঞাতে কি অজ্ঞাতে এসব করছে এটা জানা কঠিন । ওরা মা মেয়ে চলে যেতেই আমি ভাবতে বসলাম সামনে যে বিপদ আমার উপর আসছে তার কি করা । কিছু তো করতেই হবে ।

– ভাবতে ভাবতেই সহসাই একটা উপায় মাথায় এলো। কয়েক দিনের ছুটি নিলাম স্কুল থেকে । ওদেরকে নিমন্ত্রন করবো । অতিথি হবার জন্য যারা এতটা মরিয়া,  এতটা হা পিত্যেশ, এতটাই নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী তাঁদের স্পেশাল নিমন্ত্রন পাবার শতভাগ ।  তাই গঞ্জে যেতে হবে কিছু কেনাকাটার জন্য । স্কুল থেকেই গঞ্জে যাবার পথেই দুই শয়তানকে পেলাম । আমাকে দেখেই বলল,  ‘ কি সুন্দুরি কেমন আছো ? কোন খবর আছে ?’

– নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে । শান্ত গলায় বললাম, ‘পরশুদিন রাতে তোমাদের নিমন্ত্রন ।‘

– কথাটা এমন আচমকা শুনে ওরা হকচকিয়ে গেলো । কিন্তু আমার শান্ত অসহায় আচরন দেখে ওরা খিক খিক হাসতে লাগলো । ভাবখানা এমন যে,  কি ? উপায় ছিল ? পথে তো এলেই মিছেই কথা খরচ করেছো । আমি বললাম, ‘পরশু রাতে এসো । তবে আমার বাসায় নয় ।‘

– ‘এ কেমন দাওয়াত ? বাসায় নয় তো কোথায় খাওয়া দাওয়াত ? ‘

– আমি মিনতির সুরে বললাম, ‘দেখো, আমি একজন টিচার। আমার বাসায় তোমরা আস এটা সেটা পান করো এটা ঠিক নয় । তোমরা অন্য জায়গা দেখো ।  আমি টিফিন বাটিতে করে তোমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসবো । ওখানেই আপ্যায়ন হবে তোমাদের । তাই কিছু ভালো বাজার আনতে গঞ্জে যাচ্ছি ।‘

– ওরা মহা খুশিতে আমাকে এক পরিচিতের বাড়ি চিনিয়ে দিলো । মালিক সপরিবারে কয়েকদিনের জন্য কোথাও গিয়েছে । তবে আমার বাসা হলেই যে ওরা স্বস্তি  পেতো । সেটা বার বার বলতে লাগলো ।

– আজ আমি বদমাসদের জন্য রাঁধছি । এছাড়া আর কোন পথ নেই । অনেক ভেবেই এটা করা । এ গাঁয়ের বিভীষিকা ওদেরকে যখন ফেরাতে পারবোনা তখন এটাই পথ । খুব সুন্দর করে কিছু আইটেম রান্না করে ফেললাম । কাল চেনা পরিচত সবাইকে বলেছি রাতেই   আমি কিছুদিনের জন্য বাড়ি যাচ্ছি । সবাই জানে আমি  চলে গেছি । – – – আমি বদমাশ গুলোর ওখান থেকে হয়ে বাড়ি চলে যাবো ।  মন খুব খারাপ আমার । অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনায় জড়িয়ে যাচ্ছি আমি । মা কে খুব মনে পড়ছে । মায়ের কোলে মাথা রেখে কাঁদতে পারলে একটু যেন শান্তি পাবো ।

-তখন বেশ রাত । গ্রামের জন্য এটা  অনেকবেশি রাত । পুরো গ্রাম যেন ঘুমিয়ে আছে ।  টিফিন বাটিতে খাবার ভরে দুটো টিফিন বাটি নিয়ে  সবার অলক্ষে নির্ধারিত বাড়িটির সামনে এসে হাজির হলাম । চারিদিক ভীষণ নির্জন আর অন্ধকার । এমনিতেই নয়টা না বাজতেই গ্রাম ঘুমিয়ে পড়ে । এখন তো  এগারোটা প্রায় ।

 

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা- রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং

চলবে……………।

আজও কেন এমন হয় -পর্ব — ৪

Now Reading
আজও কেন এমন হয় -পর্ব — ৪

দুতিন দিন হল আমি একাই যাচ্ছি । পঞ্চম  দিন ওদের দেখা পেলাম । আমাকে দেখে সোজা সামনে এসে পথরোধ করে দাঁড়াল। আমি এগিয়ে যেতে চাইলে একজন সামনে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল–   ‘প্লিজ।‘  একি কাণ্ড আমার বুক ধুপ ধুপ করে কাঁপছে । নিজেকে স্বাভাবিক রাখার প্রয়াস পেলাম । লম্বু এগিয়ে এলো , কিছু কথা আছে ম্যাডাম।

— আমি গলা চড়িয়ে বললাম ,  ‘কি ?হয়েছে ?’  কাল গ্লাস এগিয়ে এলো । ওর চোখ দেখা যাচ্ছেনা । কিন্তু মুখ জুড়ে শয়তানি হাসি । বলল , ‘আপনি আপনি করছিস কেন  বাদল ?  ডার্লিংকে কেউ কি আপনি বলে ?   তুমি করে বল ।‘   লম্বু যদি বাদল হয়,  আমি ভাবলাম,  কালো গ্লাস তাহলে অভি । আমার ভাইও কালো গ্লাস পরে । কি সুন্দর লাগে ওকে । মুখ জুড়ে তারুন্য আর সরল মুখের মায়াময় লাবন্যে গ্লাস পরা  ভাইটি  আরও যেন সুন্দর হয়ে উঠে । আর এই অভি ? আস্ত একটা শয়তান লাগে ।  লম্বু মানে বাদল এগিয়ে এসে বলল,  ‘তুমি খুব সুন্দর ডার্লিং ।‘  আমার রাগে শরীর ফেটে  যাচ্ছিল । বললাম,  ‘পথ ছাড়ো বেয়াদপ,  যেতে দাও ।‘

— অভি বলল,  ‘নিশ্চয় যেতে দেব,  নিশ্চয় ।  তার আগে একটু  আবদার আছে । মহামান্য ।‘

— আমি কড়া  ভাষায় বললাম,  ‘তোমাদের মত বেয়াদপের সাথে কোন কথা নেই। সর,  সরে দাঁড়াও।‘

— ‘ডার্লিং কথা তো তোমার শুনতেই হবে ।‘  বাদল বলল । সাথে অভিও গলা মেলাল,  ‘হা শুনতেই হবে ।‘

—‘  আমার শুনার ইচ্ছে নেই সময়ও নেই ।‘ ভেতরে ভেতরে খুব ভয় পাচ্ছিলাম । কিন্তু নিজেকে কঠিন দেখালাম ।

—‘ না ডার্লিং , না , সময় আর ইচ্ছা আমাদের হাতে বন্ধি থাকে । একটু কথা শুনলে তো ক্ষয়ে যাবে না । কথা না বাড়িয়ে মন দিয়ে শুন , আমরা একটা জায়গা খুঁজছি। পিপাসা পেয়েছে তো তাই ।‘

— ‘মানে ?’ আমি কিছুটা বিস্মিত।

— ‘একটু পান টান করতে চাই । পিপাসার্ত  মানুষকে পানিয় দেয়া কর্তব্য তোমার । তাই তোমার বাড়িটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে । আমরা চাই তুমি আমাদেরকে দাওয়াত দাও । খুদারতকে  খাবার দাও । পিপাসার্ত কে  পানীয় দাও । কি ,  ওই দিন বলেছিলাম  না ? মনে রাখা উচিত ছিল ।‘

—লম্বু বলল, আমাদের কথা আমরা ভুলিনা ।  কাউকে ভুলতেও দেই না ।‘

—‘ আমরা পান করবো আর ডার্লিং তুমি তো আছোই । মেহমানদারী করবা । বড়ই  খিদা,  বড়ই  পিপাসা ।‘  জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কালো গ্লাস বলল ।

— বাদল খুব উৎসাহের সাথে বলল,  ‘বিদেশী বোতল । তোমার মত সুন্দুরি মেমের জন্য বিদেশী,  আমদানি ‘

— প্রবল রাগে আমার চোখ জ্বালা করে মনে হচ্ছে মাথা ফেটে যাবে । আমি আমার পায়ের দুটো  স্যান্ডেল দু হাতে নিয়ে ওদের দুজনের গায়ে মারলাম । অভির হাতে আর বাদলের পেটে  গিয়ে লাগলো বাড়ি । এবার অভি আমার হাত ধরে ফেলল, এবং আমার চোখের দিকে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,  ‘তোমাকে সাত দিন সময় দিলাম । সাত দিন । তারপর দেখো ।‘

— বাদল বলল,  ‘সাত দিনের মধ্যেই জানাইতে হবে । আমরা এখানেই থাকবো দাওয়াতের অপেক্ষায়।‘

— অভি আমার হাতে জোরে চাপ দিয়ে বলল,  ‘তোমার সাথে সুন্দর সিস্টেমে আসতে চাচ্ছি । অন্য কেউ হোলে—‘ বলে , অনেকক্ষণ আমার দিকে  অর্থ পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঝটকা মেরে আমার হাত ছেড়ে ওরা উল্টো পথে টার্ন করলো ।

— আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছিল । আমি একটা গাছের শিকড়ে বসে অসহায় রাগে কাঁদলাম কিছু সময় । পরে  নিজেকে ধাতস্থ করে স্কুলে রওনা দিলাম । এসব কথা বলার মত কাউকে পাচ্ছিলাম  না । চার পাশ দেখে শুনে যা বুঝলাম , সবাই গা বাচিয়ে চলতে চায় । উল্টো আমাকেই গ্রাম ছাড়া করবে হয়তো । সাধারন নিরীহ নিরুপায় লোক আমার কষ্ট বুঝবে । কিন্তু ওদের চাটুকারী ও অধিনস্থ  যারা তারা নিজেরাই  আগুন দিবে আমার জীবনে ও সেই আগুনে ইন্দনও  দিবে ওরাই । আমার চাই একজন ওয়ান ম্যান আর্মি কেউ । এমন কেউ তো নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও আছে ।  অন্তত সাহসী কেউ । আমারই  চোখে পড়ে নি শুধু ।

— এর পর সুমি সুস্থ হয়ে এলে আমি আবার ওকে নিয়ে স্কুলে যেতে লাগলাম । ওরা এখন আর কাছে আসে না । গান টানও গায় না । ওরা তো আমাকে ওয়ার্নিং দিয়েই রেখেছে তাই দূরে দাড়িয়েই হাসাহাসি করে ।

— নিজের অজান্তেই আমি দিন গুলো গুনছিলাম। আজ সপ্তম দিন । তাই ভেতরে ভেতরে খুব অস্থির হয়ে আছি ।

— বরাবরের মত সুমিকে নিয়ে আজও যাচ্ছিলাম । ওদেরকে আগের জায়গাতেই পেলাম ।  না তাকিয়েও বুঝলাম ওরা আজ চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । কিন্তু কিছুই করলো না।

— বাসায় ফেরার সময়ও ওদের দেখলাম। ওরা কিছুই করলো না , দূরে দাড়িয়ে ফিসফাস করছে ।

— আমার ভেতরে কি ভীষণ উদ্বিগ্নতা ছিল সেটা আমি জানি । ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে জলদি পা চালিয়ে বাসায় এলাম । সুমি ওর বাড়ি চলে গেল । ও রাতে আবার আসবে । আমি নিজের ঘরে এসেই হাত পা ছড়িয়ে খাটে শুয়ে পড়লাম । ভালো লাগছে ।  ওরা কিছুই করলো না । আরও তিনটি দিন কেটে গেছে এভাবেই । কিছুই করলো না ওরা ? এতো ভালো লাগছিলো । নতুন করে নিজের জন্য স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম । সুমির জন্যও ।

—শোনা কোথায় কান দিতে নেই । যতটা খারাপ ওদের ভাবছিলাম ওরা ততটা খারাপ নয় । একটু বিগড়ে গিয়েছে এই আর কি । সঙ্গ দোষ আর বেহিসাবি সম্পদ অনেক সময়ই  মানুষকে বাঁকা পথে টানে । ভাবলাম একদিন ওদেরকে স্কুলে ডেকে সবাই মিলে সুন্দর করে বোঝাবো । ওরা  হয়তো নিজের  অজান্তেই কতোটা  গর্হিত ঘৃণিত  কাজ করছে ।

— দিনগুলো  কাটছে ভারহীন । মনটা ফুরফুরে । এই গ্রাম নিয়ে মনে মনে কত কি করার কল্পনা করছি । নিজেকে নিয়ে , সুমিকে নিয়ে , সুমির মা আর চাচিকে মানে আমার বাড়িওয়ালীকে  নিয়ে । গান বাজিয়ে নিজেও গুন গুন  করছিলাম । ভাবলাম আজ সুমির সাথে রবীন্দ্রনাথ ও তার গান নিয়ে সুমিকে কিছু বলবো । সেই সাথে উনার গানের সাথেও  ওর পরিচয় করিয়ে দেব ।

—রাতে খাবার রেডি করে চলে গেল সফুরা। ও গেলেই মেয়ে সুমিকে পাঠিয়ে দেবে। সুমি এলেই ওকে নিয়ে একসাথে খেতে বসবো। বই পড়ছিলাম। রাতে এই সময়টুকু আমি বই পড়ি। স্কুলের পেন্ডিং কাজগুলো দেখি। সুমি এলে খাবার পর আমরা একটু গল্প গুজব করি, ও স্কুলে কেমন পড়াশুনা করছে সে ব্যপারে কথা বলি। ওকে মাঝে মাঝে পড়া দেখিয়ে দেই। কখনও আবার দুজনই বই পড়তে থাকি।  আমি ওকে কিছু ছড়ার বই জোগাড় করে দিয়েছি। ও ওগুলো  খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ে। আজ ওর সাথে শুধু  রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আলাপ আর গান শুনা ।

— একদিন খেয়াল করেছিলাম ও আঁকতে খুব পছন্দ করে। এবং ওর আকাঁর হাতও দারুণ ভালো। ভাবছি এবার যখন ছুটিতে বাড়ি যাবো ওর জন্য আকাঁর সব সরঞ্জাম  নিয়ে আসবো। মেয়েটাকে এ বিষয় গাইড করলে বহুদুর যাবে। ভালো একজন আর্টিস্ট হবার সম্ভাবনা ওর মধ্যে আছে। এবং আমি ওকে যতদূর সম্ভব সাহায্য করবো।

— বই পড়তে পড়তে কখন যে এতো রাত হয়ে গেল খেয়ালই করিনি। ঘড়িতে রাত এগারোটা । চিন্তিত চোখে দরজার দিকে তাকালাম। সুমি এখনও আসছে না কেন। আজ কি আসবেনা?  আরও দু একবারও এমন হয়েছে  আসেনি । একবার ওর নানি এসেছিল তাই আসেনি । আবার যখন ও অসুস্থ্য তখন । আজ কি হল? হয়তো পরে আসবে ।

 

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা- রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং

আজও কেন এমন হয় — পর্ব—৩

Now Reading
আজও কেন এমন হয় — পর্ব—৩

— আমি খুব সরল ভাবে বললাম।  ‘এ গায়ে তো গাড়ি দেখাই যায় না ।  এমন কি  দু চার মাসে কেউ কোন কাজে রিকশা নিয়ে আসে।  কারন ব্রিজটা ভীষণ উঁচু  এ পারে বাহন বলতে তেমন কিছু  নেই । কিছু আনতে হলে  দুতিন জনে টেনে ঠেলে আনতে হয় । কিন্তু  মোটর সাইকেল দেখা যায়। এরা কারা । ‘

— ‘একটি মোটর সাইকেল তো বজলু মিয়ার। আমার পাশের বাড়ির ।  বিদেশ থেকে আসার পর কিনেছিল। কিন্তু সাইকেল চালিয়ে গ্রাম ছেড়ে দূরে যাওয়া খুব সমস্যার ব্যপার তাই বেশির ভাগ সময় বাড়িতেই পড়ে থাকে সেটি । যখন গঞ্জে বা শহরে যায় নিয়ে যায় । আর কার কার আছে আমি জানি না ।‘

— ‘কিন্তু দুটো ছেলেকে আমি প্রায়ই দেখি মোটর সাইকেল নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে ?’  আমি আলতো ভাবে বললাম কথাটা ।

উত্তর দিতে গিয়ে একটু ভাবেন চাচি –‘হুম , মোটর সাইকেল নিয়ে দাবড়ে বেড়ানো,  অভি আর বাদলের কথা বলছ না তো?’

—‘ আমি তো নাম জানিনা । দুজন কে বাইকে দেখি সব সময় ।’ , বললাম।

—‘ হ্যা ওরাই হবে। আর কেউ তো এমন করে গাড়ি চালায় না । শুনেছি,  অভি হল  এম পি সাবের ভাইয়ের ছেলে। আর বাদল উনার শ্বশুর বাড়ির পক্ষের আত্বিয়। এখানেই থাকে । এম পির গ্রামের বাড়িতে  ।‘

— ‘এম পি তো ঢাকায় থাকেন। তাই না?’

—‘ হ্যা। পরিবার নিয়ে ঢাকায় আছেন। নিজের বাড়িতে । এখানে উনার ভাই আর অন্য আত্বিয়রা থাকে।‘

—‘এখানে আসেন না তিনি  ?’

—‘আসেন তো শুনেছি । ‘

—‘ উনার বাড়ি কোথায়?’

— ‘ শুনেছি , তোমার স্কুলের সামনে দিয়ে উত্তরে একটা রাস্তা গেছে। ওখানে কোথাও। আমি জানিনা ঠিক। তোমার চাচা বলতে পারবেন ।‘

—‘ ও তাহলে এম পি এই গ্রামেরই ।  উনার লোকেরা যেভাবে বাইক চালায়। ভয় হয়,  কবে না একটা এক্সিডেন্ট করে বসে।‘

— ‘হ্যা শুনছিলাম । ওরা এমনই , কম বয়সি ছেলেরা একটু এমন হয়ই ।‘

—‘এভাবে গ্রামের হাঁটা পথে স্পিড তোলা – আমি মৃদু প্রতিবাদের ভঙ্গিতে বললাম , ‘ কখন কার গায়ে উঠে যায়, কে আহত হয় ।  কেউ কি  কিছু বলে না ?’

— ‘ কার এতো সাহস হবে মা ?’—‘সাহস ? সাহস কেন ? ভয় পায় নাকি ?’

—চাচি আমার কথার উত্তর না দিয়ে বললেন , ‘এম পির লোককে কে সাহস করে বলবে ?’

— ‘এটা সাহসের  কথা না । সতর্কতার কথা । কারও কিছু বলা উচিত ।‘  কথাটা  শুনে চাচি একটু চমকালেন । সেটা দেখে বললাম, ‘গ্রামের বুড়ো মানুষেরা হাঁটছে বাচ্চারা হাঁটছে,  স্কুলে যাচ্ছে , কখন কার গায়ে ধাক্কা লাগে ।‘

— চাচি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার কাছ ঘেসে বসলেন । যেন খুব জরুরি গোপন কথা বলছেন ,  ‘এসব কথা বলাবলি করোনা মা । কখন ওরা কাকে কি বিপদে ফেলে দেবে কে জানে । পুরো গ্রাম থানা পুলিশ সব ওদের ইশারায় চলে । আর আমি যে এসব কথা বলছি – ওরা যদি শুনে—‘   ভয়ে একটু কেঁপে উঠলেন চাচি ।

— ‘কি হয়ছে ? এমন  ভয় পাচ্ছেন কেন ?’  চাচি চুপ করে থাকেন । ‘প্লিজ বলুন কিছু কি করেছে ওরা ? কি করেছে ?’  আমার অনেক অনুনয়ের পর চাচি আমাকে কিছু ঘটনা বললেন । এগুলো  কিছু উনার দেখা , কিছু শুনা কথা । রুদ্ধশ্বাস হয়ে শুনলাম আমি ।

— ‘এমনও হয়  ?’ প্রচণ্ড  হতাশ সুরে বললাম আমি ।  ‘এতসব ভয়াবহ কাজ করার পরও এমন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে ?’

—চাচি আমাকে বারবার অনুরধ করলেন এসব বিষয়ে কাউকে যেন কিছু জিজ্ঞেস না করি । ‘কোথা থেকে কি হয় ?  কে ওদের লোক আর কে নয় কে জানে ? এরাই শুধু নয় আরও আছে ওদের সাঙ্গ পাঙ্গ । কে কখন কোথা থেকে উদয় হবে কে জানে ?  আমি এসব বলাবলি করছি ওরা জানলে তোমার চাচাকে হয়তো আর দেখবো না কিম্বা আমার ছেলেমেয়েদের কাউকে । এ নিয়ে আমি আর কথা বলতে চাই না ।‘

—‘আপনারা এম পি কে কিছু জানান নি ?’

—  তাকে কোথায় পাবো ? পেলেও তার কাছ পর্যন্ত যাবে কাকে ডিঙ্গিয়ে , বল ? এরাই তো । কেউ কেউ চেষ্টা করতে গিয়ে উল্টো বিপদে পড়েছে । আর প্রমান কই ? কে দেবে প্রমান ?‘

— আমি আবারও কিছু বলতে চাইলে চাচি আমার হাত চেপে ধরলেন , ‘মা  আর  কোন বিপদ সামলানোর মতো সাহস আমাদের নেই । ওরা কি কি করতে পারে তার কোন ধারনা নেই তোমার , তাই এসব ভাবছ । কিছুদিন গ্রামে থাকো বুঝবে ।‘

— আমি চাচিকে নিজের কথা আর কিছু বললাম না । বাসায় ফিরে এলাম । চাচি বা চাচা  কোন সাহায্য করতে তো পারবেনই   না । অযথা ভয় পেয়ে আমাকে না আবার বাসা ছাড়তে বলেন । এই গ্রামে ভাড়ায়  ঘর পাওয়া খুব মুশকিল । উনারা যখন অপারগ তখন আর কাকেই বা বলবো ।  আমি আপাতত চুপ থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম । ছুটিতে ঢাকায় গিয়ে কারও সাথে আলাপ করে দেখবো । কি করা যায় ?  পরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা ।

— আমি আজ কাল খুব একটা বের হচ্ছিনা । বাসায় বসে সারাদিন স্কুলের কাজ দেখা আর বই  পড়াতেই  লেগে থাকি ।  । কোথাও গেলে সুমিকে সাথে নিয়ে যাই । ছোট্ট সুমি আমার কিছু সাহাজ্যে হয়তো আসবে না । তবে এই পথে একা যাবার অস্বস্থিটা  একটু কমেছে । ওর ও নিয়মিত স্কুল যাওয়া হচ্ছে ।  এখন থেকে আমি সুমিকে সাথে নিয়েই স্কুলে যাই । তাতে কি , তাতে তো দুই পাজীর দুষ্কর্মে বাঁধা পড়ে নি । ওরা আগের মতই ওদের নোংরামি করে যাচ্ছিল। আমি আর সুমি নিজের মত,  কিছু না দেখার ভান করে হাঁটতে থাকি ।

— প্রতিদিনের মত আমি আর সুমি যাচ্ছিলাম । ওরা বেশ দূরে দাড়িয়ে ছিল । হটাত কি করলো ওরা – খুব  স্পিডে বাইক চালিয়ে সুমির সামনে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক করলো । আতংকিত সুমির সামনে এসে বাইক থেকে নেমে  ওর সামনে এসে দাঁড়ালো ।

— ভয়ার্ত সুমির  চুলের ফিতা টেনে ধরে  একজন বলল,  ‘কিরে লাল ফিতা নিল ফিতা । কি খবর ?‘ সুমি প্রতিদিন দুই বেনী  করে । একটি বেণীতে  লাল  ফিতা আর অন্যটিতে নিল রঙের ফিতা বাঁধে। ওদের অসভ্যতায় সুমি ভয়ে আমার পেছনে লুকাতে চায় । লম্বু এবার  ফিতা ছেড়ে হাসতে থাকে । কালো গ্লাস বলে, ‘আরে আরে বাদল দেখ ,   লাল ফিতা নিল ফিতাও তো কম সুন্দর না ।‘

—লম্বু হাতে তালি দিয়ে  বলল , ‘বাহ,  একটার সাথে একটা ফ্রি া’

—আমি হাতের কাছে কালো গ্লাসকে পেয়ে ওর গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলাম ।

— কাল গ্লাস থমকে গিয়ে গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে আমার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে,  হাসতে হাসতে বলল , ‘এক কিলোর সাথে আড়াই শ গ্রাম ফ্রি । ম্যাডাম আজকের চড়ের বিনিময়ে  এইটুকু ফ্রি তো পেতেই পারি ।‘ তারপর শিস বাজাতে বাজাতে চলে গেল।

— ‘আমি আর কিছুই বলতে পারলাম না । বলতে গেলে ওরা না আবার আরও খারাপ আচরন করে এই নির্জন রাস্তায় এমন কেউ ছিল না যাকে ভরাসা  করে কিছু বলবো । আর বলবোই বা কাকে ? দেখে শুনে এমন মনে হচ্ছে , এ গায়ে  কিছু হিংস্র দাঁতাল বাঘ থাকে আর বিপরীতে নিরীহ মেষ শাবক ।

— এর একটা বিহিত হওয়া দরকার । কিন্তু কি ভাবে ? কোন সে পথে ?

— এর মাঝেই একদিন হটাত করে সুমি অসুখে পড়লো । কিছুদিন  থেকে আমাকে একাই যেতে হচ্ছে । সুমি যে আমাকে প্রটেক্ট করবে তা নয় । কিন্তু ও থাকলে খুব সামান্য হলেও শক্তি পাই ,। এখন  ভরসা একটাই-  ছেলে দুটো মুখেই যা বলে । এছাড়া আর কোন অশালীন কাজ করেনি  এযাবৎ।

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা- রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং