শেষ বেলায় প্রার্থনা

Now Reading
শেষ বেলায় প্রার্থনা

পূর্ব আকাশে উদিত সূর্য পশ্চিমে যাত্রা করেছে। প্রায় সন্ধ্যা। যে কোন সময় সূর্য ডুবে যেতে পারে। আর তারপর বৃদ্ধ চোখ দুটোর ঝাপসা দৃষ্টি অমানিশায় একেবারে ঢেকে যাবে। তখন মোটা ফ্রেমের চশমা আর কোন কাজে দেবে না। এখনই চোখের দৃষ্টি বেশ ঝাপসা হয়ে এসেছে। চোখ থেকে চশমাটা খুলে শাড়ির আঁচলে সযতনে ঘোলাটে কাঁচ মুছে পরিষ্কার করছেন বেগম রোকেয়া। তিনি একজন নিঃসঙ্গ নারী, একজন বিধবা স্ত্রী, একজন মাতা। তার দীঘলকালো চুলের বর্ণ রূপালি হয়ে গেছে অনেক আগেই। পঞ্চ ইন্দ্রিয় অবসর নেয়ার পরিকল্পনা আটছে। কর্মচঞ্চল কেবল অনিয়ন্ত্রিত মস্তিষ্ক-সংরক্ষিত চলমান ছবির টুকরো যখনতখন চোখের জলে ভাসিয়ে দেয়। সময়-অসময় বোঝে না। অবশ্য মস্তিষ্কের কি দোষ যখন কাছের মানুষ সময়-অসময় বিচার না করে ছেড়ে চলে যায়?
হ্যাঁ। আবার তার মৃত স্বামীর কথা মনে পড়েছে। স্বামীর কথা মনে পড়তেই চশমাটা চোখে দিয়ে রোকেয়া ছুটে যায় পঁচনধরা আলমারিটার কাছে। তারপর প্রতিদিন একইভাবে আলমারি খুলে তার স্বামীর পোশাক বের করে। বোতামগুলোতে হাত বুলাতে বুলাতে স্বামীকে হারানোর বেদনা অনুভব করে। ভয়ঙ্কর সেই দিনটির কথা মনে পড়ে-

সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা মৃতদেহ সামনে রাখা হয়েছে। কতগুলো কৌতূহলী চোখ করুণ রসাত্মক কোন নাটক দেখার অপেক্ষায়। হয়তো এক্ষুণি সদ্য বিধবার আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠবে। আকাশ কাঁপিয়ে গর্জন হবে আর বর্ষণে বর্ষণে ধুয়ে যাবে সমস্ত রঙ, রঙহীন হবে আরও একটি পৃথিবী।
কিন্তু না। ধীরে ধীরে মৃতদেহ ধারণ করা কফিনটার দিক এগিয়ে যাচ্ছে। রোকেয়া যতই এগুচ্ছে ততই পায়ের নিচের মাটি যেন দূরে সরে যাচ্ছে। কফিন আর পায়ের নিচের মাটির দূরত্ব যেন শেষ হতে চাইছে না, পা দুটো ক্লান্ত। আর পারছে না-
কফিনটা এত দূরে রাখা হয়েছে কেন? আমি আর হাঁটতে পারছি না, আমার পা অবশ হয়ে আসছে। কেউ কফিনটা আরেকটু কাছে আনো।
নাটকীয়তা ঠিক জমে নি বোধ হয়। তাই আবহটা আরও একটু বিষাদময় করার জন্য উৎসুক ভীড় থেকে নানা মন্তব্য ভেসে আসছিল।
আহারে! কি করে সহ্য করবে এমন দৃশ্য!/ না জানি কি পাপ করেছিল /এমন মৃত্যুও মানুষের হয়!/ লাশটাকে চেনাও যাচ্ছে না।
প্রিয়জনের মৃত দেহকে কেউ লাশ বলছে- এরূপ একেকটা বাক্য কর্ণে তীর হয়ে বিঁধছিল তার। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যেতেই দূরত্ব কমাতে ব্যস্ত পা দুটো থামিয়ে চিৎকার করে উঠলো-
আপনারা একটু চুপ করবেন? হারিয়েছি তো আমার প্রিয়জন- আপনারা এত কোলাহল করছেন কেন? দয়া করে চুপ করুন। একেকটা শব্দ আমার কানে তীর হয়ে বিঁধছে। আমি আর শুনতে পারছি না। থামুন এবার। থামুন।
সাহস করে এবার বাধ্য হাত দুটো সাদা কাপড়টা সরালো- বেড়িয়ে এল বিকৃত মাংসপিণ্ড। বিকৃত মুখশ্রী দেখা মাত্রই বমির উদ্রেক হয়। চারিদিকে ছিঃ ছিঃ শোনা যায়-
ছিঃ ছিঃ স্বামীর মৃতদেহ দেখে কেউ বমি করতে পারে? এ কেমন স্ত্রী?
নিজেকে সামলে নিয়ে বললো-
এটা কার লাশ?
উৎসুক জনতা বললো-
হায়রে অভাগা নারী! এ তোমার স্বামীর মৃতদেহ। ঘন্টাকয়েক আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। চেহারাটা বিকৃত হয়েছে বলে তুমি তাকে চিনতে পারছো না।
না না! কোথাও ভুল হচ্ছে। সে তো আজ সাদা শার্ট পরেছিল। আমি নিজের হাতে তাকে পরিয়ে দিয়েছি। এই আঙুল দিয়ে বোতামগুলো আটকে দিয়েছি। আর এখানে যে আছে তার গায়ে তো লাল পোশাক।
ওহে শোকে মূহ্যমান নারী! তোমার স্বামীর সাদা শার্ট আর সাদা নেই, তার নিজেরই রক্তে লাল হয়ে গেছে।
হ্যাঁ, বোতামগুলো তখনও সাদা। রক্তে রঞ্জিত সাদা শার্টের বোতামগুলোতে হাত বুলিয়ে হঠাৎই হেসে ওঠে রোকেয়া-
হা হা হা। এটা সে নয়। সে নয় এটা। ঈশ্বরের দিব্যি! শার্টের বোতামগুলো তার প্রমাণ। এগুলো অন্য বোতাম।
কিন্তু না। কেউ এই সূক্ষ্ম যুক্তিটি আমলে নিল না। এমনকি তার শ্বশুরকুলের সকলেই ধরে নিল- এসব আবেগের কথা। সবাই স্বামীহারা স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। এসব সান্ত্বনায় রোকেয়ার যন্ত্রণা দ্বিগুণ হয়ে ওঠে-
মিথ্যে সান্ত্বনা দিও না আমায়। আমি আমার স্বামীকে চাই। অন্য কারও মৃতদেহকে আমার স্বামীর দেহ বলে মেনে নিতে বলো না।
এভাবে বিলাপ করতে করতে জ্ঞান হারায়। যখন জ্ঞান ফিরলো ততক্ষণে একটি অজ্ঞাত মৃতদেহ তার স্বামীর পরিচয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত।
প্রায়ই রোকেয়া তার স্বামীর চিন্তায় বিভোর হয়ে থাকে। সে ভাবে তার স্বামী আসলে কোথায়। সে কি বেঁচে আছে এখনও- ফিরে আসবে কখনও- নাকি তার দেহ অন্য কারও পরিচয়ে ঘুমিয়ে আছে- এসব ভাবতে গিয়ে প্রায়ই তার উনুনের সবজি পুড়ে যেত। আর পোড়া সবজি খাইয়ে একমাত্র সন্তানকে বড় করলো। এতটাই বড় যে এখন আর তার মাকে প্রয়োজন হয় না।
রোকেয়া ভাবে আজ তার স্বামী বেঁচে থাকলে হয়তো তাকে এমন নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করে হতো না। যে জীবন হয় নি যাপিত তার জন্য শোক অনুভব করে রোকেয়া। স্বামীর পোশাক বুকে জড়িয়ে গলা ফাটিয়ে কাঁদে।
ঈশ্বর! কি পাপ করেছিলাম আমি যে নিজের স্বামীর মৃতদেহটিরও সন্ধান পেলাম না- অন্যকেউ আমার স্বামীর পরিচয়ে কেন ঘুমোচ্ছে? এত বড় শাস্তি আমি কেন পেলাম!
চোখের জলে ভিজে যায় বৃদ্ধ এই নারীর মৃতস্বামীর পোশাক। তারপর কাঁদতে কাঁদতে চোখ ক্লান্ত হলে যথাস্থানে পোশাকটা রেখে পুনরায় আলমারিবদ্ধ করে। তারপর সে ধূলো মোছে।
জানালার কাঁচের ধূলো, চির ধরা আয়নার ধূলো, পুরোনো ছবির ফ্রেমের ধূলো। তবে ফ্রেমের ধূলোটা মোছে আঁচল দিয়ে- তার একমাত্র সন্তানের ছেলেবেলার ছবি। এই কোমল মুখটির দিকে তাকিয়ে অকালে স্বামী হারানো এই নারী বিধবা পরিচয়ে নিয়েই জীবন কাটিয়েছেন। বেলা শেষে তার উপলব্ধি হচ্ছে -এ যেন জীবনের সবথেকে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। যে একাকিত্বে ভোগে নিঃসঙ্গ থাকাটা তার জন্য অভিশাপ। কে জানতো একটিমাত্র সন্তান উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে গিয়ে ফিরে আসবে না!

সে এখন ভীনদেশী নাগরিক। কি নিষ্ঠুর সময়ের সিদ্ধান্ত – জননী আর সন্তান দুজনই একই পৃথিবীতে বেঁচে আছে। অথচ ভিন্ন নামের দুটি দেশ- যাদের মধ্যকার দূরত্ব কয়েক হাজার মাইল। মাঝেমধ্যেই রোকেয়া ভাবে- পুরো পৃথিবীটা মিলে যদি একটাই দেশ হতো! তবে কোন সন্তান তার মায়ের দেশছাড়া হতো না। ফ্রেমের ছবির দিকে তাকিয়ে আক্ষেপ করে রোকেয়া-
কেন তোকে পাঠালাম বাবা! এ কেমন শিক্ষা যা সন্তানকে মায়ের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়? আগে জানলে তোকে আমি এমন শিক্ষা দিতাম না ! দিতাম না! এ কেমন নিয়ম! একটা পৃথিবী – দেশ কেন এতগুলো! একটা ভূমি এতগুলো খণ্ড কেন!
রোকেয়া নিজের অশ্রু সংবরণ করে । সে ভাবে – আর কি কখনও সামনাসামনি দেখা হবে তার পুত্রের সঙ্গে? অবশ্য প্রযুক্তির কল্যাণে প্রায়ই তার পুত্রের সঙ্গে তার ভিডিও বার্তা বিনিময় হয়। কিন্তু ভিডিও বার্তা বিনিময় রোকেয়ার কাছে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতোই। তাতে তো স্পর্শ করা যায় না, গায়ের গন্ধ পাওয়া যায় না। তাই মা অন্তত একটিবারের জন্য হলেও পুত্রকে দেশে আসতে বলেন। কিন্তু পুত্র বলে-
কেমন আছো মা?
ভাল আছি বাবা। তুই কেমন আছিস?
এই তো আছি মা। তোমার চোখের অবস্থা কি এখন- আগের থেকে ভাল?
আগের মতোই ভাল। আমি বোধ হয় আর বেশিদিন দেখতে পাবো না। তার আগে তোকে একবার চোখ ভরে দেখতে চাই। তুই একটিবার দেশে আয় বাবা।
কি যে বলো না মা। ঠিকমত ওষুধ খাও – সব ঠিক হয়ে যাবে। আচ্ছা মা শোন, তোমার জন্য একটা পার্সেল পাঠাবো ভাবছি- তোমার কি কি লাগবে?
আমার কিছু লাগবে না বাবা। পারলে একবার দেশে আসিস। আর যদি তাও না পাড়িস তবে তোর একটা শার্ট পাঠাস আমায়।
শার্ট? আমার শার্ট দিয়ে তুমি কি করবে?
আমি তোর গায়ের গন্ধ নেবো বাবা।
হা হা হা

এভাবেই দেশে আসার প্রসঙ্গ হেসে উড়িয়ে দেয় ছেলেটি। কিন্তু জননী তো পুত্রের হাসিতে ভেসে যেতে পারে না। সে এক পরিকল্পনা করলো। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত করলো তার বাগানের পরিচর্যাকারী ইমাম হোসেনকে।
ইমাম হোসেন কখনও একবারে সাড়া দেয় না। সম্ভবত তার শ্রবণজনিত কোন সমস্যা আছে অথবা রোকেয়া বেগম বৃদ্ধা বলে তাকে অবহেলা করে। বেশ কয়েকবার ডাকার পর সে অবহেলা লুকিয়ে প্রভুভক্ত কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করে আর তখন তার সবগুলো দাঁত গোনা যায়-
কি করবো আপনার জন্য? একটিবার শুধু উচ্চারণ করুন।
একবার ডাকলে তো তুমি শুনতেই পাও না, একবার বললে করবে কি করে?
না মানে.. গাছে পানি দিচ্ছিলাম তো, তাই শুনতে পাই নি।
গাছে পানি দেয়ার সাথে না শোনার সম্পর্ক কি জানি না। থাক ওসব। আচ্ছা শোন, যে জন্য ডেকেছি- তোমায় একটু অভিনয় করতে হবে- পারবে?
অভিনয়? আপনি বললে সব পারবো। আমাদের পাড়ায় একবার যাত্রা-অভিনয় দেখেছিলাম।
শোন, এটা তোমাদের পাড়ার যাত্রা অভিনয় নয়। এটা বাস্তবিক অভিনয়।
মানে?
তুমি এখনই আমার ছেলেকে ফোন করে আমার মৃত্যুর সংবাদ দাও।
কিন্তু আপনি তো জীবিত। জীবিত মানুষকে মৃত বলবো- এ আমি পারবো না।
চলেই যাচ্ছিল ইমাম হোসেন। কিন্তু রোকেয়া কৌশল করে বললোয়-
কাজটা করতে পারলে তোমার বেতন দ্বিগুণ করে দেয়া হবে।
ইমাম দাঁড়ালো না।
আড়াইগুণ করা হবে।
তবু দাঁড়ালো না।
তিনগুণ করে দেব।

তারপর…. হা হা হা। অর্থের কাছে বেশিভাগ মানুষের আদর্শ পরাজিত হয়, কে কত দ্রুত পরাজিত তা নির্ভর করে চাহিদার উপর। ইমাম হোসেনও একই দলের। তাই সে অভিনয়ের জন্য রাজি হয়ে গেল এবং জন্ম হল আরও একজন নিপুণ অভিনেতার। নিপুণ অভিনেতা বলা এই অর্থে, রোকেয়া বেগমের বানোয়াট মৃত্যুর সংবাদ ভীনদেশের অভিবাসি পুত্র খুব সহজেই বিশ্বাস করলো। ইমাম ফোন রাখতেই পুত্রের জননী ফোনের ওপারে কি হয়েছে তা জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে-
ইমাম! আমার সন্তান কি বিশ্বাস করেছে আমার মৃত্যুর খবর?
হ্যাঁ। সে করেছে।
সে কি কাঁদছে তার মায়ের জন্য?
না। সে বোধ হয় বড় হয়ে গেছে- তাই কাঁদে না আর।
তাহলে বোধ হয় শোকে পাথর হয়ে গেছে। হাহাকারে তার বুক এতক্ষণে ভারী হয়ে উঠেছে। আর সেই ভার লাঘবের জন্য সে নিশ্চয়ই দেশে ফিরে আসবে, তার মায়ের মুখটা শেষবারের মত দেখতে। এতক্ষণে হয়তো দেশে ফেরার যাত্রাও শুরু করেছে। কিন্তু কখন ফিরবে? আমি যে অস্থির হয়ে আছি! ইমাম, আমার ছেলে কখন ফিরবে?
ফিরবে না। বলেছে দাফনের ব্যবস্থা করতে। কখনও এসে কবর জিয়ারত করে যাবে।
জননী জীবিত অথচ পুত্রের কাছে মৃত। এভাবে কাছে টানতে গিয়ে পুত্রকে একেবারেই দূরে সরিয়ে দিল রোকেয়া।

এভাবেই রোকেয়া বেগমের দিন কেটে যায় স্মৃতিচারণ করতে করতে। কখনও স্বামীর শোকে পাথর, কখনও পুত্রের জন্য কাতর। কখনও নিঃসঙ্গ জীবনের জন্য অনুশোচনা, কখনও নিজের ভাগ্যের প্রতি ভর্ৎসনা। এভাবেই কেটে যায় রোকেয়া বেগমের জীবনের শেষ দিনগুলো।

সূর্য অস্ত গেছে। আযানের সুর ভেসে আসছে কানে। এখন প্রার্থনার সময়। রোকেয়া বেগম প্রার্থনা করছেন। তার প্রার্থনায় আক্ষেপের কোন সুর নেই। শান্তরসে শুদ্ধ এই প্রার্থনা তার নিজের জন্য নয়। এই প্রার্থনা সকল বিধবা নারীর জন্য যারা মৃত স্বামীর পোশাক হাতড়ে কাঁদে। এই প্রার্থনা সকল জননীর জন্য যারা সন্তানের ভবিষ্যত সুনিশ্চিত করার অভিলাষে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করে। তাদের জন্য এ প্রার্থনা যারা সন্তানকে একটিবার কাছে পাবার জন্য অভিনেতা হয়ে ওঠে। প্রার্থনা তাদের জন্য যারা দীর্ঘশ্বাসে বার্ধক্য কাটায়।
আসুন এই প্রার্থনায় একাত্ম হই। প্রার্থনা করি বার্ধক্যে উপনীত সকল মানুষের জন্য, দীর্ঘশ্বাসে যেন কারও মৃত্যু না হয়।