একটি বেল গাছের কাহিনী

Now Reading
একটি বেল গাছের কাহিনী

বেলতলা নামে এক গ্রামের ঘটনা।সেই গ্রামের একবারে পূর্ব পাশে একটা ঘর নিয়ে থাকতো রহিমা বিবি। তার স্বামী মারা গেছে। সারাদিন মানুষের বাড়িতে কাজ করে যেই টাকা পেতো তা দিয়েই দিন কেটে যেতো। ছোট একটা মেয়ে ছিল রহিমার। বয়স ১১ বছর।

সেই মেয়েকে নিয়েই গ্রামের একদম শেষ মাথার একটি ঘরে থাকতো রহিমা। কষ্ট করে মা-মেয়ে দুইজনের দিন কেটে যেত।যাই হোক, ঠিক তাদের বাড়ির পাশেই একটা বিরাট আকারের বেল গাছ ছিল। সেই বেল গাছ নিয়ে গ্রামে নানাধরণের কথা প্রচলিত ছিল। মাঝে মাঝেই নাকি সেই গাছের নিচে একটা লোককে বসে থাকতে দেখা যেতো। লোকটিকে যখনই দেখা যেতো তখনই নাকি দূরে কোথাও কুকুরের কান্নার আওয়াজ পাওয়া যেতো। তবে রহিমা আর তার মেয়ের কাছে এটা কোন নতুন ঘটনা নয়।রহিমার মেয়ে প্রায়ই বেল গাছের নিচে বসে থাকা লোকটিকে দেখতো আর রহিমাকে প্রশ্ন করতো “এই লোকটি কে”? রহিমা তখন বলতো জানালা বন্ধ করে দেও।মার্চ মাসের কোনও এক রবিবারে শহর থেকে নিজেদের দোকানের জন্য কেনাকাটা করে ফিরছিল একদল গ্রাম্য দোকানদার। সংখ্যায় তারা ১২-১৫ জনের মতো ছিলেন। রাত তখন ১১ টার মতো হবে। রহিমাদের বাসার সন্নিকটে আসতেই তারা দেখতে পেলেন,সেই গাছের নিচে লোকটি বসে আছে এবং লোকটিকে ঘিরে আছে একদল মানুষ আকৃতির ছায়ামূর্তি। প্রতিটা ছায়ামূর্তি আঁকারে যেকোনো

মানুষের প্রায় দ্বিগুণ। তারা সবাই দেখে দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকেন। মিনিট খানেক পরে একসময় ছায়ামূর্তিগুলো ভাসতে ভাসতে সেই গাছের উপরে
উঠে মিলিয়ে যায় এবং এর খানিকপর গাছের নিচে বসে থাকা লোকটিকে আর দেখা যায় না। ঠিক সে সময় তাদের চমকে দিয়ে রহিমার ঘর থেকে ভয়ঙ্কর আর্তনাদের আওয়াজ ভেসে আসে। তারা প্রত্যেকেই ভয় পেয়ে যায় এবং দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করে। পরের দিন সকালে স্থানীয় কিছু মানুষ হাতে লাঠি নিয়ে সেই ঘরের দিকে গেলে ঘরের মেঝেতে রহিমা এবং তার মেয়ের মাথাবিহীন লাশ খুঁজে পায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাদের মাথাগুলো পাওয়া যায় সেই গাছের মগডালে। ঠিক যেখানে গ্রাম্য দোকানদাররা আগের রাতে ঐসব ছায়ামূর্তিগুলোকে কে হারিয়ে যেতে দেখেছিল।আর তার চেয়েও ভূতুরে ব্যাপার হলো গাছটির শিকড়ের নিচে মাটি খুরে অনেকগুলো মাথার খুলি পাওয়া যায়।যা গ্রামবাসীদের ভয় আরো বাড়িয়ে দেয়। পুলিশ বাবু এসে সবার কাছে রহিমার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে।সেই গ্রাম্য দোকানদারদের কথায় তিনি কোন কান ই দিলেন না।তিনি এটাকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিলেন।তিনি সকল তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে পুলিশস্টেশনের দিকে রওনা হন। সেই ঘরটিতে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং সবাইকে জানিয়ে দেন যে বেল গাছটির আশেপাশে কাউকে দেখা গেলেই যাতে পুলিশস্টেশনে জানায়।এইদিকে গ্রামেরবাসীদের মাঝে নানাধরনের কথা শুরু হয়।কেউ বলে “আমি আগে থেকেই জানতাম এমন কিছুই হবে,ভূতের সাথে কি আর মানুষ থাকতে পারে!”আবার কেউ বলে এই বেল গাছটার কারণেই সব হচ্ছে,এবার এটা কেটে ফেলতে হবে”।যাইহোক,পুলিশবাবু এইসব কথায় বিশ্বাস করেন না।তিনি তার ইনভেস্টিগেশনে ব্যস্ত।তার কাছে এটা নিতান্তই একটা হত্যা মাত্র।পরের দিন সকালে যখন তিনি আবার গ্রামে যান তখন শুনতে পান যে কাল রাতেও নাকি বেল গাছের নিচে লোকটিকে দেখা গেছে।কিন্তু গ্রামবাসীরা ভয়ে ঘর থেকে বের হয়নি।একজন বৃদ্ধা মহিলা পুলিশবাবুর কাছে এসে বলে যে সে নাকি জানে কে এই হত্যা করেছে।পুলিশবাবু বৃদ্ধার সাথে তার ঘরে গেলেন।বৃদ্ধার একটি ছোট্ট ঘর সেইখানেই তার দুঃসম্পর্কের এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন তিনি।তার এক ছেলে আছে।সে গঞ্জে থাকে।প্রতিমাসে সে এসে টাকা আর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য দিয়ে যায়।বৃদ্ধা বললো যে সে তার ছোটবেলায় তার মায়ের কাছে শুনেছে যে ইংরেজরা যখন এই ভারত উপমহাদেশে শাসন করতো তখন একজন লোক তাদের সাথে থাকতো তাদের পথ দেখানোর জন্য।তাদের বলা হতো ইংরেজদের দালাল।তেমনি এই গ্রামেও একজন লোক ছিলেন।তাকে গ্রামের সবাই ঘৃণা করতো।তার কারনে অনেক মানুষের প্রাণ গেছে।যখন ইংরেজরাজত্ব শেষ হয় এবং দেশ ভাগ হয়,তখন গ্রামের লোকজনরা তাকে এবং কিছু ইংরেজ সৈনিকদের এই বেল গাছের নিচে নিয়ে এসে হত্যা করে।তারপর থেকেই নাকি তাদের ভূত এই বেল গাছে আছে।বৃদ্ধা আরো জানান যে,শুধু রহিমা নয় এর আগেও অনেক মানুষ এইভাবে প্রাণ দিয়েছে।পুলিশবাবু বৃদ্ধার কথা শুনে এই কথা বুঝতে পারলেন যে এটা শুধু একটা হত্যাকান্ড নয় বরং অনেকগুলো হত্যাকান্ড এখানে হয়েছে।তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে তদন্ত আরো গভীরভাবে করবেন।কিন্তু তার কাছে কোন প্রমাণও যে নেই।কাউকে দোষারোপও করা যাচ্ছে না।কে এই হত্যা করতে পারে এই নিয়েই তিনি অনেক চিন্তিত হয়ে পড়লেন।আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো তিনি জানেন যে এটি একটি হত্যাকান্ড কিন্তু কে এই হত্যাকান্ড করেছে তাকে তিনি সনাক্ত করতে পারছেন না।তার ১০ বছরে এটিই একটু জটিল তদন্ত।যাইহোক,ঘরে ঘরে গিয়ে তিনি তথ্য নিয়ে আবার রওনা হলেন পুলিশস্টেশনের দিকে।পরেরদিন সকালে গ্রামের এক কৃষক পুলিশস্টেশনে এসে পুলিশবাবুকে বললেন যে গতকাল যে বৃদ্ধা তার সাথে কথা বলেছিল সে বৃদ্ধার লাশ বেল গাছের নিচে পাওয়া গেছে।পুলিশবাবু এই কথা শুনে দ্রুত গ্রামের দিকে রওনা হলেন।তিনি গিয়ে দেখেন বেল গাছের নিচে বৃদ্ধার গলাকাটা লাশ।সেই লাশের পাশে বসে বৃদ্ধার সেই দুঃসম্পর্কের মেয়ে কান্নাকাটি করছে।গ্রামের মধ্যে একটা অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে।এই খবর পেয়ে গ্রামের লোকজন ছুটে আসছে বেল গাছ তলায়।