সাফল্যের গল্প ও মায়ের ত্যাগ

Now Reading
সাফল্যের গল্প ও মায়ের ত্যাগ

: আইছো মা ! খুব খিদা পাইছে ! এত দেরী করলা কেন মা ?

: কি করমু বাবা বাসা বাড়ির কাজ শেষ কইরা আইতে আইতে দেরী হইয়া গেল গা ! নে খাইয়া ল !

সকালে কোনরকম পঁচা পান্তা খেয়ে শ্রমিকের কাজ করতে আসতে হত। আর দুপুরে মা গরম ভাত , ডাল অথবা কখনও সেই পঁচা পান্তা, পেয়াজ,মরিচ নিয়ে আসতো। এত এত ক্ষুধা,হাড়ভাঙা খাঁটুনীর পরে যা পেতাম সবই অমৃত লাগতো। বগবগ করতে করতে বেশ কয়েক লকমা খেয়ে ফেলার পর হঠাৎ মনে হল, মা হয়তো খায়নি কারণ আমাকে ফেলে তো মা খায়না ! মাকে বললাম,

: তুমি তো খাও নাই ! আমিই তো সব খাইয়া ফেলছি !নাও হা  করো !

মা বলে, : তুই খাইলেই আমার পেট ভরে বাবা ! তোর বাপ মরার পরে তোরেতো ভালো খাওয়াইতে পারিনাই, পেট ভরেও খাওয়াইতে পারি নাই !

থালার শুধু শেষ লকমাটুকুই মাকে খাইয়েছিলাম ! এভাবে চলতে থাকে মা ছেলের কষ্টের এক একটা প্রহর… তবু মা এতটুকু মলিন ছিলেন না।

একদিন সবই ছিলো আমাদের। কোন কষ্ট ছিলো না। গ্রামে একসময় বড় দো’চালা ঘর ছিলো , ছিলো পুকুর, ধানী জমি, বাবার গঞ্জে মুদি দোকান। সবই ছিলো। তখন আমি খুব ছোট। সৎ চাচার আমাদের সুখ সয় নি। একরাতে বাবা বাড়ি ফেরার পথে ডাকাতের হাতে খুন হন। পরে জানতে পারি ডাকাতের ছদ্মবেশে সৎ চাচা তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বাবাকে খুন করে। আস্তে আস্তে বাপ দাদার রেখে যাওয়া ঘর, ধানী জমি, পুকুর সব দখল করে নেয় ! মায়ের তখন কচি বয়স। মাকে বাধ্য করা হয়, তার সাথে সংসার করার জন্য নয়তো কোলের ছেলে নিয়ে দূরে চলে যেতে ! নয়তো গ্রাম্য সালিশে ব্যভিচারিণী প্রমান করবে ! কেউ ছিলো না পাশে দাঁড়ানোর মত ! মা নিজেকে আর ছোট্ট আমাকে বাঁচাতে পালিয়ে আসে শহরে..। ব্যাস ! সেই থেকেই বস্তির একটি ঘিঞ্জিতে থাকি। মা বাসা বাড়ির কাজ করে , আমি বড় হবার পর শ্রমিকের কাজ করি। খাওয়ার খরচ আর বাসা ভাড়া  আর বাকী টাকা দিয়ে মা আমাকে শত কষ্টের মাঝেও লেখা পড়া করাতেন। আমাকে নিয়ে ভাঙা ঘরে অনাহারে অর্ধাহারে থেকেও মা স্বপ্ন দেখা বাদ দেননি ! আমি যখন ইন্টার মিডিয়েট পাশ করে কলেজে ভর্তি হই, একদিন মা প্রচন্ড জ্বর আর কাঁশতে কাঁশতে রক্তবমি করে মারা যান। বহুদিন রোগ পুষে রেখেছিলেন মা কিন্তু আমায় বুঝতেও দেননি ! হঠাৎ একদিন চলেই গেলেন আমাকে ছেড়ে ! একা হয়ে গেলাম। চিৎকার করে কেঁদেছি কিন্তু তখনও কাউকে একটু স্বান্তনা দেবার মতনও পাইনি ! এক হাতে চোখের জল মুছেছি অন্য হাতে লেখা পড়া চালিয়েছি, কাজ করেছি সফল হবার জন্য মার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য। সেই শ্রমিকের কাজ করে পড়াশুনা শেষ করেছি শিক্ষকের সহায়তাও ছিলো অবশ্য। আমাদের সেই সময়ে শিক্ষকের সাথে আর সহপাঠীদের একে অন্যের সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিলো। যাদের কিছু সহায়তায় আর নিরলস প্রচেষ্টায় আজ আমি বিসিএস ক্যাডার হয়েছি খুব ভালো চাকুরী করছি। বাড়ি, গাড়ি সব আছে। কিন্তু মা নেই, বাবা নেই। কেমন এক ভয়ঙ্কর শূণ্যতা। যার পূরণ কোনদিন সম্ভব নয়। আজও আমি কাঁদি। খাবার টেবিলে আজ কত খাবার ! কিন্তু মাকে একবেলা পেট ভরিয়ে খাওয়াতেও পারিনি আমি !

আজ আমি যতটুকু সবটাই মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম। নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন আমায় মানুষ করতে। তবু নতুন করে সুখের সংসার করার কথা ভাবেননি ! সেই কচি বয়সে বিধবা হয়েছিলেন, কত আত্মত্যাগ করেছেন কিন্তু আমায় বুঝতে দেননি। নিজে পেট ভরে না খেয়ে আমার মুখে তুলে দিয়েছেন খাবার, রোগ পুষেছেন তবু ওষুধ কিনে খেতেন না সেই টাকাও আমার খাতা কলম কিনতে ব্যয় করতেন। তবু যেন মায়ের মুখ থেকে হাসি ফুরাতো না ! আর মাথায় পিঠে হাত বুলাতেন.. আর আমি রাত জেগে পড়তাম। দিনগুলি আজ মাটির দুনিয়ায় তলিয়ে গেছে।

গিন্নি যখন অনেক পদের খাবার দিয়ে খাবার টেবিল সাজায় তখন চোখ ছলছল করে ওঠে।

চোখের জলে চিকচিক করে শৈশব কৈশরের স্মৃতি… মা বাবার অমলিন স্মৃতি… মা বাবা আর আমি যেন জীবন্ত ছুটাছুটি করি বাড়ির উঠোনে, আমাদের সুখের দো’চালা বাড়িতে। জীবনের সব সুখ যেন ওখানে অনাদরে মাটিচাঁপা পড়ে আছে।

আজ কোন বেলাই আমি খেতে বসে তৃপ্তি করে খেতে পারিনা ! তবু গিন্নিকে আর ছেলে মেয়ে দুটোকে বুঝতে দেই না। গিন্নি কষ্ট করে নিজ হাতে সব তৈরী করে…। ওদের বলি , বয়স বাড়ছে ডাক্তারের বারণ আছে !

 

সেদিন মায়ের আঁচলের ছায়ায় তৃপ্তি করে পঁচা পান্তা খেতাম , সেদিনগুলিই ভালো ছিলো। এখন একটাই আশা। কিছু ভালো কাজ করে ঈমানের সাথে মৃত্যু বরণ করলে হয়তো জান্নাতে বাবা মায়ের দেখা পাবো… এ জনম তো প্রায় শেষ ! আর একটাই কাজ , ছেলে মেয়ে দুটিকে মানুষ করতে পারলেই নিশ্চিন্ত।

আর ভালো লাগেনা দামী ওষুধ খেয়ে কৃত্রিমভাবে সুস্থ থাকতে ! তবু থাকতে হয়…, কারণ আমি যে কারো স্বামী, কারো পিতা ।