অভিশপ্ত পুকুর- পর্ব ১

Now Reading
অভিশপ্ত পুকুর- পর্ব ১

রাত ১১ টার একটু বেশি হয়েছে। সাকিব আর আমি বসে আছি বাসার ছাদের উপর। সাকিব আমার খুব ভালো বন্ধু। দুইজনে একই বাসায় থাকি। আমার বাড়ি চিটাগাং আর সাকিবের গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার। দুই জনে একি কোম্পানিত চাকরি করি, সেখান থেকেই দুইজনের পরিচয়। সাকিব অনেকবার আমাদের গ্রামে গেছে, আমিও অনেকবার সাকিবদের গ্রামে গেছি। তাদের গ্রামটা বেশ সুন্দর, তবে সবচাইতে বেশি সুন্দর একটা জমিদার বাড়ি। বাড়িটা বেশ সুন্দর, সেখানে এখন কেউ থাকে না, সেটার মালিক এখন সরকার। সেটা এখন পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছে। সেখানে অনেকেই আসে। আমিও বেশ কয়েকবার গিয়েছিলাম সেখানে। ভালো লেগেছিল আমার। বাড়িটার সামনে একটা অসাধারণ ফুল বাগান। সেখানে নানা ধরনের ফুলের গাছ রয়েছে। ফুলের বাগানের পাশেই একটা সুপারি গাছের বাগান। বাগানের মাঝ খানে গিয়ে উপরের দিকে থাকালে ভীষণ ভালো লাগে আমার। বাগানের পাশেই বিশাল বড় একটা পুকুর। পুকুরের চারপাশেও বেশ কিছু সুপারি গাছ আছে। পুকুরটা ভীষণ সুন্দর, পানিগুলোও অনেক পরিষ্কার। যতবার জমিদার বাড়িতে গিয়েছিলাম ততবার পুকুরের ঘাটে গিয়ে বসে থাকতাম। পরিবেশটা ভীষণ সুন্দর, এই রকম পরিবেশ গ্রামে ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না। শহরের মানুষগুলো যখন গ্রামে এই রকম পরিবেশ দেখে তখন তারা অবাক হয়ে যায়। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে পরিবেশের দিকে। আসলে তারা অবাক হয় নি, ইট পাথরের দানবগুলি দেখতে দেখতে তাদের চোখটা এক রকম পাথর হয়ে গেছে। তাই এমন পরিবেশ দেখে সবাই আনন্দে লাফিয়ে উঠে।
.
সাকিব আর আমি ছাদে বসে গল্প করছি। গল্পের কোন বিষয় নেই, যেটা মনে আসছে সেটা নিয়েই গল্প করছি দুইজনে। এই রকম আমরা প্রতিদিন করি, রাতে যখন ঘুম আসে না তখন দুইজনে মিলে ছাদে উঠে জমিয়ে গল্প করি। নীরব রাতে দুইজন মানুষ ছাদে বসে গল্প করলে মনটা খারাপ থাকলেও সেটা মুহূর্তে ভালো হয়ে যায়।
– দিগন্ত কাল থেকে তো লম্বা ছুটি। কোথায় কাটাবি ছুটি?
সাকিবের কাথা শুনে আমি সাকিবের দিকে তাকালাম। কফির মগে চুমুক দিয়ে বললাম,
– কোথায় আবার যাব নিজ গ্রামে যাব।
– তোকে একটা কথা বলি?
– কী কথা বল?
– আমাদের গ্রামে গেছিস তো অনেক দিন হল চল এবারের ছুটিটা দুইজনে মিলে এক সাথে কাটাই।
– না রে গ্রামে গেছি অনেক দিন হল। এবার একটু গ্রামের মুখটা দেখে আসি।
– আর একবার না হয় যাবি, এবারের ছুটিটা আমাদের সেখানে কাটা, তাছাড়া আমাদের গ্রাম তোর অনেক পছন্দ। তাই সমস্যা হবে না, দুইজনে খুব মজা করে ছুটিটা কাটাতে পারব।
– না রে যাব না।
– না তোকে যেতেই হবে। আব্বু আম্মু বলছে এবার তোকে নিয়ে যেতে, আর আমি তোকে ছাড়া এই শহর ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না।
কথাটা বলা শেষ করতেই সাকিবের ফোনটা বেজে উঠল।
– কে কল করেছে এত রাতে?
– বাসা থেকে, দেখি কী বলে।
সাকিব কী কথা বলছে সেটা আমি শুনতে পারছি কিন্তু ওপাশের শব্দগুলো শুনতে পারছি না। সাকিবের কথা শুনে মনে হচ্ছে কোন একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিছুক্ষণ কথা বলার পর, সাকিব ফোনটা রেখে দিল। লাইটের আলোই সাকিবের মুখে মন খারাপের স্পষ্ট দৃশ্য দেখতে পারছি আমি। সাকিব মন খারাপ করে সামনে দিকে তাকিয়ে আছে, তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না। চোখের কোণায় স্পষ্ট জল দেখতে পারছি আমি।
– কী হয়েছে সাকিব?
আমার কথা শুনে সাকিব আমার দিকে তাকাল। তার চোখ থেকে এক ফুটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আমি তার কাছে গিয়ে বসলাম।
– কী হয়েছে কান্না করছিস কেন?
– আমার একটা চাচাতো ভাই আছে। নাম আরিফ।
সাকিবকে থামিয়ে দিয়ে বললাম,
– হ্যাঁ, তাকে চিনি তো কী হয়েছে তার?
– সে আজ সন্ধ্যাই পুকুরে পড়ে মারা গেছে। কথাটা বলে সাকিব আবার মন খারাপ করে বসে রইল। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম। আর আমি সাকিবের কথা শুনে চমকে উঠলাম। আরিফ সাকিবের চাচাতো ভাই তবে ওরা ভাই এর মতো থাকে না, দুইজনে বন্ধুর মতো চলাফেরা করে। এত বড় একটা ছেলে কীভাবে পানিতে পড়ে মারা গেল মাথায় ঢুকছে না।
– সাকিব মন খারাপ করিস না, এই পৃথিবীর সবাই তো একদিন মরে যাবে।
সাকিব ভেজা কন্ঠে বলল,
– হ্যাঁ জানি। কিন্তু এভাবে চলে যাবে সেটা ভাবি নি।
– শুন কার মৃত্যু কখন কীভাবে হবে সেটা আমরা কেউ জানি না। আচ্ছা এটা বল ও কী সাঁতার জানত না?
– আরিফ খুব ভালো সাঁতার জানে।
সাকিবের কথা শুনে চিন্তাই পড়ে গেলাম। কিছুক্ষণ ভাবার পর বললাম,
– আচ্ছা ওর কি কোন শত্রু ছিল?
– না, আমার জানা মতে ওর কোন শত্রু নেই।
– তাহলে এত বড় একটা ছেলে পানিতে পড়ে মারা গেল কীভাবে?
সাকিব আমার কথার জবাব না দিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। বুঝতে পারছি সে মৃত্যুটা মেনে নিতে পারছে না। না পারারই কথা, এত বড় একটা ছেলে পানিতে পড়ে মারা গেল সেটা কেউ মেনে নিতে পারবে না।
– কখন যাবি?
– এত রাতে কিছু পাব না, কাল সকালে যাব।
– ঠিক আছে আমিও যাব তোর সাথে। চল এখন রুমে যাই।
– না রে তুই যা, ভালো লাগছে না আমার।
– আরে এত ভেঙ্গে পড়লে চলবে? চল তো।
এক প্রকার জোর করে সাকিবকে রুমে নিয়ে গেলাম। রুমে গিয়ে দুইজনে শুয়ে পড়লাম। দুইজনের কারও চোখে ঘুম নেই। সাকিব নীরবে কান্না করে যাচ্ছে। আর আমি ভেবে যাচ্ছি। ভেবেছিলাম এবারের ছুটিটা বাবা মার সাথে খুব মজা করে কাটাবো। কিন্তু তা আর হবে না, আরিফের মৃত্যুটা আমার স্বাভাবিক বলে মনে হল না। নিশ্চিত এর পিছনে কোন একটা কারণ আছে। কারণটা জানতে হলে আমাকে তাদের গ্রামে যেতে হবে। মৃত্যুটাতে আমি রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি। সারা রাত ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলাম, ভোরের দিকে চোখে ঘুম নেমে আসল।
.
সাকিবের ডাকে ঘুম ভাঙ্গল। চোখে খোলে দেখি সাকিব রেডি হচ্ছে। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি ৯.০০ টা হয়ে গেছে। সাকিব আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
– তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে, সকাল ১০ টাই বাস ছেড়ে দিবে।
– ঠিক আছে। আমি রেডি হয়ে আসছি।
শুয়া থেকে উঠে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিলাম। নাস্তা করে বের হয়ে গেলাম সাকিবের গ্রামের উদ্দেশ্যে।

দীর্ঘ অনেক সময় জার্নি করার পর আমরা এসে পৌঁছালাম সাকিবের গ্রামের বাড়িতে। গ্রামে ঢুকতেই চমকে উঠলাম আমি। এই গ্রামটা আগের সেই গ্রাম নেই, গ্রামের সব মানুষ কেমন যেন নীরব হয়ে আছে। মনে হচ্ছে তারা একটা ভয়ের মধ্যে আছে। গ্রামের চারপাশে নীরবতা, আর নীরবতা। সাকিব এখনও মন খারাপ করে আছে। চোখের কোণাই অশ্রু দেখা যাচ্ছে। আমি কিছু বললাম না। সামনের দিকে হাঁটছি আর চারপাশটা দেখছি। বাসস্টপ থেকে দুইজনে একটা রিকশা নিয়ে চললাম সাকিবের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
.
গ্রামের এই রকম অবস্থা দেখে আমি চিন্তাই পড়ে গেলাম। গ্রামটা ছিল হাসি খুশিতে পরিপূর্ণ একটা গ্রাম, হঠাৎ কী এমন হল যে যার কারণে গ্রামের সকল কিছু নীরব হয়ে আছে। মাথা কাজ করছে না। এখন এগুলো নিয়ে ভাববো না, এখন ভাবতে হবে আরিফের মৃত্যুটা নিয়ে। আরিফের মৃত্যু কীভাবে হল সেটার একটা পরিকল্পনা করলাম আমি। পরিকল্পনাটা এমন যে আরিফের হয়তো কোন শত্রু ছিল যা কেউ জানে না। সেই শত্রু গুলো তাকে যেকোন কারণে মেরে পানিতে ফেলে গেছে যাতে তাদের কেউ ধরতে না পারে। এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে চলে আসলাম সাকিবদের বাড়িতে। বাড়িতে অনেক মানুষ দেখা যাচ্ছে। সবাই নীরব, সাকিব আর আমি গিয়ে আরিফের লাশের পাসে দাঁড়ালাম। সাকিব আরিফের পাশে বসে কান্না করছে, তার পাশেই আরিফের মা ভাই বোন বসে কান্না করছে। তার বাবাকে দেখলাম একটা জায়গায় মাথা নিচু করে বসে আছে। বুঝলাম উনি সবার আড়ালে কান্না করছেন। বাবাদের কান্না দেখা যায় না, তারা বড়ই অদ্ভুত। হয়তো এই মানুষটির ভিতরে এখন একটা তুফান বয়ে যাচ্ছে। যেটা না পারছে কাউকে দেখাতে না পারছে কাউকে বলতে। প্রতিটা বাবা এমনি হয়, তাদের ভিতরে কী হচ্ছে সেটা কাউকে বলতে পারে না।
.
নিজের ছেলেকে নিজ কাঁধে করে কবরে নিয়ে যাওয়া, নিজ হাতে কবর দেওয়া, নিজ হতে কবরে মাটি দেওয়া। এই সকল কাজের চাইতে বড় কষ্ট আর কিছু নেই। পৃথিবীর সবচাইতে বেশী কষ্ট নিজের ছেলেকে নিজ হাতে কবর দেওয়া। এই কষ্ট মেনে নেওয়া খুব কঠিন।
.
ছেলের নিস্তব্ধ দেহ দেখে কোন মা ঠিক থাকতে পারে না। নিজের ছেলের মৃত দেহ কোন মা দেখতে চাই না। তার এই মৃত্যু মেনে নিতে পারে নি। সত্যি এদের কষ্ট দেখে আমারও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছি যদি আরিফকে কেউ খুন করে থাকে তাহলে আমি থাকে ছাড়ব না, বাবা মায়ের এই কষ্টটা তাকে বুঝিয়েই ছাড়ব আমি।
.
আরিফের একটা বড় ভাই আছে সে বাহিরের দেশে থাকে। সে চলে আসবে আজকে বিকালের মধ্যে। সে জন্য আরিফকে গাড়িতে রাখা হয়ছে। আমি আরিফকে দেখার জন্য গাড়ির পাশে গেলাম। গাড়ির গ্লাস দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পারছি আরিফের মুখটা। অনেকদিন পর দেখলাম সেটা। আরিফ আমাকে খুব পছন্দ করত। আমি আসলেই সে তার সব কাজ ছেড়ে আমার সাথে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়াত। আজকে আমি আসছি আর সে কত আরামে ঘুমাচ্ছে। সত্যিই একটা মৃত্যুর কারণে কয়েকটা জীবন পাল্টে যায়। আরিফের মুখের দিকে তাকালাম কোন কিছু মিলে কিনা দেখার জন্য। তেমন কিছুই পেলাম না, পানিতে থাকার কারণে তার মুখটা সাদা হয়ে গেছে।
.
বিকালের দিকে আরিফের বড় ভাই আসল বাড়িতে। সন্ধার সময় আরিফকে এলাকার কবরস্থানে কবর দেওয়া হল। আরিফকে কবর দিয়ে এসে সাকিবের বাড়িতে আসলাম। বাড়িটা নীরব হয়ে গেছে, একদম নীরব। কোথাও কারও কোন শব্দ পাচ্ছি না। সবাই শুধু নীরবে চোখের জল ফেলছে। হয়তো আরিফের মৃত্যুটা কেউ মেনে নিতে পারছে না। সাকিবও মন খারাপ করে বসে আছে। এমন মৃত্যু মেনে নিতে কেউ পারবে না। মন খারাপের এই দৃশ্য আমার দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে না। তাই আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে হাঁটা দিলাম।
.
আমি হাঁটছি রাস্তা দিয়ে। চারপাশের প্রকৃতিটা আজ নীরব হয়ে আছে। কোথাও কোন সাড়া শব্দ পাচ্ছি না। গ্রামটা কেমন যেন হয়ে আছে। গ্রামের মানুষগুলো এমন হয়ে আছে কেন বুঝলাম না। উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে একটা দোকানের সামনে চলে আসলাম। দোকানটা চায়ের দোকান। দোকানে বসে কিছু বৃদ্ধ কথা বলছেন। আমি দোকানের ভিতর ঢুকলাম। একটা জায়গায় গিয়ে বসলাম। লোকগুলো কথা বলছি সেটা আমি শুনতে পারছি। লোকগুলো এই গ্রামের নীরবতা নিয়ে কথা বলছে। একটা লোক বলল,
– এই গ্রামটা কেমন যেন হয়েছে, চারাদিকে নীরবতা। মানুষগুলো সব সময় ভয়ে থাকে। কয়েকমাসে গ্রাম চেহারা কত পাল্টে গেছে।
লোকটির কথাই সম্মতি জানল অন্য লোকগুলো। উনাদের কথা শুনে আমি চিন্তাই পড়ে গেলাম। কয়েকমাস আগে গ্রামে কী এমন হল যে গ্রামের অবস্থা এই রকম হয়ে আছে। এই বিষয়টা আমাকে জানতে হবে। সব দিক দিয়ে রহস্য ঘিরে ফেলছে। কী সেই রহস্য। আমাকে জানতে হবে। দোকানে বসে যখন বৃদ্ধগুলোর কথা শুনছিলাম, ঠিক তখনি আমার মোবাইলটা বেজে উঠল। পকেট থেকে বের করে মোবাইলের স্কিনের দিকে তাকলাম। বাবা কল দিয়েছে। কলটা রিসিভ করলাম,
– দিগন্তকেমন আছিস?
– জ্বি বাবা ভালো, তুমি কেমন আছ?
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি, আজ থেকে না কি তোদের অফিস বন্ধ?
– হ্যাঁ বাবা।
– গ্রামে কখন আসবি?
– বাবা আমি সাকিবদের গ্রামে আসছি, ওর একটা চাচাত ভাই আছে সে গতকাল মারা গেছে।
– ওহ আচ্ছা, তা কখন আসবি?
– জানি না বাবা, আমি দেখছি কখন আসতে পারে।
– ঠিক আছে। তোর মা চিন্তা করছে।
– বাবা মাকে চিন্তা করতে নিষেধ কর, আমি আসছি।
বাবা কলটা কেটে দিল। মোবাইল পকেটে রেখে আবার লোকগুলোর কথায় মনোযোগ দিলাম।
– আজকে কত বড় একটা ছেলে পানিতে পড়ে মারা গেল। এই কয়েকমাস ধরে তার মতো অনেক ছেলেই এভাবে মারা গেছে। এই গ্রামে কী হচ্ছে কে জানে?
কথাটা শুনে আমি আরও বেশি অবাক হয়ে গেলাম। আরিফের মতো আরও অনেক ছেলে মারা গেছে? কথাটা আমার কেমন যেন লাগল। আমি এবার নিশ্চিত এটার পিছনে যেকোন একটা কারণ আছে। কারণটা এখন অবশ্যই আমাকে জানতে হবে। এবং সেটা খুব তাড়াতাড়ি। আমার হাতে সময় বেশি নেই, ১২ দিন পর আবার অফিস খুলবে। এমনে অফিসের ছুটি ৮ দিনের। অফিসের এমডি ছুটিটা আরও বাড়িয়েছে। হঠাৎ মোবাইলটা আবার বেজে উঠল। সাকিব কল দিয়েছে, কলটা রিসিভ করলাম,
– দিগন্ত কোথায় তুই?
– এই তো একটু বাহিরে।
– আচ্ছা বাসায় আই।
– ঠিক আছে আসছি।
বসা থেকে উঠে দোকান থেকে বের হয়ে গেলাম। মাথার মধ্যে বার বার লোকগুলোর কথা ঘুরছে। গ্রামে কী এমন ঘটল? যার কারণে এতগুলো ছেলে মারা যাচ্ছে।

অভাগীর মাতৃত্ব

Now Reading
অভাগীর মাতৃত্ব

সকাল থেকে খুব বৃষ্টি হচ্ছে।বৃষ্টি থামার যেন কোনো নামগন্ধ নেই।মফিজ এই কারনে স্কুলেও যেতে পারছে না।কি করেই বা যাবে,তার যে ছাতা কিনার পয়সাও নেই।মফিজের বয়স ১২ বছর।সে ক্লাস সেভেনে পড়ে।স্কুলে তাকে নিয়ে সবাই ঠাট্টা করে।কারন সে প্রতিদিন একই জামা গায়ে দিয়ে যায়।তাও জামাটার অবস্থা খুবই শোচনীয়।পায়ে জুতা থাকে না।চুলগুলো এলোমেলো।যার এই অবস্থা সে আর বৃষ্টির মধ্যে স্কুলে যাবেই বা কি করে।আজও বৃষ্টি হচ্ছে।তাই মফিজ বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে আছে।পাশে বসে কাঁঁথা সেলাই করছেন তাঁর মা অভাগী।তাঁর মায়ের নাম ছিল আমেনা।কিন্তু এখন অভাগী নামেই গ্রামের সবাই তাকে চিনে।তাঁর নাম অভাগী হওয়ার পেছনে অনেকগুলা কারন রয়েছে।

অভাগীর বয়স যখন ৮ বছর তখন তাঁর মা মারা যান।তাঁর বাপ ছিল আধমাতাল।মদ,গাঞ্জা,সিগারেট কিছুই বাদ যেত না।অভাগীর বয়স যখন ১৪ বছর হলো তখন বৈশাখের এক ঝড়ের রাতে জসীম এসে তাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল।জসীম হলো হাশেম খান(অভাগীর বাবা)এর নিত্যদিনের অসৎসঙ্গী।অসৎ এই জন্য যে দুজনে মিলে বেশ ফুর্তি করেই নেশা করেন।জসীমের বয়স ৪০ বছর,হাশেম খানের থেকে বছর নয়েক ছোট।সে আজ ঝড়ের কবলে হাশেম খানের বাড়িতে এসে উঠেছে।দুজনে বসে এবারেও মদ গিলছে।সিগারেট জ্বালানোর দিয়াশলাই খুঁজে না পেয়ে হাশেম তাঁর মেয়েকে ডাক দেয়।অভাগী এসে দিয়াশলাই দিয়ে যায়।চোখে চোখ পড়ে জসীম আর অভাগীর।প্রথম দেখেই অভাগীকে ভালো লেগে যায় জসীমের।সে হাশেম খানের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেয়।হাশেম খান তখনি রাজি হয়ে যান।আড়াল থেকে সব শুনছিল অভাগী।তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।তাঁর থেকে প্রায় ২৫ বছরের বড় জসীমকে কিভাবে বিয়ে করবে সে?ঘরে দোর দিয়ে কাঁদতে থাকে অভাগী।পরের দিন সকালে হাশেম খান তাঁর মেয়েকে জসীমের কথা বলেন।বিয়ে করার নূন্যতম ইচ্ছা না থাকলেও তখন বাবার কথায় রাজি হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না তাঁর।কারন বাবার মুখের উপর কথা বলার দুঃসাহস তাঁর নেই।নিজের অমতেই বিয়ে হয়ে গেল অভাগীর।বাবার ঘর থেকে বিদায় নিল স্বামীর আদরে মনের কষ্ট দূর করবে ভেবে।বিয়ের পর কয়েকদিন ভালো কাটলেও বিয়ের দুই মাসের মাথায় জসীম আরেকটা বিয়ে করে বউ নিয়ে ঘরে এলো।

সতীন নিয়ে ঘর করা খুব কষ্টসাধ্য হলেও অভাগীর আর কোনো উপায় ছিল না।সতীনের কটু কথা শুনে গা জ্বালা করত।কিন্তু নিরবে তা সহ্য করতে হতো তাঁর।একটু প্রতিবাদ করতে গেলেই স্বামী জসীম তাঁর চুল ধরে উঠোনে আছরে ফেলত।এভাবেই কেটে গেল দেড় বছর।শ্রাবনের মাঝামাঝি এক সকালে অভাগী একটু পর পর বমি করতে থাকল।তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার মতো কেউ ছিল না।তাঁর সতীন যেন সে মরলেই বাঁচে।তবে আজ কি মনে করে জসীম গ্রামের বৃদ্ধ কবিরাজকে নিয়ে এল।কবিরাজ অভাগীকে খানিকক্ষন দেখে বললেন সে মা হতে চলেছে।জসীম আর রাহেলার(জসীমের দ্বিতীয় বউ)মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।তাঁরা চায় না অভাগীর সন্তান জসীমের পরিচয়ে বড় হোক।তাহলে রাহেলার সন্তানের কি হবে?তাই সেদিন রাতেই অভাগীকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় তাঁরা।সেই রাত থেকেই অভাগীর জীবনে শুরু হয় নতুন অধ্যায়।সে তাঁর মনকে শক্ত করে নেয়।এক সুদখোরের বাড়িতে কাজ করা শুরু করে।কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস চার মাস কাজ করেই তাকে সেখান থেকে বিদায় নিতে হয়।পোয়াতি কাজের লোক রাখবে না বলে জানায় বাড়ির মালিক।এবার অভাগীর বাঁচা কঠিন হয়ে পড়ে।সে মৃত্যুভয় করে না।কিন্তু তাকে বাঁচতে হবে তাঁর পেটের বাচ্চার জন্য।তাই সে জল খেয়ে দিন কাটাতে থাকে।কিন্তু জল খেয়েতো আর বেশিদিন থাকা সম্ভব নয়।দুইদিন পরই তার শরীর খারাপ করে।সে গাছের ছায়ায় নিস্তেজ হয়ে বসে থাকে।তখনি এক বৃদ্ধা মহিলার তাকে এই অবস্থায় দেখে দয়া হয়।তিনি তাকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান।

তখন অভাগী ৬ মাসের পোয়াতি।বৃদ্ধার ঘরে আড়াই মাস খুব ভালোই কাটায় অভাগী।রবিবারের এক সন্ধ্যায় তাঁর প্রসব বেদনা উঠে।বৃদ্ধ মহিলার সহায়তায় অভাগীর মাধ্যমে পৃথিবীতে আসে এক নতুন শিশু।এই শিশুর নামই মফিজ।পরে মফিজকে অনেক কষ্টে বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে আজ এত বড় করেছে অভাগী।তাঁর স্বামী রাহেলাকে নিয়েই সংসার করছে।কোনো খবর নেয় নি তাঁর।তবুও সে হাল ছাড়ে নি।তাঁর ইচ্ছা মফিজকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবে।সেজন্য তাকে যা যা করতে হয় সে সব করবে।মফিজের আদর্শ মা হয়ে উঠবে সে।মফিজের মধ্যেই বেঁচে থাকবে অভাগীর মাতৃত্ব।

শেষ বেলায় প্রার্থনা

Now Reading
শেষ বেলায় প্রার্থনা

পূর্ব আকাশে উদিত সূর্য পশ্চিমে যাত্রা করেছে। প্রায় সন্ধ্যা। যে কোন সময় সূর্য ডুবে যেতে পারে। আর তারপর বৃদ্ধ চোখ দুটোর ঝাপসা দৃষ্টি অমানিশায় একেবারে ঢেকে যাবে। তখন মোটা ফ্রেমের চশমা আর কোন কাজে দেবে না। এখনই চোখের দৃষ্টি বেশ ঝাপসা হয়ে এসেছে। চোখ থেকে চশমাটা খুলে শাড়ির আঁচলে সযতনে ঘোলাটে কাঁচ মুছে পরিষ্কার করছেন বেগম রোকেয়া। তিনি একজন নিঃসঙ্গ নারী, একজন বিধবা স্ত্রী, একজন মাতা। তার দীঘলকালো চুলের বর্ণ রূপালি হয়ে গেছে অনেক আগেই। পঞ্চ ইন্দ্রিয় অবসর নেয়ার পরিকল্পনা আটছে। কর্মচঞ্চল কেবল অনিয়ন্ত্রিত মস্তিষ্ক-সংরক্ষিত চলমান ছবির টুকরো যখনতখন চোখের জলে ভাসিয়ে দেয়। সময়-অসময় বোঝে না। অবশ্য মস্তিষ্কের কি দোষ যখন কাছের মানুষ সময়-অসময় বিচার না করে ছেড়ে চলে যায়?
হ্যাঁ। আবার তার মৃত স্বামীর কথা মনে পড়েছে। স্বামীর কথা মনে পড়তেই চশমাটা চোখে দিয়ে রোকেয়া ছুটে যায় পঁচনধরা আলমারিটার কাছে। তারপর প্রতিদিন একইভাবে আলমারি খুলে তার স্বামীর পোশাক বের করে। বোতামগুলোতে হাত বুলাতে বুলাতে স্বামীকে হারানোর বেদনা অনুভব করে। ভয়ঙ্কর সেই দিনটির কথা মনে পড়ে-

সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা মৃতদেহ সামনে রাখা হয়েছে। কতগুলো কৌতূহলী চোখ করুণ রসাত্মক কোন নাটক দেখার অপেক্ষায়। হয়তো এক্ষুণি সদ্য বিধবার আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠবে। আকাশ কাঁপিয়ে গর্জন হবে আর বর্ষণে বর্ষণে ধুয়ে যাবে সমস্ত রঙ, রঙহীন হবে আরও একটি পৃথিবী।
কিন্তু না। ধীরে ধীরে মৃতদেহ ধারণ করা কফিনটার দিক এগিয়ে যাচ্ছে। রোকেয়া যতই এগুচ্ছে ততই পায়ের নিচের মাটি যেন দূরে সরে যাচ্ছে। কফিন আর পায়ের নিচের মাটির দূরত্ব যেন শেষ হতে চাইছে না, পা দুটো ক্লান্ত। আর পারছে না-
কফিনটা এত দূরে রাখা হয়েছে কেন? আমি আর হাঁটতে পারছি না, আমার পা অবশ হয়ে আসছে। কেউ কফিনটা আরেকটু কাছে আনো।
নাটকীয়তা ঠিক জমে নি বোধ হয়। তাই আবহটা আরও একটু বিষাদময় করার জন্য উৎসুক ভীড় থেকে নানা মন্তব্য ভেসে আসছিল।
আহারে! কি করে সহ্য করবে এমন দৃশ্য!/ না জানি কি পাপ করেছিল /এমন মৃত্যুও মানুষের হয়!/ লাশটাকে চেনাও যাচ্ছে না।
প্রিয়জনের মৃত দেহকে কেউ লাশ বলছে- এরূপ একেকটা বাক্য কর্ণে তীর হয়ে বিঁধছিল তার। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যেতেই দূরত্ব কমাতে ব্যস্ত পা দুটো থামিয়ে চিৎকার করে উঠলো-
আপনারা একটু চুপ করবেন? হারিয়েছি তো আমার প্রিয়জন- আপনারা এত কোলাহল করছেন কেন? দয়া করে চুপ করুন। একেকটা শব্দ আমার কানে তীর হয়ে বিঁধছে। আমি আর শুনতে পারছি না। থামুন এবার। থামুন।
সাহস করে এবার বাধ্য হাত দুটো সাদা কাপড়টা সরালো- বেড়িয়ে এল বিকৃত মাংসপিণ্ড। বিকৃত মুখশ্রী দেখা মাত্রই বমির উদ্রেক হয়। চারিদিকে ছিঃ ছিঃ শোনা যায়-
ছিঃ ছিঃ স্বামীর মৃতদেহ দেখে কেউ বমি করতে পারে? এ কেমন স্ত্রী?
নিজেকে সামলে নিয়ে বললো-
এটা কার লাশ?
উৎসুক জনতা বললো-
হায়রে অভাগা নারী! এ তোমার স্বামীর মৃতদেহ। ঘন্টাকয়েক আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। চেহারাটা বিকৃত হয়েছে বলে তুমি তাকে চিনতে পারছো না।
না না! কোথাও ভুল হচ্ছে। সে তো আজ সাদা শার্ট পরেছিল। আমি নিজের হাতে তাকে পরিয়ে দিয়েছি। এই আঙুল দিয়ে বোতামগুলো আটকে দিয়েছি। আর এখানে যে আছে তার গায়ে তো লাল পোশাক।
ওহে শোকে মূহ্যমান নারী! তোমার স্বামীর সাদা শার্ট আর সাদা নেই, তার নিজেরই রক্তে লাল হয়ে গেছে।
হ্যাঁ, বোতামগুলো তখনও সাদা। রক্তে রঞ্জিত সাদা শার্টের বোতামগুলোতে হাত বুলিয়ে হঠাৎই হেসে ওঠে রোকেয়া-
হা হা হা। এটা সে নয়। সে নয় এটা। ঈশ্বরের দিব্যি! শার্টের বোতামগুলো তার প্রমাণ। এগুলো অন্য বোতাম।
কিন্তু না। কেউ এই সূক্ষ্ম যুক্তিটি আমলে নিল না। এমনকি তার শ্বশুরকুলের সকলেই ধরে নিল- এসব আবেগের কথা। সবাই স্বামীহারা স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। এসব সান্ত্বনায় রোকেয়ার যন্ত্রণা দ্বিগুণ হয়ে ওঠে-
মিথ্যে সান্ত্বনা দিও না আমায়। আমি আমার স্বামীকে চাই। অন্য কারও মৃতদেহকে আমার স্বামীর দেহ বলে মেনে নিতে বলো না।
এভাবে বিলাপ করতে করতে জ্ঞান হারায়। যখন জ্ঞান ফিরলো ততক্ষণে একটি অজ্ঞাত মৃতদেহ তার স্বামীর পরিচয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত।
প্রায়ই রোকেয়া তার স্বামীর চিন্তায় বিভোর হয়ে থাকে। সে ভাবে তার স্বামী আসলে কোথায়। সে কি বেঁচে আছে এখনও- ফিরে আসবে কখনও- নাকি তার দেহ অন্য কারও পরিচয়ে ঘুমিয়ে আছে- এসব ভাবতে গিয়ে প্রায়ই তার উনুনের সবজি পুড়ে যেত। আর পোড়া সবজি খাইয়ে একমাত্র সন্তানকে বড় করলো। এতটাই বড় যে এখন আর তার মাকে প্রয়োজন হয় না।
রোকেয়া ভাবে আজ তার স্বামী বেঁচে থাকলে হয়তো তাকে এমন নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করে হতো না। যে জীবন হয় নি যাপিত তার জন্য শোক অনুভব করে রোকেয়া। স্বামীর পোশাক বুকে জড়িয়ে গলা ফাটিয়ে কাঁদে।
ঈশ্বর! কি পাপ করেছিলাম আমি যে নিজের স্বামীর মৃতদেহটিরও সন্ধান পেলাম না- অন্যকেউ আমার স্বামীর পরিচয়ে কেন ঘুমোচ্ছে? এত বড় শাস্তি আমি কেন পেলাম!
চোখের জলে ভিজে যায় বৃদ্ধ এই নারীর মৃতস্বামীর পোশাক। তারপর কাঁদতে কাঁদতে চোখ ক্লান্ত হলে যথাস্থানে পোশাকটা রেখে পুনরায় আলমারিবদ্ধ করে। তারপর সে ধূলো মোছে।
জানালার কাঁচের ধূলো, চির ধরা আয়নার ধূলো, পুরোনো ছবির ফ্রেমের ধূলো। তবে ফ্রেমের ধূলোটা মোছে আঁচল দিয়ে- তার একমাত্র সন্তানের ছেলেবেলার ছবি। এই কোমল মুখটির দিকে তাকিয়ে অকালে স্বামী হারানো এই নারী বিধবা পরিচয়ে নিয়েই জীবন কাটিয়েছেন। বেলা শেষে তার উপলব্ধি হচ্ছে -এ যেন জীবনের সবথেকে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। যে একাকিত্বে ভোগে নিঃসঙ্গ থাকাটা তার জন্য অভিশাপ। কে জানতো একটিমাত্র সন্তান উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে গিয়ে ফিরে আসবে না!

সে এখন ভীনদেশী নাগরিক। কি নিষ্ঠুর সময়ের সিদ্ধান্ত – জননী আর সন্তান দুজনই একই পৃথিবীতে বেঁচে আছে। অথচ ভিন্ন নামের দুটি দেশ- যাদের মধ্যকার দূরত্ব কয়েক হাজার মাইল। মাঝেমধ্যেই রোকেয়া ভাবে- পুরো পৃথিবীটা মিলে যদি একটাই দেশ হতো! তবে কোন সন্তান তার মায়ের দেশছাড়া হতো না। ফ্রেমের ছবির দিকে তাকিয়ে আক্ষেপ করে রোকেয়া-
কেন তোকে পাঠালাম বাবা! এ কেমন শিক্ষা যা সন্তানকে মায়ের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়? আগে জানলে তোকে আমি এমন শিক্ষা দিতাম না ! দিতাম না! এ কেমন নিয়ম! একটা পৃথিবী – দেশ কেন এতগুলো! একটা ভূমি এতগুলো খণ্ড কেন!
রোকেয়া নিজের অশ্রু সংবরণ করে । সে ভাবে – আর কি কখনও সামনাসামনি দেখা হবে তার পুত্রের সঙ্গে? অবশ্য প্রযুক্তির কল্যাণে প্রায়ই তার পুত্রের সঙ্গে তার ভিডিও বার্তা বিনিময় হয়। কিন্তু ভিডিও বার্তা বিনিময় রোকেয়ার কাছে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতোই। তাতে তো স্পর্শ করা যায় না, গায়ের গন্ধ পাওয়া যায় না। তাই মা অন্তত একটিবারের জন্য হলেও পুত্রকে দেশে আসতে বলেন। কিন্তু পুত্র বলে-
কেমন আছো মা?
ভাল আছি বাবা। তুই কেমন আছিস?
এই তো আছি মা। তোমার চোখের অবস্থা কি এখন- আগের থেকে ভাল?
আগের মতোই ভাল। আমি বোধ হয় আর বেশিদিন দেখতে পাবো না। তার আগে তোকে একবার চোখ ভরে দেখতে চাই। তুই একটিবার দেশে আয় বাবা।
কি যে বলো না মা। ঠিকমত ওষুধ খাও – সব ঠিক হয়ে যাবে। আচ্ছা মা শোন, তোমার জন্য একটা পার্সেল পাঠাবো ভাবছি- তোমার কি কি লাগবে?
আমার কিছু লাগবে না বাবা। পারলে একবার দেশে আসিস। আর যদি তাও না পাড়িস তবে তোর একটা শার্ট পাঠাস আমায়।
শার্ট? আমার শার্ট দিয়ে তুমি কি করবে?
আমি তোর গায়ের গন্ধ নেবো বাবা।
হা হা হা

এভাবেই দেশে আসার প্রসঙ্গ হেসে উড়িয়ে দেয় ছেলেটি। কিন্তু জননী তো পুত্রের হাসিতে ভেসে যেতে পারে না। সে এক পরিকল্পনা করলো। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত করলো তার বাগানের পরিচর্যাকারী ইমাম হোসেনকে।
ইমাম হোসেন কখনও একবারে সাড়া দেয় না। সম্ভবত তার শ্রবণজনিত কোন সমস্যা আছে অথবা রোকেয়া বেগম বৃদ্ধা বলে তাকে অবহেলা করে। বেশ কয়েকবার ডাকার পর সে অবহেলা লুকিয়ে প্রভুভক্ত কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করে আর তখন তার সবগুলো দাঁত গোনা যায়-
কি করবো আপনার জন্য? একটিবার শুধু উচ্চারণ করুন।
একবার ডাকলে তো তুমি শুনতেই পাও না, একবার বললে করবে কি করে?
না মানে.. গাছে পানি দিচ্ছিলাম তো, তাই শুনতে পাই নি।
গাছে পানি দেয়ার সাথে না শোনার সম্পর্ক কি জানি না। থাক ওসব। আচ্ছা শোন, যে জন্য ডেকেছি- তোমায় একটু অভিনয় করতে হবে- পারবে?
অভিনয়? আপনি বললে সব পারবো। আমাদের পাড়ায় একবার যাত্রা-অভিনয় দেখেছিলাম।
শোন, এটা তোমাদের পাড়ার যাত্রা অভিনয় নয়। এটা বাস্তবিক অভিনয়।
মানে?
তুমি এখনই আমার ছেলেকে ফোন করে আমার মৃত্যুর সংবাদ দাও।
কিন্তু আপনি তো জীবিত। জীবিত মানুষকে মৃত বলবো- এ আমি পারবো না।
চলেই যাচ্ছিল ইমাম হোসেন। কিন্তু রোকেয়া কৌশল করে বললোয়-
কাজটা করতে পারলে তোমার বেতন দ্বিগুণ করে দেয়া হবে।
ইমাম দাঁড়ালো না।
আড়াইগুণ করা হবে।
তবু দাঁড়ালো না।
তিনগুণ করে দেব।

তারপর…. হা হা হা। অর্থের কাছে বেশিভাগ মানুষের আদর্শ পরাজিত হয়, কে কত দ্রুত পরাজিত তা নির্ভর করে চাহিদার উপর। ইমাম হোসেনও একই দলের। তাই সে অভিনয়ের জন্য রাজি হয়ে গেল এবং জন্ম হল আরও একজন নিপুণ অভিনেতার। নিপুণ অভিনেতা বলা এই অর্থে, রোকেয়া বেগমের বানোয়াট মৃত্যুর সংবাদ ভীনদেশের অভিবাসি পুত্র খুব সহজেই বিশ্বাস করলো। ইমাম ফোন রাখতেই পুত্রের জননী ফোনের ওপারে কি হয়েছে তা জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে-
ইমাম! আমার সন্তান কি বিশ্বাস করেছে আমার মৃত্যুর খবর?
হ্যাঁ। সে করেছে।
সে কি কাঁদছে তার মায়ের জন্য?
না। সে বোধ হয় বড় হয়ে গেছে- তাই কাঁদে না আর।
তাহলে বোধ হয় শোকে পাথর হয়ে গেছে। হাহাকারে তার বুক এতক্ষণে ভারী হয়ে উঠেছে। আর সেই ভার লাঘবের জন্য সে নিশ্চয়ই দেশে ফিরে আসবে, তার মায়ের মুখটা শেষবারের মত দেখতে। এতক্ষণে হয়তো দেশে ফেরার যাত্রাও শুরু করেছে। কিন্তু কখন ফিরবে? আমি যে অস্থির হয়ে আছি! ইমাম, আমার ছেলে কখন ফিরবে?
ফিরবে না। বলেছে দাফনের ব্যবস্থা করতে। কখনও এসে কবর জিয়ারত করে যাবে।
জননী জীবিত অথচ পুত্রের কাছে মৃত। এভাবে কাছে টানতে গিয়ে পুত্রকে একেবারেই দূরে সরিয়ে দিল রোকেয়া।

এভাবেই রোকেয়া বেগমের দিন কেটে যায় স্মৃতিচারণ করতে করতে। কখনও স্বামীর শোকে পাথর, কখনও পুত্রের জন্য কাতর। কখনও নিঃসঙ্গ জীবনের জন্য অনুশোচনা, কখনও নিজের ভাগ্যের প্রতি ভর্ৎসনা। এভাবেই কেটে যায় রোকেয়া বেগমের জীবনের শেষ দিনগুলো।

সূর্য অস্ত গেছে। আযানের সুর ভেসে আসছে কানে। এখন প্রার্থনার সময়। রোকেয়া বেগম প্রার্থনা করছেন। তার প্রার্থনায় আক্ষেপের কোন সুর নেই। শান্তরসে শুদ্ধ এই প্রার্থনা তার নিজের জন্য নয়। এই প্রার্থনা সকল বিধবা নারীর জন্য যারা মৃত স্বামীর পোশাক হাতড়ে কাঁদে। এই প্রার্থনা সকল জননীর জন্য যারা সন্তানের ভবিষ্যত সুনিশ্চিত করার অভিলাষে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করে। তাদের জন্য এ প্রার্থনা যারা সন্তানকে একটিবার কাছে পাবার জন্য অভিনেতা হয়ে ওঠে। প্রার্থনা তাদের জন্য যারা দীর্ঘশ্বাসে বার্ধক্য কাটায়।
আসুন এই প্রার্থনায় একাত্ম হই। প্রার্থনা করি বার্ধক্যে উপনীত সকল মানুষের জন্য, দীর্ঘশ্বাসে যেন কারও মৃত্যু না হয়।

ভুতের গল্প – পোড়ামুখো

Now Reading
ভুতের গল্প – পোড়ামুখো

গ্রামের নাম চরমিরকামারি। বিদ্যুৎ চলে এলেও ঘন গাছগাছালি এখনো গ্রামটিকে অজপাড়া গাঁয়ের পরিচয় দিয়ে রেখেছে। আজকে যে কাহিনীটা বলবো সেটা এ গ্রামেরই ঘটনা। ঘটনাটা ঘটে আমার এক চাচাতো ভাইয়ের সাথে। তার মুখে যা শুনেছি সেটাই গুছিয়ে লিখা আপনাদের জন্য।

রাত তখন একটা বাজে। আব্বা আম্মার কথা না শুনে ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছি। ঘণ্টায় ঘণ্টায় আব্বার ফোন কতদূর আসলাম, কিন্তু বিরক্ত হলেও মনে কেমন একটা শান্তি পাচ্ছিলাম। আব্বার শত বলা সত্ত্বেও এলাকার বাসস্ট্যান্ডে না নেমে আমি আলহাজ মোড়ে নেমে পরি। তখন ঘড়িতে বাজে ১ টা ৪৫ মিনিট।

“কিবা ঢাকা থেকে আইলা নাকি”, জোরে এক হাক শুনে চমকে পিছু চাইলাম। মোড়ের এক চা দোকানদার ডাক দিয়েছে। একটা দোকানি খোলা। বন্ধের প্রস্তুতি চলছে।”তো যাইবা কই হুনি”, দোকানদার বলে।”চাচা, ওয়াপদা গেট যাব। কলোনির মধ্যে বাসা”। “তো এখানে নামছো কেন?। কোনও গাড়ি থামবো না। বাসস্ট্যান্ডে নামা ভালা ছিল”। কথার উত্তরে শুকনো একটা হাঁসি দিলাম। ” হাঁটা দাও। বেশি না ৩০ মিনিটের রাস্তা।”, দোকানদার চাচা বলল।

দোকান বন্ধ করে দোকানদার হাঁটা ধরলো তার বাসার দিকে। পাশেই ডাল গবেষণা কলোনির মধ্যে তার বাসা( দোকানদারের সাথে কথাবার্তা এখানে উল্লেখ করে আপনাদের বিরক্ত না করাই ভালো)। একবার ভাবলাম সাথে যাবো কিনা ওই লোকের সাথে তারপর আবার কি মনে হলো, ঘুরে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলাম। ঘুটঘুটে অন্ধকার, ঠাণ্ডা হিমেল বাতাস বয়ে যাচ্ছে।

“ওই কে যাই?”, সামনের অন্ধকার দোকানের মধ্যে থেকে এক লোক বের হয়ে এল। ” ধুস শালা, আজকে কি হইছে। লোকজন একটার পর একটা আসতেছে”। আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে বুকে ফু দিলাম। নাইটগার্ড। বেশ কয়েকটা দোকান আর সাথে ওয়ালটনের শো-রুম আছে মোড়ে উপর, সেটা পাহারা দিচ্ছে এক বুড়া চাচা। আমার গেটআপ দেখে চোর না বুঝে ছেড়ে দিলো। সাথে আবার কিছু দূর এগিয়ে দিয়ে গেল। হাঁটছি তো হাঁটছি। সময় যেন আর যাই না। ভেলুপারা আর বরইচারা এর মাঝামাঝি একটা অনেক পুরানো একটা সাঁকো। কাহিনীর শুরু এখান থেকেই।

সাঁকোর উপর উঠবো এমন সময় দমকা হাওয়া বয়ে গেলে। সাঁকোর চার পাশটা খোলা। আখের চাষ করা হয়েছে। সাঁকোতে যেই পা দিয়েছি অমনি মট করে কি যেন ভাঙলো। চমকে উঠে নিচে তাকালাম কই কিছু তো নেই। খিক খিক করে হাসি শুনলাম। আঁখের পাতা গুলো তুমুল বেগে দুলতে শুরু করলো। মনে মনে আল্লাহ আল্লাহ করা শুরু করলাম। এর মধ্যে কোন ফাঁকে রাস্তার মধ্যে চলে এসেছি টের পেলাম প্রচণ্ড হর্নের শব্দে। জানটা বোধহয় আজকে যাবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে গাড়িটা আমার মধ্যে দিয়ে চলে গেল। হাসি যেন থামে না কাদের যেন। কে কে বলে উঠলাম। সাঁকো পার করেছি এমন সময় দেখি একটা কঙ্কাল হেটে আমার সামনে এলো। মাথার খুলিটা হাতে ধরা। একবারে মুখের সামনে এসে খুলিটা উঁচু করে আমার মুখের কাছে ধরলো। গরম শ্বাস আমার মুখের উপর পরছিলো। অন্ধকার তারপরও কঙ্কালটাকে আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। গায়ে কোন মাংস নেই। কিন্তু চোখ দুটো ঠিকই আছে। ভয় কাহাকে বলে আর কত প্রকার মনে মনে পড়ছিলাম। কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে কঙ্কালটা পাশের আঁখের জমিতে নেমে গেল।

হঠাৎ যেমন শুরু হয়েছিল তেমনি হঠাৎ করে থেমে গেল সব। জোরে হাঁটা ধরলাম। পণ করলাম আর কোন দিকে তাকাবো না। ভয় দুর করার জন্য গান গাওয়া শুরু করলাম। বাড়ি সেখান থেকে আরও ১০-১২ মিনিটের দূরে। তার মাঝে একটা নিরিবিলি রাস্তা। আগের রাস্তার মতো এটা অত ফাঁকা ছিল না। এই জায়গাটা সব থেকে ভয়ংকর ছিল। রাস্তার ধার ধরে টানা ঝাউ গাছ শাকরেগাড়ি মোড় পর্যন্ত, তারমাঝে ছোট একটা সাঁকো। সাঁকোর কাছাকাছি এসে দেখি, সেটার উপরে একটা লোক বসে। এতরাতে এখানে কাউকে দেখে আমার গলা শুকিয়ে এল।” ভাই কাউকে পাইলাম অবশেষে”, লোকটা বলে উঠলো। ” ভাইজান ম্যাচ আছে, একটা সিগারেট খাব”। একে তো অমাবস্যা রাত তার উপর জায়গাটা অনেক অন্ধকার। লোকটার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। দৌড় দেবার সাহস হচ্ছিলো না, পায়ে বল পাচ্ছিলাম না। মনে শক্তি সঞ্চার করে এগিয়ে গেলাম। সিগারেট যদিও খাই না, তবু লাইটার পকেটে থাকে আমার কখন কি কাজে লেগে যাই।

লাইটার জ্বালিয়ে যেই মুখের কাছে ধরেছি তারপর যা দেখলাম সেটা বুঝি না দেখলেই ভালো করতাম। বীভৎস একটা মুখ আমার সামনে। পোড়া চামড়া বের হয়ে ঝিকঝিকে সাদা দাঁত দেখা যাচ্ছে। চোখের একটার পাতা নাই আর আরেকটা চোখ তো পুরাটাই নাই। চুল পুড়ে চকচকে খুলি বের হয়ে এসেছে। লাইটারের আলোয় অর্ধ পোড়া চোখের তারা মিটমিট করে জ্বলছে। “ভাইজান ভয় পেলেন নাকি”। পোড়া হাতের ছোঁয়া আমার চমক ভাঙলো। ঠিক সেই সময় আগের খিক খিক হাসিটা আবার শুনতে পেলাম। লোকটার দিকে তাকাতেই দেখলাম এই সেই একই হাসি। দাঁত বের করে লোকটা হাসছে। হাত সরিয়ে নিতে চাইলাম। কিন্তু গায়ের সব শক্তি যেন কেউ শুষে নিয়েছে। টানতে টানতে আমাকে রাস্তা থেকে নামিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো পাশের জমিতে। খোলা মাঠের মত কিন্তু আম গাছের সারি আছে চারদিকে। মট করে শব্দ হলো। চিনচিন করে উঠলো বুকের ভেতর।” কি করলেন? কি করলেন?”, লোকটা বলে উঠলো। লোকটার ধরা হাতটার দিকে আমি তাকালাম। ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে হাতটা উল্টা দিকে বেকে গেছে। ভয় ও ব্যথায় জোরে চীৎকার করে উঠলাম। বুঝলাম যে কোন মুহূর্তে জ্ঞান হারাবো। চোখ বন্ধ হবার আগ মুহূর্তে শুনতে পেলাম,” এত নড়াচড়া করলে তো এমন হবেই। একটু গল্প করতে চাইলাম আর মামা আপনি”।

পরদিন সন্ধ্যার দিকে আমার জ্ঞান ফিরে। পরের কাহিনীটুকু হলো, আব্বা আমাকে ফোন দিয়ে না পেয়ে, চাচা আর আমাদের মিলের লোকজন নিয়ে খুঁজতে বের হন। আমার চীৎকার শুনতে পেয়ে ওই জায়গাতেও আসেন কিন্তু ওখানে ছিলাম না আমি। আমাকে নাকি বাসার দরজার সামনে পাওয়া যায়। আমার জামা চিরে নাকি আমার ভাঙ্গা হাতটা বাঁধাছিলো। হাতের যে জায়গাটা লোকটা ধরেছিল ওই জায়গাটা কালো ফোস্কা ভরা ছিল।

আমার উনি

Now Reading
আমার উনি

“এই যে ম্যাডাম, শুনছেন?”
“জ্বি বলুন।”
“কী বলবো?”
“আপনি কী বলবেন তা আমি কী জানি?”
“আমি কি আপনাকে বলেছি যে কিছু বলবো?”
“তো ডাকলেন যে?”
“ডাকলাম কোথায়? আমিতো কেবল জিজ্ঞেস করেছি আপনি শুনছেন কিনা।”
“আমি শুনছি কিনা তা জেনে আপনার কী হবে?”
“আসলে আপনার কান ঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করতেই জিজ্ঞেস করেছি শুনছেন কিনা।”
“অদ্ভুত! আমার কান ঠিক থাকলেই আপনি কী করবেন?”
“এটা একটা প্রশ্ন বটে। আসলেইতো কী করবো আমি?”
“আপনিই বলুন না কী করবেন।”
“যাক বাবা, ভুলে গেছি। মনে হলে অন্যদিন বলবো। আজ চলি।”
“হা হা হা! অদ্ভুত আপনি। ভীতুর ঢেঁকি। আচ্ছা, যান তাহলে আজ। আমিও চলি।”

কোনমতে চলে এসেছিলাম সেদিন। আসলে আমি গিয়েছিলাম ওকে প্রপোজ করতে। ‘ওকে’ করে কেন বলছি? আমি কি তার নাম জানি না? সারাদিনইতো তার নাম আওড়াতাম। এখন ‘ওকে’ করে কেন বলছি? উফ! তার নাম ভুলে গেছি আমি! এমন কেন হলো? তার নামইতো আমার বেশি মনে থাকার কথা অথচ তার নামই এখন ভুলে গেলাম? নাহ, ব্যাপারটা মানা যায় না। অবশ্য না মানা গেলেও করার কিছু নেই। যেই গুরু, সেই কাউ।

ওকে ডাক দেওয়ার সাথে সাথে যখনি ঘুরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে হা করে তাকিয়েছিল আমার মনে হয়েছে আমি আর আমি নেই। আমি কোনো এলিয়েন হয়ে গেছি। আমার হৃদপিন্ডটা কোনো এক বিশেষ পদার্থে তৈরি যার ভর এক মণেরও বেশি। ধড়াম ধড়াম শব্দে এটি স্পন্দিত হচ্ছে যার শব্দ আমার কান ছাপিয়ে তার কানেও মনে হয় চলে যাচ্ছে। আমার মস্তিষ্কের বিশেষ অংশে ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেছে। স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। তাকে প্রপোজ করার কথা ভুলে গেছি। আমার দেহের ভেতর কোথাও শর্ট-সার্কিট হয়েছে, যার দরুণ আমার দেহের বাইরে ঘাম নামক বিন্দু বিন্দু পানির কণা জমছিল। শুনেছি ঘাম নামক এই পানির কণার স্বাদ নাকি নোনতা। কখনো চেখে দেখা হয়নি। সেই সময় একটু চেখে দেখা যেত। অবশ্য সেই সময় আমার জিহবাটা কাজ করতো কিনা সন্দেহ ছিল। শর্ট সার্কিটের কারণে জিহবার ইলেক্ট্রিসিটির লাইনটাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কিনা কে জানে। শরীরটাও বেশ দুর্বল লাগছিল। মনে হচ্ছিল দেহের পাওয়ার প্লান্টে গোলমাল হয়েছে। যেকোন সময় বিস্ফোরিত হয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারি। অবশ্য মনে মনে তাই চাইছিলাম যেন বিস্ফোরিত হলেও অন্তত তার চোখের সেই দৃষ্টির বাইরে যেতে পারি। তবে ভাগ্য ভালো দেহের অক্সিলিয়ারি পাওয়ার সিস্টেম দ্রুত চালু হয়ে কোনোভাবে আমাকে সেই অবস্থা থেকে বাঁচিয়েছিল।

তবে একটা প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর এখনো আমি পাচ্ছি না। সে আমাকে ভীতু কেন বলেছিল? কয়েকদিন আগে কুকুরের দৌড়ানি খেয়ে তার সামনে দিয়েই পালিয়েছিলাম বলে? এতে ভীতু ভাবারতো কোনো কারণ নেই। তাকে কুকুর দৌড়ানি দিলে সে কি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতো? তাহলে কেন ভীতু বললো? আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে তাকে প্রপোজ করতে গিয়েছিলাম এটা সে বুঝতে পেরেছে? যদি বুঝতেই পেরে থাকে তাহলেতো এটাও বুঝে ফেলেছে যে আমি আর ভয়েই প্রপোজ করিনি পরে। ইশ! কী লজ্জা! এখন আমি ওর সামনে আবার যাবো কিভাবে? আমাকে আশেপাশে দেখলেই বা সে কী ভাববে? ছোটবেলায় একবার কুকুরের কামড় খাওয়ার পর থেকেই কুকুরকে আমি ভীষণভাবে এড়িয়ে চলি। দেখলেই ভয় করে। এখনতো মনে হচ্ছে তার কামড় না খেয়েও তাকে আমার এড়িয়ে চলতে হবে। হয়তো দেখলে ভয় পাবো না, কিন্তু যে লজ্জাটা পাবো তা কি যেকোনো প্রকার ভয়ের থেকে বেশি নয়? বুঝেছি আমার এ জীবনে তাকে আর প্রপোজও করা হবে না, পাওয়াও হবে না। আমার পিউর লাভের এভাবে সমাপ্তি খুবই বেদনাদায়ক। যাই, এবার একটু ঘুমুই। কাল থেকে তাকে এড়িয়ে চলার প্রস্তুতি নিয়ে চলতে হবে।

“এই যে মিস্টার, এতদিন কোথায় ছিলেন? আমার কান ঠিক থাকলে আপনি কী করবেন তা এখনো মনে হয়নি?”

যাক বাবা, ধরা খেয়ে গেলাম। এতো প্রস্তুতি নিয়ে এড়িয়ে চলেও কোনো লাভ হলো না। কিন্তু এখন আমি কি উত্তর দিব? আর আজ যদি কোনো উত্তর না দিই তাহলেতো ও আমাকে পেলেই এটা জিজ্ঞেস করবে আর আমি প্রতিনিয়ত লজ্জার চুকা কামড়ে লাল হবো। উফ! দেরি হয়ে যাচ্ছে। এখনি কিছু একটা উত্তর দিতে হবে। খোদা, আজ একটু সহায় হও। আজ যেন আর এলিয়েন না হই, পাওয়ার সাপ্লাইয়েও যেন আর গন্ডগোল না হয়।

“ইয়ে মানে……ইয়ে মানে আরকি ইয়ে…”
“কিসব ইয়ে ইয়ে করছেন? আমি ইয়ো ইয়ো সং শুনতে আসিনি। কান ঠিক থাকলে কী করবেন সেইটাই বলুন।”
“আসলে হয়েছে কি আপনার কানটা অনেক সুন্দর। ওটা ঠিক আছে কিনা তাই জানতে ইচ্ছা হয়েছিল।”
“কান সুন্দরের সাথে ঠিক আছের কী সম্পর্ক?”
“যেমন ধরুন অভিনেত্রী সারিকা, ওর চেহারাটা কত সুন্দর অথচ কন্ঠটা কেমন ঘেড়ঘেড়ে। তাই ভেবেছিলাম আপনার এতো সুন্দর কানেও কোনো ঘেড়ঘেড়ে সমস্যা আছে কিনা।”
“কানে আবার কীরকম ঘেড়ঘেড়ে সমস্যা থাকে?”
“ইয়ে মানে হতে পারে না যে আমি খুব সুন্দর কন্ঠে কথা বললাম অথচ আপনি সেটা ঘেড়ঘেড়ে কন্ঠে শুনলেন কিংবা একেবারেই শুনলেনও না, আই মিন বয়রা, হতে পারেন না?”
“কী!!! আপনি আমাকে বয়রা বললেন? আপনার বাড়িতে আজ বিচার দিব।”
“না না, আপনাকে আমি বয়রা বলিনি। আপনি বয়রা হলে কি আমাকে আজ এভাবে উন্মুক্ত জেলখানায় বন্দী হয়ে জেরায় পড়তে হতো?”
“ওতসব আমি বুঝি না। এক হয় এবার আসল সত্যটা বলুন, নাহয় আমি আপনার বাড়িতে গিয়ে বিচার দিব যে আপনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের সুন্দর কান খুঁজেন। খুঁজে পেলে সেটা ঠিক আছে কিনা জানার জন্য রাস্তার মাঝেই ডাকও দেন।”

ফাইস্যা গেছি, পুরা মাইনকা চিপায় ফাইস্যা গেছি। খোদা, আমার বুদ্ধিটা একটু খোলে দাও। সত্য না বলে এবার উপায় নাই। পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানোর চেয়ে সত্য বলে দেওয়াই ভালো হবে। আর এমন সুযোগ দ্বিতীয়বার আসবেও না। এইতো আমার বুদ্ধি খুলতে শুরু করেছে। এবার তাহলে আরেকটু ভাবি। সেদিন যেভাবে আমাকে ভীতু বলেছে তার মানে ও জানে আমি তাকে প্রপোজ করতে চাচ্ছি। আর জানার পরেও ও যেহেতু আজ নিজেই আমাকে ডেকেছে তার মানে ও চায় আমি তাকে প্রপোজ করি। আর ও যেহেতু চায় আমি তাকে প্রপোজ করি এর অর্থ বেশিরভাগ সম্ভব ও রাজী। মেয়েদের বুক ফাটেতো মুখ ফাটে না স্বভাবের কারণেই হয়তো ও সরাসরি কিছু বলতে পারছে না, আমাকে দিয়েই বলাতে চাচ্ছে। সুতরাং সমস্যা সব ডিশমিশ। এবার প্রপোজটা করেই ফেলি। তবে একটু ভিন্নভাবে করলে কেমন হয়? উইল ইউ মেরি মি কিংবা তোমাকে পছন্দ করি ভালোবাসি কমন হয়ে গেছে, কেমন ক্ষ্যাত ক্ষ্যাত লাগে! একটু ভিন্নভাবে এপ্রুচটা নিই। কান নিয়েই যেহেতু কথা হচ্ছে তাই কান দিয়েই প্রপোজ করি।

“এই যে মিস্টার…, এতো কী ভাবছেন? সত্য বলতে ভয় হচ্ছে? আজ কোনো ভয় টয় মানবো না। এক হয় সত্য বলবেন নাহয় বাড়িতে বিচার যাবে, হু, বলে রাখলাম।”
“আচ্ছা বলছি।”
“হু, বলেন।”
“আপনার ওই সুন্দর কান দুটোকে, মধ্যরাতে, ফিসফিসিয়ে কথা শোনাতে চাই, এবং তা বাকিটা জীবনের প্রতিটা দিনের জন্য। দিবে আপনার কানটা ওই অধিকারটুকু?”
“কানকেই জিজ্ঞাসা করুন।”
“কানতো বলতে পারে না, কেবল শুনতে পায়।”
“তবে কান কথা শুনে সে কথা যাকে পৌঁছে দেয় তাকে জিজ্ঞাসা করুন।”
“কানতো কথাটুকু শুনে নিজের কাছে রেখে দেয়নি। যাকে পৌঁছে দেওয়ার তাকে ঠিকই দিয়েছে। তবে সে কেন উত্তর দিচ্ছে না?”
“তাকে সরাসরি একবার জিজ্ঞেস করেই দেখুন না উত্তর দেয় কিনা।”
“আচ্ছা মেয়েতো বাবা!”
“হুম, আমি আচ্ছা মেয়েই। এখনো সময় আছে ভেবে দেখার। সময় থাকতে সাবধান।”
“যা ভাবার অনেক আগেই ভাবা হয়ে গেছে। এখন আর নতুন করে কোনো ভাবাভাবি হবে না। আচ্ছা, বলছি।”
“হুম, বলুন।”
“বাকীটা জীবনের প্রতিটা মধ্যরাতে আপনার কানে ফিসফিসিয়ে কথা বলার অধিকারটুকু দিবেন আমায়?”
“উফ! কী ক্ষ্যাত! আপনি করে বলে! আপনি করে বললে দিবো না।”
“ওরে বাবা! এ কার পাল্লায় পড়লাম! আচ্ছা তুমি করে বলছি।”
“কার পাল্লায় পড়েছেন পড়ে বুঝাবো। এবার বলুন।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করলাম, “বাকীটা জীবনের প্রতিটা রজনীর মধ্যাংশে তোমার কানে ফিসফিসিয়ে লজ্জা নম্রত কন্ঠে কথা বলার অধিকারটুকু দেবে আমায়?”

এরপর ওর উত্তর কী হয়েছিল তা বোধ করি না বললেও চলবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সেই যে ওর নাম ভুলেছি আর মনে পড়েনি। ওকে যে জিজ্ঞেস করবো সে উপায়ও নেই! জিজ্ঞেস করলেই নিশ্চিত বারোটা বাজাবে। সম্পর্ক হতে না হতেই তা হুমকীর মুখে পড়বে। আবার আমি চাইলেই অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে ওর নামটা জেনে নিতে পারি। ও হয়তো জানবে না ওর নাম ভুলে যাওয়ার ব্যাপারটা, কিন্তু আমি মনে করি আমার ভেতর ওর যে সত্তাটুকু আছে তাকে অপমান করা হবে। আমি ওর নাম ভুলে গিয়ে অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছি তা কেমন করে হয়? ওয়েট! ওয়েট!! আমার ফোনেইতো ওর নাম আছে। ওর নামে কয়েকটা কবিতা লিখেছি, সেগুলো ওপেন করলেইতো কবিতার মাঝে ওর নাম পাবো। কিন্তু না, আমি এটাও করবো না। আমি জানি ওর নামটা আমার মনের কোথাও না কোথাও আছে। হয়তো আমার সাথে লুকোচুরি খেলছে। তবে ধরা এক সময় ঠিকই পড়বে। কিন্তু ততদিন? ততদিন ওকে মনে মনে কী নামে ডাকবো? “ও” কেমন হয়? আই মিন “আমার ও”। না না, এটার চেয়েও আরেকটা আদুরে নাম দেওয়া যায়। “উনি”। রুনি, মুনি, ভুনি কত নামইতো হয়। আমি নাহয় আপাতত মনে মনে ওকে “উনি” বলেই ডাকলাম।

ফেসবুকে লেখক: Rihanoor Protik