3
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
 
 
ফ্রেশ!
REGISTER

পরস্পর বিরোধী তিন দেশের প্রত্যেকেই চীনের পরম মিত্র

Now Reading
পরস্পর বিরোধী তিন দেশের প্রত্যেকেই চীনের পরম মিত্র

মধ্যপ্রাচ্যের তিন শক্তিধর দেশ ইরান, সৌদি আরব আর ইসরায়েল পরস্পর বিপরীত শিবিরে অবস্থান করছে দীর্ঘদিন ধরেই। শুধু বিপরীত শিবিরে বলা হলে কম বলাই হবে এরা প্রত্যেকেই একে অপরের ঘোরতর শত্রু। ব্যাপারটা এমনযে তাদের ভেতর আদতে কোন সুসম্পর্কই নেই আর যা দেখা যায় তা বেশ বৈরী ভাবাপন্ন। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো এই তিনটি রাষ্ট্রই চীনের সাথে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। হিসেব যদিও কিছুটা জঠিল কিন্তু সাধারণের বুজতে অসুবিধা নেই এই বৈপরীত্যের।  মধ্যপ্রাচ্যে চীনের তিনটি লক্ষ্য – জ্বালানি নিরাপত্তা, হাই টেক সেক্টরে বাণিজ্যের সুযোগ, এবং বেল্ট এ্যান্ড রোড উদ্যোগে বিনিয়োগ। এগুলোর সাথে ইরান, ইসরায়েল এবং সৌদি আরবের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারটা মিলে যায়। বিশ্ব বেশ পূর্ব হতেই দুই শিবিরে বিভক্ত যার একটার নেতৃত্ব দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যটির রাশিয়া ও চীন। কোন দেশ যদি অন্যদেশের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে কিংবা যুদ্ধংদেহীভাব প্রকাশ করে সেক্ষেত্রে দেখা যায়যে কোন পক্ষকে দুই শিবিরের কেউ সমর্থন দিলে অন্য পক্ষকেও শিবিরের অপর পক্ষ সমর্থন প্রদান করে। এটা কেবল যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ করা দেশ সমূহতেই প্রযোজ্য হয়। আসুন ফেরা যাক মূল জায়গায় যেটা নিয়ে শুরুতেই আলোকপাত করেছি। সৌদি আরব, ইরান আর ইসরায়েল প্রত্যেকেরই মধ্যে রয়েছে অপরের সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস এবং তিক্ততা। তারা একে অপরকে যেভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে শাসিয়ে থাকে তাতে যেকোন মুহূর্তে পরস্পরের ভেতর একটি যুদ্ধের সম্ভাবনা বিরাজ করে।  দেখা যায়যে পরস্পর বিরোধী দুই দেশের মধ্যে ইরান হচ্ছে শিয়া আর সৌদি আরব হচ্ছে সুন্নি মতাদর্শের মুসলিমদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ। কিন্তু অপর তিন মুসলিম প্রধান দেশ সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ফিলিস্তিনে তারা তাদের মিত্রদের দিয়ে পেছন থেকে প্রক্সি যুদ্ধ লাগিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে ইরান এবং সৌদি আরব দুটি দেশই ইসরায়েলের কট্টর সমালোচক এবং এই ইহুদী রাষ্ট্রটির সাথে কোন আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কই রাখেনি। অন্যদিকে ইরানের দাবী করা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিকে এক প্রকার হুমকি বলেই মনে করে ইসরায়েল আর সৌদি আরব। সৌদি আরব এবং ইসরায়েল আবার আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইরানের প্রধান শত্রুতে পরিণত আজ। চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শীতল যুদ্ধ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ইরানের সাথে চীনের সুসম্পর্ক দেখে অনেকেই ভাবেন অপর দুইদেশের পক্ষেতো রয়েছে আমেরিকা। এটা একদমই ভুল ধারণা, মধ্য প্রাচ্যের এই বিষয়টিতে চীন একটু অন্যভাবে রাজনীতি খেলছে। সৌদি আরব এবং ইসরায়েল এর সাথেও রয়েছে চীনের সুসম্পর্ক। এই তিন শক্তির আঞ্চলিক বৈরিতা চীনের সম্পর্কের উপর কোনরুপ প্রভাবই ফেলে নি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে চীন মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিধর দেশগুলোর ক্ষেত্রে দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করেছে। চীন মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করলেও চীনের মত কোন শর্ত জুড়ে দেয়নি। চীন বারবারই বলে এসেছে কোন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিংবা মতাদর্শ পরিবর্তনে তারা প্রভাব বিস্তার করতে আগ্রহী নয়।

এদিকে দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ দেশগুলোর সাথে চীনের রাষ্ট্রীয় সফর বিনিময় হয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি জুন মাসের শুরুতেই চীনে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর সাথে সাক্ষাৎ করে এসেছেন । উল্লেখ্য যে, ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর আন্তর্জাতিক যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছিল ঠিক সেসময়ই চীনের সাথে তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এমনকি ইরাক-ইরান যুদ্ধকালীন চীন ছিল ইরানের অস্ত্রের প্রধান উৎস। এছাড়াও আরো অনেক ক্ষেত্রে চীন এগিয়ে এসেছে ইরানকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা দিতে। বিনিময়ে চীনও সুবিধা আদায় করে নিয়েছে, তারা ইরানের তেল আমদানির পথ প্রসস্থ করেছে। ইরানকে বন্ধু ভাবা কিংবা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা দেয়ার পেছনে চীনের কিছু নীতিগত বৈশিষ্ট স্পষ্ট। প্রধান কারণ হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য ইরানের অবস্থান এমন এক জায়গায় যেখানে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যখান বরাবর এবং  তা চীনের ‘বেল্ট এ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ নামে বিশাল অবকাঠামো প্রকল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীন এই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কথা বিবেচনা করে এটিকে বাণিজ্যের নতুন করিডোর বানাতে তৎপর। এদিকে “ইরান ডিল” নামক পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহারে কার্যত লাভ হয়েছে চীনেরই। কেননা ইরানে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ফলে তাদের সে শূন্যস্থান পূরণ করতে মরিয়া চীনা কোম্পানিগুলো। এ লক্ষ্যে বিনিয়োগের নতুন কৌশলও নির্ধারণ করতে চলেছে চীন।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চিত্রটা একটু ভিন্ন বটে, জাতিসংঘে উত্তাপিত অনেক বিষয়ে যদিও চীন বরাবরই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভেটো দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমানে ইসরাইলেও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে চীন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও চীনের সাথেও দ্রুত গতিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলও ভিসা অবমুক্ত করে দিয়েছে চীনা পর্যটকদের জন্য, ফলে বছরে গড়ে প্রায় লক্ষাদিক চীনা নাগরিক সেখানে ভ্রমণ করছেন। উচ্চ প্রযুক্তি সেক্টরে ইসরায়েলে প্রায় ১৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। গত বছর চীন সফর করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বিনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি তার বাণিজ্যিক এই সফরে দুদেশের মধ্যে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের চুক্তি সম্পাদন করেছেন।

সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই নীতি অনুসরণ করছে চীন যদিও তারা ভালভাবেই জানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের পরম মিত্র। চীন মধ্যপ্রাচ্যে তার বিনিয়োগ বাড়াতে সৌদি আরবে অবকাঠামোগত প্রকল্পে আগ্রহী। ইতিমধ্যেই সৌদিআরবের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে চীন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রায় সবক্ষেত্রেই মতৈক্য নেই। যেমন ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থক সরকারকে চীন হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সমর্থন দিচ্ছে, কিন্তু সিরিয়ায় তা উল্টো। সেখানকার গৃহযুদ্ধে চীন আবার বাশার আল-আসাদ সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে যা সৌদি আরবের চরম শত্রু। সবকিছুর পরও গত বছর সৌদি বাদশা সালমান চীন সফর করেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর সাথে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সাক্ষাতকার করেন। বলা হচ্ছে এটাই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের সাথে সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশের প্রধানের সাক্ষাৎ।

নয়া বিশ্বব্যবস্থার স্বরূপ

Now Reading
নয়া বিশ্বব্যবস্থার স্বরূপ

দ্বি-মেরুভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থা ভেঙ্গে যাবার ফলে, এখন কোন ধরণের বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠছে এ ব্যপারে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে এবং দ্বিতীয় কোন বৃহৎ শক্তি না থাকায় বিশ্ব রাজনীতিকে নিজের ইচ্ছানুযায়ী পরিচালনা করবে। সাময়িকভাবে হয়তো এর পেছনে সত্যতা আছে। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে দেখা যাবে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন আর এককভাবে বিশ্বরাজনীতির নিয়ন্ত্রক নয়। বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রভাব বিস্তার করছে সত্য, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি, ইউ, জাপান, রাশিয়া এবং চীনের ভূমিকাও বাড়ছে। ১৯৯৪ সাল থেকে ইউরোপে অভিন্ন ইউরোপের ধারণা কার্যকর হতে শুরু করেছে। ম্যাসট্রিষ্ট চুক্তির ফলে ১৯৯৭সালে ইউরোপ রাজনৈতিকভাবে এক হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ১জানুয়ারি থেকে একক ইউরোপীয় মুদ্রা চালু হয়েছে। এক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অর্থনৈতিক একটা শক্তি হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে আবির্ভূত হচ্ছে।

তবে একটা বিষয় লক্ষনীয় যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে পরিবর্তন ঘটলে, তা ইউরোপের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলে। এদিকে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান এবং তার ঘোষিত নীতি যদি তিনি কার্যকর করার উদ্যোগ নেন, তা বিশ্বে এক বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। বিশেষ করে নিরাপত্তা ও বৈদেশিক সম্পর্কের ব্যাপারে তিনি যেসব প্রস্তাব করেছেন বা দিয়েছেন, তা যদি তিনি কার্যকর করেন, তাহলে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসবে। এদিকে বদলাতে শুরু করেছে ইউরোপের রাজনীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় সেখানে এক ধরনের শ্বেতাঙ্গ উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্ম দিয়েছিল। আর এখন তার ঢেউ এসে লেগেছে ইউরোপে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় ইউরোপের উন্নয়নের দায়িত্বভার ইউরোপীয়দের হাতেই থেকে যাবে। এমনকি রাশিয়ার উন্নয়নে এরা একটা গ্রহণযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। যার অর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু উত্তর আমেরিকায় ও ল্যাতিন আমেরিকায় তার ভূমিকাকে সীমাবদ্ধ করে রাখবে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতেও ইউরোপ তথা যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা হবে সীমিত। এক্ষেত্রে এ অঞ্চলে জাপান ও চীনের ভূমিকা বাড়বে। জাপান এখন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। বিভিন্ন দেশে জাপানি পুঁজি বিনিয়োগ হয়েছে। জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে জাপানের ভূমিকা বাড়ছে। জাপান নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হতেও চায়। ফলে নয়া বিশ্ব ব্যবস্থায় জাপান হবে অন্যতম একটি শক্তি। অন্যদিকে চীন আগামী শতাব্দীর আগেই অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। তাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার এখন অনেক বেশি। উপরন্তু জনবলের কারণে চীন একটি বৃহৎ শক্তি হিসেবেই গণ্য হবে। তবে বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের অভিজ্ঞতা কম। চীন যে ধ্রুপদী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে থাকছেনা, এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই। চীনে যতদিন সেনাবাহিনী কমিউনিস্ট পার্টির পেছনে তাদের সমর্থন অব্যহত রাখবে ততদিন পার্টি ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে। সেনাবাহিনী সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলে চীনের অবস্থা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মতোও হতে পারে। তবে চীন একটা উঠতি শক্তি, বিশ্ব ব্যবস্থায় তাদের অস্বীকার করার সুযোগ নেই। চীনের পরে আসে ভারতের প্রশ্ন। ভারত এ অঞ্চলের অন্যতম আঞ্চলিক শক্তি। উপরন্তু ভারত পারমাণবিক শক্তির অধিকারী। শিল্প উৎপাদনের দিক দিয়ে ভারতের অবস্থান সপ্তম। প্রযুক্তির দিক দিয়েও ভারত অনেকটাই এগিয়েছে। এক ধরণের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও রয়েছে সেখানে। ভারত আগামী দিনে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর উপরে তার প্রভাব অব্যাহত রাখবে। ভারত নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের জন্যও দাবী করেছে। ভারতের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকার ভুমিকাও আগামী দিনে লক্ষ্য করার মতো। একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে যা যা দরকার এর সবি দক্ষিণ আফ্রিকার রয়েছে। দীর্ঘদিন দক্ষিণ আফ্রিকা ছিল বিশ্ব রাজনীতিতে একরকম বহিষ্কৃত। এখন বর্ণবাদের সেখানে অবসান হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগ কারীরা দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ দেখিয়েছে। ইতিমধ্যে চীন ব্যাপকভাবে এ অঞ্চলে তার বিনিয়োগ করছে। সুতরাং অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব ব্যবস্থার পরিবর্তন যে অবিসম্ভ্যাবি তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

চীন সুপার পাওয়ারে পরিণত হলে ১০টি উপায়ে ঘটবে বিশ্বের পরিবর্তন

Now Reading
চীন সুপার পাওয়ারে পরিণত হলে ১০টি উপায়ে ঘটবে বিশ্বের পরিবর্তন

চীন তার লক্ষ্য স্থির করেছে যে আগামীতে তারাই হবে সুপার পাওয়ার দেশের অধিকারী। তারা ইতিমধ্যেই এ লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কর্ম কৌশল গ্রহণ করেছে। এ ব্যাপারে চীনের প্রেসিডেন্ট শিং জিং পিং জনসম্মুখে ঘোষণা করেছে, আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে তারা বিশ্ব নেতৃত্ব দেবে। ইরাক-সিরিয়াসহ একাধিক দেশে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে ব্যস্ত আমেরিকা। এদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত এককালের দাপুটে রাশিয়া। অন্যদিকে সুনির্দিষ্ট রণকৌশল ও সাহসী পদক্ষেপ নেয়ার অক্ষমতায় ভুগছে ভারতের মতো দেশ। ফলে এই মুহূর্তে একক শক্তির আসন কার্যত টালমাটাল। আর এমন পরিস্থিতিতে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আমেরিকাকে ধরাশায়ী করার ছক কষছে চীন। অঢেল প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য্য, বিশাল মানব সম্পদ এবং শক্তিশালী অর্থনীতিতে ভর করে কিভাবে এগিয়ে যাওয়া যাবে এমন পরিকল্পনাই করছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

যদি চীন তার লক্ষ্য অর্জন করে তবে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করবে পৃথিবীর আমূল এক পরিবর্তন, হয়ত আমাদের জীবদশায় তা দেখে যেতে পারব। তেমন যদি হয় ইতিহাসে প্রথমবারের মত আমেরিকার প্রভাব প্রতিপত্তি হ্রাস ঘটবে এবং অন্যদিকে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হবে চীনের। আমাদের স্পষ্ট কোন ধারণাই নেই বিশ্ব কিরুপ অবস্থায় রুপ ধারণ করবে। চীন তাদের ইমেজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছে কিভাবে বৃহৎ শক্তি রুপে নিজেদের জানান দেয়া যায়।

আফ্রিকা হতে পারে বিশ্ব শক্তিধরের একজনঃ চীনের এমন উত্থান আবার তাদের জন্য মঙ্গল জনক নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আফ্রিকা শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এদিকে অনেকে কল্পনাই করতে পারবেনা আফ্রিকার বিষয়ে চীন খেলার কি দান টাই চালছে। বর্তমান সময়ে আফ্রিকার সাহায্যকারী প্রধান দেশ হিসেবে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তারা সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এই পরিমাণ আরো বাড়বে। তারা সেখানে এমন অনেক প্রকল্প নিয়ে এগুচ্ছে যা ২০২৫ সালের মধ্যে বিনিয়োগের লক্ষ্য মাত্রা হবে ১ট্রিলিয়ন ডলার। পাশ্চাত্য দেশ গুলি অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে এখানে বিনিয়োগ করাতে, কেননা এই অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশই স্বৈরচার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিভিন্ন দেশে আমেরিকান অর্থ বিনিয়োগ হয় রাজনৈতিক সংস্কার এবং গণতন্ত্রায়নের নিমিত্তে। তবে সে ক্ষেত্রে চীন এসব পরোয়া করেনা, তারা আফ্রিকার দারিদ্র বিমোচনে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। তাদের ভাষ্যমতে, আফ্রিকায় বিনিয়োগ করা প্রতি ডলারের বিপরীতে ৬ডলার আয় করছে। ইতিমধ্যে চীন ও আফ্রিকার মধ্যে বেশ ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চীন চাচ্ছে সে সম্পর্কের প্রসার ঘটিয়ে ব্যপক বিনিয়োগের। ইতিমধ্যে আফ্রিকাও তার সুফল পেতে শুরু করেছে, আফ্রিকার একশ কোটি লোকের মধ্যে ৩০ কোটি লোক ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে মধ্য আয়ের সারিতে। তাদের দারিদ্রতা বলতে গেলে অনেকটাই বিমোচিত হয়েছে। বলা হচ্ছে চীন ও আফ্রিকার এই সম্মীলনে ভবিষ্যতে বিশ্ব পাবে এক নতুন মাত্রা। ‘সুপার পাওয়ার’ হিসেবে বিশ্বে নিজের দাপট বাড়ানোর নকশা তৈরি করে ফেলেছে চীন। আসুন কিছু বিষয়ে আলোকপাত করি কিকি কারণে চীন তার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দাঃ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নানামুখি সংকট বর্তমান বিশ্বের এই এক নম্বর সুপার পাওয়ার দেশটির ভবিষ্যৎ অনেকটাই অনশ্চিয়তার মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে এই সংকট হতে উত্তরণ লাভ করলেও দীর্ঘ মেয়াদে দেশটি কোনোভাবেই তার অবস্থান ধরে রাখতে পারবে বলে মনে করছেন না আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য তারা নিজেরাই দায়ী এই সংকটের প্রধান কারণ তাদের অতিমাত্রায় ভোগবাদিতা এবং বিলাসিতা। জীবনটা বিলাসীভাবে উপভোগ করতে গিয়ে তারা অধিক মাত্রায় ঋণ করার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আর সাধারণ নাগরিকদের এই মনোভাবকে পুঁজি করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সে দেশে জমজমাট ব্যবসায় করে যাচ্ছে। এর কারণ বিশ্বের স্বল্প সুদে সহজে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সবার শীর্ষে। সেখানকার ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে যথেষ্ট দীর্ঘ সুত্রিতার সম্মুখীন হচ্ছে। অনেক ব্যাংক ইতিমধ্যেই ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে। ২০০৭ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে মোট ১৫৪টি বড় আকারের ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে। এ ছাড়াও দেশটি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না করে অনুৎপাদনশীল খাতে অতিমাত্রায় পুঁজি বিনিয়োগের ফলে ক্রমশ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। যার প্রভাব সমগ্র অর্থনীতির উপর ভর করেছে। এদিকে দেখা যাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বহির্বিশ্বের দেশগুলোতে চীনের বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি।  তাই অনেক ক্ষেত্রে এই অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে চীনের ভুমিকাও জড়িত। চীন চাচ্ছে অর্থনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ক্রমশ দুর্বল করে দিতে।

আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী ভূমিকাঃ অনেকের অনুমান সত্ত্বেও হয়ত এই মুহূর্তে চীন পৃথিবীর কোথাও তার শক্তি প্রয়োগ করবে না কিংবা কাউকে কমিউনিস্ট হতে প্রলুব্ধ করবেনা। যদি আফ্রিকার সাথে তাদের কোন চুক্তি সম্পাদিত হয়, চীন খুব শান্ত উপায়েই তা নিয়ন্ত্রণ করছে। চীনের সরকারি কিছু চুক্তি আছে আফ্রিকার সাথে যেখানে তারা কোন হস্তক্ষেপ করতে চায়না। যদিও সেক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সম্পূর্ণ উল্টো, তারা অনুন্নত দেশ এবং স্বৈরশাসক নিয়ন্ত্রিত দেশ সমুহে লিখিত কিংবা অলিখিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু চীন এর নীতি হল তারা সে দেশকে নিজেদের মত থাকতে দিতে চায়। এমনকি সুদান ও জিম্বাবুয়ের মত দেশে বিনিয়োগ সত্ত্বেও তাদের মানবাধিকার, আইন ও বিচার ব্যবস্থায় নুন্যতম প্রভাব বিস্তার করেনি চীন। আর এখানেই পার্থক্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। আমেরিকান সামরিক বাহিনী অক্ষম মানেই আমেরিকা অরক্ষিত, এমনকি সমগ্র ইউরোপের যে সকল দেশ গণতান্ত্রিক তাদের ক্ষেত্রেও তাই যারা আমেরিকার সামরিক বাহিনীটিকে তাদের প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে গণ্য করে। কিন্তু চীন এসব গণতন্ত্র নিয়ে ভাবেনা, এবং যদিনা আমেরিকা তার শক্তির প্রদর্শন মাত্রা ছাড়ায় সেক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে যে চীনা সামরিক বাহিনী সমগ্র বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ সমূহ গ্রাস করে বসবে। রাজনৈতিক মাপকাঠিতে আপাত নিরীহ মনে হলেও প্রয়োজনে চীন তার ভয়ংকর রুপ প্রকাশে দ্বিধা করবে না হয়ত।

বিশ্ব বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি হবে রাজ্য নির্ধারিতঃ চীন এখন ঠাণ্ডা মাথায় তার লক্ষ্য অর্জনে এগুচ্ছে। পৃথিবীর কোথাও অস্ত্র ও বোমা ব্যবহারের পরিবর্তে অন্য পন্থা অবলম্বন করছে। তার মধ্যে আরেকটি হল চীনা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার। এই পদ্ধতিকে তারা বলছে “ সফট পাওয়ার”। তারা তাদের স্কুল ও বিশ্ব বিদ্যালয় গুলোতে বাধ্যতামূলক রাজ্য নির্ধারিত পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করেছে। এসব পাঠ্য সূচি চীন এবং কমিউনিস্ট পার্টির ভাবধারায় প্রবর্তিত। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের তুলনায় তারা এখন আফ্রিকান ছাত্রদের প্রতি বেশি ঝুঁকছেন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ব্যাপারে। কেননা সেই ছাত্ররাই হতে পারে ভবিষ্যৎ রাজনীতিবিদ বা নেতা। শুধুই যে চীনে এই ব্যবস্থা আছে তা কিন্তু নয়, চীনের এই ভাবধারাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পৃথিবীর ১৪০টি দেশে চালু হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ১৫০০টি মত চীনা স্কুল বা শিক্ষা কেন্দ্র।  সেসব শিক্ষা কেন্দ্রে নিয়োজিত আছে বহু চীনা শিক্ষক যারা প্রতিনিয়ত শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন, কিভাবে চীন উন্নয়নের মডেলে রুপান্তর হচ্ছে এবং পাশ্চাত্য ভ্রান্ত ধারণাগুলো সঠিক রুপ কি হবে। পাশাপাশি চীন সম্পর্কে বিশদ ভাবে জানা এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহ্য সম্পর্কে ছাত্রদের মধ্যে ধারণা দেয়া। আর এ সব কিছুই চীনের রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত পাঠ।

নতুনভাবে চীনের ইতিহাস রচিতঃ  চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ১৯তম দলীয় অধিবেশনে প্রায় ২,৩০০ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সিপিসি’র মহাসচিব হিসাবে ৫বছরের জন্য মনোনীত হয়ে পুনরায় দেশটির প্রেসিডেন্ট পদে অভিষিক্ত হয়েছেন শি জিনপিং। পার্টির পলিট ব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলের অভ্যন্তরে তার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এমনকি, বেঁচে থাকলে নজিরবিহীনভাবে তৃতীয় দফাতেও তিনি শীর্ষ পদে আসীন হতে পারেন। পাঁচ বছর অন্তর সিপিসি-র কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যসংখ্যা প্রায় নয় কোটি যার মধ্যে সেন্ট্রাল কমিটির সদস্যসংখ্যা ২০৪৷ পার্টির সিদ্ধান্তনুযায়ী শি জিনপিং ও তাঁর মতাদর্শকে সরকারিভাবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে৷ চীনের অবিসংবাদিত নেতা মাও সে তুং এর পর এই বিরল সন্মান ও ক্ষমতা শি জিংকে চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতায় পরিণত করেছে৷ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মাও সে তুং এবং তার উত্তরসূরি দেং জিয়াওপিং এর পর তৃতীয় ব্যক্তি হলেন শি জিং যিনি এই বিরল সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

এদিকে শি জিং এর মতাদর্শের একটি মূল নীতি হলো অর্থনীতি থেকে সোশ্যাল মিডিয়া অবধি সমাজজীবনের প্রতিটি অঙ্গে ও প্রতিটি ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকাকে সম্যক গুরুত্ব দেওয়া৷ প্রেসিডেন্ট শি জিং পার্টির জাতীয় কংগ্রেস উদ্বোধনের সময় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, চীন ২০৫০ সালের মধ্যে ‘‘ বিশ্ব নেতৃস্থানীয় দেশে’’ পরিণত হবে।

ইউরোপে বিভক্তির সম্ভাবনাঃ  ইউরোপের বিভক্তি হবে সমগ্র বিশ্বের জন্য বিপদজনক। তবে শঙ্কার বিষয় হচ্ছে যে, ইউরোপে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখন বিভক্তি প্রতীয়মান। বিবিসির ‘ক্রসিং ডিভাইডস’ শীর্ষক এক জরিপে দেখা গেছে, অনেক ইউরোপিয়ান মনে করছেন তাদের দেশগুলোতে এখন যেসকল বিভক্তি দৃশ্যমান, দশ বছর পূর্বেও তা ছিল বিরল। শতকরা ৪৭ ভাগ মানুষই মনে করছেন, সমাজে সহনশীলতা অনেকটাই লোপ পেয়েছে, বেড়েছে অস্থিরতা।

‘ইপসস মরি’ নামক অনলাইনের আরেক জরিপের হিসেব অনুযায়ী, ইউরোপের ২৭টি দেশের ৬৬ ভাগ মানুষ মনে করেন তারা জাতিগতভাবে অনেক বেশি বিভক্ত। আর ৪৪ ভাগ মানুষ মনে করেন, বিশ্বব্যাপী যে উত্তেজনা চলছে তার মূল কারণ হচ্ছে রাজনীতি। এছাড়া অধিকাংশ ব্রিটিশ মনে করেন ব্রিটেনে অভিবাসী ও সেদেশের নাগরিকদের মধ্যে স্পষ্ট বিভক্তি আছে। জরিপে ১১টি ইউরোপিয়ান দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। দেশগুলো হলো- জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, হাঙ্গেরি, ইটালি, পোল্যান্ড, স্পেন, সুইডেন, সার্বিয়া, যুক্তরাজ্য এবং রাশিয়া। আর যদি তাই হয় তবে এই বিভক্তি কৌশল হিসেবে কাজে লাগাতে পারে চীন। কেননা যে কোন বিষয়ে বিভক্তি মানেই পরস্পর দুইটি পক্ষ, আর বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষ হিসেবে চীন বরাবরই ভূমিকা রেখে এসেছে।

তাইওয়ান হতে পারে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুঃ তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার লক্ষ্যে ‘তাইওয়ান ট্র্যাভেল অ্যাক্ট’ নামক পাস হওয়া বিলে স্বাক্ষর করাতে চীন প্রয়োজনে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। মার্কিন সিনেট কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে পাস হওয়া বিলটিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বাক্ষর করলে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায়। প্রশ্ন জাগতে পারে এমন কি আছে বিলটিতে যা চীনের ঘোরতর আপত্তির কারন। বিলটিতে উল্লেখ আছে, তাইওয়ানের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা ‘সম্মানজনক প্রোটোকলে আমেরিকা সফর করতে পারবেন এবং শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এর সুযোগ লাভ করবেন। বিপরীতে যেকোনো পর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তারাও তাইওয়ান সফরে গিয়ে তাদের সমকক্ষদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন।

দীর্ঘদিন ধরেই চীন স্বায়ত্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবী করে আসছে। যে কোন কিছুর বিনিময়ে তাইওয়ান করায়ত্ত করতে তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাই যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক এই সিদ্ধান্তে বেইজিং আপত্তিস্বরূপ প্রতিবাদ জানিয়েছে এই কারণেই যে, বিষয়টি ‘এক চীন’ নীতির পরিপন্থি। এদিকে চীন তার সামরিক শক্তি তাইওয়ান প্রণালি থেকে শুরু করে জেমস শোয়াল অঞ্চল পর্যন্ত মোতায়েন করেছে। এই অঞ্চলেই অবস্থিত বিতর্কিত পার্সেল দ্বীপপুঞ্জ, ম্যাকক্লিসফিল্ড ব্যাংক এবং স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জ। চীনা সেনাবাহিনী তার সর্বশেষ সংস্কারের আওতায় সাব মেরিন বহরকে উক্ত অঞ্চলে মোতায়েন করেছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে যেকোন উত্তেজনাকর মুহূর্তে তাইওয়ান আক্রান্ত হতে পারে চীন কর্তৃক।

উৎপাদন খাতে চীনের আমূল পরিবর্তন অভিসম্ভাবীঃ চীনের প্রেসিডেন্ট শিং জিং পিং মেড ইন চায়না : ২০২৫ নামে এক পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন। আর চীনের এই মহাপরিকল্পনায় কার্যত দুশ্চিন্তায় পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রশ্ন জাগতে পারে কি এমন আছে সেই পরিকলনায়। পৃথিবীর যে কোন দেশে এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে কোন দোকানে ঢুকে চোখ বুলালেই দেখা যাবে পণ্যের অর্ধেকই চীনের তৈরি। মেড ইন চায়নার এই সাফল্যের কাহিনী কম বেশি সকলেরই জানা। কেননা এত সস্তায় কোন জিনিস পৃথিবীর আর কেউ এখনো পর্যন্ত তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু পণ্যের গুনগত মান নিয়ে মানুষের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা আছে। কেননা চীনের ব্যর্থতা হচ্ছে তারা এখনো বিশ্ববাজারে নিজেদের ব্র্যান্ডগুলিকে সেভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি, যেভাবে পেরেছিল এশিয়ার অন্য আরেক জায়ান্ট জাপান। চীনের পন্য গুলোতে তাদের কোন নিজস্বতা নেই বলে প্রচার আছে, কেননা তারা পন্যের হুবুহু নকল করতেই অভ্যস্থ। তাই চীন এখন ‘মেড ইন চায়নার’ এই ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ বদলে দিতে বদ্ধ পরিকর। চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে তার ম্যানুফাকচারিং খাত। আর সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভিন্ন কৌশলে নতুন ট্রেড মার্ক সংযোজন করতে চায় চীন।

তারা যে পরিকল্পনাটি গ্রহণ করেছে মূলত তা তিন ধাপের। ২০২৫ সাল সেই পরিকল্পনার প্রথম ধাপ মাত্র। ২০২৫ সাল নাগাদ চীন যেসব পণ্য তৈরি করবে, তার সবকিছুরই গুনগত মান তারা বাড়াতে চায়। এ লক্ষ্যে শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদনে তারা প্রয়োগ করবে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি। এছাড়াও এমন কিছু চীনা ব্র্যান্ড তারা তৈরি করবে, যেগুলো কিনতে ঝাঁপিয়ে পড়বে বিশ্ববাসী।

পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে ২০৩৫ সাল, এ সময়কালে চীনা কোম্পানিগুলো বিশ্বের বাকী সব কোম্পানিকে প্রযুক্তি, পণ্যের গুনগত মান এবং সুনামে ছাড়িয়ে যেতে চায়। এ লক্ষ্যে তারা নতুন উদ্ভাবনের দিকে মনোনিবেশ করবে এবং বিশ্ব নেতৃত্ব দেবে।

আর ২০৪৯ সাল হচ্ছে পরিকল্পনার তৃতীয় ধাপ, আধুনিক চীন যখন উদযাপন করবে তার প্রতিষ্ঠার একশো বছর। এই মহেন্দ্রক্ষণে চীন ম্যানুফ্যাকচারিং জগতে  বিশ্বের এক নম্বর শক্তি হয়ে উঠার পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে।

মেড ইন চায়না : ২০২৫ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে চীনা কম্পানি আর চীনা ব্র্যান্ড বিশ্ব বাজারে চীনা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আর এটাই যুক্তরাষ্ট্রকে মাথা ব্যথার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দেবে।

চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনাঃ সাম্প্রতিককালের ঘটনা প্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে আমেরিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সভায় এখন এই বিষয়টি প্রকাশ্য। যুক্তরাষ্ট্র কোন প্রস্তাব করলে চীন যেমন ভেটো দিয়ে আটকে দেয় ঠিক তেমনি চীনের প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র একই ভূমিকা পালন করে। একদিকে চীন মরিয়া সুপার পাওয়ার দেশে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও মরণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নিজের অবস্থান সংহত রাখতে। কেউ যেন কারো চেয়ে কম নয়, আর কেউ কাউকে ছেড়েও কথা বলছেনা। এসবের বাইরেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে চীন এখন অনেকটাই মুখোমুখি। বিশ্বে প্রবাহমান বিভিন্ন সমুদ্র সীমানা দখল নিতে এই দুই শক্তিধর রাষ্ট্র চেষ্টার ত্রুটি রাখছেনা। কৌশল হিসেবে নিজেদের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তারা জোটবদ্ধ হয়ে শক্তির মহড়া প্রদর্শন করে তা বাস্তবায়ন করতে চায়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে লেজার রশ্মি ব্যবহার করছে চীন, এমনটাই অভিযোগ মার্কিন সেনা কর্মকর্তাদের। চীনের লেজার আক্রমণে অনেকটাই দিশেহারা যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবী, গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এমন ২০ টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে যেখানে চীন লেজার ব্যবহার করার সমস্ত প্রমাণ তাদের রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী যে লেজার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির কাছাকাছি অবস্থিত চীনা সামরিক ঘাটি থেকে এর উৎস বলে মনে করা হয়। তবে চীনের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও অমূলক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং তাঁর সম্প্রতি এক ভাষণে বলেছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে চীনের সেনাবাহিনী বিশ্বের অন্যতম সেরা বাহিনীতে পরিণত হবে। তিনি আরো ঘোষণা দিয়েছেন যে, জাতীয় পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নিজেদের পরিবর্তিত করার সময় এসেছে এবং সমস্ত বিশ্বকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক পাওয়ার দেখানোর জন্য তারা তৈরি হচ্ছে।” চীনের সেনাবাহিনী সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির অধীনস্থ। সেনার হাইকমান্ড হলো সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন, যার চেয়ারম্যান স্বয়ং জিনপিং। তিনি এই বাহিনীর ‘কোর লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে মনেনীত হয়েছেন। জিনপিং এখন একাধারে দলের শীর্ষ নেতা, দেশের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার, যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে তাকে এখন আর বেগ পেতে হবেনা। ২০১২সালে জিনপিং প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই ক্রমাগত চীনের সামরিক শক্তি বাড়াতে তৎপর ছিলেন। বর্তমানে চীনের সামরিক বাজেট প্রায় ১৪ হাজার কোটি ডলার এরও অধিক, যা আমেরিকার পর সর্বোচ্চ। ২০৩৫-এর মধ্যে বাহিনীকে বিশ্বের অন্যতম সেরা করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছেন জিনপিং। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মাথা ব্যথার অন্যতম কারন এখন চীনের সামরিক উত্থান। দুই দেশই রয়েছে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে, তাই আশংকা বিরাজ করছে যেকোন মুহূর্তে পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার। অভিসম্ভ্যাবি সেই যুদ্ধে দুই দেশই তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। যদি কোন কারনে যুদ্ধ বেঁধে যায়, সে ক্ষেত্রে বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে ভবিষ্যৎ সুপার পাওয়ার কে হবে।

 

দুর্দান্ত এক ফরাসি বিপ্লব প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ব

Now Reading
দুর্দান্ত এক ফরাসি বিপ্লব প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ব

পুরো অষ্টাদশ শতাব্দী ধরে ইউরোপে এক বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার কৃষক ও শ্রমজীবীদের আন্দোলনের পথিকৃৎ এই বিপ্লব। তারই ফলাফলে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে, গণতন্ত্র শব্দটি পায় নতুন মাত্রা। সত্যিকার অর্থে, ফরাসি বিপ্লব কিন্তু সফল হয়নি। যে রাজতন্ত্র থেকে মুক্তি পাবার আশায় এই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, মাত্র ১৫ বছরের মাথায় সেই রাজতন্ত্র আবার ফিরে এসে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় যা পরবর্তী ৭০ বছর পর্যন্ত এর স্থায়িত্ব ছিল। তবে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে বাইরের বিশ্বকে, গোটা বিশ্বের রাষ্ট্রব্যবস্থায় অভুতপূর্ব প্রভাব ফেলেছিল এই ফরাসি বিপ্লব। উনিশ শতকে ফ্রান্স ছাড়িয়ে সারা ইউরোপে নতুন ভাবধারার সূচনা করেছিল এই বিপ্লব। ফরাসি বিপ্লব শুরু হয়েছিল ১৭৮৯ সালে, যার মূলমন্ত্র ছিল সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা। এই আন্দোলন সংঘটিত হওয়ার পেছনে ফরাসি দার্শনিক ও সাহিত্যিকদের অসামান্য অবদান রয়েছে। ব্রিটিশদের বিপক্ষে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্যে অনেকেই ফরাসি বিপ্লব থেকে অনুপ্রানিত হয়েছিলেন।

 মানব সভ্যতার অন্যতম একটি মাইলফলক রেনেসাঁ থেকে এনলাইটেনমেন্ট পর্যন্ত যাত্রা। বিশেষত মধ্যযুগের ইউরোপে যখন ধর্মের প্রতাপ ছিল। মানুষের চিন্তা চেতনায় তখন গুরুত্ব পেয়েছিল ঈশ্বর এবং ধর্মবিশ্বাস। সেই সুযোগে মানুষের ভাবনার জগৎকে আলোড়িত করে ইতালিতে গোড়াপত্তন করেছিল রেনেসাঁ আর তা সমগ্র ইউরোপেই ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময় শিল্প সাহিত্যের প্রসারও ঘটেছিল। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, বতিচেলি­, মিকেলেঞ্জেলো, রাফায়েলসহ বহু উলে­খযোগ্য চিত্রশিল্পী ও ভাস্করদের বিখ্যাত সৃষ্টিকর্মগুলো সে সময়কারই। ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে প্রায় এক শতাব্দী ফ্রান্স আলোড়িত হয় নতুন আর পুরান  চিন্তার দ্বন্দ্বে। ১৭৭৬ সালে আমেরিকা যখন ব্রিটেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে তখন বহু ফরাসি আমেরিকানদের সমর্থন দিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। সেই ফরাসিরা যখন দেশে ফেরত আসে, তখন উপলব্দি হয় স্বাধীনতার স্বাদ কেমন। তাদের মধ্যেও আন্দোলিত হতে থাকে নিজেদের স্বাধীনতা অর্জনের, আর এই স্বাধীনতা তাদের রাজতন্ত্র থেকে মুক্তির। ফরাসি বিপ্লব শুধু ফ্রান্সের নয়, সে সময় বদলে দিয়েছিল গোটা ইউরোপের চিত্র। মানুষের চিন্তার জগৎকে আলোড়িত গোটা মানব সভ্যতাকে নতুনভাবে লিখতে ভুমিকা রেখেছে ফরাসি বিপ্লব।  ১৪ জুলাই ১৭৮৯ সাল, সেদিন শ্রমিক, জনতা, কারিগর, গ্রাম ও শহরের গরিব মেহেনতি মানুষের খাদ্যের দাবিতে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস বেশ উত্তপ্ত হয়। চারিদিকে শুরু হয় দাঙ্গা-হাঙ্গামা, এ শুধু যে নিছকই তা কিন্তু নয়। প্যারিসে সর্বাত্মক বিক্ষোভ মিছিলে প্রকম্পিত, আর তাদের ছত্রভঙ্গ করতে তৎকালীন রাজার নির্দেশে মিছিলের ওপরই তুলে দেয়া হয় অশ্বারোহী বাহিনী। ফ্রান্সের সামরিক অধিনায়ক জনতার সাথে সংঘর্ষে যেতে চাইলেন না, অতঃপর প্যারিসের নিয়ন্ত্রণ জনতার হাতেই চলে যায়। এদিকে উন্মত্ত জনতা কারাগারের অধিকর্তা দ্যলুনেকে হত্যা করে রাজবন্দীদের মুক্ত করে আনে।  বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্রের দোকান লুট করার পাশাপাশি স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের প্রতীক বাস্তিল কারাদুর্গও আক্রমণ করে উত্তেজিত জনতা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করা এবং রাজা ষোড়শ লুই এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। মূলত ফরাসি রাজতন্ত্র ছিল নিরঙ্কুশ স্বৈরাচারী। কেননা রাজা ক্ষমতার একক অধিকারী হওয়াতে অধিক স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে তাকে অনুপ্রানিত করে। ফলে একটা সময় রাজা নিজেকে ঈশ্বর প্রদত্ত ডিভাইন রাইট অব মনারকির প্রতিভু বলে ঘোষণা করেন। তিনি বলতেন, সার্বভৌম ক্ষমতা আমার ওপর ন্যস্ত, তাই সব আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ও বিচারিক আদেশের ক্ষমতা আমার। রাজার সমালোচনা যদি কেউ করত তবে তাকে গ্রেফতার করে গোপনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো।

রাজতন্ত্রের এই স্বেচ্ছাচারিতা শুরু হয়েছিল রাজা চতুর্দশ লুই এর শাসনামলের শেষ ভাগের দিকে যখন তা চরম আকার ধারণ করেছিল। পরবর্তী রাজা পঞ্চদশ লুইও ছিলেন অধিক স্বৈরচারী, তিনি রাজকার্য পরিচালনার পরিবর্তে বিলাস জীবনেই অধিক অভ্যস্ত ছিলেন। এর পর রাজা  ষোড়শ লুই সিংহাসন আরোহণের পর প্রশাসনকে ঢেলে সাঁজাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অভিজাত শ্রেণির প্রাধান্য আর পূর্বসূরিদের বিশ্বাসভিত্তিক চিন্তাধারা থেকে মুক্ত হতে পারেননি।  রাজা ষোড়শ লুই এর উচ্ছৃঙ্খলতা, অমিতব্যয়িতা এবং দুর্বল প্রজাদের উপর প্রতিনিয়ত অত্যাচার এসব কিছুই ফরাসি জনগণকে বিপ্লবমুখী করে তুলেছিল। এ ছাড়াও ছিল শাসন বিভাগের বিশৃঙ্খলতা এবং রাজকর্মচারীদের অতি মাত্রায় অত্যাচার। অন্যদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল  শাসন ও বিচারব্যবস্থা যা অসন্তোষ ছড়ায় জনগণের মাঝে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত ও ইংরেজদের সাথে প্রায় সাত বছরব্যাপী যুদ্ধে ফ্রান্সের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। আর তাতেই ব্যবসা বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়ে এবং এই অবনতির ফলে ফরাসিদের রাজকোষও শূন্য হয়ে পড়ে।  ফ্রান্সের সমাজে ব্যবস্থায় শ্রেণি বৈষম্য ছিল  প্রকট। অভিজাত ও যাজক সম্প্রদায় প্রথম শ্রেণিভুক্ত যারা রাজার আস্থাভাজন ছিল। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও জনসাধারণ ছিল সুবিধাহীন অধিকারবঞ্চিত শ্রেণি। এসব বৈষম্য সাধারণ মানুষের মনে মারাত্মক ইন্ধন জুগিয়েছিল রাজার শাসনের বিরুদ্ধে। যাজক সম্প্রদায় রাজার বিশেষ রাজনৈতিক, বিচার এবং রাজস্ব সংক্রান্ত সুযোগ সুবিধা প্রাপ্ত ছিল। রাজ্যে তাদের নিজস্ব এলাকা, বাহারি প্রাসাদ, দুর্গ ও গির্জা ছিল। আবার ফরাসি সমাজে দ্বিতীয় শ্রেণি ধরা হত অভিজাতদের। যদিও সংখ্যায় তারা নগণ্য তবুও সমাজে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন তারাই। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একচেটিয়া অধিকার ভোগ করত এই অভিজাত শ্রেণী। বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত ছিল তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত যারা অনেকটাই সুবিধাপন্থি ছিলেন। কৃষক ও শ্রমিকরা ছিল সমাজের সর্বনিম্ন স্তরের  যাদের উপর চলত রাজতন্ত্র তথা উচ্চ শ্রেণীর শোষণ ও নিষ্পেষণ। সর্বোপরি নিন্মবিত্ত ও কৃষকদের উপর অন্যায় নির্যাতনই শ্রেণি সংঘাতের ক্ষেত্র গড়ে তুলেছিল। রাষ্ট্র ব্যবস্থা এমন ছিল যে, রাজস্বের ব্যয়ভার কেবল কৃষককেই বহন করতে হতো। ফলে কৃষক ও শ্রমিকরা ক্রমেই বিপ্লবমুখী হয়ে ওঠে। ফলে পুরো অষ্টাদশ শতাব্দী ধরে ইউরোপে বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ ঘটে।

১৭৮৯ সালে ফ্রান্সের শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ গ্রামাঞ্চলে থাকত যার মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখই ছিল কৃষক শ্রেণীর। এদিকে চাষযোগ্য জমির প্রায় ৩০ শতাংশের মালিকানা ছিল গির্জা ও সামন্তপ্রভুদের হাতে যারা ছিল সংখ্যায় মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ ভাগ। এ ছাড়া বিপ্লবের সময়টাতে ফ্রান্সে প্রায় ১০ লাখের মতো ভুমিদাস ছিল। মাঝেই মাঝেই দেখা দিত অজন্মা। একজন ইতিহাসবিদ লিখেছিলেন, ফ্রান্সে ৯ দশমাংশ লোক অনাহারে মারা যায়, আর এক দশমাংশ মরে অতি ভোজনের ফলে। এ ছাড়া ছিল কর বা খাজনার জন্য নির্যাতন। সাধারণ মানুষকে রাজার আরোপ করা কর, গির্জা কর্তৃক আরোপ করা কর, ভুস্বামী বা জমিদারদের আরোপ করা কর দিতে হতো। আইনও ছিল গরিবের বিপক্ষে। তাদের বিচার করার সময় সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে ততটা মাথা ঘামানো হতো না। সব মিলিয়ে জ্বলে ওঠে বিপ্লবের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।

আন্দোলনকারী বিদ্রোহীদের হাতে ষোড়শ লুই ও তার স্ত্রী মারি অ্যান্তনে বন্দী হন। রাজার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বিদ্রোহী নেতৃত্বস্থানীয়দের মধ্যে আয়োজন করা হয় ভোটের, ৩৬১ জন মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে এবং ২৮৮ জন বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৭৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি হাজার জনতার সম্মুখে রাজা ষোড়শ লুইসকে গিলোটিনে শিরোচ্ছেদ কার্যকর করা হয়।  এরপর ১৬ অক্টোবর রানীর ক্ষেত্রেও একই শাস্তি কার্যকর হয়।ফরাসি বিপ্লব উন্মোচিত করেছিল এক নতুন দিগন্ত। এর ফলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্র শব্দটি অর্থবহ হয়ে ওঠে। বিশেষত রাজতন্ত্রের পতন এর পর বিশ্বাসভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। আর ইউরোপের রাষ্ট্রব্যবস্থায় ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ইউরোপসহ, গোটা পৃথিবীর পট পরিবর্তন করে দেয় ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল। বর্তমান বিশ্বের বেশির ভাগ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থার সুফল ভোগ করছে।

জোট নিরপেক্ষ “ন্যাম” আদৌ কি কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা?

Now Reading
জোট নিরপেক্ষ “ন্যাম” আদৌ কি কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা?

বিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক রাজনীতির একটি উল্ল্যেখযোগ্য দিক হচ্ছে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের জন্ম, যা “ন্যাম” নামে পরিচিত। ১৯৬২ সালে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। এই ন্যাম আন্দোলন দুটি পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বলয়ের বাইরে থেকে বিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক রাজনীতিতে তাদের অবদান রেখে গেছে। আমাদের অনেকেরই ভুল ধারণা আছে এই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন নিয়ে। আদতে এটি কোন আন্তর্জাতিক সংগঠন নয়, নয় কোন চুক্তিভিত্তিক আলাদা জোট। এর কোনো সনদ বা গঠনতন্ত্র নেই, নেই কোন স্থায়ী দপ্তর। কিন্তু এ সত্ত্বেও এর উদ্দেশ্য ও আদর্শ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নের জন্য গড়ে উঠেছে একটি সুনির্দিষ্ট অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। আর এটি হচ্ছে, ১. রাষ্ট্র অথবা সরকার প্রধানদের শীর্ষ সম্মেলন, ২. সমন্বয়কারী রাষ্ট্র আন্দোলনের চেয়ারম্যান, ৩. পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন, ৪. পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সভা, ৫. জাতিসংঘ জোট নিরপেক্ষ দেশ সমূহের গ্রুপ, ৬. সমন্বয় ব্যুরো (পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা জাতিসংঘ জোট নিরপেক্ষ রাষ্ট্রসমূহের স্থায়ী প্রতিনিধি) এবং ৭. বিশেষায়িত সংস্থা সমূহ।

সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনের প্রধান কাজ হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর বিচার বিশ্লেষণ ও মুল্যায়ন করা। সেই সাথে জোট নিরপেক্ষ নীতির মূল কৌশলগত ধারাসমুহের দিক নির্দেশ করা এবং জাতি সংঘে বিভিন্ন প্রশ্নে একটা যৌথ অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রে মতৈক্য সৃষ্টি করা ও শীর্ষ সম্মেলনের আন্দোলনের কার্যক্রমের সার্বিক মুল্যায়ন করে ভবিষ্যৎ কর্মসূচী গ্রহণ করা। তিন বছরে একবার সম্মেলন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা রয়েছে। নিয়মিত সম্মেলন ছাড়া সীমিত সংখ্যক অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রের সমন্বয়ে বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনেরও ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে যে দেশে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সে দেশ পরবর্তী ৩ বছরের জন্য সমন্বয়কারী দেশ হিসেবে পরিচিত হয়। সে দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান ঐ সময়ের জন্যে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সমন্বয়কারী দেশ ও আন্দোলনের চেয়ারম্যান দুই শীর্ষ সম্মেলনের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী সম্পাদন করেন। আন্দোলনের কার্যক্রম চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সমন্বয়কারী রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত হয়। চেয়ারম্যান আন্দোলনের প্রধান মুখপাত্র। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বিশ্লেষণে এবং প্রতিক্রিয়া ব্যাক্তকরনে চেয়ারম্যান জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনভুক্ত উন্নয়নশীল দেশ সমূহের মধ্যে অভ্যন্তরীণ, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এদের মধ্যে অনেক অভিন্ন সমস্যা রয়েছে। এ সমস্যাগুলো মূলত এ সমস্ত দেশের অভিন্ন ঔপনিবেশিক অতীত দ্বারা সৃষ্ট। সমস্যাগুলোর সমাধানের মূল কথা হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক আসরে স্বাধীন ও সন্মানজনক অবস্থান গ্রহণ, যা শুধু ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সম্ভব। যে সমস্ত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য জোটনিরপেক্ষ রাষ্ট্রসমূহ তাদের অভিন্ন পররাষ্ট্র নীতির ভিত্তিতে একটি আলাদা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সত্ত্বা ও গোষ্ঠীতে একত্র হয়েছে, তা হচ্ছেঃ ক) নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর পূর্ণকর্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করা, স্বাধীন অর্থনৈতিক বিকাশে অধিকার সমুন্নত রাখা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চাপমুক্তভাবে সিদ্ধান্তগ্রহণসহ জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। খ) আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সমতা, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার গনতন্ত্রায়নের জন্য  ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম,  গ) উন্নত বিশ্বের সাথে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার ভিত্তিতে ব্যাপক সংযোগ সৃষ্টি করা এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রবাহে নিজেদেরকে সক্রিয় রাখার মাধ্যমে বিশ্বে নিজেদের একটা ইতিবাচক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, ঘ) বিভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য যৌথ কূটনৈতিক তৎপরতা চালু রাখা।

সার্বিকভাবে, জোট নিরপেক্ষ দেশসমূহের মধ্যে একটি সাধারণ সংযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করা এবং বস্তুনিষ্ঠ ও স্বাধীন সংবাদ সরবরাহ ও প্রচারের নীতিমালা প্রণয়ন করা এই পরিষদের কাজ।

অভিন্ন ইউরোপের স্বপ্নদ্রষ্টা!

Now Reading
অভিন্ন ইউরোপের স্বপ্নদ্রষ্টা!

‘অভিন্ন ইউরোপীয় বাসভূমি’ এই মতবাদের প্রবক্তা ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডেন্ট মিখাইল গরবাচেভ। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপ বলতে বলতে চাননি অর্থাৎ ইউরোপের বিভক্তি চাননি। তার মতে ইউরোপ এমন এক শক্তিশালী বাসভূমি যেখানে ভূগোল আর ইতিহাস পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে মিলে গিয়ে গড়ে তুলেছে বেশ কিছু দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎকে। একথা অবশ্যই ঠিক যে এদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব সমস্যা রয়েছে। প্রত্যেকেই চায় নিজস্ব ধারায় জীবন যাপন করতে এবং নিজস্ব পুরুষানুক্রমিক ঐতিহ্য অনুসরণ করতে।  তাই রুপক অর্থে তিনি ইউরোপকে চিহ্নিত করেছিলেন একটি বাসভূমি হিসেবে, যেখানে বিভিন্ন কক্ষে (বিভিন্ন দেশ) বিভিন্ন লোক (বিভিন্ন জাতি) বসবাস করে। ইউরোপে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে বিভিন্নতা আছে, কিন্তু ইউরোপ এক- এ কথাটাই রাখতে বলেছিলেন গরবাচেভ। তিনি ইউরোপে স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখার স্বার্থেই এক ইউরোপ চেয়েছিলেন। তার এই প্রচেষ্টার পেছনে বেশ কিছু যুক্তিও ছিল।

প্রথমত, ঘনবসতিপূর্ণ ও অত্যন্ত শহরায়িত ইউরোপে পারমাণবিক ও প্রচলিত উভয় ধরণের অস্ত্রে ছেয়ে গিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক যুদ্ধের কথা বাদ দিলেও একটা চিরাচরিত যুদ্ধও বর্তমান ইউরোপের জন্য ক্ষতিকর হবে। এর কারণ শুধু এই নয় যে শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের চেয়ে প্রচলিত অস্ত্রগুলো আরো মারাত্মক- এর কারণ এটাও যে মোট দুশর মতো আণবিক রিঅ্যাক্টর ইউনিট আর বিপুল সংখ্যক রাসায়নিক কারখানাসমেত নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎশক্তি ইউনিট এখানে রয়েছে। প্রচলিত যুদ্ধের সময় এইসব কারখানা ধ্বংস হয়ে গেলে এই মহাদেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে।

তৃতীয়ত, ইউরোপ বিশ্বের শিল্পোন্নত অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানকার শ্রম শিল্প ও পরিবহন বিকাশ লাভ করতে করতে এমন একটা পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে পরিবেশের পক্ষে তার বিপদ গুরতর হয়েছে বলা যেতে পারে। এই বিপদ একটা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এখন গোটা ইউরোপের বিপদ হয়ে উঠেছে।

চতুর্থত, ইউরোপের দুই অংশের অর্থনৈতিক বিকাশের এবং সেই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত বিকাশের তাগিদে কোনো না কোনো ধরণের পারস্পরিকভাবে সুবিধাজনক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

পঞ্চমত, ইউরোপের দুই অংশে পূর্ব-পশ্চিম পরিসরে নিজস্ব সমস্যা আছে। কিন্তু অত্যন্ত তীব্র উত্তর-দক্ষিণ সমস্যা সমাধান করায় তাদের উভয়েরই আছে অভিন্ন স্বার্থ। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জাতিসমূহের ভবিষ্যৎ যদি উপেক্ষিত হয়, উন্নয়নশীল দেশ ও শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার ফারাক দূর করার জটিল সমস্যাকে যদি অবহেলা করা হয় তাহলে সেটা ইউরোপ আর বিশ্বের বাকী অংশের পক্ষে বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

ষষ্ঠত, গরবাচেভ তার ‘পেরেস্ত্রোইকা’ ও ‘গ্লাসনস্ত’ নীতির সফল বাস্তবায়ন ও সাফল্যের জন্য পশ্চিম ইউরোপের ও সেই সাথে পূর্ব ইউরোপের সমর্থনের প্রয়োজন ছিল। আর এজন্যেই তিনি ‘কমন ইউরোপিয়ান হোম’ এর তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন।

চলুন জেনে নিই ‘পেরেস্ত্রোইকা’ ও ‘গ্লাসনস্ত’ নীতি আসলে কি?

পেরেস্ত্রোইকাঃ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে মিখাইল গরবাচেভের আগমনের পর (১৯৮৫) দেশ ও পার্টির সদুর প্রসারী পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে ব্যপক সংস্কারমূলক কর্মসূচী ‘পেরেস্ত্রোইকা’ হাতে নেয়া হয়েছিল। পেরেস্ত্রোইকায় প্রধান যে বিষয়গুলো হাতে নেয়া হয়েছিল তা হলোঃ ১. অর্থনৈতিক সংস্কার, ২. সামাজিক অগ্রগণ্যতা, ৩. রাজনৈতিক গণতন্ত্রায়ন, ৪. পার্টির ভূমিকা সংশোধন , ৫. মতাদর্শ, ধর্ম ও  সংস্কৃতির গুনবিন্যাস, ৬. অভ্যন্তরীণ ও জাতীয় সমস্যা সমাধান, ৭. পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে পরিবর্তন। উপর্যুক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে ব্যপক পুনর্গঠনের মাধ্যমে গরবাচেভ পূর্ব ইউরোপে এক নতুন ধারার সূচনা করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। তিনি তাঁর বহুল প্রচারিত ‘পেরেস্ত্রোইকা’-তে লিখেছেন, ” বহুবার আমি ব্যাখ্যা করেছি যে পশ্চিমী স্বার্থবিরোধী কোন লক্ষ্য আমরা অনুসরণ করিনা। আমরা জানি যে মার্কিন ও পশ্চিম ইউরোপীয় অর্থনীতির পক্ষে প্রধানত কাঁচামালের উৎস হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য, এসিয়া, ল্যাতিন আমেরিকা অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের এলাকা এবং এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকা কত গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পর্ক ছেদ ঘটাবার কথা আমরা চিন্তাও করিনা এবং ঐতিহাসিক কারণে সৃষ্ট পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থের হানি ঘটাবার কোন অভিপ্রায় আমাদের নেই”

 

গ্লাসনস্তঃ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পুনর্গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তার জন্য রাজনৈতিক সংস্কার ও গণসমর্থন প্রয়োজন ছিল। আর এর জন্য গ্লাসনস্ত নীতি গ্রহণ করা হয়। গ্লাসনস্তের আওতায় রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থায় যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়েছিল তা হলো, ১. সকল পর্যায়ে নির্বাচিত পদে পর পর দুবার কেউ নির্বাচিত হতে পারবে না, ২. কংগ্রেস অব পিপলস ডেপুটি হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব এবং সদস্য সংখ্যা হবে ২২৫০, ৩. ডেপুটিদের মধ্য থেকে একটি স্থায়ী কার্যনির্বাহী সুপ্রিম  সোভিয়েত নির্বাচিত হবে, ৪. কংগ্রেস অব পিপলস ডেপুটি গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবে।

গরবাচেভের এই নীতি নানা কারণে বিতর্কিত ছিল। অভিযোগ আছে, ১৯৮৫ সালে গরবাচেভ ক্ষমতায় আসার পর তিনি পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ঐক্য দৃঢ় না করে বরং পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপকে একীভূত করার জন্য ইউরোপের অভিন্ন বাসভূমির কথা বলেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন এর মাধ্যমে সমগ্র ইউরোপের ঐক্য ও সংহতি বাড়বে। কিন্তু প্রকারান্তরে তার এই প্রচেষ্টা ও নীতি পূর্ব ইউরোপের ঐক্যে চির ধরায়। গরবাচেভ পূর্ব ইউরোপ সম্পর্কে দীর্ঘদিনের গড়া সোভিয়েত নীতিকে পরিত্যাগ করেন।

সহায়ক গ্রন্থঃ আমাদের দেশ ও সমগ্র বিশ্ব (পেরেস্ত্রোইকা ও নতুন ভাবনা)

ইতিহাসের ভয়াবহ অপারেশন ‘ডেজার্ট স্টর্ম’

Now Reading
ইতিহাসের ভয়াবহ অপারেশন ‘ডেজার্ট স্টর্ম’

১৯৯১ সালের ১৫ জানুয়ারি বেলা এগারটার দিকে ওভাল অফিসে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক শীর্ষ স্থানীয় উপদেষ্টাদের সঙ্গে এক বৈঠক করার পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ ইরাকে হামলা চালানোর নির্দেশ নামায় স্বাক্ষর করেন। ঐদিন বিকালে ডিক চেনি প্রেসিডেন্টের নির্দেশনামা বাস্তবায়নের আদেশ নামায় স্বাক্ষর করেন। পরদিন অর্থাৎ ১৬ জানুয়ারি বুশ পররাষ্ট্রসচিব বেকার ও কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ, মিত্রদেশগুলোর রাষ্ট্রদূত ও অন্যদের জানিয়ে দেন যে ঐদিন রাতেই ইরাকের ওপর হামলা চালানো হবে। এদিকে হামলা চালানোর এক ঘণ্টা আগে পর্যন্ত কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত ছিল। মস্কো শেষ চেষ্টার জন্য ওয়াশিংটন এর কাছে সময় চাইলেও যুদ্ধ থামানো যায়নি।

১৭ জানুয়ারি প্রথম প্রহরে ইরাকের লক্ষ্যবস্তুতে ‘টমহক’ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মাধম্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রবাহিনী উপসাগরীয় সংকটের শেষ যাত্রায় শরিক হয়। অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম শুরুর আগের সপ্তাহের কূটনৈতিক তৎপরতা ছিল বেশ লক্ষণীয়। জাতিসংঘ মহাসচিব পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে নিস্ফল জেনেও শেষ মুহূর্তে ছুটে গিয়েছিলেন বাগদাদে। সাদ্দাম হোসেন সম্ভবত কুয়েত থেকে এভাবে সরে আসার থেকে যুদ্ধ করাটাই বড় মনে করেছিলেন। তাই অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ১৫ জানুয়ারি তিনি নিজের হাতে যুদ্ধের সমস্ত দায়িত্বভার তুলে নেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশও পেন্টাগনকে ইরাক আক্রমণের কথা জানিয়ে দেন। তবে সম্ভবত বিমান আক্রমণ রাতে সুবিধাজনক হবে ভেবে আক্রমণ কয়েক ঘণ্টা বিলম্বে ১৭জানুয়ারি প্রথম প্রহরে শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রজোটের ঐ যুদ্ধ ছিল ‘গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা’ রক্ষার জন্য। মার্কিন সমর বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিকভাবে অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম এর স্থায়িত্বকাল ৪৮ঘণ্টা বলে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের তৃতীয় দিনে ইরাকের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও বিমানবাহিনীর সাহায্যে আক্রমণ প্রতিহত করার প্রেক্ষাপট এর স্থায়িত্বকাল সপ্তাহ বলে জানিয়ে দেন। মার্কিন এই ঘোষণায় তাদের জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একটা অস্তির এবং অস্বস্তির ভাব লক্ষ করা গিয়েছিল।

একটা ছোট পরিসংখ্যান দিলে বোঝা যাবে কত ব্যপক আকারে ইরাকের উপর বোমা হামলা চালানো হয়েছিল। প্রথম দিকে অর্থাৎ ১৭-২৫ জানুয়ারি, সময়সীমায় মোট বিমান হামলা চলে ১৪,৪০০বার। গড়ে প্রতিদিন বোমা বর্ষণ করা ১৮,০০০টন যা জাপানের হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত বোমার সমান।  এই বিরাট বহরের আক্রমণ চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্রজোটের বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়। তারপরও প্রেসিডেন্ট বুশ ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সব থেকে কম অর্থ ব্যয়ের যুদ্ধ।  যুদ্ধে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ডলার। আর এই অর্থ যথাক্রমে দেবে কুয়েত ১৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, জাপান ১১ বিলিয়ন ডলার, জার্মানি ৫.৫ বিলিয়ন ডলার, সৌদি আরব ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্র ৫ বিলিয়ন ডলার। যদিও অনুমানের তুলনায় যুদ্ধ কিছুটা বিলম্বিত হওয়ার কারণে আরও বেশি কিছু অতিরিক্ত অর্থ যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যয় করতে হয়েছিল।  অন্যান্য যুদ্ধের তুলনায় উপসাগরীয় সেই যুদ্ধে মার্কিন ব্যায়ের পরিমাণ ছিল নিতান্তই সামান্য। আর এই স্বল্প ব্যায়ের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়ে দেন যে জনগণকে এই যুদ্ধ ব্যায়ের কর দিতে হবেনা। তার আসল উদ্দেশ্য এর মধ্যেই বুঝা যায়। অর্থাৎ বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হবে অথচ জনগণকে তার খেসারত দিতে হবেনা, সেটা ছিল অকল্পনীয়।

অপারেশন ডেজার্ট স্টর্মে মার্কিন কূটনীতির সাফল্যের কোন তুলনা হয়না। ওয়াশিংটন সমস্ত পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন লাভে সমর্থ হয়। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল ইরাকের পরিক্ষিত বন্ধু, কিন্তু কুয়েত আক্রমণের দায়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরাকের উপর নাখোশ হয়ে পড়েছিল।

উপসাগরীয় যুদ্ধে অংশ নেয়া বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীঃ

যুক্তরাষ্ট্র                               ঃ ৩,৫০,০০০

সৌদি আরব                         ঃ ৪৫,০০০

মিসর                                   ঃ ৩৮,৫০০

ব্রিটেন                                 ঃ ৩২,০০০

সিরিয়া                                 ঃ ২১,০০০

পাকিস্তান                             ঃ ১১,০০০

উপসাগর সহযোগী কাউন্সিল ঃ ১০,০০০

বাংলাদেশ                             ঃ ২০০০

মরক্কো                                 ঃ ১,৭০০

নাইজার                               ঃ ৫০০

চেকোস্লোভাকিয়া                 ঃ ২০০

 

বলা যেতে পারে, উপসাগরীয় যুদ্ধ ছিল একটি দেশের বিরুদ্ধে বহুজাতিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আরব দেশগুলোর মধ্যে বিভক্তি আরও প্রকট হয়ে উঠে। আর আরব দেশগুলোর সেনাবাহিনী এই প্রথম সক্রিয়ভাবে একত্রে কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। প্রথমবারের মত মার্কিনীরা এই অঞ্চলে এত বড় আকারের ভূমিকা পালন করে। সাদ্দাম হোসেন মূলত আশা করেছিলেন ‘প্যান আরব’ বা ‘প্যান ইসলামিক’ একটা অনুভূতি আরব সরকারগুলোর মধ্যে তৈরি হবে কিন্তু সেটা হয়নি।

পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম সেনাবাহিনী এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও ইরাক যুদ্ধে হেরে যায়। এর প্রধানতম কিছু কারণ রয়েছে।

১. সবচেয়ে বড় ভুল ছিল কুয়েত দখল করার পর সৌদি সীমান্তে থেমে যাওয়া। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরাক যদি সৌদি আরবের দাহরান ও দাম্মাম পোর্ট দখল করে নিত এবং সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় তেল ক্ষেত্রগুলো অধিকার করতে পারত তাহলে মিত্র বাহিনী এত বিশাল সমরসজ্জা করতে পারত না। তাছাড়া তেলের এত বেশি ভাণ্ডার তার নিয়ন্ত্রণে চলে যেত যে শক্তি প্রয়োগের চিন্তা করাটাই তখন কঠিন হয়ে দাঁড়াত।

২. সাদ্দাম হোসেন কুয়েতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েই শুধু ব্যস্ত ছিলেন। দক্ষিণ ইরাকের প্রতিরক্ষা নিয়ে তিনি চিন্তাও করেননি।

৩. সাদ্দাম হোসেনের মার্কিন প্রশাসন সম্পর্কে ধারণা ছিল অত্যন্ত নগণ্য। আমেরিকান সৈন্যদের সম্পর্কে তার কোন অভিজ্ঞতাই ছিলনা।

৪. নিজের সমর সরঞ্জামের উপর তার অগাদ বিশ্বাস ছিল। তিনি তার স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র, সোভিয়েত ট্যাংক, ফরাসি মিরেজ বিমান নিয়ে গর্বিত ছিলেন। কিন্তু ঐ যুদ্ধের ফলে তাঁর সেই গর্ব চূর্ণ হয়ে যায়।

৫. নতুন প্রযুক্তি মুহুমুহু টমহকের গর্জন, ক্রুজ মিসাইলের অগ্নি স্ফুলিঙ্গ বাগদাদকে বিহ্বল করে দিয়েছিল।

৬. ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র রহস্যজনক কারণে ব্যবহার করা হয়নি। কুয়েতে অনেক রাসায়নিক অস্ত্রের শেল পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু তা ছোড়া হয়নি। পরবর্তীকালে ইরাকে অস্ত্র পরিদর্শক দলকে পাঠিয়েও কোনরকম রাসায়নিক অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ৪৩ দিনের সেই যুদ্ধে ইরাক তার সামরিক শক্তির ৪৫ ভাগ হারিয়ে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে।

তবে বলাই বাহুল্য, ২০০৩ সালের যুদ্ধের সাথে ১৯৯১ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধকে মেলানো যাবেনা। উভয় যুদ্ধের নায়ক একজন হলেও প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন ভিন্ন।

 

সহায়ক গ্রন্থাবলিঃ

  • International Politics on the World Stage, New York, John T. Rourke and Mark A. Boyer.
  • World Politics 97/98, New York,   Helen E. Purkitt(ed)

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মঞ্চায়নে অবতীর্ণ হওয়া বিশ্ব শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের দ্বন্ধ

Now Reading
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মঞ্চায়নে অবতীর্ণ হওয়া বিশ্ব শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের দ্বন্ধ

১৯৩৯ সালের ১সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণের মাধম্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেন হিটলার। এই যুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) দীর্ঘ ছয়বছর স্থায়ী ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও পৃথিবীর ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, এর একটি পক্ষ অক্ষশক্তি অন্যটি মিত্রশক্তি। অক্ষশক্তির মধ্যে ছিল জার্মানি, ইতালি এবং জাপান অন্যদিকে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ মিত্রশক্তি গঠিত হয়েছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে। যদিও অপ্রত্যাশিতভাবে রাশিয়াও ছিল মিত্রশক্তির দলে। যুদ্ধে একের পর এক জার্মানির পরাজয়ের প্রেক্ষিতে ১৯৪৫সালের এপ্রিলে জার্মানি ও ইতালি মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। হিটলার নিজেকে ধরা না দিয়ে আত্মহত্যা করেন এবং ইতালির একনায়ক মুসোলিনিকে গ্রেফতার পরবর্তী হত্যা করা হয়। অন্যদিকে, ১৯৪৫সালের ২আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও রাশিয়া পটাসডাম সম্মেলনে জাপানকে আত্মসমর্পণ করতে বললে জাপান তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে ৬ ও ৯ আগস্ট হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আনবিক বোমা বর্ষণ করা হয় ফলে ১৪ আগস্ট ১৯৪৫ জাপান শর্তহীনভাবে আত্মসমর্পণ করে।  এখানে একটা কথা বলা ভাল আর তা হচ্ছে জাপান কর্তৃক পার্ল হারবারে হামলা। ১৯৪১ সালের ৭ডিসেম্বর হাওয়াই এর ওয়াহু দ্বীপে অবস্থিত পার্ল হারবারে মার্কিন নৌ ও বিমান ঘাঁটিতে জাপান বিমান হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করে দেয়। জাপানী বিমান হামলায় চোখ খুলে যায় মার্কিনীদের, তারা সিদ্ধান্ত নিল জাপানে মরনাস্ত্রের আঘাত হানার। তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিল। ১৯৪৫ সালের ১৬জুলাই নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায়। এর ঠিক তিন সপ্তাহ পর হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা বর্ষণ করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছিল আনবিক বোমার ভয়াবহতা। বিংশ শতাব্দীতে এ ঘটনা পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরণের প্রভাব ফেললেও বৃহৎ শক্তিগুলো কখনো মরনাস্ত্র তৈরি, উৎপাদন ও পরীক্ষা থেকে পিছ পা হয়নি। বিংশ শতাব্দী প্রত্যক্ষ করেছে আটটি দেশের উত্থান, যারা নিজেদেরকে পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেছে। নিরস্ত্রীকরণের ক্ষেত্রে কিছু কিছু অগ্রগতি হলেও (এনপিটি চুক্তি ও সিসিবিটি চুক্তি স্বাক্ষর) বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূমিকা বরাবরই প্রশ্নের সম্মুখীন ছিল। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার ও উৎপাদন বন্ধের ব্যাপারে তারা কখনো আন্তরিক ছিলনা। এমনকি জাতিসংঘও এ ব্যপারে তেমন কোন বড় ভূমিকা পালন করতে পারেনি। বিংশ শতাব্দীতে এটা ছিল একটা বড় ব্যর্থতা যে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেও সভ্য সমাজ মরনাস্ত্র প্রতিযোগিতায় নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছিল।

একনজরে দেখে নিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি কি কারনে সংঘটিত হয়েছিলঃ

i) ভার্সাই চুক্তিঃ এই চুক্তির ফলে জার্মানি তার যাবতীয় উপনিবেশ হাত ছাড়া করল। শুধু তাই নয়, উপনিবেশে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ লগ্নী করা হয়েছিল তাও বিফলে গেল। সবদিক থেকে জার্মানিকে দুর্বল করাই ছিল ভার্সাই চুক্তির লক্ষ্য। সুতরাং এটা অনুমেয় ছিল যে জার্মানি এ চুক্তির শর্ত মনে প্রাণে স্বীকার করে নেবে না।

ii) দীর্ঘ যুদ্ধ বিরতিঃ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী শান্তি, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হল তখন দেখা গেল গণতন্ত্র, নিরাপত্তা ও শান্তি কোনটাই নিরাপদ নয়। সে জন্য দুই মহাযুদ্ধের মধ্যখানের সময়টাকে শান্তিপূর্ণ নয় বলে দীর্ঘ যুদ্ধ বিরতি বলা হয়।

iii) অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদঃ ভার্সাই চুক্তি জার্মানিকে নিঃস্ব করেছিল। চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর জার্মানির একমাত্র লক্ষ্য ছিল যে, কোন প্রকারে যুদ্ধপূর্ণ অবস্থায় ফিরে যাওয়া। জাপান ও ইতালি মনে করেছিল যে, আন্তর্জাতিক বানিজ্যে সব রকম সুযোগ সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। তাই অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে তারা অপরিহার্য মনে করেছিল।

iv) আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যঃ আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যকে অনেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ মনে করে। লীগ অফ নেশনস যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় লীগের সদস্যবৃন্দ ও অন্যান্য রাষ্ট্র শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সনাতন পদ্ধতির আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল, আর এ পদ্ধতি হল জোট তৈরি করা। অনেকের মনে তখন  এ বিশ্বাস জন্মেছিল যে, লীগের সফল হওয়া মানে যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে যাওয়া আর ব্যর্থতা মানে যুদ্ধ অনিবার্য।

v) নিরস্ত্রীকরণে ব্যর্থতাঃ লীগ অফ নেশনস এর প্রণেতাগণ মনে করেছিলেন শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নিরস্ত্রীকরণ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এই স্বদিচ্ছাকে ফলপ্রসূ করতে হলে বৃহৎ শক্তিবর্গের যে পরিমাণ সহযোগিতা ও লীগ কর্তৃপক্ষের দৃঢ়তা প্রয়োজন তার কোনটাই ছিলনা।  বৃহৎ শক্তিবর্গ অস্ত্র উৎপাদনের অশুভ প্রতিযোগিতায় নিজেদের নিমজ্জিত করেছিল। অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ না হওয়ায় তা যুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল।

vi) উগ্রজাতীয়তাবাদঃ হিটলারের ধারণা ছিল জার্মানজাতি পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র উৎকৃষ্ট ও শ্রেষ্ঠজাতি, অন্যরা নিকৃষ্ট। অতএব নিকৃষ্টের উপর শ্রেষ্ঠের কর্তৃত্ব থাকা খুবই স্বাভাবিক। জার্মানজাতি গোটা ইউরোপের উপর প্রাধান্য বিস্তার করবে এই স্বপ্নে হিটলার বিভোর ছিলেন। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করতে গিয়ে তিনি এক সর্বধ্বংসী যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

vii) সর্বাত্মকবাদঃ হিটলার ও মুসোলিনি উভয়েই গণতন্ত্রকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। তাঁরা গণতন্ত্রকে সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস করে সর্বাত্মকবাদ এর পথকে সর্বোৎকৃষ্ট উপায় বলে মেনে নিয়েছিলেন। তখন জার্মানি, জাপান ও ইতালির কাছে নিজেদের সংকীর্ণ জাতীয়তাবোধ ছাড়া অন্য কোন মূল্যবোধ যথাযথ মর্যাদা পায়নি।

viii) অন্যান্য কারণঃ এ ছাড়া লোকার্ণো চুক্তি, ওয়াশিংটন নৌ-সম্মেলনসহ কেলগ-ব্রিয়াণ্ড চুক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পরস্পর বিরোধী দুই মতাদর্শের বিকাশ ঘটেছে যা আজো বিদ্যমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্ব রাজনীতিতে একটি সদুরপ্রসারী ফলাফল আমরা প্রত্যক্ষ করি। আমরা এও দেখতে পাই বৃহৎ শক্তি হিসেবে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের পতন হয়েছে এই যুদ্ধ পরবর্তী অন্যদিকে  বৃহৎ শক্তি হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের। উত্থান ঘটেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের আর বিস্তৃতি বাড়িয়েছে স্নায়ু যুদ্ধের, যা নতুন আরেক বিশ্বযুদ্ধের ধামামা ক্রমাগত বাজিয়েই চলছে।

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে যে সব ভুলের কারণে জার্মানির পরাজয় ঘটেছিল

Now Reading
প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে যে সব ভুলের কারণে জার্মানির পরাজয় ঘটেছিল

এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ১৯১৪ সালের জুলাই মাসের ২৮ তারিখে অস্ট্রো-হাঙ্গেরি এবং সার্বিয়ার মধ্যেকার যুদ্ধের মাধ্যমে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সূচনা ঘটে। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই এই যুদ্ধের প্রভাব পুরো ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পরে। পরবর্তিতে যা আটলান্টিক পার হয়ে মার্কিনমুল্লুকে বিস্তার ঘটে। তবে এশিয়ার কিছু দেশও এই ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠেছিল। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ছিল এই মহাযুদ্ধের ব্যাপ্তি, এতে উভয়পক্ষের হতাহতের সংখ্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে যা অতীত কালের অন্য সকল যুদ্ধের নৃশংসতা কে হার মানিয়েছে! শুধু তাই নয়, যে পরিমাণ অর্থনৈতিক ও ভৌগলিকভাবে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা বিশ্বের জন্য ছিল পুরোপুরি নতুন এক অভিজ্ঞতা। এই যুদ্ধে বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্রের অংশগ্রহণের ফলে এটাকে বলা হয় মহাযুদ্ধ বা বিশ্বযুদ্ধ।

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে সামরিক দিক থেকে জার্মানি ছিল সব দিক থেকে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু রনাঙ্গনে ভুল চাল দেয়া হচ্ছে যুদ্ধ কৌশলের ব্যর্থতা। আসুন জেনে নিই কি কি কারণ ছিল জার্মানির পরাজয়ের পেছনে?

প্রথমত, জার্মানির পক্ষে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব ছিলনা। কিন্তু ব্রিটেন ও ফ্রান্স উপনিবেশগুলো থেকে অর্থ ও লোকবল সংগ্রহ করে যুদ্ধকে বিলম্বিত করে।

দ্বিতীয়ত, সেনা পরিচালনা করার দিক থেকে জার্মানির বেশ অসুবিধা ছিল। ইউরোপের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে জার্মানিকে সেনা সমাবেশ করতে হয়েছিল- ফলে জার্মান সেনাবাহিনী দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, যা তাদের যুদ্ধে পরাজয়ের অন্যতম কারণ।

তৃতীয়ত, রাশিয়ার বিপুল পরিমাণ সেনাবাহিনীর সামনে জার্মানি তার নিজ ভূখণ্ডে নিজস্ব সেনাবাহিনীকে এক রনাঙ্গন থেকে অন্য রনাঙ্গনে স্থানান্তর করা অসম্ভব ছিল। চারদিক হতে মিত্র পক্ষ জার্মানির সীমান্তে চাপ সৃষ্টি করলে জার্মানির বিপর্যয় ঘটে।

চতুর্থত, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার নৌ বাহিনীর তুলনায় জার্মান নৌবাহিনী ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল। যা তাদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে স্বীকৃত।

পঞ্চমত, সমুদ্রের উপর ব্রিটিশ নৌ শক্তির প্রাধান্য জার্মানির অর্থনৈতিক কাঠামোর উপর প্রচণ্ড আঘাত হানে। এছারা নিতান্ত প্রয়োজনীয় খাদ্যের অভাব ও অপুষ্টির ফলে জার্মানদের প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। সর্বোপরি প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ।

এসব কারণে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে জার্মানি হেরে যায়। জার্মানির পরাজয় ছিলো তাদের জন্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং জাতিগত অপমান। কিন্তু যে উগ্রবাদ জার্মানিকে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে টেনে নিয়ে গিয়েছিল, সেই উগ্রবাদিতার কারণেই জার্মানি পুনরায় দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সূচনা করেছিল।

Last Words Of Life

Now Reading
Last Words Of Life

ভালোবাসার মানুষের সাথে বিয়ে হবেনা প্রেমিকা জিজ্ঞেস করলো,

“আচ্ছা অন্য কারো সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেলে কি করবে তুমি? ভুলে যাবো” ছেলেটা উত্তর দিলো,

ছেলেটার উত্তর শুনে মেয়েটি রাগে অন্যদিকে মুখ ঘোরালো।

ছেলেটি আবার বলল- “তুমিও আমাকে ভুলে যাবে, সবচেয়ে বড় কথা, আমি যত দ্রুত তোমাকে ভুলে যাবো, তার চেয়েও বেশি দ্রুত তুমি আমাকে ভুলে যাবে”

“কি রকম?” প্রেমিকা প্রশ্ন করলো।

ছেলেটি বলতে শুরু করল-

“মনে করো বিয়ের প্রথম তিনদিন তুমি এক ধরনের ঘোরের মধ্যে থাকবে। শরীরে গয়নার ভার, মুখে মেকআপ এর প্রলেপ, চারিদিক থেকে ক্যামেরার ফ্লাশ, মানুষের ভিড়, তুমি চাইলেও তখন আমার কথা মনে করতে পারবে না। ‘আর আমি তখন তোমার বিয়ের খবর পেয়ে হয়ত কোন বন্ধুর সাথে উল্টাপাল্টা কিছু খেয়ে পড়ে থাকবো। আর তার কিছু পর তোমাকে হৃদয়হীনা বলে গালিদেব, আবার পরক্ষনেই পুরাতন স্মৃতির কথা মনে করে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদবো। বিয়ের পরের দিন তোমার আরো ব্যস্ত সময় কাটবে। আর প্রথম সপ্তাহে, স্বামী আর মিস্টির প্যাকেট এই দুটো হাতে নিয়ে তুমি বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনের বাড়ি ঘুরে বেড়াবে। আমার কথা তখন তোমার হঠাত হঠাত মনে হবে। এই যেমন স্বামীর হাত ধরার সময়, এক সাথে গাড়িতে চড়ার সময়। আর আমি তখন ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরে বেড়াব, আর বন্ধুদের বলব বুঝলি ভাই, জীবনে প্রেম ভালোবাসা কিছুই না, সব মিথ্যে। পরের একমাসে তুমি হানিমুনে যাবে, নতুন বাড়ি পাবে, শপিং, ম্যাচিং, শত প্লান, আর স্বামীর সাথে হালকা মিষ্টি ঝগড়া। তখন তুমি বিরাট সুখে, হঠাত আমার কথা মনে হলে ভাববে, আমার সাথে বিয়ে না হয়ে বোধহয় ভালই হয়েছে। আমি ততদিনে বাবা, মা, বন্ধু কিংবা বাড়ির বড়দের বকা খেয়ে মোটামুটি সোজা হয়ে গিয়েছি। ঠিক করেছি কিছু একটা কাজ পেতে হবে, তোমার চেয়ে একটা সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করে তোমাকে দেখিয়ে দিতে হবে। সবাইকে বলব, তোমাকে ভুলে গেছি। কিন্তু তখনও মাঝরাতে তোমার এসএমএস গুলো বেরকরে পড়বো আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ব। দুই বছর পর তুমি আর কোন প্রেমিকা কিংবা নতুন বউ নেই। মা হয়ে গিয়েছো, পুরাতন প্রেমিকের স্মৃতি, স্বামীর আহ্লাদ-ভালোবাসা, এসবের চেয়েও বাচ্চার ডায়াপার, হামের টীকা এসব নিয়ে বেশি চিন্তিত অর্থাত তখন আমি তোমার জীবন থেকে মোটামুটি পারমানেন্টলি ডিলিট হয়ে যাবো। এদিকে ততোদিনে আমিও একটা কাজ পেয়েছি, বিয়ের কথা চলছে। মেয়েও পছন্দ হয়েছে। আমি এখন ভীষণ ব্যাস্ত। এবার সত্যিই আমি তোমাকে ভুলে গিয়েছি। শুধু রাস্তা ঘাটে কোন প্রেমিক-প্রেমিকা দেখলে তোমার কথা মনে পড়বে। কিন্তু তখন আর দীর্ঘশ্বাসও আসেবে না….।

এতদূর পর্যন্ত বলার পর ছেলেটি দেখল তার প্রেমিকা ছলছল চোখ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে কোন কথা নেই। ছেলেটি ও চুপচাপ।

একটু পর প্রেমিকা বললো – “তবে কি সেখানেই সব শেষ?”

ছেলেটি বলল – না। কোন এক মন খারাপের রাতে তোমার স্বামী নাক ডেকে ঘুমুবে, আর আমার বউও ব্যস্ত থাকবে নিজের ঘুমরাজ্যে। শুধু তোমার আর আমার চোখে ঘুম থাকবেনা, সেদিন অতীত আমাদের দুজনকে নিঃশ্বদে কাঁদাবে। উপর ওয়ালা ব্যাতীত সে কান্নার কথা কেউ জানবে না, কেউ না…।

মেয়েটি ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল….

পরিশেষে এটাই বলবো যে পরিস্থিতি কাছে মানুষ আজ আনেক অসহায় ।।