সপ্নের স্যাটেলাইট ও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি

Now Reading
সপ্নের স্যাটেলাইট ও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি

আমরা সকলেই জানি যে আগামী ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ ইং তারিখে আমাদের আরও একটি বিজয় হতে যাচ্ছে।
তা হলো মহাকাশ বিজয় অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এর উৎক্ষেপন।
আমাদের মতো দেশের জন্য এটি একটি বিরাট পাওয়া।

আমরা সকলেই জানি যে স্যাটেলাইট হতে আমরা কয়েকটি সুবিধা পাবো।
যেমন,
১। দেশের অর্থ দেশেই থাকবে
.

২। আবহাওয়া এবং সামরিক ক্ষেত্রে উন্নতি হবে।
.
৩। স্যাটেলাইটে ভাড়া দিয়ে উপার্জন হবে।
.
৪। আরব-কাজাখ থেকে ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া-ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এর রেঞ্জ। ভাড়া দেয়া যাবে এসব দেশকেও।
.
৫। নতুন করে ১০০ জন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।
.
৫। মাত্র ৬-৭ বছরের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু
স্যাটেলাইট লাভজনক প্রকল্পে পরিণত হবে। ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো আমরা কি এর ঝুকি টা ভেবে দেখেছি?

চলুন না ঝুকি গুলো একটু দেখে নেয়া যাক।

১। পৃথিবীর যত দেশই স্যাটেলাইট উড়িয়েছে তারা প্রত্যেকেই ইনিশিয়াল স্যাটেলাইট নিজের অক্ষরেখায় উড়িয়েছে। বাংলাদেশ অবস্থান করছে ৮৬-৯১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা রেখায়। সে হিসেবে বাংলাদেশ এ অবস্থানেই স্যাটেলাইট পাওয়ার কথা। কিন্তু ৮৮-৯১ এ রাশিয়ার দুটি সহ মোট চারটি স্যাটেলাইট
রয়েছে। তাই এখানে স্থান পাওয়া সম্ভব না। কিন্তু ৮৬-৮৮ ডিগ্রি খালি থাকার পরও
মহাকাশ সংস্থা আইটিইউ বাংলাদেশকে স্লট দেয় নি। বাংলাদেশ চেষ্টা করে ১০২ ডিগ্রিতে। সেখানে রাশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া আপত্তি জানায়। বাংলাদেশ চেষ্টা করে ৬৯ ডিগ্রিতে। সেখানে একই আপত্তি করে চীন,
সিঙ্গাপুর,মালেশিয়া সহ আরো কয়েকটি দেশ।অবশেষে বাংলাদেশ স্থান পায়  ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা রেখায়।
প্রশ্ন হচ্ছে ৯০ ডিগ্রির বাংলাদেশকে ১১৯.১
ডিগ্রির স্যাটেলাইট কতটা নিখুঁতভাবে
কাভার করবে?

২। বাংলাদেশের বিভিন্ন চ্যানেল বা
বেসরকারি কোম্পানী কি বলা মাত্রই
নিজের স্যাটেলাইট থেকে সেবা গ্রহণ
করবে?
সেবার মান বিদেশী স্যাটেলাইট থেকে
উন্নত হবে এই নিশ্চয়তা কে দেবে?

৩। আমরা বিদেশে সেবা দিয়ে ৫০ মিলিয়ন
ডলার আয়ের স্বপ্ন দেখছি। কিনবে কারা?
ভুটান, নেপাল, মায়ানমার, আরব কিংবা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। আমরা নিজেরা এখনো সম্পূর্ণ রূপে ভারত নির্ভর। সে জায়গায় ভারত বা চীন বাদ দিয়ে নেপাল,ভুটান আমাদের কাছে থেকে সেবা নেবে এটার নিশ্চয়তা কি?

আর যদি কেউ কিনতেই যায়, ভারত চীন
তাদের ব্যবসার লসকে নিশ্চয়ই নীরবে মেনে নেবে না।

৪। বলা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অগ্রীম
১৬৫২ কোটি টাকা দেবে। প্রশ্ন হচ্ছে তারা
কি দিতে বাধ্য?
১৫% সাফল্যের সম্ভাবনার একটা প্রজেক্টে
অগ্রীম টাকা দেয়ার কোন যৌক্তিকথা
আছে?
সেবা নেয়ার আগেই কোন বেসরকারি
প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা নেয়ার রেওয়াজ
বিরল। আর বাংলাদেশের মতো দেশে কে এত টাকা দেয়ার রিস্ক কে নেবে?

৫।বাংলাদেশ একটি বিশাল ঋন এর মধ্যে পড়ে যাবে।

৬।মহাকাশে পাঠানো স্যাটেলাইট এর মধ্যে ৪২% স্যাটেলাইট ই নিজস্ব কক্ষপথে যেতে ব্যার্থ হয়েছে। কক্ষপথে যেয়ে ঠিকঠাক মতো কাজ করেছে মাত্র ১৫% স্যাটেলাইট। আমরা কি সেই ১৫% এর মধ্যে একজন হতে পারবো?

৭। আবার বাংলাদেশ সম্পর্কে আমরা সবাই কম বেশী জানি।  আমরা জানি এই দেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার আসবে।
স্যাটেলাইটটি বঙ্গবন্ধুর নামে উৎক্ষেপন করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো সরকার এর বদল ঘটলে আবারো হাজার কোটি টাকা দিয়ে এই নাম পরিবর্তন করা হবে না তার কি নিশ্চয়তা আছে।

৮। একটা স্যাটেলাইট ভাঙতে পারে, কক্ষচ্যুত
হতে পারে। সেটাকে আবারো রিকোভার করার ক্ষমতা কি বাংলাদেশের আছে?

৯। ২০ টি দেশ আমাদের কাজে সায় দেয় নি। আমারা জানি যে  স্যাটেলাইট যুদ্ধও বিরল ঘটনা নয়। ২০০৭ এ চীন আমেরিকার একটি স্যাটেলাইট
নামিয়ে দেয়, আমেরিকা পরের বছরেই
চীনের একটি নামায়। সম্ভাবনা অতি অল্প হলেও ভারত-চীন নিজের স্বার্থে আমাদের স্যাটেলাইট নামাবে না এটা কে বলতে পারে?

১০। কাজ দেয়া হয়েছে বিদেশী
কোম্পানীকে। বিদেশী কোম্পানী কর্তৃক
দেশের সম্পদ লুট বা নষ্টের ইতিহাস অনেক।

১১। সর্বশেষ খুব সহজ স্বাভাবিক প্রশ্ন, নিজেরা স্যাটেলাইট তুললে যদি এতই সুবিধা তবে কেন মাত্র ৪০ টি ( বা ৫৮) দেশ স্যাটেলাইট তুলল?

ইউরোপের সবকটা দেশ বা উত্তর-দক্ষিণ
আমেরিকার সবকটা দেশ কেন তুলল না?
তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা নিশ্চয়ই
বাংলাদেশের চেয়ে ভালো।

অর্থাৎ প্রশ্ন কিন্তু এখনো থেকেই যাচ্ছে।

তবে এতো সব ঝুকি থাকা সত্ত্বেও স্যাটেলাইটটি আমাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে এই আশাই করি।