এক আমেরিকান আইএস নেতা এবং তার বাংলাদেশী সঙ্গীসাথীদের গল্প

Now Reading
এক আমেরিকান আইএস নেতা এবং তার বাংলাদেশী সঙ্গীসাথীদের গল্প

এক.

তার নাম ইয়াহইয়া আবু হাসান, ইসলাম-পূর্ব নাম জন জর্জেলাস। সে একজন গ্রীক বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক। সে বেড়ে ওঠে প্রচন্ড ইসলামবিদ্বেষী পরিবেশে। ছোটবেলায় সে নিজেও প্রচন্ড ইসলামবিদ্বেষী ছিল। কলেজে ওঠার পর বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম বিষয়ক একটা কোর্স করার সময় ইসলাম বিষয়ক গতানুগতিক লেকচারগুলো তার কাছে বিরক্তিকর লাগতে থাকে। ফলে সে নিজেই ইসলাম সম্পর্কে আরো জানার চেষ্টা করতে থাকে এবং ধীরে ধীরে আবিষ্কার করে, ইসলাম সম্পর্কে তার এতোদিনের ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ছিল।

২০০১ সালে, ৯/১১ এর ঘটনার পরপরই, ১৮ বছর বয়সী জর্জেলাস ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। সে বছরই সে আরবী ভাষা শেখার জন্য সিরিয়াতে যায়। সে একাধিক বার সিরিয়াতে গিয়ে আরবী ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন করে।

২০০৬ সালে, যখন সে আমেরিকাতে বসে বিভিন্ন আন্ডারগ্রাউন্ড জিহাদী ওয়েব সাইট এবং ফোরামে ভিজিট করতো, এবং ইরাকে গিয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে জিহাদে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন এক সকালে সোয়াট টীম তার বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। বিচারে তার ৩৪ মাস কারাদন্ড হয়।

ইয়াইয়া আবু হাসান

২০১১ সালে, জেল থেকে মুক্তির আরো ২ বছর পর, যখন তার প্যারোলের মেয়াদ শেষ হয়, সে সপরিবারে আমেরিকা ত্যাগ করে মিসরে “হিজরত” করে। সেখানে তার সাথে অন্যান্য জিহাদীদের পরিচয় হয় এবং তার লেকচার, ফতোয়ার মাধ্যমে সে নিজেও জিহাদী ধ্যান-ধারনার প্রচার করতে থাকে।

২০১৩ সালে মোহাম্মদ মুরসীর ব্রাদারহুড সরকারের পতন হলে ইয়াহইয়া তুরস্ক হয়ে সিরিয়াতে চলে যায়। এবং সেখানে তার সাথে ইসলামিক স্টেটের পূর্ববর্তী সংস্করণ একিউআই (আলক্বায়েদা ইন ইরাক), পরবর্তীতে আইএসআই (ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক) এর নেতাদের সাথে পরিচয় হতে থাকে।

ইয়াহইয়া দীর্ঘদিন সিরিয়ার আলেপ্পোতে বাস করে এবং আরবী ভাষা, শরীয়া আইন প্রভৃতি বিষয়ে তার অগাধ পান্ডিত্যের জোরে ধীরে ধীরে জিহাদীদের মধ্যে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নেয়। ২০১৪ সালে, আইএসের খিলাফত ঘোষণার প্রাক্কালে, সে আইএসআই এর নেতাদেরকে প্ররোচিত করতে থাকে এই বলে যে, এই গ্রুপটার এখন যে পরিমাণ সামর্থ্য সৃষ্টি হয়েছে, এবং যে পরিমাণ ভূমি তাদের দখলে আছে, তাতে তাদের নেতা, বাগদাদীর উপর খিলাফত ঘোষণা করা ওয়াজিব হয়ে পড়েছে। বাগদাদী যদি খিলাফত ঘোষণা না করে, তাহলে সেটাই হবে তার জন্য হারাম।

ইনফ্যাক্ট, সে নিজেই আইএসআই এর বিভিন্ন প্রভিন্সের নেতাদেরকে বাগদাদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে চিঠি দিতে থাকে এই বলে যে, বাগদাদী যদি খিলাফত ঘোষণা না করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা তাদের জন্য অপরিহার্য। এরকম সময়ে তার সাথে আইএসের মুখপাত্র আবু মোহাম্মদ আল-আদনানীর দেখা হলে সে আদনানীকেও এই কথা জানায়। তখন আদনানী তাকে আশ্বস্ত করে যে, কয়েকমাস আগেই গোপনে খিলাফত ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে এবং শীঘ্রই প্রকাশ্যে সেটার ঘোষণা দেওয়া হবে।
দুই.

এই যে, ইসলামিক স্টেটের এতো বড় একজন নেতা, তাদের তথাকথিত খিলাফত ঘোষণার পেছনেও যার সামান্য হলেও অবদান ছিল, আইএসের মুখপাত্র এবং ফরেন অপারেশন বিভাগের প্রধান আদনানী সহ অন্যান্য নেতাদের সাথেও যার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল, এই আমেরিকান আইএস নেতা আবু ইয়াহইয়ার স্ত্রী একজন বাংলাদেশী বংশদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। তার নাম জয়া চৌধুরী, ওরফে তানিয়া, ওরফে নাজাহ উম্মে হাসান।

জয়া চৌধুরী তানিয়া, ছেলেদের সাথে

তানিয়ার জন্ম ইংল্যান্ডে হলেও তার বাবা নুরুল চৌধুরী এবং মা জাহানারা চৌধুরী বাংলাদেশ থেকে ইংল্যান্ডে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল। তানিয়ার বেড়ে ওঠা আর দশটা ব্রিটিশ বাংলাদেশী পরিবারের মতোই। কিন্তু এ লেভেলে পড়ার সময় সে কিছু আলজেরিয়ান আল্ট্রা-কনজারভেটিভ ছাত্রছাত্রীর সংস্পর্শে এসে ধর্মকর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এ সময় সে ওয়েস্টার্ণ পোশাকের পরিবর্তে বোরকা পরতে শুরু করে। ইয়াহইয়ার সাথে তার পরিচয় হয় একটা ইসলামিক ডেটিং সাইটের মাধ্যমে, ২০০৩ সালে। ২০০৪ সালে তারা বিয়ে করে। ইয়াহইয়ার ঘরে তার চার ছেলের জন্ম হয়। সবচেয়ে বড় ছেলের নাম হাসান, যার নামে তারা নিজেদের কুনিয়া আবু হাসান এবং উন্মে হাসান গ্রহণ করে।

তানিয়ার যে ছবিতে রাজা লাইক দিয়েছিল

২০১৩ সালে তানিয়াও ইয়াহইয়ার সাথে সপরিবারে মিসর থেকে সিরিয়াতে প্রবেশ করে। কিন্তু ছোট ছোট চার ছেলে নিয়ে যুদ্ধের ময়দানের কঠোর জীবন সে সহ্য করতে পারেনি। সে ২০১৩ সালের শেষ দিকে ইয়াহইয়াকে ছেড়ে চার ছেলে নিয়ে তুরস্ক হয়ে লন্ডনে ফিরে আসে। ইয়াহইয়া পেছনে রয়ে যায়, এবং পরে আইএস খিলাফত ঘোষণা করলে আইএসে যোগ দেয়। লন্ডনে ফেরার পর তানিয়া শুধু যে ইসলামিক চরমপন্থা থেকে ফিরে আসে, তাই না, সে বলতে গেলে ইসলাম থেকেই দূরে সরে যায়। ২০১৪ সালে তানিয়া ইয়াহইয়াকে ডিভোর্স দেয়। এ সময় সে হিজাব বাদ দিয়ে ওয়েস্টার্ণ পোশাকে ফিরে যায়, তার চুল ছোট করে কেটে ফেসবুকে পোস্ট দেয়, নিজেকে বামপন্থী লিবারেল হিসেবে ফেসবুকে পরিচয় দেয়। বর্তমানে সে টেক্সাসে তার শ্বশুর বাড়িতে জীবন যাপন করছে।

তিন.

এই ইয়াহইয়া-তানিয়া দম্পতির অনলাইন পারিবারিক বন্ধু ছিল আরেক বাংলাদেশী আইএস সদস্য, চট্টগ্রামের নিয়াজ মোর্শেদ রাজা ওরফে আবু মারিয়াম আল-বাঙ্গালি।

রাজার জন্ম চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে হলেও তার বাবার চাকরির সুবাদে তার বেড়ে ওঠা জাম্বিয়াতে। পরে তারা দেশে ফিরে আসে এবং ঢাকার বারিধারায় বসবাস শুরু করে। এ লেভের ২০০৭ সালে রাজা পড়াশোনার জন্য অস্ট্রেলিয়াতে যায়, কিন্তু পড়াশোনা শেষ না করেই ২০১০ সালে দেশে ফিরে আসে। পরে ২০১৫ সালের মার্চ মাসে হঠাত করেই কাউকে না জানিয়ে সে সিরিয়াতে গিয়ে আইএসে যোগদান করে।

রাজা বাংলাদেশে থাকাকালে

রাজার সাথে অন্তত ২০১২ সাল থেকেই ইয়াহইয়া-তানিয়া দম্পতির পরিচয় ছিল। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে রাজা ফেসবুকে তার মেয়ে মরিয়মের (এই মরিয়মের নাম অনুসারেই রাজা তার কুনিয়া আবু মরিয়ম গ্রহণ করেছিল) একটা ছবি পোস্ট করে। সেই ছবির নিচে তানিয়াকে মন্তব্য করতে দেখা যায়। রাজা ২০১৩ সালে ইয়াহইয়াকেও তার মেয়ের একটা ছবিতে ট্যাগ করে। এপ্রিল, ২০১৪তে রাজা তার স্ত্রী ও কন্যার সাথে তোলা একটি ছবি পোস্ট করে, যেখানে তানিয়া মন্তব্য করে – Beautiful family masha-Allah! মার্চ, ২০১৩ সালে, তানিয়া তার ছেলের সাথে একটা ছবি পোস্ট করে, সেই ছবিতে রাজাকে লাইক দিতে দেখা যায়।

রাজার যে ছবিতে তানিয়া কমেন্ট করেছিল

রাজার সাথে ইয়াহইয়া-তানিয়া দম্পতির ঠিক কিভাবে পরিচয়, সেটা নিশ্চিত জানা যায়নি। অনেকেই ধারনা করেছেন, রাজা সম্ভবত অস্ট্রেলিয়া থাকতেই র‌্যাডিকালাইজড হয়েছিল, কিন্তু পত্রপত্রিকায় তার বোনের সাথে সাক্ষাত্‍কার থেকে জানা যায়, অস্ট্রেলিয়া থেকে ফেরার পরেও অন্তত কিছুদিন সে পার্টিতে যাওয়া সহ স্বাভাবিক জীবন-যাপনেই অভ্যস্ত ছিল। সে সম্ভবত আরো পরে অনলাইনে তার অস্ট্রেলিয়ান বন্ধুদের মাধ্যমে র‌্যাডিক্যালাইজড হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান জিহাদী সার্কেলে ইয়াহইয়ার শিষ্য এবং একনিষ্ঠ ভক্ত, প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা মুসা সেরান্তোনিওর কল্যাণে ইয়াহইয়ার নাম বেশ পরিচিত ছিল।

এই নিয়াজ মোর্শেদ রাজা ওরফে আবু মরিয়ম আল-বাঙ্গালি, ২০১৫ সালের অক্টোবরে ইরাকের তিক্রিত শহরে শিয়াদের একটা সমাবেশে আত্মঘাতী বোমা হামলা করে। তার আগে সে আইইডি সম্বলিত আর্মার্ড ট্রাকে বসে ইংরেজিতে ভিডিও রেকর্ড করে যায়। পরবর্তীতে আইএস গত মার্চ মাসে তার সেই প্রপাগান্ডা ভিডিও প্রকাশ করে।

 

সোর্স:

The American Climbing the Ranks of ISIS
One of the world’s most wanted terrorists married a British woman
Suicide bomber in Iraq is Neaz from Chittagong
Exclusive: Man in latest IS video is Neaz Morshed Raja
BD terrorist had links to IS kingpin
ইসলামিক স্টেটের ‘বাংলাদেশি যোদ্ধা’ সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে
নামাজে গিয়ে নিখোঁজ হন ‘আইএস আত্মঘাতী’ নিয়াজ মোর্শেদ রাজা
Former Deakin University student Islamic State suicide bomber